০৫. বারজাক মিশন

বারজাক মিশন

(বিশেষ সংবাদদাতার খবর)

ডিসেম্বর ১৬, দাউহেরিকো।

২ ডিসেম্বর ভোর পাঁচটায় তাঁবু গোটালাম আমরা। বেশ খুশি খুশি লাগছে মালিককে। সারাক্ষণই হাসছে। রাস্তা ভাল, কিন্তু চলার পথের গ্রামগুলোর অকল্পনীয় দারিদ্র্য বড় বেশি পীড়া দিচ্ছে চোখ আর মনকে। দুধারে বেশির ভাগ জমিই সমতল। দূরে অবশ্য টিলাটক্কর যথেষ্ট আছে। জমিতে ছোট ছোট গাছ, আগাছা আর দুতিন গজ লম্বা লম্বা ঘাসের জঙ্গল। মাঝে মাঝে বেশ কিছু জায়গা জুড়ে আগাছা পুড়ে কালো হয়ে রয়েছে, মাটি বেরিয়ে পড়েছে। দাবানলের প্রকোপ। জায়গায় জায়গায় জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদ করা হয়েছে।

আশেপাশের গ্রামগুলোর নাম বড় অদ্ভূত। ফোনগৌমবি, মানফৌরো, কাফৌ, ঔসৌ এমনি সব নাম। উচ্চারণ করতেই জান বেরিয়ে যাবার যোগাড়। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। কোন গ্রামের দিকে যাব কি না আর জিজ্ঞেস করছি না এখন।

গ্রাম দেখলেই গিয়ে ঢুকছেন দুই চীফ। লোকজনদের এটা ওটা নানা কথা জিজ্ঞেস করছেন। নিজেদের স্বপক্ষে প্রমাণ খুঁজছেন।

নদী পড়ছে পথে। তবে উল্লেখযোগ্য নয়।

সন্ধ্যা নামল বাউলিয়া গ্রামে। রাতের খাওয়া শেষে শুতে যাব, দেখি গেঞ্জি আর প্যান্ট খোলেননি এখনও সেন্ট বেরেন। শোবার জন্যে তৈরি হননি এখনও। না হোন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু অবাক লাগল আমার কিটব্যাগ খুলে সমস্ত জিনিসপত্র মেঝেতে ছড়িয়েছেন দেখে—মেজাজ খিটখিটে। ব্যাপার কি?

আমাকে দেখতেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন সেন্ট বেরেন, অন্যমনস্ক লোক দুচোখে দেখতে পারি না আমি।

ভড়কে গেলাম। আমার ওপর খেপেছেন কেন বেরেন? আমতা আমতা করে। জিজ্ঞেস করলাম, কি আবার করলাম, মঁসিয়ে বেরেন?

আরে না না, আপনি না, আপনি না। ওই ব্যাটা চৌমৌকিটা।

কি করল সে?

কি করেনি? পাজামাই পাচ্ছি না, কোথায় ফেলে এসেছে কে জানে। ব্যাগে নেই।

ভুল করছেন আপনি। ওই ব্যাগে আপনার পাজামা থাকার কথা নয়। ওটা আমার ব্যাগ।

আঁ, নিজের ভুল বুঝতে পারলেন সেন্ট বেরেন। এক লাফে উঠে দাঁড়িয়েই আমার সামনে এসে বার বার মাপ চাইতে লাগলেন ভুল করে ব্যাগটা খুলে ফেলেছেন বলে। তারপরেই তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেলেন দ্রুত।

হাসলাম মনে মনে। যতই দিন যাচ্ছে, আরও বেশি ভাল লাগছে লোকটাকে।

ডিসেম্বর ৬। উল্লেখযোগ্য কিছুই ঘটল না। শুধু একটানা পথ চলা। রাতে তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম।

ডিসেম্বর ৭। এদিনেও দিনের বেলা ঘটল না কিছু। সন্ধ্যায় তাঁবু খাটানোর পর রান্নাবান্না শেষ হয়েছে। খেতে বসেছি, এমন সময় দেখলাম আশেপাশের গাছপালার আড়াল থেকে উকিঝুঁকি মারছে কয়েকজন নিগ্রো। ব্যাপার কি? দুজন সৈন্যকে ডেকে কারণ জিজ্ঞেস করতে বললেন ক্যাপ্টেন মারসিনে। কিন্তু সৈন্য দুজন এগিয়ে যেতেই সরে পড়ল নিগ্রোরা। কয়েক মিনিট পরেই আবার অন্যদিক থেকে উঁকি দিল। মতলবটা কি ব্যাটাদের!

এবার আর সৈন্য নয়, মোরিলিরেই এগিয়ে গেল। তাকে দেখে কিন্তু সরে পড়ল নিগ্রোরা। হাত-মাথা নাড়িয়ে কি কথা বলল সে ওদের সঙ্গে। ফিরে এসে জানান, এরা ব্যবসায়ী। জিনিসপত্র বেচতে এসেছে। পণ্য হলো মাটির বাসনপত্র, বাঁশ আর বেতের ঝুড়ি, লোহার বল্লম, তীর-ধনুক, কাঠের জিনিসপত্র ইত্যাদি।

দুত্তোর, এসব দিয়ে কি হবে? ঠোট উল্টে বললেন ডক্টর চাতোন্নে।

আরেকটা জিনিস আছে, বলল মোরিলিরে।

কি? নিস্পৃহভাবে জানতে চাইলেন ডক্টর।

কোলা বাদাম।

আঁ! আরে, তাই নাকি? এতক্ষণ বলোনি কেন? কই, জলদি ডাকো ওদের। বোঝা গেল, নাম শুনেই জিভে পানি এসে গেছে ডাক্তারের।

ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়ে আমরাও চেখে দেখলাম কোলা বাদাম। সত্যিই, জিভে পানি আসার মতই জিনিস। সামান্য নুনের বিনিময়ে প্রচুর কোলা বাদাম দিল আমাদের ব্যবসায়ীরা। এ অঞ্চলে নুন পাওয়া যায় না। এটা আগেই জানা ছিল। তাই আমাদের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ নুন নেয়া হয়েছে।

খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। আমাদের সঙ্গেই খেল ব্যবসায়ীরা। এরপর শুরু হলো নাচগান। বাদ্যযন্ত্র লাউয়ের খোল আর বাঁশী। যার যেভাবে খুশি বাজনা বাজাতে বাজাতে বিকট সুরে গান ধরল ওরা। নেচে চলল উদ্দাম গতিতে। নাচ মানে আকাশপানে কে কতটা জোরে লাফাতে পারে তার প্রতিযোগিতা।

আমাদের হাসি পেলেও সঙ্গের নিগ্রো কুলিরা কিন্তু দারুণ খুশি। একবাক্যে তারিফ করছে নাচের। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে ওরাও একে একে গিয়ে যোগ দিল নাচে। বাদ্যযন্ত্র তো আর নেই। তাই হাতের কাছে সসপ্যান, বাসন, বাটি, চামচ, হাতা যা পেল নিয়ে লাউয়ের খোল আর বাঁশীর সঙ্গে তাল মেলাল। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল আমাদের। হঠাৎ আর থাকতে না পেরে এগিয়ে গিয়ে নাচে যোগ দিলেন সেন্ট বেরেন। হাতে একটা ডিস আর চামচ নিয়ে নেমেছেন। নাচছেন তাধিন তাধিন। হাসির দমকে পেট চেপে ধরে বসে পড়লাম আমি। সমানে বেরেনকে বাহবা দিয়ে গেলেন বারজাক। গোমড়ামুখো বদ্রিয়ার্স পর্যন্ত মুচকে হাসলেন।

মাঝরাতে থামল নাচগান। অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে খোলা আকাশের নিচে যে যেখানে নাচছিল, শুয়ে পড়ল নিগ্রোরা।

খালা-বোনপোও ঘুমাতে চললেন। হঠাৎই একটা দুর্বুদ্ধি চাপল মাথায়। আসলে সাংবাদিকের স্বাভাবিক কৌতূহল। কোন কিছু না ভেবেই মিস ব্লেজনের তাঁবুর গায়ে গিয়ে কান পাতলাম। ভেতর থেকে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে।

না, খালা-বোনপোতে কথা হচ্ছে না। হচ্ছে টোনগানের সঙ্গে মিস ব্লেজনের।

টোগানে, আজ পর্যন্ত তোমার সম্পর্কে ধরতে গেলে কিছুই জানি না। আর্মি থেকে বরখাস্ত হবার পরেও সেনেগালে থাকতে গেলে কেন? চাকরি নেবার সময় বলেছিলে যে পরে সময় করে বলবে।

টোনগানে তাহলে বামবারা নয়! অবাক হলাম।

ক্যাপ্টেন জর্জ ব্লেজনের জন্যে…

ক্যাপ্টেন জর্জ ব্লেজন! নামটা চেনা মনে হলো।

ক্যাপ্টেন ব্লেজন! মিস জেন ব্লেজন যেন অবাক হলেন।

হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন ব্লেজন। আমিও ছিলাম ওঁর দলে। হঠাৎই ইংরেজরা আমাদের ওপর চড়াও হয়ে গুলি চালাতে আরম্ভ করল।

কেন?

বিদ্রোহ করেছিলেন ক্যাপ্টেন ব্লেজন। খুনখারাপি, লুটতরাজ করে বেড়াচ্ছিলেন।

কি বলছ তুমি?

ঠিকই বলছি। গাঁয়ের পর গা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিলেন। মানুষ খুন করছিলেন অকাতরে। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তাঁর দলের লোকেরা। হাসতে হাসতে খুন করা হচ্ছিল বাচ্চাদের।

সব হচ্ছিল কি ক্যাপ্টেনের হুকুমে?

হ্যাঁ। তবে তিনি নিজে এসে কখনও হুকুম দেননি আমাদের। হঠাৎই কোথেকে একদিন আরেকজন ইংরেজ অফিসার এসে যোগ দেয় তার দলে। তিনি আসার পরই এ ধরনের নারকীয় কান্ড করার হুকুম দেন ক্যাপ্টেন ব্লেজন। নতুন অফিসারের মুখ দিয়ে।

এই নতুন অফিসার কত দিন ছিলেন দলে?

মাস পাচ-ছয়।

কোথায় প্রথম তার সঙ্গে দেখা হয় ক্যাপ্টেনের?

গভীর জঙ্গলে।

তাকে খুব খাতির করতেন ক্যাপ্টেন?

করতেন। যেন নিজের ভাই।

নাম মনে আছে লোকটার?

হঠাৎই একটা প্রচন্ড আওয়াজ হলো এই সময় বাইরে। যেন মেঘ ডাকল। আসলে কাছেই কোথাও থেকে গর্জন করে উঠেছে একটা সিংহ। চমকে উঠলাম। টোনগানের জবাবটা ঠিক শুনলাম না।

একটু চমকে উঠেছিলেন মনে হয় মিস ব্লেজনও। কিন্তু তাঁবুর ওপাশে থাকায় দেখলাম না, বুঝলামও না ঠিক। আবার জিজ্ঞেস করলেন তিনি, তোমাদের ওপর ইংরেজরা চড়াও হবার পর কি হলো?

উল্টোপাল্টা গুলি খেয়ে অধিকাংশই মারা গেল। আমি আর কয়েকজন কোনমতে জান বাঁচিয়ে জঙ্গলে পালালাম। লড়াই থেমে যাবার পর ফিরে এসে দেখি, কাতারে কাতারে পড়ে আছে আমাদের দলের সৈন্যদের লাশ। ক্যাপ্টেনও পড়ে আছেন ওদের সঙ্গে—মরা।

অস্ফুট শব্দ করে উঠলেন মিস ব্লেজন।

থামল না টোনগানে, ক্যাপ্টেন আর অন্যান্যদের লাশগুলোকে কবর দিয়ে সে জায়গা ছেড়ে চললাম আমরা। নানা জায়গা ঘুরে ঘুরে বছর পাঁচেক পরে এসে পৌঁছুলাম টিমবাকটুতে। কিছুদিন কাজ করলাম সেখানে। তারপরে গেলাম সেনেগালে। এরপর তো আপনারই চাকরি নিলাম।

তাহলে সত্যিই মারা গেছেন ক্যাপ্টেন ব্লেজন? কথাটা যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না মিস জেন ব্লেজন।

আমি নিজে তার লাশ কবরে নামিয়েছি।

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর আবার প্রশ্ন করলেন মিস ব্লেজন, তার কবরটা কোথায় তাহলে নিশ্চয়ই জানো তুমি?

নিজের হাতের উল্টো পিঠের মত জানি!

আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন মিস ব্লেজন, ঠিক আছে, শুতে যাও, টোনগানে।

ক্যাপ্টেন ব্লেজনের নামটা চেনা চেনা লাগছিল। নিজের তাঁবুতে ফেরার পথে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল সব কথা বিদ্যুৎ চমকের মত। সেই ক্যাপ্টেন, যার নাম এক কালে লোকের মুখে মুখে ফিরত। সাহসী, দেশপ্রেমিক আর সৎ বলে যাঁর খ্যাতি ছিল সারা ইংল্যান্ডে, এমন কি ফ্রান্সবাসীদেরও তাঁর নাম অজানা ছিল না। এমন একটা লোক নাকি হঠাৎ কোন কারণ ছাড়াই বিদ্রোহ করেন। অনেকেই বিশ্বাস করেনি সেকথা, আমিও করিনি। কিন্তু সেই ক্যাপ্টেনের নাম কেন এতদিন পরে টোনগানের মুখে! ব্লেজনকে নিয়ে মিস ব্লেজনেরই বা অত কৌতূহল কেন, বুঝতে পারলাম না।

ডিসেম্বর ৮। আরেক মজার কান্ড করে বসলেন সেন্ট বেরেন। তাঁবু তুলে রওনা দেবার পর কয়েক মিনিটও যায়নি, ঘোড়ার পিঠে চেপেই কেবল উহ আহ করতে শুরু করলেন ভদ্রলোক। প্রাণপণে নামার চেষ্টা করছেন ঘোড়ার পিঠ থেকে। কিন্তু কোমরে কি অসুবিধে হবার ফলে নামতেও পারছেন না। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। সাংঘাতিক বেকায়দায় পড়েছেন। হলো কি? ফেঁড়া-টোড়া হয়নি তো যা ঘোড়ায় চেপে বসার সময়ে চাপ লেগে ফেটে গেছে?

দাঁড়ালাম আমরা। অনেক কষ্টে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন সেন্ট বেরেন। সমানে পাছা খামচাতে লাগলেন। কি হলো, কি হলো, বলে এগিয়ে গেলাম আমরা।

বড়শি, বড়শি, বলে আবার খামচাতে লাগলেন বেরেন।

বড়শি? পাছায় বড়শি বিধল কি করে? অবাক হলাম।

আরে ওই যে, ওই দিন নিগ্রোটার কাছ থেকে কিনেছিলাম। প্যান্টের পকেটেই রয়ে গিয়েছিল। এতদিন পরিনি তো, মনেই ছিল না। আজ পরেই তো এই বিপত্তি! বিরক্তভাবে পাছার কাপড় খামচাতে খামচাতে বললেন, কমসে কম তিনটে বিধেছে!

অনেক কষ্টে হাসি চাপলাম। কিন্তু শব্দ করেই হেসে ফেললেন মিস ব্লেজন। বললেন, তাও ভাল, মামা। মাছ কি করে বড়শি গেলে পরীক্ষা করতে গিয়ে গলায় যে বিধিয়ে বসোনি, এই যথেষ্ট।

আশ্চর্য! রাগ তো করলেনই না এই অসাধারণ সরল লোকটা, উল্টে বরং লজ্জিত ভাবে হাসলেন। ঠিকই, কি যে ভুলো মন আমার!

ওদিকে কিন্তু ছুরি বের করে ফেলেছেন ডক্টর চাতান্নে। এগিয়ে গিয়ে প্যান্টের কাপড় কেটে মাংস চিরে বার করে আনলেন বড়শি তিনটে।

আহ্ বাঁচালেন, ডক্টর! স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললেন সেন্ট বেরেন, ধন্যবাদ।

এবার বুঝলেন তো, মুখে বড়শি বিধলে কেমন কষ্ট পায় মাছেরা?

কিন্তু ওরা যে খাদ্য। তা ঠিক আছে, এবার থেকে যতটা সম্ভব কম ব্যথা দিয়ে মাছ ধরতে চেষ্টা করব। প্রতিজ্ঞা করলেন বেরেন।

এরপর আর কিছু বলার নেই, কাজেই চুপ করে গেলেন ডাক্তার। শব্দ করে হেসে উঠলাম আমরা কয়েকজন। অবাক হয়ে আমাদের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন বেরেন। যেন বুঝতে পারছেন না, এই কথায় হাসির কি আছে।

সেন্ট বেরেনের পাছার ক্ষতস্থানে ভালমত ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন ডাক্তার। তারপর কয়েকজন সৈন্য মিলে ধরে বেরেনকে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিল। উদাসীর মত আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন বেরেন।

এরপরের তিনটে দিন আর উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটল না।

ডিসেম্বর ১২। বোরোনিয়া গ্রামে পৌঁছলাম আমরা। কম বয়সী মোড়ল দারুণ খাতির করল আমাদের। বিনিময়ে তাকে আমরা দিলাম নুন, কিছু বারুদ আর দুটো দাড়ি কামানোর ক্ষুর। পেয়ে খুশি আর ধরে না মোড়লের। আমাদের রাত কাটানোর জন্যে নিজের লোকজনদের দিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গাঁয়ের বাইরে কয়েকটা খড়ের কুঁড়ে বানিয়ে দিল। ষাঁড়ের চামড়া দিয়ে মাটিতে কার্পেট পাতা হচ্ছে দেখে অবাক হলাম আমরা।

দাঁত বের করে হাসল মোড়ল, নইলে পোকার জ্বালায় ঘুমোতেই পারবেন না রাতে! বড্ড পোকা বেরোয় মাটি খুঁড়ে।

খুশি হয়ে মোড়লসুদ্ধ শ্রমিকদের সবাইকে একমুঠো করে কড়ি দিলেন মঁসিয়ে বারজাক। আনন্দে ধেই ধেই নাচ আরম্ভ করল নিগ্রোরা। সমানে থুথু ছিটাতে লাগল বারজাকের মুখে, গায়ে। তারপর সেই থুথু আবার হাত দিয়ে জায়গায় জায়গায় লেপটাতে লাগল। মহাবিপদে পড়ে গেলেন মঁসিয়ে বারজাক।

একগাল হাসি নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে এলেন সেন্ট বেরেন। বললেন, চটবেন না, মঁসিয়ে বারজাক। আপনাকে সবচেয়ে বড় সম্মানে ভূষিত করছে নিগ্রোরা।

সম্মানের বহর দেখে ওয়াক থু করে বমিই করে ফেললেন মিস ব্লেজন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে হে হে করে হাসলেন মঁসিয়ে বদ্রিয়ার্স, এখনও তো জানেই না ওরা, ওদের ভোটাধিকার দেবার জন্যেই পাগল হয়ে ছুটে এসেছেন মঁসিয়ে বারজাক। তাহলে হয়তো আরও বেশি সম্মান জানাবার জন্যে গায়ে পায়খানাই ডলতে লেগে যাবে।

কড়া চোখে বদ্রিয়াসের দিকে চাইলেন বারজাক, কিন্তু করার কিছুই নেই। সম্মান জানিয়ে নিগ্রোরা চলে যেতেই কুমিরের ভয় অগ্রাহ্য করে সোজা গিয়ে কাছের নদীতে ঝাঁপ দিলেন। আচ্ছা করে সাবান ডলে সারা শরীর ধুয়ে পরিষ্কার করলেন। ফিরে এসে বদ্রিয়ার্সকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, এতটা সম্মান এর আগে কেউ কখনও করেনি তাঁকে। হোক না থুথু মাখিয়ে, কিন্তু মনটা তো অকৃত্রিম।

ডিসেম্বর ১৩। সকাল সকালই টিম্বো পৌঁছুলাম। ঘর বলতে মাটির দেয়াল তোলা মাত্র কয়েকটা কুঁড়ে। গাঁয়ের বাইরে সবুজ মাঠ, গরু-ভেড়া চরছে। দেখেই বোঝা যায়, লোকগুলো অত্যন্ত গরীব। শিশুগুলো সবই হাড় জিরজিরে রুগ্ন। মেয়েগুলো কিন্তু সাংঘাতিক বেহায়া ধরনের, সারাক্ষণই সেজেগুজে আছে।

টিম্বো জায়গাটা খোলামেলা। কাছে পিঠে বনজঙ্গল নেই বললেই চলে, জন্তু জানোয়ারের ভয় কম। তাই এখানে একটু ভালমত বিশ্রাম নেবার আদেশ দিলেন মঁসিয়ে বারজাক। অনেকদিন একটানা চলে সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আমরা, লম্বা বিশ্রাম দরকার ছিল। তাঁবু পড়ল। দিন দুই থাকলাম আমরা এখানে।

ডিসেম্বর ১৫। গত দুই দিন ধরেই গাইড মোরিলিরের পাত্তা নেই। কোথায় গেল, কি হলো ভাবনায় ছিলাম আমরা। কিন্তু এদিন ঘুম থেকে উঠেই মোরিলিরের হাঁকডাক শুনলাম, কুলিদের তাড়া লাগাচ্ছে, জলদি করার জন্যে।

জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারলাম না, কোথায় গিয়েছিলে, মোরিলিরে?

চোখ তুলে চাইল মোরিলিরে। তারপর চোখ নামিয়ে আমতা আমতা করে বলল, না, এই তো, মানে কোথাও না।

বুঝলাম, খামোকা কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, বলবে না মোরিলিরে। ভাবলাম, পুরানো কোন স্যাঙ্গাত আছে তার এই গ্রামে, সম্ভবত ওর বাড়িতেই দুটো দিন অতিথি হয়ে কাটিয়েছে।

টিম্বোর পর থেকেই কিন্তু রাস্তা খারাপ হতে আরম্ভ করল। প্রায়ই চড়াই, উৎরাই ভাঙতে হচ্ছে। বুঝলাম, আসল অভিযান শুরু হলো এবার। একদিনেই পাহাড় পেরোতে হলো গোটা তিনেক। সন্ধে ছটা নাগাদ অসম্ভব ক্লান্ত হয়ে দাউহেরিকো গ্রামে পৌঁছুলাম। যথেষ্ট খাতির যত্ন করল মোড়ল।

বারজাক মহাখুশি। বদ্রিয়ার্সকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, আরে বাবা, লোকের সঙ্গে না মিশলে কি ওদের চেনা যায়? এই যে, যে গায়েই যাচ্ছি, কি খাতির করছে লোকেরা। আমাদের ফ্রান্সবাসীদের অমন অতিথিপরায়ণতার কথা ভাবা যায় না।

মুখ কুঁচকালেন বদ্রিয়ার্স, জবাব দিলেন না।

গ্রামের সবচেয়ে ভাল কুঁড়েঘরগুলোয় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিল মোড়ল। তার নিজের খড়ের প্রাসাদে থাকতে দিল মিস ব্লেজনকে। আমরা তো হতবাক। অমন অতিথিপরায়ণ এই জঙলী মোড়ল।

কিন্তু বেঁকে বসল মালিক। মিস ব্লেজনকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গেল। ফিরে এলে মিস ব্লেজনের মুখে শুনলাম, তাকে মোড়লের ঘরে থাকতে দিতে মালিক একেবারেই নারাজ। এমনকি আমাদেরও গ্রামের লোকের কুঁড়েঘরে থাকতে নিষেধ করছে নাকি মেয়েটা। কারণ কি?

ওদিকে অত খাতিরযত্ন দেখে, ক্যাপ্টেন মারসিনেও কিন্তু চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত হুকুম দিয়ে বসলেন, এই গ্রামে আর এক মিনিটও নয়। জলদি গ্রাম ছেড়ে যেতে হবে। নিশ্চয়ই মালিক সন্দেহজনক কিছু দেখেছে কিংবা শুনেছে। এই অঞ্চলেরই মেয়ে তো। বিপদ ঠিক বুঝতে পারে।

গ্রাম ছাড়িয়ে মাইল দুয়েক এসে তারপর তাঁবু ফেলা হলো।

কিন্তু কিছুই বুঝলাম না, কেন অত ভয় পেয়েছে মালিক? ক্যাপ্টেনই বা অত চিন্তিত কেন? তবে সে রাতে না বুঝলেও পরে হাড়ে হাড়ে মালিকের কথার যথার্থতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।

– আমিদী ফ্লোরেন্স

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *