১৭. যেন ভূত দেখছে এমন ভাবে

যেন ভূত দেখছে এমন ভাবে গুলিটার দিকে চেয়ে রইল সবাই।

পেকারির বাচ্চাটার বয়স কত ছিল, পেনক্র্যাফট? জিজ্ঞেস করলেন ক্যাপ্টেন।

মাস তিনেক। ফাঁদে আটকেও মায়ের দুধ খাচ্ছিল।

তিন মাসের মধ্যেই কেউ গুলিটা ছুঁড়েছে। যেই ছুঁড়ে থাকুক সে হয়ত এখনও এ দ্বীপেই আছে। কাজেই হুঁশিয়ার থাকতে হবে আমাদের।

আচ্ছা, ক্যাপ্টেন, একটা ছোট্ট নৌকো বানিয়ে নিলে কেমন হয়? তাহলে জলপথে ঘুরে দেখা যাবে দ্বীপটা।

খুব ভাল হয়। কদিন লাগবে বানাতে?

বড়জোর দিন পাঁচেক।

ঠিক আছে। কাল থেকেই নৌকো তৈরির কাজ শুরু করে দাও।

এর ঠিক দুদিন পর, আটাশে অক্টোবর ঘটল আরও একটা ঘটনা। গ্রানাইট হাউস থেকে মাইল দুয়েক দূরে সাগরের ধার দিয়ে হাঁটছিল পেনক্র্যাফট আর নেব। হঠাৎ দেখল ওরা, পাথরের আনাচে কানাচে পথ করে নিয়ে গুটি গুটি করে হেঁটে যাচ্ছে একটা বিশাল কচ্ছপ। সাথে সাথেই ছুটে গিয়ে কচ্ছপটাকে উল্টে দিল পেনক্র্যাফট। উল্টে দিলে পালানো সম্ভব নয় কচ্ছপের পক্ষে, তবু ওটার চারপাশে পাথরের ঠেকা দিয়ে রাখল আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্যে। এতবড় কচ্ছপটা দুজন বয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। তাই গ্র্যানাইট হাউসে গিয়ে ঠেলা গাড়ি নিয়ে এল। এসেই থ। ঠেকা দেয়া পাথরগুলো তেমনি আছে, নেই শুধু কচ্ছপটা। সব শুনে ভাবনায় পড়লেন ক্যাপ্টেন।

ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় তৈরি হয়ে গেল নৌকো। হালকা কাঠ আর গাছের ছাল দিয়ে তৈরি হলো ওটা। বারো ফুট লম্বা নৌকোটার ওজন হবে আড়াই মনের মত।  সেদিনই নৌকোয় উঠে বসল সবাই।

দেখো, দেখো, পেনক্র্যাফট, চুইয়ে চুইয়ে পানি উঠছে নৌকোয়! একটু ভয় পেল যেন হার্বার্ট।

ও কিছু না, নতুন নৌকো তো, দুদিনেই ঠিক হয়ে যাবে।

তীর থেকে আধমাইলটা দূরে সরে গিয়ে নৌকো বাইতে লাগল পেনক্র্যাফট। এখান থেকে ফ্র্যাঙ্কলিন হিলকে সুন্দর দেখাচ্ছে। নৌকোয় চড়ে ঘুরতে ঘুরতে বুঝতে পারলেন স্পিলেট, তটভূমির অনেক কিছুই অদেখা ছিল ওঁদের। ঘন্টাখানেক পর প্রবল বিস্ময়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল হার্বার্ট, আরে, ওটা কি? ওই, ও-ই-ই যে? আঙুল তুলে তীরের দিকে দেখাল সে।

হার্বার্টের নির্দেশিত দিকে চাইল সবাই। বিশাল দুটো পিপের মাঝখানে একটা সিন্দুক পড়ে আছে বেলাভূমিতে। তাড়াতাড়ি তীরে ভিড়ানো হলো নৌকো। বালির মাঝে সিন্দুকটা প্রায় গেড়ে যাবার যোগাড় হয়েছে  নিশ্চয়ই ভারি কিছুতে ঠাসা ওটা। আশেপাশে জাহাজডুবি হলো নাকি?

সিন্দুকটার তলা ভাঙতে গেল পেনক্র্যাফট, কিন্তু বাধা দিলেন ক্যাপ্টেন  এখানে ভাঙা ঠিক হবে না। কাজেই পিপেসহ সিন্দুকটা জোয়ারের পানিতে ভাসিয়ে নৌকোর পেছনে বেঁধে টেনে আনা হলো গ্রানাইট হাউসে। তারপর হার্বার্ট আর নেব ছুটে গিয়ে উঠল একটা বড় গাছের মগডালে। যতদূর চোখ যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারদিকে চেয়ে দেখল দুজনে। কিন্তু জাহাজ তো দূরের কথা, একটা ভাঙা মাস্তুলও চোখে পড়ল না।

যন্ত্রপাতির সাহায্যে অতি সাবধানে বাক্সটা খুলল পেনক্র্যাফট। খুলেই চক্ষুস্থির! এ কি করে সম্ভব? আরব্য উপন্যাসের দেশে হাজির হয়েছে নাকি ওরা? দস্তার পাত দিয়ে মোড়া সিন্দুকের ভেতরটা জামাকাপড়, বই, রান্নার সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র আর যন্ত্রপাতিতে ঠাসা। বেঁচে থাকতে হলে কয়েকজন সভ্য মানুষের যা যা দরকার তার সবই আছে ওতে।

ক্যাপ্টেনের জন্যে কাঁটা কম্পাস, দূরবীন, সেক্সট্যান্ট, থার্মোমিটার, ব্যারোমিটার থেকে শুরু করে নেবের জন্যে সসপ্যান, থালাবাসন, স্টোভ, কেটলী, ছুরি আর স্পিলেটের জন্যে বন্দুক, বুলেট, বারুদ, ছররা, ভোজালিও পাওয়া গেল। আর আছে জামাকাপড়, অভিধান, বাইবেল, বিভিন্ন বিষয়ের বিজ্ঞানের বই, সাদা কাগজ, ডায়েরী! এমন কি একটা ক্যামেরা ও ফটো তোলার যাবতীয় সরঞ্জামও আছে! কিন্তু একটা ব্যাপারে আশ্চর্য হলেন ক্যাপ্টেন—এত জিনিসের কোটার গায়েই লেখা নেই ওগুলো কোন দেশের তৈরি।

খুশিতে ধেই ধেই নাচতে ইচ্ছে করছে ওদের, শুধু পেনক্র্যাফট ছাড়া। মুখ গোমড়া করে বলল সে, সবই পাইয়ে দিল আরব্য উপন্যাসের ভূত, সিন্দুকের ভেতর একটু তামাক পুরে দিলে কি ক্ষতি ছিল? ওর কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল সবাই।

রাতের খাওয়ার পর বাইবেলটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন ক্যাপ্টেন, এমন সময় পেন্যাফট বলল, একটা কুসংস্কারে বিশ্বাসী আমি, ক্যাপ্টেন। বাইবেলটার বাঁধাইয়ের দিক টেবিলে খাড়া অবস্থায় রেখে হাত সরিয়ে আনুন। বাইবেলের যে জায়গাটা আগে খুলবে, হয়তো সেখানে আমাদের এ পরিস্থিতিতে কি করা উচিত তার নির্দেশ পেয়ে যাবেন।

কথাটা হাস্যকর হলেও কি মনে করে তাই করলেন ক্যাপ্টেন। আস্তে করে দুভাগ হয়ে টেবিলে বিছিয়ে পড়ল বাইবেলের দুদিক। কে যেন একটা সরু কাঠি গুঁজে রেখেছিল বাইবেলের ওই পাতা দুটোর মাঝখানে। সপ্তম অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকের পাশে লাল পেন্সিল দিয়ে চিহ্নিত করা রয়েছে। জোরে জোরে চিহ্নিত জায়গাটা সবাইকে পড়ে শোনালেন ক্যাপ্টেন, ঈশ্বরের কাছে যা চাওয়া যায়, তাই পাওয়া যায়। যে খুঁজবে, তাকে, সে-ই পাবে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *