১০. চোখ মেলে তাকাল কেড্রিক

চোখ মেলে তাকাল কেড্রিক, অনেকক্ষণ বুঝতে পারল না কিছু। অপরিচিত একটা কামরায় নরম বিছানায় শুয়ে আছে ও। অনেকগুলো মুহূর্ত নিঃসাড় পড়ে রইল, স্মৃতির পাতা হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করল কোথায় আছে? কেন? আচ্ছা, কে ও? হ্যাঁ, মনে পড়েছে ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক নিউ অরলিন্স থেকে…একটা কাজ নিয়ে পশ্চিমে এসেছিল…এবার একে একে মনে পড়ে গেল সব।

চিমনি রক-এ মিটিং ছিল। ম্যাকলেনন আসতে না পারায় স্টীলম্যানকে নিয়ে সভায় যোগ দিতে এসেছিল পিটার সেগাল। ঠোঁট থেকে সিগারেট ফেলতে গিয়ে সামনে তাকাতেই পাথরের আড়ালে লুকানো লোকগুলোকে দেখতে পায় ও, রাইফেলের ব্যারেলে সূর্যের আলো ঝিলিক মারছিল। সঙ্গে সঙ্গে বাকি দুজনকে সাবধান করে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে, আহত হয়েছে ও, কমপক্ষে একটা গুলি ঢুকেছে শরীরে।

কতক্ষণ, কতদিন আগের ঘটনা সেটা? ঘাড় ফিরিয়ে এপাশ-ওপাশ তাকাল পল কেন্দ্রিক। চৌকো কামরা, একদিকের দেয়াল নিরেট পাথরের তৈরি, অন্য এক দেয়ালের অংশবিশেষও তাই। ঘরের অবশিষ্ট অংশজুৎসই পাথরের টুকরো বসিয়ে বানানো হয়েছে। বিশাল বিছানা ছাড়াও এ-ঘরে একটা চেয়ার টেবিল আছে। কেড্রিক নড়ে উঠতেই ক্যাঁচ ক্যাচ শব্দে তীব্র আপত্তি জানাল খাটা। ঘরের দরজা খুলে গেল। মুখ তুলেই সামান্থা ফক্সের চেহারা দেখতে পেল কেড্রিক।

সামা? বিস্মিত কেড্রিক। কোথায় আমি? কী হয়েছে আমার?

কয়েকদিন হলো অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছ, বিছানার পাশে দাঁড়াল সামান্থা। মারাত্মক চোট পেয়েছ, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে তোমার। আহত হওয়ার অনেক পর লরেডো শ্যাড আর বব ম্যাকলেনন তোমাকে খুঁজে পেয়ে এখানে নিয়ে এসেছে।

আর সেগালরা?

দুজনই মারা গেছে। তোমারও মারা যাবার কথা ছিল।

কিন্তু এটা কোন জায়গা?

বহু পুরোনো একটা ক্লিফ-হাউস। থিভিং-রক পাহাড়ের ওপর এক পাশে বানানো হয়েছে এ-বাড়িটা। ম্যাকলেনন চিনত। তুমি বেঁচে আছ জানতে পারলে ওরা আবার তেড়ে আসবে বুঝতে পেরে তোমাকে এখানে নিয়ে আসে ও। লরেডো শ্যাড ওকে সাহায্য করেছে।

এখন এখানে আছে ওরা? শ্যাঙ আছে। প্রায়ই জিনিসপত্র আনতে ইয়েলো বার্ট-এ যেতে হয় তাকে। ইদানীং খুব সতর্ক থাকতে হচ্ছে, সম্ভবত সন্দিহান হয়ে উঠেছে ওরা।

আর ম্যাকলেনন?

ও মারা গেছে, পল। ডরনি শ খুন করেছে ওকে! তোমার জন্যে ডাক্তার আনতে মাস্ট্যাংয়ে গিয়েছিল, মাঝ রাস্তায় ওকে গানফাইটে চ্যালেঞ্জ করে ডরনি। বব ম্যাকলেনন ক্ষিপ্র, কিন্তু ডরনি শয়ের মতো নয় কোনওমতেই, পিস্তলু বের করার আগেই ডরনির গুলিতে মারা গেছে।

তুমি এখানে এলে কী করে? লরেডো শ্যাডের সঙ্গে আলাপ করে, ম্যাকলেনন আমার কাছে গিয়েছিল। আমি কোম্পানির বিরোধিতা করছি জানত। সেজন্যেই আমাকে বেছে নিয়েছে। ওরা। তোমার আহত হওয়ার খবর পেয়ে দেরি করি নি, এখানে চলে এসেছি। খুব ভালো না হলেও নার্সিং মোটামুটি জানতাম, লরেডোর সাহায্যে যদূর সম্ভব করেছি। লরেডো অসম্ভব ভালো লোক, পল। একেই বোধ হয় বন্ধু বলে। তোমার জন্যে কিনা করেছে! না দেখলে আমি বিশ্বাস করতাম না।

মাথা দুলিয়ে সায় দিল কেড্রিক। গুলি করেছিল, কারা? আমি সম্ভবত পয়েন্সেটকে দেখেছি।

হ্যাঁ, সে-ও ছিল। ওদের এ-নিয়ে কয়েকবার আলোচনা করতে দেখলেও এমন কিছু হতে পারে ভাবতে পারি নি। পয়েন্সেটের সঙ্গে লী গফ, ফেসেনডেন, ক্লসন আর ডরনি শ ছিল ওখানে।

আর কিছু ঘটেছে?

কী নয়? ইয়েলো বাট স্যালুন আর লিভারি-স্ট্যাবল পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে ওরা। অর্ধেকেরও বেশি লোককে তাড়িয়ে দিয়েছে ঘর-বাড়ি থেকে। সারভেঅররা এখন কাজ করছে ওখানে, আগের জরিপে ভুল থাকলে শুধরে নেয়ার জন্যে এসেছে। পিট লেইন আর তোমার বন্ধু ডাই রীডের নেতৃত্বে ইয়েলো বাটবাসীদের একটা দল পাহাড়ের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে। ওখানে বসে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওরা।

আর স্যু লেইন? ঝট করে কেড্রিকের দিকে তাকাল সামান্থা ফক্স! মেয়েটাকে তোমার খুব পছন্দ, না? ও, হ্যাঁ-কীথের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সে। চব্বিশ ঘণ্টাই একসঙ্গে আছে। বলতে গেলে কীথই এখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। আরও কয়েকজন পিস্তলবাজ আমদানি করা হয়েছে। মিক্সাসরাও আছে। অ্যাল্টন বারউইক আর লরেন কীথের হাতের মুঠোয় চলে গেছে দেশটা। এরই মধ্যে একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেছে ওরা।

নির্বাচন?

হ্যাঁ। নিজেরাই ভোট গুনেছে। মেয়র হয়েছে আমাদের কর্নেল কীথ, আর ফেসেনডেন হয়েছে শেরিফ। সঙ্গত কারণেই নির্বাচনে দাঁড়ায় নি করউইক। আর ডরনি শ তো প্রাণ গেলেও শেরিফের কাজ করবে না।

তা হলে দেখা যাচ্ছে সবকিছু সামলে নিয়েছে ওরা, না? বলল কেড্রিক। আমি বেঁচে আছি এখনও জানতে পারে নি বোধহয়।

না, চিমনি রক-এ ফিরে গিয়ে তিনটে কবর খোড়ে লরেডো শ্যাঙ, সেগাল আর স্টলম্যানকে কবর দিয়ে অন্য গর্তটিও আবার মাটি ফেলে ভরে দিয়েছে ও। তারপর ওটার ওপঃ তোমার নাম-ফলক পুঁতে দিয়েছে।

বাহ, চমৎকারর! সন্তুষ্ট হলো পল কেড্রিক। সামান্থার দিকে তাকাল। আচ্ছা, ওদের চোখে ধুলো দিয়ে এখানে যাওয়া-আসা করছ কীভাবে?

ঈষৎ রক্তিম আভা লাগল সামান্থার গালে। আমি আর ফিরি নি, পল। এ কদিন তোমার কাছেই ছিলাম। আসা-যাওয়া করার উপায় থাকলে তো? সব ফেলে চলে এসেছি আমি,

আর কয়দিন শুয়ে থাকতে হবে আমার?

ঠিক মতে, বিশ্রাম নিলে বেশি না। নাও, এবার চুপ করো, অনেক কথা হয়েছে।

মনে মনে পরিস্থিতি বিচার করে দেখল পল কেড্রিক। শিগগিরই জমি কেনা হয়ে যাবে বারউইকদের। এখন ওর একটাই কর্তব্য, অবৈধ উপায়ে কোম্পাৰি যাতে মুনাফা লুটতে না পারে, যেভাবে হোক তার ব্যবস্থা নেয়া। শুয়ে শুয়ে আস্তে আস্তে একটা প্ল্যান খাড়া করে ফেলল ও। ফঁক-ফোকরগুলো বন্ধ করে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিল সেটাকে।

কাছেই দেয়ালে পেরেকের সঙ্গে ঝুলছে ওর পিস্তল দুটো। সেইন্ট জেমস থেকে আস্তাবলে রেখে আসা ব্যাগটাও আছে এক কোণে।

সন্ধ্যা নাগাদ চূড়ান্ত হয়ে গেল কেড্রিকের পরিকল্পনা। এর পরপরই লরেডো শ্যাড এল, বিস্তারিত জানাল ওকে। সিম্যারন? একটু ভেবে মাথা দোলাল লরেডো, বুমফীল্ড হলে কাছে হত না? কী বলে?

ঠিক আছে, সায় দিল কেড্রিক, তা হলে আর দেরি করো না।

ও-নিয়ে ভাবছি না, তামাক চিবুতে চিবুতে বলল লরেডো শ্যাড। কদিন থেকেই খুবই সন্দেহবণ হয়ে উঠেছে ওরা। আমি বাইরে থাকতে থাকতেই ট্রেইল করে এখানে এসে পড়লে?

ঝুঁকি না নিয়ে উপায় নেই। এই যে নাও, টেলিগ্রাম আর চিঠি দেরি করো না!

.

 জানালা গলে রোদ ঢুকে গড়াগড়ি যাচ্ছৈ কামরায়। নাশতা নিয়ে ভেতরে এল সামান্থা ফক্স। কেড্রিকের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল চেহারা। আরে তুমি দেখছি বসে আছ?

বোকার মতো হাসল কেড্রিক। হ্যাঁ, শুয়ে শুয়ে তো কম দিন কাটালাম না। আচ্ছা, কদিন হলো বলো তো?

প্রায় দুসপ্তাহ, বলল সামান্থা, কিন্তু এখন কিছুতেই হাঁটাহাঁটি করা চলবে না। আরও কিছু দিন বিশ্রাম নিতে হবে।

জানালার কাছে এক কোণে বসলে নীচের ট্রেইলে সহজে নজর রাখা যায়। কেড্রিক ওখানে বসার পর একজোড়া উইনচেস্টার ওকে এনে দিল সামান্থা। অস্ত্র দুটো পরিষ্কার করে নিল কেড্রিক, যত্নের সঙ্গে তেল দিয়ে পালিশ করল; তারপর টোটা ভরে জানালার সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখল। এবার পিস্তলদুটো পরীক্ষা করে ঢুকিয়ে রাখল হোলস্টারে। সব ঔষে স্যাডলব্যাগ থেকে ওয়েলশ নেভী পিস্তল দুটি বের করে পরখ করল।

এখন আর কিছুই হয়তো করার নেই, ভাবছে কেড্রিক, অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু আরও আগে র‍্যানসামের কথা মনে পড়ল না কেন? আশ্চর্য! ফ্রেডরিক র‍্যানস্যামের মতো আঁদরেল উকিল সারা ওয়াশিংটনে আর আছে। কিনা সন্দেহ। গৃহযুদ্ধের সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে ওরা। ফ্রাংকো প্রশিয়ান ওঅরে, ফ্রান্সে থাকতে ওর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিদর্শক হিশেবে ওখানে গিয়েছিল রানসাম। কোম্পানির জমি কেনায় কেউ যদি বাধা দিতে পারে, একমাত্র ও-ই পারবে, সময় যত কমই হোক না কেন!

টেলিগ্রামের সঙ্গে বিস্তারিত বিবরণসহ চিঠিও যাচ্ছে র‍্যানসামের কাছে, ওটার সাহায্যে একটা উপায় ঠিকই বের করে ফেলবে ও। জনপ্রিয় এবং করিৎকর্মা তরুণ সিটের র‍্যানসামের উঁচু মহলে যথেষ্ট যোগাযোগ, অমায়িক ব্যবহার দিয়ে সহজে যে কোনও কাজ আদায় করে নিতে পারে। তা ছাড়া র‍্যানসাম একজন সুযোগ্য স্ট্রাটেজিস্টও বটে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন একজন লোকই দরকার।

পাহাড়ের অনেকটা ভেতরে লোকচক্ষুর আড়ালে যে কোনও হামলা ঠেকানোর উপযোগী করে বানানো হয়েছে এই ঘরটা। এই পাহাড়ের নাম, সামান্থা জানিয়েছে, থিভিং-রক। শাদারা এখানে আসার বহু আগে যেসব ইন্ডিয়ান থাকত, ভয়ঙ্কর চোর ছিল ওরা, তাই, এই নামকরণ। এখানে ঝর্না থাকায় পানির অভাব নেই। জরুরি প্রয়োজন মেটাবার মতো রসদপত্র রাখারও ব্যবস্থা আছে।

ধীরে ধীরে আরও দুটো দিন কেটে গেল। ততীয় দিন সকালে, জানালার পাশে বসতে যাবে, এমন সময় নীচের সংকীর্ণ ক্যানিয়নে একজন ঘোড়সওয়ারকে ঢুকতে দেখল কেড্রিক।

আস্তে আস্তে এগোচ্ছে লোকটা, তীক্ষ্ণ চোখে ট্রেইল জরিপ করছে। মাঝে মাঝে থামছে, সতর্ক নজর বোলাচ্ছে চারদিকে।

উঠে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন কেড্রিক র একটা উইনচেস্টার নিয়ে পাশের কামরায় চলে এল।

সামান্থা? মৃদু কণ্ঠে ডাকল ও।

সাড়া নেই।

একটু অপেক্ষা করে আবার ডাকল পল। সাড়া মিলল না।

এবার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল কেড্রিক, মনে পড়ল, সজির ঘাটতি মেটাবার জন্যে স্ক-ক্যাবেজ আনতে নীচে যাবে বলেছিল সামান্থা।

আবার জানালার কাছে ফিরে এল কেড্রিক। সতর্কতার সঙ্গে সামনের এলাকা জরিপ করল। বুকের ভেতর আচমকা লাফিয়ে উঠল হৃৎপিণ্ডটা। ক্যানিয়ন দেয়ালের একটা গর্ত থেকে স্ক-ক্যাবেজ তুলছে সামান্থা ফক্স, বড় জোর পঞ্চাশ গজ দূরেই দাঁড়িয়ে আছে অনাহুত অশ্বারোহী!

রাইফেল উঁচিয়ে দূরত্ব মাপল কেড্রিক। কমপক্ষে চারশো গজ দূরে, এবং নীচে রয়েছে লক্ষ্যবস্তু। সযত্নে অশ্বারোহীকে তাক করল ও। তারপর রাইফেল নামিয়ে নিল। সামান্থার অনেক কাছে পৌঁছে গেছে লোকটা, গুলি ফসকে গেলে পাথুরে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ওকে আঘাত করতে পারে। ছুটন্ত বুলেট ক্যানিয়ন-দেয়ালে বাড়ি খেয়ে আবার ক্যানিয়নে ফিরে আসবে, সংকীর্ণ জায়গায় ছুটোছুটি করবে ওটা, বিপদের আশঙ্কা আছে।

সামান্থাকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করার একটা উপায় বের করা দরকার। আগত অশ্বারোহী সামান্থার পায়ের ছাপ দেখতে পেলে এই হাইডআউটের অস্তিত্ব ফাঁস হয়ে যাবে। লোকটার ঘোড়ার কানজোড়া আচমকা খাড়া হয়ে গেল, আড়ষ্ট হলো সে, সতর্ক, ডানে বাঁয়ে তাকাল। সাবধানে আবার অশ্বারোহীকে তাক করল কেড্রিক। অসতর্ক শত্রুকে হত্যা করা ওর ধাতের বাইরে, কিন্তু নিরুপায় হলে সেটাও করতে হবে!

সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামান্থা ফক্স 1 কান পেতে কী যেন শোনার চেষ্টা করছে। উত্তেজনায় টান টান হয়ে গেছে পল কেড্রিক। নিষ্পলক তাকিয়ে আছে ও, কান খাড়া। অপেক্ষা করছে। এই মুহূর্তে বড় জোর পঞ্চাশ ফুট দূরত্ব। সামান্থা আর আগন্তুকের মাঝে। অবশ্য বেরিয়ে থাকা একটা পাথর আর ওটার গায়ে জন্মানো আগাছা, একটা কটনউড আর গোটা কয়েক সিডার ওদের আলাদা করে রেখেছে।

কান পেতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ওরা। জিভের ডগা দিয়ে ঠোঁট ভেজাল পল কেড্রিক। অনেকক্ষণ এক নজরে তাকিয়ে থাকায় চোখে জ্বলুনি শুরু হয়েছে। হাতের পিঠে চোখ মুছল ও।

স্যাডল থেকে নামল অশ্বারোহী, হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করল। সাবধানে ঘোড়ার কাষ্ট্র থেকে সরে এল সে, সামান্থার দিকে তাকাতেই কেন্দ্রিক দেখল হাত নাড়ছে মেয়েটা কেড্রিকও হাত নাড়ল প্রত্যুত্তরে। আবার রাইফেল তুলে ধরল ও। হাত নেড়ে আপত্তি জানাল সামান্থা। হাঁপ ছেড়ে অপেক্ষা করতে লাগল ক্যাপ্টেন কেড্রিক।

ক্যানিয়নের বালিময় তলদেশে ট্র্যাক পরখ করছে লোকটা। হাঁটু গেড়ে বসেছে। এদিক-ওদিক নজর বোলাচ্ছে। এই সময় নতুন চরিত্রের প্রবেশ ঘটল মঞ্চে। কেড্রিকের চোখের কোণে মৃদু নড়াচড়া ধরা পড়ায় ফিরে তাকাল ও, লরেডো শ্যাড এগিয়ে আসছে। চট করে জানালার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল লরেডো। তারপর একটু সামনে এগিয়ে স্যাডল থেকে নামল।

এত দূরে, জানালার কাছে বসে কিছুই শুনতে পাচেছ না কেড্রিক। কিন্তু বুঝতে পারছে গভীর বালির ওপর দিয়ে এগোতে কষ্ট হচ্ছে লরেড়ো শ্যার্ডের। অচেনা শত্রু থেকে মোটামুটি বার গজ দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল ও।

নিশ্চয়ই কিছু বলেছে শ্যাড, হঠাৎ স্থির হয়ে গেল লোকটা। খুব আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। তারপর ঘুরল। সূর্যের আলোয় তার চেহারা দেখতে পেল কেড্রিক।

ক্লসন!

এর পরের ঘটনা প্রায় চোখের পলকে ঘটে গেল, কে, জানার উপায় নেই, একজন কিছু বলল। আচমকা পিস্তলবাজের বিশেষ কায়দায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল লরেডো শ্যাড, চকিতে বেরিয়ে এল ডানহাতের পিস্তল রোদ পড়ে ঝিকিয়ে উঠল ওটার মাল, মুহূর্তের জন্যে স্থির হলো। এবং ক্লসন ট্রিগার টেপার আগমুহূর্তে গুলি করল ও।

টলতে টলতে এক কদম পিছিয়ে গেল ক্লসন। আবার ট্রিগার টিপল লরেডাৈ শ্যাঙ। আস্তে আস্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল আউট-ল। এগিয়ে গেল লরেডা, ক্লসনের কোমর থেকে গানবেল্ট খুলে নিল। তারপর ঘোড়ার পিঠ থেকে স্যাডলব্যাগ, রাইফেল আর কার্তুজ নামাল। এবার ক্লসনের লাশ সামান্থার সাহায্যে ধরাধরি করে স্যাডলে তুলে বেঁধে দিল। ঘোড়ার পাছায় চাপড় লাগাতেই ছুটতে শুরু করল ওটা।

সামান্থা ফক্স যখন ঘরে এল, মুখ ফ্যাকাসে। পুরো ঘটনাটা দেখেছ তুমি?

মাথা দোলাল কেড্রিক। ওকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে দেয়া সম্ভব ছিল না। ক্লসন ফিরে গেলে কাল দুপুর নাগাদই আমরা শেষ হয়ে যেতাম। কিন্তু এবার, সন্তোষের হাসি হাসল ও, নিজেদের প্রাণের কথা ভাবতে হবে

ভেতরে ঢুকে কেড্রিকের দিকে তাকিয়ে হাসল লরেডো শ্যাড। ব্যাটা আগেই পিস্তল বের করে রেখেছে জানতাম না, বলল ও।দুপায়ের মাঝখানে পিস্তল লুকিয়ে বসেছিল। আরেকটু হলেই গিয়েছিলাম।

স্যাডলব্যাগটা নামিয়ে রাখল লরেড়ো শ্যাড। কিছু খাবার, বলল ও, আর কয়েক রাউন্ড গুলি আছে এটায়। আমি আসার সময় গুলি নিয়ে এসেছি। ক্লসনেরগুলোও কাজ দেবে কী বল? তোমার টেলিগ্রাম আর চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছি। টেলিগ্রাফারের একশো একটা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মুখে ফেনা উঠে গেছে-আমার এখানকার গোলযোগের কথা বোধ হয় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

চমকার, যত প্রচার পাবে তত ভালো। মুসিবতে পড়ে যাবে কোম্পানি, আমাদেরই লাভ। নতুন কিছু কানে এল?

হ্যাঁ। গুন্টারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বাইরের এক লোক হৈ-চৈ শুরু করে দিয়েছে। তোমার ঘাড়ে নাকি দোষ চাপানোর চেষ্টা চলছে। কোম্পানি, বলছে

তুমিই খুন করেছ। মাথা ঝাঁকাল কেড্রিক। জানতাম, ওরা এমন কিছু বলবে। যাকগে, দুএকদিনের ভেতর এখান থেকে বেরিয়ে পড়ছি আমি। তারপর দেখা যাবে কত ধানে কত চাল।

আরও কদিন সময় নিলে ভালো করতে, অনিশ্চিত কণ্ঠ বলল লরেডো শ্যাড। বদমাশগুলো এত তাড়াতাড়ি আমাদের খোঁজ পাবে না। অবশ্য, হঠাৎ বলল ও, পরশু সেই গ্রুলা মাস্ট্যাংটার ট্র্যাক দেখেছি আমি। কাছেই।

আবার গ্রুলা!

আরও দুটি দিন কেটে গেল। লরেডোর সঙ্গে পাহাড় থেকে নীচে নেমে এল পল, কেড্রিক ক্যানিয়নে হাঁটাহাঁটি করল। অদূরে একটা গুহায় ওদের ঘোড়া লুকিয়ে রাখা হয়েছে, ওগুলোর খোঁজ খবর নিল। ওকে দেখে খুশিতে মাথা নেড়ে ছুটে এল অ্যাপলুসা। হাসি মুখে ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিল কেন্দ্রিক।

কী-রে, তৈরি আছিস তো?

বল খেপে আছে, বলল শ্যাঙ। একটা সিগারেট ধরিয়ে চোখ ছোট করে কেড্রিকের দিকে তাকাল। এখান থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবে?

একটু ঘুরে ফিরে দেখব, তারপর পিট লেইনের সঙ্গে আলাপ করতে যাব। তারপর যারা আমাদের ফাঁদে ফেলে খুন করার চেষ্টা করেছে, সেই শয়তানগুলোকে খুঁজে বের করে নিজের হাতে শায়েস্তা করব। বিশেষ করে ডরনি শকে চাই আমি!।

লোকটা এক নম্বর হারামী, লরেডো বলল শান্ত কণ্ঠে। আমি অবশ্য দেখি নি, তবে সামান্থার কাছে শুনলাম, ওর হাতে নাকি বিদ্যুৎ আছে! ববকে খুন করার সময় সামান্থা দেখেছে ওকে।

আমাদের একজন খুন হয়েছে ওর হাতে, শান্ত কণ্ঠে বলল কেড্রিক, জান দিতে হলেও বদলা নেব আমি।

ঠিক বলেছ। ডরনি একটা খুনী! তবে পালের গোদা অ্যাল্টন বারউইক, আসল শয়তান। কীথ লোকটা ওর ডানহাত মাত্র। প্রয়োজনে তাকেও রিনা দ্বিধায় খুন করবে বারউইক। ওর মতো ধড়িবাজ লোক আর পাবে না।

তিনদিন পর সামান্থাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলো ওরা রিমের উল্টো দিকে, পিট লেইনের আস্তানায় এসে পৌঁছুল। হাইডআউটে ঢোকার পথে বাধা দিল ডাই রীড। তারপর পল কেড্রিককে চিনতে পেরে খুশি হয়ে উঠল সে।

আরে, পল, তুমি! চোখে মুখে শান্তির ছাপ তার। এসো, বাবা, এসো! আমরা শুনেছিলাম ওরা তোমাকে মেরে ফেলেছে!

অগ্নিকুণ্ডের কাছে দাঁড়িয়ে আছে পিট লেইন, ওকে ঘিরে, শুয়ে আছে দশবারজন লোক। এদের সবাইকেই মোটামুটি চেনে কেড্রিক। ওরা তিনজনে খোলা জায়গায় আসলে আস্তে আস্তে উঠে বসল সবাই। ঘুরে দাঁড়াল পিট লেইন। পিটকে সামনাসামনি দেখে অবাক হয়ে গেল কেড্রিক।

মোটামুটি স্যু লেইনের মতো লম্বা, বিশাল কাঁধ ছেলেটার, চিকন কোমর শক্তিশালী কাঠামো। সরাসরি ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। দেখলেই বোঝা যায়, ভাবল কেড্রিক, ডরনি শয়ের মতোই বিপজ্জনক চরিত্র।

আমি কেড্রিক, বলল ও, ওর নাম সামান্থা ফক্স, আর লরেডো শ্যাডকে তো তোমরা চেনোই।

তোমাদের সবাইকে আমরা চিনি, সতর্ক কৌতূহলী দৃষ্টিতে ওদের মাপল পিট।

.

শান্ত কণ্ঠে নিজের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করল পল কেড্রিক। তো এই হলো ব্যাপার, রিস্তারিত বর্ণনার পর যোগ করল ও। আমার বন্ধুকে ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত শুরু করার ব্যবস্থা নিতে বলেছি। আসল সত্য বের না হওয়া পর্যন্ত জমি বিক্রি যাতে বন্ধ থাকে সেটা দেখবে ও। বিক্রি বন্ধ হওয়ার পর তদন্ত শুরু হলে কীথরা আর এখানে থাকতে পারবে না। প্রকৃত ঘটনা চাপা দিতে পারলেই কেবল ওদের রেহাই পাবার আশা আছে, কিন্তু সেটা কোনওমতেই সম্ভব নয়।

আমরা এখানে বসে থাকি আর ওরা কেটে পড়ক, এই বলতে চাইছ? জিজ্ঞেস করল পিট লেইন।

না! মাথা নেড়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল পল কেড্রিক। সোজা মাস্ট্যাংয়ে যাব আমরা!

ওখানে এখন কোম্পানির লোকেরা শেরিফ আর মেয়রের পদ দখল করেছে বটে, কিন্তু জনগণ আমাদের পক্ষে তা ছাম, সহজ কণ্ঠে বলল, ও, বিক্রি বন্ধের খবর ওদের কানে যাবার পরই আমরা হাজির হব, খবরটা রাষ্ট্র হওয়ার পর কেউ আর ওদের পক্ষ নেবে না। জানপ্রাণ দিয়ে পালানোর পথ খুঁজবে পিস্তলবাজের দল।

গোলাগুলি হবেই, বুড়ো মতো একজন বলল।

হলেও সামান্য, সায় দিয়ে বলল কেড্রিক। আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হলে প্রায় সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। খুনীর দল আড্ডা গেড়েছে ওই শহরে। স্টীলম্যান আর সেগালের হত্যাকারী ওরা, বব ম্যাকৃলেননের হত্যাকারী। ববের খুনীকে হাতের মুঠোয় পেতে চাই আমি।

ঘুরে তাকাল প্লিট, লেইন না, আমি!

দুঃখিত, লেইন। ববকে খুন করেছে শ। আমার জন্যে ডাক্তার আনতেই মাস্ট্যাংয়ে গিয়েছিল বব। অবশ্য বলা যায় না তুমিও, শেষ করার আগে বলল কেড্রিক, সুযোগ পেয়ে যেতে পারো।

ওকে মারতে পারলে আমিও খুশি হতাম, শান্ত কণ্ঠে বলল লরেডো শ্যাড। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। এল মাস্ট্যাংটার মালিক কে? ঘোড়াটা তোমাদের কারও?

মাথা নাড়ল লেইন। না, আমরাও একই কথা ভাবছি।

আশপাশেই ঘুরঘুর করে, বুড়ো বলল, অথচ আজ পর্যন্ত কেউ তার চেহারা দেখে নি। আমাদের চেয়ে জায়গাটা অনেক বেশি চেনে লোকটা। অনেক আগে থেকে এখানে আছে বোধ হয়।

লোকটার মতলব, বলল শ্যাড, যদি বোঝা যেত!

কাঁধ ঝাঁকাল কেড্রিক। হু, জানা গেলে ভালো হত। ডাই রীডের দিকে ফিরল ও। তোমাকে দেখে স্বস্তি পেয়েছি। বিপদে পড়েছ ভেবে দুশ্চিন্তায় ছিলাম।

বিপদ? দাঁত বের করে হাসল, ডাই রীড। বিপদের কথা বলছ? হাহ! বিপদ মাথায় নিয়েই তো এতদিন বেঁচে আছি! দুনিয়ায় যতদিন মানুষ থাকবে, বিপদ তার পিছু ছাড়বে না। ওর কোনও মা-বাপ আছে? তাই আজকাল আর ও-নিয়ে ভাবি না! ছোট ভঁটঅলা পাইপে টান দিল ডাই রীড, কেড্রিকের মাথার ক্ষতস্থানের দিকে তাকাল। তুমি নিজেই তো ভালো বিপদে পড়েছিলে বলে মনে হচ্ছে? খুলিটা আর একটু নরম হলে টের পেতে!

 ওকে যে অবস্থায় পেয়েছি, তিলমাত্র আশা ছিল না, বলল লরেড়ো শ্যাড। শরীরে গুলি নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল ওরা তিনজন। ধরে নিয়েছিলাম তিনজনই মারা গেছে। কেড্রিকের শরীর আর মাথা তো, ফুটো হয়ে গিয়েছিল। ওকে যখন ছায়া থেকে সরিয়ে আনি, আমি ভেবেছিলাম, মাথাটা বুঝি গুড়ো হয়ে গেছে। স্রেফ কপাল জোরে বেঁচে গেছে!

.

সকালে আবার স্যাডলে চেপে বেরিয়ে পড়ল পল কেড্রিক আৰু লরেডো শল্পড়। পিট লেইনের হাইউআউটে কয়েকজন মেয়ের সঙ্গে রয়ে গেছে সামান্থা ফক্স। ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে মাস্ট্যাংয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে ওরা। তবে আপাতত কোম্পানির লোকদের মুখোমুখি হতে চায় না।

আমাদের অবশ্য বেশি কিছু করার নেই, লরেডোর কথায় সায় দিয়ে বলল কেড্রিক, তবে আমি শহরের আশপাশের এলাকার নকশা মনে গেঁথে নিতে চাই। বারউইকরা খবরটা পাওয়ার পর কী ঘটবে সঠিক অনুমান করার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এই মুহূর্তে তো সব কিছু ওদের অনুকূলে, বেশ শক্ত অবস্থানে আছে বারউইক আর কীথ।

একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে ব্যাপারটা। স্কোয়াটারদের দখলে আছে এমন একটা জমির লোভে এখানে এসেছিল ওরা। জায়গাটা জরিপের ব্যবস্থা করেছে। বেশির ভাগ এলাকায় নিজেদের দাবী প্রতিষ্ঠিত করেছে। জায়গামতো নোটিস জারি করে সময় শেষ হবার অপেক্ষায় ছিল; নোটিসটা কারও চোখে না পড়লে এত দিনে ওদের জমি কেনা হয়ে যেত, কারও কিছু করার থাকত না। কিন্তু নোটিসটা একজনের চোখে পড়াতেই ঝামেলা বেধে গেল। স্কোয়াটাররা নেতৃত্ব দেয়ার মতো দুজন লোককে পেয়েছিল, পিটার সেগাল আর বব ম্যাকৃলেনন।

কিন্তু ওরা কেউই এখন বেঁচে নেই। নেতা হতে পারত এমন আরেকজন, স্টীলম্যান, তাকেও খুন করা হয়েছে। ওরা জানে ম্যাকলেননদের কে বা কারা হত্যা করেছে সেটা এখনও গোপনই আছে। আমার ওপর আর নির্ভর করা। যাবে না বুঝতে পেরেই আমাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বারউইক। ওরা। এখনও জানে আমি মারা গেছি। এ ব্যবসার টাকা সরবরাহ করেছিল জন গুন্টার, সে খুন হওয়ায় এখন আর টাকা ফেরত দেয়ার চিন্তা করতে হবে না। বারউইক আর কীথকে।

আর মাত্র কটা দিন, বিক্রির কাজ শেষ হলেই জমির মালিকানা পেয়ে যাবে ওরা। এই মুহূর্তে ওদের বাধা দেয়ার মতো কোনও শক্তি নেই। পিট লেইনসহ সবাইকে আউট-ল ঘোষণা করবে ওরা। প্যসি পাঠানো হবে ওদের। পাকড়াও করার জন্যে। জমি কেনা শেষ করেই দেখো, খুনীর দল নিয়ে বেরিয়ে পড়বে লরেন কীথ।

হ্যাঁ, ধীর লয়ে বলল লরেটে শ্যাড, মনে হচ্ছে সব দিক সামাল দিয়ে ফেলেছে ব্যাটারা। কিন্তু তুমি একটা জিনিস বাদ দিচ্ছ, ভুলে যাচ্ছ সামান্থা ফক্সের কথা।

তার কথা আসছে কেন?

শোনো, সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে বলল লরেডো শ্যাড। ম্যাকলেনন খুন হওয়ার পরপরই শহর থেকে চলে এসেছে ও। ওরা জানে তোমার সঙ্গে ওর। পরিচয় আছে। তোমার সামনেই অফিসে ওদের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করার ঘোষণা দিয়েছে সামান্থা, টাকা তুলে নেয়ার হুমকি দিয়েছে। ধরো টাকা ফেরত চাইল সামান্থা এবং ওরা রাজি হলো না, তখন? মনে করো, আবার বলল লরেডো, এই অবস্থায় মুখ খুলল সামান্থা, যা জানে ফাঁস করে দিল। ও অনেক কিছু জানে এটাই ধরে নেবে, ওরা। মেয়েটা গুন্টারের ভাগ্নী, গুন্টার ওকে অনেক কথা বলেছে অনুমান করাই স্বাভাবিক, তাই না?

ওরা সামান্থাকে ধরার চেষ্টা করবে?

তোমার কী ধারণা? ধরার চেষ্টা করবে কিংবা হত্যা করবে।

তীক্ষ্ণ হলো পল কেড্রিকের দৃষ্টি। লেইনের কাছে নিরাপদেই থাকবে সামান্থা, বলল ও, কিন্তু সন্দেহ প্রকাশ পেল কণ্ঠস্বরে। ওদেরকে বেশ ভালো লেগেছে আমার।

কাঁধ ঝাঁকাল লরেডো শ্যাড। তা লাগতে পারে। কিন্তু ভুলে যেয়ো না, সিঙ্গার ওঁদেরই একজন। স্লোয়ানকে হত্যার কাজে সাহায্য করতে ইতস্তত করে নি সে, অ্যাবি মিক্সাসের সঙ্গে ছিল। টাকা দিয়ে ওকে কিনে নিয়েছিল বারউইক। আরও কেউ বিক্রি হয় নি জানছ কীভাবে?

.

ঠিক ওই সময়ে, ধূসর পাথুরে ভবনের অফিসরুমে অ্যাল্টন বারউইকের মুখোমুখি এমনি একজন লোক বসে আছে। দেয়াল ঘেঁষে একটা চেয়ারে বসেছে কর্নেল লরেন কীথ। বারউইকের সামনে বসা লোকটার নাম ওয়ালেস, তার পাণ্ডুর চেহারায় আত্মবিশ্বাসের ছাপ। সত্যি বলছি! বলো ওয়ারেস। চুরি করে, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে, অন্ধকারে সারা রাত ঘোড়া হাঁকিয়ে মিথ্যে কথা বলতে আসি নি নিশ্চয়ই! সামান্থা ফক্স, গানম্যান লরেডে শ্যাড আর কেড্রিক পিট লেইনের ক্যাম্পে এসেছিল।

কেড্রিক? কেড্রিক বেঁচে আছে? তীব্র উত্তেজনায় সামনে ঝুঁকে এল কীথ।

হ্যাঁ, তোমার আমার মতোই তরতাজা। মাথার একপাশে চুল চেছে ফেলেছে দেখলাম, গভীর একটা দাগ খুলিতে। শরীরের এক দিকেও গুলি খেয়েছে। ওহ, জায়গা মতোই লেগেছিল গুলিটা! কিন্তু, বিশ্বাস করো, এখন আবার ঘোড়া হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছে! আসল খবর এখনও চেপে রেখেছে ওয়ালেস। চোখ বড় করে বারউইকের দিকে তাকিয়ে হাসল সে। কিছু টাকা দিতে পারলে ভালো হত, মিস্টার বারউইক। আরও একটা খবর ছিল। কঠিন দৃষ্টিতে ওয়ালেসের দিকে তাকাল বারউইক। ড্রয়ার খুলে দুটো স্বর্ণ-ঈগল বের করে ছুঁড়ে দিল ডেস্কর উপর। ঠিক আছে? এবার বলো, কী খবর?

ওয়াশিংটনে র‍্যানসাম নামে এক লোকের কাছে খবর পাঠিয়েছে কেড্রিক। পূর্ণ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত জমি বিক্রি ঠেকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করবে সে।

কী?

ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়ল কীথ, ছাইয়ের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মুখ। এমন কিছু হতে পারে ভাবতেও পারে নি সে। প্রথম যখন জমি দখলের বুদ্ধিটা পেল, একেবারে জলবৎ তরলং মনে হয়েছিল, মনে হয়েছিল মুফতে অঢেল টাকা কামানোর একটা মওকা পাওয়া গেছে। সামরিক বাহিনীতে চাকরির সুবাদে ওয়াশিংটনে উঁচু মহলে জানাশোনা ছিল, এদিকটা বারউইক সামাল দিতে পারলে গুন্টারের টাকায় ছককা মেরে দেয়া যাবে ভেবেছিল। ব্যর্থতার সম্ভাবনা মাথায় আসে নি। অনেক টাকা মুনাফা আসবে, নিশ্চিত ছিল কীথ। সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, বারউইক আর গুন্টারের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে পুবে চলে যাবে, লাভের টাকায় আরামসে পায়ের ওপর পা তুলে কাটিয়ে দেবে বাকি জীবন। কাজটা অবৈধ, কিন্তু পরোয়া করে নি সে। এখন যদি পুবের লোকেরা ব্যাপারটা জেনে যায়

র‍্যানসাম? ভাঙা গলায় বলল কীথ, এত থাকতে র‍্যানসাম!

যুদ্ধের সময় ওর সঙ্গে কাজ করেছিল ফ্রেডরিক র‍্যানসাম, দুজনের মধ্যে তেমন সদ্ভাব ছিল না। একটা সেতুর কাছে একটা বিশেষ ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল কীথের, গরম হয়ে উঠল কানজোড়া। ঘটনাটার কথা র‍্যানসাম জানে, এবং তার ভিত্তিতেই এবারের ব্যাপারটা মূল্যায়ন করবে সে। র‍্যানসামকে বেছে নিয়ে কতখানি বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে, কোনওদিন জানতে পারবে না কেড্রিক!

এইবার হয়েছে! নড়েচড়ে দাঁড়াল কীথ। র‍্যানসাম মহা আনন্দে আমাদের বারটা বাজিয়ে ছাড়বে!

বারউইক বুঝতে পারছে, আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে কীথ। সেই ময়লা শার্ট গায়েই বসে আছে বিশালদেহী লোকটা, বিরক্তি আর অসন্তোষ-ভরা দৃষ্টিতে দেখছে কীথকে। এবার কি বিগড়ে যাবে লোকটা?

ক্যাম্পে ফিরে যাও, ওয়ালেসকে বলল বারউইক, নতুন কিছু জানলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে খবর দিয়ে। এখন থেকে কড়া নজর রাখবে সবার ওপর। কিছুই যেন তোমার নজর এড়াতে না পারে। দেখো, ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমাকে

আর ভাবতে হবে না।

ওয়ালেস চলে গেলে কীথের দিকে ফিরল বারউইক, বাঁকা হাসি দেখা দিল তার ঠোঁটে। অসুবিধে কী? হোক না তদন্ত! ওরা এখানে এসে দেখবে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার কাউকে পাবে না!

পাবে না? কীথের কণ্ঠে অবিশ্বাস, কেড্রিক, শ্যাড আর সামান্থার মতো জলজ্যান্ত সাক্ষী থাকার পরেও একথা বলছ কীভাবে?

সময় হলে দেখবে, শান্ত কণ্ঠে বলল বারউইক, ওরা কেউ নেই। একজনও না, বিশ্বা করো?

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *