৫. অবিবাহিতদের কবরস্থান

অবিবাহিতদের কবরস্থান

শরীরের আত্মা পানি করে দেওয়ার মত জায়গার অভাব নেই আমেরিকায়। এদের মধ্যে কোনো কোনোটা এতটাই চমকে দেবে আপনাকে যে মনে হবে ওখানটায় গিয়ে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে। আর এটা হওয়ার কারণ আতংক এভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে যে নাড়ীর স্পন্দন টের পাবেন না। এমন জায়গার উদাহরণ হিসাবে ইলিনয়েসের শিকাগোর ব্যাচেলর গ্রোভ গোরস্থানের নাম থাকবে একেবারে উপরের সারিতেই।

এই ভুতুড়ে গোরস্থান কোনো কারণ ছাড়াই পুরু কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যায় অনেক সময়। নানা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে এখানে। চোখে পড়ে ভয়াবহ সব দৃশ্য। তাই যারা অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন আর প্রচণ্ড মানসিক শক্তির অধিকারী তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এটি। এখানে সব সময় যে কিছু দেখবেনই তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে অনুভব করবেন অশুভ কিছু একটার উপস্থিতি। কখনও কারও মৃদু স্পর্শ পাবেন, কিন্তু আশপাশে কারও চেহারা দেখবেন না। তারপর আবার কোনো কোনো জায়গায় হঠাৎ করেই তাপমাত্রা বিশ ডিগ্রী নেমে হাড়ে কাপ ধরিয়ে দেবে আপনার। এখানকার ভৌতিক কাণ্ডকীর্তির আরও কিছু বর্ণনা দেওয়ার আগে বরং এই সমাধির ইতিহাসটা একটু জেনে নেওয়া যাক। কারণ অনেকেরই ধারণা এখানকার সব অদ্ভুতুড়ে ঘটনার পিছনে এর নাটকীয় ইতিহাসেরও ভূমিকা আছে।

এই গোরস্থানে ১৮২০-২১ সালের সমাধিফলকও খুঁজে পাবেন। যদিও সরকারীভাবে এটি সমাধিস্থলের মর্যাদা পায় ১৮৪৪ সালে। ১৯৬০-এর দশকের পর থেকেই এখানে আর নতুনভাবে কাউকে গোর দেওয়া না হলেও একে ঘিরে অশুভ কাণ্ড-কীর্তি কমেনি একটুও। বরং এতে যেন এখানে আস্তানা গাড়া আত্মাদের সাহস আরও বেড়েছে। এই সমাধিস্থলের নাম ব্যাচেলার গ্রোভ হওয়ার উত্তর খুঁজে পাবেন এর ইতিহাসে। এখানে মূলত কবর দেওয়া হত এই এলাকায় আস্তানা গাড়া অভিবাসীদের। এদের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি ছিলেন জার্মানরা, ইলিনয়েস-মিশিগান খাল খননে কাজ করছিলেন যাঁরা। আর এদের মধ্যে অনেকেই কবর দেওয়ার সময়ও ছিলেন অবিবাহিত। আর তাই এই সমাধিস্থলটির নাম হয়ে যায় ব্যাচেলর গ্রোভ বা অবিবাহিতদের গোরস্থান।

কবরস্থানটিকে ঘিরে আছে ছোট্ট একটা লবণাক্ত পানির হ্রদ। আর এই এলাকায় রাজত্ব করা গুণ্ডাপাণ্ডাদের খুব পছন্দের জায়গা ছিল এই হ্রদ। কারণ কারও সঙ্গে গোলমাল বাধলেই মেরে. এই লেকে গুম করে ফেলত তারা। এমন অনেক মৃতদেহই এখানে ভেসে থাকতে দেখেছে লোকেরা। বলা হয় গোরস্থানে যেসব আত্মারা হানা দেয় তাদের মধ্যে হ্রদে মারা যওয়া লোকদের আত্মারাও রয়েছে।

শিকাগোর শহরতলী মিডলথিয়ানের কাছেই গোরস্থানটা। নুড়ি বিছানো একটা পথ চলে গেছে অশুভ এই কবরস্থানটির দিকে। আর এই পথ ধরে হাঁটার সময়ই বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ শুরু হয়ে যায় লোকেদের।

শিকাগোর সাইকিক রহস্যভেদী কেন মেলভয়েন-বার্গ আর শিকাগো ট্রিবিউন পত্রিকার এক রিপোর্টারের নাড়ীর স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল এখানেই। ২০০৬ সালের এক রাতে হানা দিয়েছিলেন অসম সাহসী এই দুজন গোরস্থানে। ভিতরে ঢুকতে না ঢুকতেই শুরু হয় নানা রহস্যময় ঘটনা। তারপরই ছোট্ট একটা ছেলের আত্মার মুখোমুখি হন তারা। ছেলেটার কান্নার শব্দ শুনতে পান পরিষ্কার। তার হারানো রূপার মুদ্রাটি খুঁজে বের করে দেওয়ার জন্য পই পই করে তাদের অনুরোধ করতে থাকে সে।

রিপোর্টারটি এমনিতেই বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তারপরই দেখলেন সাইকিক রহস্যভেদীটি যেন হঠাৎ একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন। সবুজ থকথকে কাদায় ভর্তি একটা পুকুরের দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন। তারপরই পনিতে নেমে পড়লেন। পা হাঁটু পর্যন্ত না ডোবা পর্যন্ত এগুলেন। এবার সবুজ শৈবালে ভরা পানির মধ্যে দু-হাত চুবিয়ে দিলেন। একটু পর যখন হাত তুললেন। সেখানে কাদা লেপা ছোট্ট কী একট জিনিস। পরিষ্কার করতেই বেরিয়ে এল এটা ১৯৪২ সালের আধ ডলারের একটি রৌপ্য মুদ্রা। আরও আশ্চর্য ব্যাপার; কণ্ঠটা তাদের এখানেই খুঁজতে বলেছিল মুদ্রাটা।

ব্যাচেলর গ্রোভে হানা দেয়া কৌতূহলী অনেক লোকই গল্প করেন ভুতুড়ে একটা খামার বাড়ির। এই দেখা যায় তো পর মুহূর্তেই আবার অদৃশ্য হয়ে যায় ওটা। তবে সবার বর্ণনাতেই বাড়িটার একই আদল পাওয়া যায়। বিশাল খাম্বাসহ রোয়াকের সাদা একটি বাড়ি ওটা। পাক খেতে-থাকা মৃদু একটা আলো জ্বলতে দেখা যায় জানালায়। তবে বাড়িটাকে কখনও একই জায়গায় দেখা যায় না। কেউ ওটার কাছে যাওয়া শুরু করলেই ভোজবাজির মত অদৃশ্য হয়ে যায়। রাতে তো বটেই দিনের আলোতেও দেখা গেছে বাড়িটা। কিন্তু পুরানো দিনের দলিলদস্তাবেজ আর ফাইলপত্র ঘেঁটে এই এলাকায় এমন কোনো বাড়ির অস্তিত্বের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে দৰ্বত্তরা সমাধিফলক উপড়ে ফেলা আর চিত্রকর্ম শাভিত ভাস্কর্য নষ্ট করা আরম্ভ করলে গোরস্থান জুড়ে এক ধরনের লাল আলো দেখতে শুরু করে দর্শনার্থীরা। কখনও কখনও প্রচণ্ড গতিতে লোকেদের অনুসরণ করে, কখনও আবার বাতাস ভেদ করে চলে যায়। অভিজ্ঞ অতিপ্রাকৃত ঘটনা বিশেষজ্ঞ আর ওয়্যার্ড শিকাগোর ( শিকাগোর বিভিন্ন ভৌতিক আর রহস্যময় জায়গা ঘুরিয়ে দেখায় এই প্রতিষ্ঠানটি) লোকেরাসহ আরও অনেকে বার বরই হানা দিয়েছেন রহস্যময় এই জায়গাটিতে। এমনই এক অভিযানের সময় ক্রিঞ্জ নামের ধারাবাহিকটির একটি পর্ব ধারণ করা হয়।

নড়বড়ে, ভেঙে পড়া সব সমাধি ফলকের মাঝখানে ক্যামেরাগুলো স্থাপন করেন প্রযোজক ট্রয় টেইলরসহ অন্যান্য কর্মীরা। আর এই চিত্রগ্রহণের সময় বেশ কিছু ডিজিটাল ফুটেজ কোনো কারণ ছাড়াই নষ্ট হয়ে যায়। আতংকে অবশ হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয় কর্মীদের। কারণ এ ধরনের অভিজ্ঞতা ব্যাচেলর গ্রোভে আসার আগে আর কখনও হয়নি তাদের। পরে এর দ্বিতীয় একটা পর্ব তৈরি করতে গিয়ে ক্যামেরাসহ নানান ধরনের যান্ত্রিক গোলমালের কারণে পুরোপুরি ভেস্তে যায় কাজ।

তবে এই কবরস্থানে লোকেদের সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে রাখে সাদা পোশাক পরা এক নারী। অনেক মানুষই তাকে দেখেছেন। একটা সমাধি ফলকের উপরে বসে থাকেন, আর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন সামনের গাছপালায় ঠাসা জঙ্গুলে জায়গাটির দিকে। শিকাগো সান-টাইমসের জুড়ি ফেলজ ক্যামেরায় বন্দি করেছেন এই রহস্যময় নারীমূর্তিকে। পূর্ণিমার রাতেও মাঝেমাঝে দেখা যায় তাঁকে। সাদা পোশাক পরা নারীটি তখন একটা মৃত নবজাতককে দু-হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে ঘুরে বেড়ান ইতস্তত কবরস্থানের ভিতরে-কেন কেউ জানে না।

১৮৭০-এর দশকে জমিতে লাঙ্গল টানতে থাকা এক লোক কুখ্যাত লেকটার খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন। আর এটাই তার কাল হয়। ঘোড়াটা প্রথম পানিতে পড়ে, সেই সঙ্গে টেনে নিয়ে যায় কৃষক আর লাঙ্গলকেও। কিন্তু ঘটনার একশো বছর পর বনবিভাগের দুজন রেঞ্জার আবার দেখেন ওই কৃষককে, হাল চাষ করছেন আগের মতই। কখনও আবার দেখা যায় দুই মাথাওয়ালা একটা ভূতকে।

আবার নুড়ি বিছানো পথটাতে প্রবেশের আগে গাড়ি চালকদের রাস্তায় একটা তীক্ষ্ণ মোড় নিতে হয়। এসময় কখনও কখনও কোনো কোনো চালক আচমকা প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসা একটা পাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যান। ওটাকে দেখে ১৯৪০ মডেলের গ্যাং স্টারদের গাড়ি বলে মনে হয়। তবে আশ্চর্য ব্যাপার গাড়িটার সঙ্গে সংঘর্ষের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পরই আবিষ্কার করেন কেউ আহত হননি, গাড়ির কোনো ক্ষতি হয়নি। এমনকী তীব্র বেগে হামলে পড়া গাড়িটারও কোনো নাম নিশানা নেই।

আবার কেউ-কেউ এমনও দাবি করেছেন এই গোরস্থানে যাওয়ার পর থেকেই দুর্ভাগ্য পিছু নেয় তাদের। এমনটাই ঘটে আমেরিকার ইলিনয়েসের এইডেন নামের এক যুবক আর তার বান্ধবীর ভাগ্যে। অন্তত এইডেনের দাবি তাই। গোরস্থানটা থেকে বের হয়ে আসার পর থেকেই একটার পর একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।

তারিখটা ছিল ২০০৪ সালের অক্টোবরের পনেরো তারিখ। এক হপ্তাহ পরেই এইডেনের জন্মদিন। এমনিতেই অদ্ভুতুড়ে ঘটনার প্রতি বেশ আগ্রহ এইডেনের। তার প্রেমিকারও এটা বেশ ভালই জানা আছে। তাই সে প্রস্তাব করল জন্মদিনের একটি উপহার হিসাবে ব্যাচেলর গোরস্থানে বেড়িয়ে আসবে তারা। পরিকল্পনাটা মনে ধরল এইডেনের। দারুণ উত্তেজিত হয়ে উঠল। উৎসাহের চোটে একটা ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডার কিনে ফেলল। সঙ্গে ডিজিটাল ক্যামেরাটাও নিয়ে নিল। ঠিক মধ্যরাতে, বারোটার দিকে বের হলো তারা বাড়ি থেকে। এইডেনের বাড়ি থেকে গোরস্থানটা দেড় ঘণ্টার রাস্তা। কাছাকাছি পৌঁছে গাড়িটা বন বিভাগের জায়গায় রেখে হাঁটতে শুরু করল তারা। গোরস্থানের কাছাকাছি আসতেই অজানা একটা ভয় আঁকড়ে ধরল দুজনকে। বেশ কয়েকটা ছবি তুলল। তারপরই হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। যত দ্রুত সম্ভব কিছু ছবি তুলে নিল, পাছে আবার পরে ছবি তোলা না যায়।

গোরস্থানে ঢুকতেই অস্বস্তি বাড়ল। এইডেনের মনে হলো তার ঘাড়ের পিছনে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। যদিও পিছন ফিরে কাউকে দেখা গেল না। মিনিট বিশেক থাকার পরই এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল দুজনে। ভয়ের হিমশীতল একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে। এদিকে গোরস্থান আর এর আশপাশের এলাকায় একটা জনপ্রাণীকেও দেখা যাচ্ছে না। গোরস্থান থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত রেকর্ডারটা চালুই রাখল। গাড়িতে ঢুকেই রেকর্ডারটা প্রথম থেকে চালু করে দিল এইডেন। আর তখনই প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেল। মনে হলো যেন কেউ ফিসফিস করে বলছে এখান থেকে বিদায় হও। আসল সমস্যা শুরু হলো বাড়িতে পৌঁছার পর। হঠাৎ করেই প্রচণ্ড কাশি হয়ে গেল এইডেনের, সেই সঙ্গে গলায় প্রচণ্ড ব্যথা। তার স্বাস্থ্য এমনিতে বেশ ভাল, আর ঠাণ্ডায় বের হওয়ার মত পোশাকও ছিল পরনে। মাত্র বিশ মিনিট গোরস্থানে থেকে শরীরের এই হাল হলো কেন ভেবে কূলকিনারা পেল না। পরদিন সকালে যখন বান্ধবী এল তখন তার কাহিল অবস্থা। গায়ে জ্বর, সেই সঙ্গে পেট খারাপ। নড়াচড়াও করতে পারছে না ঠিকমত। তার বান্ধবী ল্যাপটপ নিয়ে এলে দুজন দেখতে বসল। কোনো কোনো ছবিতে সাদা ধোয়ার মত দেখা গেল। আবার কয়েকটা ছবিতে অস্পষ্ট মানুষের মুখও দেখা যাচ্ছে।

এক মাস পর একসঙ্গে একটা ফ্ল্যাটে উঠল দুজন। এর দুই মাস পর গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ল তারা। গাড়ি দুর্ঘটনার এক মাস পর কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি হারাল এইডেনের বান্ধবী। তারপর চাকরি যাবার পালা এইডেনের। দুজনে কতগুলো ইন্টারভিউ যে দিল তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু চাকরি যেন সোনার হরিণ হয়ে গেল। পুরো বছরটাই খারাপ গেল। জ্বর, সর্দি-কাশি লেগেই থাকল। আর অ্যাপার্টমেন্টেও একটার পর একটা সমস্যা তৈরি হলো। এক বছরের মধ্যে অ্যাপার্টমেন্টে ছাড়তে বাধ্য হলো তারা। আবার এইডেনের বাবা-মার কাছে গিয়ে উঠল। তবে এবার শনির দশা কাটল। কয়েক মাসের মধ্যে চাকরি পেল দুজনেই। এরপর আর বড় কোনো সমস্যায় পড়তে হলো না। এইডেনের নিশ্চিত ধারণা এই গোরস্থানে ব্যাখ্যার অতীত কোনো একটা সমস্যা আছে। কারণ সেখানে যাবার আগে তারা দুজনেই ছিল সুস্থ-সবল। কিন্তু ফেরার সঙ্গে-সঙ্গেই একটার পর একটা সমস্যা শুরু হয়ে গেল। আর তাই এইডেন নিজে পণ করেছে আর কখনও এই অশুভ গোরস্থান না মাড়ানোর। তেমনি বন্ধুবান্ধবদেরও পরামর্শ দেয় ওদিকে যাওয়ার দুঃসাহস না দেখানোর। তবে, পাঠক কখনও যদি শিকাগো চলেই যান, অবিবাহিতদের এই গোরস্থানে যাবেন কিনা তা আপনার সিদ্ধান্ত। তবে গেলে যেতে হবে মনটাকে শক্ত করে, সব ধরনের অঘটনের জন্য প্রস্তুত হয়েই।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *