০৬. মাস্ট্যাংয়ে ফিরল না পল কেড্রিক

মাস্ট্যাংয়ে ফিরল না পল কেড্রিক। একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছে, সেটা সফল করতে হবে। উত্তর-পশ্চিমে বাঁক নিয়ে ইয়েলো বাট আর মাস্ট্যাংয়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে চলল। এখানকার অধিবাসীদের সম্পর্কে এত কথা উঠেছে যখন, ওদের আবাসস্থল নিজের চোখে দেখতে চায়, ও। জীবন যাপনের কায়দা দেখলে ওদের আসল পরিচয় স্পষ্ট হয়ে যাবে। সকালের কাঁচা রোদে আরামদায়ক উষ্ণতা। এগিয়ে চলল পল কেড্রিক। কিছুক্ষণ পর গতি কমিয়ে আনল ও, হাঁটিয়ে নিয়ে চলা অ্যাপলুসাকে। চারদিকে সতর্ক নজর বোলাচ্ছে।

এটা আর যাই হোক জলাভূমি নয়। অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে কোম্পানি মিথ্যে তথ্য সরবরাহ করেছে। জায়গাটা জনবসতিহীন, এটাও সত্যের অপলাপমাত্র। অবশ্য স্কোয়াটাররা আদতেই বাজে লোক হলে, ওকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। পুরো ব্যাপারটা ইতিমধ্যে বিরক্তি ধরিয়ে দিয়েছে; কিন্তু কোম্পানির কাছে ঠেকে আছে ও, কাজ ছাড়তে গেলে সব টাকা ফিরিয়ে দিতে হবে-এই মুহূর্তে এতগুলো টাকা জোগাড় করা রীতিমত অসম্ভব। তা ছাড়া, চিন্তাটা হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল, এখানে সামান্থা ফক্স আছে…।

কর্মময় জীবনে অসংখ্য মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ পেয়েছে পল কেড্রিক, কিন্তু নির্দিষ্ট কারও প্রতি কখনও তেমন দুর্বলতা বোধ করে নি, অবশ্য তাদের মধ্যে সামান্থার মতো দীর্ঘাঙ্গী, প্রিয়দর্শিনী ছিল না কেউ। কোম্পানির জন্যে নয়, সামান্থাকে আরেকবার দেখবে বলেই মাস্ট্যাংয়ে ফিরে যাবে ও আরেকটা কারণ আছে, ওর নির্দেশ উপক্ষো করেছে উরনি শ, রবার্টসকে খুন করা হয়েছে, হামলা চালানো হয়েছে, ইয়েলো বাট শহরে; ওরা হয়তো ধরে নিয়েছে পল কেড্রিক বেঁচে নেই; ওদের ভুল ভেঙে দিতে হবে।

উত্তরে ঘোড়া ঘোরাল কেড্রিক, সেঝোঁপ আর ক্যাট-ক্ল গাছের মাঝে পথ করে আকাশ-ছোঁয়া জোড়া নীল-পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলল। উত্তরে এই এলাকাটিকে দেয়ালের মতো ঘিরে রেখেছে রিম-দেয়ালের এপাশে ওগুলো ছাড়া আর কোন পাহাড় নেই। বাঁ দিকে এবড়োখেবড়ো প্রান্তর, একটা গভীর ক্যানিয়নও আছে। অ্যাপলুসাকে ঘুরিয়ে ক্যানিয়নের দিকে এগোল কেড্রিক। আচমকা লাগাম টেনে ধরল, দাঁড়িয়ে পড়ল ঘোড়াটা।

সামনে মাটিতে একটা ছুটন্ত ঘোড়ার ট্র্যাক্ট দেখা যাচ্ছে। এই ছাপ কেড্রিকের চেনা।

ইয়েলো বাটে যাবার সময় পথে একজন অজ্ঞাত ঘোড়সওয়ার ওদের ওপর নজর রাখছিল। এটা তারই গ্ৰল মন্টংয়ের ট্র্যাক। ঘোড়াটা এদিকে গেছে বেশিক্ষণ হয়নি।

এবার আরও ধীর গতিতে এগোল কেড্রিক। ক্যানিয়নে ঢুকে অন্য দিকে বেরিয়ে এল। সামনে, ঘাসে ছাওয়া. বিরাট মাঠ, ক্ষুদে একটা ঝর্না বয়ে যাচ্ছে মাঠের বুক চিরে। দূরে এক কোণে একটা পাথুরে কুটির। এ-তল্লাটের অন্যান্য ঘর-বাড়ির তুলনায় সুন্দর এবং আকর্ষণীয়। সামনে ট্রেইল দেখে সময় নষ্ট করল না কেড্রিক, ঘোড়া নিয়ে মাঠের ওপর দিয়ে কুটিরের দিকে এগিয়ে গেল।

স্যান্ডস্টোন ব্লকের দেয়াল আর শনের ছাউনি দেয়া, কুটিরটা দেখলে মুগ্ধ হতে হয়। উঠোনে ছায়া বিলোচ্ছে শেড গাছ। ছ-সাতটা মুরগী আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খাবার খুঁটে খাচ্ছে। করালে কয়েকটা ঘোড়া আছে। জিন চাপানো গ্রাটা চোখে পড়তেই ধক করে উঠল বুকটা। কারও জন্যে যেন অপেক্ষা করছে ওটা।

কুটিরের দরজার সামনে রাশ টেনে ঘোড়া থামাল প্রল কেড্রিক, স্যাডল থেকে নামল, লাগামটা জড়িয়ে দিল পয়েলের সঙ্গে। এই সময় হঠাৎ দরজা খুলে কড়াই হাতে একটা মেয়ে বেরিয়ে এল। কেড্রিককে দেখে চমকে উঠল সে! মুহূর্তে তাকে চিনতে পারল পল। স্যু লেইন, এর সাথেই ট্রেইলে দেখা হয়েছিল। ডরনি শ নাকি এই মেয়েটার প্রতি দুর্বল।

তুমি! কেড্রিকের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ঢোক গিলল স্যু লেইন! তুমি না মারা গেছ?

কাঁধ ঝাঁকাল কেড্রিক। মারা যাই নি, খিদেয় কাহিল। খাওয়ার কিছু আছে?

ঝাড়া এক মিনিট ওর দিকে চেয়ে রইল স্যু লেইন, তারপর মাথা দোলাল। এসো, ভেতরে এসো। ঘোড়াটা বেঁধে রাখো, নইলে সোজা মাঠে চলে যাবে। তোমার আবার, শুকনো শোনাল ওর কণ্ঠস্বর, যে কোনও মুহূর্তে ওটার দরকার হতে পারে। জায়গাটা তোমার জন্যে নিরাপদ নয়।

মাস্ট্যাংয়ের পাশেই অ্যাপলুসাকে বাঁধল কেড্রিক, তারপর স্যু লেইনের পিছু পিছু ঘরে ঢুকল। তাই নাকি? বলল ও, আমার তো ধারণা ছিল কোম্পানির সঙ্গে তোমার ঠিক বিরোধ নেই।

এসব কথা বলে না! ধমকে উঠলস্যু লেইন। কক্ষনো না! গলা নামাল সে, তারপর আবার বলল, এখানে অন্তত নয়। ভাইয়ের কানে গেলে…!

তার মানে বোনের সঙ্গে পিট লেইনের বনিবনা নেই? কৌতূহলের বিষয়। হাতে মুখে পানি ছিটিয়ে চুল আঁচড়ে নিল কেড্রিক।

বিরক্তির সঙ্গে খোঁচা খোঁচা দাড়ি ভরা গাল চুলকাল ও। তোমার ভাইয়ের ক্ষুর আছে? এভাবে থাকতে আর ভালো লাগছে না।

 জবাব না দিয়ে ক্ষুর এনে দিল স্যু লেইন। শেভ করে হাত মুখ ধুয়ে আবার ঘরে ঢুকল কেড্রিক। পরিপাটি করে সাজানো কামরা; একটা সাইড টেবিলের ওপর কয়েকটা বই সাজিয়ে রাখা, নকশা তোলা পর্দা ঝুলছে জানালায়, গোটাকতক তামার বাসন দেয়ালে ঝুলিয়ে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল পল কেড্রিক। প্লেটে খাবার বেড়ে দিল স্যু লেইন। গরুর মাংস, ডিম, রুটি আর মধু।

গরু খোঁজা খুঁজছে তোমাকে সবাই, বলল স্যু লেইন, আচ্ছা, ছিলে কোথায়?

স্যু লেইনের বক্তব্যের প্রথম অংশ বিশ্বাস করল কেড্রিক, প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল।

রবার্টস খুন হওয়ার পর ইয়েলো বাট থেকে পালানো ছাড়া উপায় ছিল। লুকিয়ে ছিলাম। পরের ঘটনা কী?

শেষবারের মতো নোটিস দিয়েছে কর্নেল কীথ। ভালোয় ভালোয় আমরা সরে না গেলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে। কীথের কথা মানতে অস্বীকার করেছে বব ম্যাকলেনন।

ঠিক করেছে।

ঝট করে কেড্রিকের দিকে তাকাল স্যু লেইন, দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা। তুমি একথা বলছ? তুমি না কোম্পানির লোক?

খাবার থেকে মুখ তুলে স্যু লেইনের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। কোম্পানির লোক হই আর যা হই খুন-খারাবীতে আমার মত নেই। মানুষকে তার ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করারও পক্ষপাতি নই আমি।

এমনিতেই তো ওখানে থাকতে পারবে না ওরা। জায়গাটাকে সরকার। ইন্ডিয়ান রিজারভেশন, ঘোষণা করলে সবাইকে জোর করে সরিয়ে দেয়া হবে। খামোকা, বোকার মতো লড়ছে।

কিন্তু তখন সরকার জমির বিনিময়ে টাকা দেবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে।সে যা হোক, কোম্পানি অনেক তথ্য গোপন করেছে-মিথ্যে বলেছে; আমাদের কাছে, সরকারের কাছে তো বটেই।

কেড্রিকের সামনে এসে বসল স্যু লেইন তাতে কী? শেষ পর্যন্ত ওরাই জিতবে। টাকা, প্রভাব, ক্ষমতা-কী নেই ওদের? আর সেটলারদের কী আছে? ঘোড়ার ডিম! তিক্ত চেহারায় কামরার চারদিকে চোখ বোলাল মেয়েটা। হয়তো ভাবছ, আপন লোকদের বিরোধিতা করছি আমি; তা ঠিক নয়। আসলে এদের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। আমরা দুভাই-বোন এখানকার মানুষ নই, হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু পিট সেটা বোঝে না! আচ্ছা, তুমিই বলো, এই কাঠখোট্টা একটা জায়গায় সারা জীবন খেটে মরতে হবে, এটা সম্ভব?

কেড্রিকের দিকে ঝুঁকে এল, স্যু লেইন। শোনো, ক্যাপ্টেন কেড্রিক। তুমি আসলে কীথদেরই একজন। ডরনি শয়ের মতো নগণ্য, ভাড়াটে গানম্যান নও। আশপাশের লোকদের বশ করার মতো ক্ষমতা তোমার আছে। কীথকে সামলানোও তোমার জন্যে কঠিন হবে না। দেখো, ইচ্ছে করলেই কিন্তু বিরাট কিছু হতে পারো তুমি?

বোকামি করছ কেন তা হলে? কী লাভ ওসব কথা ভেবে? এইসব রাখাল আর চাষার দলের কাছে তোমাকে দেয়ার মতো কিছু নেই। নিজেরাই দুবেলা খেতে পায় না, তোমাকে দেবে কোত্থেকে? তার চেয়ে কোম্পানির সঙ্গে থাকো, শেষ পর্যন্ত কোম্পানিই জিতবে; তোমার ভাগেও লাভের অংশ পড়বে। বোকামি করো না, ক্যাপ্টেন-কোম্পানিতে থেকে ওদের হয়ে কাজ করে যাও।

টাকাই সব নয়, বলল পল কেড্রিক, আত্মসম্মান বলে একটা কথা আছে।

চোখ বড় করে ওর দিকে তাকাল সু লিইন। এসব কথা মন থেকে বিশ্বাস কর না নিশ্চয়ই? তোমার ওই আত্মসম্মান নামক বস্তুটি দিয়ে দোকানে গিয়ে একবার খাবার, কেনার চেষ্টা করো। এক দানা গমও পাবে না। কিন্তু কথা তা নয়। তুমি কী করবে সেটা তোমার ইচ্ছে। কিন্তু আমি এমন একজন পুরুষকে চাই যার আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা আছে। চট করে উঠে দাঁড়াল স্যু লেইন, টেবিল ঘুরে কেড্রিকের কাছে এল। ক্যাপ্টেন, তুমি পারো না? ইচ্ছে করলেই তো এখানে বিরাট কিছু হতে পারো, তাই না?

স্যু লেইনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল পল কেড্রিক। তোমার নজর অনেক ওপরে মনে হচ্ছে?

হবে না কেন? একটা সাধারণ র‍্যাঞ্চারের বউ হয়ে জীবন যাপন করতে চাই না আমি। এখান থেকে দূরে কোথাও যেতে চাই, উপভোগ করতে চাই জীবনকে। কেড্রিকের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকাল স্যু লেইন। একটু বুদ্ধি  খাটালেই গুন্টার বা কীথ এমনকি বারউইককেও পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারবে। অবশ্য বারউইকের সঙ্গে পেরে ওঠা একটু কঠিন হরে; কিন্তু অসুবিধে নেই, আমি উপায় বাতলে দেব।

তুমি? মাথা তুলে তাকাল কেড্রিক। ওর একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা, তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে। স্যু লেইন, অস্বীকার করার জো নেই, সুন্দরী এবং আকর্ষণীয়। রীতিমত অস্বস্তিতে পড়ে গ্লেল: কেড্রিক। ওর অবস্থা বুঝতে অসুবিধে হলো না সু, লেইনের। তা শুনি, কীভাবে?

মাথা নাড়ল স্যু লেইন। উঁহু, আগে বলো তুমি আমার দলে, তারপর বলব। তবে মনে রেখো, জন গুন্টার একটা নিরেট গর্দভ। টাকার দরকার ছিল বারউইকদের, গুন্টার সামান্থার টাকা পয়সার হিসেব রাখে, তাই দলে টেনে নিয়েছে। কীথ বিপজ্জনক লোক, অনেক বড় হওয়ার ইচ্ছে তার অন্তরে দয়া মায়ার বালাই নেই। কিন্তু আসল চীজ হলো বারউইক, ঝামেলা মিটে যাবার পর সবার ওপর মাথা তুলে দাঁড়াবে সে, নিশ্চিত থাকতে পারো। ভেবে-চিন্তে, হিসেব করে কাজ করে।

অনেক খবর রাখো দেখছি।

হ্যাঁ! লোকেরা আমায় পছন্দ করে, আমাকে খুশি করার জন্যে নানান কথা শোনায় তারা, আমিও প্যাঁচ কষে, অনেক কথা বের করে নিই-ওরা বুঝতে পারে না। এবং কিছুই আমি ভুলি না।

আমাকে সব বলে দিচ্ছ যে?

কারণ তুমি ছাড়া আর কাউকে দিয়ে কাজ হবে না। ওদের সবকটাকে লাইনে রাখা একমাত্র তোমার পক্ষেই সম্ভব। ডরনি শও তোমার নির্দেশ মানতে বাধ্য হবে-যদিও ও তোমাকে বিশ্বাস করে না।

বিশ্বাস করে না? কেন?

ডাই রীডকে তোমার কামরা থেকে বের হতে দেখেছে ডরনি, তোমার ওপর নজর রাখছিল সে।

আচ্ছা, এই ব্যাপার?

কিন্তু ওর ওপর নজর রাখতে গেল কেন ডরনি? কী ভাবছে লোকটা? ডাই রীডের সঙ্গে ওর সাক্ষাতের কথা কীথকে জানিয়েছে?

খাওয়া শেষ করে সিগারেট ধরাল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। ট্রেইলে প্রথম দেখার পর থেকেই এই মেয়েটা ওকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। এ-রকম একটা মেয়ে এমন হীন স্বার্থপর বিশ্বাসঘাতক হতে পারে বিশ্বাসই হতে চায় না। হালকা পাতলা সুনয়না কিশোরীর মতো মেয়েটিকে দেখলে কে বলবে পেটে পেটে এত প্যাঁচ তার!

বোঝা যাচ্ছে স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হিশেবে ওকে বেছে নিয়েছে মেয়েটা। আরও কতজনকে এইভাবে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছে কে জানে?

আচ্ছা, তোমার ভাইটিকে দেখছি না যে? বাড়ি নেই? জিজ্ঞেস করল পল কেড্রিক।

সতর্ক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল স্যু লেইন। ওর সঙ্গে দেখা করার কিংবা কথা বলার দরকার নেই তোমার। তুমি এবার যাও।

কিন্তু, আমি সত্যিই পিটের সঙ্গে আলাপ করতে চাই, সু। ছেলেটার কথা অনেক শুনেছি, পরিচিত হতে ইচ্ছে করছে।

তুমি যাও, সতর্ক করে দিল স্যু লেইন। একটু পরেই, পিট ফিরে আসবে, ইয়েলো বাটের লোকজনও থাকবে ওর সঙ্গে!

তার মানে ও নেই? তা হলে বাইরে ঘোড়াটা কার? ওই গুলা মাস্ট্যাংটার কথা বলছি।

চোখের পলকে বদলে গেল স্যু লেইনের চেহারা, মাথা নাড়ল। আমাকে মিথ্যেবাদী ভাবতে পারো, কিন্তু সত্যি বলছি, জানি না। ওটার আরোহীকে আমি কখনও দেখি নি।

স্যু লেইনের চোখের দিকে তাকাল পল কেড্রিক। মেয়েটা বোধ হয় সত্যি কথাই বলছে। দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে একটু যেন ভয় পেয়েছে সে। ঘোড়াটা একজন বেঁধে রেখে গেল আর তাকে দেখলে না?

ঠিক। পিট বেরিয়ে যাবার খানিক পর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি ঠিক ওইখানে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়াটা। এবারই কিন্তু প্রথম নয়। আগেও দুবার এখানে এসেছে ওটা। কোনওবারই পিট ঘরে ছিল না। এখানে আরও অনেকে দেখেছে ওই ঘোড়া। ঘরে পুরুষ মানুষ না থাকলেই কেবল ওকে দেখা যায়। মিসেস বার্ট উইলিয়ামস বলেছে একদিন প্রায় তিন ঘণ্টা ওদের করালে ছিল গ্রাটা।

ঘোড়াটা ফেরত নেবার সময়ও কেউ দেখে নি মালিককে? তা কী করে হয়?

অথচ তা-ই হচ্ছে। এখন যেমন দাঁড়িয়ে আছে, তেমনি দাঁড়িয়ে-ইয়াল্লা, ওটা চলে গেছে!

চমকে উঠে দাঁড়াল পল কেড্রিক, দরজা দিয়ে বাইরে তাকাল। স্যু লেইনের কথা সত্যি প্রমাণ করে বাতাসে মিলিয়ে গেছে ইঁদুর-রঙা ঘোড়াটা। ওর অ্যাপলুসা আগের মতোই, ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, এটা নেই।

উঠোনে এসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। কিন্তু সমভূমি বা পাহাড়ের গায়ে কোনওরকম নড়াচড়া চোখে পড়ল না। সত্যি মিলিয়ে গেছে ঘোড়াটা স্যুর দিকে ফিরল ও, হতভম্ব চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। অ্যাপলুসার দিকে পা বাড়াল পল। স্যাডলের সঙ্গে পিন দিয়ে একটা কাগজ সাটা রয়েছে। খুলে নিয়ে পড়ল ও। কাছে এসে দাঁড়াল স্যু লেইন, কাগজটা তার হাতে তুলে দিল।

দূরে থাকো!

কাঁধ ঝাঁকাল কেড্রিক। তোমার ভাইয়ের কাজ?

না! ঘোড়ার কথা আমার কাছেই শুনেছে ও, আমার চেয়ে বেশি কিছু জানে। তা ছাড়া, এটা ওর লেখা নয়, পিট লেখাপড়া জানে না, লিখবে কীভাবে?

ম্যালপাই ক্যানিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পরেও অনেকক্ষণ অদ্ভুত ঘোড়াটা নিয়ে মাথা ঘামাল পল কেড্রিক। কেউ একজন পরিকল্পিতভাবে স্কোয়াটারদের বিভ্রান্তিতে ফেলে আতঙ্কিত করে তোলার চেষ্টা করছে। কোম্পানির এমন কিছু করার কথা নয়; এমন, কেউ করছে কাজটা যার হাতে অপচয় করার মতো অঢেল সময় আছে।

উত্তরে ব্লু হিলের উদ্দেশে ঘোড়া ঘুরিয়ে এগোল কেড্রিক, তারপর পুবে বাঁক নিয়ে ওল্ড মরমন ট্রেইল পেছনে ফেলে রিম ঘেঁষে এগিয়ে চলল।

চারদিকে ঘাসে ছাওয়া ময়দান। যেদিকে তাকাও, ঘাস আর ঘাস এরকম জায়গায় নির্ঝঞ্ঝাটে বড়সড় একটা গরুর পাল চরানো সম্ভব-সবুজ সতেজ ঘাস খেয়ে অল্পদিনেই তাগড়া হয়ে উঠবে ওগুলো। রিম, আছে বলে গরু সামলানোর কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে। রিমই প্রাকৃতিক বেড়ার কাজ করবে, গরু, বাছুর হারিয়ে যাবার আশঙ্কা থাকবে না।

সল্ট ক্রিক লেকে পৌঁছে ক্রিক ধরে নদীর এদিকে এগোল কেড্রিক, কিছুক্ষণ পর আবার পুবে বাঁক নিল, চিমনি রকে এসে ওটাকে পেছনে ফেলে দক্ষিণ-পুবে হগব্যাক ট্রেইল পর্যন্ত একনাগাড়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে চলল; তারপর রিজ পেরিয়ে মাস্ট্যাংয়ের উদ্দেশে পুব দিকে পূর্ণ গতিতে ছুটল।

বরাবরের মতো সতর্ক সজাগ দৃষ্টি ওর। কখনও কখনও হয়তো নিংর, কঠিন, তবু এদেশকে ভালোবাসে ও এখানকার নীল-আকাশ আর পাহাড়-পর্ত, দূরান্তের কুয়াশা; এদেশের সকাল-সন্ধ্যার মায়াবী পরিবেশ, সবুজ ঝোঁপঝাড় আর রক্তের মতো লাল চুনাপাথরের টিলা-সবই ওর ভালোবাসার সম্পদ।

কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না পল কেড্রিক। গুন্টারের কাছে ওর দেনা সিন্দাবাদের বুড়োর মতো ঘাড়ে চেপে আছে; তা ছাড়া আরও কিছু ব্যাপার রয়েছে। ঝামেলায় জড়াতে চায় না ও, কিন্তু এখন কাজ ছাড়তে গেলে ঝামেলা হবে এবং তারপর এখানে থাকলে আরও মুশকিল; অথচ সেরকমই ওর ইচ্ছে। কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করা। যায়, কিন্তু তাতে লাভ হবে না, জানা কথা।

কিন্তু এখানে সামান্থা ফক্সের ভূমিকা কী? ও যা ভাবছে, তার চেয়েও গম্ভীরভাবে জড়িয়ে আছে? নাকি ব্যাপারটা খুবই সাধারণ: শুধু ওর টাকাটা মামা ব্যবসায় খাটিয়েছে? তেমন হলে এই অবস্থায় সুযোগ পেলেও সরে দাড়ানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

বারউইক এখনও দুর্বোধ্য রয়ে গেছে ওর কাছে। লোকটার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অসীম। কিন্তু ওই ক্ষমতার উৎস কোথায় বোঝার উপায় নেই। দেখলে একেবারে সাধারণ মনে হলেও এটা তার আসল চেহারা নয়। পরিষ্কার বোঝা যায়, কীথ বা গুন্টার তাকে সমীহ করে চলে।

স্যু, লেইনের সঙ্গে কথা বলার সময় ইয়েলো বাট মেসার কাছে ওর আত্মগোপনের জায়গার কথা এড়িয়ে গেছে কেড্রিক। মেয়েটা এমনিতেই এমন কিছু কথা জেনে গেছে, যা বিপদ ডেকে আনতে পারে। তা ছাড়া, জায়গাটা যে, কোনও সময় আবার কাজে লাগতে পারে। সুতরাং ওটার কথা গোপন রাখাই ভালো।

কেড্রিক যখন মাস্ট্যাংয়ে পৌঁছুল, পুরো শহর ঘুমে বিভোর। সোজা আস্তাবলের দিকে এগিয়ে গেল ও। ঘোড়াকে একটা স্টলে রেখে জিন-লাগাম। খুলে ভালো করে দলাইমলাই করল, ছোলা আর খড় খেতে দিল। তারপর আস্তাবল থেকে বেরিয়ে নিঃসাড়ে সেইন্ট জেস-এর উদ্দেশে এগোল। হোটেলের কাছে আসতেই বারান্দার চেয়ারে বসা লম্বা একহারা গড়নের এক লোক উঠে দাঁড়াল। সেদিন এই চেয়ারেই বসেছিল কেড্রিক। শারীরিক গঠন, মাথার চওড়া ব্রীমের টুপি আর পিস্তল ঝোলানোর কায়দা দেখে লরেডো শ্যাডকে চিনতে পারল কেড্রিক।

ক্যাপন? চাপা কণ্ঠস্বর। ভালো আছ?

হ্যাঁ। তুমি?

হাসল শ্যাড। আমার কথা ভাবতে হবে না। আমি সুস্থ! ইঙ্গিতে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিল লরেছো শ্যাড। বসো। তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম ফিরে আসবে।

অন্যরা কী বলছে? কী ভারছে ওরা, আমি পটল তুলৈছি নাকি পালিয়েছি?

কেউ এটা, কেউ ওটা। এদিকে কীথের তো পাগল হওয়ার দশা। তুমি ফেরামাত্র দেখা করতে বলে দিয়েছে-রাত দুপুরে হলেও।

এখন পারর না। অসম্ভব ক্লান্ত।

মাথা দোলাল শ্যাড, তারপর নিভে যাওয়া সিগারেটটা ধরাল। বুঝলে ক্যাপন, ব্যাপারস্যাপার এখন আর সুবিধের মনে হচ্ছে না আমার কাছে।

মাথা ঝাঁকাল কেড্রিক। বুঝতে পারছি কী বলছ। মানুষকে ঘর বাড়ি থেকে উৎখাত করার মতো পিশাচ আমিও নই।

কাজ ছেড়ে দিচ্ছ?

এত তাড়াতাড়ি নয়। ওদের সঙ্গে আগে কথা বলে দেখি।

কী লাভ? রক্তের নেশায় পেয়েছে ওদের। ইয়েলো বাট-এর লোকটাকে পয়েনেসট হত্যা করেছে, কিন্তু উস্কানি দিয়েছে ডরনি, শ। পয়েন্সেট লোকটাকে খুন করার পর চার-পাঁচজন সুখ মিটিয়ে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে বেচারার লাশ। ফেসেনডেন অবশ্য গুলি করে নি, গফ করেছে কি না জানি না। তবে বাজি রাখতে পারো, আমার পিস্তল থেকে একটা গুলিও বেরোয় নি। পৈশাচিক ব্যাপার, ক্যাপন, জঘন্য।

এর জন্যে ওদের জবাবদিহি করতে হবে। ইয়েলো বাট হামলায় তুমি, ছিলে?

হ্যাঁ, ছিলাম। কিন্তু আমি গুলি ছুঁড়ি নি। আমি গির্জার পাদ্রী নই, ক্যাপন; কিন্তু যোদ্ধা, অসহায় লোকদের সঙ্গে লড়াই করার রুচি আমার নেই। আর এখনও এত পচে যাই নি যে, মেয়েমানুষ আর শিশুদের ওপর পিস্তল ছুঁড়ব।

এখন কী ভাবছে ওরা? নতুন কোনও পরিকল্পনা?

একটু ইতস্তত করল লরেডো শ্যাড; তারপর কাঁধ ঝাঁকাল। তার চেয়ে তুমি নিজেই ওদের সঙ্গে আলাপ করো, ক্যাপন। কিছু জানলেও অন্তত এই মুহূর্তে মুখ খুলতে চাই না আমি।

 অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল লরেডো শ্যাড। সিগারেট টানল দুজন। হঠাৎ অধৈর্যভাবে বাতাসে হাতের ঝাঁপটা মারল শ্যাড আমি গানম্যান, ক্যাপন, পিস্তল চালানোর জন্যেই আমাকৈ ভাড়া করেছে ওরা। কিন্তু এ রকম কিছু আশা করি নি আমি। বিপক্ষের কয়েকজনকে আমার কাছে আমাদের চেয়ে হাজার গুণ ভালো লোক বলে মনে হয়েছে। ভাবছি, কাজটা ছেড়ে দেব।

আহ্‌-হা, হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল পল কেড্রিক, তোমার কথা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি অন্য একটা উপায়ের কথা ভাবছি। বুঝিয়ে শুনিয়ে গুন্টারদের যদি ক্ষান্ত করতে না পারি, দল পাল্টে বিপক্ষে চলে যাব।

শ্যাড মাথা দোলাল। এই কথাটা কিন্তু আমিও ভেবেছিলাম.।

হঠাৎ ঘাড় ফেরাল কেড্রিক। বড় জোর বিশ ফুট দূরে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে ডরনি শ। আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল পল। লরেডো শ্যাডও দাঁড়িয়ে পড়ল। কেড্রিকের দৃষ্টি এড়িয়ে শ্যাডের দিকে তাকাল ডরনি শ।

সটকে পড়তে চাইলে আগে আমাকে খুন করতে হবে, শ্যাড, মনে রেখো।

প্রয়োজন হলে তাই করব, চট করে জবাব দিল শ্যাড। তোমাকে মারতে আমার হাত কাঁপবে না। এখনই নামতে চাও?

যথেষ্ট হয়েছে, শ্যাড! তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল পল কেড্রিক। আগেও বলেছি, আবার বলছি, আমার দলে মারপিট চলবে না।

আস্তে আস্তে ঘাড় ফিরিয়ে কেড্রিকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল ডরনি শ। এখনও হুকুম দিচ্ছ, আঁ? এ-অবস্থা আর থাকবে না!

হয়তো, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল পল কেড্রিক। যাক গে, আমি এখন ঘরে যাচ্ছি।

কীথ কিন্তু তোমাকে ডেকেছে।

পরে। এখন আমি ক্লান্ত, তাছাড়া তাড়াহুড়োর কিছু নেই। যা বলার সকালেই বলব।

এই কথা তাকে জানাব?

 তোমার মর্জি।

আবার হাসল শ। নিজের দেশে তুমি হয়তো বিরাট কিছু, কেড্রিক। কিন্তু ভুলে যেয়ো না এটা অন্য দেশ। কীথ খেপলে খারাপ হয়ে যাবে। বারউইকের বেলায়ও একই কথা খাটে।

আবার কাঁধ ঝাঁকাল কেড্রিক। ওদের চেয়েও খারাপ লোক আমার দেখা আছে। কিন্তু কাউকে খেপাচ্ছি না আমি। ঘুমোতে যাচ্ছি। কিছু বলার থাকলে সকালে অনেক সময় পাবে কীথ। আমি উঠে পড়ব ততক্ষণে।

চলে যাবে বলে পা বাড়াল ডরনি শ, একটু ইতস্তত করল, তারপর কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসল, তোমার কী হয়েছিল? আমরা তো ভেবেছিলাম মারা গেছ নয়তো ওদের হাতে ধরা পড়েছ।

হঠাৎ সন্দেহ জাগল কেড্রিকের মনে। এই জন্যেই কি ইয়েলো বাটের রবার্টসকে হত্যা করিয়েছে শ? ক্ষিপ্ত সেটলাররা ক্লেড্রিককে হত্যা করবে ধরে নিয়েছিল? খুবই সম্ভব।

বাদ দাও ওসব কথা, সহজ ভঙ্গিতে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল পল। এক জায়গায় গা ঢাকা দিয়েছিলাম আর কি!

ঘুরে হাঁটতে শুরু করল ডরনি শ। কিন্তু কয়েক কদম এগোনোর পরই হঠাৎ কথা বলে উঠল কেড্রিক। ভালো কথা, ডরনি, গ্রুলা মাস্ট্যাং হকায় এমন কাউকে চেনো?

জমে গেল ডরনি শ, কিন্তু ঘুরল না। ওর শরীর যেন পাথরের মূর্তি। এক মুহূর্ত পরেই আবার হাঁটতে শুরু করল সে। না! বলল রুক্ষ কণ্ঠে, চিনি না!

লরেডো শ্যাড তাকিয়ে রইল ওর দিকে। মনে রেখো পার্ডনার, ওই লোকটাকে তোমার একদিন খুন করতে হবে, নইলে নিজেই মারা পড়বে তুমি।

হুম, শান্ত কণ্ঠে বলল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক, আমিও তাই ভাবছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *