১৬. মরচে ধরা পুরানো একটা লোহার টেবিল

মরচে ধরা পুরানো একটা লোহার টেবিলের সামনে বসে আছে ডাংম্যান। চেয়ে রয়েছে রঙচটা কাঠের দেয়ালের ধারে বসা মুসা আর রবিনের দিকে।

সত্যি বলছি, তোমাদের ব্যথা দিতে খুব খারাপ লাগছে আমার, হাসল ডাংম্যান।

জবাব দিল না দুই গোয়েন্দা। কি বলবে? শক্ত করে হাত-পা বাঁধা। কোথায় রয়েছে, জানে না। শুধু জানে, একটা পাহাড়ী অঞ্চলে রয়েছে। চোখ বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে ওদের। দরজার গুলো সব খুলে ফেলেছিল মুসা, ঠেলা দিতেই বাড়ি কাঁপিয়ে দড়াম করে পড়েছিল পান্না, সেই শব্দ শুনে উঠে এসেছিল ডাংম্যান।

পালাতে পারেনি ওরা। ডাংম্যান আর তার দুই চেলা মিলে ধরে ফেলেছে ওদের, চোখের পলকে হাত-পা-মুখ বেঁধে এনে তুলেছে একটা ট্রাকে। সাইকেল দুটোও তুলে নিয়েছে ট্রাকে। তারপর তাদেরকে নিয়ে আসা হয়েছে এখানে।

অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো উচিত হয়নি তোমাদের, বুঝতে পারছ তো? হাসল ডাংম্যান। চুরি করে আমার বাড়িতে ঢুকেছ, কাজটা ভাল করোনি। আইনের চোখে অপরাধু! পুলিশে দিতে পারতাম, কিন্তু তার চেয়ে এখানে নিয়ে আসাটাই আমার জন্যে নিরাপদ হয়েছে। পুলিশ গেছে আমার বাড়িতে, কিশোরও ছিল তাদের সঙ্গে। না না, বেশি আশা করো না, ওরা কিছুই পায়নি। তোমাদের সমস্ত চিহ্ন নষ্ট করে দিয়েছি। কিছুই বুঝতে পারোনি।

থাকো এখানে, আমার মেহমান হয়ে। কদ্দিন? তা, আমি যতদিন না যাচ্ছি। তবে এখানকার কাজ ফুরিয়ে এসেছে আমার, আর বেশি সময় লাগবে না।

ধৈর্যের বাধ ভাঙল রবিনের। তুমি একটা চোর।

চাম্যাশ হোর্ড চুরির তালে আছ, ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল মুসা।

হা-হা করে হেসে উঠল ডাংম্যান। তোমরা চালাক ছেলে। ঠিকই আন্দাজ করেছ। আজ রাতেই বের করে আনব ওগুলো।

ছেলেদেরকে আরেকবার দেঁতো হাসি উপহার দিয়ে ঘুরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল ডাংম্যান।

নীরবে একে অন্যের দিকে তাকাল দুই গোয়েন্দা। জানালার ময়লা কাচের, ভেতর দিয়ে দেখতে পাচ্ছে, সূর্য ডুবছে। রাতের দেরি নেই, ডাংম্যানকে থামানোর কোন উপায় বের করতে পারছে না ওরা।

পেদ্রোজ এস্টেটের কোথাও রয়েছি, অনুমানে বলল মুসা।

কোন চিহ্নও তো রেখে আসতে পারলাম না। দরজাটা অবশ্য ভাঙা…।

ভাঙা নয়, ভ্রু খুলেছিলাম শুধু, শুধরে দিল মুসা। বলল না, কোন চিহ্ন রাখেনি। আমাদেরকে পাঠিয়ে দেয়ার পর নিশ্চয় আবার দরজা লাগিয়ে ফেলেছে। সাইকেলেদুটোও নিয়ে এসেছে, কেউ কিছু বুঝবে না।

হ্যাঁ। দেয়ালে-টেয়ালে চিহ্নও আঁকতে পারলাম না, সময়ই দিল না ব্যাটারা।

তবু, কিশোর আমাদের খুঁজে বের করবেই, বন্ধুর ওপর অগাধ আস্থা মুসার। বাঁধন খোলা গেলে আমরাও চেষ্টা করতে পারতাম।

দরজায় দেখা দিল ডাংম্যান। হাসতে হাসতে ঢুকল কেবিনে। পরাস্ত হবে না কিছুতেই, আঁ। তোমাদের প্রশংসা না করে পারছি না।

এসব করে পার পাবে না তুমি, কঠিন গলায় বলল মুসা।

হাসি মুছল না ডাংম্যানের মুখ থেকে। খুব পাব। তোমরা আমাকে সুযোগ করে দিয়েছ আরও। কিশোর আর পুলিশ থাকবে তোমাদের খোঁজে, বাদামী চোরদুটোর খোজে, আমাকে সন্দেহ করার সুযোগই পাবে না। দারুণ হয়েছে।

কিশোর পাশাকে চেনো না তুমি, ডাংম্যান, বলল রবিন। তোমার পরিণতি আমি এখনই বলে দিতে পারি। জেল।

নাহ্, তা আর হচ্ছে না, দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে বলল ডাংম্যান। অনেক সময় নিয়ে অনেক ভাবনাচিন্তা করে প্ল্যান করেছি, প্ল্যানমাফিক কাজ করেছি, কয়েকটা ছেলে আর ছোট্ট শহরের কয়েকটা পুলিশ আমাকে ঠেকাবে এখন? পারবে না। আমার কথা শুনবে? আমারও সুবিধে, তোমাদেরও।

না, শুনব না, সাফ জবাব দিল মুসা।

হুঁ, সাহস আছে। তবে বোকামি করছ। অবশ্য দুনিয়ায় বোকার সংখ্যাই বেশি, নইলে আমার কপালে চাম্যাশ হোর্ড থাকত না। অনেক আগেই অন্য কেউ তুলে নিয়ে যেত।

এত আশা করছ কেন? রবিন বলল। না-ও তো পেতে পারো।

পাবো, মাই বয়, পাবো। ম্যাগনাস ভারদির ছোট্ট ধাধার সমাধান আমি করে ফেলেছি। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চাম্যাশ হোর্ড এসে যাবে আমার হাতে। ছেলেদের দিকে চেয়ে ডাংম্যানের চোখের পাতা কাছাকাছি হলো। তখন তোমাদের একটা ব্যবস্থা করা যাবে।

বলে ঘুরল সে। দরজার নবে হাত রেখে ফিরে চাইল। পালানোর চেষ্টা কোরো না, লাভ হবে না। পাহাড়ের ওপরে এই কেবিন, তিন ধারে একশো ফুট গভীর খাদ। এক দিক দিয়ে শুধু সরু একটা পথ, তাতে লোক পাহারা রেখেছি। গলাকাটা এক ডাকাত সে। সারাক্ষণ কেবিনের দরজায় চোখ রাখছে। কাজেই পালাতে পারছ না তোমরা।

জোরে আরেকবার হেসে উঠে বেরিয়ে গেল ডাংম্যান।

বাইরে থেকে তালা লাগানোর ক্লিক শব্দ শোনা গেল।

পিছমোড়া করে হাত বাধা হয়েছে, খোলার চেষ্টা করল মুসা। খানিকক্ষণ টানাটানি করে ব্যর্থ হয়ে বলল, রবিন, আমার পিঠে পিঠ ঠেকাতে পারবে? গড়িয়ে চলে এসো তো।

দুজনেই রুক্ষ মেঝেতে গড়িয়ে গড়িয়ে কাছাকাছি হলো, পিঠে পিঠ ঠেকাতে পারল।

রবিনের কজির বাঁধন খোলার চেষ্টা শুরু করল মুসা। দরদর করে ঘাম ঝরল কপাল থেকে, দাঁতে দাতে চাপল সে। মনে হলো, যুগ যুগ পেরিয়ে গেছে, আঙুল ব্যথা হয়ে গেল, কিন্তু কিছুই করতে পারল না। ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিল।

নাগালই পাই না, হাঁপাচ্ছে সে।

নাগাল পাওয়ার জন্যে কি আর বেঁধেছে, রবিন বলল।

ছুরিটাও নিয়ে গেছে হারামজাদা। দাতে কামড়ে ধরে…

দাঁত! শুয়ে পড়ো তো। কাত হয়ে।

রবিন শুয়ে দুই মোচড় দিয়ে সরে এল খানিকটা, মুখ নামিয়ে আনল মুসার হাতের কাছে। কজির দড়ি বেশ ভালমতই নাগাল পেল দাঁত দিয়ে। গিঁট কামড়াতে লাগল। লালা লেগে সামান্য নরম হলো দড়ি, প্রথম গিটটা কামড়ে ধরে টানাটানি করতে লাগল, কাঁচা মাংস কামড়ে ধরে কুকুর যেভাবে দু-পাশে মুখ-মাথা নেড়ে টেনে ছেড়ার চেষ্টা করে, সেভাবে।

কিছুক্ষণ টানাটানি করে থামল সে, জিরিয়ে নিয়ে আবার শুরু করল।

তিনবারের মাথায় চিল হতে লাগল গিঁট।

চেঁচিয়ে উঠল মুসা, হচ্ছে! টের পাচ্ছি। আরও জোরে।

প্রথম গিটটা খুলে গেল। দ্বিতীয়টা খোলা আরও সহজ হলো।

বাঁধন মুক্ত হয়ে উঠে বসল মুসা, খুলে ফেলল পায়ের বাঁধন। এরপর রবিনের বাঁধন খোলাটা কোন ব্যাপারই না।

ডলাডলি করে বাধনের জায়গাগুলোতে রক্ত চলাচল সহজ করে নিল দুজনে। তারপর উঠে এসে দাঁড়াল জানালার কাছে। মুসা সামনের জানালায়, রবিন পেছনের।

মুসা বলল, গার্ডটাকে দেখতে পাচ্ছি। অন্ধকারেও ওর চোখ এড়িয়ে যেতে পারব না, এমন জায়গায় রয়েছে।

সব চেয়ে উঁচু চূড়াটার ওপাশে নেমে গেছে সূর্য। এপাশে আলো কমছে। রাত নামল বেশ তাড়াতাড়ি।

এদিক দিয়েও সম্ভব না, রবিন বলল। কয়েক ফুট পরেই খাদ। নাহ, যাওয়ার আশা বাদ।

ঘরের মাঝে রাখা টেবিলের কাছে ফিরে এল দুই গোয়েন্দা।

টেবিলে রাখা লণ্ঠনের কাচে হাত বোলাতে বোলাতে বলল মুসা, কোথায় আছি অনুমান করতে পারছি। পশ্চিমে গিরিপথটা দেখা যায়। পর্বতের মধ্যে কোথাও রয়েছি আমরা, মিস পেদ্রোর বাড়ি থেকে মাইল পাচেক দূরে।

সঙ্কেত পাঠালে কেমন হয়, লণ্ঠনটার দিকে তাকিয়ে আছে রবিন। পাঁচ-ছয় মাইল দূর থেকে দেখা যাবে রাতের বেলা।

প্রথমে কিছু বুঝল না মুসা। কিন্তু রবিনকে লণ্ঠনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে-ও তাকাল। ঠিক বলেছ। কিন্তু লণ্ঠন জ্বালাতে দেশলাই লাগবে।

লণ্ঠন যখন আছে, নিশ্চয় দেলাইও আছে, টেবিলের ড্রয়ার টান দিয়ে খুলল রবিন। এই যে আছে, বললাম না।

দুজনেরই মুখ উজ্জ্বল হলো। মোর্স কোড জানা আছে, রাতে এস ও এস পাঠাতে পারবে। কারও চোখে পড়ার সম্ভাবনা অবশ্য খুবই ক্ষীণ, তবু বলা তো যায় না। যদি পড়ে গেল?

পেছনের জানালার দিকে চেয়েই চমকে উঠল মুসা।

কি হলো? বলতে বলতেই ফিরল রবিন, দেখে স্থির হয়ে গেল সে-ও।

জানালার বাইরে একটা মুখ। বাদামী চামড়া।

পাল্লা খুলে ফেলে একে একে ভেতরে ঢুকল দুজন লোক। পরনে বিচিত্র সাদা পোশাক। হাতে লম্বা, বাঁকা ফলাওয়ালা ছুরি।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *