০৫. অনড় হয়ে স্যাডলে বসে রইল কেড্রিক

অনড় হয়ে স্যাডলে বসে রইল কেড্রিক। কান খাড়া। নুড়ি পাথর গড়িয়ে পড়ার আওয়াজ ভেসে এল। বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখন, অনর্থক ঝুঁকি নেয়ার উপায় নেই। ফঁদে আটকা পড়ে গেছে ও। কিন্তু ফাঁদ থেকে বেরুতে গিয়ে কাউকে হত্যা করতে চায় না, এবং মরারও ইচ্ছে নেই।

নিঃশব্দে স্যাডল থেকে নামল কেড্রিক। সতর্ক। এই মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে কিছু করতে গেলে বিপদ হবে। হয়তো কিছুই করার উপায় নেই, তবু অভিজ্ঞ মানুষ ও, অতীতে বহুবার এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়েছে, কিন্তু শেষ, পর্যন্ত ঠিকই সব বিপদকে পেছনে ফেলে আসতে সক্ষম হয়েছে। ঠাণ্ডামাথায় ধীরে সুস্থে ভাবতে পারলে এবারও একটা না একটা উপায় বেরোবেই।

অ্যাপলুসার পাশে স্থির দাঁড়িয়ে চারপাশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। ইয়েলো বাটের বিশাল কাঠামোর নীচে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার এতক্ষণে চোখে সয়ে এসেছে। মাথা নামিয়ে পায়ের দিকে তাকাল ও। বালির ধূসর একটা রেখা দেখা যাচ্ছে, কাছেই বেশ বড় বড় বোল্ডার আর ছড়ানো ছিটানো ঝোঁপের মাঝে একটা ফাঁকের ভেতর হারিয়ে গেছে ওটা। ঘোড়া নিয়ে ফোকরটার দিকে পা বাড়াল কেড্রিক।

ফোকরটা এত সংকীর্ণ যে ঘোড়ার্টার এগোতে কষ্ট হচ্ছে। মোটামুটি ফুট বিশেক এগোনোর পর সামান্য চওড়া হলো। বোল্ডারগুলো এখানে কিছুটা ছোট, কোমর সমান উঁচু, আগাছা জন্মেছে ওগুলোর ওপর। অপালুসাও বিপদ টের পেয়েছে বোধ হয়, প্রায় নিঃশব্দে আলতো পায়ে এগোচ্ছে।

অন্ধকারে আক্ষরিক অর্থেই হাতড়ে হাতড়ে এগোচ্ছে পল কেড্রিক। ও নিশ্চিত, বালির-রেখাঁটি পানির স্রোতেই তৈরি হয়েছে, ক্যানিয়নে পানির উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে, ক্লিফের কিনারা দিয়ে উপচে কিংবা কোনও ফোকর গলে এসেছে পানি। ফাঁকটা বের করতে হবে। এগিয়ে চলল কেড্রিক, অসংখ্য বোল্ডারের জটলায় এসে পড়েছে ও, এঁকেবেঁকে বালি রেখা ধরে কোথায় যাচ্ছে জানে না।

দুবার থামল পল, পেছনে গিয়ে টুপির সাহায্যে পায়ের ছাপ মুছে ফেলল। অন্ধকারে কাজ হলো কিনা বোঝার উপায় নেই; তবে ফাঁকটা সরু, ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম। দশ মিনিটের মতো চিপা গলি দিয়ে এগোনোর পর হঠাৎ আবার খাড়া দেয়ালের মুখোমুখি হলো ও। ঢাল বেয়ে, ঝোঁপঝাড় আর পাথরচাইয়ের ভেতর দিয়ে আরেকটা দেয়ালের সামনে এসে পড়েছে।

মাথার ওপর, নাগালের বাইরে ক্লিফের গায়ে একটা নচ দেখতে পেল পল কেড্রিক। ওই ফোকরটা দিয়েই সম্ভবত বালির রেখাটা নেমে এসেছে। এবার সত্যি সত্যি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল কেড্রিক। অ্যাপলুসাকে রেখে. ক্লিফের দেয়ালহাতড়ে ফাটল খুঁজতে শুরু করল।

বাঁ দিকে কিছুই পাওয়া গেল না। বার কয়েক পঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল। ক্যানিয়নের মুখ থেকে কোনওরকম শব্দ আসছে না। এটা বক্স ক্যানিয়ন হলে ইয়েলো বাটের লোকদের অজানা থাকার কথা নয়। সেক্ষেত্রে অন্ধকারে ভেতরে ঢোকার ঝুঁকি না নিয়ে ভোরের অপেক্ষা করবে ওরা। রাতের অন্ধকারে এখানে চমৎকার প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব। তবু বলা যায় না, প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলছে লোকগুলো, এই মুহূর্তেও ছুটে আসতে পারে।

ফিসফিস করে ঘোড়াকে সান্ত্বনা দিয়ে দেয়াল ঘেষে এবার ডানে এগোল কেড্রিক। খানিকটা এগোনোর পর হঠাৎ দেখল পায়ের নীচের মাটি ঝুপ করে নীচে নেমে গেছে। একটা গহ্বরে নেমে এল পল। ঠাণ্ডা, সঁতসেঁতে একটা ভাব এখানে। কাছেপিঠে ঝর্না আছে হয়তো, যদিও পানি গড়ানোর শব্দ পেল ও।

গহ্বরে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডার মধ্যেও দরদর করে ঘামছে ক্যাপ্টেন কেড্রিক। অনড় দাঁড়িয়ে কান খাড়া করল ও, ঘামে ভেজা মুখ মুছল। আচমকা বাতাসের মৃদু ছোয়া লাগল মুখে।

চমকে উঠল কেড্রিক। নতুন আশা জাগল বুকে। ঘুরে দঁাড়িয়ে অদম্য উৎসাহে পাহাড়ী-দেয়ালে সন্ধান চালাল, কিন্তু আকস্মিক হাওয়ার উৎস খুঁজে পাওয়া গেল না। এবার আরও সাবধানে এগোল ও হঠাৎ বুঝতে পারল নীচের শক্ত মাটি সামান্য খাড়া হয়ে উপর দিকে উঠে গেছে। পায়ে পায়ে ক্লিফের চূড়ার দিকে এগোল পল কেড্রিক, হাতে রাইফেল ধরা।

ঢালের মাথায় এসে ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাল কেড্রিক। ক্যানিয়নের মুখের কাছে ধূসর বালির রেখা এখান থেকে ফিকে দেখাচ্ছে। এখানে হঠাৎ ঈষৎ বাঁক নিয়েছে ক্যানিয়ন, তারপর কানাগলির মতো শেষ হয়ে গেছে। গলির শেষ মাথায়, ওপরে ক্লিফের কিনারায় একটা নচ। খাড়া একটা ঢাল ক্লিফের চূড়া থেকে নেমে এসেছে। ওখানে রিমের ওপর বাতাসে কোনও কারণে আলোড়ন উঠেছিল হয়তো, সেজন্যেই ওঁর মুখে ছোঁয়া লেগেছে। কেড্রিক লক্ষ্য করল টালটা অসম্ভব খাড়া, ওটা বেয়ে উঠতে গেলে ধস নামকে, এবং তাতে প্রচণ্ড শব্দের সৃষ্টি হবে, ব্যর্থ হয়ে যাবে ওর পালানোর চেষ্টা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ঘেরাও করে ফেলবে ওকে। তা ছাড়া, এতক্ষণে হয়তো রিমের ওপর পাহারা বসানো হয়ে গেছে।

কেড্রিক ঘুরতেই হঠাৎ পা হড়কে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বাঁচার সহজাত প্রবৃত্তির বশেই একটা ঝোঁপের গোড়া আঁকড়ে ধরল। অতল খাদে পড়ে প্রাণ হারানোর হাত থেকে বেঁচে গেল এ-যাত্রা। হাঁচড়ে-পাঁচড়ে শক্ত জায়গায় উঠে দাঁড়াল ও, একটা নুড়ি পাথর ছুঁড়ে দিল নীচের দিকে। অনেকক্ষণ পর ওটার পতনের শব্দ কানে এল পনের থেকে বিশ ফুট গভীর হবে গর্তটা। দেয়ালের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে ঢালের গোড়ায় এসে দাঁড়াল কেড্রিক, নতুন একটা জিনিস ধরা পড়ল চোখে।

বৃষ্টির পানির তীব্র স্রোত মাটির ওপর প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি করেছে এখানে, ফলে চওড়া একটা ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে; হয়তো গিরিখাদের দিকেই গেছে ওটা। এই খাদে আত্মগোপন করার মতো একটা জায়গা না থেকে পারে না। চট করে আবার অ্যাপলুসার কাছে ফিরে এল কেড্রিক।

ঢালটা খাড়াভাবে খাদের তলদেশে নেমে এসেছে। নীচে এর্সে ঘাড় কাত করে ওপরে তাকাল কেড্রিক। কমপক্ষে পনের ফুটের মতো নীচে দাঁড়িয়ে আছে ও মাথার ওপর খাদের সমান প্রশস্ত এক টুকরো তারা-জ্বলা-আকাশ দেখা যাচ্ছে। খাদের সংকীর্ণ তলদেশ ধরে অ্যাাপালুসা নিয়ে আরও নীচে নামতে শুরু করল পল কেড্রিক। খানিক দূর এগোনোর পর দেখল, খাদের দুপাশের দেয়ালের ওপর জন্মানো ঝোঁপঝাড় আর আগাছায় মাথার ওপরের ফাঁক ঢাকা পড়ে গেছে।

চারদিকে অপার্থিব নিস্তব্ধতা। শীত শীত করছে। আরও এগোল পল কেড্রিক। পানির তীব্র স্রোত বাক নিয়ে খাদের দেয়ালে একটা গুহা তৈরি করেছে, কাছে এসে ভেতরে ঢুকে পড়ল ও। গুহার শেষ প্রান্তে একটা ছোট গর্তে পানি জমে আছে। অ্যাপলুসাকে পানি খাওয়ার জন্যে ছেড়ে দিল পল। এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি সাবাড় করল ঘোড়াটা।

ক্যান্টিন থেকে দুটোক পানি খেলো, কেড্রিক। তারপর অ্যাপলুসার পিঠ থেকে স্যাডল নামিয়ে একমুঠো ঘাস দিয়ে ওটার শরীর দলাইমলাই করে দিল। তারপর ঘোড়াকে বেঁধে রেখে কম্বল বিছিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। ভাবছে ও। সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে, এরপরও যদি ধরা পড়তে হয়, গোলাগুলি করা ছাড় উপায়ান্তর থাকবে না এবং তাতে প্রাণহানী ঘটবেই।

বিস্ময়করভাবে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ল কেড্রিক। যখন ঘুম ভাঙল, অ্যাপলুসার হাবভাবে সতর্ক হয়ে উঠল ও। চোখের পলকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। অ্যাপলুসার ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে কথা বলে ওকে শান্ত করল। সকাল হয়েছে। ওপরে, খানিকটা দূর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে।

গুহাটা চুনাপাথরের, প্রায় পনের ফুটের মতো উঁচু, তবে গুহামুখের দৈর্ঘ্য আট ফুটের বেশি হবে না। গুহার খোলা মুখে এসে দাঁড়াল কেড্রিক, যে-পথে এখানে এসেছে, কড়া নজরে সেদিকে তাকাল। যা ভেবেছিল, ক্লিফের মাথার কাছে ওই নচ থেকে নামা পানির তোড়েই এই খাদের সৃষ্টি। বৃষ্টির সময়, সন্দেহ নেই, কানায় কানায় ভরে যায় এটা।

এখানে মাথার ওপরে ডালপালায় খাদের ফাঁক ঢাকা পড়ে গেছে, একটা চ্যাপ্টা পাথর খাদের ওপর সেতু বানিয়ে দিয়েছে। আবার খাদের মুখের দিকে তাকাল কেড্রিক, প্রায় সম্পূর্ণই ঝোঁপের আড়ালে রয়েছে খাদটা বোধ হয় ওকে খুঁজে পাবে না ওরা, ক্ষীণ সম্ভাবনা বেশি কিছু আশা করা ঠিক নয়।

সিগারেটের তেষ্টা পেয়েছে, কিন্তু ধরানোর সাহস হলো না। ধোয়ার গন্ধে ও কোথায় আছে বুঝে যাবে ওরা। কয়েকবার মানুষের গলার আওয়াজ পেল কেড্রিক। দুএকবার খুব কাছে এসেও ফিরে গেল ওরা। গুহার ভেতর চোখ ফেরাল পল। গেল্ডিংটা পানি খাচ্ছে। পরিমাণে সামান্য হলেও, সারারাত গর্তে আবার পানি জমেছে। কেড্রিকের ক্যান্টিন এখনও আধাআধি ভরা, এবং পানি কোনও সমস্যা নয়।

.

হাঁটুর ওপর রাইফেল ফেলে বসে আছে ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। মাঝে মাঝে খাদের গভীরে তাকাচ্ছে। বৃষ্টির পানি এখান থেকে কোথায় যায়? শহরের কাছে গিরিখাদে? তা যদি হয়, এই খাদের কথা শহরবাসীদের অজানা থাকার কথা নয়।

সময় গড়িয়ে চলল। হঠাৎ কখনও মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া গেলেও ওর ধারেকাছে এল না কেউ। খাদটার কথা বোধ হয় কেউ জানে না। কিছুক্ষণ পায়চারি করল কেড্রিক। একটা ঢিবির গা থেকে কয়েক গোছা ঘাস নিয়ে ফিরে এল। অ্যাপিলসাকে দিল ওগুলো। ঘাস খেতে পেয়ে খুশি হয়ে গেল ঘোড়াটা। ব্যাগ থেকে কয়েক টুকরো জার্কি বের করে চিবুতে লাগল কেড্রিক। এক কাপ কফি হলে দারুণ হত, ভাবল।

কিছুক্ষণ পর আবার খাদ ধরে সামনে এগিয়ে গেল কেড্রিক। একটু এগোতেই দেখল, হঠাৎ আরও গভীর হয়ে নীচের দিকে নেমে গেছে ওটা। এখন আর কথাবার্তার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। থামল ন পল। এক জায়গায় এসে আবার ঈষৎ বাঁক নিয়েছে খাদ, পানির তোড়ে বড়সড় একটা গামলার মতো গুহা তৈরি হয়েছে, গুহার ভেতরে আবার বাঁক নিয়েছে স্রোতের পানি, ঢাল বেয়ে আরও গভীরে ছুটে গেছে।

এত দূরে আসার পর আর লোভ সামলাতে পারল না পল কেড্রিক, বড় গুহাটার দিকে এগিয়ে গেল। বিশাল গুহা পাহাড়ের পেটের ভেতর ঢুকে গেছে। এখানে ওখানে পাথুরে তাক, কিন্তু ওগুলোর পানির নীচে কখনও ডুবেছে বলে মনে হলো না। গুহার তলায় একটা ছোট্ট পুকুর মতো রয়েছে, পুকুরের তলদেশে বিরাট বিরাট ফাটল, সমস্ত পানি ওই ফাটলগুলো দিয়েই বেরিয়ে যায়।..

যদিও খুব একটা ভেতরে ঢোকে নি, কিন্তু বেরুনোর দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেল কেড্রিক; বাতাস স্থির হয়ে আছে। তবু, এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে কেড্রিকের মনে হলো, সঙ্গে যথেষ্ট খাবার থাকলে অনায়াসে কয়েক সপ্তাহ এখানে লুকিয়ে থাকা সম্ভব। ঢালের গোড়ায় খাদের মুখ দেখতে না পেলে এটার কথা জানতে পারবে না কেউ।

ক্লিফের মাথা থেকে নেমে আসা পানি শহরের পাশে গিরিখাদের দিকে না গিয়ে এই গুহাতেই আসে।

মন্থর গতিতে বেলা গড়িয়ে চলল। সিগারেট খাওয়ার জন্যে দুবার বড় গুহার কাছে চলে এল কেড্রিক। কয়েক ঘণ্টা পর পালানোর একটা চেষ্টা করবে ও। কিন্তু আঁধার নামার পরে খাদ থেকে বেরিয়ে ঢালের গোড়ায় দাঁড়িয়ে ক্যানিয়নের মুখের দিকে তাকাতেই একটা অগ্নিকুণ্ড চোখে পড়ল ওর। দুজন লোক বসে আছে আগুনের পাশে। ওদের কাছে রাইফেল আছে। ও এদিকে কোথাও আছে, অনুমান করে নিয়েছে ওরা, জানে খাবারের অভাব হলে আপসে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে।

এতক্ষণে ওর নিখোঁজ সংবাদ নিয়ে মাস্ট্যাংয়ে ফিরে গেছে ডরনি, শ। ইয়েলো বাটের রবার্টকে হত্যা করার কথাও বারউইককে জানাবে সে। ওর লোকজনই রবার্টসের মৃত্যুর জন্য দায়ী, এ ব্যাপারে কেড্রিক নিঃসন্দেহ। কিন্তু শহরের কাছাকাছি এরকম নগ্ন সন্ত্রাস গুন্টার কিংবা কীথ কি মেনে নেবে? বিপক্ষীয় কেউ দেখে থাকলে অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তে হবে ওদের।

ঘুরে চুড়ার দিকে উঠে-যাওয়া ঢালটা পরখ করল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। ঘোড়ার পিঠে এটা বেয়ে ওঠা অসম্ভবই বলা যায়। অবশ্য সুস্থ সবল একজন লোকের পক্ষে এটা বেয়ে উঠে যাওয়া কঠিন নয়, অ্যাপলুসাটা তো পাহাড়ী ঘোড়াই…ঝুঁকি নিয়ে দেখা যেতে পারে…ঢালের শেষ মাথায় ওর অপেক্ষায় লোক বসে না থাকলে বেরিয়ে যেতে পারবে। হাতের কাছে একটা মাটির তুপ থেকে এক মুঠো ঘাস ছিড়ে নিয়ে অ্যাপলুসার কাছে ফিরে এল কেড্রিক। ঘোড়াকে ঘাস দিতেই মহানন্দে চিবুতে শুরু করল সে। তাকিয়ে রইল ও।

অস্বস্তিতে ভুগছে সামান্থা ফক্স।

মামার কাছে ইয়েলো বাটের সংবাদবাহককে আসতে দেখেছে ও, ফিরে যেতেও দেখেছে। বারউইক কী জবাব দিয়েছে জানে। লোকটা বিদায় নেয়ার পর দিন দুপুরে সদলে ফিরে এসেছে ডরনি শ। কিন্তু ক্যাপ্টেন কেড্রিক ফেরে নি ওদের সঙ্গে।

কিন্তু কেড্রিক ফিরল না ফিরল তাতে ওর কী? ও ভাবছে কেন অযথা? এই কেনর জবাব ও জানে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে ও। সেদিন বারান্দায় দেখা হওয়ার পর থেকে কেবলই ঘুরে ফিরে কেড্রিকের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। লোকটার ইস্পাত দৃঢ় চেহারা, চওড়া কাঁধ আর তাকানোর ভঙ্গি যেন এখনও চোখের সামনে ভাসছে। জন মামার সঙ্গে যাদের ওঠাবসা তাদের সঙ্গে বিরাট একটা পার্থক্য রয়েছে কেড্রিকের জীবনে প্রথম এমন কাউকে দেখেছে ও।

অজান্তেই কেড্রিকের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা করছিল সামান্থা, কিন্তু হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল লোকটা?

বারান্দায় এসে দাঁড়াল জন গুন্টার। চিন্তিত চেহারা, সিগারের গোড়া চিবুচ্ছে।

কী হয়েছে, বল তো? জিজ্ঞেস করল সামান্থা। কোনও অঘটন ঘটল না। তো? ক্যাপ্টেন কেড্রিক কোথায়?

জানি না! উৎকণ্ঠায় তীক্ষ্ণ শোনাল গুন্টারের কণ্ঠস্বর। স্কোয়ার্টারদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, তারপর আর ফেরে নি। ডরনির ওপর কীথের আস্থা থাকলেও ওকে আমি একটুও বিশ্বাস করি না। ভরনি একটা ব্লুক্তপিপাসু পিশাচ। আমরা বোধ হয় একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছি, সাম্য। এই সময় কেড্রিককে দরকার ছিল। লোকটার বিচার-বুদ্ধি আছে, মাথা খাটিয়ে কাজ করতে জানে।

ও হয়তো এসকে জড়াবে না বলে ঠিক করেছে। হয়তো বুঝতে পেরেছে, তোমরা যাদের চোর-ডাকাত, খুনী বলছ আসলে মোটেই সেরকম কিছু নয় তারা।

ঝট করে সামান্থা ফক্সের দিকে তাকাল জন গুনার। একথা কার কাছে শুনলে? কৈফিয়ত চাইল সে।

কারও কাছে না। শুনতে হবে কেন? আমার চোখ নেই? এখানে রাস্তায় ঘোরার সময় ওই চোর-ডাকাতের চেহারা নিজের চোখে দেখেছি: ওদের সংসার আছে, ছেলেমেয়ে আছে, রসদপূত্র কেনার জন্যেই এখানে আসে ওঁরা। আমার কাছে ওদের ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছে। এসব আর আমার ভালো ঠেকছেন, মামা, আমার টাকায় এত কাণ্ড ঘটছে ভাবতে পারি না।

আহা! তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না, সামা। তুমি নিশ্চিত থাকো, তোমার যাতে লাভ হয় আমি আর লরেন সেদিকেই খেয়াল রাখব।

আমার লাভের কথা ভাবলে এ-কাজটা ছেড়ে দাও! আবেদন ঝরল সামান্থ। ফক্সের কণ্ঠে। এর তো কোনও প্রয়োজন দেখি না। আমার টাকা পয়সার অভাব নেই। টাকার জন্যে মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করতে হবে এ কেমন কথা? ওরাও মানুষ, ওদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে!

তা তো বটেই! ধৈর্য-চুতি ঘটল গুন্টারের। এ-নিয়ে আগেও বহুবার আলোচনা করেছি আমরা, সামা 1 ওখানে যারা থাকছে তাদের বেশির ভাগই খারাপ লোক। তাছাড়া এমনিতেও ওদের জায়গাটা ছাড়তে হবে। যার দখলেই থাক, ভবিষ্যতে সরকার পুরো জায়গাটা কিনে নেবে। যদি আমাদের দখলে থাকে, প্রচুর টাকা লাভ করতে পারব আমরা। সরকারের কাছ থেকে? নিজের দেশের সরকারের কাছ থেকে? ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে গুন্টারের দিকে তাকাল, সামান্থা। সরকারকে যে ফাঁকি দেয় সে কেমন চরিত্রের মানুষ আমি বুঝি না। স্বীকার করি এ ধরনের লোক আছে, কিন্তু আমার মামাও সেই দলে, কোনওদিন ভাবতে পারি নি।

হাসিয়ো না আমাকে, সামা। ব্যবসার ব্যাপার, তুমি কী বোঝ? এসব বুঝতে হলে বাস্তববাদী হতে হয়!

তা ঠিক। কিন্তু এই মুহূর্তে এমন কিছু জিনিসের কথা মনে পড়ছে যেগুলো অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হবে, অথচ লক্ষ টাকার বিনিময়েও ওসব পাওয়া যায় না। নাহ, উঠে দাঁড়াল সামান্থা ফক্স, আমি ভাবছি, তোমাদের ব্যবসা থেকে আমার টাকা উঠিয়ে নেব। এখানে কাছাকাছি কোথাও ব্লাঞ্চ কিনব। আমি আর তোমাদের সঙ্গে নেই।

অসম্ভব! অধৈর্যভাবে চেঁচিয়ে উঠল জন গুন্টার। সব টাকা ব্যবসায় খাটানো হয়ে গেছে। এখন কোনওমতেই টাকা দেয় যাবে না। শোনো, সামা, লক্ষ্মী মেয়ের মতো আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, যেমন এতদিন রেখেছ!

হ্যাঁ, এতদিন বিশ্বাস করেছি, কারণ তোমাকে দিয়ে খারাপ কাজ হতে পারে ভাবি নি। সরাসরি গুন্টারের দিকে তাকাল সামান্থা। তুমি খুব ভালো করেই জানো, যা করতে যাচ্ছ, কাজটা ভালো নয়, বলে চলল ও, মনে রেখো, লড়াই ছাড়া ওদের নড়ানো যাবে না। ভয় দেখালেই সুড় সুড় করে ইঁদুরের গর্তে পালাবে ওরা-এই তো ভেবেছিলে? তোমাদের ধারণা ভুল। বব ম্যাকলেননকে দেখেছি আমি। ভয়-ভীতিতে কাবু হওয়ার মতো লোক সে নয়। লরেনের ভাড়াটে খুনীদের দিয়ে কাজ হবে না।

কে বলেছে, ওরা খুনী? অস্বস্তির সঙ্গে প্রতিবাদ করল জন গুন্টার। সামান্থার চোখের দিকে তাকানোর সাহস হলো না তার। একটু বেপরোয়া এবং রগচটা হতে পারে, কিন্তু খুনী নয়।

তাহলে ডরনি শ? এরই মধ্যে বারজন মানুষকে খুন করে নি সে? দেখতে সুন্দর আর অল্প বয়সী হলে কী হবে, লোকটা শেয়ালের চেয়েও ধূর্ত। ওকে দেখলে আতঙ্কে সিঁটিয়ে যায় সবাই। উঁহু, এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই, মাম!। এভাবে চালালে শিগগিরই নিরপরাধ মানুষ হত্যাও বিনা আপত্তিতে মেনে নিতে শুরু করবে তুমি।

লরেন অব্য এসব নিয়ে ভাবে না। সে বরাবর ঠাণ্ডী স্বভাবের মানুষ। তুমি সেদিন জানতে চেয়েছিলে ওকে বিয়ে করতে আমার আপত্তি কোথায়। এই স্বভাবের জন্যেই ওকে আমার অপছন্দ। হিংস্র বাঘের মতো মেজাজ ওর। স্বার্থ উদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়ালে আপনজনকে হত্যা করতেও দ্বিধা করবে না, প্রয়োজনে তোমাকেও ছাড়বে না সে।

চমকে উঠল গুন্টার, অস্বস্তির সঙ্গে সামান্থার দিকে তাকাল। কী বাজে বকছ?

বাজে বকছি না, মামা। সত্যি কথা বলছি। ওই সুদর্শন লোকটার আসল চেহারা আমি চিনি। ওর মতো স্বার্থপর লোক আর দুটি পাবে না। নাহ্, মানতেই হয়, চমৎকার সব সঙ্গীসাথী বেছে নিয়েছ তুমি। ঘুরে দাঁড়াল সামান্থা। ক্যাপ্টেন পল কেড্রিকের খোঁজ পেলে আমাকে জানিয়ে, ঠিক আছে?

ঘরে চলে গেল সামান্থা।

ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে রইল গুন্টার। তিক্ত কণ্ঠে বিড়বিড় করে কী যেন বলল। একেবারে মায়ের স্বভাব পেয়েছে মেয়েটা! সত্যি কথাটা কীভাবে যেন জেনে ফেলে। এবারও ভুল হয় নি। পুরো ব্যাপারটা ধীরে ধীরে কুৎসিত চেহারা নিতে শুরু করেছে। কীথের চেয়ে বারউইকের ওপরই বেশি অসন্তুষ্ট গুন্টার। অদ্ভুত, স্থূলদেহী ওই নোংরা লোকটা যেন মূর্তিমান পিশাচ, ওর হাবভাবে কোথায় যেন একটা অস্বাভাবিকতা রয়েছে, দেখলেই সাপের কথা মনে পড়ে।

.

পল কেড্রিকের আকস্মিক অন্তর্ধান শুধু সামন্থী ফক্সকেই চিন্তায় ফেলে দেয় নি।

শহর প্রতিরক্ষা দলের অঘোষিত নেতা বব ম্যাকলেনন ইয়েলো বাটের সীমান্তে জীর্ণ র‍্যাঞ্চ হাউসে পিটার সেগাল, বার্ট উললিয়ামস, ডাই রীড এবং পিটলেইনের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। মু। লেইনও আছে সভায়। একটু পেছনে বসেছে সে। কালো চোখে দেখছে সবাইকে, প্রতিটি শব্দ গিলছে।

অবাক কাণ্ড! বিরক্তির সঙ্গে বলল ম্যাকলেনন। লোকটা গেল কোথায়? কসম খেদার, নিজের চোখে ওকে বক্স ক্যানিয়নে ঢুকতে দেখেছি। ওদিক দিয়ে বেরোনোর কোনও রাস্তা নেই। আকাশে উড়ে গিয়ে না থাকলে ক্যানিয়নেই তাকে পাওয়া যাওয়ার কথা!

নিজেই তো দেখলে, শুকনো গলায় বলল সেগাল নেই! স্রেফ হাওয়া হয়ে গেছে।

সেটা অসম্ভব নয়, মন্তব্য করল ডাই রীড। পল কেড্রিক ক্ষিপ্র লোক, হাত মাথা দুটোই সমান চলে, পাইপ বের করে আস্তে আস্তে তামাক ভরতে শুরু করল সে। ওর ওপর হামলা চালানো ঠিক হয় নি, বলে চলল, রীভ, ওকে আমি চিনি, ভালো ছেলে। আমাদের সম্পর্কে জানতে এখানে এসেছে বলে থাকলে, মিথ্যে বলে নি। বাজি রেখে বলতে পারি রবার্টসের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ও কিছুই জানত না।

বিশ্বাস করতে পারলে ভালো হত, বলল ম্যাকলেনন। ওকে আমার ভালো লেগেছে। শত্রুপক্ষে একজন ভালো লোক থাকলে আমাদেরই সুবিধে। অন্তত কিছুটা হলেও ঝামেলা কমত, এ-সবের অবসানও ঘটতে পারত।

কিন্তু এখন ডরনি শকে ঠেকানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ব্যাটা আস্ত শয়তান, বলল সেগাল, শেয়াল যেমন মুরগী মারে তেমনিভাবে মানুষ খুন করে ও।

কেড্রিক সেদিন ন্যায়সঙ্গতভাবেই লড়েছিল আমার সঙ্গে, বলল বার্ট উইলিয়ামস। ওর ওপর আমার কোনও রাগ নেই।

বললাম তো, কেড্রিক ভালো ছেলে, বলল ডাই রীড়। ছেলেবেলা থেকে ওকে চিনি। আমার অন্তত ভুল হতে পারে না। ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই আমি। যে ওর খোঁজ দিতে পারবে, পঞ্চাশ একর জমি দেব তাকে!

.

ভোরের আলো ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে হামলা হলো। চোখের পলকে আক্রমণ চালাল ওরা। গিরিখাদের মুখ থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এল অশ্বারোহীদের দল, ইয়েলো বাটের ধূলি-ধূসর রাস্তায় পৌঁছেই এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু, করল। সেই সাথে ডিনামাইট বিস্ফোরণের প্রচণ্ড আওয়াজে কানে তালা লাগল। তারপর আচমকা, যেমনি এসেছিল, তেমনি চলে গেল ওরা। দেখা গেল দুজন লোক পড়ে আছে রাস্তায়।

মাস্ট্যাংয়ের রাস্তায় পিটার্সকে হুমকি দিয়েছিল ডরনি শ, সেই পিটার্স এদের একজন। তিনটে গুলি খেয়েছে বুকে, মাটিতে পড়ার আগেই মারা গেছে বেচারা। অপমানের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল পিটার্স। অশ্বারোহীদের মাঝে ডরনি শকে দেখেই অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমে এসেছিল, কিন্তু গুলি করার সুযোগ পায় নি।

 অন্যজনের উরু আর বাহুতে গুলি লেগেছে, লোকটা সুইডিশ, মাত্র বছর দুএক হলো এখানে এসেছে।

যত্নের সঙ্গে হামলার পরিকল্পনা নিয়েছিল ওরা। পাহারাদারের অজান্তে গিরিখাদের মুখে পৌঁছে গেছে। এ-রকম সময়ে আক্রমণ হতে পারে কারও মাথায় আসে নি। অঘোরে ঘুমোচ্ছিল প্রহরী। হঠাৎ ধড়মড় করে জেগে ওঠে সে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের ঘায়ে জ্ঞান হারিয়েছে আবার। তবে ওর কপাল ভালো, গুরুতর কোনও আঘাত পায় নি।

দুটো ডিনামাইট বিস্ফোরিত হয়েছে ইয়েলো বাটে। একটা জেনারেল স্টোরে, দরজা আর বারান্দা উড়ে গেছে; অন্যটি ফেটেছে দুটো দালানের মাঝামাঝি জায়গায়, ক্ষয়ক্ষতি হয় নি।

প্রথম রাইফেলের আওয়াজ পেয়েই খাদ থেকে বেরিয়ে এল কেড্রিক। আগেই ঘোড়ার পিঠে জিন চাপিয়ে রেখেছিল। হঠাৎ পালানোর সুযোগ পেয়ে গেল! গোলাগুলির শব্দে ক্যানিয়নের মুখের পাহারাদাররা শহরের দিকে ছুটে গেছে। চট করে খাদ থেকে ঘোড়া বের করে ক্যানিয়নের মুখে চলে এল পল। শহরের ওদিকে বালির মেঘ দেখা যাচ্ছে। ক্যানিয়ন থেকে বেরিয়ে ডানে বাঁক নিল ও, এগোল মেসার গা ঘেঁষে।

আবার মুক্ত বাতাসের ছোঁয়া লাগল গায়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *