০৮. চিড়িয়াখানায় অন্ধকারে হায়েনার হাসি

চিড়িয়াখানায় অন্ধকারে হায়েনার হাসি শুনেছে কিশোর, হাসিটা অনেকটা সেরকম লাগল তার কাছে।

ওটাই! গলা কেঁপে উঠল মুসার। ভূতের ছায়া। আজ অন্যরকম লাগছে!

মানে?

সেদিনের মত কুঁজো নয়। তবে হাসিটা একরকম।

জলদি করা দরকার। নইলে হারিয়ে ফেলব। চলো।

উঠে, টিলার উল্টো ধার দিয়ে দ্রুত নেমে এল ওরা। বনের দিকে ছুটল। যে পথ ধরে ছায়াটা গেছে, সে-পথ ধরে। যতখানি কাছে থেকে স্তব অনুসরণ করতে চায়।

ফিরে তাকাল না ছায়াটা, লম্বা লম্বা পা ফেলে একভাবে এগিয়ে চলেছে। থেমে গেছে বুনো হাসি।

মাইলখানেক পর ঘন হতে শুরু করল বন। এগিয়েই চলেছে ছায়া। আরও খানিকদ্দূর এগিয়ে মোড় নিল, মূল পথ থেকে সরে গেল একটা গলিপথে।

সরু এই পথটা গিয়ে পড়েছে বাটি-আকৃতির ছোট একটা উপত্যকায়। খোয়া বিছানো কাঁচা পথ চলে গেছে উপত্যকার বুক চিরে, পথের শেষ মাথায় ছোট, পুরানো একটা কাঠের বাড়ি। চারপাশে ঘেরা বারান্দা, খড়খড়ি লাগানো জানালা, পাথরে তৈরি চিমনি।

শিকারীর বাংলো গোছের কিছু, বলল কিশোর। হান্টিং লজ।

দেখো!

আড়াল থেকে বেরিয়ে কালো মস্ত আরেকটা ছায়া এগিয়ে আসছে বাড়ির দিকে। আরও কাছে আসার পর কানে এল এঞ্জিনের শব্দ। ট্রাক, হেডলাইট নিভানো। যেন উড়ে এসে ট্রাকটা থামল ছায়ামূর্তির কাছে, কেবিন থেকে লাফিয়ে নামল বেঁটে, ভারি একটা লোক। দ্রুত, চাপা গলায় কথা হলো কিছু, তারপর ঘুরে ট্রাকের পেছনে গিয়ে টেইল-বোর্ড নামাল লোকটা।

পেছন থেকে নামল চারটে বেঁটে মূর্তি।

ওদেরকে এক সারিতে দাঁড় করাল লোকটা। আগে আগে বাড়িটার দিকে চলল, সে, পেছনে অন্যেরা।

লম্বা ছায়াটা আগেই গিয়ে উঠেছে বারান্দায়। আলো জ্বেলে দিল।

খাইছে! আঁতকে উঠল মুসা। কি ওগুলো?

খুবই বেঁটে চারটে মূর্তি, মাথা নেই।

মাথা! মাথা গেল কই! গলা কাঁপছে মুসার।

আ-আমি জানি না! কিশোর পাশাও কথা হারিয়ে ফেলেছে। ও-ওরা, মনে তো হচ্ছে, মুশূন্য বামন…

অন্ধকারে একে অন্যের মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল দুই কিশোর।

হচ্ছে কি এখানে? মুসার জিজ্ঞাস।

জানি না, গলা শুকিয়ে গেছে গোয়েন্দাপ্রধানের। কাছে গেলে বোঝা যাবে। চলো, জানালা দিয়ে উঁকি দিই।

ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করল দুজনে।

হঠাৎ আবার বিস্ফোরিত হলো যেন ভয়াল হাসি, ঠিক তাদের পাশে।

কোনরকম ভাবনা-চিন্তার অবকাশ নেই আর। পাঁই করে ঘুরে দিল দৌড় দুজনে, যে পথে এসেছে, সে-পথে। পেছন ফিরে তাকানোর সাহস হারিয়েছে।

 

উত্তেজিত হয়ে লাইব্রেরি থেকে বেরোল রবিন। জবর খবর জেনেছে।

দ্রুত হেডকোয়ার্টারে এসে ঢুকল সে। কিন্তু মুসা আর কিশোর ফেরেনি। এলেই যেন বাড়িতে ফোন করে, ওদের জন্যে মেসেজ রেখে বেরিয়ে এল রবিন। বাড়ি চলল।

টেলিভিশনে স্থানীয় সংবাদ শুনছেন মিস্টার মিলফোর্ড। লস অ্যাঞ্জেলেসের একটা বিশিষ্ট পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ করেন তিনি, কাজেই রেডিওটেলিভিশনের যে কোন খবর শোনা পারতপক্ষে বাদ দেন না। বাড়িতে থাকলে তো নয়ই।

রান্নাঘরে মাকে খুঁজে পেল রবিন।

এক গ্লাস দুধ আর কয়েকটা বিস্কুট এগিয়ে দিলেন মিসেস মিলফোর্ড। লাইব্রেরি থেকে এলি?

হ্যাঁ, বলল রবিন। মা, কিশোর কোন মেসেজ দিয়েছে?

না-তো।

অ। রান্নাঘরের টেবিলে বসে খেতে শুরু করল রবিন।

এই সময় বাবা ঢুকলেন সেখানে। কি যে হচ্ছে আজকাল, অনিশ্চিত কণ্ঠস্বর, কাউকে উদ্দেশ্য করে বলেননি। রকি বীচেই আজ একটা লোককে মারার চেষ্টা হয়েছিল। পাবলিক হলে, লোকজনের সামনে।

রকি বীচে? আঁতকে উঠলেন মিসেস মিলফোর্ড। সাংঘাতিক কাণ্ড ! কে? কাকে?

আর বলো না, কোন চরমপন্থী হবে। যাকে আক্রমণ করা হয়েছিল, সে এক নিরামিষভোজী সঙ্রে প্রেসিডেন্ট, আরেক পাগল। ভক্তদের সামনে বক্তৃতা দিচ্ছিল, এই সময় সাদা, বিচিত্র পোশাক পরা দুই নোক মঞ্চে উঠে আক্রমণ করে বসল। দুজনেরই বাদামী চামড়া।

গলায় দুধ প্রায় আটকে গেল রবিনের। একটু কেশে পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, বাদামী চামড়া?

তাই তো বলল।

প্রেসিডেন্ট ব্যথা পেয়েছে? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস মিলফোর্ড।

না। লোক দুটোকে ধরা যায়নি। পালিয়েছে।

নাম কি ওর, বাবা? জিজ্ঞেস করল রবিন।

কার নাম?

ওই যে, নিরামিষভোজী প্রেসিডেন্ট।

ডাংম্যান। কি ডাংম্যান যেন।

কোন সন্দেহ থাকল না আর রবিনের, পুতুল ছিনতাইকারীরাই আক্রমণ করেছে। নিরামিষভোজীদের প্রেসিডেন্টকে। দুই ঢোকে বাকি দুধটুকু শেষ করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল সে। টেলিফোন করবে। একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেছে, বাদামী। লোকগুলো যে-ই হোক, সাংঘাতিক কোন উদ্দেশ্য রয়েছে তাদের।

রিঙ হয়েই চলেছে হেডকোয়ার্টারে। কিন্তু ধরছে না কেউ। তারমানে ফেরেনি এখনও মুসা আর কিশোর।

 

হুমড়ি খেয়ে ঝোপের ভেতর পড়ে রয়েছে দুই গোয়েন্দা। হাঁপাচ্ছে জোরে জোরে। কাটা, ভাঙা শুকনো ডালের মাথার খোঁচা আর আঁচড় লেগে ছিলে গেছে গায়ের চামড়া। পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়েছে কয়েকবার, দুই হাঁটুর চামড়াও ক্ষতবিক্ষত। তবে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে রহস্যময় কাঠের বাংলো।

পাগলা-ভূতটা তাদের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।

সাবধানে মাথা তুলে পেছনে তাকাল মুসা। কিশোর, কিছু দেখতে পাচ্ছ? .

না। এখানে আমরা নিরাপদ।

আমার তা মনে হচ্ছে না। কি ওগুলো? মুশূন্য বামনগুলো?

সহজ কোন ব্যাখ্যা নিশ্চয় আছে, অস্বস্তিবোধ পুরাপুরি যাচ্ছে না কিশোরের। ভাল মত দেখারই তো সুযোগ পেলাম না। ফিরে গিয়ে আবার যদি…

পারলে তুমি যাও, হাত নাড়ল মুসা। আমি নেই। একে তো পাগলা হাসি, তার ওপর ওই মাথাছাড়া… কেঁপে উঠল সে। আল্লাহগো, বাঁচাও !

জোরে নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। হাসিটা অবশ্য বিকটই, ভয় লাগে।

খালি ভয়? চলো পালাই। আবার এসে পড়লে, ভয়ে ভয়ে পেছনে তাকাল। মুসা।

নীরব হলো কিশোর। গভীর ভাবনায় ডুবে গেছে।

উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছে গোয়েন্দা-সহকারী।

অবশেষে বলল কিশোর, আমার মনে হয়, সব কিছুর মধ্যেই যুক্তি রয়েছে, মুসা। বাদামী চামড়ার সেই মূর্তিচোর লোকটা, এই ভূতের হাসি, মুশূন্য বামন…

কি যুক্তি?

সেটাই জানতে হবে। তবে এখন আমাদের বাড়ি যাওয়াই ভাল।

হ্যাঁ, এইটা হলোগে কাজের কথা।

অন্ধকারে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল মুসা। এই একটা কাজে সে বিশেষ পারদর্শী। একবার কোন পথে গেলে সেটা সহজে ভোলে না, কি করে যেন ঠিক চিনে নেয়। কিশোরের খুব অবাক লাগে মাঝে মাঝে।

চলছে ঠিক পথেই, তবে গতি ধীর।

যেখানে দিয়ে ঢুকেছিল দেয়ালের সেই জায়গাটার কাছে এসে থামল দুজনে।

ঝোপের ভেতর থেকে ব্যাগটা বের করল মুসা।

হুক ছুড়ে মারল কিশোর। একবার, দু-বার, তিনবার, আটকাতে পারছে না, অথচ তখন একবারই কাজ হয়ে গিয়েছিল। তবে তখন আলো ছিল।

দেখি, আমার কাছে দাও, হাত বাড়াল মুসা। প্রথমবারে সে-ও পারল না, কাজ হলো দ্বিতীয়বারে। টেনেটুনে দেখল দড়িটা না, খুলে আসবে না। উঠতে গিয়েই স্থির হয়ে গেল। নীরবতার মাঝে রাইফেলের বোল্ট টানার ক্লিক শব্দটা বড় বেশি করে কানে বেজেছে।

এই সরে এসো! কঠিন আদেশ শোনা গেল।

পথের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে লম্বা একটা মূর্তি, হাতের রাইফেল এদিকে ফেরানো।

কিছু করার নেই। দেয়ালের কাছ থেকে সরে এল দুই কিশোর, পথে উঠল। মূর্তিটার কাছে এসে বলে উঠল কিশোর, টনি, আমি কিশোর, ও মুসা।

রাইফেল সরাল না টনি। সন্দেহ যাচ্ছে না। শীতল কণ্ঠে বলল, এখানে কি করছ?

টনি, অধৈর্য হয়ে বলল মুসা, কি করছি ভালমতই জানো। সোনার পুতুল খুঁজছি।

এই অসময়ে? ধমকের সুরে বলল টনি। অন্ধকারে চোরের মত? কই, আজ আবার আসবে বলোনি তো। সত্যি করে বললো, কেন এসেছ?

কি জ্বালা! বললাম তো পুতুল খুঁজতে, জবাব দিল কিশোর। ভাবলাম, গেটের কাছে হারিয়েছে যখন, অন্ধকারে চোরটা আবার ফিরে আসতে পারে ওখানে। কণ্ঠস্বর পাল্টে গেল। টনি, পুতুল খোঁজার অনুমতি আমাদেরকে দিয়েছেন তোমার দাদী, নাকি?

দ্বিধায় পড়ে গেল টনি। তোমাদের বিশ্বাস করব কিনা ভাবছি।

তোমাকেও তো অবিশ্বাস করতে পারি আমরা! রেগে গেল মুসা। আমরা যে তিন গোয়েন্দা, অনেক আগে থেকেই জানো তুমি। আমাদের কার্ড পেয়েছ।

থামানোর জন্যে মুসার পায়ে লাথি মেরে বসল কিশোর, কিন্তু লাভ হলো না, ধনুক ছেড়ে বেরিয়ে গেছে তীর।

কি করে জানলে?

আর মিথ্যে বলে লাভ নেই, সত্যি কথাই বলল মুসা।

না, নরম হলো টনির গলা, রাইফেল নামাল, তোমরা চালাক ছেলে। হ্যাঁ, তোমাদের কার্ড পেয়েছি, গেটের কাছে। ডাংম্যানকে সেকথা বললাম। যা করার বুঝেশুনে করতে বলল আমাকে। দাদীর উকিলকে জিজ্ঞেস করলাম তোমাদের কথা। সে আমাকে টেরিয়ার ডয়েলের কাছে পাঠাল, সেকথা আগেই বলেছি। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, মাল বিক্রির ছুতোয়ই তোমাদেরকে এস্টেটে নিয়ে এসেছিলাম, চাইছিলাম, পুতুল খোঁজার কাজটা দাদী তোমাকে দিক।

তুমি ভেবেছিলে আমরা চুরি করেছি, ঝাঁঝাল মুসার কণ্ঠ।

যা, স্বীকার করল টনি, কিছু মনে করো না। মিস্টার ডাংম্যানকে সে-কথাও বলেছি। সে বলল, তা না-ও হতে পারে। চোর হয়তো তাড়াহুড়োয় পুতুলটা গেটের কাছে ফেলে গেছে, তোমরা কুড়িয়ে পেয়েছ। তাই ঠিক করলাম, পুরস্কার ঘঘাষণা করে পুতুল ফেরত দেয়ার সুযোগ করে দেব তোমাদের।

ওসব ঝামেলা না করে, বলল কিশোর, খোলাখুলি বললেই ভাল করতে।

ওই যে, মিস্টার ডাংম্যান বলল, তোমরা চোর না-ও হতে পারো।

কুড়িয়ে পেয়েছি কিনা, সেটাও তো জিজ্ঞেস করতে পারতে?

সেটাও আলোচনা করেছি আমরা। মিস্টার ডাংম্যান বলল, তোমরা স্বীকার করবে না। ভয় দেখালে কোন দিনই আর দেবে না পুতুলটা।

তাই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, আনমনে বলল কিশোর। পুরস্কার ঘোষণা করালে। এমন ভাব দেখালে, যেন জানোই না পুতুলটা আমাদের কাছে আছে।

হ্যাঁ। এখন তো সব খোলাখুলি হয়ে গেল। দিয়ে দাও না ওটা। তুমিই তো পেয়েছ?

রবিন আর মুসা পেয়েছিল।

পেয়েছিল?

হ্যাঁ। হারিয়েছি আবার। সকালে বাদামী চামড়ার এক লোক কেড়ে নিয়ে গেছে।

মাথা নাড়ল কিশোর। না, ফেরত পাওয়ার সুযোগ এখনও আছে। লোকটাকে খুঁজে বের করতে পারলেই…

শব্দ করে হাসল টনি। আমার সাহায্য নেবে? তোমাদের সঙ্গে কাজ করতে খুব ভাল লাগবে আমার।

হ্যাঁ, একটা সাহায্যই করতে পারো, বলল কিশোর। চোখ খোলা রাখো, এস্টেটে কারা আসে যায় খেয়াল রাখো।

ঠিক আছে।

এখন আমাদের বাড়ি যাওয়া দরকার। দেরি হয়ে গেছে।

গেট দিয়ে ওদের বের করে দিল টনি।

অন্ধকার গিরিপথ ধরে সাইকেল চালিয়ে চলল দুই গোয়েন্দা।

কিশোর, একসময় জিজ্ঞেস করল মুসা, আমরা যে ভূত দেখেছি, টনিকে বললে না কেন?

ওকে বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার ধারণা, কিছু একটা গোপন করছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *