০৭. ধূসর পাথুরে ভবনের অফিস-রুমে

ধূসর পাথুরে ভবনের অফিস-রুমে পা রাখল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। ঘরময় পায়চারি করছিল কর্নেল লরেন কীথ; থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। ডরনির কাছে শুনলাম মাঝরাতের পরই ফিরেছ তুমি। আসার সঙ্গে সঙ্গে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলেছিলাম, দেখা করো নি কেন?

আসলে, খুব ক্লান্ত ছিলাম আমি। তা ছাড়া, কীথের চোখে চোখ রাখল কেড্রিক, জরুরি কোনও খবরও আমার কাছে ছিল না।

একটা কাজের জন্যে তোমাকে ভাড়া করা হয়েছে, কিন্তু এখনও কিছুই করতে পারো নি তুমি। কোমরে হাত দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল কীথ। গিয়েছিলে কোন চুলোয়?

সংক্ষেপে পরিষ্কার করে ইয়েলো বাটের ঘটনা খুলে বলল কেড্রিক, তবে লুকোনোর জায়গা এবং স্যু লেইনের সঙ্গে দেখা করার কথা সযত্নে এড়িয়ে গেল। জায়গাটা নিজের চোখে দেখার পর, বলল পল, কেন যেন আমার মনে হচেছ ওখান থেকে ওদের উচ্ছেদ করা সহজ হবে না। গুন্টার আর তুমি সরকারকে তো বটেই আমাকেও মিথ্যে কথা বলেছ। চোর-ছ্যাচড় আর গুণ্ডা বদমাশের দল আদৌ আস্তানা গাড়ে নি ওখানে।ওরা সৎ এবং ভালো মানুষ। ওদের তাড়াতে গেলে অনেক ধকল পোহাতে হবে, টিকতে পারবে না।

অনুকম্পার হাসি দেখা দিল কর্নেল কীথের ঠোঁটে। ভয়ে কুঁকড়ে গেলে মনে হয়। তুমি নাকি লড়াকু লোক! আমাদের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছ, শোনো বলি, ওই ফালতু লোকগুলোকে একবার যখন তাড়াব ঠিক করেছি, তুমি সাহায্য করো বা না করো, যেভাবে হোক ওদের তাড়াবই। তোমাকে ভাড়া করার বুদ্ধিটা গুন্টারের মাথা থেকে বেরিয়েছিল-আমার নয়।

সত্যি কথা বলেছ, বারউইকের পিছু পিছু কামরায় ঢুকল জন গুন্টার। এক লহমায় কেড্রিক আর কীথকে জরিপ করে নিল ও। ইয়েলো বাট-এ গেছে বলে ওকে দোষারোপ করো না, আমিই যেতে বলেছিলাম।

ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসতে নিশ্চয়ই বলে দাও নি? ও এখন বলছে, আমাদেরকে নিয়ে, নাকি কাজটা হবে না!

এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল বারউইক; এবার ডেস্কের উল্টোদিকে গিয়ে প্রকাণ্ড চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। বড় করে শ্বাস টানল, ঘাম মুছল হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে; তারপর তীব্র দৃষ্টি হানল কেড্রিকের দিকে। কী জানতে পারলে, বলো?

ওরা যুদ্ধ করার জন্যে তৈরি হয়ে আছে। বব ম্যাকলেনন আর সেগালের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। ওদের মাঝে ভয়ের কোনও চিহ্ন নেই, বরং আছে প্রখর আত্মমর্যাদা বোধ; প্রয়োজনে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও লড়বে। যে কোনও পরিস্থিতির জন্যে তৈরি হয়ে আছে ওরা। তোমাদের হামলায় ওদের একজন লোক মারা গেছে, গুরুতর আহত হয়েছে একজন আর ডিনামাইট বিস্ফোরণে একটা দোকানের দরজা, বারান্দা উড়ে গেছে।

অগ্নিদৃষ্টিতে কীথের দিকে তাকাল অ্যাল্টন বারউইক। অথচ তুমি বলেছিলে তিনজন মারা গেছে, মাটির সঙ্গে মিশে গেছে একটা দালান। এবার থেকে নিশ্চিত হয়ে তারপর আমার কাছে রিপোর্ট করবে, ঠিক আছে? আবার কেড্রিকের দিকে তাকাল সে। হ্যাঁ, তারপর বলল, তোমার কী হয়েছিল, পালিয়েছিলে?

আমাকে এখানে দেখতে পাচ্ছ।

অনেকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল ওরা। বারউকের শীতল কঠিন দৃষ্টি যেন পলের অন্তস্তল পর্যন্ত দেখে নিচ্ছে।

এখন এ-ব্যাপারে তোমার মতামত? অবশেষে জানতে চাইল বারউইক।

যুদ্ধ বাধলে, ভেবেচিন্তে জবাব দিল: কেড্রিক, ওয়াশিংটনে এর হাওয়া লাগবে। লিংকন কাউন্টি ওঅরের কথা নিশ্চয়ই তোমাদের মনে পড়ে? ওখানকার মতো এখানেও একজন জেনারেল এসে হাজির হবে। তারপর ওই জায়গা থেকে কত মুনাফা তোমাদের হাতে আসবে বুঝতেই পারছ।

প্রকাণ্ড মাথাটা দুলিয়ে সায় দিল বারউইক। নেহাত সত্যি কথা! সুতরাং আমাদের অন্য উপায়ের কথা ভাবতে হবে। এ লোকটা, আবার কীথ আর। গুন্টারের দিকে আগুনঝরা-দৃষ্টিতে তাকাল সে, অন্তত কাজের কথা বলতে পারে, নির্ভুল রিপোর্ট দেয়; ওর কাছ থেকে তোমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

কেড্রিকের দিকে তাকাল বারউইক। আর কিছু?

একটা কথা। ওদিকে সমভূমিতে একজন রহস্যময় ঘোড়সওয়ারের আনাগোনা চোখে পড়েছে আমার। ইঁদুর-রঙা একটা মাস্ট্যাং হাঁকিয়ে বেড়ায়। লোকটা একাই ওখানকার লোকজনকে আতঙ্কিত করে তুলেছে, তোমাদের তর্জন-গর্জনে কিন্তু কিছুই হয় নি!

তাই? নিরাবেগ কণ্ঠে বলল বারউইক। ডেস্কের কাগজপত্র নাড়াচাড়া করল কয়েক মুহূর্ত তারপর জিজ্ঞেস করল, শুনলাম, তুমি নাকি কাজ ছেড়ে দেবার কথা ভাবছ, সত্যি নাকি?

খুন-খারাবীতে জড়াতে চাই না আমি। ওরা মোটেই আউট-ল নয়, নিরপরাধ শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমার পরামর্শ: ওদের কাছ থেকে জায়গাটা কিনে নাও, নইলে ওরা যেভাবে আছে সেভাবেই থাকতে দাও।

তোমাকে আর মাতব্বরি ফলাতে হবে না! শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল লরেন কীর্থ। সিদ্ধান্ত যা নেয়ার আমরাই নেব!

আমার অনুমতি ছাড়া, নরম গলায় বলল বারউইক, কেউ এখন কাজ ছাড়তে পারবে না!

হঠাৎ হেসে উঠল পল কেড্রিক। তা হলে শিগগির অনুমতি দাও, এই মুহূর্তে কাজটা ছেড়ে দিলাম আমি।

পল! প্রতিবাদ করল গুন্টার। এসব কী বলছ।

কোম্পানির কাছে তোমার দেনার কী হবে? বিরক্তির সঙ্গে জিজ্ঞেস করল কর্নেল কীথ। ফেরত দেয়ার ক্ষমতা আছে?

তার দরকার নেই।

একসঙ্গে ঘাড় ফিরিয়ে বক্তার দিকে তাকাল, ওরা। দোরগোড়ায় সামান্থা ফক্স দাঁড়িয়ে। তোমাদের এই ব্যবসাতে আমার টাকাও খাটছে। টাকা নেয়ার সময় মামা বলেছিল এটা রিয়েল-এস্টেট ব্যবসা, কোনওরকম দুর্নীতি নেই। এতদিন মামা সৎ পথে ছিল বলে তার কথা বিশ্বাস করে খোঁজ-খবর ছাড়াই টাকা খাটানোর অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন আসল কথা জানার পর আমার টাকা উঠিয়ে নেব ঠিক করেছি। ক্যাপ্টেন কেড্রিকের কাছে তোমাদের যা পাওনা, কেটে রেখে বাকি টাকা আমাকে ফিরিয়ে দাও। ক্যাপ্টেন তার সুবিধে মতো ওই টাকা ফিরিয়ে দেবে।

পাথর হয়ে গেল যেন সবাই। রক্ত সরে শাদা হয়ে গেছে জন গুন্টারের চেহারা। প্রথমে হতবাক, তারপর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল কর্নেল কীথ, প্রতিবাদ করতে গেল, কিন্তু তার আগেই গুন্টারের দিকে তাকিয়ে মুখ খুলল বারউইক।

তুমি- ধমকে উঠল সে, তুমি বলেছিলে টাকাগুলো তোমার। গর্দভ কোথাকার! এর মাঝে মেয়েমানুষকে টানতে গেলে কোন আক্কেলে? বেশ, ওকে তুমি জড়িয়েছ, এখন সামলাও! নইলে আমাকে হাত দিতে হবে।

এখন থেকে আমাকে কিংবা আমার কাজকর্ম নিয়ে আর কাউকে মাথা ঘামাতে হবে না, জবাব দিল সামান্থা। আমি নিজেই সব দেখাশোনা করব!

কেড্রিকের দিকে তাকাল ও। তোমার সিদ্ধান্তে আমি খুশি হয়েছি, ক্যাপ্টেন। আশা করি এর জন্যে তোমাকে আপসোস করত্বে হবে না।

সামান্থার পিছু পিছু কামরা থেকে বেরিয়ে যাবার জন্যে পা বাড়াল পল কেড্রিক, কিন্তু বারউইকের ডাকে থামতে হলো ওকে।

ক্যাপ্টেন!

ঘুরে দাঁড়াল পল কেড্রিক! কুৎসিত দৃষ্টি ফুটে উঠেছে কর্নেল কীথের চোখে। গুন্টারের চেহারায় অবিশ্বাস আর আতঙ্কের ছাপ।

ক্যাপ্টেন, কেড্রিক, বলল বারউইক, আমরা বোধ হয় একটু ধৈর্য হারা হয়ে পড়েছিলাম। যা হোক, এ-ব্যাপারে তোমার সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি আমার ভালো লেগেছে। ঠিকই বলেছ, ইয়েলো বাট থেকে ওদের উচ্ছেদ করতে গেলে ঝামেলা হবে এবং তাতে স্বভাবতই ওয়াশিংটনে নানা কথা উঠবে। ব্যাপারটা আমিও ভেবেছিলাম, কিন্তু ম্যাকলেনন সম্পর্কে জানা না থাকায় সম্ভাবনাটা ক্ষীণ বলে উড়িয়ে দিয়েছি।

সেগালকে আমি চিনি, আবার বলল সে। কিন্তু ম্যাকলেনন সম্পর্কে কিছুই জানি না। তোমার কথা শুনে, সর্বাত্মক হামলার পরিকল্পনা বাদ দিতে হচ্ছে। ভিন্ন উপায় খুঁজতে হবে আমাদের। আর হ্যাঁ, বলে চলল বারউইক। মিস ফক্সের ওপর তোমার মোটামুটি প্রভাব আছে বলে মনে হলো। এই মুহূর্তে আমরা কোনওরকম ব্যর্থতা সহ্য করতে পারব না, তাই তোমাকে একটা প্রস্তাব দিচ্ছি। তুমি আমাদের কোম্পানিতে যোগ দিলে কেমন হয়? সাইলেন্ট পার্টনার হিসেবে?

ক্রোধে ঝলসে উঠল, কীথের চেহারা। কিন্তু গুন্টারের চোখে-মুখে প্রত্যাশার ছাপ পড়ল। বারউইক থামল না। লাভের শতকরা পনের ভাগ পাবে তুমি। প্রচুর টাকা! মিস ফক্সকে তুমি লাইনে রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। তুমি যদি হাল ধরো, রক্তপাত ছাড়াই হয়তো সমস্যার একটা সমাধান বের করা সম্ভব হবে।

দ্বিধায় পড়ল পুল কেড্রিক। টাকার পরিমাণ প্রলুব্ধ করার মতো, সামান্থার কাছে দায়বদ্ধ হতে চায় না ও। কিন্তু, রক্তপাত ছাড়া কথাটাই বেশি আকৃষ্ট করল ওকে, সাবধান হতে ভুলে গেল।

রক্তপাত না হলে, বলল কেড্রিক, তোমার শর্তে আমি রাজি। কিন্তু তারপরও ব্যাপারটা নিয়ে একটু খোলাখুলি আলাপ করতে হবে।

পাঁই করে ঘুরে দাঁড়াল কর্নেল কীথ। এ-সবের কোনও অর্থ হয় না, বারউইক! তুমি খুব ভালো করে জানো, ওদের সরানোর একমাত্র রাস্তা সরাসরি পূর্ণশক্তিতে আক্রমণ। আগেও এ-নিয়ে কথা বলেছি আমরা। তা ছাড়া এই লোকটা মোটেই বিশ্বস্ত নয়। আমার কানে এসেছে, শত্রুপক্ষে ওর বন্ধু আছে; ওদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে ও।

যত যোগাযোগ রাখবে তত ভালো, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কী যেন ভাবল বারউইক, হাত দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। ওদিকে বন্ধু থাকায় কেড্রিক সহজেই একটা সমঝোতায় পৌঁছুতে পারবে! হঠাৎ হেসে উঠল সে। তোমরা দুজন একটু বাইরে যাও তো, ক্যাপ্টেন কেড্রিকের সঙ্গে একা কিছু কথা বলতে চাই।

.

কয়েক ঘণ্টা পর, রাস্তায় দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বোলাচ্ছে পল কেড্রিক। বারউইক আশাতীত ভালোমানুষির পরিচয় দিয়েছে। বিশ্বাসভাজন না হলেও, ওদের কাছ থেকে জমি কেনার ব্যাপারে অন্তত লোকটার আপত্তি আছে বলে মনে হয় নি। কয়েকজনকে জমি বিক্রি করায় রাজি করানো গেলে অন্যরাও শেষ পর্যন্ত আপত্তি তুলবে না। সরকার হস্তক্ষেপ করলে জায়গাটা ওদের এমনিতেই ছাড়তে হবে। ম্যাকলেনন আর সেগালকে রাজি করিয়ে শান্ত করতে পারলে নেতৃত্বের অভাবে লড়াইয়ের উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে সেটলাররা। লড়াই না হলে রক্তপাতের প্রশ্নই ওঠে না। বরঞ্চ সেটলাররা জমির বিনিময়ে বেশ কিছু টাকা পাবে।

লোকজনের ভিড় এড়িয়ে রাস্তা ধরে এগোল কেড্রিক। বিরক্তি বোধ করছে। বারউইক কুটিল চরিত্রের লোক, কিন্তু বাস্তব বুদ্ধি আছে তার। বুঝতে পেরেছে, জমি কেনার আগ মুহূর্তে একাধিক হত্যাকাণ্ড মহাশোরগোলের সৃষ্টি করবে, ফলে ওদের পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাবে। সাময়িকভাবে হলেও ঝামেলা ঠেকানো গেছে। সামান্থার ধারণা, এবার একটা সমাধান বের করা। সম্ভব হবে। ম্যাকলেনন আর সেগালের সঙ্গে আলাপ করার জন্যে কাল আবার ফিরে যাবার কথা ভাবছে পল কেড্রিক। একজন নিরপেক্ষ লোক মারফত রাতের মধ্যেই খবর পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে।

শহরে আসতে রাজি হবে না ওরা, ওর সঙ্গে একমত হয়েছে বারউইক। তো, এক কাজ করো, মাঝামাঝি কোথাও একটা জায়গা বেছে নাও? ল্যারগো ক্যানিয়ন কিংবা চিমনি রকে ওদের সঙ্গে দেখা করলে কেমন হয়? আমিও না হয় যাব তোমার সঙ্গে আমরা দুজন বব ম্যাকলেনন আর পিটার সেগালের সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চয়ই একটা অপসরফায় পৌঁছুতে পারব, কী বলে? অন্তত চেষ্টা করতে তো দোষ নেই?

শান্তি ফিরিয়ে আনার এই সম্ভাবনাই রাজি হতে বাধ্য করেছে কেড্রিককে। সামান্থার কাছ থেকে সম্মতি আদায় করেছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে ওর ব্যাখ্যা মন দিয়ে শুনেছে সামান্থা, তারপর সরাসরি ওর দিকে তাকিয়ে বলেছে, তবে ওদের কথায় তুমি আস্থা রাখতে পারছ না, তাই না, ক্যাপ্টেন? আমিও ওদের বিশ্বাস করি না। জন মামা কোনওদিন এমন ছিল না আমার মনে হয় নিজের অজান্তে ওদের ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে ও। যাকগে, বারউইক যদি আলোচনা করতে চায়, আপত্তি করার কারণ দেখি না। আমি তোমার পক্ষে। আশা করি আলোচনা থেকে লড়াই এড়ানোর একটা উপায় বেরিয়ে আসবে।

কিন্তু এখন বিভিন্ন দিক থেকে পরিস্থিতি বিচার করে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছে না কেড্রিক। সবকিছু যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

ম্যাকলেনন আর সেগালের নেতৃত্বে ইয়েলো বাটবাসীরা শহর এবং ঘরবাড়ি রক্ষা করার জন্যে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। জরিপের কাজ বন্ধ করে দিয়ে জমিজমা সব নিজেদের দখলে রেখে দেবে।

কিন্তু দুই পক্ষেই অত্যুৎসাহী লোকের অভাব নেই। এদিকে ঘটনাপ্রবাহের আকস্মিক মোড় পরিবর্তন সহজভাবে নেয় নি কর্নেল কীথ। শুরু থেকেই সর্বাত্মক হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার কথা বলে আসছে সে। পশ্চিমের অনেক রহস্যময় ঘটনার সঙ্গে আরেকটা ঘটনা যোগ হত তা হলে। কীথের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে, ভাবল কেড্রিক, ওদিক থেকে যে কোনও মুহূর্তে বিপদ আসতে পারে।

সেইন্ট জেমস-এর নিজের কামরায় ফিরে শুয়ে পড়ল পল কেড্রিক। পরদিন কাক-ভোরে ঘুম ভাঙল, জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখল ঘোড়ায় চেপে শহর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কর্নেল, লরেন কীথ। বিস্মিত হলো

লাফিয়ে বিছানা থেকে নামল, চট করে পোশাক পরে নিল। কীথের মতলব জানা দরকার। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এল ও, এগেলি আস্ত বিলের দিকে। অ্যাপলুসার পিঠে চেপে শহর থেকে বেরিয়ে এল। একটু খুঁজতেই পাওয়া গেল কীথের ট্র্যাক, অনুসরণ করল। ট্রেইল থেকে বেরিয়ে উত্তর-ঘেঁষে পশ্চিমে গেছে কীথ। কিন্তু কয়েক মাইল এগোনোর পূর ট্রেইল হারিয়ে ফেলল পল। লম্বা এক চক্কর দিয়ে ট্রাকের সন্ধান চালাল। ল্যারগো। ক্যানিয়নের কাছাকাছি কোথাও হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে কর্নেল লরেন কীথ।

হোটেলে ফিরে বব ম্যাকলেননের পাঠানো বার্তা পেল পল কেড্রিক। বুধবার বিকেল তিনটের চিমনি রকে সৈগালকে নিয়ে বারউইক আর কেড্রিকের সঙ্গে আলোচনা করতে আসবে সে। আজ সোমবার, মাঝে পুরো একটা দিন পড়ে আছে। কিন্তু সোমবার সারা দিন কোথাও ডরনি শয়ের দেখা মিলল না। তবে বার কয়েক ওর সঙ্গে দেখা করে গেল লরেডো শ্যাড, বেশির ভাগ সময়ই স্যালুনে স্যালুনে কাটাচ্ছে সে।

গভীর রাতে ধীরে ধীরে কেড্রিকের ঘরের দরজা খুলে গেল। পিস্তলহীতে উঠে বসল পল। ভেতরে পা রাখল লরেডো শ্যাড।

কিছু একটা ঘটছে, বলে বিছানায় বসল লরেডো। আমার কাছে কেমন যেন বেখাপ্পা লাগছে। ঘণ্টা দুয়েক হবে, পয়েন্সেট আর লী গফ এসে বলল ওরা চলে যাচ্ছে। এখানে যখন লড়াই হচ্ছে না, থেকে লাভ নেই। ডুরাংগোতে চলে যাচ্ছে। এর আধ ঘণ্টাটাক পড়ে ঘোড়া নিয়ে চলে গেল।

এতে বেখাপ্পার কী আছে? সিগারেট বানাতে বানাতে জিজ্ঞেস করল পল কেড্রিক। বরং বারউইকের সঙ্গে আমার তোসে-রকমই কথা হয়েছে। এখানে সত্যিই লড়াই হচ্ছে না।

হুম, শুষ্ক কণ্ঠে বলল লরেডো শ্যাড। কিন্তু ওরা সঙ্গে করে অনেক জিনিসপত্র এনেছিল এখানে, অল্প কিছু জিনিস নিয়ে গেছে। অস্বাভাবিক নয় প্যাক হর্স হারিয়ে ফেলল নাকি?

ফেসেনডেন কোথায়?

জানি না।

আর কেউ যায় নি?

হ্যাঁ, ক্লসন। অন্তত কাছেপিঠে নেই সে। সকালের পর আর দেখা হয় নি।

বাকি রইল ডরনি শ, ওকেও দেখা যাচ্ছে না; এবং ফেসেনডেন, এখনও যদি বিদায় না নিয়ে থাকে। অস্বস্তি বোধ করছে কেড্রিক। কিন্তু ব্যরউইক পিস্তলবাজদের বিদায় দিতে শুরু করলে একে তো শুভ লক্ষণই বলতে হবে। ও হয়তো অনর্থক সন্দিহান হয়ে উঠছে। শ্যাডকে চাকরি ছাড়ার ব্যাপারে কিছু বলা হয় নি। এদিকে, শুকনো গলায় বলল লরেডো শ্যাড, মিক্সাসরা দুভাই আবার আজ সকালে ফিরে এসেছে, সোজা বারউইকের অফিসে ঢুকেছে ওরা।

ওরা আবার কারা?

খুনী। গুমখুনে, ওস্তাদ বলা যায়। একজনের নাম বীন, অন্যজন অ্যাবেল। স্যান্দো ভ্যাল দাঙ্গায় ছিল ওরা। ওই ঘটনায় অনেক লোক প্রাণ হারিয়েছিল। ও, হা, তখন বারউইকও ছিল ওখানে। আসল কথা, সেখানেই প্রথম আমার সঙ্গে তার পরিচয়।

তুমিও ছিলে ওই হাঙ্গামায়?

হুম। রয় গ্যাবলের সঙ্গে ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়েছিলাম। গ্যাবল ছিল দুর্ধর্ষ আউট-ল, বেশ বড়সড় একটা দলের সর্দার। লড়াইতে জড়িয়ে পড়ায় খুব খারাপ অবস্থা যাচ্ছিল তার। আমার কাছ থেকে একটা বাছুর ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে আমি বাধা দিই, আমাকে গানফাইটে চ্যালেঞ্জ করে বসে সে। একেবারে মন্থর ছিল লোকটা।

ব্যাপারটা দুর্বোধ্য কয়েকজন গানম্যান বিদায় নিল, তারপর আরও দুজন হাজির হলো। এমনও হতে পারে পরিকল্পনা পরিবর্তনের আগেই ওদের দুভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বারউইক? সম্ভব। সম্ভাবনার কথা লরেডো শ্যাডকে বলল কেড্রিক। সন্দেহের সঙ্গে মাথা দোলাল টেক্সান।

তা হতে পারে, কিন্তু আমার সন্দেহ আছে। বারউইককে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। তোমার গুন্টার খুব একটা ভাল মানুষ নয়; আর কীথ, ভাবতে গেলে আগাগোড়া বদমাশ; কিন্তু ওদের কারোই বারউইকের ধারে কাছে ঘেঁষার সাধ্য নেই-অন্তত কূট-বুদ্ধির দিক দিয়ে।

.

নানা দিক থেকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা খুঁজে পেল কেড্রিক। এদিকে ম্যাকলেনন আর সেগালের সঙ্গে দেখা করার কথাও অপরিবর্তিত রয়েছে। আলোচনা থেকে সমাধানের একটা উপায় বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা আছে। এক্ষেত্রে বারউইককে সন্দেহ করার কোনও কারণ দেখছে না ও।

রোদ ঝলমল সকাল, উত্তপ্ত একটি দিনের আগমন বার্তা ঘোষণা করছে। রাস্তায় বেরিয়ে এল কেড্রিক। এখনও শীতের আমেজ যায় নি, রোদের উত্তাপ উপভোগ করছে ও। রাস্তা পেরিয়ে ছোট্ট রেস্তরাঁয় ঢুকল, নিঃশব্দে খাওয়া সেরে নিল। একদফা কফি শেষ করে দ্বিতীয় বারের মতো কাপ ভরে চুমুক দিচ্ছে, এমন সময় রেস্তরাঁয় ঢুকল, সামান্থা ফক্স।

কেড্রিকের দিকে চোখ পড়তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওর চোখমুখ, হাসল। সোজা কেড্রিকের টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। এখানে তুমি একটা দর্শনীয় বস্তু জানো সেটা? ওই প্রাচীন পাথুরে বাড়ি আর বুড়ো নোংরা লোকটার চেহারা দেখতে দেখতে কাহিল হয়ে গেছি। দম বন্ধ হবার যোগাড় হয়েছে। ঝামেলাটা চুকে গেলে বেঁচে যেতাম।

সামান্থার দিকে তাকাল কেড্রিক। কী করবে তারপর?

কী জানি, এখনও কিছু ঠিক করি নি। এদিকে আশপাশে কোথাও একটা র‍্যাঞ্চ কিনব ভাবছি। ওখানে অনেক গাছ থাকবে, থাকবে ঘাসআর পানি। জায়গাটা যে খুব বড় হতে হবে তেমন কোনও কথা নেই।

গরু পুষবে না?

পুষব, তবে অল্প। আমার শখ ঘোড়া। তোমার অ্যাপাসার মতো। অসংখ্য ঘোড়া থাকবে আমার।

চমৎকার। ঘোড়া পোষার জন্যে খুব বেশি জায়গার দরকারও হয় না। ভালো ঘোড়ার বাজার দর চড়া। কিছুক্ষণ সামান্থার সৌন্দর্য উপভোগ করল পল কেড্রিক; মেয়েটার চেহারার লাবণ্য, দুচোখের সরল দৃষ্টি মুগ্ধ করল ওকে। তুমি এখানে থাকবে শুনে কেন যেন খুব খুশি লাগছে। এর পর আর তোমাকে ছাড়া আমার ভালো লাগত না।

চট করে কেড্রিকের দিকে তাকাল সামান্থা, হাসিতে নাচছে চোখজোড়া। আরে, তুমি দেখছি আর সব কাউবয়দের মতো, প্রেম নিবেদন করতে চাইছ!

না, সামান্থা, শান্ত কণ্ঠে বলল কেড্রিক, তা নয়, তোমাকে সত্যি ভালোবাসি আমি, এতে কোনওরকম সন্দেহের অবকাশ নেই! একদিন বুঝবে আমি মিথ্য, বলি নি।

আমারও মনে হচ্ছে তুমি সত্যি কথা বলছ, বলল সামান্থা ফক্স।

ওদিকে পশ্চিমে, বলল কেড্রিক, ঠিক পশ্চিমে নয়, উত্তর-পশ্চিমে কয়েক মাইল দীর্ঘ একটা রিম আছে। রিমের চূড়ায় অপূর্ব পাইনের বন। গাছ, পানি, বুনো-জন্তু জানোয়ার আর নয়ন জুড়ানো সবুজ মাঠ, সবই আছে ওখানে। অমন দৃশ্য মানুষ খুব কম দেখেছে। ওদিকে একটা জায়গা চিনি আমি, একবার ক্যাম্প করেছিলাম। মিঠে পানির ঝর্না; লম্বা লম্বা ঘাস, সারাক্ষণ হাওয়ায় দুলছে; আর বিস্তীর্ণ সমভূমি, বন-কী নেই?

ইশ, শুনেই লোভ লাগছে। এখানে আসার পর থেকে এমন একটা জায়গাই খুঁজছি! চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল কেড্রিক। আমার কাজ শেষ হোক, তোমাকে নিয়ে যাব, কেমন? জায়গাটা দেখবে।

কেড্রিকের দিকে তাকাল সামান্থা ফক্স। ঠিক আছে, পল, আমরা দুজন একসঙ্গে যাব ওখানে।

টুপি হাতে থমকে উঁড়াল কেড্রিক, দরজা দিয়ে বাইরে চোখ ফেরাল। হ্যাঁ, একসঙ্গে বিড়বিড় করে বলল ও। তারপর চোখ নামিয়ে সামান্থার দিকে চাইল। বুঝলে, সামা, একসঙ্গে শব্দটার চেয়ে সুন্দর শব্দ আর নেই…।

রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে আসার পথে দুজনের খাবারের দাম চুকিয়ে দিল কেড্রিক। উত্তপ্ত রাস্তায় দাঁড়াল মুহূর্তের জন্যে। একটা বাকবোর্ড এসে থামল স্টোরের সামনে। একজন লোক নামল, সতর্ক ভাবভঙ্গি, সন্ত্রস্ত দৃষ্টি। হঠাৎ ঘাড় ফিরিয়ে কেড্রিকের দিকে তাকাল সে, তারপর স্যাৎ করে ঢুকে পড়ল দোকানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *