১৪. ইয়ার্ডে পৌঁছেই আগে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল

ইয়ার্ডে পৌঁছেই আগে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল কিশোর। মুসা আর রবিন ফেরেনি। মেসেজ-রিসিভার যন্ত্রটা দেখল, কোন মেসেজ নেই, ফোন আসেনি। বেরিয়ে এসে তাড়াতাড়ি থানায় ছুটল সে।

অফিসেই পাওয়া গেল পুলিশ চীফ ইয়ান ফ্লেচারকে।

এই যে, ইয়াং ডিটেকটিভ, এসো এসো, হেসে ডাকলেন তিনি। তারপর, কি মনে করে?

একটা কেস, স্যার, বলল কিশোর। আপনার সাহায্য লাগবে।

বসো, চেয়ার দেখালেন তিনি। খুলে বলল, কি হয়েছে?

বাসার সময় নেই, স্যার। ডাংম্যান…

ধীরে, কিশোর। গোড়া থেকে বলো, রিপোর্ট লিখতে হবে তো।

ঠিক আছে, বলল কিশোর। তবে দেরি করা যাবে না, স্যার। পুতুল কুড়িয়ে পাওয়া থেকে শুরু করল, যত তাড়াতাড়ি পারে শেষ করতে চায়।

থামো, থামো, হাত তুললেন চীফ। ভূতের ছায়া? নিশ্চয় ভুল করেছে রবিন আর মুসা। কল্পনা। তোমার কি মনে হয়?

না, স্যার, কাল রাতে আমিও শুনেছি। বিচ্ছিরি হাসি। লম্বা একটা ছায়া, তবে কুঁজো মনে হয়নি আমার। ওরা নাকি লম্বা নাকও দেখেছে, পাখির মাথার মত মাথা, ঝটকা দিয়ে দিয়ে নড়ছিল। কাল রাতে আমি আর মুসা ছায়াটার পিছু নিয়েছিলাম। উপত্যকায় গিয়ে এক জায়গায় একটা ট্রাক এল কোত্থেকে, চারজন মুণ্ডুশূন্য বামনকে নামাল।

কাশলেন চীফ। মুশুন্য বামন?

মাথা দেখা যাচ্ছিল না আরকি। চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রেখেছিল, যাতে কোথায় এসেছে না দেখতে পারে। বন্দী।

ওদেরই কেউ সেরাতে পুতুলটা ছুঁড়ে ফেলেছিল? সাহায্যের জন্যে চেঁচিয়েছিল?

তাই তো মনে হয়, স্যার। বামনদেরই কেউ চুরি করেছে পুতুলটা। তাতে মেসেজ ভরে বাইরে ছুঁড়ে দিয়েছে। আশা, কারও না কারও চোখে পড়বেই, উদ্ধারের ব্যবস্থা হবে।

বেশি আশা করেছে। নির্জন এলাকায় ঝোপের ধারে ফেলেছে ছোট্ট পুতুল, তাতে লুকানো কুঠুরীতে মেসেজ, তা-ও আবার বোঝা যায় না কিছু।

মরিয়া হয়ে উঠেছিল হয়তো। কিংবা, আশেপাশে তার বন্ধুরা ঘোরাঘুরি করছে জানত, তাদেরকেই ডেকেছে, পুতুল তাদের হাতে পড়বে বলেই ছুঁড়ে ফেলেছে। ওরা পায়নি, আমাদের হাতে এসে পড়ল। আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল দুই বাদামী চামড়ার লোক।

বাদামী চামড়া? খুলে বলল সব কিশোর।

ওরা? স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন এতক্ষণে চীফ। কিশোর আবল-তাবল কথা বলে না, জানেন। তাই ভূতুড়ে ছায়া আর মাথাশূন্য বামনদের কথা শুনে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন। যাক, বাস্তব কিছু পাওয়া গেল। হ্যাঁ, ওদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া যায়। চলো, ডাংম্যানের ওখানেই যাই আগে।

দুজন পুলিশ সঙ্গে নিলেন চীফ। শহরতলীতে ঢুকল পুলিশের গাড়ি। নির্জন পথ ধরে ছুটছে।

দূর থেকেই গথিক-বাড়িটার গাড়িবারান্দায় ডাংম্যানের গাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল কিশোর। বাড়িতেই আছে। ওই যে গাড়ি।

বেল বাজানোর আগেই সদর খুলে গেল। ডাংম্যান। কিশোরকে দেখে উদ্বিগ্ন হলো, ওরা কোথায়? রবিন আর মুসা?।

নেই? আমি তো ভাবছিলাম, এখানেই আছে। টনিকে দেখেছেন?

না। স্যালভিজ ইয়ার্ডের কাছে তার গাড়ি দেখলাম মনে হলো। ছুটে গেলাম, কিন্তু মোড় পেরিয়ে আর দেখলাম না গাড়িটা। ইয়ান ফ্লেচারের দিকে তাকাল, এই প্রথম যেন চোখে পড়ল।

ইনি ইয়ান ফ্লেচার, লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশের চীফ, পরিচয় করিয়ে দিল কিশোর। আপনার কথামতই থানায় গিয়েছিলাম।

আপনি এসেছেন খুব ভাল হয়েছে, চীফ, স্বভাব-বিনীত গলায় বলল ডাংম্যান। সমস্যায় পড়ে গেছি। দুজন লোক মারার চেষ্টা করল আমাকে। আমিষভোজী ফ্যানাটিক হবে-টবে প্রথমে ভেবেছি। কিন্তু কিশোর আমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে অদ্ভুত সব কথা বলে।

ভূতুরে ছায়া আর মুণ্ডুশূন্য বামন? বললেন চীফ।

হ্যাঁ। বেশি কল্পনা করে বোধহয় ছেলেটা। তবে, মিস পেদ্রোর সোনার পুতুল চুরি হয়েছে, এটা সত্যি।

চিন্তিত মনে হলো চীফকে। চাম্যাশ হোর্ডের কথা এখানকার অনেকেই শুনেছে, আমিও শুনেছি। থাকলে থাকতেও পারে।

ওসব সোনা-দানার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই আমার, হাত নাড়ল ডাংম্যান। আমি ভাবছি মুসা আর রবিনের কথা। কোথায় গেল?

খোঁজা দরকার, বললেন চীফ।

বাড়ির ভেতরে অনেক জায়গায় খোঁজা হলো। নেই।

দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল কিশোর। গেল কই?

চোরগুলোর পিছু নেয়নি তো? ভুরু কোঁচকালো ডাংম্যান।

নিতেও পারে, চীফ বললেন।

কিন্তু তাহলে আমাকে জানানোর ব্যবস্থা করত, কিশোর মেনে নিতে পারছে না।

সুযোগই পায়নি হয়তো। চোরগুলোর পিছু নিয়ে থাকলে ভাবনার কথা। বিপদ। হতে পারে।

মুখ কালো হয়ে গেছে কিশোরের।

লক্ষ করলেন চীফ। কিছু বললেন না।

ডাংম্যানের অফিসে ঢুকল ওরা। সেফ খুলে ছোট একটা বাক্স বের করে নিয়ে টেবিলের কাছে চলে গেল সে। খাবারের এঁটো আর মোড়কের কাগজ পড়ে আছে।

বেল শুনে উঠে গেলাম, সলজ্জ হাসল ডাংম্যান, ফেলার সময় পাইনি। কাগজ দলেমুচড়ে ঝুড়িতে ফেলল সে, খাবারের টুকরো পরিষ্কার করল। বাক্স খুলে পুতুলটা বের করে বাড়িয়ে দিল। এই যে, এটা নিয়েই গোলমাল। চোরগুলো বার বার আক্রমণ করছে আমাকে।

পুতুলের গোপন কুঠুরি খুলল কিশোর। চীফের দিকে ফিরল, মেসেজ নেই।

থাক না থাক, ওসব জেনে কাজ নেই আমার, বলল ডাংম্যান। জিনিসটা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি, ব্যস, এবার আমি নিশ্চিন্ত। চুরি আর হবে না।

চোরগুলো কোথায়, হয়তো রবিন আর মুসা বলতে পারবে, বললেন চীফ। কিশোর, এসো, খুঁজি।

হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখুন, ডাংম্যান বলল। কিশোর, নতুন কিছু খবর পেলেই আমাকে জানিও ! আমি আছি আজ এখানেই। কাল এস্টেটে যাব, টনির সঙ্গে কথা আছে।

বাড়ির ভেতরে পাওয়া গেল না রবিন আর মুসাকে।

বেরিয়ে পুলিশ দুজনকে নিয়ে গাড়ির দিকে চললেন চীফ। পেছনে আস্তে আস্তে হাঁটছে কিশোর, চারপাশে তাকাচ্ছে, চিহ্ন খুঁজছে। দুটো বাড়ির মাঝের একটা গলির দিকে চোখে পড়ল তার। কপালে হাত রেখে রোদ আড়াল করে ভালমত দেখল।

চীফ! চেঁচিয়ে উঠল সে, দেখুন। টায়ারের দাগ।

গলির দিকে ছুটল কিশোর। পেছনে ফ্লেচার।

এখানে ছিল ওরা, দেখতে দেখতে বলল কিশোর। এই যে, দেখুন, সাইকেলের টায়ারের দাগ। আর এই যে এটা দেখছেন, পাথর দিয়ে বানানো খুদে একটা পিরামিড মত জিনিস দেখাল। মুসার কাজ। চুপচাপ বসে থাকতে পারে না, হাতের কাছে পাথর পেলেই এরকম বানায়।

নিশ্চয় তাহলে কারও পিছু নিয়ে গিয়েছে, বললেন ফ্লেচার।

গলিটার দুই দিকেই তাকাল কিশোর। বুঝতে পারছি না। গেলে তো চিহ্ন রেখে যেত, চকের দাগ। দেয়ালগুলো দেখল ভাল করে। নেই।

হয়তো সময় পায়নি। নাকি অফিসে গিয়ে একটা অল পয়েন্ট বুলেটিন ছাড়ব?

বাড়ি গিয়ে দেখি আগে, ফিরেছে কিনা।

হ্যাঁ, চলো। ভূতুড়ে ছায়াটার কথা ভাবছি। চোরদের কেউ না তো?

না, স্যার। ওরা বেঁটে, ছায়াটা অনেক লম্বা। টনির সমান।

কিন্তু টনির গলা চেনো তোমরা।

চিনি। কিন্তু ইচ্ছে করলে খানিকটা বদলে নেয়া যায়, জানেনই তো। তবে, হাসিটা মানুষের মনে হলো না। মানুষ ওরকম হাসে না।

তো কি? সেটাই তো ভাবছি।

এডগার অ্যালান পোর সেই গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে, হাসলেন চীফ। কেউ চিনতে পারছিল না খুনীর গলা, কথা বলে না, শুধু বিচিত্র শব্দ করে। মানুষের কণ্ঠের মত নয়। বানর জাতীয় না, ঝট করে দেয়ালের দিক থেকে চোখ ফেরাল কিশোর। অস্ট্রেলিয়ায় এমন কি জীব আছে স্যার, যেটা হাসে?

মানে?

ঠোঁট কামড়াল কিশোর, চোখ মুখ কুঁচকে গেছে। কি যেন একটা আছে, স্যার, মনে পড়ি পড়ি করেও পড়ছে না। আচ্ছা, টনির কথায় টান আছে। বলেছে ইংল্যাণ্ড থেকে এসেছে, মিছে কথাও হতে পারে। হয়তো অস্ট্রেলিয়ান। আসল টনি নয় সে।

তাহলে ডাংম্যানের কথা বাদ দিচ্ছে কেন? তার কথায়ও তো টান রয়েছে।

উজ্জল হলো কিশোরের চোখ। অস্ট্রেলিয়ান টান? ব্রিটিশ যে নয়, এটা

ঠিক।

বোঝা যায় না। অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের সঙ্গে কথা বললেই বুঝতে পারব, লোকটার বদনাম থাকলে জানাবে। চলো যাই।

কিশোরকে স্যালভিজ ইয়ার্ডের গেটে নামিয়ে দিয়ে গেল পুলিশের গাড়ি।

সোজা এসে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল সে। রবিন আর মুসা নেই। কোন মেসেজও পাঠায়নি।

দুজনের বাড়িতে ফোন করল কিশোর। জানল, দুপুরে খেয়ে যে বেরিয়েছে, আর ফেরেনি।

আর নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ফোন করে চীফকে খরবটা জানাল কিশোর। তারপর ফোন করল রেন্ট-আ-রাইড অটো কোম্পানিতে। রোলস-রয়েস গাড়িটা দরকার।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *