০৪. নির্বাক হয়ে গেছে যেন ডরনি শ

নির্বাক হয়ে গেছে যেন ডরনি শ। সাপার শেষে কেড্রিক যখন অ্যাপলুসার পিঠে জিন চাপাতে গেল, মুখ তুলে তাকাল সে।

ডরনি, আমি ইলো বাট-এ যাচ্ছি। নিজের চোখে, শহরটা একবার দেখে আসি, বলল, কেড্রিক। গোলমাল করার ইচ্ছে আমার নেই, চাইও না। কিন্তু, কীসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে যাচ্ছি সেটা জানা দরকার।

অনড় দাঁড়িয়ে ওকে রওনা হতে দেখল ডরনি শ। কিছু বলল না। পড়ন্ত বিকেলের শেষ আলোয় যতটা সম্ভব দূরত্ব কমিয়ে আনতে দ্রুত এগোল পল কেড্রিক। ইয়েলো বাট শহর এবং তার আশপাশের এলাকা জরিপ করা ছাড়াও আরেকটা উদ্দেশ্য আছে ওর। ওখানকার অধিবাসীদের আসল পরিচয় জানাঃ ও সংসারী মানুষ নাকি খুনে-ডাকাত? আউট-ল তত্ত্ব প্রমাণিত হওয়ার মতো তেমন কিছু এখনও দেখতে পায় নি ও।

একটা দীর্ঘ ডিম্বাকৃতি মেসার ঠিক পায়ের কাছে গড়ে উঠেছে ইয়েলো বাট শহর। মেসা থেকেই শহরের নামের উৎপত্তি। এখানে এক চিলতে সমতল ভূমিতে জুড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে পাথর আর কাঠের বাড়িগুলো। ঘরগুলো পাহাড়ের দেয়ালের সামনে দীর্ঘ একটা অ্যারোয়ো অর্থাৎ গিরিখাদের দিকে মুখ করে বানানো। গিরিখাদের কিনারায় মাত্র তিনটে ঘর আর একটা করলি। একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যায়: শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলে কিছু নেই।

একজন কিংবা দুজন রাইফেলধারী মেসার চূড়ায় উঠতে পারলে ওখান থেকে অনায়াসে পুরো শহর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তা ছাড়া শহরের পেছনের পাহাড় কিংবা সামনের গিরিখাদের নিচু অংশে লুকিয়ে থেকে শহরের দিকে গুলি ছোড়া সম্ভব। ইয়েলো বাট মেসাটি প্রায় দেড়শো ফুট উঁচু, মুখ শহরের

 প্রশস্ত রাস্তার দিকে। তবে শহর প্রতিরক্ষার জন্যে ইদানীং কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কয়েকটা বাড়ির সামনে স্তূপীকৃত মাটি দেখা যাচ্ছে-নতুন মার্টি। তূপের দিকে তাকিয়ে, কোথায় কেন মাটি খোঁড়া হয়েছে বোঝার চেষ্টা করল পল কেড্রিক; খানিক পর হাল ছেড়ে দিয়ে আশপাশের এলাকায় নজর বোলাতে শুরু করল।

চিন্তিত চেহারায় ইয়েলো বাট মেসার দিকে তাকাল ক্যাপ্টেন কেড্রিক। শহরের লোকেরা ওটার চূড়ায় রাইফেলসহ কাউকে পাঠানোর কথা, কি ভাবে নি? পাঠানোই তো স্বাভাবিক। কিন্তু যোগ্য, সেনাপতিকেও রণাঙ্গনে অনেক সময় মামুলি ব্যাপার ভুলে বসতে দেখা যায়। এদের বেলায়ও তেমন ঘটতে পারে। অথচ মেসার মাথায় বসে কেবল ইয়েলো বাট শহর নয়, আশপাশের পুরো এলাকার ওপর কর্তৃত্ব ফলানো সম্ভব। কয়েক মাইলের ভেতর এটাই সর্বোচ্চ চূড়া।

ঘোড় ঘুরিয়ে শহরের দিকে এগোল ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। ফাঁকা জায়গায় রয়েছে ও; কিন্তু কেউ দেখে থাকলেও কোন রকম বাধা দিল না। ওর সঙ্গে আরও লোক থাকলে কী হত?

বাট স্যালুনের সামনে ঘোড়া থামিয়ে স্যাডল থেকে নাম কেড্রিক, হিচরেইলে বাধল ওটাকে। জানে, ঘোড়াটা ক্লান্ত, এই মুহূর্তে দূরে কোথাও যাবার ক্ষমতা নেই।

শহরের একমাত্র রাস্তা খাঁ খাঁ করছে। স্যালুনের বারান্দায় উঠল কেড্রিক, তারপর স্যুইং-ডোর ঠেলে আলোকিত কামরায় পা রাখল। একটা টেবিলে বসে সলিটেয়ার খেলছিল একজন, মুখ তুলে তাকাল, ভুরু কুঁচকে উঠল তার, কিছু যেন বলতে চাইল; কিন্তু পরমুহূর্তে মত পাল্টে আবার খেলায় মনোযোগ দিল। বারের দিকে এগিয়ে গেল পল কেড্রিক। রাই, সহজ কণ্ঠে বারটেন্ডারকে বলল।

ওর দিকে না তাকিয়েই মাথা দোলাল বারটেন্ডার, একটা গ্লাসে মদ ঢেলে দিল। কেড্রিক বারের ওপর পয়সা ফেললে চোখ তুলে তাকাল সে সঙ্গে সঙ্গে কাঠিন্য ফুঠে উঠল তার চেহারায়। কে তুমি? জানতে চাইল সে। তোমাকে তো আগে দেখি নি?

দুজন লোক দুপাশে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতে পারছে কেড্রিক। অচেনা লোক। প্রথমজন মাঝবয়সী, তীক্ষ্ণ চেহারা; অপরজন লাল-চুলো এক উদ্ধত যুবক।

এদের জন্যেও ঢাল, বারটেন্ডারকে বলল পল। তারপর সাবধানে, আস্তে আস্তে, ওদের সন্দেহের উদ্রেক না করে বারের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল। সতর্ক দৃষ্টিতে পুরো রুম জরিপ করল!

দশ বারজন লোক আছে স্যালুনে। একদৃষ্টিতে মাপছে ওকে। আমার পকেট থেকে পয়সা যাচ্ছে, শান্ত কণ্ঠে বলল ও, তোমরাও যোগ দেবে। নাকি?

নড়ল না কেউ কাঁধ ঝাঁকাল কেড্রিক। আবার বারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। মদের গ্লাস হাওয়া হয়ে গেছে!

আস্তে আস্তে বারটেন্ডারের দিকে তাকাল কেড্রিক। আমার গ্লাসটা, কোথায়? নম্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

কেড্রিকের দিকে তীব্র দৃষ্টি হানল বারটেন্ডার। কী জানি, বলতে পারব না! কাঁধ ঝাঁকিয়ে পাল্টা জবাব দিল সে।

পয়সা দিয়ে মদ কিনেছি, গ্লাসটা দাও। অখণ্ড নীরবতা।

ওকে প্রায় উপেক্ষা করে দুপাশের দুজন লোক বরের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।

আমাকে খেপিয়ো না, আবার বলল কেড্রিক। মদের গ্লাসটা ফিরিয়ে দাও-জলদি!

মিস্টার, বারের উপর দিয়ে সামনে ঝুঁকল বারটেন্ডার তোমার মতো লোকের কাছে আমরা মদ বিক্রি করি না। চ্যাঙদোলা করে বাইরে ফেলে দেয়ার আগেই মানে মানে কেটে পড়ো। ভাগো হিয়াসে!

বারের কিনারে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল পল কেড্রিক, পরের ঘটনা এত দ্রুত ঘটে গেল যে, পাশের লোক দুটো নড়াচড়া করারও ফুরসত পেল না।

বিদ্যুৎ চমকের মতো ছুটে গেল কেড্রিকের ডান হাত, জাপ্টে ধরল বারটেন্ডারের কলার, সাথে সাথে বারের দিকে পেছন ফিরে হ্যাচকা টান দিল। বাইন মাছের মতো পিছলে শূন্যে উঠে গেল লোকটা, উড়ে গিয়ে দড়াম করে মেঝেয় পড়ল। পরমুহূর্তে বাউলি কেটে দুপাশের দুজনের আওতার বাইরে সরে গেল কেড্রিক। চট করে খাপ থেকে পিস্তল বের করেই কাভার করে দাড়াল কামরার প্রতিটি লোককে।

উঠে দাঁড়িয়েছিল কয়েকজন, কেড্রিকের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে পিস্তল দেখে জমে গেল। পয়েন্ট-ফোর-ফোর রাশানটা কখন বেরিয়ে এসেছে দেখতে পায় নি কেউ।

দেখে, স্যালুনের সবাইকে উদ্দেশ্য করে নরম কণ্ঠে বলল কেকি। গোলমাল করার জন্যে এখানে আসি নি আমি। একটা কাজ করে দেয়ার জন্যে আমাকে ভাড়া করা হয়েছে, তাই দেখতে এসেছি তোমাদের সম্পর্কে যা শুনেছি, সেসব সত্যি না মিথ্যা। তোমাদের বারটেন্ডার লোকটা হয় কালা কিংবা ভদ্রতা জানে না; আমি এক গ্লাস হুইস্কি দিতে বললাম, কথা না শুনে বাজে বকতে শুরু করে দিল। তাই একটু শিক্ষা দিয়ে দিলাম।

এই যে, তুমি, সলিটেয়ার খেলোয়াড়কে বলল কেড্রিক, তোমাকে দেখে তো ভালো লোক বলেই মনে হচ্ছে। এদিকে এসো, গ্লাসে মদ ঢেলে বারের কিনারে রাখো দেখি। তারপর, দৃষ্টি সরাল না ও, এখানকার প্রত্যেককে এক গ্লাস করে হুইস্কি দাও। বাঁ হাতে, পকেট হাতড়ে একটা স্বর্ণ মুদ্রা বের করে বারের ওপর ছুঁড়ে ফেলল। এই যে, পয়সা মিটিয়ে দিলাম।

এক কদম পিছিয়ে এল, কেড্রিক, তারপর পিস্তল হোলস্টারে ঢুকিয়ে রাখল। নিষ্পলক চোখে ওকে দেখছে সবাই, নড়াচড়া করার সাহস করছে না। ব্যাপারটা সম্ভবত লালচুলো মেনে নিতে পারছে না, বাহাদুরী দেখাতে চাইছে, সে, বুঝতে পারছে কেড্রিক।

অ্যাই, তুমি! আচমকা বলে উঠল ও, বিয়ে করেছ? ছেলেপুলে আছে?

কটমট করে কেড্রিকের দিকে তাকাল লালচুলো, তারপর শুকনো গলায় জবাব দিল, হ্যাঁ, দুটো ছেলে। তাতে তোমার কী?

বললাম না, সহজ কণ্ঠে জবাব দিল কেড্রিক, তোমাদের সম্পর্কে জানতে এসেছি এখানে?

মদ ঢালতে ঢালতে মুখ তুলে তাকাল সলিটেয়ার খেলোয়াড়। কী জানতে চাও, আমাকে জিজ্ঞেস করো। আমি পিটার সেগাল।

তোমার কথা অনেক শুনেছি।

মৃদু হাসি ফুটে উঠল সেগালের ঠোঁটে। হ্যাঁ, বলল সে, তোমার কথাও শুনেছি আমরা।

নিঃশব্দে সবাইকে মদ ঢেলে দিল পিটার সেগাল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে স্যালুনের প্রতিটি লোক। মদ বিতরণ শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল সেগাল।

বন্ধুরা, বলল সে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে খামোকা প্রাণনাশের ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। ও কী বলতে চায় আগে শোনা যাক। পছন্দ না হলে আমল না দিলেই হবে।

ধন্যবাদ, সেগাল, স্যালুনের চারপাশে নজুর বোলাল কেড্রিক। নিষ্করুণ চেহারায় ওর দিকে তাকিয়ে আছে দুজন, দৃষ্টিতে বিদ্বেষ; একজনের চোখে নিখাদ কৌতূহল; পেছনের দরজায় এক লোক দাঁড়িয়ে, রুক্ষ চেহারা, অস্থির দৃষ্টি, প্রাক্তন আউট-ল ক্লসনের মতোই রগচটা বলে মনে হচ্ছে লোকটাকে।

আমি যেই কোম্পানির চাকরি করছি, বলল কেড্রিক, সরকারের কাছ থেকে এদিককার সব জমি কিনে নিতে যাচ্ছে ওরা। কোম্পানির নাম কীথ গুন্টার অ্যান্ড বারউইক। নিউ অরলিন্সে আমাকে কাজ দেয়ার সময় ওরা জানিয়েছিল, একদল আউট-ল, ছিচকে চোর আর ছিনতাইবাজ গায়ের জোরে জায়গাটা দখল করে রেখেছে। উচ্ছেদ করতে গেলে বাধা দেয়ার চেষ্টা করবে, এখানে চোর-ডাকাতের আস্তানা বানাতে চায় ওরা। আমার দায়িত্ব এদের বিতাড়িত করে জায়গাটা কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া। সেই কারণেই এখানে আসা।

পেছনের সারি থেকে মৃদু গুঞ্জন ভেসে এল। সময় নিয়ে গ্লাস খালি করল পল কেড্রিক। তারপর সহজ ভঙ্গিতে সিগারেট বানাতে শুরু করল।

ডান দিকের দরজা ঠেলে দুজন লোক স্যালুনে চুকল। প্রথমজন লম্বায় মোটামুটি কেড্রিকের সমান হবে, মাথায় আলকাতরার মতো কালো চুল, জুলফির কাছে পাক ধরেছে, ধূসর চোখে শীতল দৃষ্টি; চেহারায় দৃঢ়তার ছাপ। কামরার চারদিকে নজর বুলিয়ে কেড্রিকের দিকে তাকাল সে।

বব, এ হচ্ছে ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক, নিচু গলায় বলল পিটার সেগাল। এতক্ষণ ওর কথাই শুনছিলাম। ওকে নাকি বলা হয়েছে, আমরা একদল খুনে ডাকাত, বদমাশ!

বারউইকের কাণ্ড নিশ্চয়ই, বলল ম্যাকলেনন। বলে যাও, কেড্রিক।

বিশেষ কিছু বলার নেই আর। আসলে একজন যোদ্ধা হিসেবে নিজের চোখে জায়গাটা দেখতে চাইছিলাম আমি। মাস্ট্যাংয়ে আসার পর থেকেই এমন কিছু কথা কানে এসেছে, এমন কিছু ইঙ্গিত পেয়েছি, যাতে করে আমার ধারণা হয়েছে ৰারউইকরা হয়তো মিথ্যে বলে নি। তাই তোমাদের আসল পরিচয় জানতে নিজেই চলে এসেছি। দেখতে চাই, আমাকে যেমন বলা হয়েছে, সত্যি, তোমরা তৃত খারাপ কি না। তা ছাড়া, তোমাদের মতামতও তো জানা দরকার।

কুৎসিত হয়ে গেল লালচুলোর চেহারা। আমরা তোমার কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই, কেড্রিক! কর্কশ কণ্ঠে বলল সে, বুঝতে পারছ কী বলছি? খুনীর দলকে নিয়ে একবার শুধু আসো এখানে, দেখে নেব কয়টা জ্যান্ত ফিরে যেতে পারে!

চুপ করো, রেড! ধমকে উঠল সেগাল। বব কী বলে শোনা যাক।

আহা, কেন পাত্তা দিচ্ছ? রুক্ষ কণ্ঠে বলল রেড। এই ব্যাটা ভয়ে এখনই কাবু হয়ে গেছে, নইলে এভাবে খোঁজখবর করতে আসত?

ভুরু কুঁচকে, রেডের চোখের দিকে তাকাল পল কেড্রিক, কণ্ঠকে শান্ত রেখে বলল, উঁহু, ভয় পাই নি, রেড। আমি যদি মনে করি কোম্পানি ঠিক বলেছে, তোমাদের উচ্ছেদ করা দরকার, যে কোনও মূল্যে তা করব; কেউ ঠেকাতে পারবে না। প্রয়োজন হলে আরও লোক যোগাড় করব। আমি জানি কীভাবে লড়াই করতে হয়। সারা জীবন লড়াই করে আসছি, জেতার কৌশল আমার অজানা নেই। ভয় পেয়ে এখানে আসি নি, এসেছি, নিজের কাছে পরিষ্কার থাকতে চাই বলে। এখানে তোমাদের দাবী বৈধ হলে, তোমাদের সম্পর্কে যেসব কথা বলা হয়েছে সেসব মিথ্যে হলে, নিজেকে সরিয়ে নেব আমি।

অবশ্য, আবার বলল ও, অন্যেরা কী করবে না করবে জানি না, তবে আমার সিদ্ধান্ত ওদের জানিয়ে দেব।

যুক্তিসঙ্গত কথা, সায় দিল ম্যাকলেনন। বেশ, ঠিক আছে, আমাদের কথা বলছি এবার। এখানকার জমিজমার মালিক আসলে সরকার। তবে কিছু অংশ নাভাহহা আর উতে ইন্ডিয়ানরা ওদের বলে দাবী করে। ওদের সঙ্গে আমাদের লড়াই করতে হয়েছে, তবেই এখানে থাকতে পেরেছি। চার-পাঁচজন আছে, দশবছরেরও বেশি হলো এখানে বসবাস করছে। বাকিরা কমপক্ষে তিনচার বছর ধরে আছে।

এখানে ঘর-বাড়ি বানিয়েছি আমরা, ঝর্নাগুলো পরিষ্কার করেছি, কিছু কিছু জায়গা ঘিরে নিয়ে চাষাবাদ করেছি। এখানে আমাদের সংসার আছে, ছেলে-মেয়ে আছে। কিন্তু তোমাদের কোম্পানি এখন আমাদের ভিটেমাটি ছাড়া করার চেষ্টা করছে; আমাদেরকে বঞ্চিত করতে চাইছে।

আইন অনুযায়ী ছয়মাস আগে নোটিস জারি করা উচিত ছিল। অর্থাৎ কারও কাছে খাস জমি বিক্রি করার অন্তত ছয়মাস আগে সরকারকে নোটিস জারি করতে হয়। সেই জমি, আমাদের জানা মতে, জনবসতিহীন হতে হবে। কিন্তু এ-জায়গাটা তা নয়। দেখতেই পাচ্ছ, আমরা এখানে বাস করছি। তার ওপর, মাত্র পাঁচমাস আগে নোটিস জারি করা হয়েছে; এমন জায়গায় সাঁটানো হয়েছে সেটা, যেখানে সচরাচর মানুষের চলাচল নেই! নোটিসটা এত ছোট ছোট হরফে ছাপা ম্যাগনিফাইং গ্লাস ছাড়া পড়ে কার সাধ্যি।

যাই হোক, মাত্র মাসখানেক আগে কীভাবে যেন আমাদের একজনের চোখে পড়ে যায় ওটা, আইনের প্যাচাল কথাবার্তা থেকে অর্থ বের করতেই তার কয়েকদিন লেগে যায়, তারপরই হাউমাউ করে আমার কাছে ছুটে আসে সে এখন সত্যি ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্যে সরকারের কাছে লোক পাঠাব, অত টাকা কোত্থেকে পাব, বল? সুতরাং রুখে দাঁড়িয়ে লড়াই করা ছাড়া উপায় নেই। সেদিকেই জোর দিচ্ছি আমরা। কোম্পানি আমাদের উৎখাত করতে, চাইলে, যদিও তা পারবে বলে মনে হয় না, এখানকার প্রতিটি ধূলিকণা রক্ত দিয়ে কিনতে হবে! বিড়বিড় করে ম্যাকলেননের কথায় সায় দিল সবাই। ভুরু কুঁচকে আবার কামরার চারদিকে নজর বেলাল কেড্রিক। ডরনি শ ঠিকই বলেছে। প্রয়োজনে লড়াই করে মরবে এরা। ম্যাকলেনন আর সেগালের মতো লোক নেতৃত্ব দেয়ায় এদের সঙ্গে পেরে ওঠা মুশকিল হবে।

আইনের দিক থেকে কোম্পানি অবশ্য সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কোণঠাসা অবস্থায় পড়ে গেছে এরা। এখনই যদি কাউকে ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়, গন্তব্যে পৌঁছুতে কমপক্ষে সপ্তাতিনেক সময় লাগবে তার। এর পর লালফিতার বাধা পেরিয়ে উপযুক্ত লোকের কাছে গিয়ে জমি বিক্রি ঠেকানো যাবে-তার আশাও ক্ষীণ।

ফটকাবাজিতে নেমেছে বারউইকরা, জানাল বব ম্যাকলেনন, গুজব রটেছে; এখানে নাকি শিগগিরই ইন্ডিয়ান রিজারভেশন প্রতিষ্ঠা করা হবে। কথাটা যদি সত্যি হয়, এখন জমি কিনতে পারলে পরে সরকারের কাছেই আবার চড়া দামে এই জমি বিক্রি করে অনেক টাকা মুনাফা লুটতে পারবে ওরা।

অথবা তোমরা, বলল পল কেড্রিক। দুদিকের পাল্লাই ভারি দেখতে পাচ্ছি, ম্যাকলেনন। কোম্পানির পক্ষে একটা শক্ত যুক্তি আছে। ফেডারেল সরকার এখানে রিজারভেশন প্রতিষ্ঠা করলে তোমাদের এমনিতেই বিদায় নিতে হবে।

সেটা যখন হবে তখন দেখা যাবে, বলল পিটার সেগাল। এই মুহূর্তে কোম্পানিকে ঠেকানোই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা ফটকা কারবারী নই। এবং পিস্তলবাজও নই।

আরও একজন লোক ঢুকল স্যালুনে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিনতে পারল পল কেড্রিক। বার্ট, মাস্ট্যাংয়ের রাস্তায় একে পিটিয়েছিল ও। দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কামরা জরিপ করল বাট।

কেউ না? আস্তে করে জিজ্ঞেস করল কেড্রিক। পিট লেইন সম্পর্কে কী যেন শুনছিলাম?

লেইন মোটেই খারাপ না! তেতে উঠল রেড। ওর মতো ভালো মানুষ পাওয়া কঠিন।

ম্যাকলেনন কিংবা সেগাল কিছুই বলল না। অস্বস্তির সঙ্গে নড়েচড়ে দাঁড়াল সেগাল। অর্থাৎ, একটা ব্যাপারে মতানৈক্য আছে এদের। লেইন সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে, ভাবল পল কেড্রিক।

তো, দৃঢ়কণ্ঠে বলল ও, ব্যাপারটা নিয়ে আমাকে একটু চিন্তাভাবনা করতে হবে। তার আগে গোলমাল করার দরকার নেই। তোমরা রাজি থাকলে। বল, আমি আমার লোকদের শান্ত রাখার ব্যবস্থা করি।

আমরাও ঝামেলা চাই না, বলল বব ম্যাকলেনন। আমরা যতক্ষণ শান্তিতে আছি, কোম্পানির লোকজন এখন থেকে দূরে থাকছে, আমাদের দিক থেকে গোলমাল হবে না।

দরজার দিকে পা বাড়াল কেড্রিক, কিন্তু বারটেন্ডারের ডাকে থামতে হলো।

পয়সা ফেলে যাচ্ছ, তুমি, শুকনো গলায় বলল সে।

ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল কেড্রিক, হাসল, তারপর খুচরো পয়সা নিয়ে পকেটে রাখল। আবার দেখা হবে, বলে পা বাড়াল।

ঠিক এই সময় আচয়কা দড়াম করে দরজা খুলে গেল, টলমল পায়ে ভেতরে ঢুকল এক লোক। অন্য একজন লোককে ধরে রেখেছিল, মেঝেয় ফেলল তাকে।রবার্টস! বলল লোকটা। ওকে ওরা খুন করেছে।

একসঙ্গে মেঝের লোকটার দিকে তাকাল কামরার সবাই। একাধিকবার গুলি করা হয়েছে বেচারাকে, তারপর ঘোড়ার পায়ের নীচে পিষ্ট করেছে; ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে লাশ। পেটের ভেতরে পাক দিয়ে উঠল কেড্রিকের, বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল, কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে যেন।

অভিযোগ ভরা দৃষ্টিতে ওকে দেখছে সবাই। ম্যাকলেননের চেহারা আড়ষ্ট, তাতে অবিশ্বাসের ছাপ; সন্ত্রস্ত সেগাল। রেডসহ অবশিষ্টরা সামনে পা বাড়াল। এই লোকটা! আঙুল তুলে কেড্রিকের দিকে ইঙ্গিত করল রেড, ক্রোধে থর গুর করে কাঁপছে। এখানে দাঁড়িয়ে মিঠে মিঠে কথা রলেছে আর ওর চ্যালারা খুন করেছে আমাদের ববকে!

ধরো শালাকে! চেঁচিয়ে উঠল একজন। ধরো! আমার কাছে দড়ি আছে!

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে কেড্রিক, জানে, এখন এদের কিছু বোঝানো অসম্ভব। হয়তো পরে বুঝতে পারবে রবার্টসের হত্যায় ওর হাত ছিল না, ওর অজান্তে ঘটেছে ব্যাপারটা; কিন্তু এই মুহূর্তে কারও কথায় কান দেবে না। লোকটা চেঁচিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে স্যাৎ করে স্যালুন থেকে বেরিয়ে এল কেড্রিক, হ্যাচকা টানে হিচরেইল থেকে ঘোড়ার বাধন খুলে লাফিয়ে স্যাডলে চেপে বসল। চমকে উঠে দালানকোঠার মাঝ দিয়ে ছুটতে শুরু করল অ্যাপলুসা। #

পেছন থেকে চিৎকার আর খিস্তি ভেসে আসছে। গুলি করল কেউ, কানের পাশ দিয়ে উড়ে গেল একটা বুলেট। দুটো দালানের মাঝখানে ঘোড়া ঢোকাল পল কেড্রিক, পরক্ষণে বুঝতে পারল, পালাতে গিয়ে ফঁদে পা দিয়ে ফেলেছে। সামনে, বড়জোর দুশো গজ দূরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে নিরেট পাথুরে দেয়াল। দেয়ালের নীচের দিকে ফাঁক-ফোকর আছে কি না বোঝার উপায় নেই। এখন গিরিখাদের দুটোমুখেই সশস্ত্র প্রহরী পাঠিয়ে দেবে ওরা, ওদিকে যাওয়া আর সম্ভব নয়। বাঁক নিয়ে অন্ধকারে সোজা ইয়েলো বাট এর দিকে ঘোড়া ছোটাল কেড্রিক।

শহরে ঢোকার পথে মেসার গোড়ায় ইংরেজি হরফ ভি আকৃতির একটা ফাঁক দেখেছিল ও। ওদিক দিয়ে বেরুনো গেলেই হয়! হয়তো বক্স, ক্যানিয়নও হতে পারে ওটা। সেক্ষেত্রে ওখানে ঢোকার অর্থ হবে উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে ঝাঁপ দেয়া।

গতি কমিয়ে আনল কেড্রিক। শব্দ করা চলবে না। শব্দ শুনলে সহজেই ওর অবস্থান আঁচ করে ফেলবে প্রতিপক্ষ। কোণঠাসা করে ধরে ফেলবে। সমভূমিটা ছোট, গিরিখাদ ছাড়া বেরুনোর পথ মাত্র দুটো এবং ওদিকে কড়া নজর রাখা হবে নিঃসন্দেহে।

অনেক কাছে চলে এসেছে মেসা। অতল গহ্বরের মতো কালো আঁধারে ধীর গতিতে এগোচ্ছে অ্যাপলুসা আর কয়েক মিনিট, তারপরই নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছুতে পারবে।

অ্যাপলুসা ক্লান্ত, সারাদিন পথ চলেছে। বন্ধুর, পথে ওর মতো বিশালদেহী একজন লোককে এতদূর বয়ে এনেছে। তরতাজা ঘোড়া নিয়ে ধাওয়াকারীদের। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে পারবে না। প্রাণ বাঁচানোর এখন মাত্র একটা উপায় আছে: ওদের ধাঁধায় ফেলতে হবে, যাতে কিছুটা অতিরিক্ত সময় আদায় করা যায়। কিন্তু যেভাবেই হোক, ভোর হবার আগেই পালাতে হবে ওকে। দিনের আলোয় পুরো এলাকা চষে ফেলবে ওরা, ওর অবস্থান ফাস হয়ে যাবে।

সামনে হাঁ করে আছে ক্যানিয়নের মুখ। ক্যানিয়নের দুপাশের দেয়াল উঁচু না হলেও এত খাড়া যে ঘোড়া নিয়ে এই দেয়াল বেয়ে উঠে পালানো সম্ভব, হয়।

এখন আর চিৎকারের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু কেড্রিক জানে, ওকে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করবে ওরা, গিরিখাদের দিকে যারা নজর রেখেছে, এতক্ষণে অন্যদের জানিয়ে দিয়েছে, ওদিকে যায়নি ও। এখনও আটকা পড়ে আছে। হতে পারে ওদিকে আদৌ কোনও পাহারা নেই, কিন্তু কাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে জানে পল; আসার সময় কাউকে পাহারা দিতে না দেখলেও এখন পাহারা থাকবে ধরে নেয়াই ভালো।

সংকীর্ণ ক্যানিয়ন। খুব সাবধানে এগোল কেড্রিক, কিন্তু খানিকটা এগোনোর পরই দেখল ক্যানিয়নের শেষপ্রান্তের দেয়াল আকাশ, ছুঁয়েছে-কালো, নিরেট। মুখ গলা শুকিয়ে এল ওর, থমকে দাঁড়াল অ্যাপলুসা। ঝিম মেরে বসে রইল পল। ঘোড়াটা হাঁপাচ্ছে। একটা নিরেট দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ও, ফাঁদে পড়েছে।

পেছনে একটা আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। চিৎকার করে উঠল কেউ। দেশলাই জ্বালিয়ে ট্র্যাক খুঁজছিল ওরা, পেয়েছে। আর কিছুক্ষণ, তারপরেই এসে পড়বে! ধরা পড়ে যাবে ও। কিছুই বুঝতে চাইবে না ওরা, মরণফাঁদে আটকা পড়েছে ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক! নিরুপায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *