০৯. প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে

প্রকাণ্ড শরীর নিয়ে বেশ সহজ ভঙ্গিতেই স্যাডলে বসে এগিয়ে চলেছে অ্যাল্টন বারউইক। লম্বা লম্বা পাঅলা একটা ব্লাড বে হাঁকাচ্ছে সে। অ্যাপলুসা নিয়ে। পাশে রয়েছে, ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। মাঝে মাঝে স্পারের গুতোয় ঘোড়ার। গতি বাড়িয়ে সামনে চলে যাচ্ছে বারউইক, একটু পরেই আবার কেড্রিকের পাশে আসছে। পুরোনো ছেড়া দোমড়ানো-মোচড়ানো একটা টুপি মাথায়। দিয়েছে সে, গলায় প্যাচানো রুমালটাও নোংরা, ঘামের দাগ-পড়া শার্টের কলার ঢেকে রেখেছে।

বেল্টের ওপর দিয়ে ঝুলে পড়েছে গায়ের শার্ট। একটা পিস্তল ঝুলছে কোমরে, অনেক উঁচু করে বাঁধা গানবেল্ট, এভাবে ঝোলানো পিস্তল বের করা অসুবিধেজনক। যেমন ছিল তেমনই আছে, বারউইকের দাড়ি, কর্কশ নোংরা কাঁচাপাকা। কিন্তু কথাবার্তায় অস্বাভাবিক আন্তরিক মনে হচ্ছে তাকে।

দেশটা বড় সুন্দর, কেড্রিক। এমন দেশে মরেও সুখ। হাতের কাজ, শেষ করে, এখানেই ধারে-কাছে কোথাও একটার‍্যাঞ্চ গড়ে তোল না কেন? আমিও তাই করব ভাবছি।

মন্দ বলে নি। বাঁ হাতে লাগাম ধরেছে কেড্রিক, ডানহাত ঝুলছে পাশে। গতকাল সামান্থা ফক্সের সঙ্গে এ-নিয়ে আলাপ করেছি।

বারউইকের ঠোঁটের হাসি, অদৃশ্য হলো। কাল ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে? কখন??

বিকেলে, সহজ কণ্ঠে বলল কেড্রিক। কিন্তু বারউইকের কণ্ঠস্বরের আকস্মিক পরিবর্তন নজর এড়াল না। গুন্টারকে বারউইকই খুন করে নি তো? নাকি কাজটা ইয়েলো বাটের কারও? যা অবস্থা, সত্যি জানার উপায় নেই। অনেকক্ষণ কথা বলেছি আমরা। সামান্থা চমৎকার মেয়ে।

জবাব দিল না বারউইক, পরস্পরের সঙ্গে চেপে বসল ঠোঁটজোড়া। ক্যানিয়নের লালচে দেয়াল দুপাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সল্ট ক্রিকের তলদেশ থেকে প্রায় পাঁচশো ফুট উঁচুতে রয়েছে ওরা। গন্তব্যে পৌঁছুতে বেশি দেরি নেই। অস্বাভাবিক সতর্ক হয়ে উঠেছে বারউইক, ধাঁধায় পড়ে গেল কেড্রিক। কোনরকম বিপদের আশঙ্কা করছে না তো লোকটা? কিন্তু এ প্রসঙ্গে উচ্চবাচ্য করল না ও।

স্যু লেইনের সাবধানবাণীর কথা মনে পড়ে গেল। ওকে হত্যা করতে চাইছে ওরা–কিন্তু এই ওটা কারা? স্পষ্ট করে বলে নি মেয়েটা। স্রেফ আজকের মিটিংয়ে যোগ দিতে বারণ করেছে জোর গলায়। মনে মনে ব্যাপারটা উল্টে পাল্টে দেখল কেড্রিক। মেয়েটা পরিকল্পিতভাবে আপোস প্রচেষ্টা বানচাল করতে চায় নি তো? নাকি সত্যিই গোপন কোনও তথ্য জানতে পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে?

স্যু লেইনের বন্দুকবাজ ভাই, পিট লেইন সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারে নি। পল কেড্রিক। কোনও আলোচনাতেই পিটের নাম উচ্চারিত হয় নি। কিন্তু সব সময় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকলেও, কেড্রিক নিশ্চিত, সেই ইঁদুর-রঙা ফেঁড়াটার রহস্যময় সওয়ারীর মতো বর্তমান সংকটে তারও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। স্যু বলেছে ঘোড়াটা নাকি ভোজবাজির। মতো অদৃশ্য হয়ে যায়-আজগুবী গল্প! কিন্তু স্যু লেইনের মতো মেয়ের তো আষাঢ়ে: গল্পে বিশ্বাস করার কথা নয়! সল্ট ক্রিকের ক্যানিয়ন চওড়া হয়ে গেছে এখানে, কয়েকটা শাখা ক্যানিয়ন এসে মিশেছে এটার সঙ্গে। ক্যানিয়নের তুলদেশ ছেড়ে ট্রেইল থেকে প্রায় সাতশো ফুট উঁচু আকাশচুম্বি ক্লিফের দিকে এগোল ওরা, দক্ষিণ দিকে। খানিক পর পর নোংরা রুমালে ঘামে চটচটে মুখ মুছছে বারউইক। কথা বলছে না, একেবারে বোবা বনে গেছে।

টুপি ঠেলে পেছনে সরাল কেড্রিক, একটা সিগারেট রোল করতে শুরু করল। বারউইককে এই প্রথম এমন উত্তেজিত হতে দেখছে ও, ভাবনায় পড়ে যাচ্ছে। গুন্টারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোম্পানির কারও সাথে কথা বলে নি পল। শহরের কিছু লোকের সাহায্যে লাশটা সরানোর ব্যবস্থা করেছে। হত্যাকাণ্ডের পরিণতিতে তুমুল লড়াই বেধে যাবে, আশঙ্কা করেছিল কেড্রিক, অথচ লড়াই থামানোর জন্যেই আপ্রাণ চেষ্টা করছে ও। সমস্যা, গুন্টারকে যে কে কী কারণে হত্যা করল সেটাই বোঝা যাচ্ছে না ব্যাপারটা সিঙ্গার হত্যার প্রতিশোধও হতে পারে। আবার কীথ অথবা বারউইকও করে থাকতে পারে কাজটা।

হঠাৎ রাশ টেনে ধরল কেড্রিক। একটা ঘোড়া উত্তর পশ্চিম কোণ থেকে এসে এদিক দিয়ে গেছে, টাটকা ট্র্যাক দেখা যাচ্ছে। বারউইকও দেখল।

এই ট্রাক আমার চেনা, বলল কেড্রিক। ঘোড়াটা কার?

চল তো, অধৈর্য কণ্ঠে বলল অ্যালটন বারউইক। ওরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করবে।

সকালের সোনালি আলোয় এগিয়ে চলল দুজন। মাথার উপর নীল আকাশ ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে দিগন্ত স্পর্শ করেছে। টুকরো টুকরো শাদা মেঘ ভাসছে, যেন দীঘিতে সাঁতার কাটছে রাজহাঁসের দল। বায়ে লালচে পাহাড়গুলো আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভানে, দূরে হারিয়ে গেছে উপত্যকা, চোখ ভোলানো দৃশ্য। সেজঝোপে ঢাকা মাঠের ওপর দিয়ে দৃষ্টি মেলে দিল পল। এখান থেকে সাত আট মাইল দূরে এই নীলের সাগরেই হারিয়ে গেছে ম্যালপাই ক্যানিয়ন। ওখানে স্ন্য লেইন আছে।

এখন কী ঘরে আছে মেয়েটা? নাকি কোথাও বেরিয়ে গেছে? হালকা পাতলা, কালো চুল আর কালো চোখের মেয়েটা সত্যি আকর্ষণ করে। মরুভূমির সূর্যের প্রখর তাপ ওর কোমল ত্বকে সামান্যতম রুক্ষতা আনতে পারে নি। বিপদ সম্পর্কে ওকে সতর্ক করতে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে মাস্ট্যাংয়ে ছুটে গিয়েছিল সে। কেন? ওকে বাঁচাতে? মেয়েটা ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ল না তো? চট করে ধারণাটা নাকচ করে দিল পল। তবু প্রশ্নটা অনবরত খুঁচিয়ে চলল ওকে। সুন্দরী হলেও কঠিন এবং স্বার্থপর স্যু লেইন, এখানে থাকতে চায় না, দূরে কোথাও যেতে চায়। তাপ-তরঙ্গ নাচছে নীচের সমতলে। লাল-পাহাড়ী-দেয়ালের নীচে ছায়া পড়েছে। হঠাৎ বাতাসে বালির ঘূর্ণি উঠল, পিশাচিনীর মতো নাচল মরুভূমির বুকে, তারপর ঘন অ্যান্টিলোপ ঝোঁপ আর ক্যাট-ক্লর মাঝে হারিয়ে গেল। কপালের ঘাম মুছল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। পুবে ঘোরল অ্যাপলুস। দূরে চিমনি রক-এর সুউচ্চ চূড়া দেখা যাচ্ছে। আশপাশে আরও অনেক পাহাড় জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে।

ওই যে, বরউইকের কণ্ঠে বিজয়ের সুর, ওরা আছে!

দক্ষিণে, মাইল তিনচার দূরে, দুজন ঘোড়সওয়ারকে দেখা যাচ্ছে, চিমনি রকের দিকে এগিয়ে আসছে। এত দূর থেকে ওদের চেনা না গেলেও গন্তব্য বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না।

চমৎকার, উজ্জ্বল হয়ে উঠল বারউইকের চেহারা। সময় মতোই পৌঁছে যাবে ওরা। মনে করো ভারি সোনার ঘড়িটা দেখল সে, ওদের আগেই কিন্তু ওখানে পৌঁছে যেতে পারবে তুমি। এক কাজ করো? তুমি গিয়ে ওদের জন্যে অপেক্ষা করো, এই ফাঁকে আমি ওদিকে ক্যানিয়নের ভেতর দিকে একটা চাতাল পরীক্ষা করে আসি, ঠিক আছে? দেরি করব না।

কয়েক মিনিট পর চিমনি রক-এর ছায়ায় এসে ঘোড়া থামাল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। একটা খুদে পুকুর আছে এখানে। অ্যাপলুসাকে পানি খাইয়ে কিছু বোল্ডার আর গাছের আড়ালে ঘেসো জমিতে ছেড়ে দিল। তারপর ফিরে এসে মাটিতে বসে সিগারেট ধরাল। আরও এগিয়ে এসেছে ঘোড়সওয়াররা। একজন একটা চেস্টনাট হাঁকাচ্ছে, লম্বা লম্বা পা ফেলছে ওটা। অন্যটা একটা ড্যাপল্ড

কেড্রিকের সামনে এসে ঘোড়া থামিয়ে স্যাডল থেকে নামাল ওরা। প্রথমজন পিটার সেগাল। অন্যজনকে কেড্রিক চেনে না, আগে দেখে নি।

ম্যাকলেনন কোথায়? জানতে চাইল ও।

সময় মতো, র‍্যাঞ্চ থেকে আসতে পারে নি বলে আমি স্টীলম্যানকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। স্টীলম্যান ভালো লোক। ওর কথা আমাদের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। তবে ববের মুখে প্রতিশ্রুতি চাইলে, প্রয়োজনে ও-ও আসবে নিশ্চয়ই।

বারউইক এসেছে আমার সঙ্গে। ক্যানিয়নের ভেতর কী একটা চাতাল পরীক্ষা করতে গেছে সে।

গোল হয়ে দাঁড়াল তিনজন। কেড্রিককে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করল স্টীলম্যান।

ডাই রীডের মুখে তোমার অনেক প্রশংসা শুনেছি। তুমি নাকি খুবই বিশ্বস্ত লোক।

অন্তত বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করি, সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে গিয়ে মুখ তুলে তাকাল পল কেড্রিক।

মুহূর্তের জন্যে আড়ষ্ট হয়ে গেল ও, ফ্যাকাসে হয়ে গেল চেহারা; পরক্ষণে সতর্ক হয়ে উঠল। সাবধান! চিৎকার করে বলল, শুয়ে পড়ো!

বন্দুকের কানফাটা আওয়াজে চাপা পড়ে গেল ওর গলা। কেড্রিক মাটি স্পর্শ করার আগেই কী একটা যেন আঘাত করল ওর দেহে। পরমুহূর্তে খাবলা লাপিল খুলিতে। অন্ধকারের স্রোত ধেয়ে এল, অতল অন্ধকার টেনে নিতে শুরু করল ওকে…নীচে…আরও নীচে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। অকস্মাৎ দপ করে নিভে গেল সব আলো! তারপর আর কিছু মনে নেই।

.

তৃপ্তির সঙ্গে মুচকি হাসল অ্যাল্টন বারউইক। সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঠাণ্ডা মাথায় ঘোড়া ঘোরাল। চিমনি রক-এর কাছে একটা নিচু পাথুরে দেয়ালের পেছন থেকে বেরিয়ে এসেছে চার অশ্বারোহী, সেদিকে এগোল। বারউইক ওদের কাছে যাবার আগেই ছায়ায় লুটানো তিনজন মানুষের কাছে পৌঁছে গেল ওরা। স্যাডল থেকে নেমে রাইফেল হাতে বারউইকের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।

একদম খতম! বলল ডরনি শ, কঠিন দৃষ্টি তার। চিরদিনের জন্যে চুকে গেল ঝামেলা?

 ফেসেনডেন, ক্লসন আর পয়েন্সেট মাটিতে শায়িত কেড্রিকদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিছু বলছে না। হামলার হাত থেকে কেউ যাতে, রেহাই না পায়, সেজন্যে অন্য এক জায়গায় লুকিয়ে ছিল লী গফ, বেরিয়ে এসে ওদের সঙ্গে যোগ দিল। ঝুঁকে পড়ল সে কেড্রিকদের দিকে।

আক্ষরিক অর্থেই বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে পিটার সেগাল, ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত। একপাশে পড়ে আছে স্টীলম্যান, অর্ধেকটা খুলি উড়ে গেছে। গাঢ় ছায়ায় লুটিয়ে আছে ক্যাপ্টেন কেড্রিক, রক্তাপুত মাথা, শরীরও রক্তাক্ত। আরও এক দফা গুলি লাগিয়ে দেব? নিশ্চিত হওয়া যেত? পয়েন্সেট জিজ্ঞেস করল।

নিশ্চিত হওয়ার আর বাকি আছে কী? ভেঙচি কাটল ক্লসন। দেখছ না চালুনির মতো ফুটো হয়ে গেছে একেকটা?।

কেড্রিকের কী অবস্থা? জিজ্ঞেস করল ফেসেনডেন। ব্যাটা সত্যিই মরেছে?

মরে ভূত হয়ে গেছে, বলল লী গফ।

আরে! বাধা দিয়ে বলল ডরনি শ, এ-তো ম্যাকলেনন না! স্টীলম্যান!

একসঙ্গে স্টীলম্যানের পাশে জড়ো হলো ওরা।

তাই তো! হিংস্র কণ্ঠে বলে উঠল বারউইক। মুশকিল হলো দেখছি। এখন ম্যাকলেননকে ধরতে না পারলে- ডরনি শর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে চুপ করে গেল সে।

ডরনির হালকা ধূসর চোখ দুটো ছেলেমানুষি উত্তেজনায় নেচে উঠল।

কুছ পরোয়া নেই, বস, সিগারেট ফেলে গোড়ালি দিয়ে পিষে নেভাতে নেভাতে বলল সে, আমি আছি কেন? ম্যাকলেনন শালাকে আমার হাতে ছেড়ে দাও। কাল সন্ধ্যা নাগাদ ব্যাটার দফারফা করে দিচ্ছি!

আমি আসব? পয়েন্সেট জিজ্ঞেস করল।

দরকার হবে না, বলল ডরনি শ। তবে চাইলে আসতে পারো। শুনেছি বব ম্যাকলেনন নাকি সীমান্তের কোন এক শহরের মার্শাল ছিল। মার্শালের বাচ্চাদের আমার মোটেই সহ্য হয় না।

যার যার ঘোড়র কাছে ফিরে এল ওরা, স্যাডলে চেপে রওনা হলো। পশ্চিমে গেল ডরনি শ, পয়েন্সেট এবং লী গফ-বব ম্যাকলেননকে শিকার করতে যাচ্ছে; অ্যাল্টন বারউইক, চোখের কোণে কুঞ্চন, চলেছে পুবে, মাসট্যাংয়ের দিকে। অন্যরাও রয়েছে তার সঙ্গে। অস্বস্তির সঙ্গে স্যাডলে বসে পেছন ফিরে তাকাল ফেসেনডেন।

ওদের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারলে ভালো হত; বলল সে।

শখ থাকলে ফিরে যাও! বলল ক্লসন। বললাম তো সবকটা মরে ভূত হয়ে গেছে। কেড্রিক শালাকে অসহ্য লাগত আমার! পয়লা গুলিটা সোজা তার। খুঁলি বরাবর ছুঁড়েছি, বুঝলে?

বিকেল গড়িয়ে চলল। পশ্চিমে হেলে পড়ল সূর্য। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে নামল প্রচণ্ড শীত। রূপালি চাঁদের কাছে কোথায় যেন করুণ ফরিয়াদ জানাল একটা কয়োটি। অন্ধকার আকাশের নীচে নিস্তব্ধ মরুভূমি।

আকাশচুম্বী চিমনি রক আর তার আশপাশে কোথাও কোনও স্পন্দন নেই। একটা কয়েটি এদিকে এগিয়ে আসছিল। বাতাসে রক্তের গন্ধ পেয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। পিছিয়ে গেল দুকদম। তারপর ঘুরে ছুট লাগাল যেদিক থেকে আসছিল সেদিকে। পেছন ফিরে তাকাল একবার। পুকুর পারে এখনও আছে কেড্রিকের অ্যাপলুসা, হাঁটছে, মাঝে মাঝে ঘাস খাচ্ছে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ওটা, রক্তের গন্ধে নাকের পাটা ফুলে উঠল।

গাছপালা আর বোল্ডারের আড়ালে থাকায় গোলাগুলির সময় মাথা তুলেও কিছু দেখতে পায় নি ঘোড়াটা, ঘাস খাওয়ায় মন দিয়েছে আবার। কোথাও কিছু নড়ছে না। রাতের হিম রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দিচ্ছে। আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাটিতে শায়িত মানুষগুলোর শরীর।

.

দশ মাইল উত্তরে, একটা খোঁড়া ঘোড়া টেনে নিয়ে পায়ে হেঁটে এগোচ্ছে লরেডো শ্যাড। কেড্রিকের সঙ্গে সন্ধ্যায় দেখা করার কথা, দেরি করে ফেলেছে। ঘণ্টা দুএক আগে একটা খাদের কিনারা ধরে এগোনোর সময় মাটি ধসে পড়ায় আছড়ে পড়ে পা মচকেছে ঘোড়াটার। আপনমনে বিড়বিড় করে চলেছে শ্যাড, হাঁটছে, দুঘণ্টা ধরে রাতের মতো ক্যাম্প করবে না এগিয়ে যাবে, ঠিক করার চেষ্টা করছে। কেড্রিক ওর জন্যে অপেক্ষা করে থাকবে ভেবে থামতে পারছে না।

এক ঘণ্টা পর। পায়ে ফোস্কা পড়ে গেছে, তবু হাঁটছে লরেডো শ্যাঙ। হঠাৎ ঘোড়ার খুরের শব্দ কানে এল। দাঁড়িয়ে পড়ল ওঁ। রাইফেল তুলে নি। হাতে। একটু পরেই আঁধার ফুড়ে বেরিয়ে এল এক অশ্বারোহী, রাশ টানল সে। দীর্ঘ নীরবতা। লরেডো শ্যাডই প্রথম কথা বলল।

নাম বলো, পার্ডনার।

নবাগত অশ্বারোহীও সশস্ত্র। বব ম্যাকলেনন, বলল সে। তুমি?

লরেডো শ্যাপ। আমার ঘোড়াটা খোঁড়া হয়ে গেছে। চিমনি রক-এর দিকে যাচ্ছি। কেড্রিকের সঙ্গে ওখানে দেখা করার কথা। ম্যাকলেমনের দিকে তাকাল ও। তোমারও তো মিটিংয়ে থাকার কথা ছিল? কি হলো?

আমি সময় মতো পৌঁছুতে না পারায় সেগাল আর স্টলম্যান গিয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যার পরেও ওরা ফেরে নি, তাই খোঁজ করতে বেরিয়েছি।

কী বললে? তীক্ষ্ণ চিৎকার বেরুল শ্যাডের গলা চিরে। ম্যাকলেনন, আমার ভয় হচ্ছে। কোথাও একটা ভজকট হয়ে গেছে বোধ হয়। বারউইককে ফুটো পয়সারও বিশ্বাস নেই!

 টেক্সানকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাপল ম্যাকলেনন। লোকটাকে ভালো লাগলেও দ্বিধা হচ্ছে।

তোমার মার্কা কিন্তু অন্য কথা বলে, তুমি কোম্পানির লোক নও?

মাথা নাড়ল লরেডো শ্যাড। আসলে ব্যাপারটা এরকম, এখানে লড়াই করে টাকা কামাতে এসেছিলাম। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে বাছবিচার করেচিলি আমি। এখানকার ব্যাপারস্যাপার আমার আর কেড্রিকের পছন্দ হয় নি। তাই কোম্পানির কাজ ছেড়ে দেয়ার কথা ভাবছিলাম আমরা। শুধুমাত্র শান্তি বজায় রাখা যাবে, এই আশায় রয়ে গিয়েছিল কেড্রিক। আমি ওর সঙ্গ ছাড়ি নি।

আমার পেছনে উঠে পড়ো; বলল ম্যাকলেনন। দুজনকে অনায়াসে পিঠে নিতে পারবে আমার ঘোড়া, তা ছাড়া বেশি দূর তো নয়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *