০৯. পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামল রবিন। তাড়াহুড়ো করে কাপড় পরে নিচতলায় নামল। বাবা-মা ওঠেননি। তাদের দরজায় টোকা দিয়ে ডেকে বলল, মা, আমার নাস্তা খেয়ে নিচ্ছি।

মায়ের ঘুমজড়ানো কণ্ঠ শোনা গেল, ঠিক আছে। কোথায় যাবি?

ইয়ার্ডে।

জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছে রান্নাঘরে। রুটি, ভাজা ঠাণ্ডা ডিম আর এক গ্লাস কমলার রস দিয়ে নাস্তা শেষ করে এসে মুসাকে ফোন করল রবিন।

মুসার মা জানালেন মুসা বেরিয়ে গেছে।

ঘর থেকে ছুটে বেরোল রবিন।

ইয়ার্ডে ঢুকেই পড়ে গেল মেরিচাচীর সামনে।

এই যে, একটাকে অন্তত পাওয়া গেল, বলে উঠলেন তিনি। অন্য দুটোকে ডাকাডাকি করলাম, জওয়াবই নেই। পালিয়েছে বোধহয় ভোররাতেই। রবিন, কিশোরকে বলো, আজ তার চাচার সঙ্গে এস্টেটে যেতে হবে।

বলব, আন্টি।

মেরিচাচী অফিসে গিয়ে ঢোকার পর পা বাড়াল রবিন, ওয়ার্কশপের দিকে। দুই সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকল হেডকোয়ার্টারে।

মুসা আর কিশোর দুজনেই আছে।

মেরিচাচী কি বললেন? ভুরু নাচাল মুসা।

জানাল রবিন। গম্ভীর হয়ে থাকা কিশোরকে জিজ্ঞেস করল, ভূত-থেকে-ভূতের কি খবর?

মাথা নাড়ল শুধু কিশোর, মুহূর্তের জন্যে চোখ সরাচ্ছে না টেলিফোনের ওপর থেকে।

কাল রাতে কি জেনেছি, জানো? কথা আর পেটে রাখতে পারছে না রবিন।

আমরা কি দেখেছি, শোনো আগে, মুসার অবস্থাও রবিনের মতই। হড়হড় করে উগড়ে দিতে আরম্ভ করল সে। শুনে চোখ বড় বড় হয়ে গেল রবিনের।

নিশ্চই মাথা আছে ওদের, মুসা বামনদের কথায় আসতেই বলল কিশোর। তবে দেখা যায়নি। মরুকগে ব্যাটারা। আমি ভাবছি, ভূত-থেকে ভূতের কি অবস্থা? খবর-টবর আসে না কেন? ওই বাদামী লোকদুটোই সমস্ত রহস্যের চাবিকাঠি, কিন্তু কোথায় ওরা? হ্যাঁ, রবিন, চাম্যাশ হোর্ডের কথা কি জেনেছ কাল?

এখানকার লোকাল হিস্টরি বইতে ব্যাপারটা নিয়ে বেশ ফোলানো-ফাপানো হয়েছে, জানাল রবিন। ডাকাতের দলটা মারা পড়তেই গুপ্তধন খুঁজতে বেরিয়েছিল লোকে, দলে দলে। অনেক দিন ধরে অনেক ভাবে খুঁজেছে, পায়নি। ডাকাতেরা পুরো পর্বত জুড়ে ছড়িয়ে ছিল, একেক দিন একেক জায়গায় সরে যেত। পেদ্রোজ এস্টেটেও গিয়ে লুকিয়েছিল একবার। গুপ্তধনগুলো কোথায় আছে, আন্দাজই করতে পারেনি কেউ।

অ্যামিউলেট দুটোর খবর কি? জিজ্ঞেস করল মুসা। আর মিস ভেরা পেদ্রোর ভাইয়ের নাম?

মিস পেদ্রোর ভাইয়ের নাম ছিল ফিয়ারতো, খুনী। একটা লোককে খুন করে ফেরারী হয়েছিল। অবাকই লাগে, যে লোকটাকে খুন করেছিল, সে ছিল শিকারী, থাকত এস্টেটের হানটিং লজে। কেউ জানে না, কেন তাকে খুন করেছে ফিয়ারতো। অ্যামিউলেট দুটোর কোন কথাই লেখা নেই বইতে। একবার উল্লেখও করা হয়নি।

নিচের ঠোঁটে কামড়ে ধরল কিশোর। আচ্ছা, ম্যাগনাস ভারদি মরার আগে ঠিক কি বলেছিল, বলো তো।

চারটে বইতে তিন রকম লিখেছে, নোটবই বের করল রবিন। একটাতে লিখেছে, হোয়াট ম্যান ক্যান ফাইণ্ড দা আই অভ দা স্কাই? আরেক লেখক বলছেন, দা স্কাইজ আইজ ফাইণ্ড নো ম্যান। অন্য দুটো বইতে একরকম কথা, ইট ইজ ইন দা আইজ অভ দা স্কাই হোয়্যার নো ম্যান ক্যান ফাইও ইট। চাম্যাশ ভাষা থেকে অনুবাদ করতে গিয়েই গড়বড় করে ফেলেছে মনে হয়।

খুব বেশি গোলমাল করেনি, বলল কিশোর। আই অভ দা স্কাই কথাটা সবাই বলছে।

কিন্তু, কিশোর, মুসা বলল, আই অভ দা স্কাইয়ের মানে কি?

আকাশে কি জিনিস আছে, যা দেখতে চোখের মত? পাল্টা প্রশ্ন করল কিশোর।

অনেক সময় মেঘ ওরকম দেখায়।

আমার মনে হয় সূর্য, রবিন বলল।

মাথা নোয়াল কিশোর। আমারও তাই মনে হয়। চাঁদও হতে পারে। রূপকথার বইতে, ছবিতে চাঁদ আর সূর্যকে মানুষের মুখের মত করে আঁকে অনেকে।

তাহলে কি চাঁদে গিয়ে গুপ্তধন লুকিয়েছে নাকি? প্রশ্ন তুলল মুসা।

না, তা নয়। তবে এমন কোন জায়গা হয়তো বেছে নিয়েছে, যেখানে সব সময় চাঁদ আর সূর্যের আলো পড়ে। প্রাচীন অনেক মন্দির এমনভাবে তৈরি হয়েছে, সব সময় রোদ পড়ে ওগুলোতে।

হ্যাঁ, সায় দিল রবিন। কিছু কিছু মন্দির তো আছে, ওপরের দিক খোলা, সেখান দিয়ে রোদ কিংবা জ্যোৎস্না এসে পড়ে মঞ্চের ওপর।

তাহলে কি ওরকম কোন জায়গা খুঁজতে হবে?

কোথায় খুঁজব? হঠাৎ উজ্জল হলো কিশোরের মুখ। ম্যাগনাস ভারদি অন্য কিছুওঁ বুঝিয়ে থাকতে পারে। কোন গিরিখাত, গিরিপথ বা উপত্যকার কথাও বোঝাতে পারে, যেখান থেকে চাঁদ কিংবা সূর্যকে দেখতে চোখের মত লাগে। কি মুসা, এমন কোন জায়গা চেনো?

কোত্থেকে চিনব? আমার চোখে তো পড়েনি। আর সান্তা মনিকা তো ছোট পর্বত না, সবটাতেই নাকি ঘুরেছিল ভারদির ডাকাতের দল। কোন জায়গা থেকে চাঁদ-সুরুজকে চোখের মত লেগেছে ব্যাটাদের, ওরাই জানে,

হ্যাঁ, মুসার সঙ্গে একমত হলো রবিন। তাছাড়া ভারদি বলেছে, গুপ্তধন কেউ খুঁজে পাবে না, এমন জায়গায়ই রেখেছে।

আমার তা মনে হয় না, বলল কিশোর। নিশ্চয় ব্যাপারটাকে ধাধা বানিয়ে রেখে গেছে ভারদি। বাদামী লোকটা পুতুল দিয়ে কি করবে যদি খালি একথাটা জানতে পারতাম, অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যেত।

ও-মা, কিশোর, ভুলেই গিয়েছি! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। মিস্টার ডাংম্যানকে আক্রমণ করেছিল ওরা।

খুলে বলল সব।

লাফিয়ে উঠল কিশোর। এক্ষুণি মিস্টার ডাংম্যানের কাছে যাওয়া দরকার। জরুরী কিছু হয়তো জানতে পারব। না দুজন নয়, একজন এসো আমার সঙ্গে। আরেকজন থাকো ফোনের কাছে। কে থাকবে?

গতরাতে মুসা গেছে, আজ আমি যাব, বলল রবিন। বেকুব হয়ে সারাক্ষণ একা এখানে বসে থাকতে পারব না।

যাও, খুশি হয়েই বলল মুসা, কাঁটায় লেগে ছড়ে যাওয়া একটা জায়গায় হাত বোলাচ্ছে। আমি আছি।

মুসা, কিশোর বলল, ওয়াকি-টকি নিয়ে যাচ্ছি। ভূত-থেকে-ভূতের কোন খবর এলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।

ফোন করে ভেজিট্যারিয়ান লীগের ঠিকানা জেনে নিয়ে হেডকোয়ার্টার থেকে বেরোল কিশোর আর রবিন। সাইকেল নিয়ে একটা গোপন পথ দিয়ে ওয়ার্কশপ থেকে বেরোল, মেরিচাচীর চোখে যাতে না পড়ে সেজন্যে এই সতর্কতা।

দশ মিনিটেই বাড়িটা খুঁজে বের করে ফেলল ওরা। শহরের এক প্রান্তে লা পামা স্ট্রীটের শেষ মাথায় ব্লকের মস্ত গথিক-স্টাইলে বানানো পুরানো বাড়িটাকে হেডকোয়ার্টার করেছে ভেজিট্যারিয়ান লীগ। শুকনো বাদামী পাহাড়ের ঢাল নেমে এসে মিশেছে পথের সঙ্গে। পর পর কয়েকটা ব্লকের পেছন দিয়ে আরেকটা সরু পথ চলে গেছে, তার কিনারে সব কটা বাড়ির গ্যারেজ।

গথিক-বাড়ির গেটের কাছে সাইকেল রাখল দুই গোয়েন্দা। সদর দরজায় এসে বেল বাজাল। বেটে তাগড়া এক লোক দরজা খুলে দিল।

মিস্টার ডাংম্যান আছেন? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

ও, তোমরা? লোকটার পেছন থেকে উঁকি দিল ডাংম্যান। এসো, এসো। ল্যাঙলী, সরো, ওদের আমি চিনি। গোয়েন্দাদের দিকে চেয়ে বলল, এত তাড়াতাড়ি আসবে ভাবিনি কিন্তু? লীগে যোগ দিতে এসেছ তো?

বেঁটে লোকটা গিয়ে কাজে লাগল আবার। আবছা আলোকিত হলঘরে অগোছাল হয়ে রয়েছে কিছু বাক্স, ওগুলোই গোছাচ্ছিল বোধহয়, ঘণ্টা শুনে দরজা খুলতে এসেছে।

বিনীত গলায় বলল কিশোর, না, স্যার, এত তাড়াতাড়ি নিরামিষ ধরার ইচ্ছে নেই। আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।

কথা? বেশ, অফিসে এসো। সব অগোছাল হয়ে আছে, দেখেশুনে পা ফেলো। তোমরা লীগে যোগ দিলে খুব খুশি হতাম, অনেক সাহায্য করতে পারতে।

বাক্স, বই, ফাইলিং কেবিনেট, গাদা গাদা বিজ্ঞাপন আর পোস্টার ছড়িয়ে রয়েছে সারা ঘরে, ওগুলোর মাঝ দিয়ে সাবধানে পা ফেলছে ওরা।

ওক কাঠের ভারি দরজা খুলে বড় অরেকটা রোদে-উজ্জল ঘরে ছেলেদের নিয়ে এল ডাংম্যান, এটাই অফিস। প্রাচীন একটা ডেস্কে বসে দুটো প্রাগৈতিহাসিক চেয়ার দেখিয়ে মেহমানদের বসতে বলল।

বলো, কি বলতে এসেছ?

শুনলাম, আপনাকে নাকি মারতে চেয়েছিল? বলল কিশোর।

আর বোলো না, পাগল। বদ্ধ উন্মাদ। দুই জন। এমন হঠাৎ করে মঞ্চে লাফিয়ে উঠল। বক্তৃতা দিচ্ছিলাম তখন। কোন মতে নিজেকে বাঁচিয়েছি। ঠেলাঠেলি, হই-চই জুড়ে দিল মেম্বাররা, পুলিশ ডাকতে গেল, অথচ দুজনকে ধরার কথা মনে এল না কারও। পালাল।

আক্রমণ করেছিল কেন, স্যার? জিজ্ঞেস করল রবিন।

জানি না।

কিছু বলেছে? কিশোর প্রশ্ন করল।

বলেছে, তবে ইংরেজি নয়। অনেক চেঁচামেচি, বকবক করেছে, কি বলেছে ওরাই জানে। একটাকে জাপটে ধরেছিলাম, কিন্তু রাখতে পারলাম না, ঝাড়া দিয়ে ছুটে গেল। পুলিশ আসার আগেই পালাল দুব্যাটা। হয়তো ফ্যানাটিক হবে, নিরামিষভোজীদের দেখতে পারে না। ও-রকম অনেকের পাল্লায় পড়েছি আগেও। কত রকম লোক যে আছে দুনিয়ায়। মতের মিল হলো না, ব্যস, ধরে মারো ব্যাটাকে, এমন অনেক আছে।

জানি। তবে ওদের দুজনের কথা যা শুনলাম, ফ্যানটিক মনে হচ্ছে না।

অবাক হলো ডাংম্যান। নয়? তাহলে কেন মারতে এল? তোমরা অন্য কিছু ভাবছ, অন্য কারণ?

হ্যাঁ, স্যার, আমরা ভাবছি… বলতে গিয়ে থেমে গেল রবিন।

মৃদু একটা শব্দ হয়েছে।

ডাংম্যানও শুনছে, চোখ কুঁচকে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে শব্দের উৎস আবিষ্কারের জন্যে।

বীপ-বীপ-বীপ! বীপ-বীপ-বীপ!

ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল কিশোর। মাপ করবেন, স্যার, আমাদের এখুনি বাইরে যেতে হচ্ছে। আসছি। রবিন, এসো।

তাড়াতাড়ি এসো, ডাংম্যান বলল। পেদ্রোজ এস্টেটে যাব। রোজই যাই মিস পেদ্রোর সঙ্গে দেখা করতে। তার সাহায্য না পেলে এখানে কিছুই করতে পারতাম না।

আসছি, স্যার, ঘুরে হাঁটতে শুরু করল কিশোর। পিছু নিল রবিন।

ওয়াকি-টকি সিগন্যাল দিচ্ছে। নিশ্চয় মুসা। আশেপাশে বড় বড় বিল্ডিং। শব্দঠিকমত ধরা যাবে না। খোলা জায়গা খুঁজল কিশোর। বাগানটা চোখে পড়ল, উজ্জ্বল রোদ। একটা ঝোপের ধারে ছায়ায় চলে এল দুজনে।

হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ে সুইচ টিপল কিশোর। ফার্স্ট বলছি। সেকেণ্ড, শুনছ? ফাস্ট, শুনছ? ওভার।

শুনছি। বলো। ওভার, জবাব দিল কিশোর।

কিশোর? মুসার দুর্বল কণ্ঠ উত্তেজিত। ভূত-থেকে-ভূতে খবর দিয়েছে। এইমাত্র। একটা ছেলে লোক দুটোকে দেখেছে। ঝরঝরে গাড়িটা লা পামা স্ট্রীটের…।

কিশোর! চেঁচিয়ে উঠল রবিন। ওই যে, আসছে!

লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল কিশোর। রিসিভারের বোতাম থেকে আঙুল সরে গেল, কেটে গেল বেতার যোগাযোেগ। স্তব্ধ হয়ে গেল মুসার কণ্ঠ।

সেকথা ভাবার সময় নেই এখন কিশোর আর রবিনের। ওদের সাইকেলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সেই বাদামী চামড়াদের একজন, পরনে বিচিত্র সাদা পোশাক। আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সদর দরজা আর ঝোপটার মাঝামাঝি জায়গায়। দুজনের হাতেই দুটো বড় বাঁকা ফলাওয়ালা ছুরি।

ছেলেরা ওদের দেখে ফেলতেই রওনা হলো দুজনে। ভীষণ ভঙ্গিতে ছুরি নেড়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল।

গেটের দিকে যাওয়ারও উপায় নেই, বাড়িতে ঢোকার পথও রুদ্ধ।

দৌড় দাও! চেঁচিয়ে বলল কিশোর। সোজা পাহাড়ে!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *