০৩. মরুভূমির অধিবাসীরা

মরুভূমির অধিবাসীরাই কেবল এমন শান্ত সকালের সঙ্গে পরিচিত। চারদিক নিঝুম। থেকে থেকে সিক্যাডা ডাকছে শুধু। নরম রোদে আরামদায়ক উষ্ণতা। দূরে, আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পাহাড় আর মেসা। এখানে সেখানে দলবদ্ধ মেঘের ছায়া।

ছজন অশ্বারোহী, রুক্ষ কঠিন ছয় জন মানুষ, স্যাডলে শব্দ তুলে ঘোড়া হাঁকিয়ে বিস্তৃত মরুভূমির প্রান্তে পৌঁছুল। প্রত্যেকেই যার যার ভাবনায় ডুবে আছে। ওরা সবাই পিস্তলবাজ, অতীতে মানুষ হত্যা করেছে, ভবিষ্যতেও একই উদ্দেশ্যে পিস্তল ব্যবহার করবে অনায়াসে। নিষ্ঠুর সময়ের কাছে মার খেয়ে ওদের অনেকেই দয়ামায়াহীন পাষণ্ড পরিণত হয়েছে, অবশিষ্টদের ভাগ্যেও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে। বন্দুকবাজদের এর হাত থেকে নিস্তার নেই।

অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে যারা বেঁচে থাকে তারা নিঃসঙ্গ মানুষ, এরাও ব্যতিক্রম নয়। এদের কাছে মানুষ মানেই সম্ভাব্য শত্রু, প্রতিটি ছায়া বিপদ। সতর্কভাবে ঘোড়া নিয়ে এগোচ্ছে ওরা; আচরণে সংযত, চোখে সাবধানী দৃষ্টি।

চিঁ-হিঁ-হিঁ করে ডেকে উঠল একটা ঘোড়া; আলগা পাথরে ঘষা খেলো একটা খুর; নড়েচড়ে আরাম করে স্যাডলে বসল কেউ, লম্বা করে দম নিল। আর কোনও শব্দ নেই কোথাও।

একটা অ্যাপলুসা গেল্ডিং নিয়ে এগোচ্ছে ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। ঘোড়াটার সামনের দিকে লালচে-ধূসর, পেছনে ধবধবে শাদার ওপর বৃষ্টির ফোঁটা আকৃতির ছোপ; চারটে পা-ই শাদা। শক্তিশালী, ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন ঘোড়, বুদ্ধিমান এবং সত।

রওনা হওয়ার জন্যে ওরা যখন একসঙ্গে মিলিত হচ্ছিল, অ্যাপলুসাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে লরেডো শ্যাড, ঘুরে ঘুরে সপ্রশংস দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে দেখেছে ঘোড়াটাকে।

ভাগ্যবান লোক তুমি; ফ্রেন্ড! দারুণ ঘোড়া! পেলে কোথায়? অবশেষে জিজ্ঞেস করেছে।

নাভাহো রেমুডা, নেয় পার্শ ওঅর হর্স এটা-রিজারভেশন থেকে যোগাড় করেছি।

আস্তে আস্তে জমায়েত হয়েছে সবাই। কেড্রিক লক্ষ্য করেছে, ওকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করে নিয়েছে ওরা। ওর পশ্চিমা কায়দার পোশক-আশাক বিশেষত নিচু করে কোমরে ঝোলানো, উরুর সঙ্গে বাঁধা পিস্তলজোড়া ওদের নজর কেড়েছে। গতকাল নিউ অরলিন্স-এ কেনা তৈরি পোশাকে ওকে দেখেছিল ওরা। কিন্তু আজ আপন দলের মানুষ হিসেবে ওকে যাচাই করার সুযোগ পেয়েছে।

দীর্ঘ ঋজু শরীর কেড্রিকের। গতকালের পোশাকের মধ্যে শুধু কালো টুপি আর জুতোজোড়া অবশিষ্ট রয়েছে আজ। একটা ধূসর ঊলের শার্ট পরেছে, কালো সিল্কের রুমাল গলায় পেঁচিয়েছে। পরনের জিন্সের প্যান্টটাও কালো। সহজভাবে কোমরে ঝুলছে পিস্তলজোড়া, প্রয়োজনের মুহূর্তে হাতে উঠে আসবে।

সরাই উপস্থিত হলে কেড্রিক বলেছে, ঠিকাছে, চল!

স্যাডলে চেপে বসেছে ওরা, তারপর সবার ওপর একবার নজর বুলিয়েছে কেড্রিক। একহারা গড়নের ডরনি শ; বিশালদেহী পাই ফেসেনডেন; ছিপছিপে রুক্ষ চেহারার পয়েন্সেট; লম্বা চওড়া সোনালি চুলো লী গফ আর কুৎসিত ক্লন; দলের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য শক্তপোক্ত টেক্সান, লরেডো শ্যাঙ। এগোতে শুরু করেছে ওরা। আরও একবার ওদের জরিপ করেছে কেড্রিক। আর কিছু না হোক, এরা লড়াকু লোক। বার কয়েক ওর পিস্তলের দিকে তাকিয়েছে ডরনি শ।

ওগুলো কোল্ট নয় বলে মনে হচ্ছে?

ঠিক ধরেছ। পয়েন্ট ফোর-ফোর রাশান। চমৎকার জিনিস, সহজে নিশানা ভেদ করা যায়। মাথা দুলিয়ে সামনের ট্রেইলের দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চেয়েছে কেড্রিক। এদিকে আগেও গেছ?

হ্যাঁ, বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছে। নর্থ ফর্ক পেরিয়ে কিছুদূর গলে একটা ঝর্না আছে, ওখানে দুপুরে বিশ্রাম নেব আমরা। তারপর অনেক কটা গভীর ক্যানিয়ন আর একটা বড়সড় পাহাড় পার হতে হবে। ইন্ডিয়ান আর স্প্যানিশরা পাহাড়টার নাম দিয়েছে দ্য অরফ্যান। পাহাড়ের পরেই শুরু বুনে এলাকার, নিজের চোখেই দেখতে পাবে। ঝকঝকে শাদা দাঁত বের করে হাসল ডরনি শ। যেদিকে তাকাও, দেখবে একই চেহারা।

ডরনি, আচমকা জিজ্ঞেস করে বসেছে লী গফ, এবারও ম্যালপাই ক্যানিয়নের দিকে যাবে নাকি?

হাসল ক্লসন। যাবে না মানে! অন্য কেউ হলে অনেক আগেই হাল ছেড়ে দিত, কিন্তু আমাদের ডরনি হার মানার বান্দা নয়, তবে স্পষ্ট বোঝা যায় পশ্চিমা গানশ্লিংগারের থোড়াই পরোয়া করে মেয়েটা, তার নজর আরও ওপরে!

মেয়েটা কিন্তু দারুণ! গফের কণ্ঠে খোলামেলা প্রশংসা ঝরেছে। কিন্তু ভরনিকে তেমন পাত্তা দেয় না।

কে জানে স্বার্থ আছে বলেই এতদিন সম্পর্ক রেখেছে কি না, বাঁকা কণ্ঠে বলেছে পয়েন্সেট। কীথের জন্যে খবরাখবর মেয়েটার কাছ থেকেই হয়তো যোগাড় করে ও। কোথায় কী ঘটছে কিছুই তো তার অজানা থাকে না।

স্যাডলে ঘুরে বসেছে ডরনি শ, কঠোর হয়ে উঠেছে লম্বাটে তীক্ষ্ণ চেহারা। চোওপ! শীতল কণ্ঠে বলেছে সে।

আড়ষ্ট হয়ে গেছে পয়েন্সেট, নিখাদ বিষ মেশানো দৃষ্টিতে ডরনির দিকে তাকিয়েছে, কিন্তু পাল্টা জবাব দেয় নি। লোকটা এত দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়েছে, না দেখলে কেড্রিকের বিশ্বাস হত না। দুর্ধর্ষ কঠিন লোক পয়েন্সেট, কারও তোয়াক্কা করে না। অথচ সেও সযত্নে এড়িয়ে গেছে ডরনি শকে। মনে রাখার মতো ব্যাপার।

বেলা গড়িয়ে চলল। দলের সদস্যদের ওপর নজর রাখছে পল কেড্রিক। উরনি শর প্রতি আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছে সবাই, লক্ষ্য। করল ও। এমনকী, বিশজন মানুষের হত্যাকারী ফেসেনডেনও এড়িয়ে চলছে। তাকে।

দুপুরে নর্থ ফর্কের ঝর্নার ধারে ক্যাম্প করল ওরা। সাধারণত কাউ-ক্যাম্পগুলোয় যেমন খোশ গল্প চলে, এখানে ত! হলো না। রূঢ় এবং মেজাজি লোক ওরা, গল্প গুজর করার মানসিকতা নেই। একমাত্র লরেঙে শ্যাডকেই কিছুটা সহজ মনে হলো, স্বাভাবিক আচরণ করছে ও। সবার মৌন সম্মতি পেয়ে রান্নার দায়িত্ব নিল ক্লসন। কারণ বুঝতে দেরি হলো না কেড্রিকের, চমৎকার রাধে লোকটা।

খাওয়ার ফাঁকে খতিয়ে নিজের অবস্থান বিচার করল, কেড্রিক। নিউ অরলিন্স-এ এই কাজের দায়িত্ব নিয়েছে ও; টাকা পয়সার খুব টানাটানি যাচ্ছিল তখন। ওকে এখানে আনার জন্যে জন গুন্টারই প্রয়োজনীয় টাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখন কাজ ছাড়তে গেলে টাকাগুলো ফিরিয়ে দিতে হবে। সেটা সম্ভব নয়। অথচ সঙ্গীদের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরে পড়া উচিত।

অসংখ্য যুদ্ধে ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে অংশ নিয়েছে কেড্রিক। লড়াই করাই ওর পেশা; ছেলেবেলা থেকে কুশলী যোদ্ধা হিসেবে বেড়ে উঠেছে। ওর বাবা সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন, রণকৌশল নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেছেন তিনি; বাবার দেখাদেখি পল কেড্রিকও সামরিক বিষয়ে ছোট বেলাতেই আগ্রহী হয়ে উঠে। বাবার কাছেই শিক্ষা লাভ করে ও, তা ছাড়া এক খবরকাগজের মালিকও ওকে অনেক কিছু শিখিয়েছে-কোনও এক শীতকালে ওদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল সে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের কৌশল সম্পর্কে কেড্রিকের আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় ও, গৃহযুদ্ধে অংশ নেয়। একাধিক লড়াইতে সফলতার মধ্য দিয়ে ওর বহুদিনের শিক্ষা আর চিন্তাভাবনা বাস্তব ভিত্তি লাভ করে তবে অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রচুর মানুষ হত্যা করার পরও নিষ্ঠুর পাষণ্ড হয়ে যায় নি।

একটা জায়গা থেকে একদল আউট-লকে উচ্ছেদ করার কাজটা প্রথম প্রথম সাধারণ মনে হয়েছিল, উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের গন্ধ পেয়েছিল ও। তখন মনে হয়েছে মনের মতো একটা কাজ পাওয়া গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সন্দেহ জাগছে, কাজটা নেয়া অদৌ ঠিক হয়েছি কি না। ডাই রীডের কথা আর মাস্ট্যাংবাসীদের হাবভাবে মনে হচ্ছে প্রথমে যেমন ভেবেছিল, ব্যাপারটা আসলে তত সহজ-সরল নয়। যাই হোক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে জায়গাটা নিজের চোখে দেখতে হবে, বুঝতে হবে, কোথায় কাদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে নামতে যাচ্ছে। আরেকটা কথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, অচিরেই, সঙ্গীদের জেরার মুখোমুখি হতে হবে ওকে। যাকে যাকে খুন করা দরকার খুন করে পাওনা টাকা বুঝে নিয়ে চলে যেতে চাইবে ওরা, দেরি সইবে না।

শুধু লরেডো শ্যাডই সম্ভবত ওর লাইনে চিন্তা ভাবনা করছে। সুযোগ পেলে আজ একবার টেক্সানের সঙ্গে আলাপ করতে হবে, ভাবল পল কেড্রিক, বুঝতে হবে সে কী জানে, কতটুকু বোঝে। গতকাল ডরনি বলছিল, লরেডো শ্যাড দলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লোক; কেড্রিকেরও তাই মনে হচ্ছে। আত্মবিশ্বাসী বলেই ওর আচরণে এরকম সহজ একটা ভাব এসেছে। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলেই কেবল এতটা আত্মবিশ্বাসী হতে পারে কেউ। কীভাবে বিপদের মোকাবিলা করতে হয় এই লোক সেটা জানে।

কফি শেষ করে উঠে দাঁড়াল কেড্রিক, ধীর পায়ে ঝর্নার ধারে এল, দুঢোক পানি খেয়ে দাড়াল সোজা হয়ে; এগিয়ে গেল ঘোড়র কাছে। ক্যাম্পে পৌঁছে জিনের বাঁধন ঢিল করে দিয়েছিল, ধীরে সুস্থে বাঁধতে শুরু করল। চমৎকার হাওয়া বইছে। ওরা চাপা কণ্ঠে কথা বললেও প্রায় প্রতিটি শব্দই

পরিষ্কার কানে আসছে ওর। প্রথম প্রশ্নটা ধরতে পারল না ও, কিন্তু ফেসেনডেনের জবাব স্পষ্ট শোনা গেল।

ওকে ঘটাতে যেয়ো না, ভরনি। সাত ঘাটের পানি খাওয়া লোক। এখন আমার মনে পড়েছে, ওর সঙ্গে আমার আগেও একবার মোলাকাত হয়েছে।

দাঁড়িয়ে আছে কেড্রিক, এতদূর থেকেও যেন ওদের উত্তেজনার আঁচ লাগছে।

ইনজুন টেরিটোরিতে ওর কাছ থেকে প্যাটারসনের গরু ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম আমরা। পাত্তা পাই নি।

কী হয়েছিল? জানতে চাইল লী গফ, লড়াই?

সামান্য। আমি তখন ল্যানো গানম্যান চাক গিবন্সের সঙ্গে থাকতাম। ওর স্বভাব ছিল গায়ে পড়ে ঝগড়া করা। আমার সঙ্গেও বেশ কয়েকবার গানফাইট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু আমি ঝামেলা এড়িয়ে গেছি। ঝগড়া করে টাকা হারানোর ঝুঁকি নেই নি। কিন্তু চাক একটা খচ্চর, কেড্রিক যখন ওকে রুখে দাঁড়াল, গরু দিতে রাজি হলো না, ওকে চ্যালেঞ্জ করে বসল

কফিতে চুমুক দিল ফেসেনডেন। অধৈর্যভাবে অপেক্ষা করছে সবাই। অবশেষে তর সইতে না পেরে লী গফ জানতে চাইল, তারপর?

কাঁধ ঝাঁকাল ফেসেনডেন। কেড্রিক বেঁচে আছে, দেখতেই পাচ্ছ।

মানে কীভাবে ঘটল ব্যাপারটা তাই জিজ্ঞেস করেছি।

খাপ থেকে পিস্তল বের করতে পারে নি গিবন্স। কেড্রিক কখন ড্র করেছে দেখতেই পাই নি আমরা; কিন্তু পরে দেখা গেল চাকের শার্টের বাঁ দিকের পকেটে একটা আধুলি দিয়ে ঢাকা যাবে, এত কাছাকাছি দুটো ফুটো।

এরপর আর কথা এগোল না। জিনের পেটি বাঁধার পেছনে আরও কিছু সময় ব্যয় করল কেড্রিক। তারপর ঘোড়া ছেড়ে দূরে সরে গেল, ক্যাম্পের চারদিকে একবার চক্কর মারল, চোখ বোলাল এদিক-ওদিক। চেহারায় চিন্তার ছাপ।

অভিজ্ঞতা ওকে শিখিয়েছে, কর্মস্থল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখার গুরুত্ব কতখানি। মাস্ট্যাং থেকে টেরিটোরি লাইন পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল রণাঙ্গনে পরিণত হতে যাচ্ছে অচিরেই, গোটা এলাকা সম্পর্কে ভালো করে জানার ওপরই হয়ত বাচামরা নির্ভর করবে। যে কোনও এলাকা সম্পর্কে জানার সুযোগ সাধারণত হাতছাড়া করে না ও।

আগেও বহু কঠিন লোকের কাছ থেকে কাজ আদায় করেছে কেড্রিক, তাই এই দলটাকে নিয়ে ভাবছে না। যদিও জানে, এই দলের লোকগুলো বিপজ্জনক, কিন্তু একসঙ্গে ওদের সামলানো তেমন কঠিন হবে না; তবে আলাদা আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সমস্যা দেখা দেবে। কারণ, ওরা একা থাকতেই পছন্দ করে, দলের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা থাকার কথা নয়। মাত্র। দুটো জিনিসে বিশ্বাস করে এরা, সিক্সগানে দক্ষতা এবং টাকা। এ দুটোর ওপর ভরসা করে বেঁচে আছে; মারাও যাবে।

ফেসেনডেন মুখ ভোলায় একদিক দিয়ে সুবিধে হয়েছে। ওর ব্যাপারে কারও মনে দ্বিধা থাকলে এখন তা দূর হয়ে যাবে। ও একজন পিস্তলবাজ জানার পর নির্দেশ মানতে আপত্তি করবে না; ভয়ে নয়, ওকে স্বগোত্রীয় একজন, ভেবেই ওর কথা শুনবে। ও উড়ে এসে জুড়ে বসেছে এমনটি ভাববে না।

বিশ্রাম নিয়ে আস্তে ধীরে আবার যখন ওরা পথে নামল, আগুনের হলকা, বইছে যেন চারদিকে, উত্তপ্ত হয়ে আছে মরুভূমি। দিগন্তে সামান্যতম আলোড়ন নেই, ধু-ধু চরাচর। দূরে একটা মেসার মাথার ওপর অবিরাম চক্কর দিচ্ছে একটা নিঃসঙ্গ শকুন-খাবার খুঁজছে। তীক্ষ্ণ নজরে চারদিক জরিপ করছে ক্যাপ্টেন পল কেড্রিক। তবু হঠাৎ হঠাৎ বারান্দায় দেখা মেয়েটার চেহারা মনে পড়ে যাচ্ছে। সামান্থা ফক্স সুন্দরী। জন গুন্টারের ভাগ্নী হলেও, বোঝা যায়, মামার সব কাজে তার অনুমোদন নেই।

মেয়েটা এখানে এসেছে কেন? কীথের সঙ্গে কী সম্পর্ক তার? ওর প্রতি কীথের বিদ্বেষ টের পেয়েছে কেড্রিক, অবাক হয় নি। এমনিতে ঠাণ্ডা স্বভাবের মানুষ ও, সহজে রাগে না, কিন্তু ওকে যদি কেউ খোঁচায়, বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা এক বাঘ গা ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠে, ওলট-পালট করে দেয় সবকিছু। নিজের সুপ্ত ক্রোধের কথা জানে, তাই সতর্ক থাকে ও, মেপে কথা বলে; সংযত রাখে নিজেকে।

হঠাৎ লাগাম টেনে ঘোড়া থামাল ডরনি শ। ওটা ল্যারগো ক্যানিয়ন, সামনের সংকীর্ণ উপত্যকার দিকে ইঙ্গিত করল সে। ওই যে ডান দিকে দূরে পাহাড়টা দেখছ, ওটাই দ্য অরফ্যান। ইনজুনরা ওখানে শাদা মানুষদের উঠতে দেয় না; শোনা যায়, ওখানে নাকি চমৎকার মিঠে পানির একটা ঝর্না আছে, সারা বছর পানি পাওয়া যায়।

এর পরই শুরু হয়েছে বারউইকদের এলাকা। একেবারে অ্যারিজোনার সীমান্ত ঘেঁষা জায়গাটুকু না পেলেও; বিশাল একটা এলাকা পেতে যাচ্ছে। স্কোয়াটারদের ঘাঁটি ইলো বাট নামে একটা শহর; গোটা বার ঘর-বাড়ি আছে ওখানে; দোকান, আস্তাবল, করাল, স্যালুন এমনকী ব্যাংকও পাবে।

চিন্তিত চেহারায় মাথা ঝাঁকাল কেড্রিক। সামনে যদূর চোখ যায়, ধু-ধু মরুভূমি; কিছুতেই একে জলাভূমি বলা যায় না। আশপাশে পাছপালা চোখে পড়ছে না, লতানো কিছু মেসকিট ঘাস কিংবা ব্ল্যাক গ্র্যামা রয়েছে, এ ছাড়া ক্যাকটাস, সোপউইড, ক্রিওসেট ঝোঁপ আর ক্যাট-ক্ল ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে জুন্মেছে। কোনও কোনও ওঅশে অবশ্য গাঢ় সবুজ পিনন কিংবা জুনিপারও আছে।

আরও সামনে এগোল ওরা। ল্যারগো ক্যানিয়নে ঢুকল, তার পর বেরিয়ে এসে পশ্চিম দিকে চলল। সতর্ক কেড্রিক। মুহূর্তের জন্যে অনেক দূরে একজন অশ্বারোহীকে দেখতে পেল। কিছুক্ষণ পর একই ঘোড়সওয়ারকে আরও খানিকটা কাছাকাছি দেখে অনুমান করল ওদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। প্রার্থনা করল ও, কোনওরকম হামলা যেন না হয়।

কোম্পানির জমির প্রায় মাঝখানে আস্তানা গেড়েছে স্কোয়াটাররা। ওদের নেতার নাম বর ম্যাকলেনন। ওর আবার দুই চ্যালা আছে। একজন পিটার সেগাল অন্যজনের নাম পিট লেইন। গতকাল জানতে চাইছিলে ওরা লড়বে কিনা। এই তিন শয়তানের বাচ্চা অন্তত লড়বে। সেগালের মোটামুটি বয়স হয়েছে; চল্লিশের কোঠায় রয়েছে ম্যাকলেনন, এক কালে. একটা কাউটাউনের মার্শাল ছিল; আর লেইন, ব্যাটা বড় কঠিন চীজ, ঠিক বোঝা যায় না; কোমরে দুটো পিস্তল ঝুলিয়ে ঘোরে, অসম্ভব প্রভাব রাখে স্কোয়াটারদের ওপর। শুনেছি, ডুরাংগোতে নাকি একবার গানফাইটে জড়িয়ে পড়েছিল, একাই ঝামেলা সামাল দিয়ে বেরিয়ে আসে।

কেড্রিকের পেছন থেকে কে যেন নিচু কণ্ঠে বলে উঠল, বোনটার মতোই দুর্বোধ্য চরিত্র!

চেপে বসল ডরনি শয়ের ঠোঁটজোড়া, কিন্তু এ-ছাড়া আর কোনও প্রতিক্রিয়া হলো না। তবে কেড্রিকের তথ্যের ভাণ্ডার কিছুটা পূর্ণ হলো। নিঃসন্দেহে শত্রু-শিবিরে ডরনি শয়ের একজন বন্ধু আছে, তার কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্যই কীথকে দেয় সে। আপন, ভাই আর গোষ্ঠীর সঙ্গে বেইমানি করছে মেয়েটা? অসম্ভব নয়। ওদের চোখে ধরা না পড়ে কীভাবে মেয়েটার কাছে যাওয়া-আসা করে ডরনি?

ওয়েলশম্যান ডাইরীডের কথা বলে নি ডরনি। কিন্তু ছোটখাট শক্তিশালী মানুষটার একটা ভূমিকা না থেকেই পারে না।ওর কথা ভুললে চলবে না।

হঠাৎ গজ তিরিশেক দূরের একটা ক্যানিয়ন থেকে এক অশ্বারোহী বেরিয়ে এল, ঘোড়া নিয়ে এগোল ওদের দিকে। বিড়বিড় করে গাল বকে লাগাম টানল ডরনি শ। একসঙ্গে থামল বাকিরাও।

অশ্বারোহী একটা মেয়ে। চমৎকার স্বাস্থ্য, ইন্ডিয়ানদের মতো বাদামি ত্বক, এক মাথা কালো চুল, বড় বড় দুচোখে অদ্ভুত দ্যুতি; হাত দুটো ছোট, পুতুলের মতো।

প্রথমে শয়ের দিকে তাকিয়ে তারপর অন্যদের ওপর চোখ বোলাল সে। অবশেষে পল কেড্রিকের ওপর স্থির হলো তার দৃষ্টি। প্রচুর সময় নিয়ে মাপল ওকে। তোমার নতুন বন্ধুটি কে, ডরনি? জিজ্ঞেস করল, পূরিচয় করিয়ে দাও?

তীক্ষ্ণ কঠিন দৃষ্টিতে কেড্রিকের দিকে তাকাল ডরনি শ ক্যাপন কেড্রিক, এসো, স্যু লেইনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।

ক্যাপ্টেন? নতুন দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল মেয়েটা। আর্মিতে ছিলে?

হ্যাঁ, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল কেড্রিক। মেয়েটার পিনটো দেখে বোঝা যাচ্ছে, ওদের ওপর এ নজর রাখে নি। অর্থাৎ কাছেপিঠে আরও একজন ঘোড়সওয়ার আছে! কে?

ঘর ছেড়ে একা এত দূর আসা কি ঠিক হয়েছে, সু? বাধা দিয়ে প্রশ্ন করল ডরনি শ।

ঠিক-বেঠিক আমি ভালো বুঝি, ডরনি, ঠাণ্ডা স্বরে জবাব দিল মেয়েটা। ডরনির চেহারা লাল হয়ে গেছে, লক্ষ্য করল কেড্রিক। যাক গে, তোমাকে, কিংবা ক্যাপ্টেন কেড্রিক যদি লিডার হয়, ওকে সাবধান করে দিতে এসেছি আমি। তোমাদের আর এগোনো ঠিক হবে না। সকালে আলোচনায় বসেছিল ওরা, ম্যাকলেননও ছিল। ওরা ঠিক করেছে, বাইরের ঘোড়সওয়ার কিংবা সারভেঅরদের দেখলেই গুলি করবে। এখন থেকে এটা তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ এলাকা। খবরটা জামাতে একজন লোককে মাস্ট্যাংয়ে পাঠানো হচ্ছে, আজ রাতে পৌঁছে যাবে সে।

বলে কী মেয়েটা! শুষ্ক কণ্ঠে বলল লী গফ। ওরা দেখছি অনেক বেড়ে গেছে। তা আমরা সামনে বাড়লে কী হবে?

গফের দিকে তাকাল স্যু লেইন। লড়াই, শান্ত কণ্ঠে বলল সে।

ধেত্তের, অধৈর্য কণ্ঠে বলল পয়েন্সেট, অনর্থক কথা বলে সময় খরচ করার কী দরকার? লড়াই করতেই তো এসেছি আমরা, নাকি? চল, আগে বাড়ি, কেমন লড়াই জানে ব্যাটারা দেখি!

চিন্তিত চেহারায় স্যু লেইনের আপাদমস্তক জরিপ করল পল কেড্রিক। মেয়েটা সুন্দরী, সন্দেহ নেই। সামান্থা ফক্সের মতো রূপসী, হয়তো নয়, তবে সুন্দরী।

পাহারা দেয়ার জন্যে লোক পাঠিয়ে দিয়েছে? জিজ্ঞেস করল ও।

কেড্রিকের দিকে তাকাল স্যু লেইন। এখনও না পাঠালেও শিগগিরই পাঠাবে। হাসল স্যু লেইন। পাহারা থাকলে তোমাদের সাবধান করার সুযোগ পৈতাম?

তুমি কার পক্ষে, মিস লেইন? জানতে চাইল কেড্রিক।

ঝট করে ঘাড় ফিরিয়ে অগ্নিদৃষ্টি হানল ডরনি শ। কিন্তু সে কিছু বলার সুযোগ পেল, না। স্যু লেইনই জবাব দিল। কারও না। বলতে পারো আমি নিজের পক্ষেই আছি। আমি কী চাই না চাই সেটা আমিই ঠিক করি। ভাই কিংবা অন্য কারও তোয়াক্কা করি না। ওরা নির্বোধ, নইলে এই মরুভূমির জন্যে লড়াই করবে কেন? বিরক্তির সঙ্গে হাত খেলিয়ে চারপাশ দেখাল ও। এখানে মানুষ বাঁচে? আমি চাই ওরা হারুক। তা হলে এখান থেকে অন্য কোথাও যেতে পারব!

আচমকা ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল স্যু লেইন। যে কথা বলতে এসেছিলাম বলেছি, এবার চলি।

আমিও আসছি, হঠাৎ বলল ডরনি শ।

শয়ের দিকে তাকাল স্যু লেইন। না! এবার কেড্রিকের দিকে দৃষ্টি দিল, আপাদমস্তক জরিপ করল ওকে। ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটের কোণে। তবে ক্যাপ্টেন কেড্রিক চাইলে আসতে পারে। ওকে ওরা চেনে না!

হেসে উঠল কে যেন। মরার মতো শাদা হলো ডরনির চেহারা, সাঁই করে ঘোড়া ঘোরাল। ঠোঁট ফাঁক হয়ে দাঁতের পাটি বেরিয়ে পড়েছে। ডান হাত পিস্তল বের করার জন্য তৈরি।

কে হাসল? জিজ্ঞেস করল ডরনি, গলাটা একটু যেন কেঁপে গেল তার। হাসল কে?

মিস লেইন, শান্ত কণ্ঠে বলল কেড্রিক, ডরনি শ গেলেই ভালো হত। এলাকাটা আমার চেয়ে বেশি চেনে ও।

ঝলসে উঠল ডরনির চোখ। আমি জানতে চেয়েছি, কে হেসেছে?

ঘাড় ফেরাল কেড্রিক। রাখো এসব, শ, স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল ও, আমি যতক্ষণ কম্যান্ডে আছি কেউ মারামারি করতে পারবে না!

মুহূর্তের জন্যে যেন পাথর হয়ে গেল ডরনি শ। পরক্ষণে সাপের মতো ঠাণ্ডা চোখে কেড্রিকের দিকে তাকাল। আমাকে বলছ? ওর কণ্ঠে একই সঙ্গে বিদ্রূপ আর অবিশ্বাস।

বিপদ চিনতে পল, কেড্রিকের ভুল হয় না, কিন্তু উত্তেজিত হলো না ও, শুধু মাথা ঝাঁকাল। তোমাকে একা নয়, ডরনি, সবাইকে বলছি। বিশেষ একটা কাজ নিয়ে এখানে এসেছি আমরা। তোমাকেও আর সবার মতো টাকা দেয়া হচ্ছে। আমরা যদি নিজেরা মারপিট করে সময় নষ্ট করি, কাজ এগোবে কী করে? এখন আমাদের শক্তি হ্রাস পেলে মুশকিল হয়ে যাবে।

তা ছাড়া নিজের লোকদের মধ্যে খুনোখুনি কীথ কিংবা বারউইক পছন্দ করবে না।

কেড্রিকের চোখে চোখে তাকিয়ে রইল ডরনি শ। অসহনীয় নীরবতা। ঝোঁপের মধ্যে একটা ঝিঝি পোকার ডাক নিস্তব্ধতাকে যেন বাড়িয়ে তুলছে। মাটিতে পা ঠুকে মাছি তাড়াল স্যু লেইনের ঘোড়া। সহসা পল কেড্রিক বুঝতে পারল, ডরনি শ ওকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। সম্ভবত এই প্রথম কোনও কাজে বাধা দেয়া হয়েছে তাকে। খেপে গেছে সে।

আস্তে আস্তে পিস্তলের কাছ থেকে হাত সরিয়ে নিল ডরনি শ। ঠিকই বলেছ, ক্যাপন, শুষ্ক কণ্ঠে বলল সে। এখনও গোলাগুলির সময় আসে নি। তা ছাড়া, বারউইক আবার রাগী মানুষ।

কেড্রিকের দিকে তাকাল স্যু লেইন, দৃষ্টিতে অবহেলা। আমি যাচ্ছি। তোমরা সাবধানে থেকো।

কিন্তু স্যু লেইনের ঘোড়া পা বাড়ানোর আগেই কেড্রিক জানতে চাইল, মিস লেইন, বল তো তোমাদের দলে কার একটা লম্বা পাঅলা গুলা আছে?

ঝট করে ঘাড় ফেরাল স্যু লেইন, ফ্যাকাসে চেহারা। কী-গ্রুল্লা?

হ্যাঁ, বলল কেড্রিক, সকাল থেকে ওটায় চেপে আমাদের ওপর নজর রাখছিল কে যেন। এই মুহূর্তে আধমাইলটাক দূরে আছে সে। এবং, আবার বলল ও, একটা ফীল্ডগ্লাসও আছে তার কাছে!

খিস্তি ঝেড়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ফেসেনডেন। চোখ কটমট করে ইতিউতি নজর বোলাল পয়েন্সেট। কেবল ডরনি শয়ের মুখেই কথা ফুটল। শুকনো অবিশ্বাস ভরা কণ্ঠে বলব, গ্রুলা? এখানে?

ব্যস, আর কিছু বলল না সে।শয়ের মন্তব্যে বিভ্রান্তিতে পড়ল কেড্রিক, তীক্ষ্ণ চোখে জরিপ করল ওকে। গ্রুলা ঘোড়াটার কথা মনে হচ্ছে আগে। থেকেই জামে ডরনি, কিন্তু এখানে দেখা যাবে ভাবে নি। স্যু লেইনের বেলায়ও একই কথা খাটে। স্পষ্টতই, ওর প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে সে।

অনেকক্ষণ পর, নর্থ ফোর্কের ঝর্নার কাছে ফিরে আসার সময়ও ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভাবল ও নতুন একটা তথ্য, হয়তো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ-আবার অর্থহীনও হতে পারে।

ফিরতি পথে খুব একটা কথাবার্তা হলো না ওদের মাঝে। লড়াই করতে না পেরে হতাশ হয়েছে পয়েন্সেট, তবে কিছুটা সন্তুষ্ট ফের বিশ্রামের সুযোগ পেয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *