০৬. লা এক্সপ্যানসন ফ্রাঁসে পত্রিকায়

লা এক্সপ্যানসন ফ্রাঁসে পত্রিকায় আমিদী ফ্লোরেন্সের লেখা তৃতীয় অধ্যায় বেরোয়। ৫ ফেব্রুয়ারি। এবং সেটাই তাঁর শেষ খবর। এরপর আর লেখা পাঠাননি রিপোর্টার। কারণ রহস্যাবৃত।

বারজাক মিশন

(নিজস্ব সংবাদদাতার খবর)

ডিসেম্বর ২৪। কানকান। গতকাল এসে পৌঁছেছি এখানে। আগামীকালই ছেড়ে যাচ্ছি এ জায়গা। বড়দিন এই দুর্গম এলাকায়ই কাটাতে হচ্ছে। মন কেমন করছে দেশের জন্যে। সেখানে বাইরে নিশ্চয়ই এখন তুষার ঝরছে। ঘরের ভেতরে ফায়ারপ্লেসের পাশে বসে নিশ্চয়ই হুল্লোড় করছে সবাই, উৎসবের জন্যে তৈরি হচ্ছে।

মনে আছে নিশ্চয়ই, এক নিগ্রো গ্রামে আমাদের রাত কাটাতে বারণ করেছিল মালিক? আশ্চর্য! এরপর থেকে কালোদের কোন গায়েই আর আমাদের রাত কাটাতে দিচ্ছে না সে। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ক্যাপ্টেন মারসিনে। গ্রামের লোক দেখলেই তেড়ে যাচ্ছেন। তার এই অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ বুঝতে পারছি না। কোথায় যেন কি একটা গোলমাল হয়েছে।

মঁসিয়ে বদ্রিয়ার্স মহাখুশি। ওদিকে ক্রমেই খাপ্পা হয়ে উঠছেন মঁসিয়ে বারজাক। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে সেদিন হন হন করে এগিয়ে গিয়ে থামলেন ক্যাপ্টেনের সামনে। গভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, কার হুকুমে গায়ের নিরীহ লোকের সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করছেন আপনি? দলের নেতা কি আপনি?

না, মঁসিয়ে, আপনি, বিনীতভাবে জবাব দিলেন ক্যাপ্টেন।

তাহলে গায়ের লোকের সঙ্গে এ ব্যবহার কেন?

আপনার আর সঙ্গের লোকদের নিরাপত্তার জন্যেই।

কি করে জানলেন নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে চলেছে?

এক মহা ষড়যন্ত্র আঁচ করেছি আমি, কিছু কিছু কথা কানেও এসেছে।

মানে? ফরাসী সরকারের অধীন নিরীহ নিগ্রোরা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে? ভাবলেন কি করে কথাটা?

তাই করছে, শুনেছি মালিকের কাছে।

আপনার মত একজন ঝানু অফিসার সামান্য একটা বাঁদীর কথায় নাচবেন, জানা ছিল না। আরও গম্ভীর হলেন বারজাক। আপনার কথায় আর চলছি না আমি। আজই গিয়ে গাঁয়ের কারও কুঁড়েতে রাত কাটাব।

সেক্ষেত্রে ইচ্ছের বিরুদ্ধেও কর্তব্য করতে হবে আমাকে, বিনীত ভাবেই বললেন ক্যাপ্টেন। আপনাকে বাধা দেব আমি সরাসরি।

মানে! রাগে লাল হয়ে উঠল বারজাকের মুখচোখ।

তাঁবুতে আটকে রাখব আপনাকে, বলেই আর কথা না বাড়িয়ে ঘুরে হাঁটতে শুরু করলেন ক্যাপ্টেন।

কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মিস ব্লেজন, এগিয়ে এসে বোঝাতে লাগলেন মঁসিয়ে বারজাককে। মালিক ঠিকই বলেছে, মঁসিয়ে বারজাকঃ, ডোঔং কোন জিনিসটা কি চেনেন?

আমি চিনি, পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ডক্টর চাতোন্নে। এবার এগিয়ে এসে বললেন, এক ধরনের মারাত্মক বিষ। খাবার আটদিন পর শুরু হয় বিষের ক্রিয়া এবং তখন টের পেলেও আর করার কিছুই থাকে না। জানেন কি করে তৈরি হয় এই বিষ?

বিমূঢ় হয়ে পড়েছেন মঁসিয়ে বারজাক। কিন্তু রাগ কমেনি, তাই কোন উত্তর দিলেন না।

কি করে? প্রশ্ন করলেন মিস জেন ব্লেজন।

মড়ার পেটে জোয়ারের বোঁটা ঢুকিয়ে রাখা হয়। একুশ দিন পর বের করে গুঁড়িয়ে দুধ, পানি বা অন্য কোন তরল পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে শত্রুকে কায়দা করে খাইয়ে দেয় নিগ্রোরা। বিষটা স্বাদ-গন্ধহীন, তাই মোটেই ধরা যায় না। খাবার আট দিনের মাথায় পেট ফুলতে শুরু করে রোগীর। মারা যায় দুই দিন পরেই। কোন চিকিৎসা নেই। এই বিষ প্রয়োগের একটা রক্ত জমানো কাহিনীও শুনিয়ে দিলেন ডক্টর চাতোন্নে।

সেদিন রাতে গায়ে গিয়েছিল মালিক, বললেন মিস ব্লেজন। নিজের কানে শুনেছে, মোড়ল গায়ের আরও কয়েকজনকে নিয়ে যুক্তি করছে, খাতিরযত্ন করে নিজেদের ঘরে নিয়ে গিয়ে দুধের সঙ্গে কায়দা করে এই বিষ খাইয়ে দেবে আমাদের। পরদিন আড়ালে আবডালে থেকে থেকে আমাদের পেছন পেছন যাবে। আটদিন পর আমরা মারা গেলে জিনিসপত্র সব লুট করে নেবে।

হাঁ করে শুনলেন সব মঁসিয়ে বারজাক। এবারে আর মিস ব্লেজনের কথাকে অবিশ্বাস করতে পারলেন না কিছুতেই। জঙ্গলী নিগ্রোদের আদর আপ্যায়নের ধরনধারণ একটু বেশিই মনে হতে লাগল তাঁর কাছে। সময় বুঝে এগিয়ে এলেন এবার মঁসিয়ে বদ্রিয়ার্স, কি, বলিনি? নরপিশাচদের পক্ষে না নাচতে শুরু করেছিলেন? এবার?

রাগে ফেটে পড়লেন বারজাক, হারামজাদাদের গ্রাম সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেব কাল থেকে।

শুনে আঁতকে উঠলেন মিস ব্লেজন। সাবধান, ও কাজটিও করতে যাবেন না। এই অসভ্য এলাকায় হাজার হাজার নিগ্রোর সঙ্গে সামান্য কয়েকজন সৈন্য নিয়ে একেবারে মারা পড়ব আমরা। যত আধুনিক সৈন্যই হোক না কেন।

অথচ এই খুনে নরখাদকদের হাতেই রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দিতে চাইছিলেন মঁসিয়ে বারজাক।   ফোড়ন কাটলেন বদ্রিয়ার্স।

এক গাঁয়ের লোক দেখেই কিন্তু সব লোককে বিচার করা যায় না, মঁসিয়ে বদ্রিয়ার্স, এবারে মঁসিয়ে বারজাকের পক্ষে কথা বললেন মিস ব্লেজন।

আর ঠেকানো গেল না বারজাককে, বক্তৃতা আরম্ভ করে দিলেন, ভাইয়েরা, আরেকটা দিক ভাবতে হবে আমাদের। সুসভ্য নাগরিক আমরা, তাছাড়া ফরাসী। চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে কি আমরা ভয় পাই? বিষের ভয়ে কর্তব্য থেকে সরে দাঁড়াব? আমার আগের বক্তা এইমাত্র যা বললেন…।

বাতাসে জোরে হাত নেড়ে বারজাককে থামিয়ে দিলেন মিস জেন ব্লেজন। তর্কবিতর্ক থাক এখন, মঁসিয়ে বারজাক। অভিযান ঠিকই চলবে আমাদের, কিন্তু রক্তপাত এড়িয়ে। ক্যাপ্টেন মারসিনের কথামত চললেই নিরাপত্তা বজায় থাকবে আমাদের।

ক্যাপ্টেনের কথামত! পরিষ্কার বোঝা গেল যে মিস ব্লেজনের কথাটা ঠিক পছন্দ হলো না মঁসিয়ে বারজাকের।

ওঁকে একটু সম্মানের চোখে দেখা উচিত আপনার, মঁসিয়ে বারজাক, রাগ করেই বললেন মিস ব্লেজন। যিনি আপনার জীবন বাঁচালেন তাকে অতটা অবহেলা করা ঠিক হচ্ছে না। আমি হলে অনেক আগেই তার কাছে গিয়ে ধন্যবাদটা জানিয়ে আসতাম।

মিস ব্লেজন রেগে যেতেই নরম হয়ে গেলেন বারজাক। বললেন, আঁ-হ্যা, তা ঠিকই বলেছেন। হঠাৎই মেজাজটা বিগড়ে গিয়েছিল, কিছু মনে করবেন না, বলে হন হন করে এগিয়ে গিয়ে সোজা ক্যাপ্টেনের হাত চেপে ধরলেন।

মাপ করবেন, ক্যাপ্টেন…

আরে, আরে, সে কি! আমি তো কিছুই মনে করিনি।

আবার সহজ হয়ে এল পরিস্থিতি এবং হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা।

কিন্তু ওদিকে আরেক কান্ড। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেন্ট বেরেনকে। নাহ কোন তাঁবুতেই নেই।

খোঁজাখুঁজি দেখে হাতের কাজ ফেলে এগিয়ে এল টোনগানে, কি হলো? কাকে খুঁজছেন?

বললাম, মসিয়ে সেন্ট বেরেন কোথায়, দেখেছ?

উনি? উনি তো ওই যে, ওখানে। আঙুল তুলে একটা দিক দেখিয়ে দিল টোনগানে।

কোথায়, চলো তো দেখি?

চলুন…

টোনগানের পেছন পেছন শখানেক গজ দূরে ঝোপের ওপাশের একটা ডোবার কাছে দাঁড়ালাম। কিন্তু কোথাও চোখে পড়লেন না সেন্ট বেরেন। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে টোনগানের দিকে তাকাতেই আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল সে। দেখলাম, একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে বসে আছেন সেন্ট বেরেন। বড়শিতে ব্যাঙ গাঁথছেন, টোপ। মুখটা মলিন, ব্যাঙের কষ্টে যেন তাঁরও কষ্ট হচ্ছে। হবেই! হাজার হোক বড়শি বেঁধার যন্ত্রণা তো টের পেয়েছেন। এখনও পুরো শুকায়নি। কিন্তু কি আর করা, খাবার তো জোগাড় করতে হবে-যদিও কেউ তাকে খাবার জোগাড়ের জন্যে বলেনি।

ব্যাঙ গেঁথে তিনি কি মাছ ধরবেন? বড় কৌতূহল হলো। তাই তাকে না ডেকে চুপচাপ দাড়িয়ে লক্ষ্য করতে থাকলাম।

বড়শিতে বেঁধা ব্যাঙটাকে কিন্তু পানিতে ফেললেন না বেরেন। ডোবার পানি আর মাটির মাঝখানে ফেলে শক্ত করে ধরে রাখলেন ছিপটা। আরও আশ্চর্য লাগল আমাদের! পাগল হয়ে গেলেন নাকি ভদ্রলোক। পানি থেকে ডাঙায় উঠে এসে টোপ গিলতে তো শুনিনি কোন মাছকে!

কিন্তু না, পাগল হননি বেরেন। বড়জোর মিনিট পনেরো অপেক্ষা করতে হলো। তার পরেই অতি সাবধানে পানি থেকে মাথা তুলল জীবটা। ব্যাঙটার হাত দুয়েক দূরে। তারপর সন্তর্পণে এগিয়ে আসতে লাগল খাবারের দিকে।

গুইলেটাপি, বিদঘুটে জীবটাকে দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল টোনগানে। নিগ্রোদের ভাষায় গুইলেটাপি মানে ইগুয়ানা। এক জাতের গিরগিটি।

যত সাবধানেই উঠে আসুক ব্যাঙটাকে গিলতে কিন্তু বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না ইগুয়ানা এবং বড়শি বেঁধাল নিজের গলায়। ছিপ ধরে টেনে টেনে ইগুয়ানাটাকে কাছে আনলেন সেন্ট বেরেন। তারপর কাছেই ফেলে রাখা একটা লাঠি তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে পেটাতে লাগলেন জানোয়ারটাকে।

কান্ড দেখুন, রেগেমেগে বলল টোনগানে, জোরে মারলে ব্যথা পাবে গুইলেটাপিটা, তাই আস্তে পেটাচ্ছেন। আরে বাবা ধরতেই যখন পারলি, দে না আচ্ছা করে কষে এক ঘা।

শেষ পর্যন্ত আর সইতে পারল না টোনগানে। ছুটে গিয়ে সেন্ট বেরেনের হাত থেকে লাঠিটা টান মেরে ছিনিয়ে নিয়েই দমাদম দুই ঘা লাগাল ইগুয়ানাটাকে। জীবটা মরে যেতেই হাসি ফুটল বেরেনের মুখে। স্বস্তির হাসি।

চমৎকার একটা শিকার করলেন, মঁসিয়ে, বেরেনকে বলল টোনগানে, তোফা খাওয়া হবে।

ডিসেম্বর ২৬। তাঁবু তুললাম আমরা। একটা বেশ বড়সড় নদী পড়ল মাইলখানেক যেতে না যেতেই। আমাদের দেখেই ঝপাং ঝপাং করে নদীতে গিয়ে ঝাঁপ দিল গোটা পাঁচ-ছয় জানোয়ার। কুমীর আর জলহস্তী! মুশকিল তো! জলহস্তীকে এড়িয়ে না হয় ওপারে যাওয়া গেল, কিন্তু কুমীর? ওই কুৎসিত হতচ্ছাড়া প্রাণীগুলো তো ছাড়বে না।

কি করা যায় ভাবছি, এমন সময় এগিয়ে এল মোরিলিরে। বলল, এখান দিয়ে নদী পেরোনো যাবে না। মাইল চারেক উজানে এক জায়গায় পাথর জমে জমে নদীর গভীরতা বড়জোর দুফুটে এসে দাঁড়িয়েছে। ওখান দিয়েই পেরোতে হবে।

চললাম। কিন্তু উজানে এসেই পানিতে নামতে গিয়ে গোল বাধাল গাধাগুলো। ভাটিতে কুমীর আর জলহস্তী দেখে এসেছে, এখনও ভয় কাটেনি, তাই কিছুতেই নামতে চাইছে না।

অনেক রকম সাধ্যসাধনা করেও কোন কাজ হলো না। একটা গাধাকেও এক পা নামানো গেল না। গ্যাট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নদীর তীরে।

বুঝেছি, ইয়া মোটা এক লাঠি হাতে এগিয়ে এল টোনগানে, গাধা গাধা-ই, বলেই ধুমসে পেটাতে শুরু করল সামনের তিনটে গাধাকে। উপায়ান্তর না দেখে বিকট স্বরে প্রতিবাদ জানাতে জানাতে পানিতে পা দিল গর্দভ প্রবরেরা। বোধ হয় বুঝল যে কুমীরের চাইতে টোনগানের হাতের লাঠি বেশি নির্দয়।

জানোয়ারগুলোকে লাঠিপেটা করাটা পছন্দ হলো না বেরেনের। ছুটে এসে প্রতিবাদ করতে করতে বললেন, আহা-হা অত মারছ কেন জানোয়ারগুলোকে, টোনগানে। বললেই হত, একটা বড়শি ধার দিতাম, সামনের গাধাটার পাছায় সামান্য একটু ফুটিয়ে দিলেই হত।

কথা শুনে হাসি চেপে রাখা দায় হলো।

গাধা তো নামল, কিন্তু আরেক বিপদ হলল। ভয়ের চোটে দ্রুত নদী পেরোতে , লাগল গাধাগুলো, ফলে পিঠের বোঝা সব পানিতে ভেসে যাবার জোগাড় হলল। ওদিকে আগে ভাগেই ঘোড়ায় চেপে নদী পেরিয়ে এসে সমানে চেঁচাতে লাগলেন মঁসিয়ে বারজাক। মালপত্র সব পানিতে ভেসে গেলে অভিযানই যে পন্ড হয়ে যাবে।

কিন্তু মোরিলিরে থামাল তাঁকে। ভাববেন না, মঁসিয়ে, এখুনি সব ঠিক করে ফেলবে কুলিরা।

হলোও তাই, একটা বোঝাও নষ্ট হতে দিল না কুলিরা।

আবার পথ চলা।

একসময় পাহাড় ডিঙিয়ে টিনকিসো উপত্যকায় পৌঁছলাম। একটা ব্যাপার চোখে পড়ছে কিন্তু সেই দাউহেরিকো থেকেই। টোনগানেকে ছেড়ে মোরিলিরের সঙ্গে খুব দোস্তি পাতিয়েছে চৌমৌকি। সারাক্ষণ পাশাপাশি চলছে। আর ওদিকে মালিকের সঙ্গে জবর খাতির টোনগানের। সেদিকে তাকিয়ে একবার মুচকে হাসতে দেখলাম মিস ব্লেজনকে।

উপত্যকা পেরোতেই শুরু হলো জঙ্গল। তবে গভীর নয়, গাছপালাও বেশির ভাগই মরা। জমি খটখটে শুকনা, বৃষ্টি নেই বোধহয় দীর্ঘদিন।

দাউহেরিকো ছাড়ার তিনদিন পর আবার একটা মজার ঘটনা ঘটালেন সেন্ট বেরেন। তিনিই দলের প্রাণ, স্বীকার করতেই হচ্ছে।

গাইডের পরামর্শমত মরা জঙ্গল ছাড়াবার পরই আমাদের সব বন্দুক বাক্সে ভরে রাখা হয়েছিল। এই অঞ্চলের নিগ্রোরা নাকি ভয়ানক হিংস্র। বন্দুক দেখলেই ভড়কে গিয়ে মারাত্মক বিষ মাখানো তীর আর বল্লম নিয়ে আক্রমণ করে বসতে পারে।

জঙ্গলের ধারের একটা গ্রামের পাশ দিয়ে যাবার সময় হঠাৎই কোথা থেকে দমাদম ঢিল এসে পড়তে লাগল সেন্ট বেরেনের পিঠে। সেই সঙ্গে বনের ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে এল, মারফা! মারফা! (বন্দুক! বন্দুক!)

কিন্তু কোথায় মারফা? আর বেরেনের ওপরই বা অদৃশ্য শত্রুর এই আক্রোশ কেন?

মোরিলিরে কিন্তু মুচকে হাসল। হাত তুলে বেরেনের পিঠের দিকে নির্দেশ করে বলল, ওটাই যত গন্ডগোলের মূল।

কে, সঁসিয়ে বেরেন… বলতে বলতেই বেরেনের পিঠে ঝোলানো ছিপ রাখার ধাতব খাপটার দিকে চোখ পড়ে গেল। হেসে বললাম, আপনার ওই ছিপের খাপটাকে বন্দুক মনে করেছে অসভ্যরা।

তবে রে হারামজাদারা, হঠাৎই খেপে গেলেন সহজ সরল লোকটা। তড়াক করে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নেমেই বনের দিকে ছুটলেন, দেখাচ্ছি মজা। ছিপের খাপ দিয়েই পিটিয়ে লাশ করব আজ।

অনেক কষ্টে ধরেটরে তাকে ফেরানো হলো।

এগিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন মারসিনে। বললেন, কপাল ভাল, বন্দুক ভেবে তীর ছুঁড়ে বসেনি অসভ্যরা। আর ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। টোনগানের দিকে ফিরে আদেশ দিলেন, মসিয়ে বেরেনের ছিপের খাপও বাক্সে ভরে রাখো।

কখ্খনো না, রুখে উঠলেন শান্তশিষ্ট বেরেন। ওটা আমার পিঠে যেমন আছে, থাকবে।

অনেক বুঝিয়েও রাজি করানো গেল না বেরেনকে। কিছুতেই পিঠছাড়া করতে রাজি হলেন না তিনি খাপটা। অগত্যা চট দিয়ে মুড়ে দেয়া হলো ওটাকে। যাক, এখন আর বন্দুক বলে ভুল করবে না নিগ্রো ব্যাটারা।

বিভিন্ন রকম গোলমালে বারো ঘণ্টা দেরি হয়ে গেল কানকান পৌঁছতে। তাঁবু ফেলার হুকুম দিলেন মঁসিয়ে বারজাক।

খাবার সময় দেখা গেল মোরিলিরে নেই। কোথায় গায়েব হয়ে গেছে কে জানে! গ্রামে গিয়ে ঢুকেছে নাকি?

পরদিন ভোরেই কিন্তু কুলিদের ধমকাতে দেখা গেল আবার ওকে। এভাবে তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা এবারে আর মোটেই ভাল চোখে দেখলেন না ক্যাপ্টেন মারসিনে। কড়া ধমক লাগালেন। আমতা আমতা করে যেমন তেমন একটা কৈফিয়ত দিল মোরিলিরে। কিন্তু বুঝলাম, ক্যাপ্টেন সেটা মোটেই বিশ্বাস করলেন না।

সকালে চায়ের টেবিলে বসে একটু অদ্ভুত খবর দিলেন মঁসিয়ে বেরেন। ভোর রাতে সবুজ ব্যাঙের চিৎকারে উঠে পড়েছিলেন তিনি। তাঁবু থেকে বেরিয়েই দেখেন, পূবদিক থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে একটা লোক। কাছে আসতেই চিনলেন, মোরিলিরে। আমরাও পুবদিকেই যাচ্ছি। রাতের বেলা ওদিকে কি করতে গিয়েছিল মোরিলিরে? ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুলল আমাদের।

আরেকটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল এদিনেই। প্রায় জোর করেই সেন্ট বেরেন, বারজাক, চৌমৌকি, মিস ব্লেজন আর আমাকে কানকানের এক ওঝার ভেল্কিবাজি দেখাতে নিয়ে গেল সে। হাত সাফাইতে নাকি লোকটা ওস্তাদ। কৌতূহল হলো, তাই গেলাম।

গ্রামে ঢুকে অতি নোংরা এক কুঁড়েঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মোরিলিরে ডাকতেই বিচিত্র পোশাক (জানোয়ারের ছাল, পাখির পালক, চিতার দাঁত ইত্যাদি) পরা এক ভয়ঙ্করদর্শন লোক এসে দাঁড়াল কুঁড়েঘরের দরজায়। আমাদের অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেল ঘরের ভেতরে, একটা মাদুরের ওপর বসতে দিয়ে জিজ্ঞেস করল কি  জন্যে এসেছি।

কারণটা জানাল মোরিলিরেই।

লোকটা তখন তন্ত্রমন্ত্রের অদ্ভুত সব জিনিসপত্র খুলে বসল। গম্ভীর গলায় মন্ত্র উচ্চারণ করল কিছুক্ষণ। তারপর একে একে বলে গেলঃ

আমাকেঃ তোমার পাঠানো খবর আর কেউ পাবে না।

সেন্ট বেরেনকেঃ ঘায়ে কিছুদিন কষ্ট পাবে। বসতে অসুবিধে হবে।

মিস জেন ব্লেজনকেঃ মনের মানুষ ছেড়ে যাবে। মনে বড় কষ্ট পাবে তুমি।

সব শেষে বারজাককেঃ সিকাসো পেরোলেই সাদা চামড়ার দেখা পাবে। হয় গোলামি, না হয় মৃত্যু।

দুশ্চিন্তা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম সবাই। আমি যে খবর পাঠাই, জানল কি করে অসভ্য ওঝা? মঁসিয়ে বেরেনের পাছায় ঘা, এটাই বা জানল কি করে? মিস ব্লেজনের মনের মানুষ আর সিকাসোর ওদিকের সাদা মানুষের কথা ছেড়ে দিলাম, কারণ সে সম্পর্কে এখনও আমরা জানি না কিছু।

অন্যদের কথা জানি না, কিন্তু ছোট্ট ঘটনাগুলো কাঁটার মত খচ খচ করে বিঁধতে লাগল আমার মনে। হয়তো কিছুই না, কিন্তু কিছুতেই দূর করতে পারছি চিন্তাটা। কোথায় যেন একটা গন্ডগোল আছে। একটা নগণ্য মোড়লের সাহস হলো কি করে অতি আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একটা দলকে বিষ খাইয়ে মারার? তাকে মদদ জোগানোর মত অতি শক্তিশালী কেউ উস্কানি দেয়নি তো আড়াল থেকে? পর পর দুই বার রহস্যজনক ভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল কেন মোরিলিরে? কোথায় গিয়েছিল? সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারছে না কেন সে ক্যাপ্টেনের প্রশ্নের? অসভ্য ওঝার কি সত্যি দিব্যদৃষ্টি আছে? নাকি আগেই কেউ তাকে শিখিয়ে পড়িয়ে রেখেছিল?

সব কিছু গভীরভাবে বিবেচনা করলে অনুমান করতে কষ্ট হয় না, যে আমাদের এই অভিযান ভন্ডুল করে দিতে চাইছে কেউ।

কিন্তু কেন? কে?

ডিসেম্বর ২৬। কানকান ছেড়েছি। সারাদিন চলে বিশ মাইল পথ পেরিয়ে একটা খোলা জায়গায় তাঁবু ফেলা হয়েছে আমাদের। কাছেপিঠে জনবসতি নেই।

বারো মাইল পেছনে ফেলে এসেছি দিয়ানগানা গ্রাম, সামনে তিরিশ মাইল দূরে সিকোরো।

সারাদিন পরিশ্রম গেছে খুব! সকাল সকাল খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। মাঝরাতে অদ্ভুত একটা আওয়াজে চমকে জেগে উঠলাম। পশ্চিম দিক থেকে আসছে শব্দটা। ক্ষীণ থেকে আস্তে আস্তে তীব্রতর হচ্ছে শব্দটা। অনুমান করলাম, শব্দ সৃষ্টিকারী উড়ে আসছে। শুনেছি, আফ্রিকার কোন কোন অঞ্চলে কোটি কোটি মৌমাছি এক সাথে উড়ে যাবার সময় অমন আওয়াজ হয়। কিন্তু সে তো দিনের বেলা, এই রাতে কেন?

তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, আমার আগেই অন্য সবাই বেরিয়ে এসেছে।

আকাশ মেঘে ঢাকা। উপরের দিকে তাকিয়েও কিছুই দেখলাম না।

ক্রমেই মাথার ওপর এসে গেল সেই অদ্ভুত শব্দ। প্রচন্ড গর্জনে কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়। কানে আঙুল ঢোকাচ্ছে সবাই।

আতঙ্কে মাটিতে মুখ গুঁজে পড়ে আছে নিগ্রো কুলির দল। আমরা হতবাক হয়ে ক্যাপ্টেন মারসিনেকে ঘিরে দাড়িয়ে আছি, ভয় যে পাইনি এমন কথা বলব না।

এই সময়ে মোরিলিরেকে কোথাও দেখলাম না। সে কি ভয়ে তাঁবু থেকেই বেরোয়নি?

পূব থেকে এসে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে পশ্চিমে চলে গিয়েছিল শব্দ। আবার ফিরে এল; এবার পশ্চিম থেকে এসে পুবে চলে গেল।

এভাবে পর পর চার পাঁচবার এল-গেল। নিঝুম নিশুতি রাতের নীরবতা খান খান হয়ে ভেঙে গেল সেই প্রচন্ড শব্দে।

এরপর সারাটা রাত আমরা কেউ দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না। আফ্রিকায় অনেক অদ্ভুত কান্ডই ঘটে বলে অভিযাত্রীরা বলেন। কিন্তু এমন ঘটনার কথা কেউ বলেননি।

ভোর হলো। আবার রওনা দেবার পালা। কিন্তু কিছুতেই যেতে চাইল না আর কুলিরা। ভয়ঙ্কর প্রেত যে পুবেই গেছে। হুঁশিয়ার করে দিয়ে গেছে রাতের বেলা। এখন তার কথা অমান্য করে এগোলে সোজা ধরে ধরে ঘাড় মটকাবে। রক্ত নাকি খুব পছন্দ এই প্রেতের।

শেষ পর্যন্ত অনেক রকমে বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজি করানো গেল কুলিদের। সবার আগে আগে ঘোড়ার পিঠে চড়লেন ক্যাপ্টেন মারসিনে। মাইল পাঁচেক পুবে এসে হঠাৎ কি দেখে থেমে পড়লেন তিনি। লাফ দিয়ে নামলেন ঘোড়া থেকে। মাটিতে ঝুঁকে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে কি দেখতে লাগলেন।

ব্যাপার কি? একে একে আমরাও নেমে পড়লাম ঘোড়ার পিঠ থেকে, এগিয়ে গেলাম।

অদ্ভুত দাগগুলো আমরাও দেখতে পেলাম। মাটিতে জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে দশটা গভীর দাগ। যেন জোড়া লাঙল টেনে নিয়ে গেছে মাটির ওপর দিয়ে। কঠিন মাটির বুক চিরে ফালা ফালা হয়ে গেছে।

এ কি কান্ড! কোন রহস্য শুরু হলো আবার?

গত রাতে শুনেছি অদ্ভুত শব্দ! এখন দেখছি অদ্ভুত দাগ! কোন ভয়ঙ্কর বিপদের দিকে এগিয়ে চলেছি আল্লাহই জানেন।

-আমিদী ফ্লোরেন্স

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *