১০. পরিষ্কার বুঝতে পারছি বিপদে পড়েছি

ফেব্রুয়ারি ১৪। সন্ধ্যা। পরিষ্কার বুঝতে পারছি বিপদে পড়েছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না বিপদটা কি ধরনের। কাদের সঙ্গে চলেছি আমরা? আমার মন বলছে, সশস্ত্র প্রহরীর বেশে যারা এসেছে আমাদের পথ দেখানোর জন্যে, তারা আর যাই হোক, ফরাসী সরকারের অধীনস্থ কর্মচারী নয়। তাহলে কারা এরা? ক্যাপ্টেন মারসিনে জোর দিয়ে বলেছেন যে চিঠিটা কর্নেল অবানেরই লেখা। কিন্তু বারজাকের মত আমিও কথাটা বিশ্বাস করতে পারছি না কেন?

আরেকটা ব্যাপারে সেই প্রথম থেকেই খটকা লেগেছে আমার। আমাদের পেছনে পেছনে হন্তদন্ত হয়ে পনেরো দিন ধরে ছুটে আসা লোকগুলোর তো সারা শরীর ধূলিধূসরিত থাকার কথা—সেটাই স্বাভাবিক; কিন্তু দিব্যি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ফিটফাট সবাই। আর লেফটেন্যান্ট ল্যাকোর তো যেন জামাই সেজে এসেছে।

শুধু জামা-কাপড়ই যে পরিষ্কার তাই নয়, চোখে মুখে বিন্দুমাত্র ক্লান্তির চিহ্ন নেই ল্যাকোরের। দেখে শুনে মনে হচ্ছে, জোর করে অফিসার সাজতে চাইছে লোকটা। চেহারায়, চলনে বলনে ফরাসী সামরিক অফিসারের স্মার্টনেসের কোন চিহ্নই নেই তার মধ্যে। কড়া করে মোম মাখানো গোঁফ, যেন মাত্র ব্যান্ডবক্স থেকে বেরিয়ে এসেছে, সৈনিক-ছাউনি থেকে নয়। চকচকে পালিশ করা আনকোরা নতুন জুতো যেন থিয়েটারের অভিনেতার পায়েই বেশি ভাল মানাত।

আসলে বেশি বাড়াবাড়ি করতে গিয়েই ধরা পড়ে যাচ্ছে ল্যাকোর। আর লেফটেন্যান্ট বলব না তাকে। কারণ, বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না যে কোনকালেই ফরাসী সেনাবাহিনীতে লেফটেন্যান্ট ছিল না সে।

ওদিকে ল্যাকোরের ঠিক উল্টো তার সার্জেন্ট দুজন। সামরিক পোশাক আছে ঠিকই, কিন্তু মলিন, শতচ্ছিন্ন। আরও অবাক কান্ড, ইউনিফর্মের রেজিমেন্টের নম্বর, চিহ্ন কিছুই নেই ওদের। মলিন শুধু পোশাকই, তাদের চেহারা কিন্তু দিব্যি চকচকে যেন মাত্র জাহাজ থেকে নেমে এসেছে, আর আসার সময়ে কুড়িয়ে নিয়ে পরে এসেছে কাপড়গুলো। হঠাৎই সন্দেহটা জাগল মনে–লুট করেনি তো?

বিশ্বাস করতে পারছি না এদের আমি কিছুতেই, কিন্তু আবার অবিশ্বাসের তেমন কোন কারণও খুজে পাচ্ছি না। একটা ব্যাপারে কিন্তু দুনিয়ার যে কোন উন্নতমানের সেনাবাহিনীর সমতুল্য এর নিয়মানুবর্তিতা। ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে, বিন্দুমাত্র ভুলত্রুটি নেই, কাজে অবহেলা নেই, বিশ্রামের জন্যেও লালায়িত নয় কেউ। একজন সেন্ট্রির যাবার ঠিক আগের মুহুর্তে এসে যাচ্ছে তার বদলী। যন্ত্রের মত নিখুঁত ভাবে চলছে সব।

তিনটে দলে বিভক্ত তেইশজনের দলটা। বিশজন নিগ্রো সৈন্যের ভলান্টিয়ার দলটার কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না। নীরবে খায়-দায়-ঘুমোয়। আশ্চর্যের ব্যাপার! নিগ্রোদের স্বভাবের সঙ্গে একেবারেই বেমানান।

যমের মত ভয় করে চলে এরা সার্জেন্ট দুজনকে। আর ল্যাকোরকে তো বলতে গেলে আল্লাহ মানে। চোখের ইঙ্গিত মাত্র নীরবে হুকুম পালন করে চলে। সারাক্ষণই যেন কোন অজানা আতঙ্কে কাঠ হয়ে থাকে সিপাইরা।

শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যেই মাঝেসাঝে কথা বলে সার্জেন্ট দুজন, তাও চাপা গলায়। আড়ালে-আবডালে লুকিয়েও ওদের কথা শুনতে পারছি না আমি। তবে চেষ্টা অব্যাহত রাখছি।

সারাক্ষণ একেবারে একা থাকে ল্যাকোর। বেঁটে। ডাকাতের মত রুক্ষ, ইস্পাতের মত কঠিন দুই চোখ। ঠোট দুটো দেখলেই বোঝা যায় ভয়ঙ্কর প্রকৃতির নিষ্ঠুর এই লোক। সারা বিকেলে মাত্র দুবার সাক্ষাৎ হয়েছে তার সঙ্গে আমার, কিন্তু কোনবারেই কথা হয়নি। শুধু দলের লোকদের হুকুম দিতেই তাঁবু থেকে বেরিয়েছিল সে। ল্যাকোরকে দেখামাত্রই যে যেখানে ছিল লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে বিশজন সিপাই। একেবারে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে। যেন কাঠের পুতুল। কঠিন স্বরে সিপাইদের নয়, সার্জেন্ট দুজনকে হুকুম দিয়েই আবার গিয়ে তাবুতে ঢুকেছে ল্যাকোর।

ক্যাপ্টেন মারসিনে চলে যাবার পর সারাটা দিনে একবারও মিস জেনের দেখা পাইনি। তাঁবু থেকে বেরোননি।

আর হ্যাঁ, এখনও ফেরেনি চৌমৌকি।

ফেব্রুয়ারি ১৫। সকালে দেরি করে তাঁবু থেকে বেরোলাম। আজও বিশ্রাম নেয়া হবে। টেনগানেকে জিজ্ঞেস করে জানলাম ব্যাপারটা। গতকালও সারাটা দিন বিশ্রাম গেছে, আজ আবার কেন?

অতি ফিটফাট ল্যাকোরের সঙ্গে আচমকা দেখা হয়ে যেতেই জিজ্ঞেস করলাম, এই যে, লেফটেন্যান্ট, আজ আবার বিশ্রাম কেন?

মঁসিয়ে বারজাকের হুকুম, তিনটে শব্দে উত্তরটা দিয়েই গটগট করে চলে গেল। ল্যাকোর।

ব্যাপারটা কি? ভাবনায় পড়লাম আমি। সৈন্যসংখ্যা কমে যাওয়াতেই কি অভিযান বন্ধ রেখেছেন বারজাক? নাহ, জিজ্ঞেস করেই দেখতে হচ্ছে।

আমি তাঁবুর কাছাকাছি যেতেই দেখলাম, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছেন বারজাক। আমার দিকে নজর নেই। পেছনে হাত, চোখ মাটির দিকে। চিন্তাচ্ছন্ন। বেরিয়েই পায়চারি করতে শুরু করলেন।

এগিয়ে গিয়ে ডাকলাম, মসিয়ে বারজাক?

কে? মুখ তুলে চাইলেন বারজাক, ও, রিপোর্টার? আসুন। তারপর কি খবর?

আজও নাকি থেকে যেতে চাইছেন? কেন?

আসলে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছি না।

কি সিদ্ধান্ত?

এগোব, নাকি-ফিরে যাব। আসুন না, আমরা দুজনে মিলে পরামর্শ করে দেখি?

বেশ তো।

অভিযান চালিয়ে গেলে যে কি হবে বোঝা হয়ে গেছে আমার, নতুন আর কিছুই পাব না।

ঠিক।

এদিকে সৈন্যসংখ্যা এখন আগের তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এত কম লোক নিয়ে আরও দুর্গম এলাকায় ঢোকা কি উচিত হবে?

কিন্তু এর চাইতে কম লোক নিয়েও তো এর চেয়ে দুর্গম এলাকায় পাড়ি দিয়েছে মানুষ। তবে কথা সেটা নয়…।

জানি কি বলবেন। কেউ একজন আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে, এগোতে বাধা দিচ্ছে। ওসব কথা আর ভাল লাগছে না।

কথার মোড় ঘোরালাম। নতুন সৈন্য আর অফিসারদের কথা তুলে আমার মনের সমস্ত সন্দেহের কথা জানালাম বারজাককে। কিন্তু হাসতে লাগলেন তিনি। বললেন, আপনার কল্পনা শক্তির তারিফ না করে পারছি না, মঁসিয়ে ফ্লোরেন্স। কিন্তু ওসব আপনার ভুল ধারণা; কর্নেল অবানের সই জাল হতে পারে না কিছুতেই। ক্যাপ্টেন মারসিনের মত ঝানু অফিসার তার কমান্ডিং অফিসারের সই না চেনার মত বোকা নন।

চুরি করে আনা হতে পারে চিঠিটা, কিংবা ছিনিয়ে আনা হতে পারে।

চুরি অসম্ভব, আর কর্নেলের পাঠানো লোকদের কাছ থেকে ল্যাকোর চিঠি ছিনিয়ে নিতে গেলে মারাত্মক লড়াই হত। সেক্ষেত্রে ল্যাকোরের দলের লোকেরাও অন্তত পক্ষে জখম হতই। কিন্তু এখানে যারা এসেছে তাদের গায়ে একটা আঁচড়ও নেই। তাছাড়া সুদানীজ ভলান্টিয়ার নয় বলে এদের সন্দেহ করার কোন কারণই নেই। একেবারে নিখুঁত চালচলন।

কিন্তু সার্জেন্ট দুজনের কাপড় দেখেছেন?

ক্যাপ্টেন মারর্সিনের সার্জেন্টদের কাপড়ই বা তত ভাল ছিল কোথায়? আর তাছাড়া পনেরো দিন জঙ্গল ভেঙে এলে কাপড়চোপড় থাকে?

ল্যাকারের পোশাক তো একেবারে আনকোরা! যেন সদ্য ভাঁজ ভেঙে পরেছে।

ফরাসী সেনাবাহিনীর অনেক অফিসারই ফিটফাট থাকতে ভালবাসে। সঙ্গে করে নিশ্চয়ই নতুন ইউনিফর্ম এনেছিল লেফটেন্যান্ট। ওর সঙ্গে কথা হয়েছে আমার। শিক্ষিত, বিনীত, ভদ্র। অহেতুক কোন কথা বলে না। তাছাড়া লোকের সম্মান দিতে জানে।

একটু থেমে আমার চোখের দিকে চাইলেন বারজাক। একটু জোর দিয়েই বললেন, তাছাড়া কথা শোনে।

তা অভিযান চালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে আপনার কি মত। অসুবিধে হবে?

মোটেই না।

কিন্তু তবু দ্বিধায় রয়েছেন, বুঝতে পারছি।

কালই রওনা হব। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।

গিয়ে আর কোন লাভ নেই জেনেও?

বুঝলাম ঠিক জায়গায় গিয়ে লেগেছে খোঁচাটা, বললেন, দেখুন, অভিযান চালিয়ে যেতেই হবে এখন।

কারণ?

হঠাৎই গলার স্বর খাটো করে আনলেন বারজাক, দেখুন মঁসিয়ে, আপনাকে বলতে দোষ নেই। অনেক আগেই বুঝে নিয়েছি, এই বর্বরদের ভোটার বানানো যায় না। আপনি কিন্তু আবার বলে দেবেন না চেম্বারে। অভিযান শেষ করতেই হবে নইলে রিপোর্ট দিতে পারব না ঠিকমত। ফিরে গিয়ে আমি আমার রিপোর্ট দেব, বদ্রিয়ার্স দেবেন তাঁরটা। দুটো রিপোর্টই খতিয়ে দেখবে কমিশন। ফলে হয় আমার মুখ রাখার জন্যে অতি সভ্য কিছু নেটিভকে ভোটার করা হবে, কিংবা আদৌ করাই হবে না এবং সেক্ষেত্রেও আমি উচ্চবাচ্য কিছু করব না। সমস্ত ব্যাপারটা ভুলে যেতে লোকের সাতদিনও লাগবে না। কিন্তু অভিযান বন্ধ করে যদি ফিরে যাই, আমাকে আস্ত রাখবে না বিরোধীপক্ষ। হেরে যাব আমি। পলিটিকসের একটা গোপন কথা বলি, কোন সময় ভুল করে তা স্বীকার করতে নেই। তাহলেই হয়েছে, ভোটে জিততে হবে না আর কোনদিন।

আর কথা বাড়ালাম না। পরিষ্কার করেই সব কথা বলেছেন বারজাক।

বারজাকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের তাঁবুতে ফেরার সময়, ফোল্ডিং চেয়ারে বসে গভীর মনোযোগের সঙ্গে নিজের নোটবইটা পড়তে দেখলাম পর্সিকে। রিপোর্টারের স্বাভাবিক কৌতূহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। একদম কথা বলেন না ভদ্রলোক। দিনরাত শুধু নিজের নোটবইয়ে কি লেখেন আর আপন মনেই বিড়বিড় করেন। নাহ, দেখতেই হবে তার নোটবইটা। সুযোগের অপেক্ষায় রইলাম এবং পেয়েও গেলাম।

আধ ঘণ্টা পরেই, বোধ হয় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ফোল্ডিং চেয়ারের ওপর নোটবইটা রেখে চলে গেলেন পসিঁ। বিন্দু মাত্র দেরি না করে নোটবইয়ের শেষ লেখা পাতাটা খুললাম। দুর্বোধ্য কিছু সঙ্কেত লেখা আছে। মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলাম না। তবু পরে মাথা ঘামিয়ে দেখা যাবে ভেবে তাড়াতাড়ি নিজের নোটবইয়ে টুকে নিলাম সঙ্কেতগুলোঃ পি, জে, ০, ০০৯, পি, কে, সি, ১৩৫, ০৮, ম, ৭৬১…, এমনি সব।

এগুলো আবার কি লেখা রে বাবা! মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি লোকটার! নইলে নোটবইয়ে এসব হেঁয়ালি কেন? সঙ্কেতের অর্থ বের করার সত্যিই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। সঙ্কেতগুলো টুকে নিয়ে নোটবইটা অবার যথাস্থানে রেখে পসিঁ ফিরে আসার আগেই কেটে পড়লাম।

আশপাশটায় একটু চক্কর দিতে বেরোলাম বিকেল বেলা। সঙ্গে টোনগানে। ঘোড়ায় চড়েই চলেছি দুজনে-চৌমৌকির ঘোড়াটা নিয়েছে টোনগানে। ভাল ঘোড়া দেখলেই দখল করে নেয়ার তালে থাকে ও।

রওনা দেবার পর থেকেই কথা বলার জন্যে উসখুস করছিল টোনগানে। ক্যাম্পের কাছ থেকে সরে আসার পর আর থাকতে পারল না, বলেই ফেলল, লোকটা একেবারে বদমাশ। বিশ্বাসঘাতক!

কে! কার কথা বলছ?

চৌমৌকি হারামজাদা। ওর ওস্তাদ মোরিলিরের মতই পাজী। কুলিদের সোনার টাকা দিত দুজনেই। গোপনে মদ সরবরাহ করত। আর বলত, বেশি হাঁটবি না, অল্পতেই কাহিল হয়ে পড়ার ভান করবি।

কড়ি দিত, বলছ বোধহয় তুমি? চেমৌকি আর মোরিলিরের হাতে সোনার টাকা থাকবে বিশ্বাস করতে পারলাম না।

সোনার টাকা! ইংলিশ! জোর দিয়ে বলল টোনগানে।

ইংলিশ সোনার টাকা চেনো?

চিনব না মানে? কত দেখলাম।

একটু ভেবে নিলাম। কথা আদায় করতে হবে টোনগানের কাছ থেকে। পকেট থেকে একটা সোনার ফরাসী টাকা বের করে বাড়িয়ে ধরলাম, এই নাও, রাখো।

হাত বাড়িয়ে মোহরটা নিল টোনগানে। খুশিতে সব দাত বেরিয়ে পড়েছে তার। মোহরটা জিনের সঙ্গে আটকানো ব্যাগে রাখতে গিয়েই থমকে গেল! বিস্ময় ফুটেছে চোখেমুখে! রোল পাকানো একগাদা কাগজ টেনে বের করল ভেতর থেকে। দেখেই চিনলাম। আমার লেখা রিপোর্ট। লা এক্সপ্যানসন ফ্রাঁসে পত্রিকায় পাঠানোর জন্যে চৌমৌকির হাতে দিয়েছিলাম। পাঠায়নি। লুকিয়ে রেখে দিয়েছে। জঙলী ওঝার তিনটে ভবিষ্যদ্বাণীই সফল হলো তাহলে। বাকি আর একটা রইল। সেটা ফললেই ষোলোকলা পূর্ণ হয়।

খারাপ হয়ে গেল মনটা। নীরবে টোনগানের পাশে পাশে এগিয়ে চলেছি। একটা খোলা জমিনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মাটির দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। রাশ টেনে ঘোড়া দাঁড় করিয়ে ফেললাম।

ছসাত গজ চওড়া আর প্রায় পঞ্চাশ গজ লম্বা কয়েকটা দাগ। এই দাগ আগেও দেখেছি। কেটে বসে গেছে জমিতে। আজব সেই শব্দ প্রথম শোনার পরদিন এই রকম দাগই দেখেছিলাম ক্যাম্পের কিছুদূরের মাটিতে, কানকানে।

আজব ওই আওয়াজের সঙ্গে এই দাগের কি সম্পর্ক আছে? ক্রমেই জমাট বাঁধছে রহস্য। হালকা হচ্ছে না কিছুতেই। একের পর এক শুধু ঘটেই চলেছে রহস্যজনক ঘটনা!

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। তাঁবুতে ফিরে চললাম।

আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে চলেছি। ক্যাম্পের কাছাকাছি এসেই হঠাৎ নীরবতা ভাঙল টোনগানে, ল্যাকোর লোকটাকে মোটেই পছন্দ হচ্ছে না আমার।

আমারও না, সায় দিলাম আমি।

ফেব্রুয়ারি ১৭। এখনও ফেরেনি চৌমেকি। কিন্তু তাকে ছাড়াও মোটামুটি ভালই পথ চলেছি আমরা। সে থাকতে বরং আরও কম এগোতাম। গত দুদিনে পাড়ি দিয়েছি মোট তিরিশ মাইল। এখন দিব্যি হাঁটছে কুলিরা। ল্যাকোরের ভয়েই হয়তো। তাদের দুপাশ আগলে চলেছে বিশজন নিগ্রো সৈন্য। পেছনে দুই সার্জেন্ট। ক্যাপ্টেন মারসিনের নিগ্রো সৈন্যেরা কুলিদের সঙ্গে কথা বলত, এমনকি হাসি-ঠাট্টা পর্যন্ত করত নিজেদের মধ্যে। অথচ ল্যাকোরের লোকগুলো একেবারে গোমড়ামুখো। নিজের জাতভাইদের সঙ্গে পর্যন্ত একটা কথা নেই।

বারজাকের পাশে পাশে চলেছে ল্যাকোর। পিছিয়ে এসে, পসিঁ আর চাতোন্নের পেছনে সেন্ট বেরেনের পাশাপাশি চলেছেন মিস ব্লেজন। ল্যাকোরকে একেবারেই পছন্দ করেন না তিনি।

সকাল নটা নাগাদ একটা গ্রামে এসে পৌঁছলাম। কিন্তু গোটা গ্রাম একেবারে খাঁ খাঁ করছে। জনমানবের ছায়াও নেই! গেল কোথায় এরা সব! গ্রামের পাশ দিয়ে চলার সময় একটা ঘরের ভেতর থেকে চাপা আর্ত-গোঙানি শোনা গেল। আমি আর ডাক্তার এগিয়ে গিয়ে উঁকি দিলাম। শিউরে উঠলাম। ভেতরে বীভৎস দৃশ্য! ঘরের মেঝেতে মরে পড়ে আছে দুজন লোক। একজন পুরুষ একজন মেয়ে। দুজনেরই সমস্ত দেহ ফালাফালা করে চেরা। পচে, ফুলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, টেকা দায়। নাকে হাত দিলাম। তৃতীয় একজন বুড়ো লোক পড়ে কাতরাচ্ছে। সাংঘাতিকভাবে জখম হয়ে রয়েছে সে।

কাঁধের হাড় একেবারে গুঁড়ো হয়ে গেছে লোকটার। সাংঘাতিক জখম ভেদ করে বেরিয়ে পড়েছে ভাঙা হাড়ের টুকরো। পচন ধরেছে জখমে। কোন অস্ত্র অমন মারাত্মক জখম করতে পারে বুঝলাম না।

এগিয়ে গেলেন ডক্টর চাতোন্নে। বুড়োর পাশে বসে পড়ে জখম পরীক্ষা করে দেখতে লাগলেন। ঘরের ভেতরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। ভাল দেখা যায় না। লোকটাকে বাইরে বের করা দরকার। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারজাককে ডাকলেন ডাক্তার।

বারজাকের সঙ্গে সঙ্গে এল ল্যাকোর, মিস জেন, সেন্ট বেরেন ও পসিঁ। সার্জেন্ট দুজন। টোনগানে আর কয়েকজন কুলিও এল। বুড়োকে ধরাধরি করে ঘর থেকে বের করে নিয়ে এল দুজন কুলি।

ঘরের বাইরে উঠানে লোকটাকে চিত করে শুইয়ে আরেকবার তার জখম পরীক্ষা করলেন ডাক্তার। ক্ষতস্থান থেকে বের করলেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য সীসের টুকরো। তারপর ব্যান্ডেজ বাঁধতে লাগলেন। পাশে দাড়িয়ে একটার পর একটা ডাক্তারী সরঞ্জাম এগিয়ে দিল ল্যাকোর। সমানে চিৎকার করছিল বুড়ো লোকটা।

বুড়োর ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ করে আবার ঘরে ঢুকলেন ডাক্তার। লাশ দুটোকে পরীক্ষা করলেন, তারপর একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে আবার বেরিয়ে এলেন বাইরে!

বুড়োর চিৎকার একটু কমেছে ততক্ষণে। টোনগানেকে দিয়ে জিজ্ঞেস করালেন ডাক্তার, ব্যাপার কি? কি করে ঘটল এমন?

কোকাতে কোকাতে আস্তে আস্তে বলে গেল বুড়ো। অনুবাদ করল টোনগানেঃ

দিন ছয়েক আগে, মানে এগারো তারিখে, দুজন সাদা মানুষ এসে হানা দেয় এই গ্রামে। একটা কুঁড়েতে ঢুকে কথা নেই বার্তা নেই, সামনে মেয়ে-পুরুষ দুজনকে দেখে গুলি চালায়। সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় দুজন। কুঁড়েঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে উকিঝুঁকি মারতে থাকে নিগ্রোরা। ভেতরের দৃশ্য দেখে আঁতকে ওঠে। বিন্দুমাত্র দেরি না করে বনের দিকে ছুটে পালায় তারা। একটু পিছিয়ে পড়েছিল। বুড়ো। এমন সময় কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে আসে সাদা লোক দুজন। পেছন থেকে আবার গুলি চালায়। কাঁধের কাছে সাংঘাতিক এক ধাক্কা খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বুড়ো। পরে লোক দুজন চলে গেলে গাঁয়ের লোকেরা বুড়োকে ধরাধরি করে নিয়ে আসে। এই কুঁড়েতেই শুইয়ে রাখে। তারপর ভয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। এ ধরনের ব্যাপার নাকি আশেপাশের গাঁয়েও ঘটেছে। ভয়াবহ আতঙ্কের মাঝে দিন কাটাচ্ছে এসব এলাকার লোকেরা। আনেকেই পালাচ্ছে দূরের গাঁয়ে।

অদ্ভুত কান্ড! অজানা ভয় এসে গ্রাস করল মনকে। অসহায় নিগ্রোগুলোকে কারা এসে এমন নিষ্ঠুরভাবে খুন করে যাচ্ছে? কেন?

বাইরে বের করে আনার সময় বোধহয় ল্যাকোরের সার্জেন্ট দুজনকে খেয়াল করেনি বুড়ো। এখন হঠাৎ ল্যাকোরের পেছনে ওদের দেখতে পেতেই আতঙ্কে চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসার জোগাড় হলো তার।

চকিতে ঘুরে দাঁড়ালাম। বিন্দুমাত্র ভাবান্তর নেই সার্জেন্টদের চেহারায়। শুধু ক্ষণিকের জন্যে দেখলাম ওদের দিকে চেয়ে ভয়ঙ্করভাবে জ্বলে উঠল ল্যাকোরের দুই চোখ।

বুড়ো লোকটির দিকে ফিরে দেখলাম এরই মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গেছে। তার নাড়ি দেখছেন ডাক্তার। মিনিটখানেক ধরে পরীক্ষা করে কুলিদের আদেশ দিলেন, তাকে অন্য একটা ঘরে রেখে আসতে। আমাদের দিকে ফিরে বললেন, আশা নেই। আর ঘণ্টাখানেক বাঁচবে কিনা সন্দেহ, ছটা দিন যে কি করে টিকে ছিল! গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে।

মনটা সাংঘাতিক খচখচ করতে লাগল আমার। অসংখ্য রহস্যের ভিড়ে এসে ঠাই নিয়েছে আরেক নতুন রহস্য। ল্যাকোরকে দেখে নির্বিকার ছিল বুড়ো, কিন্তু সার্জেন্ট দুজনকে দেখামাত্র অমন আঁতকে উঠল কেন?

এই গায়ে আর বিশ্রাম নিলাম না। সোজা এগিয়ে চললাম। পথে একটা বনের ধারে থেমে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। সন্ধে নাগাদ এসে পৌঁছলাম ছোট একটা গাঁয়ে, নাম কাদৌ। তাঁবু খাটানো হলো। দলের সবারই মুখচোখ গম্ভীর! কারও সঙ্গে কারও কথা নেই। সবার মনেই চাপা উত্তেজনা !

এখান থেকেই আমাদের সঙ্গ ছেড়ে যাবেন মিস জেন ব্লেজন আর সেন্ট বেরেন। তাঁরা যাবেন উত্তরে।

এই ভয়ঙ্কর অঞ্চলে মিস ব্লেজনকে শুধু কয়েকজন কুলি আর সেন্ট বেরেনের সঙ্গে ছেড়ে দিতে মন চাইল না আমাদের কারোই। অনেক বোঝালাম। কিন্তু কার কথা কে শোনে? যাবেনই মিস ব্লেজন। অনুমান করলাম, যদি বিয়ে হয় তবে এই একগুয়ে বৌ নিয়ে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হবে ক্যাপ্টেন মারসিনের।

শেষ পর্যন্ত এলাকাটার ভয়াবহতা সম্পর্কে মিস ব্লেজনকে একটু বুঝিয়ে বলতে বললাম ল্যাকোরকে। কিন্তু বলল না সে, বরং হাসল, রহস্যময় হাসি। লোকটার প্রতি ঘৃণায় আমার মন ছেয়ে গেল।

সকাল সকালই শুতে যাচ্ছি, লোকজন কম তাই বেশি তাঁবু খাটানোর ঝামেলা করিনি। এক তাঁবুতে দুজন করে থাকার ব্যবস্থা করেছি। আজ আমার সঙ্গে থাকছেন ডক্টর চাতোন্নে।

শোয়ার আগে আমার বিছানায় এসে বসলেন ডাক্তার। ফিসফিস করে বললেন, একটা কথা জানিয়ে রাখছি আপনাকে, মঁসিয়ে ফ্লোরেন্স, লোকগুলো সাধারণ গুলিতে মরেনি। তাছাড়া বুড়োর কাঁধের ক্ষতটা দেখেছিলেন? বিস্ফোরক বুলেট! বলেই আর একটিও কথা না বলে চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়লেন নিজের বিছানায়।

কি আর বলব? আরেক রহস্য এসে হাজির। এই অদ্ভুত বুলেট তৈরি করল কে এই এলাকায়? এতদিন পর্যন্ত শুধু শুনেই এসেছিলাম যে এমন বুলেট বানানো সম্ভব। কিন্তু তৈরি করে এই জিনিস ব্যবহার করতে শুরু করল, কোন সে প্রতিভাবান?

ফেব্রুয়ারি ১৮ সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই আক্কেল গুড়ুম আমাদের সবার। উধাও হয়ে গেছে সৈন্যরা, বিশজন নিগ্রো সৈন্য, দুজন সার্জেন্ট এমনকি ল্যাকোর পর্যন্ত। সেই সঙ্গে উধাও হয়েছে কুলির দল। রয়ে গেছে শুধু আমাদের নিজেদের কয়েকটা ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র, ছত্রিশটা গাধা আর পাঁচদিনের খাবার! গাইড টোনগানে পর্যন্ত উধাও।

ভয়ঙ্কর দুর্গম এলাকায় গভীর জঙ্গলের ধারে আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়লাম।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *