১১. স্তব্ধ হয়ে বসে রইল বারজাক মিশনের সদস্যরা

স্তব্ধ হয়ে বসে রইল বারজাক মিশনের সদস্যরা। অনেক অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভাঙলেন প্রথম আমিদী ফ্লোরেন্স। এরপরের করণীয় কি তাই নিয়ে আলোচনায় বসল সবাই!

হঠাৎ একটা তাঁবুর পাশের ঝোপের ভেতর থেকে গোঙানির আওয়াজ শোনা গেল। সচকিত হয়ে সেদিকে চাইল সবাই। আবার শোনা গেল গোঙানি। এক লাফে উঠে দাঁড়ালেন ফ্লোরেন্স, ছুটলেন। তার পেছনে পেছনে ছুটল অন্যেরা।

ঝোপের ভেতর পড়ে রয়েছে টেনগানে। হাত-পা-মুখ বাঁধা। পাজরার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে।

তাড়াতাড়ি ধরাধরি করে ঝোপের ভেতর থেকে বের করে আনা হলো টোনগানেকে। বাঁধন খোলা হয়। ডাক্তারী ব্যাগ নিয়ে এসেছেন ততক্ষণে ডক্টর চাতোন্নে। পাজরায় ব্যান্ডেজ বাঁধলেন, ইঞ্জেকশন দিলেন। একটু সুস্থ বোধ করতে লাগল টোনগানে, মুখ খুলল।

ভোররাতে নাকি একটা চাপা শব্দে ঘুম ভেঙে যায় টোনগানের! সাবধানে তাবুর বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে সে একে একে ঘোড়ায় চড়ে চলে যাচ্ছে নিগ্রো সৈন্যেরা, সার্জেন্ট দুজন আছে সঙ্গে। একটু দূরে কুলিদের সঙ্গে হাত নেড়ে কি কথা বলছিল ল্যাকোর। মিনিট পাঁচেক পরেই তার সঙ্গে চলে যেতে শুরু করল কুলিরা। ব্যাপারটা কি ঘটছে বুঝতে পারেনি টোনগানে। চুপি চুপি এগিয়ে গিয়েছিল তদন্ত করতে। কিন্তু অতর্কিতে আক্রান্ত হয়। বাঁধা দেবার সময়ও পায়নি।

তিনজন সৈন্য মিলে বেঁধে ফেলে টোনগানেকে।

ব্যাটা মরেছে তো? জিজ্ঞেস করে ল্যাকোর।

না। বেঁধেছি শুধু, জবাব দিল একজন সার্জেন্ট।

গর্দভ কোথাকার! এখনও জ্যান্ত রেখেছ কেন? ঢোকাও বেয়োনেট ! চাপা গলায় ধমকে উঠল ল্যাকোর।

সঙ্গে সঙ্গে হুকুম তামিল করল সার্জেন্ট মাটিতে পড়ে থাকা টোনগানের বুক লক্ষ্য করে নেমে এল বেয়োনেট। বুদ্ধি করে সঙ্গে সঙ্গে কাত হয়ে গেল টোনগানে, পাজরের চামড়া কেটে বসে গেল বেয়োনেট একপাশে, মোক্ষম জায়গায় লাগেনি। যেন হৃৎপিন্ডে বিধেছে এমনি ভাবে গুঙিয়ে উঠল টোনগানে-ইচ্ছে করেই। আর সেজন্যেই বেঁচে গেল।

অন্ধকারে সার্জেন্ট ভাবল টোনগানে বুঝি মারা গেছে। ঠ্যাঙ ধরে টেনে তাকে ঝোপের ভেতরে ফেলে রেখে চলে গেল। রক্তক্ষরণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল টোনগানে। একটু আগে হুঁশ হওয়ায় গোঙাতে পেরেছে।

মিশনের সবাই বুঝল, ক্যাপ্টেন মারসিনেকে কায়দা করে সরিয়েছে ল্যাকোর। কিন্তু, কার আদেশে? ক্যাপ্টেন কি বেঁচে আছেন এখনও? প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা জেন ব্লেজনের। কিন্তু বুঝিয়ে সুজিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন সেন্ট বেরেন।

এরপর পরিস্থিতির মোকাবিলা কিভাবে করা যায় তা নিয়ে আলোচনায় বসল অভিযাত্রীরা। প্রথমেই সঙ্গের জিনিসপত্রের হিসেব নিল। দেখা গেল, সাতটা রাইফেল, দশটা রিভলভার, প্রচুর কার্তুজ, সাতটা ঘোড়া, ছত্রিশটা গাধা, প্রায় হাজার পাউন্ড ব্যবহারের সামগ্রী আর চারদিনের মত খাবার আছে। সুতরাং ভেঙে পড়ার কোন কারণ নেই। চারদিনের খাবার তো আছেই, বন্দুকও আছে সঙ্গে; সুতরাং শিকার করে খাবার জোগাড় করতে কোন অসুবিধে হবে না।

কিন্তু গাধাগুলোর একটা ব্যবস্থা করতে হয় আগে। এত গাধার কোন দরকার নেই এখন। তাছাড়া এগুলোকে চালিয়ে নেয়াও এক সমস্যার ব্যাপার। দুটো গাধার পেছনে একজন করে লোক দরকার হয়।

বুদ্ধি দিলেন জেন। বিক্রি করে ফেলা হোক গাধাগুলোকে। কিন্তু এই জঙ্গলে গাধা কিনবে কে? কিনবে, জঙলীরা। কিন্তু ওদের কাছে পয়সা কোথায়? নাই বা থাকল, কড়ি তো আছে। ওই কড়ি হলে সামনের যে কোন গ্রাম থেকে খাবার কেনা যাবে।

সুতরাং জেন আর সেন্ট বেরে গেলেন। কাদৌ গ্রামের লোকজনের সঙ্গে দামদর ঠিক করে বিক্রি করে ফেললেন গাধাগুলোকে। একবারে মন্দ দাম হলো না —সাড়ে তিন লাখ কড়ি।

গাধা তো বিক্রি হলো এখন মাল বয়ে নেয়া যায় কি করে? এরও সুরাহা করে ফেললেন জেন! গ্রাম থেকে ভাড়া করে কুলি নিয়ে এলেন। কড়ি দিয়েই ভাড়া মেটাবেন।

এসব করতে করতেই দিন তিনেক চলে গেল। এবারে রওনা দেয়া যায়, কিন্তু টোনগানে এখনও সেরে ওঠেনি। সে ভাল না হলে পথ দেখাবে কে? সুতরাং টোনগানে না সারা পর্যন্ত এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল মিশনের সদস্যরা।

তেইশ তারিখ নাগাদ অনেকখানি সেরে এল টোনগানের পাজরার ঘা। পথ চলতে পারবে। সুতরাং আর দেরি করার কোন মানে হয় না।

সকাল সকালই মীটিং-এ বসল অভিযাত্রীরা। টোনগানে আর মালিকও থাকল মীটিঙে। সভাপতি অবশ্যই বারজাক।

চেম্বারে মীটিং শুরু করার আগে যেমন করে থাকেন তেমনি ভঙ্গিতে বললেন বারজাক, অধিবেশন শুরু হচ্ছে। কে আগে কথা বলবেন?

বারজাকের কথার ধরনে হেসে উঠল সবাই-ফ্লোরেন্স ছাড়া! চেম্বার মীটিং দেখে দেখে অভ্যস্ত আছেন তিনি, কাজেই নাটুকেপনা আর হাসির উদ্রেক করে না তার।

আপনিই বলুন, মঁসিয়ে চেয়ারম্যান, বললেন ফ্লোরেন্স।

বেশ, চেয়ারম্যান সম্বোধনে অবাক হলেন না বারজাক। মীটিংই তো এটা, আর এই মীটিঙে সভাপতি তো তিনিই। প্রথমেই দেখা যাক কোথায় আছি আমরা। সামনের টেবিলে ফেলে রাখা ম্যাপের একটা জায়গায় আঙুল খে বললেন, সাগর উপকূল থেকে বহুদূরে, সুদানে আমাদের ফেলে পালিয়েছে ল্যাকোর!

সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে নোটবই বের করে নিলেন পসিঁ। নাকের ওপর চশমাটা ঠিক করে বসিয়ে নিয়ে নোটবই খুলে বললেন, এক মিনিট, মঁসিয়ে চেয়ারম্যান। বহুদূর বলতে আমরা এখন সাগর থেকে আটশো আশি মাইল নশো আটত্রিশ গজ এক ফুট পৌনে পাঁচ ইঞ্চি দূরে আছি। এটা অবশ্য আমার তাঁবুর খুঁটি পর্যন্ত মাপ।

অত চুলচেরা হিসেবের দরকার নেই আমাদের, মঁসিয়ে পসি, বললেন বারজাক। সোজা কথা, কোনাক্রি থেকে এখন নশো মাইলের মত দূরে আছি আমরা। তাড়াতাড়ি কাছাকাছি কোন ফরাসী সৈন্য ছাউনিতে পৌঁছানো দরকার এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

বারজাকের কথায় সায় দিল সবাই। কেবল মুখ গোমড়া করে রইলেন পসিঁ। জবাব দিলেন না।

তা, সায়ে গেলে কেমন হয়? প্রস্তাব রাখলেন বারজাক, নাইজারের মধ্যেই পড়েছে জায়গাটা।

অনেক অসুবিধে তাতে, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলেন পসিঁ। ঝড়ের গতিতে উল্টে গেলেন নোটবইয়ের পাতা। সায় এখান থেকে পাঁচশো মাইল দূরে। আমাদের গড়পড়তা পদক্ষেপ পঁচিশ ইঞ্চি। তাহলে পাঁচশো মাইল যেতে পা ফেলতে হবে এক লক্ষ এগারো হাজার একশো এগারো বার। সোজা কথা?

খামোকা বাজে কথা বলছেন, খেপেই গেলেন ফ্লোরেন্স। অত অঙ্ক না শুনিয়ে সোজা বললেই হয়, দিনে দশ মাইল চলতে পারলে সময় লাগবে মোট তিপান্ন দিন।

অন্য কারণে বলছি হিসেবটা, নোটবই বন্ধ করে বললেন পসি, সায়ে না গিয়ে জেন-এ যাওয়া উচিত আমাদের। অর্ধেক পথ! পাঁচশোর জায়গায় মাত্র আড়াইশো মাইল।

এর চেয়ে ভাল সিগৌসিকোরো চলুন না, মাত্র একশো মাইল?

এরচেয়ে ভাল হয় যদি আবার সিকাসোতে ফিরে যাই আমরা। একশো কুড়ি মাইল। কুড়ি মাইল বেশি বটে, কিন্তু চেনাজানা লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, সাহায্য পাওয়া যাবে। আর তা না হলে মঁসিয়ে ফ্লোরেন্সের কথামত সিগৌসিকোরোতেই যাওয়া যাক।

ঠিকই বলেছেন আপনি, বললেন বারজাক। আর মঁসিয়ে ফ্লোরেন্সও মন্দ বলেননি। সিকাসো ফিরে গেলেই বেশি ভাল হত আমাদের, কিন্তু লোকে যে দূর দূর করবে। বলবে, অভিযান ভন্ডুল করে ফিরে এসেছে বোকা পাঁঠাগুলো। ভদ্রমহোদয়গণ, বক্তৃতা শুরু করতে গেলেন তিনি আবার, কর্তব্য সবার আছে…

বারজাককে এখুনি বাঁধা দেয়া দরকার, বুঝলেন ফ্লোরেন্স ! নইলে পরে তাঁর বক্তৃতা থামানোই কঠিন হবে। তাই তিনি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, কিন্তু কর্তব্যের চাইতে বড় হলো বিচক্ষণতা!

কিন্তু সত্যিই কি কোন বিপদ আছে সামনে? প্রশ্ন রাখলেন বারজাক, এর আগেও আমাকে বলেছেন মঁসিয়ে ফ্লোরেন্স। কোন এক অদৃশ্য শত্ৰু পিছু লেগেছে আমাদের। কিন্তু ওরা তো শুধু আমাদের ভয় দেখিয়েই ক্ষান্ত থেকেছে, সত্যিকারের কোন ক্ষতি করতে পারেনি।

টোনগানেকে তো মারতেই চেয়েছিল, বললেন ডক্টর চাতোন্নে। ও তো নিগ্রো, ওর আবার প্রাণের দাম কি?

ভুলে যাচ্ছেন কেন, মঁসিয়ে চেয়ারম্যান, ছাড়ার পাত্র নন ডাক্তার, এই নিগ্রোদের ভোটাধিকার দানের জন্যেই দেশ থেকে বেরিয়েছেন আপনি। আমাদেরকেও এই বিপদের মুখে টেনে এনেছেন। এখন এ ধরনের কথা অন্তত আপনার মুখে মানায় না। তাছাড়া শুধু টোগানেকে কেন, এর আগে আমাদেরকেও তো বিষ খাইয়ে মারার পরিকল্পনা করেছিল শত্রুরা।

ঠিকই বলেছেন, ডক্টর, সায় দিলেন ফ্লোরেন্স।

কয়েক মিনিট নীরবতা। ভুরু কুঁচকে ভাবতে লাগলেন বারজাক।

ঠিক আছে, শেষ পর্যন্ত মনস্থির করে নিয়ে বললেন বারজাক, আপনাদের দুজনের প্রস্তাবকেই ভোট দিচ্ছি; সিকাসোতে যাব, না সিগেসিকোরো। কেউ যদি বলেই যে, অভিযান ভন্ডুল করে ফিরে এসেছি আমরা তবে সোজা মুখের ওপর বলে দেব যে, দোষ আমাদের নয়, দোষ সরকারের। আমাদের নিরাপত্তা প্রদান করতে পারেনি সরকার। সশস্ত্র প্রহরী দিয়ে তা আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।

একেই বলে পলিটিক্যাল লীডার, বিড় বিড় করে বললেন পসিঁ! কোন ব্যাপারেই সহজে হারতে রাজি নন এঁরা।

হঠাৎই ব্যাপারটা খেয়াল হলো ফ্লোরেন্সের। চুপচাপ বসে শুধু শুনছিল খালাবোনপো। একটা কথাও বলেনি মীটিঙে। ওঁদের মতামতও তো নেয়া দরকার। তাই বলে উঠলেন, মিস ব্লেজন আর মঁসিয়ে বেরেনের মতামত তো শুনিনি আমরা এখনও!

ঠিক, ঠিক কথা। প্রায় লাফিয়ে উঠলেন বারজাক।

ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়াল জেন ব্লেজন, শান্ত স্বরে বলল, আমাদের মতামতের কোন দরকার নেই। কারণ আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছি না আমরা দুজন। কিন্তু যেখানে যাব বলে বেরিয়েছি, প্রাণ থাকতে তার শেষ না দেখে ছাড়ব না।

আঁ! চমকে উঠলেন যেন বারজাক, কিন্তু সঙ্গে সৈন্যসামন্ত যে কেউ নেই।

থাকবে না ধরে নিয়েই তো বেরিয়েছিলাম।

কিন্তু কুলি?

কুলি পথে নিয়ে নেব। তাছাড়া কয়েকজন তো ঠিকই করে রেখেছি। অদৃশ্য শত্রু… ।

তার রাগ আপনাদের ওপর, আমার ওপর নয়।

হঠাৎই রেগে গেলেন বারজাক, তাহলে গায়ের জোরে আটকাব আপনাকে। ইয়ার্কি পেয়েছেন? আমি চেম্বারের একজন মেম্বার সামনে থাকতে কোন অস্থানে কুস্থানে গিয়ে মরবেন আপনি, আর তাই আমি বসে বসে দেখব ভেবেছেন?

আমি বালিকা নই, শান্ত স্বরেই বলল জেন। আর ইয়ার্কিও মারছি না।

তবে?

তবে আবার কি, কর্তব্য।

কর্তব্য! বিমূঢ় হয়ে গেলেন বারজাক। মিশনের অন্য সদস্যরাও বিস্মিত। এই গভীর জঙ্গলে কি কর্তব্য থাকতে পারে একটা মেয়ের?

এক মুহূর্ত দ্বিধা করল জেন। তারপর মনস্থির করে নিয়ে বলল, প্রথম থেকেই আপনাদের ঠকিয়েছি আমি, সেজন্যে মাপ চাইছি আজ।

ঠকিয়েছেন। বিস্ময়ে ভুরু কুঁচকে গেছে বারজাকের।

হ্যা, ঠকিয়েছি। সেন্ট বেরেন সত্যিই ফরাসী, কিন্তু আমি ইংরেজের মেয়ে। আমাকে আপনারা কেউই ঠিক চিনে উঠতে পারেননি। আমার নাম জেন ব্লেজন। ইংল্যান্ডের লর্ড ব্লেজন আমার বাবা। বড় ভাই ছিলেন ক্যাপ্টেন জর্জ ব্লেজন। কৌবোর কাছে কোন এক অজ্ঞাত কবরে শুয়ে আছেন এখন, সুতরাং কৌবো পর্যন্ত যেতেই হবে আমাকে। এটা আমার কর্তব্য।

একে একে আফ্রিকা অভিযানের আসল উদ্দেশ্য বলে গেল জেন ব্লেজন। আবেগে গলা কাঁপছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত স্তব্ধ হয়ে বসে তার কথা শুনছে শ্রোতারা! বংশের মুখ উজ্জ্বল করতে, ভাইয়ের বদনাম ঘোচাতে, বাপের সুনাম রাখতে দুর্গম যাত্রায় বেরিয়েছে একরত্তি একটা মেয়ে, এ যে অবিশ্বাস্য!

হঠাৎ প্রচন্ড রাগে ফেটে পড়লেন আমিদী ফ্লোরেন্স, মিস ব্লেজন, আপনার। বিরুদ্ধে নালিশ আছে আমার!

হকচকিয়ে গেল জেন। ফ্লোরেন্সের এ-রকম প্রতিক্রিয়া আশা করেনি সে।

নালিশ?

হ্যাঁ, নালিশ। ভুলে যাচ্ছেন কেন, জাতে আমি ফরাসী।

তো, তো কি হয়েছে? কথা জড়িয়ে গেল জেনের।

ছিঃ ছিঃ! কি করে ভাবলেন আপনি, আপনাকে আমরা বিপজ্জনক একটা জায়গায় যেতে দেব? একা?

মঁসিয়ে ফ্লোরেন্স! তবু ঠিক বুঝতে পারছে না জেন।

অন্যায়। এ ঘোর অন্যায়। আসলে অত্যন্ত স্বার্থপর আপনি…

বুঝে ফেলল জেন। হাসল, বুঝেছি, মঁসিয়ে ফ্লোরেস।

কথা বলতে দিন আমাকে,  তীব্র গলায় বললেন ফ্লোরেন্স। জাতে শুধু ফরাসীই নই, জাতে আমি সাংবাদিকও। প্যারিসে বসে অদ্ভুত সব খবরের আশায় প্রহর গুনছেন আমার সম্পাদক। যখন শুনবেন যে, জেন ব্লেজনের গরম খবর আমার নাকের ডগা দিয়ে পালিয়েছে, আর আমি বসে বসে শুধু হাই তুলেছি তখন চাকরিটা রাখবেন? তাছাড়া অ্যাডভেঞ্চারের নেশাও আমার আছে। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন, আপনার সঙ্গে যাচ্ছি আমি।

মঁসিয়ে ফ্লোরেন্স।

হ্যাঁ, তাই। একগুয়ের মত বললেন ফ্লোরেন্স, বাধা দিয়ে কোন লাভ হবে না, আমি যাচ্ছি।

এগিয়ে এসে ফ্লোরেন্সের হাত চেপে ধরল জেন। ছলছল করে উঠল দুই চোখ, সত্যি আমার সৌভাগ্য, মঁসিয়ে ফ্লোরেন্স।

আর আমি? গম্ভীর গলায় জানতে চাইলেন ডক্টর চাতোন্নে, আমাকে নেবেন ?

আপনি? ঘুরে চাইল জেন।

হ্যা, আমি। এরকম অভিযানে ডাক্তার একজন সঙ্গে থাকতেই হবে। ধরুন জঙলীরা আপনাকে শরীরের মাঝামাঝি থেকে কেটে দুটুকরো করে ফেলল। তখন সেলাই করে জোড়া লাগাবে কে, শুনি?

ডাক্তারের কথার ধরন শুনে হেসে ফেললেন ফ্লোরেন্স। কিন্তু ফুঁপিয়ে উঠল জেন, ডক্টর ডক্টর!

ওদিকে খেপে লাল হয়ে গেছেন বারজাক। চেঁচিয়ে উঠলেন, ভেবেছেন কি আপনারা, মিস ব্লেজন? ফ্লোরেন্স? ডক্টর? আমার মতামতটা নেবারও প্রয়োজন নেই নাকি আপনাদের?

সত্যিই রেগেছেন বারজাক। কেউ কোন কথা বলল না।

ডক্টর চাতোন্নে, আবার বললেন বারজাক, আপনি এই মিশনের সদস্য, কিন্তু আমি লীডার। আমার হুকুম না নিয়ে এই বিদেশিনীকে কথা দিচ্ছেন কি করে?

আমি, মানে আমি… আমতা আমতা করতে লাগলেন ডাক্তার।

হ্যা, আপনি। আমাকে জিজ্ঞেস না করে কি করে কথা দিচ্ছেন?

আমি…আমি…

বসে ছিলেন, লাফ মেরে উঠে দাঁড়ালেন বারজাক, ভয়ানক জঙলী এলাকা দিয়ে অগুনতি বিপদের মোকাবিলা করে এগোতে হবে মিস ব্লেজনকে। হঠাৎ কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে নিলেন তিনি, তাই আমার মনে হয়, মিশনের সবার উচিত একজন বিদেশিনীকে একান্তভাবে সাহায্য করা। অর্থাৎ আমাকেও বাধ্য হয়েই যেতে হচ্ছে। ঘুরিয়ে কথাটা বললেন বারজাক।

মসিয়ে বারজাক! এবারে কেঁদেই ফেলল জেন।

এক মুহুর্তে গম্ভীর ভাব দূর হয়ে গেল সবার মুখ থেকে। সমানে কথা বলতে লাগলেন সবাই।

সামান্য একটুখানি রাস্তা, খাবাৱের অভাব হবে না, বললেন ফ্লোরেন্স।

চার পাঁচদিনের খাবার তো সঙ্গেই রয়েছে। এমনভাবে বললেন ডাক্তার যেন। ছমাসের খাবার আছে।

পাঁচদিন নয়, ঠিক চারদিনেরই আছে, সঠিক পরিমাণ বাতলে দিলেন বারজাক। তারপর বললেন, কিন্তু তাতে কি, পথে কিনে নেব।

কথাটা এমনভাবে বললেন যেন প্যারিস, বাড়ির বাইরে গেলেই খাবারের দোকান।

আর শিকার তো রয়েইছে, বললেন ডাক্তার।

সেন্ট বেরেন বললেন, মাছ ধরা তো আরও সোজা।

ডাক্তার বললেন, জঙলী ফলও প্রচুর মিলবে!

উচ্ছাসে ফেটে পড়ল টোনগানে, বলল, গাছ চেনা আছে আমার।

সি মাখন বানাতে পারি আমি। সত্যি! বলে আনন্দে প্রায় নাচতে লাগল মালিক।

হিপ, হিপ, হুররে! হিপ, হিপ, হুররে! লাফিয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন ফ্লোরেন্স।

তাহলে আর সময় নষ্ট না করে কাল ভোরেই রওনা দেয়া যাক, প্রস্তাব রাখলেন বারজাক।

এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি পসিঁ। নোটবই খুলে আপন মনে অঙ্ক কষছিলেন এত গোলমালের মাঝেও। হঠাৎ মুখ তুলে চেয়ে বললেন, তার মানে সিগৌসিকোরোর চাইতে আরও আড়াইশো মাইল বেশি যেতে হচ্ছে আমাদের। প্রতিবার পা ফেলে যদি পঁচিশ ইঞ্চি যাই আমরা…।

কেউ কান দিল না গণিত বিশারদের কথায়।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *