১৭. সঙ্গে নেয়ার অনুরোধ

সঙ্গে নেয়ার অনুরোধ জানাল কিশোর আর রবিন। হেসে মাথা ঝাঁকাল হেলিকপ্টারের পাইলট জ্যাক বোরম্যান।

তোমাদের যাওয়া ঠিক হচ্ছে না, বললেন শেরিফ। গোলাগুলি চলতে পারে। বললেন বটে, কিন্তু সরে দাঁড়িয়ে ছেলেদেরকে ওঠার জন্যে জায়গাও ছেড়ে দিলেন।

পাইলট আর প্যাসেঞ্জার সিটের মাঝের ছোট্ট পরিসরে গাদাগাদি করে বসল রবিন আর কিশোর। প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে বসলেন শেরিফ, টেলিস্কোপিক সাইট লাগানো রাইফেলটা রাখলেন কোলের ওপর।

মস্ত ফড়িঙের মত ডানা ফড়ফড় করে আকাশে উঠল কপ্টার।

আকাশে চাঁদ, নিচে উপত্যকায় আলোর চেয়ে অন্ধকার বেশি। শূন্যে উঠেই সুইচ টিপল বোরম্যান, ফেকাসে অন্ধকারের চাদর যেন কুঁড়ে গেল সার্চলাইটের নীলচে-সাদা তীব্র আলোক-রশি। একটা লেভার দেখিয়ে শেরিফকে বলল, ওটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যেখানে খুশি আলো ফেলতে পারবেন।

সামনে ঝুঁকলেন শেরিফ। এখনও হয়তো আলো জ্বালায়নি। লেভার ঘুরিয়ে নিচের ঢালে আলো ফেললেনু।

বড় বড় পাথরের চাঙড় কিভূত ছায়া সৃষ্টি করছে। ওপর থেকে আঁকাবাকা একটা ফিতের মত লাগছে হ্যামবোনের সড়কটাকে। সবুজ গাছপালার মাঝে এখন প্রায় সাদাই দেখাচ্ছে ওটা।

ট্রাকটা এখুনি ফেলে রেখে যাওয়ার চেষ্টা করবে না, বোরম্যান বলল। এই পথেই অন্তত হ্যামবোন পর্যন্ত যাবে।

হঠাৎ মোড় নিল কপ্টার। তৈরি ছিল না, পাক দিয়ে উঠল কিশোরের পেটের ভেতর, এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা।

টুইন লেকস টু হ্যামবোন সড়কের প্রতিটি ইঞ্চি খুঁজে দেখা হলো, কিন্তু ট্রাকটা পাওয়া গেল না। এত তাড়াতাড়ি পেরিয়ে গেল? বিশ্বাস করতে পারছেন না শেরিফ। তা-ও আবার আলো না জেলে?

নড়ে উঠল রবিন।

তার দিকে তাকালেন শেরিফ, অভয় দিয়ে বললেন, ভেব না, থােকা। আমার অ্যাসিসটেন্ট জীপ নিয়ে আসছে। যাবে কোথায় ব্যাটারা?

হ্যামবোনে কপ্টার অনেক নিচুতে নামিয়ে আনল বোরম্যান। বাড়িঘরের প্রায় ছাত ছুঁয়ে উড়ে চলেছে।

ওটা কি? চেঁচিয়ে উঠলেন শেরিফ। একটা ট্রাক-খনির ছাউনিটার কাছে।

ঝুঁকে দেখে বলল কিশোর, ওটা মিসেস রোজি ফিলটারের। বিকেলেই দেখেছি আমরা, খালি। মহিলা নেই।

কি ঘটছে এসব?

আরও অনেক ব্যাপার আছে, পরে সব খুলে বলব। আগে জিনা আর মুসাকে খুঁজে বের করা দরকার।

হ্যামবোন পেরিয়ে গিয়ে থাকলে পশ্চিমের ঢালে কোথায় আছে, কোনও একটা সরু পথে। কিন্তু কোনটায় যে গেল, সেটা বোঝাই তো মুশকিল।

একটাই উপায় আছে, বলতে বলতেই কপ্টারের নাক পশ্চিমে ঘোরাল বোরম্যান। দ্রুত পেছনে পড়তে লাগল ভূতুড়ে শহর হ্যামবোন।

 

মাথার ওপরে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনছে জিনা আর মুসা। গাছের পাতার ওপর দিয়ে গিয়ে রাস্তায় নামল সার্চলাইটের আলো।

কিন্তু আলো আর ফিরে এল না ওখানে চলে যাচ্ছে হেলিকপ্টার। দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল এঞ্জিনের শব্দ।

খিকখিক করে হাসল বিংগো। এবার যাওয়া যায়। এঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে আবার পথে নামিয়ে আনল ট্রাক। আলো না জ্বেলেই আবার এগিয়ে চলল হ্যামবোনের দিকে।

একবার বেরোতে পারলে এই হতচ্ছাড়া পথে আর আসছি না, ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস টানল সে। এসে আর লাভও নেই। নিশ্চয় এতক্ষণে জোরেশোরে খুঁজতে শুরু করেছে ম্যাকআরখার, আগে না পেয়ে থাকলে কিছু যে খুঁজতে গেছি আমরা, নিশ্চয় বুঝে ফেলেছে।

দশ লাখ ডলারের বোঝাটা কতবড়? জিজ্ঞেস করে বসল জিনা।

ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল বিংগো, ফিরে তাকাল। তোমাকে কে বলেছে?

চুপ করে রইল জিনা।

সিগারেট বের করে ধরাল বিংগো। হ্যারি, এ দুটোকে কোথাও ফেলে দেয়া দরকার। এমন কোথাও, যাতে তার বাড়ি ফিরতে না পারে।

কেশে উঠে হাত নেড়ে নাকের সামনে থেকে ধোয়া ত্যাভাল জিন। এত বাজে অভ্যাস, এই ধোয়া টানা, বলল সে। ফুসফুসের দফা রফা, গলাও শেষ, কথা বললে বঙের আওয়াজ বেরোয়। হ্যাঁ, কি যেন বলছিলে, আমাদের কোথাও ফেলে যাবে? তাতে কি লাভ? ফিনিক্সে যে তোমরা ডাকাতি করেছ, তিন ডাকাত আর এক ডাকাতনী মিলে, এটা আরও লোকে জানে।

গুঙিয়ে উঠল হ্যারি। অন্য ছেলে দুটো? বোকার মত রেখে এলাম।

বোকা নয়, শুধরে দিল জিনা, বলো, গাধার মত। গর্দভচন্দ্র।

বন্দুক তুলে পেছন থেকে হুমকি দিল হ্যারি। চুপ হয়ে গেল জিনা।

হ্যামবোন থেকে উল্টো দিকের পথ ধরে নেমে চলল ওরা। লো গীয়ারে চালাচ্ছে বিংগো এক জায়গায় এসে ডানে আরেকটা শাখাপথ বেরিয়েছে, সরু পথ, বেজায় রুক্ষ।

উপচে পড়া অ্যাশট্রেতে সিগারেট টিপে নেভাল বিংগো। মূল সড়ক, যেটাতে রয়েছে সেটা দেখিয়ে জিনাকে জিজ্ঞেস করল, এটা কোথায় গেছে?

জানি না।

পেছন থেকে ডেকে বলল হ্যারি, এটা দিয়ে যাওয়া উচিত না, মন সায় দিচ্ছে। নিচে হাজারখানেক পুলিশ নিশ্চয় ঘাপটি মেরে আছে। পাশের রাস্তায় নামো।

ঘোৎ-ঘোৎ করে কি বলল বিংগো, বোঝা গেল না। মোড় ঘুরে পাশের রাস্তায় গাড়ি নামাল। কাঁচা রাস্তা, অনেক কষ্টে যেন ওখানে জন্মানো থেকে নিজেদেরকে ঠেকিয়ে রেখেছে দুপাশের গাছের জঙ্গল। গভীর দুটো খাজ, টায়ারের দাগ, তার ওপর মাঝেমাঝেই পাথর পড়ে আছে। ফলে আটকে যেতে চাইছে চাকা; জোর করে সরিয়ে আনার চেষ্টা করলেই লাফিয়ে উঠছে ভীষণভাবে।

আরেকটা সিগারেট ধরাল বিংগো, কিন্তু টানতে পারল না। গাড়ি সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে। গাল দিয়ে জ্বলন্ত সিগারেটটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরল।

আগুনসহ তো ফেলেছ, বলল জিনা। দেখো, জঙ্গলে দাবানল লেগে যায় নাকি? তাহলে পুরো পুলিশ ফোর্স ছুটে আসবে তোমাদের নাকে লাগাম পরাতে।

তীক্ষ্ণ টিটকারি নীরবে হজম করল বিংগো, জবাব দেয়ার উপায় নেই, গাড়ি সামলাতে ব্যস্ত।

মুসা আর জিনার মনে হলো অনন্ত কাল ধরে চলেছে তারা ওই পাহাড়ী পথ ধরে। মাঝে মাঝে বনের ভেতর পরিত্যক্ত কেবিন চোখে পড়ছে, কি এক গোপন রহস্য লুকিয়ে রেখেছে যেন অন্ধকার ঘরগুলো। হ্যামবোনের চেয়ে ছোট আর বেশি ভূতুড়ে আরেকটা শহর পেরোলেন। সামনে এক জায়গায় একটা কথােট বসে ছিল রাস্তার ওপর, মহাগভীর, কিন্তু হেডলাইটের আলো চোখে পড়তেই ভীতু শেয়ালের মত কুঁই করে উঠে গিয়ে লুকালো পাশের অন্ধকার ঝোপে। মাথার ওপর কয়েক বার হেলিকপ্টারের আলো দেখা গেল। প্রতিবারেই জঙ্গলে ট্রাক ঢুকিয়ে ফেলল বিংগো। কপ্টার দূরে সরার আগে বেরোল না। ঘুমানোর চেষ্টা করল মুসা আর জিনা, কিন্তু যা ঝাঁকুনি ঝিমানোও সম্ভব নয়, ঘুম তো দূরে কথা।

ওপরের দিকে গাড়ি উঠছে তো উঠছেই। কিন্তু অবশেষে বাঁক নিল পথ। সাপের মত একেবেঁকে খানিক দূর নেমে গিয়ে সোজা হলো।

বোধহয় বাচলাম, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল বিংগো।

স্টিয়ারিঙে হাতের চাপ যদিও শিথিল করতে পারছে না। ঢিল পড়লেই নাক ঘুরিয়ে গাছের গায়ে গুতো মারার জন্যে রওনা দেয় গাড়ি।

চাঁদ ডুবে গেছে। আকাশে শুধু তারা মিটমিট করছে, ওপরেও ছায়াপথ, নিচেও ছায়াপথ বানিয়ে রেখেছে। যতই নামছে গাড়ি, দু-ধারে সরে যেন বেশি করে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে বন, পথ চওড়া হচ্ছে।

উপত্যকায় নামল গাড়ি। সামনে আড়াআড়ি চলে গেছে আরেকটা পাকা রাস্তা। তার ওপাশে বিস্তৃত মরুর খোলা শূন্যতা।

গাড়ি থামিয়ে ডানে-বাঁয়ে তাকাল বিংগো। অল্প অল্প হাঁপাচ্ছে, বেড়েছে। ফোঁসফোসানি।

হেসে বলল হ্যারি, পুলিশ নেই। বলেছিলাম না, মেইন রোডে থাকবে ওরা। এদিকে আসব আমরা, কল্পনাও করেনি।

এখনও বলা যায় না, বিংগো খুশি হতে পারছে না। রোড ধরে যাবই না। সোজা চালাল সে। ঝাঁকুনি খেয়ে পাকা রাস্তায় উঠল ট্রাক, রাস্তা পেরিয়ে আবার ঝাঁকুনি খেয়ে নামল মরুভূমিতে।

মাথায় বাড়ি খেয়ে আঁউক! করে উঠল জিনা। মস্ত এক গর্তে পড়ে ক্যাঙারুর মত লাফ দিয়ে আবার উঠে পড়েছে গাড়ি। জিন্দেগীতে জায়গামত যাবে না এই ট্রাক।

চুপ! ধমক দিল বিংগো। অস্বস্তিতে ভুগছে। ঝাল ঝাড়ল আধপোড়া সিগারেটের ওপর, অ্যাশট্রেতে পিয়ে মারল ওটাকে। যেতেই হবে। মরুভূমি পেরোলে সামনে অন্য পথ পাবই। ওখানে পুলিশ থাকবে না।

শেষ তারাটাও মলিন হলো, মিলাল মহাশূন্যে।

ফিরে তাকাল মুসা, পেছনে পাহাড়ের চূড়ায় লালচে আভা। আঁধার কাটছে দ্রুত। খানিক পরেই উঁকি দেবে টকটকে লাল সূর্য। পাকা রাস্তা এখন অনেক পেছনে।

সামনে শিগগিরই আরেকটা পথ পাব, বিড়বিড় করে নিজেকে আশ্বাস দিল যেন বিংগো। যেটাতে…হুঁক…

চোরা গর্তে পড়ে কাত হয়ে গেছে ট্রাক। জোর হিসহিস শোনা গেল, ধোয়া বেরোতে শুরু করল রেডিয়েটর থেকে।

সব্বোনাশ! এঞ্জিন বন্ধ করে, ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে বালিতে লাফিয়ে গিয়ে পড়ল বিংগো। ঘুরে গিয়ে উঁকি দিল ট্রাকের নিচে। এঞ্জিনের সামনের অংশ থেকে বালিতে পড়ছে মরচে রঙের পানি, ময়লা করছে ধবধবে সাদা বালি।

কি হলো? হ্যারির গলার ভেতরটা সিরিশ দিয়ে ঘষেছে যেন কেউ।

রেডিয়েটর খতম, অচেনা লাগছে বিংগোর কণ্ঠস্বর। অ্যাক্সেল দুই টুকরো। গুঙিয়ে উঠল হ্যারি। সর্বনাশ!

জানালার কাছে এসে জিনার দিকে পিস্তল তাক করল বিংগো। নামো। মুসাকে বলল, এই, তুমিও।

হলো তো এখন? কালো হয়ে গেছে জিনার মুখ।

চুপ। নামো।

নামল দুজনে। হ্যারিও নামল। শূন্য চোখে তাকাল ছড়ানো মরুর দিকে। সামনে দেখিয়ে বলল, ওদিকে পাহাড় পেছনে রেখে সোজা হাঁটব। আগে-পরে পথ পেয়ে যাবই।

না, জেদ ধরল জিনা। এখানে হাঁটতেই থাকবে, হাঁটতেই থাকবে, পথ আর পাবে না। তারপর সূর্য উঠলে টের পাবে মজাটা। দেখতে দেখতে একশো ডিগ্রী ছাড়িয়ে যাবে গরম, কাবাব হয়ে যাবে। ট্রাকে বসে থাকাই ভাল।

ট্রাকে থাকলে মরব, বলল হ্যারি।

বাজে কথা রেখে হাঁটো তো, আবার ধমক দিল বিংগো।

না, বালিতে বসে পড়ল জিনা। গুলি করে মেরে ফেললেও আমি যাব না। রোদে কাবাব হওয়ার চেয়ে গুলি খেয়ে মরা অনেক আরামের। গরমে মগজ গলে নাক দিয়ে বেরিয়ে আসবে।

দ্বিধা করল মুসা। তারপর বসে পড়ল জিনার পাশে।

ভীষণ দৃষ্টিতে তাকাল বিংগো। পিস্তলের হাতলে চাপ বাড়ছে, সাদা হয়ে যাচ্ছে আঙুল।

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল হ্যারি, লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে শুরু করল সামনের দিকে।

জিনা আর মুসার ওপর বার দুই নজর সরাল বিংগো, কাঁধ ঝাঁকিয়ে পিস্তলটা ঢুকিয়ে রাখল পকেটে। ঘুরে রওনা হয়ে গেল সঙ্গীর পেছনে।

নীরবে চেয়ে আছে জিনা আর মুসা।

ছোট হতে হতে যেন ধোয়ার ভেতর মিলিয়ে গেল দুই ডাকাতের অবয়ব। দ্রুত চড়ছে সূর্য, গরম বাড়ছে। রাতের শিশিরে ভেজা বালি থেকে বাষ্প উঠতে শুরু করেছে ধোয়ার মত।

হতাশ হয়ে যদি ফিরে যায় ওরা? কোলা ব্যাঙের স্বর বেরোল মুসার কণ্ঠ থেকে। যদি খোঁজা বাদ দেয়? পিপাসার ছাতি ফেটে মরব।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *