০১. শহরের সবকটা দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায়

শহরের সবকটা দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হলো খবরটা। সেন্ট্রাল ব্যাংকে দুঃসাহসিক ডাকাতি। সাঙ্ঘাতিক ঘটনাটা ঘটল স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে থ্রেডনীডল কোণে সেন্ট্রাল ব্যাংকের ডিকে ব্রাঞ্চে। ম্যানেজার লুই রবার্ট ব্লেজন, বিখ্যাত লর্ড ব্রেজনের ছেলে।

বিশাল একটা ঘরকে ভাগ ভাগ করে নিয়ে এই ব্যাংক। ওক কাঠের কাউন্টার। কাঁচের দরজা দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়বে বাদিকে লোহার গরাদ দিয়ে ঘেরা স্ট্রংকুম। এর পেছনেই ম্যানেজারের রুম। তারপর একটা গলিপথ। বড় হলঘরে গিয়ে শেষ হয়েছে পথটা। থ্রেডনীডল স্ট্রীটে বেরিয়ে যাওয়া যায় এখান থেকে। হলঘর থেকে বেরোনোর দরজাটাও ডবল কাঁচের।

সেদিন, পাঁচটা বাজতে বিশ মিনিট বাকি। ম্যানেজার ছাড়া ব্যাংকের কর্মচারী সংখ্যা ছয়। দুজন ছুটিতে আছে। তিনজন মক্কেলের সঙ্গে কথা বলছে। একমনে বসে টাকা গুনছে ক্যাশিয়ার। সারাদিনে জমা পড়া টাকার হিসেব করছে। মোট জমার পরিমাণ ৭২,০৭৯ পাউন্ড ২ শিলিং ৪ পেন্স।

মিনিট কুড়ি পরেই বন্ধ হয়ে যাবে ব্যাংক। নামিয়ে দেয়া হবে স্টীলের শাটার।

নভেম্বর। ব্যাংকের কাঁচের দরজায় গোধূলির আভা রাস্তা থেকে ভেসে আসছে ক্লান্ত বাড়ি ফেরতা অফিস কর্মচারীদের কলরব আর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাওয়া যানবাহনের আওয়াজ। হঠাৎই এই সময় খুলে গেল ব্যাংকের ডবল কাঁচের সুইংডোর।

ভেতরে এসে ঢুকল একজন লোক। চকিতে ভেতরের আবহাওয়াটা একবার পর্যবেক্ষণ করেই ঘুরে দাঁড়াল। ডান হাত তুলল। তিনটে আঙ্গুল সোজা করে ইঙ্গিত করল, তিন। কাকে যেন বোঝাল, মোট তিনজন কর্মচারী উপস্থিত। লোকটার ইঙ্গিত ক্লার্কেরা দেখতে পেল কিনা, কিংবা দেখলেও আদৌ বুঝল কিনা, তা নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই আগন্তুকের। এমনি বেপরোয়া।

ইঙ্গিত শেষ করেই দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এসে মক্কেলদের পেছনে দাঁড়াল আগন্তুক। যেন সে-ও আর একজন মক্কেল।

লম্বা, মজবুত গড়ন এই অদ্ভুত লোকটার। কঠিন মুখ। চোখে দৃঢ় সংকল্পের ছায়া। রোদে পোড়া চামড়ার সঙ্গে দাড়ির রঙ মিশে গেছে। গলা থেকে পায়ের গোড়ালির ওপর নেমে এসেছে সিল্কের লম্বা ডাস্টকোট।

আগে আসা মক্কেলদের একে একে বিদেয় করে আগন্তুকের দিকে তাকাল একজন ক্লার্ক। শেষ মক্কেলটি দরজা খুলে বেরিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম আগন্তুকের মতই দেখতে আর একটি লোক এসে ঢুকল ঘরে। এর গায়েও একই ধরনের লম্বা ডাস্টকোট ৷ এগিয়ে এসে আর একজন ক্লার্কের সামনে দাঁড়াল।

তৃতীয় আরও একজন লোক এসে ঢুকল পনেরো সেকেন্ড পরই। এর গায়েও ডাস্টকোট, কিন্তু এ প্রথম দুজনের মত লম্বাদেহী নয়। বেঁটে, গাটাগোটা। কালো দাড়ি।

আধ মিনিট পর ঢুকল আরও দুজন লোক। দুজনেরই পরনে ধূসর ওভারকোট! আশ্চর্য! বছরের এই সময়ে এই শহরে ওভারকোট পরে না লোকে। চেহারার রঙ ব্রোঞ্জের মত। দাড়িগোফে ঢেকে আছে গালমুখ। ঘরে ঢোকার কায়দাটা কিন্তু ভারি অদ্ভুত এই দুজনের। লম্বা, হারকিউলিস মার্কা আগের লোকটা দরজা ঠেলে ঢুকতেই, পেছন পেছন দ্বারপথে এসে দাঁড়াল অন্য লোকটা। তারপর হাতলে কোর্ট আটকে যাবার ভান করে ওটা ছাড়িয়ে নিতে গেল। আসলে এই সুযোগে কাচের দরজার এপাশ থেকে ঝোলানো ওপেন লেখা বোর্ডটা উল্টে ক্লোজড করে দিল। পাঁচটা বেজে গেছে। এই লেখা দেখে এখন আর কেউ সন্দেহ করবে না।

পাঁচজনের মধ্যে চারজন ক্লার্কদের সঙ্গে কথা বলতে লাগল! হারকিউলিস মার্কা লোকটা দেখা করতে চাইল ম্যানেজারের সঙ্গে।

এক মিনিট, প্লীজ, একজন ক্লার্ক বলল। তাড়াতাড়ি ম্যানেজারের কাছে চলল সে।

আধ মিনিটের মধ্যেই ফিরে এসে হারকিউলিসকে নিয়ে চলল ম্যানেজারের ঘরে। দরজা খুলে লোকটাকে ঘরে ঢোকার পথ করে দিয়ে সরে দাঁড়াল। লোকটা ঢুকে যেতেই আবার ফিরে এল কাউন্টারের পেছনে, আগের জায়গায়!

কি কথাবার্তা হলো ম্যানেজারের সঙ্গে হারকিউলিসের, কেউ জানল না। ঠিক দুমিনিটের মাথায় ম্যানেজারের ঘর থেকে বেরিয়ে এল লম্বু। ক্যাশিয়ারকে জানাল, তাকে ডাকছে ম্যানেজার।

একটা ব্রীফকেস আর তিনটে লেবেল লাগানো প্যাকেটে সারাদিনের জমা পড়া টাকা নিয়ে স্ট্রংক্ৰমে গিয়ে ঢুকল আগে ক্যাশিয়ার। জায়গামত রেখে বেরিয়ে এসে প্রথমে দরজা বন্ধ করল। তারপর স্টীলের গরাদগুলো ঠেলে দরজার ওপর নিয়ে এসে ইয়া বড় বড় তালা আটকে দিল। বারকয়েক টেনেটুনে তালাগুলো ঠিকমত লেগেছে কিনা পরীক্ষা করে দেখে, সন্তুষ্ট হয়ে ঘুরে দাঁড়াল। চলল ম্যানেজারের ঘরে।

এতক্ষণ ম্যানেজারের ঘরের দরজার বাইরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ক্যাশিয়ারের কাজকর্ম দেখছিল হারকিউলিস। লোকটা এগিয়ে আসতেই পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল, তারপর পেছন পেছন এসে ঢুকল ম্যানেজারের ঘরে।

ঢুকেই কিন্তু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ক্যাশিয়ার। কোথায় ম্যানেজার? ফাঁকা ঘর! রহস্য যে কি, ভাবারও সময় পেল না ক্যাশিয়ার। প্রচন্ড জোরে তার গলা চেপে ধরল হারকিউলিস। টু শব্দটি করতে পারল না সে, জ্ঞান হারাল। তার মুখে ন্যাকড়া গুঁজে দিল হারকিউলিস তারপর কোটের পকেট থেকে দড়ি বের করে হাত-পা বেঁধে ফেলল।

তিনজন ক্লার্কের কেউ জানল না, ম্যানেজারের ঘরে কি পরিণতি ঘটল ক্যাশিয়ারের।

আস্তে করে দরজার পাল্লা একটু ফাঁক করল হারকিউলিস। খুক খুক করে কাশল। চার সঙ্গী বুঝল, ওদিককার কাজ শেষ। সঙ্গে সঙ্গে তিনজন ঝাপিয়ে পড়ল তিন ফ্লার্কের ওপর। আধ মিনিটের মধ্যেই জ্ঞান হারাল তিনজন ক্লার্ক। মুখে ন্যাকড়ার ডাস্টার গুঁজে দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলা হলো ওদেরও।

লম্বা লম্বা পায়ে ম্যানেজারের ঘর থেকে বেরিয়ে এল হারকিউলিস। মাটিতে পড়ে থাকা ক্লার্ক তিনজনের দিকে একবার চেয়েই আদেশ দিল, শাটার নামাও। গম গম করে উঠল গলা।

শাটার নামাতে ছুটল তিনজন। হঠাৎ বেজে উঠল টেলিফোন। ম্যানেজারের ঘরে। থামো! আবার আদেশ দিল হারকিউলিস। ওদিকে অর্ধেক নামানো হয়ে গেছে শাটার। মাঝপথেই থেমে গিয়ে ফিরে চাইল তিন ডাকাত।

এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলল হারকিউলিস, হ্যালো!

কে,ব্লেজন নাকি?

বলছি।

গলাটা অচেনা ঠেকছে যে?

লাইন খারাপ।

কিন্তু আমার এদিকে তো ঠিকই আছে মনে হচ্ছে।

এদিকে খারাপ। আপনাকেও তো চিনতে পারছি না আমি।

বলেন কি, অ্যা! আমি লিওনার্ড।

ও, তাই নাকি? অথচ আপনাকে চিনতে পারলাম না। নাহ্, এই টেলিফোনগুলো নিয়ে আর পারা গেল না! বিরক্তি হারকিউলিসের গলায়।

তা, ভ্যান পৌছেছে?

কই, না তো!

ঠিক আছে। পৌঁছলেই এস ব্ৰাঞ্চে পাঠিয়ে দেবেন। এইমাত্র ফোন করেছিল ওরা মোটা টাকা নাকি জমা পড়েছে ওখানে।

দেব। হ্যা, তা কেমন জমা পড়েছে?

বিশ হাজার পাউন্ড।

ওরে বাব্বা, তাই নাকি! ঠিক আছে, ভ্যান এলেই পাঠিয়ে দেব।

গুড! রাখি?

আচ্ছা।

ওদিকে লাইন কেটে যেতেই রিসিভার নামিয়ে রাখল হারকিউলিস। কি ভাবল এক সেকেন্ড। তারপর সঙ্গীদের হুকুম দিল, ক্যাশিয়ারের গা থেকে জামাকাপড় খুলে আনো ৷ জলদি।

ক্যাশিয়ারের জামাকাপড় দ্রুত পরে নিল হারকিউলিস। গায়ে ঠিক লাগল না। বেশি আঁটো। হবেই। সবাই তো আর বিশালদেহী হারকিউলিস নয়।

ক্যাশিয়ারের পকেট থেকে চাবি বের করে স্ট্রংরুম খোলা হলো। এক বান্ডিল হুন্ডি, তিনটে প্যাকেট আর ব্রীফকেসটা বের করে নিয়ে এল দুজন লোক। ঠিক এই সময় সদর দরজার বাইরে গাড়ি থামার শব্দ হলো।

আধ মিনিট পরেই অর্ধেক নামানো শাটিারের গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা মারল কেউ।

ডাস্টকোট খোলো, জলদি। চাপা গলায় হুকুম দিল হারকিউলিস, যে-ই ভেতরে ঢুকবে, শুইয়ে দেবে।

হুন্ডি আর টাকাগুলো নিয়ে বেরিয়ে গেল হারকিউলিস। অজ্ঞান তিন ক্লার্ককে দ্রুত কাউন্টারের তলায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল তিনজন; চতুৰ্থজন ওঁৎ পেতে রইল দরজার পাশে, কেউ ঢুকলেই তার ব্যবস্থা করতে পারবে।

সদর দরজার বাইরে একেবারে সিড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংকের ডেলিভারী ভ্যানটা। অন্ধকার হয়ে এসেছে ইতোমধ্যেই। গাড়ির ভেতরে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। নিজের জায়গায় বসে আছে কোচোয়ান। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বলছে গার্ড। একটু আগে শাটারে হাতের ধাক্কা মেরে জানান দিয়ে গেছে সে-ই।

রাস্তায় যানবাহনের ভিড়। পথচারীরও অভাব নেই।

কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে গার্ডর পাশে দাঁড়াল হারকিউলিস। কাঁধে হাত রাখতেই চমকে উঠে ফিরে চাইল গার্ড। আবছা অন্ধকারে ক্যাশিয়ারের পোশাক পরা লোকটার দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, স্টোর কই?

স্টোর? বলেই অনুমান করল হারকিউলিস, ক্যাশিয়ারের কথাই জানতে চাইছে গার্ড। তাড়াতাড়ি বলল, ছুটিতে।

গাড়ির ভেতর উঁকি মেরে দেখল আর কেউ নেই। বলল, তা ভেতরে গিয়ে টাকা পয়সাগুলো একটু নিয়ে আসবে?

কিন্তু…, মাথা চুলকাল গার্ড, গাড়ি ছেড়ে তো যাবার হুকুম নেই আমার।

কমিনিট আর লাগবে, যাও না। তোমার জায়গায় দাঁড়াচ্ছি আমি। এই ব্রিফকেস আর প্যাকেটগুলো গুছিয়ে রাখছি, ততক্ষণে তুমি টাকার অন্য প্যাকেটগুলো নিয়ে এসো।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্যাংকের সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল গার্ড ! যাবে কি যাবে না আর একবার ভেবে ভেতরে ঢুকেই পড়ল শেষ পর্যন্ত।

দরজাটা খোলো তো। কোচোয়ানকে আদেশ দিল হারকিউলিস।

এই যে, খুলছি।

কোচোয়ানের সীটের পেছনে ভ্যানে ঢোকার পথ। ধাতুর শীট দিয়ে তৈরি কপাট। যতটা সম্ভব ডাকাতির সম্ভাবনা কমিয়ে আনা হয়েছে। কোচোয়ানের আসন কাত করে অর্ধেকটা তুলে কপাট খুলতে হয়, তারপর ভেতরে ঢোকা যাবে কঠিন পথ। হবেই, টাকা ডেলিভারী ভ্যান তো।

সামান্য কয়েকটা প্যাকেটের জন্যে সেদিন কিন্তু অত কষ্ট করতে গেল না কোচোয়ান। সীটে বসেই কাত হয়ে ধাতুর কপাট একটু ফাঁক করে হারকিউলিসের হাত থেকে ব্রিফকেসটা নিল। হেঁট হয়ে কপাটের ফাঁক দিয়ে মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। টাকা কম হলে মাঝেমধ্যেই এভাবে রাখে কোচোয়ান, তারপর গার্ডকে পাশে বসিয়ে নিয়ে চলে যায়।

কোচোয়ানের অর্ধেকটা শরীর ভেতরে অদৃশ্য হতেই যেন গাড়ির ভেতরটা দেখার জন্যেই উঠে এল হারকিউলিস। অন্ধকারে হঠাৎ ওর হাত দুটো ভেতরে ঢুকে গেল।

রাস্তার কেউ দেখতেও পেল না, হঠাঁই শক্ত হয়ে গেল কোচোয়ানের পা দুটো, তারপরই নেতিয়ে পড়ল। নেতিয়ে পড়ল কোমরসুদ্ধ ওপরের দেহাংশও – সীটের নিচে।

কোচোয়ানের কোমরের বেল্ট খিঁচে ধরল হারকিউলিস। শিথিল দেহটা ঠেলে দিল গাড়ির ভেতর। লাশের পাশে পড়ে আছে টাকার প্যাকেট আর ব্রীফকেস এছাড়াও রয়েছে আরও অনেকগুলো প্যাকেট, আর ছোট ছোট কাপড়ের ব্যাগ। অন্যান্য ব্রাঞ্চ থেকে তুলে এনেছে। হেড অফিসে যাবে।

রাস্তায় অত ভিড়। কিন্তু কেউই খেয়াল করল না, গত কয়েকটা মিনিটে রাস্তার ওপর কি ভয়ানক ব্যাপার ঘটে গেল।

গাড়ির ভেতরের মিটমিটে আলোয় হারকিউলিস দেখল মেঝের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে কোচোয়ানের লাশটা। বয়ে যাওয়া রক্তের ধারাকে সেই মৃদু অলোয় কালচে দেখাচ্ছে। ঠিক কন্ঠের কাছেই বিঁধিয়ে দেয়া ছুরিটার দিকে তাকাতে একটা নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল হারকিউলিসের ঠোঁটে।

রক্তের পরিমাণ দেখে একটু চিন্তিত হয়ে উঠল হারকিউলিস। কি করা যায়? গাড়ির কাঠের মেঝের ফাঁক দিয়ে বাইরে তো পড়বেই। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় কোন পথারীর চোখে পড়ে গেলেই বিপদ।

কোচোয়ানের সীটটা তুলে দিয়ে কবাট খুলল হারকিউলিস। ভেতরে ঢুকে পড়ল। দ্রুত কোট খুলে নিল লাশের গা থেকে। একটানে কণ্ঠ থেকে ছুরিটা তুলে নিয়ে ক্ষতস্থানে শক্ত করে পেঁচাল কোটটা। এখন রক্ত বেরোলেও কোটের গরম কাপড়ে তা শুষে যাবে।

হাতে রক্ত লাগল হারকিউলিসের। কোচোয়ানের কোটেই মুছে নিল। একটু

ভেবে ছুরিটাও মুছে নিয়ে বন্ধ করে রেখে দিল পকেটে। তারপর বেরিয়ে এল বাইরে। চারদিকটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়েই নেমে পড়ল। এগিয়ে গিয়ে ব্যাংকের শাটারে বিশেষ কায়দায় টোকা দিতেই খুলে গেল কাচের সুইংডোর।

কই? ভেতরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করল হারকিউলিস।

আছে, কেরানী সাহেবদের সঙ্গেই, জবাব দিল একজন।

ঠিক আছে, ওটার কাপড় চোপড়ও খুলে নাও।

গা থেকে ক্যাশিয়ারের পোশাক খুলে গার্ডের পোশাক পরে নিল হারকিউলিস। দুজন ডাকাতকে ব্যাংকের ভেতরেই রেখে বাকি দুজনকে নিয়ে বাইরে বের হয়ে এল।

আবার গাড়িতে উঠল হারকিউলিস। দুজন ডাকাত বাইরে রাস্তায়ই দাঁড়িয়ে রইল। একে একে সব কটা প্যাকেট, থলি, ব্রীফকেস বাইরে বের করে দিল হারকিউলিস। ওগুলো নিয়ে আবার ব্যাংকের ভেতরে চলে গেল দুই ডাকাত। অনেকেই দেখল ঘটনাটা, কিন্তু কেউ মাথা ঘামাল না। বুঝল, গাড়ি থেকে টাকা পয়সা চালান যাচ্ছে ব্যাংকের ভেতরে। আগামী দিন হয়তো মক্কেলের ভিড় বাড়বে, টাকা তুলতে আসবে; তাই আগে থেকে বন্দোবস্ত করে রাখা হচ্ছে।

ব্যাংকের ভেতরে টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা ইত্যাদি সব নেয়া হয়ে গেলে সমান পাঁচ ভাগে ভাগ করা হলো ওগুলো। কোটের পকেটে, হাতে যে যেখানে পারল তুলে নিল সব।

চলো যাই, বলল হারকিউলিস। কি করতে হবে আগেই তো বলেছি। টাকা পয়সাগুলো আমাদের গাড়িতে তুলে রেখে আবার ফিরে আসব। যাব আসব পেছনের দরজা দিয়েই। এরপর আমি চলে যাব ডেলিভারী ভ্যানে, তোমরা সবকটা শাটার নামাবে, তালা দেবে, ড্রেনে ফেলে দেবে চাবিগুলো। আর হ্যাঁ, ম্যানেজারকে কি করতে হবে মনে থাকে যেন। কোন প্রশ্ন?

না, একসঙ্গেই জবাব দিল চারজন ডাকাত।

ঠিক আছে, যাই চলো। আরে হ্যাঁ, ব্রাঞ্চ অফিসের ঠিকানাটা তো নিলাম না।

এগিয়ে গিয়ে কাচের সুইংডোরের কাছে দাঁড়াল হারকিউলিস। দরজার পাশেই হলদে কাগজে লিখে সাটানো আছে সবকটা ব্রাঞ্চের নাম আর ঠিকানা। এস ব্রাঞ্চের ঠিকানাটা মুখস্থ করে নিন সে।

ডাস্টকোটগুলো সব ফেলে যাবে ব্যাংকের ভেতরেই, বলল হারকিউলিস। প্রথম দৃষ্টিতেই চোখে পড়ার মত জায়গায়।

একে একে সমস্ত মালপত্র নিজেদের গাড়িতে তুলল ডাকাতেরা। হারকিউলিসের পোশাকটাও বাদ গেল না। কাজ শেষ করে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে আবার সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল হারকিউলিস। গাড়িতে উঠল গিয়ে। বাইরের একটা শাটার নামাতেই ঘোড়ার পিঠে চাবুক মারল সে।

গাড়ি নিয়ে সোজা গিয়ে এস ব্রাঞ্চের সামনে দাড়াল হারকিউলিস। কোচবক্স থেকে নেমে গট গট করে হেঁটে গিয়ে ঢুকল ব্যাংকের ভেতরে। ক্যাশিয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে কোন প্রকার ভণিতা না করে বলল, দেন কি দেবেন। দেরি হয়ে যাবে।

চমকে চোখ তুলে চাইল ক্যাশিয়ার, আপনাকে তো চিনি না। বডরুক কোথায়।

আমিই এসেছি।

বিড় বিড় করতে লাগল কাশিয়ার, মাথা খারাপ হলো নাকি ম্যানেজারের? চিনি না, জানি না, এমন সব লোককে পাঠায় টাকা নিতে। কতবড় দায়িত্বপূর্ণ কাজ…

দেখুন, কথা বেশি বলছেন আপনি। আপনাকে জিজ্ঞেস করে লোক রাখবে নাকি বড় সাহেবরা? চটে উঠন হারকিউলিস, বি-ব্রাঞ্চ থেকে রওনা দিয়েছি, হঠাৎ সেন্ট্রাল থেকে ফোন পেল ম্যানেজার, ওখানে অনেক টাকা জমা পড়েছে। খুব বিশ্বস্ত কাউকে পাঠাতে হবে। সামনে আমাকেই পেল। ব্যস, আমার আর সব কাজের দফারফা। বলে কিনা, আমাকেই আসতে হবে। শালার চাকরিই ছেড়ে দেব।

কিন্তু আপনাকে যে এর আগে কোনদিন দেখিনি! সন্দেহ ক্যাশিয়ারের গলায়।

অত চেনাচেনির দরকার হলে চলি আমি। আগামীকাল বড় সাহেবরা হয়তো চেনাবেন আপনাকে।

“আইডেন্টিটি আছে? সন্দেহ তবু যায় না ক্যাশিয়ারের।

মনে মনে ঘাবড়ে গেলেও মুখের ভাব ঠিকই রাখল হারকিউলিস। দুর্ধর্ষ ডাকাত সে। অত সহজে মচকানোর নয়।

তা আছে, পাশের টলটায় বসে পড়ল হারকিউলিস। পকেটে হাত ঢোকাল। আসলে ভাবল, কি করা যায় এখন? ব্যাংকের গার্ডের আইডেন্টিটি দেখতে কেমন। সেটাও জানা নেই তার। কিন্তু বিচলিত ভাবটা একটুও প্রকাশ করল না চেহারায়।

গার্ডের পোশাকের পকেটে যত কাগজপত্র পাওয়া গেল একে একে সব টেনে বের করল। পাওয়া গেল আইডেন্টিটি। কিন্তু সেটা বডরুকের। আড়চোখে একবার ক্যাশিয়ারের দিকে তাকিয়ে দেখল সে। একমনে টাকা গুনছে লোকটা। চোখের পলকে বডরুকের আইডেন্টিটি ছিড়ে দুই টুকরো করে ফেলল হারকিউলিস। ছবি সাটা অংশটা ঢুকিয়ে রাখল আবার পকেটে। বাকি অংশটা নিয়ে উঠে গিয়ে দাঁড়াল ক্যাশিয়ারের সামনে।

এই নিন, আইডেন্টিটি।

অর্ধেকটা টুকরো হাতে নিয়ে বোকার মত হারকিউলিসের দিকে তাকাল ক্যাশিয়ার, আর আধখানা কোথায়? ছবিটাই তো নেই।

আধখানা দিয়েছি নাকি। কই, দেখি? আরে হ্যা, তাই তো! বাকি অর্ধেকটা ছিড়েই গেল বোধহয় ! ক্যাশিয়ারের সামনেই পকেটে হাত ঢুকিয়ে আবার সমস্ত কাগজপত্রগুলো বের করল। হারকিউলিস, অবশ্যই কার্ডের অন্য অর্ধেকটা ছাড়া। আঁতিপাতি করে খুঁজল।

গেছে। ক্যাশিয়ারের চোখে চোখে তাকাল হারকিউলিস, গেছে, বুঝলেন?

কপাল যেদিন খারাপ হয়, সব দিক দিয়েই হয়। পনেরো বিশটা ব্রাঞ্চে ঘুরতে হয়। সবাই আইডেন্টিটি দেখতে চায়। দেখাতে দেখাতে আর ঠিক থাকে নাকি ওটা। কোথায় কোন কাগজপত্রের সাথে ছিড়ে রয়ে গেছে, কে জানে! নাহ, আজ আর টাকা নেয়া হলোই না। হেড অফিসের সাথে বোঝাপড়া করে নেবেন। চলি।

ঘুরে দাঁড়াল হারকিউলিস। এ লোক জেনুইন। নইলে অত বড় জোর করত না। পেছন থেকে ডাকল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, অত রাগছেন কেন? কই দেখি আবার আইডেন্টিটিটা?

দিল হারকিউলিস, এই যে, নিন।

এই অর্ধেকটা অবশ্য জেনুইনই। কিন্তু এতে না আছে আপনার ছবি, না নাম। কিন্তু কি আর করা, বিপদে যখন পড়েই গেছেন…।

আমি বিপদে পড়িনি। আপনাদের ব্রাঞ্চের টাকা নেবার কাজটা জোর করে আমার ওপর গছানো হয়েছে। তার ওপর অত হস্থিতম্বি করছেন। দাঁড়ান না, কালই ব্রাঞ্চ-ম্যানেজারের নামে জেনারেল ম্যানেজারের কাছে নালিশ করছি আমি।

হারকিউলিসের মুখের দিকে তাকাল ক্যাশিয়ার। কিন্তু অন্য দিকে তাকিয়ে আপনমনে গজ গজ করছে লম্বা লোকটা।

নিন, নিয়ে যান টাকা, হঠাই মনস্থির করে বলল ক্যাশিয়ার, এই যে, এই রেজিস্টারে সই দিন।

ক্যাশিয়ারের সামনে টেবিল থেকে কলমটা তুলে নিতে নিতে জিজ্ঞেস করল হারকিউলিস, কোথায়?

অতদিন ধরে টাকা নিচ্ছেন তাও জানেন না?

ক্যাশিয়ারের চোখের দিকে তাকাল হারকিউলিস। ভয় পেয়ে গেল ক্যাশিয়ার ধরে মারবেই নাকি তাকে গোয়ারগোবিন্দ লোকটা। তাড়াতাড়ি রেজিস্টারের একটা জায়গা দেখিয়ে বলল সে, এই যে, এখানে।

পুরোপুরিই মেজাজ যেন খিঁচড়ে গেছে এমনি ভাব দেখিয়ে রেজিস্টারে এলোমেলো কয়েকটা টান মেরে কলমটা ছুঁড়ে ফেলল টেবিলের উপর। হ্যাচকা টানে ক্যাশিয়ারের হাত থেকে টাকার প্যাকেটটা নিয়েই চলতে শুরু করল। বোকার মত হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল ক্যাশিয়ার। মন বলতে লাগল, হাকডাক যতই করুক, হারকিউলিস মার্কা অচেনা লোকটাকে টাকা দেয়া উচিত হলো না তার মোটেই।

ডাকাতি হয়ে যাবার এক ঘন্টা পরেই কিন্তু ভ্যানটা হাইড পার্কের কোণে পড়ে থাকা অবস্থায় দেখল পুলিস; ভেতরে কোচোয়ানের রক্তাক্ত লাশ। সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান শুরু হয়ে গেল।

ডিকে ব্রাঞ্চের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকল পুলিস, ক্লার্কদের মুখে শুনল ওভারকোট আর ডাস্টকোট পরা পাঁচজন লোক এসেছিল ব্যাংকে। সর্দার মত লোকটা ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে ঢুকেছিল। তারপর ক্যাশিয়ারের ডাক পড়ে, কিন্তু ম্যানেজারের ঘরে ঢুকে ম্যানেজারকে দেখতে পায়নি ক্যাশিয়ার।

গেল কোথায় ম্যানেজার? যোগসাজস আছে তার ডাকাতদের সঙ্গে?

আশেপাশে অনেক অফিস ছিল; সেগুলোর দারোয়ান কেয়ারটেকারদেরকে জেরা করে বিশেষ কোন সুবিধে হলো না। নতুন কিছু বলতে পারল না কেউ। ক্লার্করা আগেই তার চেয়ে অনেক বেশি বলেছে।

পুলিস ধরেই নিল, ডাকাতদের সঙ্গে যোগসাজস ছিল ম্যানেজারের। নাহলে এমনভাবে ডাকাতি করা সম্ভব নয়। আর যদি ডাকাতদের সঙ্গে সম্পর্ক নাই থাকবে তাহলে উধাও হয়ে গেল কেন সে?

যথারীতি হুলিয়া বের করল ম্যানেজারের নামে। দেশের বন্দরে বন্দরে, ট্রেন-স্টেশনে ম্যানেজারের ছবি সমেত নির্দেশ চলে গেল। এই চেহারার লোককে দেখলেই যেন পাকড়াও করা হয়। কিন্তু কোথায় ব্লেজন! তার কোন খবর নেই।

এতটুকু করেই যথাসাধ্য করা হয়েছে ভেবে খুশি থাকল পুলিস।

যেদিন ডাকাতি হয় সেদিনই রাত দুটোয় লন্ডন থেকে সাউথ হ্যাম্পটন স্টেশনে এসে থামল একটা ট্রেন। প্রথম শ্রেণীর কামরা থেকে নামল পাঁচজন লোক। কারও গাল নিখুঁত কামানো, কারও ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, কারও বা নাকের নিচে ইয়া গোঁফ, কারও বা দাড়িগোফ কিচ্ছু নেই। কুলি ডেকে কামরা থেকে নামাল বেশ কিছু চটের বস্তা আর বিশাল একটা ট্রাংক। একটা গাড়ি ডেকে মালপত্রসহ স্টীমার ঘাটে চলল পাঁচজন।

স্টীমারে তোলা হলো মাল। প্রচুর বখসি পেয়ে দাত বের করে হাসল কুলি। সাহেবরা রীতিমত ভদ্রলোক, এ বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই।

স্টীমার যাবে দাহোমের কোটানৌতে।

ভোরে জোয়ার আসতেই ছাড়ল স্টীমার।

ডাকাতির খবরটা ভালমত ছড়ানোর আগেই ইংল্যান্ড থেকে অনেক দূরে চলে গেল স্টীমার।

ডাকাত আর ধরতে পারল না পুলিস। জেনকেও খুঁজে পেল না।

আস্তে আস্তে এই ডাকাতি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা কমে এল। লোকে ভুলেও গেল এক সময়।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *