০৮. আরও দুজন লোক

আরও দুজন লোক হঠাৎ রাস্তা পেরিয়ে স্টোরের দিকে এগিয়ে গেল। একজনকে আগে কখনও দেখে নি পল; অন্যজন সেদিন ইয়েলো বাট স্যালুনের পেছনের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ধূর্ত চেহারার সেই লোকটা, নাম সিঙ্গার, কথা বলছে সেই। রাস্তার উল্টোদিকে পৌঁছে দাঁড়িয়ে পড়ল দুজন। হাতের ইশারায় বাকবোর্ড থেকে নামা লোকটাকে দেখিয়ে দিল সিঙ্গার।

ওই যে লোকটা, অ্যাবি, বলল সে। শত্রুপক্ষে একজন। ম্যাকলেননের শালা।

শুরুটা ভালোই হবে দেখছি, সংক্ষেপে মৃদু কণ্ঠে বলল অ্যাবি। চলো তা হলে?

চট করে ঘুরে ওদের পিছু নিল পল কেন্দ্রিক। ওরা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দ্রুত এগিয়ে গেল ও, কবাট দুটো বন্ধ হওয়ার আগেই হাতল ধরে ফেলল। ওর আগমন টের পায় নি কেউ, অনুমান করল কেড্রিক। কাউন্টারে দাড়ানো লোকটার দিকেই মনোযোগ ওদের।

হ্যাল্লো, স্লোয়ান, নরম কণ্ঠে ডাকল সিঙ্গার, এসো, অ্যাবি মিক্সাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।

নামটা নিঃসন্দেহে স্লোয়ানের পরিচিত, ফ্যাকাসে চেহারায় ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। বাচ্চাদের একটা দুধের বোতল ধরে আছে, কিনতে যাচ্ছিল। সন্ত্রস্ত চেহারায় পালা করে সিঙ্গার আর অ্যাবি মিক্সাসের দিকে তাকাচ্ছে। আতঙ্কিত এবং হতচকিত, নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। তুমিও আছ এই ঝগড়ায়, সিঙ্গার? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি এসবে জড়াও নি।

হাসল সিঙ্গার। সবাই যাতে একথা ভাবে সেটাই চেয়েছি।

ছুঁচোর মতো লম্বাটে চেহারা মিক্সাসের, চোখদুটো হলুদ, ঈষৎ কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল সে। একটা দলিল এটা, স্লোয়ান। এখানে লেখা আছে: তুমি তোমার জমির মালিকানা ছেড়ে দিচ্ছ। সই করে দাও, আর ঝামেলা পোহাতে হবে না।

রক্ত সরে শাদা হয়ে গেছে স্লোয়ানের চেহারা, মাথা নিচু করে দলিলের দিকে তাকাল সে, চোখের পাতা পড়ছে না। আবার অ্যাবি মিক্সাসের দিকে, চোখ ফেরাল। পারব না। কদিন পরেই আমার বউয়ের বাচ্ছা হতে যাচ্ছে। তা ছাড়া ওই জমির পেছনে প্রচুর খেটেছি আমি, ছেড়ে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যাই করো, আমি সই করব না।

করলেই ভালো হত, নিষ্কম্প শীতল কণ্ঠে বলল অ্যাবি মিক্সাস। ইতিমধ্যে উধাও হয়ে গেছে দোকানি। ওদিকে ওরা তিনজন আর একধারে ঝোলানো জিন্স আর স্নিকারের আড়ালে, গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পল কেড্রিক-দোকানে আর কেউ নেই। ভালো চাইলে, সই করে দাও, ওই জমির ওপর আসলে তো তোমার অধিকার নেই। আমি কি মিথ্যে বলেছি?

এখনও চেহারার ফ্যাকাসে ভাব কাটে নি স্লোয়ানের, কিন্তু ভয় কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে। লোকটা সাহস করে এখন মুখ খুললেই তাকে মরতে হবে; বুঝতে পেরে কেড্রিকই নীরবতা ভাঙল।

হ্যাঁ অ্যাবি, মৃদু কণ্ঠে বলল ও, আমি বলছি তুমি মিথুরু?

বজ্রাহতের মতো আড়ষ্ট হয়ে গেল মিক্সাস। লোকটা খুনী এবং বিপজ্জনক, কিন্তু ধূর্তও বটে, নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তবেই খুন করে। সিঙ্গার ছাড়া কামরায় আর কেউ নেই ধরে নিয়েছিল সে। এখন দেখা যাচ্ছে পেছনে আর একজন দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের মতো কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল সে, তারপর ঘুরতে শুরু করল। দেয়ালের কাছে চলে গেছে সিঙ্গার, তার দুচোখ কেড্রিককে খুঁজে ফিরছে।

ওটা কেট্রিক! বলল সে, বুস গানম্যান!

ভুরু কোঁচকাল মিক্সাস। কী ব্যাপার, আঁ? বিরক্তির সঙ্গে বলল সে। তুমি নাক গলাচ্ছ কোন্ দুঃখে?

খুনোখুনি আর চলবে না, অ্যাবি, জোর গলায় বলল পল কেড্রিক। আগামীকাল শান্তিসভায় যোগ দিতে যাচ্ছি আমি। খুন-খারাবী বন্ধ!

নির্দেশ মতোই কাজ করছি আমি, বলল মিক্সাস, তুমি বারউইকের সঙ্গে কথা বলো!

একটু নড়ে উঠল স্লোয়ান, পাঁই করে ঘুরল অ্যাবি মিক্সাস। একদম নড়বে! খেঁকিয়ে উঠল সে।

তুমি যেতে পারো, স্লোয়ান, বলল কেড্রিক। বাকবোর্ডে চেপে ঘরে ফিরে যাও। ম্যাকলেননকে বলো আমার কথার নড়চড় হবে না। অ্যাবি, ওকে খুন করার কথা ভুলে যাও তুমি। তোমার সামনে বিপদ।

 বিভ্রান্ত অ্যাবি মিক্সাস। কেড্রিক বন্দুকবাজদের নেতৃত্ব দিচ্ছে জানে সে। তাই দ্বিধাগ্রস্ত। ভুল করতে যাচ্ছিল সে? কিন্তু তা কী করে হয়? ওকে তো-গবেট কোথাকার! ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল সে। কীথই এখানে পাঠিয়েছে আমাকে!

চুপ করো! চেঁচিয়ে উঠল সিঙ্গার, তুমি–

ঠাণ্ডামাথার খুনী অ্যারি মিক্সাস, কিন্তু মনের জোর নেই। নির্দেশ, পাল্টা নির্দেশ, তারপর খুন করতে গিয়ে মাঝপথে বাধা পেয়ে দিশেহারা হয়ে গেছে-অনেকটা অন্ধকার কানাগলিতে, পথ হারানোর মতো। সিঙ্গারের ধমকে শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না। চরকির মতো ঘুরল সে, দাঁত বেরিয়ে পড়ে হিংস্র হয়ে উঠল চেহারা।

আমাকে ধমকাতে এসো না! খেঁকিয়ে উঠল অ্যাবি মিক্সাস।

একটা হাত পিস্তলের বাঁটের কাছে ঝুলছিল সিঙ্গারের, আতঙ্কে আঁকড়ে ধরতে গেল। নিমেষে হোলস্টার থেকে বেরিয়ে এল অ্যাবির পয়েন্ট ফোর ফোর, অগ্নিশিখা তেড়ে এল সিঙ্গারের দিকে। গুলি খেয়ে লাটিমের মতো ঘুরল সিঙ্গার। ধীরে ধীরে দুহাটু ভাজ হয়ে গেল তার, লন্ত মোমের মতো পিছলে পড়ল মেঝেতে, মাথা এলিয়ে পড়ল একটা ময়দার বস্তার ওপর। মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসছে।

হাঁ করে সিঙ্গারের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মিক্সাস, চোখ পিটপিট করল বার কয়েক। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসছে ও, উত্তেজিত স্নায়ু শান্ত হচ্ছে। অবিশ্বাসভরা দৃষ্টিতে সিঙ্গারের দিকে তাকিয়ে আছে।

হায়াল্লা, সিঙ্গারকে মেরে ফেলেছি! বলল অ্যাবি।

হ্যাঁ, মিক্সাসের ওপর থেকে চোখ না সরিয়ে বলল পল কেড্রিক। এখন বুঝতে পারছে, কত সামান্য কারণে খেপে যায় লোকটা। এবার কীথের কাছে কী জবাব দেবে!

আবির ছুঁচো মুখো চেহারায় আবার ধূর্ত হাসি ফুটে উঠল। কীথ? কীথের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

গুলির শব্দে আকৃষ্ট হয়ে আস্তে আস্তে দরজার কাছে ভিড় জমতে শুরু করেছে। নিজের জায়গায় ফিরে এসেছে দোকানি, আতঙ্কিত ঝুলে-পড়া হারায় তাকিয়ে আছে।

দোকানের দরজার দিকে তাকাল অ্যাবি মিক্সাস। এই সুযোগে নিঃশব্দে পিছিয়ে এল কেড্রিক। ঝোলানো স্নিকারগুলোর আড়ালে আড়ালে পা টিপে টিপে দুই কাউন্টারের মাঝে ফাঁকায় বেরিয়ে এল ও; তারপর দোকানির শোবার ঘর হয়ে পেছনের দরজা দিয়ে গলিপথে নেমে এল।

ভিড়ের পেছন দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে ঘুর পথে সেইন্ট জেমস-এর সামনে পৌঁছুল পল। থামল। হঠাৎ পাশে হাজির হলো লরেডো শ্যাড।

কী ব্যাপার? চট করে জিজ্ঞেস করল সে।

ব্যাখ্যা করল কেড্রিক। বুঝতে পারছি না ঠিক, বলল ও। কীথ বোধহয় খুশি মতো কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। আলোচনা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বারউইকের শান্ত থাকার কথা। আমি জানি ব্যাপারটা কীথ মেনে নেয় নি। সঙ্গে সঙ্গে বারউইকের বিরোধিতা করেছিল সে।

সিঙ্গার সেটলারদের একজন না? জিজ্ঞেস করল লরেডো শ্যাড। ও খুন হওয়ায় সবাই খেপে যাবে! কীথ বা কোম্পানির সঙ্গে সিঙ্গার হাত মিলিয়েছিল, কেউ জানে?

ঠিকই বলেছ, লরেডো, চিন্তিত চেহারায় বলল পল কেড্রিক। এটাকে উসিলা করেই হয়তো মহা হাঙ্গামা বেধে যাবে!

দুজনই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল ওরা। স্লোয়ান ম্যাকলেননের আত্মীয়, তাই ওকে খুন করতে চেয়েছিল অ্যাবি। আমার গলা শুনে ভড়কে যায় সে, মাথা ঠিক রাখতে পারে নি।

ভিড়ে ভাঙন ধরল। ছোট ছোট জটলা করে নতুন ঘটনাটা প্রসঙ্গে আলাপ করতে লাগল লোকেরা রাস্তার ওপর। লরেন কীথ যখন হাজির হলো তখনও কেড্রিকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে লরেড়ো শ্যাড। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে প্রথমে শ্যাড তারপর কেড্রিকের দিকে তাকাল কীথ।

কী হচ্ছে ওখানে?

কেড্রিকের দিকে চোখ রেখে প্রশ্ন করল সে। কেড্রিক কাঁধ ঝাঁকাল। গানফাইট বোধহয়, যা শুনলাম, মাস্ট্যাংয়ে এসব পুরোনো ব্যাপার।

মিক্সাসকে দোকানে ঢুকতে দেখলাম, মন্তব্য করল লরেডো শ্যাড। এর মধ্যে তার হাত আছে কি না জানতে চাও?

ঘাড় কাত করে লরেডোর দিকে তাকাল কর্নেল লরেন, কীথ, সন্দেহভরা চোখ, কে মারা গেল? প্রশ্ন করে পালা করে দুজনের দিকে তাকাল।

সিঙ্গার নামে এক লোক, সহজ কণ্ঠে, বলল লরেডো শ্যাড। মিক্সাসই খুন করেছে।

মিক্সাস? সিঙ্গারকে মেরেছে? মাথা নাড়ল কীথ। অসম্ভব!

অসম্ভর হতে যাবে কেন? ধীর লয়ে বলল লরেটে। লড়াই করতেই তো এখানে এসেছে মিক্সাস, নাকি? সিঙ্গার একজন সেটলার, তাই না?

ইতস্তত করল কীথ, তার ছুঁচাল কঠিন চেহারায় দিশেহারা ভাব। কীথের চেহারা দেখে মনে মনে তৃপ্তি বোধ করল কেড্রিক। দোকানি ওর চেহারা দেখতে পায় নি। মিক্সাস, সিঙ্গার আর স্লোয়ান-এই তিনজন কেবল দেখেছে ওকে। এদের মধ্যে সিঙ্গার মারা গেছে, শ্লোয়ান কেটে পড়েছে। সিঙ্গারকে খুন করার পেছনে অ্যাবি মিক্সাস কী যুক্তি খাড়া করবে ভেবে পেল না কেড্রিক। তবে একজন বেঈমান্তের মৃত্যু ঘটেছে, হতবুদ্ধি হয়ে গেছে ইয়েলো বাটের শত্রু বারউইকরা। ভবিষ্যতের কথা বলা যায় না, তবে আপাতত ভালোই হয়েছে ব্যাপারটা। তবে একটা জায়গাতেই মুশকিল, সিঙ্গার ইয়েলো বাটের লোক ছিল, কীথ বা কোম্পানির সঙ্গে তার গাটছড়া বাঁধার কথা কারও জানা নেই-জানলেও তাদের সংখ্যা নগণ্য।

জটলার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কেড্রিকের মনে হলো: নতুন একটা উপাদান যোগ হতে যাচ্ছে ঘটনা ধারায়। জনমতও যে একটা প্রচণ্ড শক্তি, কথাটা ভাবে নি বারউইক; এবার ভাবতে হবে। শহরের প্রতিটি মানুষের চেহারায় কাঠিন্য ফুটে উঠেছে।

এরা, প্রায় সবাই-ই গরীব; যার যার পথে চলে কিংবা চলার চেষ্টা করে। কোম্পানির কার্যকলাপে অসন্তুষ্ট হয়েছে ওরা। সিঙ্গারকে যে সবাই চিনত তা নয়, যারা চিনত তারাও খুব একটা আমল দিত না; কিন্তু এখন কাকে হত্যা করা হয়েছে তা নয়, পুরো ব্যাপারটা তাদের দৃষ্টিতে পরিশ্রমী, একদল মানুষের বিরুদ্ধে বহিরাগতদের মদতপুষ্ট কোম্পানির লড়াইতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় লোকদের শ্রমের বিনিময়ে মুনাফা লুটতে চাইছে ওরা। তা ছাড়া সিঙ্গার আর যাই হোক পিস্তলবাজ ছিল না, তার ওপর স্থানীয় লোক ছিল সে। অ্যাবি মিক্সাস নৃশংস খুনী, কারও অজানা নেই, পিস্তল ভাড়া খাটায় সে।

মাথা দুলিয়ে রাস্তার দিকে ইঙ্গিত করল পল কেড্রিক। কর্নেল, বলল ও, বিপদ এড়াতে চাইলে এখন থেকে এদেরকেও হিসেবের মধ্যে ধরো। জনগণ খেপলে সামলাতে পারবে না।

ভয়ার্ত দৃষ্টিতে জনতার দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকাল লরেন কীথ। তারপর পড়িমরি করে হেডকোয়ার্টারের দিকে ছুটল। কীথের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল শ্যাড, তারপর কেড্রিকের দিকে ঘাড় ফেরাল। আমরা কিন্তু এখনও কোম্পানির সঙ্গে আছি, ওদের জন্যে মুণ্ড হারাতে চাই না আমি। চলল কেটে পড়ি। কয়েকদিন পাহাড়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকি।

সম্ভব নয়। বারউইককে নিয়ে সেগালদের সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে। তবে তুমি চাইলে শহর থেকে বেরিয়ে যেতে পারো, চারদিক জরিপ করে গফদের কোনও খোঁজ মেলে কিনা দেখো-সত্যি চলে গেছে না ভাওতা দিচ্ছে জানতে পারলে ভালো হয়। কাল সন্ধ্যা নাগাদ আমার সঙ্গে চিমনি রকে দেখা করো। আমি অপেক্ষা করব।

.

শ্যাডের কাছে বিদায় নিয়ে সেইন্ট জেমস-এ নিজের রুমে ফিরে এল পল কেড্রিক। চট করে কিছু জিনিস গুছিয়ে নিল। তারপর ব্যাগ হাতে সোজা চলে এল লিভারি স্ট্যাবলে, অ্যাপলুসার পিঠে জিন চাপিয়ে তৈরি করে রাখল টাকে। আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এসে বড় রাস্তা এড়িয়ে হেডকোয়ার্টারের দিকে এগোল পল। সামান্থা ফক্সের সঙ্গে দেখা করবে, এ-মুহূর্তে বারউইক বা কীথের মুখোমুখি হতে চায় না।

হেডকোয়ার্টারে কারও দেখা পেল না পল। গুন্টার, বোধ হয় কোথাও গেছে। বারউইক আর কীথ উধাও। অফিস-রুমে পায়চারি করতে করতে মাথার ওপর মৃদু পদশব্দ শুনতে পেল পল কেড্রিক।

চড়া গলায় ডাকল ১৪:মাথার উপর ছুটন্ত পায়ের শব্দ হলো। কয়েকমুহূর্ত পর সিঁড়ির মাথায় এসে দাড়াল সামান্থা, ফক্স।

কে? পরক্ষণে কেড্রিককে চিনতে পেরে তাড়াতাড়ি নেমে এল। কোনও সমস্যা?

সব কিছু খুলে বলল কেড্রিক, কিছুই গোপন করল না। হয়তো কিছুই হবে না। কিন্তু ঝামেলা শুরু হতে আবার বেশি কিছু লাগেও না। সবাই এখন জানে কোম্পানির বন্দুকবাজরা শহর থেকে চলে গেছে। বারউইক, কীথ আর তোমার মামা নিশ্চয়ই গা ঢাকা দিয়েছে।

আজ সারা দিনে একবারও মামার সঙ্গে আমার দেখা হয় নি। সকালে একসঙ্গে নাশতা করার পরই কোথায় যেন চলে গেছে।

দাঁড়াও, দেখছি। তোমার কাছে পিস্তল আছে? জিজ্ঞেস করে আবার নিজেই মাথা নাড়ল কেড্রিক। হয়তো তার প্রয়োজন হবে না। এখানে সবাই তোমাকে পছন্দ করে, তা ছাড়া আগেই তুমি তোমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছ। তোমার বিপদ হবার আশঙ্কা কম। তবু সাবধান থাকা ভালো। বিনাকাজে ঘর ছেড়ে বেরিয়ো না। গোলমাল একটা বাধল বলে!

দরজার কাছে পৌঁছুনোর আগেই আবার সামান্থা ডাকল ওকে, ঘুরে মুখোমুখি হলো কেড্রিক।

পল, সামান্থার দৃষ্টিতে আবেদন ঝরছে। নিজের দিকে খেয়াল রেখো।

দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। মাথা দোলা, কেড্রিক। আচ্ছা, চেষ্টা করব।

ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় থমকে দাঁড়াল কেড্রিক। বারউইক আর কীথ হয়তো গা ঢাকা দিয়েছে; কিন্তু যত খারাপই হোক, ভাগ্নীকে, বিপদে ফেলে পালিয়ে যাবার মতো লোক তো গুন্টার নয়! গুন্টারের অন্তর্ধানের রহস্য কী? ভাবতে ভাবতে ঘাড় ফিরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল পল কেড্রিক। বাড়ির পেছনের রাস্তা খাঁ-খাঁ করছে, তূপ হয়ে আছে পাউডারের মতো মসৃণ ধূসর বালি; গাছের পাতায় পাতায়, ঝোঁপ ঝাড়ে ধুলোর পুরু আস্তরণ পড়েছে।

নেড়েচেড়ে গানবেল্ট জায়গামতো বসাল কেড্রিক, তারপর বাড়ির পেছন দিকে পা বাড়াল। সাধারণত আস্তারল ঘোড়ায় গিজগিজ করে, কিন্তু এখন যেন ফাঁকা। দ্রুতপায়ে এগোল ও, পায়ে পায়ে ধুলো উড়ছে, ঝুন-ঝুন শব্দ উঠছে ম্পারে।

আস্তাবলের কাছে পৌঁছে ওঅটর ট্রাফের পাশে দাঁড়াল পল। শহরের কোলাহল কানে আসে কিনা শোনার চেষ্টা করল।

নীরবতা, অস্বাভাবিক নীরবতা।

সামান্থার নিরাপত্তার কথা ভেবে মুহূর্তের জন্যে ইতস্তত করল কেড্রিক, তারপর সব দ্বিধা ঝেড়ে পা বাড়াল, চওড়া দরজা গলে ঢুকল আস্তাবলে।

একটা ছাড়া সবগুলো স্টল খালি। স্টলের মুখে এসে দাঁড়াল কেড্রিক। গুন্টারের চেস্টনাটটা রয়েছে। কাছেই পড়ে আছে স্যাডল। তা হলে কী শহরেই আছে গুন্টার? একটু ভেবে সম্ভাবনাটা নাকচ করে দিল কেড্রিক। মাথা থেকে টুপি খুলে রুমালে ব্যান্ড মুছল, আবার জায়গামতো বসাল ওটা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রতিটি স্টল পরীক্ষা করল ও, চেহারায় চিন্তার ছাপ।

কোথাও কিছু নেই!

বিভ্রান্ত কেড্রিক আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এল। সূর্য যেন আগুন ঢালছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। চোখ ছোট করে ইতিউতি তাকাল ও। এখনকার এই বড় আস্তাবল তৈরি হওয়ার আগে যেটা আস্তাবল হিসেবে ব্যবহৃত হত, সেই জরাজীর্ণ দালানটা চোখে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত সেদিকে চেয়ে রইল কেড্রিক। তারপর, পা বাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে কানে এল ঘোড়ার খুরের শব্দ, চট করে উবু হয়েই বসে পাইকরে ঘুরল ও, দুই হাত প্রস্তুত।

পর মুহূর্তে আবার সোজা হয়ে দাড়াল। স্যাডল থেকে পিছলে নেমে ছুটে আসছে লেইন। ওঁহু, পল, তুমি এখানে! আর আমি এদিকে খুঁজে সারা! কেড্রিকের বাহু আঁকড়ে ধরে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটা। কালকের মিটিংয়ে তুমি যেয়ো না, পুল, বিপদ হকে!

ম্যাকলেনন ষড়যন্ত্র করেছে?

ম্যাকলেনন? মুহূর্তের জন্যে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল স্যু লেইন। না, না! ম্যাক নয়! চেহারা বদলে গেল ওর। আমার বাড়িতে চলল, পল, ওদের ঝামেলা ওরা পোহাবে! তুমি আমার সঙ্গে এসো!

হঠাৎ আমার জন্যে বড় উতলা হয়ে উঠলে যে? প্রকৃতই কৌতূহল বোধ করছে কেড্রিক তোমার সঙ্গে মাত্র একবার আমার কথা হয়েছে এবং সব ব্যাপারেই মতের অমিল পেয়েছি আমি।

তর্ক করে সময় নষ্ট করো না তো! ওদের কেউ যদি দেখে ফেলে আমি তোমার সঙ্গে কথা বলছি, বিপদে পড়ে যাব। তুমি আমার সঙ্গে চলো, গোলমাল না মেটা পর্যন্ত এখান থেকে দূরে থাকো। ডরনিকে আমি চিনি, ও তোমাকে ঘৃণা করে, পল, মন থেকে ঘৃণা করে!

তাই নাকি? স্যু লেইনের কাঁধ চাপড়ে দিল পল কেড্রিক। যাও, ঘরে ফিরে যাও। এখানে অনেক কাজ পড়ে আছে আমার।

অ! একটু কঠিন হলো স্যু লেইনের দৃষ্টি। ওই মেয়েটাই না যাওয়ার কারণ নিশ্চয়ই? কী যেন নাম, ফক্স? মেয়েটার কথা অনেক শুনেছি, খুব নাকি সুন্দরী আর-আর, কেমন মেয়ে সে?

চমৎকার, গাঢ় স্বরে বলল কেড্রিক। আলাপ করে দেখো, তোমার ভালো লাগবে।

আড়ষ্ট হয়ে গেল স্যু লেইন। আচ্ছা? মেয়েদের সম্পর্কে কী জানো তুমি পল? জানতে ইচ্ছে করছে। আদৌ কিছু জানো? সামান্থা ফক্সকে আমার ভালো লাগার প্রশ্নই ওঠে না। কেড্রিকের কাধ ধরে ঝাঁকুনি দিল ও। চাইলে আসতে পারো। কাল রাতে খবরটা পেয়েছি আমি। এমন কিছু ঘটুক আ-আমি চাই না।

কী-কীসের কথা বলছ?

অধৈর্যের সঙ্গে মাটিতে পা ঠকল স্যু লেইন। উফ, বোকা নাকি! ওরা তোমাকে খুন করার প্ল্যান করছে, পল! কই, এবার চল।

এখন না, শান্ত কণ্ঠে বলল কেড্রিক। আগে,এ-বিবাদের একটা মীমাংসা করতে হবে। তারপর তোমাদের ওদিকে একবার যেতেও পারি।

অধৈর্যভাবে ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল স্যু লেইন। স্যাডলে চেপে ঘাড় ফিরিয়ে কেড্রিকের দিকে তাকাল। যদি মত পাল্টাও

এখন নয়, আবার বলল কেড্রিক। তা হলে সাবধান, খুব সাবধান, পল!

স্যু লেইন চলে গেলে কী ভেবে হেডকোয়ার্টারের দিকে তাকাল পল কেড্রিক। জানালায় দাঁড়িয়ে ওর দিকে এতক্ষণ তাকিয়েছিল সামান্থা, চোখাচোখি হতেই চট করে সরে গেল। পা বাড়াতে গিয়েও থমকে গেল কেড্রিক। কী বলবে? এখন মেয়েটা কিছুই বুঝবে না।

বাড়ির সামনে যাবার জন্যে পা বাড়াল ও, কয়েক পা এগিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘুরে দ্রুত পায়ে ফের এগিয়ে গেল পুরোনো আস্তাবলের দিকে। দরজার খিড়কিতে হাত রাখল। রোদ-বৃষ্টির অত্যাচারে কাহিল অবস্থা, আস্তে আস্তে খুলল ও, মরচে ধরা কজ্বা আর্তনাদ করে উঠল। ভেতরে সঁতসেঁতে পরিবেশ, গুমোট। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল কেড্রিক। মাকড়শার জালে ঢাকা জানালার ফাঁক গলে রোদ এসে বহুদিন আগের খড়ে ছাওয়া মেঝেতে নকশা আঁকছে। এক কদম এগিয়ে সবচেয়ে কাছের স্টলে উঁকি দিল পল।

একটা হাতের ওপর মাথা রেখে উপুড় হয়ে পড়ে আছে জন গুন্টার, শার্টের পেছনে রক্তের দাগ। মৃতদেহটার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল পল। পেছনে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছে সামান্থার মামাকে, উপর্যুপরি তিনবার আঘাত করেছে খুনী। আঘাতের চেহারা দেখে মনে হয়, ডেস্কে বা টেবিলে বসে কাজ করছিল গুন্টার, এই সময় অতর্কিতে হামলা চালানো হয়েছে।

কয়েক ঘণ্টা আগেই মারা গেছে জন গুন্টার।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *