১০. বাড়ির কোণের দিকে

বাড়ির কোণের দিকে দৌড় দিল ওরা।

দ্বিধায় পড়ে গেল লোক দুজন। ক্ষণিকের জন্যে। চেঁচিয়ে উঠল গলা ফাটিয়ে।

ফিরেও তাকাল না ছেলেরা। বাগানের শেষে নিচু বেড়া লাফ দিয়ে ডিঙিয়ে এসে পড়ল বাদামী পাহাড়ের গোড়ায়, পথে।

পাহাড়ে ওঠো, হাঁপাতে শুরু করল কিশোর। পরিশ্রম একেবারেই সয় না তার।

আগে ছুটছে রবিন, পেছনে কিশোর, শুকনো ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে। শক্ত, ঘন, ধূসর ঝোপের ডাল তাদের কাপড় ছিড়ছে, চামড়া ছিলছে, খেয়ালই করছে না কেউ। কানে আসছে পদশব্দ। তাড়া করে আসছে দুই বাদামী। চেচাচ্ছে।

কি বলে? রবিনও হাঁপিয়ে উঠছে।

ব্যাটাদের মাথা, জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে কিশোর। কিচ্ছু বুঝি না।

পালাতে পারব? পারতে হবে।

আরও ওপরে উঠে সরু একটা পথ পাওয়া গেল। ঝোপঝাড় নেই। খাড়াইও অনেক কম। গতি কিছুটা বাড়ল ওদের।

ছুটছে ওরা। সরে যাচ্ছে রকি বীচ থেকে দূরে, গথিক-বাড়ি, তাদের সাইকেল পেছনে পড়ছে, কিন্তু কিছু করার নেই। বাঁচতে চাইলে পালাতে হবে। ভারি হয়ে আসছে পা। পথের ওপর জোরাল হচ্ছে জুতোর আওয়াজ।

ওহ-ন্নো! চেঁচিয়ে উঠে থমকে দাঁড়িয়ে গেল রবিন। তার প্রায় গায়ের ওপর এসে পড়ল কিশোর। আরেকটু হলেই দিয়েছিল ধাক্কা দিয়ে ফেলে।

হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে পথ। সামনে নিচে গভীর খাদ। মাঝখানে খানিকটা খালি, তারপরে আবার পাহাড় এবং পথ।

পুল ছিল, বলল রবিন। পাহাড়ী ঢলের সময় ভেঙেছে।

ওপারে যাওয়া যাবে না। পাগলের মত এদিক ওদিক তাকাচ্ছে কিশোর। এক পাশে পাহাড়ের চূড়া দেখিয়ে বলল, চলো।

বিপথে আবার ওপরে উঠতে শুরু করল ওরা। ধুলায় ধূসর চুড়া, রোদে তপ্ত হয়ে আছে। নিচে চিৎকার শোনা গেল। গোয়েন্দাদের দেখে ফেলেছে।

ফিরে তাকাল কিশোর। উঠে আসছে লোক দুজন। পাহাড়ে চড়ার অদ্ভুত ক্ষমতা। ঝোপ, পাথর, খাড়াই কোন কিছুকেই পরোয়া করছে না।

আর পারব না ওদের সঙ্গে, দাঁড়িয়ে গেল রবিন।

থেমো না!

ঘাড়ে যেন চাপড় মারছে কড়া রোদ। গরমে কটকট করছে শুকনো ডাল পাতা। ঘামে ভিজে গেছে ওদের শরীর। শুকনো চোখা ডাল হাত দিয়ে ঠেলে

সরাতে হচ্ছে বার বার, রক্তাক্ত হয়ে গেছে তালু আর আঙুল।

অবশেষে পাহাড়ের কাধে পৌঁছল ওরা। লাল ধুলোমাটির ওপরেই ধপাস করে বসে পড়ল কিশোর, হাঁ করে হাঁপাচ্ছে, আরেকটু হলেই জিভ বেরিয়ে যাবে।

ফিরে তাকাল রবিন! হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আসছে!

আসুক! গুঙিয়ে উঠল কিশোর, আর পারছি না।

কপালের কাছে হাত তুলে চোখ থেকে বোদ আড়াল করল রবিন। জানের ভয়ে ছুটছি আমরা, তা-ই পারছি না, আর ওদের কাণ্ড দেখো! এক্কেবারে পাহাড়ী ছাগল। এই কিশোর, ইয়াকুয়ালি না তো? দা ভেভিলস অভ দা ক্লিফস!

কৌতূহল কিছুটা শক্তি ফিরিয়ে দিল কিশোরের দেহে। উঠে দাঁড়িয়ে তাকাল সে। হতেও পারে। এজন্যেই কথা বুঝি না। ইয়াকুয়ালি বলেই হয়তো।

এসকিমো ভাষা বলুকগে, আমার কিছু না, আমার এখন পালানো দরকার, চঞ্চল হয়ে উঠল রবিন। যাই কোথায়? আচ্ছা, ডাংম্যানই আমাদের ধরতে পাঠাল না তো?

মনে হয় না, দূরে গথিক-বাড়িটার দিকে তাকাল কিশোর। শান্ত। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

সাইকেলের কাছে যদি খালি ফিরতে পারতাম!

সামনে কোথায় যাব? পাহাড়ের শূন্য কাঁধের দিকে তাকাল রবিন, শুকনো ঝোপ ছাড়া আর কিছু নেই। লুকানোর কোন জায়গায়ই চোখে পড়ছে না। দেখতে দেখতে হঠাৎ উজ্জ্বল হলো তার মুখ। কিশোর, পেয়েছি! এসো।

কাঁধ ধরে ছুটতে শুরু করল রবিন। পেছনে কিশোর।

পাহাড়ের চূড়া ঘিরে রেখেছে কাঁধ। খানিকটা এগোতেই লোকগুলো আড়ালে পড়ে গেল। আরও পঞ্চাশ গজমত পেরিয়ে উল্টো দিকে মোড় নিল ওরা। নেমে যাওয়া পাহাড়ের ঢালে এখানে ওকের জঙ্গল শুরু হয়েছে, ঝোপও খুব ঘন।

যাচ্ছি কোথায়? হাঁপাতে হাঁপাতে বলল কিশোর।

এখানেই।

আচমকা শুরু হয়েছে সবুজ জঙ্গল, যেন একটা সবুজ দেয়াল। তাতে এসে প্রায় ঝাঁপ দিয়ে পড়ল রবিন, ঢুকে গেল বনে।

পেছনে ছুটছে কিশোর। হঠাৎ মাটি সরে গেল পায়ের তলা থেকে, মহাশূন্যে ঝাপ দিয়েছে যেন।

ময়দার বস্তার মত এসে ধাপ্পাস করে পড়ল সরু একটা গিরিখাতের তলায়। চারপাশে ঘন গাছের জঙ্গল। আগের রাতের ছড়ে যাওয়া হাঁটুতে নতুন করে চোট লাগল, ডলতে ডলতে উঠে বসল সে। তাকাল মাতালের মত।

আগেই বলতে পারতে, খসখসে কণ্ঠ, গলার ভেতরটা সিরিশ দিয়ে ঘষা হয়েছে যেন কিশোরের।

সময় পেলাম কই? পাশ থেকে বলল রবিন। তোমার মতই আমিও তো পড়েছি। একটা সাপকে লাঠি নিয়ে তাড়া করেছিলাম। যাক, ব্যাটারা আর খুঁজে পাবে না।

কি জানি, নিশ্চিন্ত হতে পারছে না কিশোর।

শশশ, ঠোঁটে আঙুল রাখল রবিন।

হামাগুড়ি দিয়ে খাদের কিনারে সরে এল দুজনে। ঝোপে ঢুকল।

আস্তে করে ঝোপের ডালপাতা সরিয়ে ওপরে উঁকি দিল রবিন।

বড় জোর পঞ্চাশ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে লোকদুটো। কথা বলছে, একেক দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে, উত্তেজিত।

একেবারে শুয়ে পড়ল কিশোর। বুঝে গেছে, আমরা ধারে-কাছেই আছি।

কি করব এখন?

চুপ করে থাকব। আর কি করা?

চুপ করে শুয়ে রইল দুজনে, কান খাড়া। লোকগুলোর কথা আর পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অনিশ্চিতভাবে হাঁটাহাঁটি করছে ওরা, বোধহয় ঝোপের ভেতরে খুঁজছে। স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে কথা, কিন্তু এক বর্ণও বুঝতে পারছে না ছেলেরা।

ফিসফিসিয়ে বলল কিশোর, দেখে ফেলবেই, লুকিয়ে বাচতে পারব না।

না-ও দেখতে পারে। গিরিখাতটা বাইরে থেকে দেখা যায় না।

তাহলে আমাদের মতই পা ফসকে ভেতরে পড়বে। বেরোনোর পথ আছে? ওদের চোখ এড়িয়ে?

এক মুহূর্ত ভাবল রবিন। বায়ে গভীর আরেকটা খাদ আছে, গথিক-বাড়িটার পেছনে যে আরেকটা পথ আছে, তার কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে পঞ্চাশ ফুট খোলা জায়গা পেরোতে পারলেই খাদটায় গিয়ে নামতে পারব।

পঞ্চাশ ফুট, না? নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে শুরু করল কিশোর। দু-চোখের কোণে খাজগুলো গভীর হয়েছে। তাহলে ওদের নজর এড়ানোর অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। এমন কিছু, যাতে ওরা এসে এখানে নামে, ওই সময়ে খোলা জায়গা দিয়ে ছুটে যাব আমরা।

তাহলে ভেনট্রিলোকুইস্ট হতে হবে আমাদের, তিক্ত কণ্ঠে বলল রবিন। খোলা জায়গায় গিয়ে এখানে আমাদের কথা ছুঁড়ে পাঠাতে হবে। এছাড়া আর কি করার আছে?

ঠিকই বলেছ! ঝট করে সোজা হলো কিশোর।

মানে? ভেনট্রির ভ্যা-ও জানি না আমরা। কথা ছুঁড়ব কিভাবে?

ইলেকট্রোনিক ভেনট্রিলোকুইস্টের সাহায্যে, পকেট থেকে ওয়াকি-টকিটা বের করল কিশোর। তোমারটা আছে না? গুড। আমারটা ফেলে যাব এখানে। তোমারটা দিয়ে কথা পাঠাব এটাতে।

দারুণ! এতক্ষণে হাসি ফুটল রবিনের মুখে। কথা শুনে এখানে ধরতে আসবে ওরা, ওই সুযোগে আমরা পগার পার। ওঠো, দেরি করছ কেন?

ঝোপ থেকে বেরোল দুজনে।

ওয়াকি-টকিটা মাটিতে রেখে একটা পাথর চাপা দিয়ে রিসিভারের সুইচ অন করে. রাখল কিশোর। রবিনের যন্ত্রটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিয়ে এগোল খাদের এক কিনারে, খোলা জায়গাটার দিকে।

ওই যে একটা বড় গাছ দেখছ? হাত তুলে দেখাল রবিন। তারপরেই।

শুরু হোক তাহলে, হাসল কিশোর। ওয়াকি-টকি মুখের কাছে এনে জোরে বলল, রবিন, ওরা আসছে। বলেই রবিনের মুখের কাছে ধরল যন্ত্র।

আসুক। আমাদের দেখতে পাবে না।

কান পেতে রয়েছে কিশোর, দূরের যন্ত্রটায় বেজে উঠেছে কথা, এখান থেকেও শোনা গেল মৃদু।

আরেকবার ওয়াকি-টকিত্বে কথা বলল দুজনে।

ঝোপঝাড় ভাঙার দুপটুপ আওয়াজ হলো।

শুনেছে, ফিসফিস করল রবিন। খুঁজতে যাচ্ছে।

ছোটো, বলেই লাফ দিয়ে উঠে ছুটতে শুরু করল কিশোর।

মাথা নিচু করে এক দৌড়ে বড় গাছটা ছাড়িয়ে এল দুজনে। ফিরে তাকাল একবার। লোকগুলোকে দেখা যাচ্ছে না।

খাদের ধারে চলে এল ওরা। বেশি গভীর নয়। আসলে চওড়া একটা ফাটল, লম্বা, এঁকেবেঁকে চলে গেছে অনেকটা গিরিপথের মত হয়ে।

তাতে লাফিয়ে নামল দুজনে।

ঢাল বেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে নামল গথিক-বাড়ির পেছনের পথে। লোক দুটোর দেখা নেই।

চলো, গিয়ে ডাংম্যানকে লোকগুলোর কথা জানাই, পরামর্শ দিল কিশোর।

দ্রুত বাড়ির কোণ ঘুরে সামনে সদর দরজার কাছে চলে এল ওরা। বেল বাজাল কিশোর।

অপেক্ষা করেও সাড়া পাওয়া গেল না।

আবার বেল বাজাল।

সাড়া নেই।

দরজার নব মোচড় দিয়ে দেখল, খুলল না, তালা লাগানো।

দরজার পাশে একটা জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিল কিশোর। লোক দেখা যাচ্ছে না।

এস্টেটে চলে গেছে হয়তো, রবিন বলল।

তা-ই হবে। চলো, ভাগি।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *