০৯. পাহারাদারদের জিজ্ঞেস করে

(আমিদী ফ্লোরেন্সের নোটবই থেকে।)

পাহারাদারদের জিজ্ঞেস করেও কোন হদিস পাওয়া গেল না। মোরিলিরেকে কেউ পালাতে দেখেনি। নাকি মিছে কথা বলছে ওরা, কে জানে!

সাংঘাতিক রেগে গেলেন ক্যাপ্টেন। এই সময় পাহারারত চারজনেরই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করলেন। তারপর কাগজের টুকরোটা নিয়ে নিজের তাঁবুতে চলে গেলেন তিনি।

ঘণ্টাখানেক পরেই ডাক পড়ল আমার ক্যাপ্টেনের তাঁবুতে। আমাকে ঢুকতে দেখেই বললেন, এই যে, মঁসিয়ে ফ্লোরেন্স, আসুন। লেখাগুলোর অর্থ উদ্ধার করতে পেরেছি।

এগিয়ে গিয়ে ক্যাপ্টেনের বিছানায়ই বসে পড়লাম। লেখাটার ফরাসী তর্জমা করে রেখেছেন তিনি। আমাকে পড়ে শোনালেনঃ রাজা ইউরোপীয়দের চায় না …ওরা এখনও আসছেই… চিঠি দেখালেই আসবে সৈন্যদল, হুকুম অবশ্য সে দেবে..তামিল করবে… শুরু করেছ। রাজা এখন…

নাহ, মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝলাম না! হতাশভাবে এদিক ওদিক মাথা দোলালাম।

বুঝলেন না? বললেন ক্যাপ্টেন, বুঝিয়ে দিচ্ছি। কোথাও কোন এক রাজা আমাদের এগোতে দিতে চান না। তার কাছে আমরা অযাচিত এক উৎপাত। কোন একটা ষড়যন্ত্র চলছে তাই আমাদের বিরুদ্ধে, রাজারই হুকুমে। যে করেই হোক আমাদের নিরস্ত করতে চান তিনি। দরকার হলে তার হুকুমে সৈন্যদল আসবে।

রাতেই আবার মীটিং বসল আমাদের। আবার সবার উদ্দেশ্যে কাগজটা পড়ে বুঝিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন।

হুমম। অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে পড়েছেন মঁসিয়ে বারজাক। ব্যাপারটা থেকে দুটো জিনিস অনুমান করা যায়। এক, মোরিলিরে সেই রাজার গুপ্তচর। দুই, সাংঘাতিক প্রভাবশালী ওই অজ্ঞাত রাজা। সৈন্যদল পর্যন্ত আছে তাঁর। আমাদের অনেক রকমে ঠেকিয়ে রাখতে চেয়েছেন তিনি। পারেননি। আমরা এগিয়েই চলেছি। এবার সৈন্যদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তিনি।

ঠিকই বলেছেন মঁসিয়ে বারজাক। একমত হলাম আমরা সবাই।

এখন সবারই প্রশ্ন হলো, আমরা কি আর সামনে এগোব? একগুঁয়ের মত বললেন বারজাক, নিশ্চয়ই এগোব। সামান্য একটা গেঁয়ো রাজার ভয়ে যদি লেজ শুটিয়ে পালাই আমরা, ফরাসীদের ইজ্জত থাকবে?

কিন্তু তাহলে নতুন আরেকজন গাইড দরকার। তবে আপাতত মিস ব্লেজনের গাইড দুজন কাজ চালিয়ে নিতে পারবে।

চৌমৌকি লোকটাকে কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না আমি। লোকটার হাবভাব কেমন যেন সন্দেহজনক। তাছাড়া মোরিলিরের সঙ্গে সাংঘাতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল তার। তবে টোনগানে লোকটা সন্দেহের অতীত, নির্দ্বিধায় বলা চলে এ-কথা।

কুলিদের বোঝাতে গেল দুই গাইড। মোরিলিরে যে ভেগেছে এ-কথা বলল না। ওরা কুলিদের বরং বলল যে, মোরিলিরে রাতের বেলা নদীতে গোসল করতে নেমেছিল, কুমীরে নিয়ে গেছে।

টোনগানে ফিরে এসে বলল যে সব শোনার পর কুলিরা হাঁ বা না কিছুই বলেনি।

ফেব্রুয়ারি ৯। মোরিলিরে নেই, কিন্তু তার প্রভাব রয়ে গেছে কুলিদের মাঝে। আগের মতই ধীর আমাদের গতি। সারাক্ষণই কথা কাটাকাটি করে চলেছে চৌমৌকি আর টোনগানে। মাঝেমধ্যে হাতাহাতির অবস্থা হয়ে যায়। চৌমৌকির ওপর পথ দেখানোর ভার দিলেই সে ভুল পথে নিয়ে যায়। মাইল কয়েক যাবার পর ভুল হয়ে গেছে বলে আবার পিছিয়ে আসে। পক্ষান্তরে টোনগানের পথ নির্দেশ নির্ভুল। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও কিছুই বলা যাচ্ছে না চৌমৌকিকে। কুলিদের সঙ্গে তারই ভাব বেশি, তাকে কিছু বললে বেঁকে বসবে কুলিরা। মহা মুসিবতে পড়েছি।

গত আড়াই দিনে মাত্র বিশ মাইল পথ অতিক্রম করেছি আমরা। এখনও কোকোরো উপত্যকাতেই রয়ে গেছি। তবে ডাইনে-বাঁয়ে পাহাড় আর নেই, ক্রমশ চওড়া হচ্ছে উপত্যকা। পথে নদী কম।

ফেব্রুয়ারি ১১। সকালের দিকে চাষের জমি দেখেই অনুমান করলাম, সামনে গ্রাম। পথের ধারে অসংখ্য উইয়ের ঢিবি দেখলাম। বিশাল টিবিগুলো মানুষ প্রমাণ উঁচু। পাখি আর কোন কোন জানোয়ারের মত এই উই কিন্তু জঙলীদেরও অতি প্রিয় খাদ্য। সি মাখনে ভেজে সমানে খায় ওরা উই, উই-এর ডিম, বাচ্চা বেবাক।

সকাল আটটা নাগাদ গ্রামের দেখা পেলাম। নাম, বামা। গ্রামে ঢোকার আগেই একদল ওঝার দেখা পেলাম। শনের ঝালরে মুখ ঢাকা। গলায় মানুষের খুলি আর হাড়ের মালা। এই অসভ্য দেশে এরাই মাতব্বর। দারুণ খাতির এদের। কোথাও হয়তো ভূত তাড়াতে গিয়েছিল, এখন নাচতে নাচতে ফিরে চলেছে। পেছনে চলেছে ছেলে-ছোকরার দল।

মাঝে-মধ্যেই পেছনে ফিরে তাড়া করে একেকটা ছেলেকে ধরে ফেলছে ওঝারা। ধরে সবাই মিলে মন্ত্রপূত লাঠি দিয়ে সমানে পেটাচ্ছে। প্রায় আধমরা করে তবে ছাড়ছে। আর মদ গিলছে সমানে। গাছের গুড়ির তৈরি পিপেয় দোলো মদ নিয়ে সঙ্গেই চলেছে বাহক। ঘণ্টাখানেক পরেই দেখলাম, সব কজন ওঝা পাড় মাতাল হয়ে পড়েছে।

ওঝাদের সঙ্গে সঙ্গেই গাঁয়ে এসে ঢুকলাম আমরা। তৎক্ষণাৎ ক্যাপ্টেনের কাছে এসে আরজি পেশ করল চৌমৌকি, কুলিরা একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে, বিশ্রাম চাই। টোনগানেও এসে হাজির ক্যাপ্টেনের কাছে। সে বলল, আজকে কুলিদের মেজাজ খুবই ভাল, পথ চলা যাবে অনেক বেশি।

কিন্তু দুজনকেই অবাক করে দিয়ে ক্যাপ্টেন বললেন যে, তিনি আগে থেকেই স্থির করে রেখেছেন আজ লম্বা বিশ্রাম নেবেন। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল চৌমৌকি। কিন্তু খুশি হলো। টোনগানের দিকে চেয়ে বিচিত্র ভ্রুকুটি করে সরে পড়ল। আর ক্যাপ্টেনের সঙ্গে না পেরে মালিকের ওপর গিয়ে মেজাজ দেখাতে লাগল টোনগানে।

থাকতেই যখন হবে গ্রামটা একটু দেখে নিতে ক্ষতি কি। তাই বেরোলাম। গায়ে গায়ে লেগে থাকা কুঁড়েঘরগুলোর দরজা হচ্ছে ছাদের দিকে। দরজা মানে এক গোল ছিদ্র। এই ছিদ্র পথেই মই বেয়ে নামতে হয়। হিংস্র জানোয়ারের উৎপাত বেশি এদিকে, তাই এই ব্যবস্থা। সুতরাং আমরা ছাদ থেকে ছাদে ঘুরতে লাগলাম। কুঁড়েঘরগুলো গায়ে গায়ে লাগানো থাকায় মাটিতে আর নামতে হলো না। ছাদে ছাদে গিয়েই দাঁড়ালাম মোড়লের ঘরের ওপর।

ফরাসী স্থানীয় বাহিনীতে একজন পদাতিক সৈন্য ছিল মোড়ল, এখন অবসর নিয়েছে। কিন্তু গোঁফটা ছাটেনি, তামার পাইপে তামাক খেতে খেতে ফরাসী কায়দায় সাদর অভ্যর্থনা জানাল আমাদের। দোলো মদ এনে দিল। আমরা তাকে কিছু আজেবাজে জিনিস উপহার দিলাম।

এরপর গেলাম গায়ের বারোয়ারী উঠানে। সেখানে দেখলাম মাথাপিছু চার কড়ি মজুরি নিয়ে নিগ্রোদের নখ কাটছে একজন নাপিত। কাটার সঙ্গে সঙ্গে নখের মালিকেরা একটা একটা করে কুড়িয়ে নিয়ে নখগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলছে। নইলে নাকি শত্রুরা ওই নিয়ে গিয়ে যাদুমন্ত্র করে সাংঘাতিক ক্ষতি করবে। এমন কি মুখ দিয়ে রক্ত তুলে মেরে ফেলারও সম্ভাবনা আছে।

উঠানের এক কোণে ভিড় দেখে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম একটা লোক জ্বরে ভীষণ কাঁপছে। একজন কিম্ভুত পোশাক পরা ওঝা চিকিৎসায় ব্যস্ত। রোগীকে মাটিতে উপুড় করে শুইয়ে তার সামনে একটা কাঠের উপদেবতার মূর্তি রেখেছে। মন্ত্রপূত সাদা ছাই মেখেছে রোগীর মুখে। কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে থেকে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ল ওঝা। তারপর মাটিতে ফেলে রাখা একটা বেত তুলে নিয়ে বেধড়ক পেটাতে লাগল রোগীকে। ভূত তাড়াচ্ছে। ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার করে উঠল রোগী! মিনিট পাঁচেক সমানে পিটিয়ে বেতটা ছুঁড়ে ফেলে দিল ওঝা। তারপর পাশে বসে পড়ে রোগীর ঘাড়ের এক জায়গায় হাত রাখল। হাতটা আবার তুলে নিতেই দেখা গেল মুঠোয় মানুষের একটা কড়ে আঙুল। আঙুলের রূপ নিয়ে রোগীর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে ভুত। পরিষ্কার হাত সাফাই। আঙুলটা দেখেই হৈ হৈ করে উঠল দর্শকরা। গম্ভীর হয়ে গোঁফে তা দিতে দিতে দর্শকদের দিকে চাইল ওঝা, আর মুচকে মুচকে হাসতে লাগল। এই ফাঁকে তড়াক করে লাফিয়ে উঠেই রোগী দিল চম্পট। এতে আরও হতবাক হয়ে গেল দর্শকরা। কি তাড়াতাড়ি সেরে উঠল রোগী।

ডক্টর চাতোন্নেও এসেছেন আমার সঙ্গে। ব্যাপার দেখে রেগে উঠলেন তিনি। নজর রাখলেন কোন কুঁড়েঘরে গিয়ে ঢুকল জ্বরের রোগী। তারপর আমাকে নিয়ে গিয়ে সেই কুঁড়েতে ঢুকলেন। মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে দারুণ কাঁপছে আর কোকাচ্ছে মুমূর্ষ লোকটা, আবার পিটুনীর ভয়েই শুধু পালিয়ে এসেছে সে। তাকে পরীক্ষা করে দেখে ওষুধ দিলেন ডক্টর। কিন্তু ওঝাই যখন ব্যর্থ হয়েছে তখন আর একজন ভদ্র চেহারার বিদেশীর কথা ভূত শুনবে, একথা বিশ্বাস করতে পারল না লোকটা। নেহাত অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেল সে ডাক্তারের ওষুধ। আরও কয়েক পুরিয়া ওষুধ খাবার জন্যে দিয়ে আমাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার।

ফেব্রুয়ারি ১২। গ্রাম ছাড়ার আগের মুহূর্তে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল একটা লোক। কাছে আসতেই চিনলাম, গতকালকের সেই জ্বরের রোগী। জ্বর একেবারে ছেড়ে গেছে তার। এসেছে ডাক্তারকে কৃতজ্ঞতা জানাতে।

কোন বৈচিত্র্য নেই পথে। একঘেয়ে চলা। অব্যাহত রয়েছে চৌমৌকির চালাকি। দুপুরে এসে সে আস্তে আস্তে কি যেন বলল ক্যাপ্টেনকে, দূর থেকে শুনতে পেলাম না। কিন্তু মিনিট দশেক পরেই আদেশ দিলেন ক্যাপ্টেন, আজ আর চলা হবে না। আগামীদিন সকাল পর্যন্ত বিশ্রাম, দুপুরের খাওয়ার পর তাঁবু গুটানো হবে। একটানা বারো মাইল চলে তারপর আবার থামা হবে।

অদ্ভুত সেই আওয়াজটা আজ আবার শোনা গেল। বিকেল ছটার সময়ে এখনও দিনের আলো রয়েছে। পুব দিক থেকেই আসছে আওয়াজ। ভয় পেয়ে গিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে প্রার্থনা শুরু করে দিয়েছে নিগ্রোরা। সামনে চাইলাম। কিন্তু বিশাল এক পাহাড় দৃষ্টি পথ জুড়ে আছে। ছুটলাম, পাহাড়ে উঠব। ক্রমেই বাড়ছে, আওয়াজ। হাঁপাতে হাঁপাতে আমরা উঠলাম চুড়ায়। তীক্ষ্ণ চোখে চাইতে লাগলাম শব্দের উৎস বরাবর। মনে হলো মেঘের ভেতর থেকে আসছে শব্দটা, দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। একসময় শব্দ পশ্চিমে মিলিয়ে গেল। আমরা আবার নেমে এলাম পাহাড় থেকে। পাহাড় জঙ্গলের নিয়ম অনুযায়ী রাত নামছে দ্রুত। তাঁবুতে ফিরে এলাম।

ডায়েরী লিখছি। দূর থেকে ভেসে আসছে নিশাচর জানোয়ারের ডাক। কাছেই কোথাও থেকে বিচ্ছিরি অট্টহাসি হেসে উঠল একটা হায়েনা। ঠিক এমন সময়ে আবার শোনা গেল সেই রহস্যময় আওয়াজ। পশ্চিম থেকে এসে আস্তে আস্তে পুবে সরে গেল। এ কি রহস্য? কিসের এই শব্দ? গর্জনে কানে তালা লেগে যাচ্ছে, অথচ কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। সত্যিই কি অদৃশ্য প্রেত? কিন্তু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অমন কথা কি করে বিশ্বাস করি?

ফেব্রুয়ারি ১৩। দেরি করে উঠেছি ঘুম থেকে। তাড়াতাড়ি উঠেই বা লাভ কি। যাত্রা তো শুরু হবে সেই দুপুরের পরে। বাইরে বেরিয়ে দেখি পাহাড়ের কোলে একটা গাছের গোড়ায় বসে আলাপ করছে টোনগানে আর মালিক। তাঁবুর পাশে মাটিতেই চট বিছিয়ে বসে অতি মনোযোগের সঙ্গে কাগজে কি লিখছেন মঁসিয়ে পর্সি। হয়তো অন্ধ করছেন। সকালের কচি রোদে পায়চারি করছেন মঁসিয়ে বারজাক। দুটো তাঁবুর মাঝখানে এক জায়গায় বসে বসে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে কথা বলছেন মিস ব্লেজন। সেন্ট বেরেনকে দেখলাম না কোথাও। হয়তো মাছ ধরতে বেরিয়েছেন কিংবা ব্যাঙ-নিদেনপক্ষে ইগুয়ানা।

চৌমৌকিকেও দেখলাম না কোথাও। ভেবেছিলাম গত কয়েকদিনের লেখা রিপোর্টগুলো দেব তাকে। এতদিন রিপোর্টগুলো তো সেই-ই পাঠিয়ে এসেছে লোক মারফত।

ফেব্রুয়ারি ১৪। একটা বেশ বড়সড় ঘটনা ঘটল আজ। সেই যে গতকাল উধাও হয়েছে, আজ সকাল আটটায়ও চৌমৌকির কোন পাত্তা নেই। তাকে ছাড়াই, শুধু টোনগানের ওপর নির্ভর করে রওনা দেব ভাবছি, এমন সময় দূরে একদল লোক আসতে দেখা গেল। ঘোড়ার পিঠে চেপে আসছে তারা। আরও কাছে আসতে বোঝা গেল, সৈন্যদল।

নিজের সৈন্যদের দ্রুত তৈরি হবার আদেশ দিলেন ক্যাপ্টেন মারসিনে। চোখের পলকে অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ের ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে গেল সবাই। পরবর্তী হুকুমের অপেক্ষা শুধু, তারপর বিদ্যুৎগতিতে পজিশন নিয়ে লড়াই শুরু করে দেবে।

আরও কাছে এল দলটা। পরিষ্কার চিনতে পারলাম ফরাসী সামরিক ইউনিফর্ম পরা বিশজন নিগ্রো সৈন্যকে নিয়ে আসছে তিনজন ফরাসী অফিসার, দলের নেতা একজন লেফটেন্যান্ট।

ক্যাপ্টেন মারসিনের হুকুমে আমাদের বাহিনীর একজন সার্জেন্ট নবাগতদের সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে গেল। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলার কোন লক্ষণই দেখা গেল না লেফটেন্যান্টের মধ্যে। সোজা এগিয়ে এল ক্যাপ্টেনের কাছে। ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে জিজ্ঞেস করল, ক্যাপ্টেন মারসিনে?

ইয়েস, লেফটেন্যান্ট।

সজোরে বুট ঠুকে স্যালুট করল লেফটেন্যান্ট। আমি লেফটেন্যান্ট ল্যাকোর, স্যার। সুদানীজ ভলান্টিয়ার ঘোড়সওয়ার বাহিনীর বাহাত্তরতম কলোনিয়াল ইনফ্যানট্রির চার্জে আছি। বামাকো থেকে আসছি। আপনাদের পেছনেই ছিলাম, অল্পের জন্যে ধরতে পারিনি সিকাসোতে।

কেন?

এই যে নিন, পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে দিল ল্যাকোর, এই চিঠিটা পড়লেই বুঝবেন।

হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিয়ে খুললেন ক্যাপ্টেন। পড়তেই তার মুখের ভাব পুরো বদলে গেল। বিস্ময় আর নিরাশার ছাপ ফুটে উঠল মুখে।

কিন্তু এখুনি কিছু বলতে পারছি না আমি, লেফটেন্যান্ট। আমি এখন মঁসিয়ে বারজাকের অধীন। ওঁর অনুমতি নিতে হবে।

বারজাকের কাছে এগিয়ে এসে হাতে চিঠিটা তুলে দিলেন ক্যাপ্টেন। আমাদেরকে বললেন, আপনাদেরকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি।

শোনা মাত্রই ফ্যাকাসে হয়ে গেল মিস জেন ব্লেজনের মুখ, কিন্তু সামলে নিলেন পরক্ষণেই।

চিঠিটা খুলে দেখার প্রয়োজন বোধ করলেন না মঁসিয়ে বারজাক। জিজ্ঞেস করলেন, মানে?

টিম্বাকটুতে যাবার হুকুম এসেছে।

কে দিল হুকুম?

পড়েই দেখুন।

দ্রুত চিঠিটা পড়লেন মঁসিয়ে বারজাক। তারপর আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন, জোরে জোরে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে পড়লাম আমিঃ

ফ্রান্স গণতন্ত্র

গভর্নমেন্ট জেনারেল দ্য সেনেগাল

সার্কল দ্য বামাকো।

অনতিবিলম্বে সিগো সিকোরোতে রিপোর্ট করতে আদেশ দেয়া হচ্ছে ক্যাপ্টেন পিয়ের মারসিনেকে। সেখানে ছাউনিতে রিপোর্ট করে যাবেন টিম্বাকটুতে। ডিসট্রিক্ট কমান্ডারের কাছে রিপোর্ট করবেন।

ক্যাপ্টেন মারসিনের কাজ বুঝে নেবেন বাহাত্তরতম কলোনিয়াল ইনফ্যানট্রির লেফটেন্যান্ট ল্যাকোর। নাইজার বেন্ডের এক্সট্রা-পার্লামেন্টারি মিশন চীফ মঁসিয়ে বারজাকের অধীনে থেকে মিশনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবেন।

-কর্নেল কমান্ডিং

লা সার্কল দ্য বামাকো, সেন্ট অবান।

আমার পড়া শেষ হতেই চেঁচিয়ে উঠলেন বারজাক, ফাজলেমির আর জায়গা পায়নি। একশোজন সৈন্যের জায়গায় মাত্র বিশজন। প্যারিসে একবার যাই, চেম্বারের মেম্বারের সঙ্গে ইয়ার্কির মজা দেখাব আমি কমান্ডিং অফিসারকে!

কিন্তু আমার তো হুকুম না মেনে উপায় নেই মঁসিয়ে বারজাক, স্যার।

ক্যাপ্টেনকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে গেলেন মঁসিয়ে বারজাক। তারপর কি মনে করে হাতছানি দিয়ে আমাকেও ডাকলেন। বললেন, রিপোর্টার মানুষ আপনি। সব কথাই জানা থাকা দরকার।

ক্যাপ্টেনকে বললেন, অর্ডারটা জালও হতে পারে, ক্যাপ্টেন।

জাল! চমকে উঠলেন যেন ক্যাপ্টেন, অসম্ভব! হতেই পারে না। চিঠির সীলমোহর ঠিক আছে। তাছাড়া কর্নেল অবানের অধীনে কাজ করেছি আমি। সইটা ভালমতই চিনি। নাহ্, স্যার, জাল হতে পারে না।

হঠাৎই চুপ মেরে গেলেন বারজাক। কিন্তু মুখ দেখেই বুঝলাম, ব্যাপারটা মোটেই মনঃপূত হচ্ছে না তাঁর।

লেফটেন্যান্ট ল্যাকোরকে ডেকে বারজাকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন।

তীব্র গলায় লেফটেন্যান্টকে জিজ্ঞেস করলেন মঁসিয়ে বারজাক, হঠাৎ এই হুকুমের কারণ?

আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তোয়ারেপরা। ছুটকো ছাটকা আক্রমণ শুরু করেছে। টিম্বাকটুতে তাই সৈন্য বেশি দরকার এখন। যেখান থেকে পারছেন, কুড়িয়ে বাড়িয়ে নিয়ে এখন শক্তি বাড়াচ্ছেন কর্নেল অবান।

কিন্তু তিনি কি জানেন না যে মাত্র কুড়িজনে আমাদের চলবে না? সাংঘাতিক বিপদের ভয় পদে পদে?

মিছে আশঙ্কা আপনার, স্যার। এ অঞ্চল ভালভাবেই চিনি আমি। এখন পুরো শান্ত। অভয় দিয়ে বলল ল্যাকোর।

অথচ কলোনি মিনিস্টার নিজে চেম্বারে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন যে নাইজারে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটছে। কোনাক্রি রেসিডেন্টও সমর্থন করেছে এ কথা।

বাসি হয়ে গেছে খবরটা, হেসে বলল ল্যাকোর, সব এখন শান্ত, স্যার।

মানতে পারছি না। আমাদের আসার পথে যেসব বিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটেছে তা জানালেন বারজাক।

সব তুচ্ছ ঘটনা। এক বিন্দু মলিন হলো না ল্যাকোরের মুখের হাসি। আমি থাকতে আপনাদের ক্ষতি করতে পারে এমন ক্ষমতা এদিকে কারও নেই, দৃঢ় গলায় বলল সে।

এরপর আর কিছু বলার থাকল না বারজাকের।

তাহলে আমাকে অনুমতি দিন, স্যার, বললেন ক্যাপ্টেন। রওনা হতে হবে এখুনি।

ঠিক আছে, যান। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিদায় দিলেন বারজাক।

সৈন্যদলকে তৈরি হওয়ার আদেশ দিয়ে একে একে আমাদের সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেন ক্যাপ্টেন। মিস ব্লেজনের কাছে বিদায় নিতে গিয়ে শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন, আসি।

এসো।

বুঝলাম আবার ফিরে আসবেন ক্যাপ্টেন মারসিনে। মিস ব্লেজনের খাতিরেই আসবেন। এসো, ওই একটি শব্দেই অনেক কথা বলা হয়ে গেছে।

ক্যাপ্টেনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে সঙ্গে একজন গাইড এনেছে ল্যাকোর। দলবল নিয়ে রওনা হলেন ক্যাপ্টেন। যতদূর দেখা গেল, ঠায় দাঁড়িয়ে চেয়ে রইলাম আমরা। একশো ঘোড়সওয়ার নিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন পিয়ের মারসিনে। অন্যদের কথা জানি না, কিন্তু আমার মনে হলো একটা অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ যেন খসে পড়ে গেল শরীর থেকে।

লেফটেন্যান্ট ল্যাকোরের বিশজন সৈন্যের দিকে তাকালাম। নিজের অজান্তেই ছমছম করে উঠল গাটা। প্রতিটি লোকের সঙ্গে যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ভয়ঙ্কর বিপদ।

হঠাৎ মনে পড়ে গেল কথাটা। মিস জেন ব্লেজনের মনের মানুষ ছেড়ে চলে যাবেন, ওঝার এই ভবিষ্যদ্বাণীও তো সফল হলো। শেষ কথাটাও হবে না তো?

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *