২০. নড়ো না, ডাংম্যান

নড়ো না, ডাংম্যান, কঠিন গলায় আদেশ দিলেন ফ্লেচার। তাকে ধরার নির্দেশ দিলেন সহকারীদের। ডাংম্যান, আরেকটা চোর কোথায়?

এই যে, স্যার, ধরেছি, অন্ধকার থেকে বলে উঠল একজন পুলিশ।

সার্চ করা হচ্ছে ডাংম্যানকে, হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার কাছ থেকে ছোট একটা বস্তা নিয়ে চীফের দিকে বাড়িয়ে দিল একজন পুলিশ। ধাক্কা দিয়ে রিগোকে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো তার বসের পাশে।

বস্তা খুলে ডাংম্যানের দিকে তাকালেন ফ্লেচার। স্বর্ণ। চাম্যাশ হোর্ড পেয়েছ। ভাল চাইলে বলো কোথায় আছে। তোমার কথা সব জানি আমরা।

আমার কথা? হাসছে ডাংম্যান। নোংরা ওই ইনডিয়ানগুলো কিছু বানিয়ে বলেছে?

অস্ট্রিলিয়ান পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি আমি।

হাসি মুছে গেল ডাংম্যানের মুখ থেকে। অস্ট্রেলিয়া? জানলেন কি করে?

কিশোর, মাথা নেড়ে কিশোরকে বলতে ইঙ্গিত করলেন চীফ।

অন্ধকার থেকে উড়ে এসে ডাংম্যানের মাথায় বসল বড় একটা পাখি। কাকের সমান, মাছরাঙার মত লম্বা ঠোঁট, তেমনি খাটো লেজ, শরীরের তুলনায় মাথাটা অনেক বড়, ঝটকা দিয়ে দিয়ে নাড়ছে। বড়সড় মাছরাঙাই বলা যায়।

কি পাখি? অদ্ভুত পাখিটার দিকে তাকিয়ে আছে মুসা।

কেউ জবাবু দেয়ার আগেই ঠোঁট ফাঁক করে হেসে উঠল পাখিটা, বিকট অট্টহাসি ছড়িয়ে দিল পর্বতের কন্দরে কন্দরে।

এই তাহলে ভূতের হাসি! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। হায় হায়, একটা পাখির ভয়ে কাবু হয়ে ছিলাম!

কুক্যাবুরা, মোটেই অবাক হয়নি কিশোর। অস্ট্রেলিয়ায় একে বলে লাফিং জ্যাকাস। চীফ, এই নামটাই মনে করতে পারছিলাম না।

একটা টর্চ নিয়ে বিশেষ অ্যাঙ্গেলে ডাংম্যান আর পাখিটার ওপর আলো ফেলল সে। ছায়া পড়ল গিয়ে পাহাড়ের চেয়ালে। বিচিত্র কুঁজো একটা ছায়া, মাথাটা ঝটকা দিয়ে দিয়ে নড়ে, লম্বা নাক। ওই যে আমাদের ভূতের ছায়া।

বুঝলাম, ডাংম্যান বলল, তুমিই আমার সর্বনাশ করেছ। এই পাখিটাও করেছে অনেকখানি। সরিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু এত বেশি ভক্ত হয়ে পড়েছে, সরতে চায় না, তাড়িয়ে দিলেও বার বার আসে।

খালি পাখিটার দোষ না, ডাংম্যান, চীফ বললেন, তোমার স্যাণ্ডউইচের মোড়কও দায়ী। আরও হুঁশিয়ার হওয়া উচিত ছিল তোমার।

হুঁ, ছেলেটাকে আণ্ডার এস্টিমেট করেই ভুল করেছি। যাক, যা হয়েছে হয়েছে, কিছু অন্তত পেয়েছি। তো, ছেলেগুলোকে চাই?

চেঁচিয়ে উঠলেন মিস্টার মিলফোর্ড, কি করেছ ওদের?

আর চালাকির চেষ্টা করো না, ডাংম্যান, কড়া গলায় বললেন চীফ। এমনিতেই বহুদিন জেল খাটতে হবে তোমাকে।

তা বোধহয় হবে না, কারণ, আমি চলে যাচ্ছি। পথ-খরচের ব্যবস্থা করেই রেখেছি, হেসে চোখ টিপল ডাংম্যান। ওই বস্তাটায় কিছু সোনা আছে। হোর্ডের তুলনায় খুবই সামান্য, কিন্তু তা-ই বা কম কি? ওগুলো নিয়েই আমি চলে যাব, আপনারা কিছু বলতে পারবেন না। তবে, আসামী যদি একান্তই চান, ল্যাঙলী আর রিগোকে রেখে দিতে পারেন।

শয়তান! ধোকাবাজ! চেঁচিয়ে উঠে বসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল ল্যাঙলী, কিন্তু দুজন পুলিশ ধরে ফেলল তাকে।

চুঁ-চুঁ, ল্যাঙলী, কি ছেলেমানুষী করছ? তিরস্কার করল ডাংম্যান। তোমাদের ভাগ দেব বলেছিলাম, মাল সব পেলে দিতামও। আমিই তো পেয়েছি এই এত্তোটুকুন। হ্যাঁ, চীফ, একটা প্রস্তাব দিতে চাই। আপনি আমাকে ওই সোনাগুলো আর এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবেন, বিনিময়ে ছেলেরা কোথায় আছে আমি জানাব।

কঠিন কণ্ঠে ধমকে উঠলেন চীফ, ডাংম্যান!

ওসব ধমক-ধামকগুলো রাখুন এখন। কোন লাভ হবে না, হাসি হাসি ভঙ্গিটা চলে গেল ডাংম্যানের, কর্কশ হয়ে উঠল কণ্ঠস্বর। যা বলছি করুন, নইলে ছেলেগুলোকে জ্যান্ত পাবেন না। ওদের কাছে খাবার পানি কিচ্ছু নেই। আমাকে চলে যেতে দিন। ফোনে জানাব কোথায় আছে ওরা। তা নাহলে মরুক।

এতখানি করার সাহস পাবে না।

পাব, চীফ, পাব। আপনি আমাকে চেনেন না। খিকখিক করে হাসল ডাংম্যান। তার সঙ্গে গলা মেলানোর জন্যেই বুঝি বুনো হাসি হেসে উঠল মাথায় বসা পাখিটা।

অস্থির হয়ে উঠলেন মিস্টার মিলফোর্ড। ফ্লেচারকে কিছু বলার জন্যে এগোলেন, তার আগেই বলে উঠল কিশোর, চীফ, রাজি হবেন না। আমি বুঝে গেছি কোথায় আছে ওরা।

ঝট করে কিশোরের দিকে ফিরল ডাংম্যান।

কোথায়, কিশোর? জলদি বলো? তর সইছে না আর মিস্টার মিলফোর্ডের।

ওই যে ওখানে, টাওয়ারের মত খাড়া হয়ে থাকা পর্বত-চূড়া দেখাল সে। ম্যাগনাস ভারদির কথাগুলো ছিল : ইট ইজ ইন দা আই অভ দা স্কাই হোয়্যার নো ম্যান ক্যান ফাইও ইট। ম্যান কেন বলেছে সেটা তো বুঝলামই, বাকি থাকল আই অভ দা স্কাই। সূর্য কিংবা চাঁদের কথা বলেনি। সত্যি সত্যি চোখের মত দেখতে একটা জিনিসের কথা বলেছে। ওই দেখুন।

জ্যোৎস্নায় আলোকিত আকাশের পটভূমিতে বিরাট একটা মুখ দেখা গেল, মানুষের মুখের আদল, দুটো চোখ, নাক, মুখ-নিখুঁত মানুষ যেন। বিশাল এক পাথর, আবছা আলোয় ওরকম লাগছে।

বাঁ চোখটা দেখছেন? বলল কিশোর। বেশি কালো। মনে হচ্ছে সুড়ঙ্গমুখ। ওটার ভেতরেই রয়েছে চাম্যাশ হোর্ড। রবিন ওখানেই আছে।

তোমার ধারণা আমি উঠেছি ওখানে? ডাংম্যানের কথায় জোর নেই।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। ইনডিয়ান ছেলেদের সাহায্যে উঠেছ। অস্ট্রেলিয়ান পুলিশ জানিয়েছে, বড় বড় দালান বেয়ে উঠে চুরি করেছ তুমি। কাজেই পাহাড়েও উঠতে পেরেছ।

বেশ, ধরলাম আছে ওরা ওখানে। নামাবে কি করে?

জ্যাকোয়া আর জেরমি যাবে।

সঙ্গে সঙ্গে বলল জ্যাকোয়া, সি, সহজ। খুব সহজ।

একটা ছেলের কথা শুনবেন আপনারা? ফ্লেচারকে বলল ডাংম্যান। আগেই বলে দিচ্ছি, পরে আমাকে দুষতে পারবেন না। ওর অনুমান ভুল হলে আমাকে কিছু বলবেন না। পরে আমি কোন কথা শুনব না। যা করার বুঝেসুঝে করুন।

দ্বিধায় পড়ে গেলেন ফ্লেচার। চেয়ে আছেন মিস্টার মিলফোর্ডের দিকে, শোনার জন্যে অধীর।

আস্তে কাশি দিলেন মিস্টার মিলফোর্ড। কিশোরের ওপর ভরসা আছে আমার।

অল রাইট, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন চীফ। জ্যাকোয়া আর জেরমি যাবে। ছেলেদেরকে বেঁধে রেখেছে কিনা কে জানে। তাহলে কাউকে গিয়ে নেমে তুলে আনতে হবে ওদের, কিংবা বাঁধন কেটে দিয়ে আসতে হবে, যাতে ওরা নিজেরাই বেরিয়ে আসতে পারে। জ্যাকোয়া আর জেরমি ঢুকতে পারবে তো?

ওরা ঢুকতে না পারলে নিশ্চয় ডাংম্যানও পারেনি, কিশোর বলল। তারমানে, গুহার মুখে পাথর চাপা দিয়ে এসেছে। একটা ছেলেকে বাধ্য করেছে অন্য চারজনকে বাধতে, তারপর ওই ছেলেটাকেও বেধে ঠেলে ফেলে দিয়েছে ভেতরে। তার ওপর পাথর চাপা…খুব খারাপ লোক তুমি, ডাংম্যান!

ভেতরে ঢুকবে কে তাহলে? চীফের জিজ্ঞাসা।

আমি, এগিয়ে এল মুসা।

তুমি পারবে না, কিশোর বলল। তোমার শরীর না-ও ঢুকতে পারে। আমাকেই যেতে হবে।

দীর্ঘ একটা মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন চীফ। তোমরা, সত্যি, অমন ছেলে! ঠিক আছে, যাও।

ওঠার জন্যে তৈরি হলো দুই ইনডিয়ান। কিশোরকে পিঠে তুলে নিল জ্যাকোয়া। উঠতে শুরু কল দেয়াল বেয়ে।

নিচে, গিরিসঙ্কটের অন্ধকার মেঝেতে দাঁড়িয়ে ওপর দিকে চেয়ে আছে দর্শকরা। অনেক ওপরে উঠে গেছে তিনজন। কালো কয়েকটা পোকার মত লাগছে এখন।

উঠে যাচ্ছে দুই ইনডিয়ান। কিশোর সঙ্গে না থাকলে আরও তাড়াতাড়ি উঠতে পারত।

অবশেষে পৌঁছল ওরা বাঁ চোখটার কাছে।

থামল এক মুহূর্ত। তারপর হারিয়ে গেল অন্ধকারে।

পেরেছে! হাঁপ ছাড়লেন ফ্লেচার।

নামবে কি করে আবার, ভাবছি, বিড়বিড় করলেন মিস্টার মিলফোর্ড।

উঠতে যখন পেরেছে, নামতেও পারবে।

 

বাটির মত একটা গর্ত, তলায় বড় পাথর চাপা দেয়া। মোটা একটা লোহার দণ্ড পড়ে আছে পাথরটার কাছে, আর কিছু স্বর্ণ।

ওই ডাণ্ডা দিয়ে চাড় মেরে পাথর ফেলেছে ডাংম্যান, বলল কিশোর। জ্যাকোয়া, সরাতে হবে।

তিনজনে মিলে সরিয়ে ফেলল পাথরটা। ছোট কালো একটা গর্ত দেখা গেল, সরু সুড়ঙ্গের মুখ। ঠিকই আন্দাজ করেছে কিশোর, জ্যাকোয়া কিংবা জেরমি ঢুকতে পারবে না, মুসারও কষ্ট হত ঢুকতে। বেল্ট থেকে টর্চ খুলে ঢোকার জন্যে তৈরি হলো সে। নিজের এক পায়ে দড়ি বেঁধে নিয়ে অন্য প্রান্ত ধরতে বলল দুই ভাইকে।

আমি তিনবার হ্যাঁচকা টান দিলে টেনে তুলবে আমাকে।

লম্বা হয়ে শুয়ে সুড়ঙ্গে মাথা ঢুকিয়ে দিল কিশোর। কল করে এগোল। খুবই সরু, এক জায়গায় এসে কিশোরও আটকে গেল। জোরাজুরি করে, বান মাছের মত শরীর মুচড়ে পেরোল সে জায়গাটা।

কয়েক ফুট পরে আরও সরু আরেকটা জায়গা, কাঁধ আটকে গেল কিশোরের। কিছুতেই ঢুকতে পারছে না। বাঁয়ে একটা নড়াচড়া টের পেয়ে টর্চ জ্বালল। আঁতকে উঠল, আরেক মুহূর্ত দেরি করলেই পাথরের রাড়ি খেয়ে ছাতু হয়ে যেত মাথা। রবিন!

সাড়া দাওনি কেন? হেসে হাত থেকে পাথরটা ফেলে দিল রবিন। এই একটু আগেও ছেলেগুলোকে বলছিলাম, তুমি আসবে।

আলো ফেলে দেখল কিশোর। আর দুই ফুট পেরোতে পারলেই গুহায় ঢুকতে পারত। টর্চ ঘোরাল সে। হাসিমুখে তার দিকে চেয়ে আছে বাদামী চামড়ার এক কিশোর, বয়েস রবিনের চেয়ে কম।

আলো আরও পিছে সরিয়ে দেখো, হেসে বলল রবিন।

ছোট্ট গুহার শেষ মাথায় আলো ফেলল কিশোর। কেঁপে উঠল হাত, আরেকটু হলেই টর্চ ছেড়ে দিয়েছিল হাত থেকে।

আরও তিনটে ছেলে বসে আছে। তাদের কাছেই রয়েছে গুপ্তধনের স্তুপ। সোনার ছোট-বড় ইঁট, নুড়ি, নানা রকম মোহর, অলঙ্কার, আর প্রায় সব ধরনের মূল্যবান পাথর। টর্চের আলোয় জ্বলছে রামধনুর সাত রঙ সৃষ্টি করে।

চাম্যাশ হোর্ড! বিড়বিড় করল কিশোর। সত্যি পাওয়া গেল তাহলে!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *