১৮. জিনা আর মুসা যেখানে রয়েছে

জিনা আর মুসা যেখানে রয়েছে, তার থেকে অনেক ওপরে বসে কিশোর আর রবিন দেখল, পর্বতের চূড়া লাল হয়ে উঠছে ভোরের কাঁচা রোদে।

সুইচ টিপে সার্চ লাইট নিভিয়ে দিয়ে বড় করে হাই তুললেন শেরিফ। সারা রাত জেগে থেকে চোখ লাল।

নড়েচড়ে বসল বোরম্যান। সারারাত পাহাড়ের ওপরে আকাশে চক্কর দিয়েছে, আরেকবার দেয়ার জন্যে তৈরি হলো।

অবাক কাণ্ড! বলল সে। হাওয়া হয়ে গেল নাকি ওরা? কোনও জায়গা তো আর বাদ রাখিনি।

গেল কই? না ঘুমিয়ে আর দুশ্চিন্তায় শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে রবিনের মুখ। মেইন লোভ ধরে নামেনি, তাহলে পুলিশের চোখ এড়াতে পারত না। আরেকটা কপ্টার যে বেরিয়েছে, তারাও কোন খোঁজ পাচ্ছে না। বাতাসে তো আর মিলিয়ে যেতে পারে না।

পাহাড়ে জঙ্গলে কোথাও লুকিয়ে আছে, ক্লান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর। অসংখ্য পোড়ো শহর আছে, ছাউনি আছে, তার মধ্যে ঢুকে বসে থাকলেও আকাশ থেকে দেখব না।

ঠিকই বলেছ, সায় দিলেন শেরিফ। দেখা যাবে না। কিন্তু আমি ভাবছি, মরুভূমিতে নেমে যায়নি তো? রোড ক্রস করে? সেটা করলে মরবে। পানিও নেই ওদের সঙ্গে, খাবারও নেই।

মরুভূমিতে নামলে দেখা যাবে? রবিন প্রশ্ন করল।

তা তো যাবেই। একেবারে খোলা। তবে অনেকখানি জুড়ে চক্কর দিতে হবে।

হেলিকপ্টারের নাক ঘুরে গেল পশ্চিমে। গাছপালার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলল মরুভূমির উদ্দেশে।

 

রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল জিনা।

সাদা হচ্ছে সূর্য, রোদের তেজ বাড়ছে।

শরীরে প্রচণ্ড ক্লান্তি, কিন্তু উত্তেজনায় ঘুম আসছে না জিনার। পঞ্চমবারের মত ঘুরে এল ট্রাকের চারপাশে। ধপ করে বসে পড়ল মুসার পাশে।

ট্রাকের ছায়ায় বসে আছে মুসা। বেশিক্ষণ থাকবে না এই ছায়া, যে হারে দ্রুত সরছে।

দুপুর তো হয়ে এল, বলল জিনা। ওরা আসছে না কেন?

বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল মুসা। ইস, যা খিদে লেগেছে না। গতকাল দুপুরের পর আর কিছু পেটে পড়েনি।

তুমি তো ভাবছ খাওয়ার কথা। আমার যে গলা শুকিয়ে কাঠ, খাবার পেলেও এখন গলা দিয়ে নামবে না।

রেডিয়েটরটাও তো লীক হয়ে গেছে। নইলে ওখান থেকে পানি নিয়ে খেতে, পারতাম।

হুঁ, কাঁধ নিচু করল জিনা। ঝট করে সোজা হলে পরক্ষণেই, চেঁচিয়ে উঠল, ও মাই গড! হলো কি আমার?

লাফিয়ে উঠল সে। ইগনিশন থেকে খুলে বের করল ফাস্ট এইড কিটস। ভেতরে একটা ডাক্তারী কচি পাওয়া গেল। উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুখচোখ।

এটা দিয়ে কি করবে? জিনার আনন্দের কারণ বুঝতে পারছে না মুসা।

কাছেই একটা ব্যারেল ক্যাকটাস দেখাল জিনা। ক্যাকটাসের ভেতরে পানি থাকেই। বৃষ্টির সময় শুঁষে নিয়ে জমিয়ে রাখে শরীরের ভেতর। শুকনো মৌসুমে কাজ চালায়, বেঁচে থাকে। আরও আগেই মনে পড়ল না কেন ভাবছি।

বেটার লেইট দ্যান নেভার, মুসা,বলল। রসাল জিনিসের সন্ধান যে পাওয়া গেছে এতেই আমি খুশি। কাঁচিটা নিয়ে দৌড় দিল সে। কুপিয়ে খুঁচিয়ে শক্ত চামড়া কেটে ভেতর থেকে দু-টুকরো নরম শাঁস বের করল। ফিরে এসে একটা দিল জিনার হাতে।

মুখে দিয়েই চেহারা বিকৃত করে ফেলল দুজনে।

বুঝতে পারছি না কোনটা খারাপ, তিক্ত কণ্ঠে বলল মুসা। পিপাসায় মৃত্যু…নাকি এটা?

চুষে চুষে সবটুকু রস খেয়ে ছোবড়াটা ফেলে দিল জিনা। মাথার ওপর উঠে এসেছে সূর্য। ছায়া নেই। ট্রাকের নিচে ঢুকতে হবে, আর কোন উপায় নেই, বলল সে। কপ্টার এলে ট্রাকটা দেখতে পাবে, আমরাও তখন বেরিয়ে আসতে পারব।

ক্রল করে ট্রাকের তলায় চলে এল দুজনে।

আরে, বেশ ঠাণ্ডা তো এখানে, হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল জিনা!

ক্যাকটাসের রস খেয়ে আর ছায়ায় শুয়ে সামান্য ভাল বোধ করছে ওরা। দূর থেকে ভেসে এল কি এক নাম না জানা মরু-পাখির বিষণ্ণ ডাক।

কনুই দিয়ে আস্তে করে জিনার পাজরে গুতো দিল মুসা, ইঙ্গিতে দেখাল।

বানির তলা থেকে মাথা তুলেছে একটা ক্যাংগারু-ইদুর, সতর্ক চোখে দেখল কয়েক মুহূর্ত, বিপদ নেই বুঝে বেরিয়ে এল। আরও কয়েক সেকেণ্ড চুপচাপ থেকে হঠাৎ মস্ত লাফ দিয়ে ছুটে গেল এক দিকে, বোধহয় খাবার দেখতে পেয়েছে।

কোথা থেকে জানি, যেন মাটি খুঁড়ে উদয় হলো কয়েকটা গিরগিটি, ট্রাকের নিচে এসে ঢুকল গুটিগুটি পায়ে, খাবার খুঁজছে।

চারপাশে সাদা বালির সমতল বিস্তার, আগুন হয়ে উঠেছে। মরুর তপ্ত বাতাসে একধরনের অদ্ভুত ঝিলিমিলি, মনে হচ্ছে যেন কাঁপছে বাতাস।

সময়ের হিসেব রাখেনি ওরা, ঠিক কতক্ষণ পর বলতে পারবে না, মাথা তুলল মুসা। কান পেতে শুনছে।

জিনাও মাথা তুলল। হ্যাঁ, আমিও শুনছি। অনেক দূরে। কপ্টারের এঞ্জিনই। চেঁচিয়ে উঠল, আসছে, ওরা আসছে!

তাড়াহুড়ো করে ট্রাকের নিচ থেকে বেরোল দুজনে। কিন্তু মিলিয়ে যাচ্ছে শব্দ।

আকাশের দিকে মুখ তুলে আঁতিপাতি করে খুঁজল, কিন্তু গাঢ় নীলের মাঝে কোথাও কোন কলঙ্ক নেই।

কিন্তু শুনলাম তো, হতাশ কণ্ঠে বলল জিনা।

শুনেছি আমিও, কান পেতে আছে মুসা।

শোনা যাচ্ছে না আর শব্দটা।

এদিকে কেন এল না? কেঁদে ফেলবে যেন জিনা। আর বেশিক্ষণ টেকা যাবে। মরব।

ভেঙে পড়ছ কেন এখনই? আসবে ওরা আমাদের খুঁজে বের করবে… বলল বটে, কিন্তু নিজেই ভরসা পাচ্ছে না মুসা, গলায় জোর নেই।

কয়েক মিনিট পর আবার শোনা গেল শব্দটা; দূরে, আওয়াজ বাড়ছে আস্তে আস্তে। সাদাটে-নীল দিগন্তে দেখা দিল কালো একটা বিন্দু।

এগিয়ে আসছে কপ্টার। লাফিয়ে উঠল জিন আর মুসা, পাগলের মত হাত নেড়ে, চেঁচিয়ে ওটার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাল।

দেখতে পেল হেলিকপ্টার। দ্রুত নাক ঘুরিয়ে কাত হয়ে ছুটে এল সাঁ করে।

বালিতে ঘূর্ণিঝড় তুলল কপ্টারের পাখা, তার ভেতর দিয়েই মাথা নুইয়ে দৌড়ে গেল জিনা আর মুসা।

তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে হাঁসফাঁস করছেন সুলদেহী শেরিফ। তোমরা ঠিক আছ? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

ধাক্কা দিয়ে আরেকটু হলে তাঁকে ফেলেই দিয়েছিল রবিন আর কিশোর, কে আগে নামবে সেই প্রতিযোগিতা। ছুটে এল দুহাত তুলে। আনন্দে কে যে কাকে জড়িয়ে ধরল সে হুঁশ থাকল না।

সবার আগে সামলে নিল জিনা। শেরিফকে বলল, ডাকাতদুটো ওদিকে পালিয়েছে। পায়ে হেঁটে গেছে।

ট্রাক ভেঙে পড়ার পরই ভেগেছে, যোগ করল মুসা!

তাড়াতাড়ি আবার গিয়ে কপ্টারে উঠলেন শেরিফ। পাশে কাত হয়ে কিছু বললেন পাইলটকে।

মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে রেডিওর ওপর ঝুঁকল বোরম্যান। বোধহয় হাইওয়ে পেট্রোলকে খবর জানাচ্ছে। জানালা দিয়ে মুখ বের করে এঞ্জিনের গর্জন ছাপিয়ে চেঁচিয়ে বলল, তোমরা থাকো এখানে। মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি, আরেকটা হেলিকপ্টার আসছে। ব্যাটাদের ধরতে চললাম আমরা। পানির একটা ক্যান্টিন। বাড়িয়ে দিল মুসার দিকে।

উড়াল দিল আবার হেলিকপ্টার। সোজা পশ্চিমে রওনা হলো হ্যারি আর বিংগোর খোঁজে।

পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসল জিনা আর মুসা।

আমি শিওর, বেশি দূর যেতে পারেনি ব্যাটারা, জিনার কষ্ঠে সন্তোষের আমেজ।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *