১৩. লাঞ্চ শেষে ইয়ার্ডে ফিরে

লাঞ্চ শেষে ইয়ার্ডে ফিরে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল আবার রবিন আর মুসা। ফোনধরার যন্ত্রটা দেখল। না, কোন মেসেজ কোড করা নেই, কেউ ফোন করেনি তাদের অবর্তমানে। বেরিয়ে এসে ভেজিট্যারিয়ান লীগ-এ রওনা হলো দুজনে।

খুব সতর্ক রয়েছে ওরা। লোক দুটোকে চোখে পড়ল না। কোন নড়াচড়া, কোন রকম সাড়া নেই গথিক-বাড়িটার ভেতরে বাইরে। ডাংম্যানের গাড়িটা নেই। সদর দরজা তালাবন্ধ।

এস্টেটে গেছে, অনুমান করল মুসা।

তাহলে কিশোরের সঙ্গে দেখা হবে। আমরা এখানেই থাকি। লোকগুলো আসতে পারে।

ভেজিট্যারিয়ান লীগের উল্টোধারে দুটো বাড়ির মাঝে সরু একটা গলি। ওখানে সাইকেল রেখে ঘাপটি মেরে থাকবে ঠিক করল দুই গোয়েন্দা। তা-ই করল। রুক্ষ পাহাড়ের দিকে চোখ। গরম রোদ পাঁউরুটির মত সেঁকছে যেন পাহাড়টাকে, বাতাসে বাস্পের অদ্ভুত ঝিলিমিলি। অনেক ওপরে ডানা মেলে ভাসছে একটা গলাছেলা ধাড়ী শকুন, পাক দিয়ে দিয়ে ঘুরছে।

কুৎসিত পাখিটাকে দেখে অস্বস্তিতে ভরে গেছে মুসা আমানের মন। আমাদের কথা ভাবছে না তো ইবলিস পাখিটা?

গালাগাল করছ কেন? খুব ভাল পাখি ওরা, প্রতিবাদ করল রবিন। পচা-গলা খেয়ে সাফ করে, জায়গা পরিষ্কার রাখে।

সেজন্যেই তো ভয়। আমিও তো পচতে পারি। আমি মরি, সেই দোয়া করছে কিনা এখন কে জানে? শকুনের দোয়ায় গরু মরে না মরে না করেও তো অনেক মরে।

কেমন যেন শুকনো, জমাট নীরবতা। গত এক ঘণ্টায় একটা গাড়িও যায়নি গরম সড়কটা ধরে। চুপ করে বসে থাকা আর সইল না মুসার, হাতের কাছে কয়েকটা ছোট পাথর দেখে ওগুলো নিয়ে খেলতে শুরু করল। আরও খানিক পর পা সোজা করল। ঝি ঝি ধরে গেছে। গুঙিয়ে উঠল, গোয়েন্দাগিরির এই একটা ব্যাপার মোটেই ভাল্লাগে না আমার। বসে থাকা আর থাকা।

কিশোর তো বলে খুব জরুরী কাজের একটা এটা, গোয়েন্দাদের জন্যে। কখনও কখনও এক জায়গায় হপ্তার পর হপ্তা নাকি কাটাতে হয়।

ওরকম বসে থাকার গোয়েন্দা হতে আমি চাই না, থ্যাংকু, হাত নাড়ল মুসা। চোরা-ব্যাটারা আবার এখানে আসবে এ-ধারণা হলো কেন কিশোরের?

মনে হয়, ডাংম্যানের বাড়িতে এমন কিছু আছে, ওরা নিতে চায়। গুপ্তধনের কোন সূত্র-টুত্র হতে পারে।

মারছে! তাই নাকি? আবার গুঙিয়ে উঠল মুসা, দ্রুত তাকাল এদিক ওদিক! তাহলে তো আসবেই।

হ্যাঁ। আর সে-কারণেই চোখ রাখাটা জরুরী।

হঠাৎ, পথের ওপার থেকেই বোধহয়, ভেসে এল চাপা চিৎকার। এ-ভাই, কেউ আছ?

মৃদু কণ্ঠ, কিন্তু তপ্ত দুপুরের এই নীরবতায় স্পষ্ট বোঝা গেল কথা।

এই কেউ আছ? বাঁচাও! আবার এল সাহায্যের আবেদন।

বাড়িটার মধ্যে, ফিসফিস করে বলল মুসা। ওদিকে। ভেজিট্যারিয়ান লীগের পেছনে দিক দেখাল।

ডাংম্যানকে আটকে রাখেনি তো? রবিনের সন্দেহ, চোরেরা?

দ্বিধা করছে দুই গোয়েন্দা। যাবে? চোরেরা কাছেপিঠে নেই তো? তাহলে বেরিয়ে পড়বে মহাবিপদে। কিন্তু অসহায় লোকটাকে সাহায্য করাও দরকার।

কি করি? বুঝতে পারছে না মুসা।

গিয়ে দেখা উচিত। তবে হুশিয়ার থাকতে হবে। বিপদ দেখলেই যাতে পালাতে পারি।

সাবধানে ছুটে নির্জন শূন্য পথটা পেরোল ওরা। সদর দরজা বন্ধ, তাই ওদিকে গেলই না, ঘুরে সোজা চলে এল পেছনে। পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করবে।

নবে মোচড় দিয়েই বলে উঠল মুসা, খোলা। ঠেলে পাল্লা খুলে পা রাখল অন্ধকার চওড়া একটা গলিতে।

রান্নাঘরে এসে ঢুকল ওরা। কেউ নেই। সেখান থেকে বেরিয়ে বাড়ির পেছনের ছোট একটা হলঘরে ঢুকল, জিনিসপত্র সব এলোমেলো। ঠাণ্ডা, আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কান পাতলো শোনার জন্যে।

কই, কিছুই শুনছি না, ফিসফিসিয়ে বলল রবিন।

কিন্তু এদিক থেকেই শব্দ হয়েছে। চলো তো, অফিসে দেখি।

সাবধানে দোর খুলল মুসা। ভেতরে উঁকি দিল। নীরব, নির্জন।

আলমারীর দরজার মত একটা দরজার দিকে ইশারা করল রবিন। পা টিপে টিপে সেটার কাছে এসে তাতে কান রাখল দুজনে। ওপাশের শব্দ শোনার চেষ্টা করছে।

কিন্তু পুরো এক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু শোনা গেল না।

আস্তে করে গিয়ে ডাংম্যানের টেবিল থেকে বড় একটা পেপারওয়েট তুলে নিয়ে এল মুসা। চোখের ইশারায় দরজা খুলতে বললু রবিনকে।

হ্যাঁচকা টানে পাল্লা খুলে ফেলল রবিন। কিন্তু কারও মাথায় পাথরটা বসানোর সুযোগ হলো না মুসার ভেবেছিল ওপাশে ঘর আছে, নেই। আসলেই ওটা আলমারী, দেয়াল আলমারী। শূন্য।

এদিকেই কোথাও থেকে হয়েছে, আবার বলল মুসা।

এমন জায়গায় আছে লোকটা, যেখানে বাতাস ঢোকে না। বেহুশ হয়েযেতে পারে।

তা পারে। তাড়াতাড়ি করা দরকার।

নিচতলার সব কটা ঘর খুঁজল ওরা। নেই। দোতলায় উঠল। তিনটে ছোট ছোট ঘরের পাটিশন সরিয়ে বড় একটা বৈঠক-ঘর করা হয়েছে। এক কিনারে একটা মঞ্চ। ওতে উঠেই ভাষণ দেয় ডাংম্যান, বোঝা গেল, ওখানেই আক্রান্ত হয়েছিল।

তোমরা এসেছ? বাঁচাও! শোনা গেল আবার চিৎকার। মাথার ওপরে।

চেঁচিয়ে উঠল রবিন, তেতলায়।

এসো, সিঁড়ির দিকে দৌড় দিয়েছে মুসা।

তেতলায় আলো খুব সামান্য। জানালার সমস্ত খড়খড়ি নামাল। ধুলোর পুরু আস্তরণ সব কিছুতে। এক ধারে কতগুলো তক্তা পড়ে আছে, তাতেও ধুলো। কয়েকটা দরজা, পাল্লা খোলা, সব কটা থেকে করিডর চলে গেছে দিকে দিকে।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে কান পেতে রয়েছে ছেলেরা।

হঠাৎ এলোমেলো করাঘাতের শব্দ হলো একটা করিডরের শেষ মাথায়। বড় একটা তক্তা তুলে নিয়ে দৌড় দিল মুসা, পেছনে রবিন। আরেকটা দরজা, তারপরে আরেকটা ঘর। খালি।

আবার দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। শব্দের আশায় কান পাতল।

দূরের দরজাটা আগে চোখে পড়ল রবিনের, ঘরের উল্টোধারে। মুসা, ওখানে।

মাথা নুইয়ে সায় জানিয়ে এগোল মুসা।

দরজার নব ধরে মোচড় দিল রবিন। তক্তা তুলে তৈরি রয়েছে মুসা।

তালা দেয়া, জানাল রবিন। ভাঙা যাবে?

দড়াম করে তাদের পেছনে দরজার পাল্লা বন্ধ হলো, যেটা দিয়ে ঢুকেছিল। চরকির মত পাক খেয়ে ঘুরল দুজনে, চোখ কোটর থেকে ছিটকে বেরোনোর অবস্থা। তক্তা মাথার ওপর তুলে ফেলেছে মুসা। কিন্তু বাড়ি মারার জন্যে কাউকে পেল না। শুধু, খোলা ছিল দরজাটা, এখন বন্ধ।

কিট করে দরজার বাইরে একটা শব্দ হলো।

মুসা! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। তালা লাগিয়ে দিয়েছে।

হা-হা করে হেসে উঠল কেউ ওপাশে। নিজেদেরকে খুব চালাক ভাবো, না মিয়ারা? আবার হাসি। পরিষ্কার চেনা যাচ্ছে এখন গলা। টেরিয়ার ডয়েল।

দরজার কাছে ছুটে গেল দুই গোয়েন্দা। বন্ধ। ধাক্কা দিল মুসা, লাথি মারল, নাড়লও না পাল্লা।

শুঁটকি, জলদি দরজা খোলো! চেঁচাল রবিন।

জলদি, হুমকি দিল মুসা, নইলে বেরিয়ে দেখাব মজা।

বেরোতে তো হবে আগে, ওপাশ থেকে বলল টেরিয়ার। তারপর না মজা দেখানো। আমি যাচ্ছি, বুঝেছ? গরম তো টেরই পাচ্ছ। ঘাম শুকাও। ইস, হোমসের বাচ্চাটাকে পেলাম না, আফসোস, করল সে। ওটাকে শিক্ষা দেয়ার বেশি ইচ্ছা ছিল।

কিশোর তোমার মত গর্দভ নাকি? রেগে গেল রবিন। তোমার মত শুঁটকি?

চুপ! ধমক দিল টেরিয়ার। তার চেয়ে কিশোরের বুদ্ধি বেশি এটা কেউ বললেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে সে। তোমরা গাধারা যে কি বিপদে পড়েছ, বুঝতে পারছ আশা করি?

বিপদে পড়বি ব্যাটা দুই, রাগে কাঁপছে মুসা। ভেবেছিস কি…

কি ভেবেছি? হাসি হাসি গলায় জবাব দিল টেরিয়ার, বলছি, শোনো। একজন ভদ্রলোকের বাড়ি চোরের হাত থেকে বাঁচিয়েছি। দুটো চোরকেই আটকেছি। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, বাড়ির ভেতরে শব্দ শুনে সন্দেহ হলো। ঢুকে দেখি দুটো ছিঁচকে চোর।

পাগল! রবিন বলল। শুঁটকি যে শুঁটকিই। কে বিশ্বাস করবে তোমার কথা?

সবাই করবে, খিকখিক করে হাসল টেরিয়ার। সামনের দরজায় তালা। পেছনের দরজা তাহলে কে খুলল? তোমরা। নাহলে ঢুকলে কিভাবে? আবার হাসল সে। টনি পেদ্রো তোমাদের কথা বলার পর থেকেই চোখ রাখছিলাম ময়লার ডিপোটার ওপর। আজ বাচ্চা হোমসকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতে দেখলাম ফোচাচাকে। কার মুরগীর মরা চামড়া কিনতে গেছে, কে জানে। তোমাদেরও বেরোতে দেখলাম, ঢুকতে দেখলাম, আবার বেরোতে দেখলাম। ধরেই নিলাম, ইবলিস দেখা করেছে তোমাদের সঙ্গে, কিছু একটা নিয়ে মেতেছ। পিছু নিলাম। হি-হি-হিহ!

নরকে পচে মরবি তুই, শুঁটকির বাচ্চা! গাল দিল মুসা। ইবলিস বলেছে বুঝি? হি-হিহ।

ইবলিস নয়, শুঁটকি, বোঝানোর চেষ্টা করল রবিন, মিস্টার ডাংম্যান। তিনি জানেন আমরা এখানে আছি। মিস পেদ্রোর কাজ করছি।

বোকা বানাতে চেয়ো না। টনি পেদ্রো আমাকে বলেছে, একটা দামী পুতুল খুঁজছে সে। তার ধারণা, তোমরা চুরি করেছ ওটা।

তোমার মুণ্ডু! চেঁচিয়ে উঠল মুসা। টনির সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেছে আমাদের। ও-ই আমাদের অনুরোধ করেছে পুতুলটা খুঁজে দেয়ার জন্যে। তোর গিয়ে লটকে থাকা উচিত জেলেদের জালে, তা না করে ব্যাটা এখানে ভদ্রলোকের পাড়ায় আসিস কিশোর পাশার সঙ্গে পাল্লা দিতে। কিশোর তোর মত দূর?

কে ইঁদুর একটু পরেই বুঝবে। খাঁচায় তো সবে আটকেছ, দারুণ মজা পাচ্ছে টেরিয়ার, রাগছে না তাই। এতই যদি বুদ্ধি বাচ্চা হোমসের, কান্নাকাটি করে তাকেই ডাকো না, এসে তালা খুলে দিয়ে যাক। তো, থাকো তোমরা, ধূলো খাও। আমি বাড়ি যাচ্ছি। গুড বাই। করিডরে পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল।

অস্থির চোখে মুসার দিকে তাকাল রবিন, তারপর দরজায় গিয়ে কান ঠেকাল। নিচ তলায় নেমে যাচ্ছে টেরিয়ার। আরও খানিকক্ষণ পর নিচতলার দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো, যেটা দিয়ে ঢুকেছিল ওরা।

হতাশ চোখে একে অন্যের দিকে তাকাল দুই গোয়েন্দা। সরে এল দরজার কাছ থেকে। ভাল বিপদেই পড়েছে।

জানালায়ও শিক লাগানো, বলল মুসা। অন্য দরজাটায়ও তালা।

পুরানো বাড়ি। দেয়ালে কিংবা মেঝেতে নরম জায়গা থাকতে পারে। খোলা তক্তাক্তা।

সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে গেল মুসা। মেঝেতে দুর্বল জায়গা খুঁজতে শুরু করল। নেই।

রবিন খুঁজল দেয়াল। পাথরের মত শক্ত, বিষণ্ণ কণ্ঠস্বর।

এখন কিশোর কিংবা ডাংম্যান তাড়াতাড়ি এলেই বাঁচি।

সাইকেল দুটো গলিতে আছে। কিশোরের চোখে পড়বে।

হ্যাঁ, বলল মুসা। তাহলে বুঝবে, আশেপাশেই আছি আমরা।

দুজনেই হাসল, কিন্তু প্রাণ নেই তাতে। নিজেদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে, মনকে বোঝাচ্ছে, কিশোর এই এল বলে, ওদের উদ্ধার করবে। সময় যাচ্ছে।

দুর্বল গলায় এক সময় বলল রবিন, কিশোর না এলেও ডাংম্যান তো আসবেই। তার বাড়ি যখন।

ধরো, এল না।

তাহলে বেরোনোর উপায় আমাদেরকেই করতে হবে।

আবার সারাটা ঘর খুঁজল ওরা। নেই। জায়গামতই এনে তাদেরকে আটকেছে টেরিয়ার। _ রবিন! চেঁচিয়ে উঠল মুসা, একটা দরজার দিকে চেয়ে আছে। এটা ভেতরের দিকে খোলে। কজাগুলো দেখে যাও। ভেতরে।

স্ক্রু খোলার কথা ভাবছ

হ্যাঁ। সহজ কাজ।

স্ক্রু-ড্রাইভার থাকলে সহজ।

শক্ত ছুরি দিয়েও ভোলা যাবে, ভারি স্কাউট-নাইফটা বের করল মুসা, বিপদের আশঙ্কা থাকে এ-রকম কোন জায়গায় গেলে সঙ্গে নেয়।

যতটা সহজ মনে করল, কাজটা তত সহজ নয়। কজা আর স্কু পুরানো, জং পড়ে গেছে। ঘষে ঘষে আগে মরচে সাফ করল মুসা, তারপর ক্রু খোলার চেষ্টা চালাল।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *