০২. ফেঞ্চগিনির রাজধানী মানে কোনাক্রি অঞ্চলে

ফেঞ্চগিনির রাজধানী মানে কোনাক্রি অঞ্চলের নিতান্তই একটা ছোট গ্রাম। অথচ এখানেই বাস করেন এদেশের গভর্নর জেনারেল।

২৭ নভেম্বর। মহাহট্টগোল সমস্ত গ্রাম জুড়ে। উৎসব হবে। কিসের? সোজা ব্যাপার নয়, কয়েকজন অতি মান্যগণ্য লোক আসবেন গ্রামে। পর্যটক। গভর্নর আদেশ দিয়েছেন, বয়স্ক সকল পুরুষকে জাহাজ ঘাটায় গিয়ে অভ্যর্থনা করে আনতে হবে অতিথিদের। ইচ্ছে করলে বাচ্চা ছেলেমেয়ে কিংবা মহিলারাও যেতে পারে, কিন্তু তাদের জন্যে বাধ্যবাধকতা নেই।

অতিথিরা সংখ্যায় সাতজন। নাইজারের তীর ধরে ধরে এগিয়ে একটা বিশেষ অভিযান চালাবেন তারা। একটা বিশেষ বাঁক পর্যন্ত গিয়ে তবে শেষ হবে এই অভিযান। এদেরকে পাঠিয়েছে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় প্রশাসন দপ্তর। সেই দপ্তরেরই নির্দেশে গঠিত এক্সট্রা পার্লামেন্টারী কমিশনের উচ্চপদস্থ অফিসার এরা। কাউন্সিল মিনিস্টার স্ব-ইচ্ছায় এঁদের পাঠিয়েছেন বললে ভুল বলা হবে। আসলে নিজেদের মধ্যে বিবাদ নিম্পত্তির জন্যে ধরতে গেলে নিজেরাই অভিযানে বেরিয়েছেন তারা। তবু সরকারী একটা ছাপ না থাকলে নয়, তাই নির্দেশনামা সই করিয়ে নেয়া হয়েছে প্রশাসন দপ্তর থেকে।

বিরাট একটা ঝগড়া মিটে গেল হঠাৎ করেই। মিটমাট হওয়ার মূলে এই নাইজার বাঁক অভিযান। রাজনৈতিক দুটি দলের অতি ক্ষমতাবান দুই নেতার মধ্যে ঝগড়া বেঁধেছিল। ধারণা করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে সমঝোতা কোনদিনই হবে না, কিন্তু হয়ে গেল। দারুণ মজার না ব্যাপারটা?

দুই নেতার একজনের নাম বারজাক, অন্যজনের বদ্রিয়ার্স।

প্ৰথমজন মোটাসোটা, গোলগাল চেহারা, কালো চাপদাড়ি। বড় বড় বুলি আওড়াতে ভালবাসেন। কিন্তু তাই বলে সবই যে ফাকা, তা নয়। বক্তৃতা দিতে পারেন জমিয়ে। দিলখোলা, হাসিখুশি এই মানুষটাকে অনেকেই ভালবাসে।

দ্বিতীয়জন কিন্তু এর ঠিক উল্টো। রোগাটে, দীর্ঘকায়। দাড়ি নেই। পাতলা ঠোঁটের ওপর দুদিকে ইয়া লম্বা কোণ বের করা ঝোলা গোঁফ। উদ্ধত প্রকৃতির, সব কিছুতেই জোর খাটাতে চান। এক নম্বরের নৈরাশ্যবাদী।

উদার প্রকৃতির মানুষ বারজাক। নিজেকে মেলে ধরাই তার ইচ্ছে।

অত্যন্ত গুটোন স্বভাব বদ্রিয়ার্সের। ভাল করে কথাই বলতে চান না কারও সঙ্গে।

উপনিবেশ সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যাপারে চিরদিনই মতের অমিল দুজনের-স্বভাব আর চেহারার মতই। শুধু উপনিবেশই নয়, যে কোন ব্যাপারে দুজন একসঙ্গে হলেই বাদানুবাদ বাধবে। একজন কিছু একটা বললেই অন্যজন সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবাদ করে বসেন। আস্তে আস্তে তুমুল ঝগড়া বেধে যায় দুজনের। ব্যাপারটার তখন নিষ্পত্তি করে উপস্থিত লোকেরা; অবশ্যই দু দলে ভোট গ্রহণের মাধ্যমে।

বারজাক হয়তো বলবেন, শুয়োরের মাংসে বেশি চর্বি থাকা ভাল, খেতে স্বাদ।

সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করবেন বদ্রিয়ার্স, বেশি চর্বি খাওয়া খুব খারাপ, পেটে অসুখ হয়।

তাতে কি? বারজাক বলবেন, খেয়ে তো শান্তি। হলোই বা পেটে অসুখ।

পেটে অসুখ থাকলে কারও শান্তি লাগে না, গম্ভীর হয়ে প্রতিবাদ করবেন বদ্রিয়ার্স।

বোকারাই পেট নিয়ে চিন্তা করে।

চিন্তা নেই যার, সে পাগল।

ব্যস। এমনি করেই উত্তরোত্তর তর্ক বেড়ে যাবে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবেন দুজনেই। তুমুল পর্যায়ে ঝগড়া না পৌঁছুনো পর্যন্ত অপেক্ষা করবে দুদলেরই সমর্থকেরা। তারপর নিষ্পত্তি করতে এগিয়ে আসবে।

আপাতত বিবাদের শুরু হয়েছে বারজাক প্রস্তাবিত একটা আইন প্রণয়ন নিয়ে। তিনি প্রস্তাব করেছেন, সেনেগাল, গামবিয়া, গিনির উপরের অংশ এবং নাইজারের পশ্চিমে অবস্থিত ফরাসী সুদানের কিছু অংশে ভোট ব্যবস্থা চালু করে কালোদেরও ভোটদানের সুযোগ দেয়া হোক। তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে উঠে প্রতিবাদ করে বসলেন বদ্রিয়াস। ব্যস, শুরু হয়ে গেল একজন আরেকজনকে লক্ষ্য করে চোখাচোখা যুক্তির বাণবর্ষণ।

একজনের যুক্তি, নিগ্রোরা যথেষ্ট সভ্য হয়ে গেছে। তাদের আর গোলাম বানিয়ে রেখে মানবতার অবমাননা করার কোন মানে হয় না। হল জুড়ে তুমুল করতালি উঠল। বারজাকের যুক্তিকে বাহবা দিল সবাই।

সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে উঠলেন বদ্রিয়ার্স। তার মতে, নিগ্রোরা আগের মতই হিংস্র, বর্বর রয়ে গেছে। তাদের ভোটাধিকার দেয়া আর রুগ্ন শিশুর সঙ্গে ওষুধ নিয়ে পরামর্শ করা এক কথা। বরং আরও বেশি করে নিগ্ৰো অধ্যষিত এলাকায় সৈন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা উচিত। নিগ্ৰোদের ভোটাধিকার দেয়ার মত বোকামি কিছুতেই সরকারের করা উচিত হবে না। ফরাসীদের অধিকৃত দেশে ফরাসীরাই থাকবে একচেটিয়া অধিপতি, এতে অন্য কারও হস্তক্ষেপ হলে আর মান থাকল কোথায়? আবার হাততালিতে ফেটে পড়ল জনতা। দেশের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়ে আনন্দ আর বাঁধ মানছে না ওদের।

 

এদিকে কিন্তু মুখ কালো করে বসে আছেন উপনিবেশ দপ্তরের মন্ত্রী মহোদয়। মহাফাপরে পড়েছেন তিনি। দুপক্ষের কথাতেই যুক্তি আছে। ফরাসীদের শাসনে সত্যিই অভ্যস্ত হয়ে এসেছে ফরাসী-অধিকৃত নিগ্রোরা। লেখাপড়াও শিখছে কেউ কেউ। কিন্তু এরপরও গোলমালের খবর যে আসছে না, তা নয়। গ্রামে গ্রামে লুটতরাজ আর হাঙ্গামা চলছে। গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে নিরীহ বাসিন্দারা। গুজব শোনা যাচ্ছে, কোথায় নাকি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে একটা নিৰ্দলীয় শক্তি, ঘাটি গেড়ে বসেছে আফ্রিকার অজ্ঞাত এক অঞ্চলে। উঠে দাঁড়িয়ে মন্ত্ৰী মহোদয় একেবারে নিরপেক্ষ থেকে কথাগুলো জানালেন শ্রোতাদের। আবার হাততালি পড়ল। এতবড় বিজ্ঞ মন্ত্রীর প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠল জনতা।

হাততালি আর হট্টগোল শেষ হলে এবারে কথা বলল শ্রোতাদের একজন, দুজনের কেউই যখন ব্যাপারটায় একমত হতে পারছেন না, তখন গিয়ে দেখে আসলেই তো হয়, কোনটা করা দরকার আর কোনটা নয়।

এতবার যাওয়া হয়েছে ওসব অঞ্চলে যে আর নতুন কিছুই দেখার নেই, বললেন মন্ত্রী। তবে চেম্বার সিদ্ধান্ত নিলে আরেকবার যাওয়া যেতে পারে।

অনেক তর্কবিতর্কের পর ঠিক হলো, আরেকবার যাওয়াই উচিত।

তাহলে অভিযানের নেতা কে হবেন সদস্যরাই ঠিক করে দিক, নিজের গা বাঁচিয়ে বললেন মন্ত্রী।

আবার শুরু হলো তর্ক, হট্টগোল, ঝগড়া। অনেক কষ্টে চেঁচামেচি থামিয়ে ভোট নেবার আদেশ দিলেন মন্ত্রী। রাজি হলো সবাই। ভোটও নেয়া হলো। কিন্তু সমস্যা তাতে বাড়ল বই কমল না। দেখা গেল যে, সমান সমান ভোট পেয়েছেন দুই নেতা।

মহা মুসিবত! বলে দুহাতে কপাল চেপে ধরে বসে রইলেন মন্ত্রী। এরপর কি করা যায়?

তখন মীমাংসা করে দিল একজন অতিরসিক শ্রোতা, এক কাজ করলেই হয়। দুজনকে নেতা করে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।

সবারই পছন্দ হয়ে গেল প্রস্তাবটার কারণও ছিল। আসলে সবাই চাইছিল কোনমতে দুই নেতাকে কয়েকমাসের জন্যে দেশছাড়া করতে। অন্তত সে কয়েকটা- মাস উপনিবেশ সংক্রান্ত বেহুদা চেঁচামেচি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

অতএব বারজাক এবং বদ্রিয়ার্স দুজনেই আফ্রিকা অভিযানে নেতা নির্বাচিত হয়ে গেলেন। কিন্তু একটু চালাকি করলেন প্রবীণ মন্ত্রী। দুজনের মধ্যে ক্ষমতা কার থাকবে সেটা বলে দিলেন তিনি। থাকবে বারজাকের। কারণ তিনি বদ্রিয়াসের চেয়ে তিনদিনের বড়। মনে মনে ভয়ানক চটে গেলেন বদ্রিয়ার্স, কিন্তু মন্ত্রীর বিরুদ্ধাচরণ করতে সাহস হলো না তার।

প্ৰবল দুই প্রতিযোগীর অদ্ভুত অভিযানে আরও কয়েকজন যাবেন, সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। এদের মধ্যে একজনের নাম ড. চাতোরে, নামী ডাক্তার। সব সময় হাসিখুশি থাকতে ভালবাসেন। মোটামুটি লম্বা বলা চলে তাকে, পাঁচ ফুট আট। বয়স পঞ্চান্ন পেরোয়নি, অথচ মাথার একটা চুলও কালো নেই। সজারুর কাঁটার মত গোঁফজোড়াও পেকে ধবধবে সাদা। সত্যিকারের বুদ্ধিমান বলতে বোধহয় এঁদের মত লোককেই বোঝায়।

দ্বিতীয়জন ভৌগোলিক সমিতির সদস্য মসিয়ে ইসিদোর তাসিন। অনেক বড় বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানের গবেষণায় প্রায় সারাক্ষণই ধ্যানমগ্ন থাকেন। কাজেই বাহ্যিক রসকষ তেমন নেই, বেশি কথা বলেন না।

আর যাচ্ছেন মন্ত্রী পরিষদের তিনজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। এঁরা হলেন মসিয়ে পসি, মসিয়ে কুইরো এবং মসিয়ে হেইরো।

শেষ লোকটি কিন্তু তেমন গণ্যমান্য বা নাম করা কেউ নয়। লা এক্সপ্যানসন ফ্রান্সে নামে এক দৈনিক খবরের কাগজের রিপোর্টার। নিজের কাজকে খুব শ্রদ্ধা করে। কর্তব্যে ফাঁকি নেই, সৎ, বুদ্ধিমান। অনেকেই বলে, রিপোর্টারের কাজ না করে স্টেজে নায়কের অভিনয় করলেই তাকে মানাত ভাল। নাম, আমিদী ফ্লোরেন্স।

এই আটজন বিশেষ অতিথিকে অভ্যর্থনা জানিয়ে নেবার জন্যেই নিজ দপ্তরের লোক-লস্কর আর কোনাক্রি অঞ্চলের সমস্ত শক্তসমর্থ গ্রামবাসীকে নিয়ে জাহাজঘাটায় হাজির হয়েছেন ফ্রেঞ্চগিনির গভর্নর জেনারেল। অভ্যর্থনার বহর দেখে মনে হলো, সাগর পেরিয়ে মানুষ নয়, আকাশ থেকেই ফেরেশতারা এসে হাজির হয়েছেন।

অভ্যর্থনার জাঁকজমক দেখে প্রথমে ভড়কে গেলেও ধাতস্থ হয়ে গভর্নরকে ধন্যবাদ জানালেন বারজাক। তারপর জাহাজঘাটায় জাহাজ থেকে নামিয়ে আনা একটা টেবিলে দাঁড়িয়ে এক গালভরা বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতা শুরু হতেই ফিসফিস করে নিজের লোকদের বলে দিলেন গভর্নর হাততালির কমতি যেন না হয়। সুতরাং, বক্তৃতা শেষ হবার পর অন্তত আধঘণ্টা লাগল হাততালি শেষ হতে। গ্রামবাসীদের বলে বলে হাততালি দেয়াল দপ্তরের লোকেরা।

বারজাকের বস্তৃতা শেষ হলে উঠে দাঁড়ালেন বদ্রিয়ার্স। তার তেজী বক্তৃতার অর্থ অশিক্ষিত গ্রামবাসীরা কি বুঝল কে জানে, কিন্তু জোর হাততালিতে তারা আকাশ কাঁপিয়ে দিল। আসলে হাততালি দেয়াটাকে একটা মজা বলে ধরে নিল ওরা।

মহা সমারোহে অতিথিদের গভর্নরের বাড়িতে নিয়ে আসা হলো এখানে তিনদিন থেকে অভিযাত্রীরা পরবর্তী কর্মসূচী ঠিক কয়বে।

যেতে হবে অনেক পথ। প্রস্তাবিত আইনের মাধ্যমে যে অঞ্চলকে ভোটাধিকার দিতে চাইছেন বারজাক, আয়তনে সেটা ফ্রান্সের তিনগুণ, প্রায় দশ লক্ষ বর্গমাইল। এত বড় এলাকার সমস্ত জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয়।

ঠিক হলো, দুদলে ভাগ হয়ে এগোবে অভিযাত্রীরা। কিন্তু দুদলকে সমান পথ পেরোতে হবে না। একদল যাবে দেড়হাজার মাইল, অন্যদল ঘোরাপথে আড়াই হাজার মাইল।

প্রথমে এক দলে রওনা হবে অভিযাত্রীরা। কোনাক্রি হয়ে প্রথমে কানকান, সেখান থেকে কেনেডোগের সবচেয়ে বড় শহর সিকাসোতে যাবে। এখান থেকে দুদলে ভাগ হবে ওরা।

বদ্রিয়াসের নেতৃত্বে একদল যাবে দক্ষিণে একেবারে আইভরি কোস্ট পর্যন্ত অন্য দলটা বারজাকের নেতৃত্বে পুবদিকে চলে সেঈ-তে নাইজার নদীর পাড়ে পৌঁছুবে, নদীর তীর ধরে ধরে গিয়ে পৌঁছুবে দাহোমের উপকূলে। আগস্ট তারপর নাগাদ গ্র্যান্ড-ব্যাসামে পৌঁছুবেন বদ্রিয়ার্স, আর অক্টোবরে বারজাক গিয়ে থামবেন কৌটানো।

এতটা পথ পেরোনো সহজ কথা নয়। তাও ভাল পথ হলে কথা ছিল। আফ্রিকা। দুর্গম জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত আর জলাভূমিতে ঠাসা। হিংস্র জানোয়ারের ভয় তো আছেই, আছে মারাত্মক বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ-সাপখোপ। এসব ডিঙিয়ে যাওয়া যে কত ভয়ঙ্কর, তা বলে বোঝানো যাবে না।

এত বিপদের সম্ভাবনা পথে, অথচ খুশি উপচে পড়ছে মসিয়ে ইসিদোর তাসিনের। ভূগোল বিশারদ তিনি। গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক তথ্য জোগাড়ের জন্যে এর চেয়ে ভাল অভিযান আর কি হতে পারে? এতদিন যাবৎ লোকের অজানা অনেক কিছুই জানবেন তিনি, শুনবেন, চোখেও দেখবেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই সব অঞ্চলে অভিযান চালাতে মাত্র দুই যুগ* (* জুল ভার্ন এই বই লেখার সময় থেকে) আগেও সাহস করত না লোকে। কিন্তু নাইজারের বাঁক পর্যন্ত ফরাসী শাসন কায়েম হওয়ায় ওখান পর্যন্ত সিপাই-সান্ত্রী আছে, তাই সহজেই বেড়িয়ে আসা যাবে অঞ্চলটা তাসিনের ধারণা।

ঠিক হলো, পয়লা ডিসেম্বর থেকে যাত্রা শুরু হবে।

এর আগের দিন, অর্থাৎ তিরিশে নভেম্বরে এক বিশেষ ভোজসভায় অতিথিদের আপ্যায়িত করবেন ফেঞ্চগিনির গভর্নর জেনারেল। অতি সম্মানের সঙ্গে ফ্রান্সের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে, সেই সঙ্গে এক অসভ্য জংলী এলাকায় হবে গণতন্ত্র স্থাপন অভিযানের সূচনা।

তিরিশে নভেম্বর। সারাটা সকাল রোদে রোদে ঘুরে, স্থানীয় লোকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে, সন্ধ্যে নাগাদ অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে সবে গভর্নর ভবনে ফিরে এসেছেন বারজাক। গা থেকে কোটটা খুলতে যাচ্ছেন, এমন সময় আর্দালী এসে খবর দিল, দুজন লোক দেখা করতে এসেছে।

দুজন? প্রশ্ন করলেন বারুজাক।

একজন পুরুষ, একজন মহিলা। লোকটা ভারি অদ্ভুত।

কলোনির কেউ?

এর আগে কখনও দেখিনি, তবে হতে পারে। অস্বাভাবিক ঢ্যাঙা লোকটা এক্কেবারে নুড়ি পাথর। ঘাসের চিহ্নও নেই কোথাও।

নুড়ি পাথর? বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন বারজাক।

বুঝলেন না, স্যার। হাসল আর্দালী। বারজাকের মিশুক স্বভাবের পরিচয় আগেই পেয়ে গেছে সে। তাই তার মনে অহেতুক শংকা নেই, টাক, টাক। মাথায় টাক চকচক করছে লোকটার। চোখ দুটো যেন পিংপং বল।

আরে সর্বনাশ! চোখ কপালে তুললেন বারজাক, দারুণ কল্পনা দেখছি হে তোমার। তা ভদ্রমহিলার মাথায় ঘাস আছে তো? আর চোখ?

তা তো আছেই, স্যার। ভদ্রমহিলা নুড়ি পাথরের ঠিক উল্টো।

বয়েস কেমন? দেখতে?

মোটামুটি।

সুন্দরী?

র্তা বলতে পারেন এবং ফিটফাট।

অন্যমনস্কভাবে গোঁফে তা দিতে লাগলেন বারজাক।

হু! ঠিক আছে, পাঠিয়ে দাও।

আর্দালী চলে যেতেই ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন বারজাক। নিজের থলথলে চেহারাটা দেখলেন। ঘড়িতে ঢং ঢং করে সন্ধ্যা ছটা বাজার সংকেত হলো, কানেই ঢুকল না। আরেকটা জিনিস কল্পনাতেই আসেনি তার, আসার কথাও নয়—যে ঠিক, এই সময়ে লন্ডনে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক লুট হচ্ছিল।

আর্দালীর পিছু পিছু ঘরে এসে ঢুকল একজন বছর চল্লিশ বয়সের লোক, সঙ্গে বছর পঁচিশেকের একটি মেয়ে। দুজনকে পৌঁছে দিয়েই বেরিয়ে গেল আর্দালী।

ঠিকই বলেছে আর্দালী, লোকটা সত্যিই ঢ্যাঙা। আঁটসাট পোশাকে ঢাকা ধড়টার তুলনায় পা দুটো যেন একটু বেশিই লম্বা। চোখ দুটো পিংপং বলের মত না হলেও ঠেলে বেরিয়ে আসছে। সরু গলাটা অস্বাভাবিক লম্বা। এর ওপর আলতো করে বসিয়ে রাখা হয়েছে মাথাটা, যেন বেশি নাড়াচাড়া করলেই খসে পড়বে। ছুরির মত ধারাল বিশাল লম্বা নাক, পুরু ঠোঁট। লোকটার দেখার মত একমাত্র হলো গোঁফজোড়া। সত্যিই সুন্দর।

চকচকে টাক। কিন্তু একটু ভুল কথা বলেছে আর্দালী। নুড়ি পাথরের অনেক নিচে ঘাড়ের কাছে কয়েক গুচ্ছ ঘাস আছে। আর আছে দুই গালে লম্বা জুলফি। অতি শুকনো পাটের মত রঙ। এত যে কুৎসিত কিন্তু তবু ভাল নাগে লোকটাকে। সারাক্ষণই মুখে হাসি লেগে আছে, চোখ দুটোয় অকপট সরলতা।

আর মেয়েটি সত্যিই সুন্দরী। সুগঠিতা, ছিপছিপে। নিখুঁত নাক। বিশাল চোখ দুটোকে ঢেকে রেখেছে বড় বড় মোটা ঘন পাপড়ি। অত সুন্দর চোখ জীবনে দেখেনি বারজাক। মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল।

দুজনকেই বসতে বললেন বারজাক।

মসিয়ে বারজাক, গায়ে পড়েই আলাপ করতে এলাম আপনার সাথে, কথা শুরু করল নুড়ি পাথর। আসলে একটা সাহায্য চাইতে এসেছি। আমি জানি, দেখতে আমি সুবিধের নই ৷ নামটাও অদ্ভুত-এজনর দ্য সেন্ট বেরেন। ব্যাচেলর। অঢেল সম্পত্তি রেখে গেছেন বাবা রেনেজ শহরে। কথা বলার সময় প্রচুর হাত পা নাড়েন বেরেন।

আর এই যে, ইনি, মেয়েটার পরিচয় দিলেন বেরেন, আমার খালা, মিক্স জেনব্লেজন।

আপনার খালা? অবাক হলেন বারজাক।

হ্যাঁ হ্যাঁ। আমার খালা। দুনিয়ার আর দশটা খালার মতই খালা। জোর দিয়ে বললেন এজনর।

ঠোঁট দুটো অতি সামান্য ফাঁক করল মেয়েটা। বারজাকের মনে হলো, এত সুন্দর হাসি আর দেখেননি।

ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে প্রতিবাদ করল জেন, খালি সুযোগ পেলেই হলো, আমাকে ওর খালা প্রতিপন্ন করতে উঠে পড়ে লেগে যান মসিয়ে দ্য সেন্ট বেরেন।

তাতে নিজের বয়েস কমে যায়, বললেন বেরেন।

আসলে লোককে চমকে দিতে চান উনি। তারপরেই আবার জন্মগত সম্পর্ক যা, আমার মামা হয়ে যান।

তাহলে এবার কাজের কথায় আসা যাক, বললেন বেরেন। দুজনেরই জ্ঞানপিপাসা আমাদের প্রবল। ভ্রমণের নেশাও খুবই। নতুন দেশ আর সন্ধানে বেরিয়েছি এ যাত্রায়। মেয়ে হলে কি হবে, আমার এই ভাগ্নীটির ভয়ডর বলতে কিছু নেই। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ে, আর সব সময় সঙ্গে এই মামাটি থাকা চাই-ই, নিজের বুকে টোকা দিল সে। এবারেও বেরিয়েছি। হঠাৎ শুনলাম আমরা এবার যে পথে যার ঠিক করেছি, আপনারাও সেই পথেই যাবেন। তখন ভাবলাম, আপনাদের সঙ্গেই যাই। কারণ ভয়ঙ্কর বিপদ-সংকুল পথে দল ভারি হলে অনেক দিক দিয়েই সুবিধে। তাই আপনার কাছে এলাম। সঙ্গে যাবার অনুমতি পাব কি?

আমার আপত্তি নেই, বললেন বারজাক। কিন্তু সত্যি বলতে কি, আমার সহযোগীদের সঙ্গে একটু পরামর্শ না করে পাকা কথা দিতে পারছি না।

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই, বললেন বেরেন।

ব্যাপারটা কি জানেন, সঙ্গে মেয়েমানুষ থাকলে এ ধরনের অভিযানে অনেক রকম বিপত্তি আসার সম্ভাবনা থাকে। হয়তো এজন্যেই আপত্তি তুলবে আমার লোকেরা।

দেখুন মসিয়ে বারজাক, আমার ভাগ্নী বলে বাড়িয়ে বলছি না, অনেক পুরুষ মানুষের চাইতে ওর সাহস অনেক বেশি। আল্লাহ আসলে ছেলে করতে করতে মেয়ে বানিয়ে ফেলেছে ওকে।

শুধু সঙ্গে থাকা ছাড়া আর কোন ব্যাপারেই বিরক্ত করব না আপনাদের, বলল জেন। সমস্ত ব্যবস্থা আমরা করেই রেখেছি। প্রয়োজনীয় সব রকমের জিনিসপত্র, ঘোড়া, কুলি প্রচুর নিয়েছি আমরা। খুব ভাল দোভাষীর কাজ চালাতে পারে এমন দুজন গাইডও ভাড়া করেছি।

কিন্তু তবু সহযাত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে আমাকে, আগের কথাই বললেন বারজাক। হাজার হোক, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-অভিযানে বেরিয়েছি, সামান্য ভুল করলেও চলবে না। তবে হা, অত করে যখন বলছেন, ওদের রাজি করাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব আমি।

তাহলে কখন জানতে পারছি আমরা?

রওনা তো কালকেই দেব। তার আগেই জানতে পারবেন।

অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। তাহলে চলি এখন।

বিদায় নিয়ে চলে গেল মামা-ভাগ্নী।

রাতে ডিনারে বসে সহযাত্রীদের কাছে কথাটা তুললেন বারজাক। কেউই অমত করল না। সঙ্গে একজন রূপসী থাকুক, মনে প্রাণে সবারই এই কামনা।

আপত্তি করলেন না, কিন্তু মনে মনে খুত খুত করতেই লাগলেন বদ্রিয়ার্স। জেনের রূপের কথা নিয়ে যেন একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছেন বারজাক। কোন ফাঁদ নয়তো? এরকম একটা অভিযানের সঙ্গে একজন মেয়েমানুষ ইচ্ছে করে যেতে চায়, এটা খুবই অস্বাভাবিক। অন্য কোন মতলব নেই তো বারজাকের? মিনিস্ট্রি আর চেম্বার থেকে অনেক রকম গুজব আসছে কানে, সে সবের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই তো ওই মেয়ের?

সবাই রাজি হয়ে গেছে জেন আর তার মামাকে সঙ্গে নিতে, তাই ইচ্ছে করেই কোন আপত্তি করলেন না বদ্রিয়ার্স। দেখাই যাক না কি হয়। বিপদের মোকাবিলা না করতে পারার মত কাপুরুষ নন তিনি।

দুজন কে আমি জানি না, কথা বললেন গভর্নর, তবে দিন পনেরো আছে, শুনেছি।

দুজনের মধ্যে একজনের কথা তো শোনা যেতেই হবে, বললেন বারজাক। চোখে পড়ার মত মেয়ে।

আমিও তাই শুনেছি। ডানাকাটা পরী নাকি, সেনেগাল থেকে স্টীমারে এসেছে। আপনি তো স্যার বলছেন, বারজাককে লক্ষ্য করে বললেন গভর্নর, নিছক বেড়ানোর উদ্দেশ্যেই যদি যেতে চান ওঁরা, তো আমার মনে হয় কোন অসুবিধে হবে না।

শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, সেন্ট বেরেন আর জেনব্লেজনকে সঙ্গে নেয়া হবে। কুলি আর গাইড বাদে লোক সংখ্যা দাঁড়াল এখন দশ।

কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, ঠিকানা রেখেছিলেন বারজাক। পরদিন ভোরে উঠেই মামা-ভাগ্নীকে সুখবরটা দেবার জন্যে ছুটলেন তিনি। গিয়ে দেখলেন, জেনের সঙ্গে কথা বলছে সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন, পিয়েরি মারসিনে। অভিযাত্রীদের নিরাপত্তার জন্যে সেও নিজের দলবল নিয়ে সঙ্গে যাবে।

জেনকে ডেকে খবরটা দিলেন বারজাক। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে বললেন মামা-ভাগ্নীকে। যাত্রার বেশি দেরি নেই আর।

জেনের সঙ্গে আগেরই পরিচয় রয়েছে ক্যাপ্টেনের, দেখে মনটা কিন্তু খারাপ হয়ে গেল বারজাকের।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *