১৫. খাবার গরম করে খেয়ে

খাবার গরম করে খেয়ে আবার ঘোড়ায় চড়ল ওরা। গতি ধীর। রাস্তা খুব খারাপ, পিছলে পড়ে হাড়গোড় ভাঙার ইচ্ছে নেই কারও। কাছাকাছি রয়েছে ওরা। প্রাণের ভয় সবারই আছে, জানোয়ারগুলোও তাই খুব সর্তক, কিশোরের হোতকাটাও আর ঘাসের লোভ করছে না এখন।

বিশ্বাস হচ্ছে না, এক সময় বলল কিশোর। মিসেস ফিলটারের মত মহিলা আতঙ্কিত হয়ে পালাবেন…।

সব তোমার অনুমান, জিনা বলল। তার আসলে কি হয়েছে কে জানে।

একটা ব্যাপারই হয়েছে, জোর দিয়ে বলল কিশোর, যেই বুঝতে পেরেছেন তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে, অমনি পোটলা বেঁধে পালিয়েছেন। এমনও হতে পারে, টুইন লেকসে তার কোন সঙ্গী ঘোরাঘুরি করছিল কদিন ধরে। ভুলে যাচ্ছ কেন, ছুরিটা এখনও পাওয়া যায়নি।

মুসার মুখ উজ্জ্বল হলো। হ্যাঁ, তাই তো। ওই ব্যাটাই চুরি করেছে। মিসেস ফিলটারই হয়তো সে-রাতে চোরটাকে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

খাবার চুরির রহস্যটাই বা কি? রবিন বলল। আর সিগারেটের গোড়া?

কি? জিজ্ঞেস করল জিনা।

হতে পারে চোরটা তখনও মিসেস ফিলটারের ঘরেই ছিল, আমরা যেদিন তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। খিদে পেয়েছিল, তাই আমরা ঘর থেকে বেরোতেই খেয়ে নিয়েছে সে। মনে করে দেখো, খাবার নেই এ-ব্যাপারটা প্রথমে মিসেস ফিলটারের চোখে পড়েনি, কিশোর বলার পর

চমৎকার যুক্তি, রবিন, বলল কিশোর। ঠিক পথেই ভাবছ।

তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে! রেগে গেল জিনা।

উত্তেজিত হয়ো না জিনা, কিশোর বলল। সবই আমাদের অনুমা। অনেকগুলো উদ্ভট ব্যাপার ঘটছে তো। পাঁচ বছরের পুরানো একটা লাশ পেলাম খনিতে, পাঁচ বছর আগের এক ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিল লোকটা। সন্দেহভাজন বিধবা মহিলা রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলেন। গাছ কাটার একটা ছুরি চুরি গেল, ডাকাতদের সঙ্গে এটারও কোন সম্পর্ক থাকতে পারে। একটা বাতিল রূপার খনির মুখ খুলে খনি-খনি খেলা শুরু করেছে এক আধপাগলা কোটিপতি। কুড়িয়ে পেলাম একটা সোনা মেশানো নুড়ি। অথচ, মিসেস ফিলটারের কথামত এক আউন্স সোনা থাকার কথা নয় খনিতে।

হয়তো মিছে কথা বলেছেন, মুসা বলল।

কেন বলবেন? ম্যাকআরবারের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক আছে বলে তো মনে হলো না।

যদি টাকাগুলো খনিতে লুকানো থাকে? মিসেস ফিলটারের সে কথা জানা থাকলে, ম্যাকআরবারের মতই চাইবেন খনিতে কেউ না ঢুকুক।

এরপর বাকি পথটা প্রায় নীরবে পেরোল ওরা, বিশেষ কোন কথা হলো না। শেষ বিকেলে এসে নামল উপত্যকায়। ম্যাকআরবারের লাল ট্রাকটা নেই। কেবিনের কাছে পড়ে রয়েছে রঙের বালতি, কিন্তু মেকসিকান শ্রমিকেরা অদৃশ্য। বিকেলের সোনালি রোদে লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমে অচেতন বিশাল কুকুরটা।

স্তব্ধ নীরবতার মাঝে শুধু ঘোড়ার খুরের খটাখট শব্দ, বেশি হয়ে কানে বাজছে। বেড়ার কিনার দিয়ে এল ওরা। কিন্তু কুকুরটার খবরই নেই যেন, ঘুমাচ্ছে।

অদ্ভুত তো, কিশোর বলল। এতক্ষণ তত বেড়া ভাঙার চেষ্টা করার কথা।

র‍্যাঞ্চে ফিরে ঘোড়াগুলো খেয়াড়ে ঢুকিয়ে রাখল ওরা। বাড়ির সদর দরজা খোলা। রান্নাঘরের টেবিলে একটা নোট পাওয়া গেল, মিস্টার উইলসন লিখে রেখে গেছেন?

ভিকির বোন জরুরী
খবর দিয়েছে। তাকে
নিয়ে সিলভার
সিটিতে গেলাম।
ফিরতে রাত হবে।
ঠাণ্ডা খাবার দিয়েই
কোনমতে আজ
ডিনার সেরে নিও।

-লাভ, আঙ্কেল
উইলসন।

দারুণ! উজ্জ্বল হয়ে উঠল কিশোরের মুখ।

আমার কাছে তো দারুণ লাগছে না, জিনা বলল তোমার হয়েছে কি, কিশোর, ডিকিখালার বোনের শরীর খারাপও তো হতে পারে?

না হলেই খুশি হব, অন্তর থেকেই বলল কিশোর।

খুশি হয়েছি কেউ নেই দেখে। মিসেস ফিলটার নেই, ম্যাকআরের ট্রাকটা নেই—তারমানে সে-ও নেই, তার শ্রমিকেরা নেই। আঙ্কেল উইলসন আর ভিকিখালাও নেই। দারুণ বলব না? খনিতে ঢোকার এর চেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর পাব?

পকেট থেকে নুড়িটা বের করে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে খপ করে ধরল আবার সুে, সঙ্গীদের দিকে তাকাল। চলো, এখুনি। এমন সুযোগ আর পাব না। দেখি গিয়ে কি মেলে খনিতে।

কুত্তাটা? মনে করিয়ে দিল মুসা। কেউ না থাকলেও ওটা তো আছে।

ব্যবস্থা করছি, ফ্রিজের কাছে প্রায় উড়ে গিয়ে পড়ল জিনা। ভেড়ার আস্ত এক রান বের করে নিয়ে বলল, বাঘা কুত্তার ওষুধ। অনেকক্ষণ ব্যস্ত থাকবে।

কয়েক মিনিট পর ম্যাকআরথারের বেড়ার ধারে এসে দাঁড়াল ওরা। কুকুরটা এখনও ঘুমাচ্ছে।

সেৎসি মাছি কামড়েছে নাকি ব্যাটাকে? মুসা বলল।

সেৎসির কামড়ে কুকুরের কিছু হয় না, জানাল রবিন। শুধু মানুষ আর গাধার ওপর কাজ করে ওদের বিষ।

খাইছে! গাধা আর মানুষ তাহলে এক টাইপের প্রাণী? ইজ্জত গেল। হেই কুত্তা, হেই বাঘা। ওঠ, ওঠ।

এই যে তোর খাবার নিয়ে এসেছি, ভেড়ার ঠ্যাঙটা নাড়ল জিনা।

কিন্তু নড়লও না বাবা।

আবার ডাকল মুসা। কিন্তু সাড়া নেই। অশেষে বেড়া ডিঙাল সে, ওপরে চড়ে লাফিয়ে নামল অন্য পাশে, ম্যাকআরবারের সীমানা ভেতরে।

সাবধান, হুঁশিয়ার করল রবিন, জেগে উঠে কামড়ে দিতে পারে।

জিনা, দেখি রানটা দাও তো, বলল মুসা। ওপর দিয়ে ছুঁড়ে দাও। কুত্তা মিয়া কখন আবার লাফিয়ে ওঠে।

রানটা লুফে নিয়ে কুকুরটার দিকে ফিরল মুসা। মরে গেল নাকি?

মুসার মতই বেড়া ডিঙাল তিনজনে। রানটা নিয়ে নিল আবার জিনা। এক সঙ্গে চারজনে এগোল কুকুরটার দিকে।

এই তো ছেলে, লক্ষ্ণী ছেলে, রাগে না, কোমল গলায় বলতে বলতে হাঁটু মুড়ে বলল জিনা। কুকুরটার দিকে হাত বাড়াল।

হুঁশিয়ার! বাঘা কুত্তা কিন্তু, ফিসফিস করে বলল কিশোর।

কিন্তু বাঘা কুত্তার ঘুম ভাঙল না। জিনা গায়ে হাত বোলালে মৃদু লেজ নেড়ে শুধু গোঁ গোঁ করল ঘুমের মধ্যেই।

কুকুরের এত ঘুম? এদিক ওদিক তাকাল সে। বেড়ার কাছে একটা টিন দেখে এগিয়ে গেল। যা সন্দেহ করেছিল। খানিকটা মাংস অবশিষ্ট রয়েছে এখনও। ওখান থেকেই ঘোষণা করল, ঘুমের ওষুধ খাইয়েছে।

কে খাওয়াল, দেখার জন্যেই যেন চারদিকে তাকাল অন্য তিনজন। কিন্তু কাউকে চোখে পড়ল না।

মেকসিকানগুলো গেল কোথায়? নিচু কণ্ঠে বলল রবিন।

এই, শুনছেন? চেঁচিয়ে ডাকল মুসা। কেউ আছেন? প্রতিধ্বনি তুলে তার ডাকের সাড়া দিল শুধু পাহাড়।

বোঝা গেছে, কেউ নেই, উঠে দাঁড়াল জিনা। প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে টর্চটা টেনে বের করে বলল, চলো, কেউ চলে আসার আগেই ঢুকে পড়ি।

খনিমুখের দিকে এগোল সে। অন্ধকার একটা কালো গহ্বর, ভেতরের কিছুই চোখে পড়ছে না। সূর্য ডোবেনি, তবে পাহাড়ের ওপারে অদৃশ্য হয়েছে। অন্ধকার নামছে তাই উপত্যকায়।

ভেতরে ঢুকল ওরা।

আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল জিনা। কি করেছে ব্যাটারা? বোমা মেরেছে কোন জায়গায়?

আসিনি এখনও সেজায়গায়, কিশোর বলল। আরও ভেতরে ঢুকতে হবে। চাপা আওয়াজ হয়েছে, তারমানে অনেক গভীর থেকে বেরিয়েছে। চলো, যে জায়গায় নুড়িটা পেয়েছি সেখানে।

জিনার হাত থেকে টর্চটা নিয়ে আগে আগে চলল কিশোর। আগের বারের মত পরিষ্কার নয় আর এখন পথ, আলগা নুড়ি আর পাথরে বিছিয়ে আছে, জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট খুপ। পঞ্চাশ ফুট মত এগিয়ে পাওয়া গেল ফোকরটা, এখানেই বোমা মারা হয়েছে। ভেতরে কি যেন চকচক করছে।

দেখো দেখো, চেঁচিয়ে উঠল মুসা, সোনা!

ফোকরে ঢুকল কিশোর। টর্চের আলোয় ঝকঝক করছে হলদে ধাতু। আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে টুকরোটা বের করে নিয়ে এল সে। আশ্চর্য!

মিসেস ফিলটার ভুল বলেছেন, জিনা বলল। খনিটাতে স্বর্ণ আছে।

হঠাৎ স্থির হয়ে গেল চারজনেই।

খনির বাইরে শব্দ। গুলি করেছে কেউ, কিংবা গাড়ির এঞ্জিনের মিসফায়ার।

কে যেন আসছে, ফিসফিস করল মুসা।

চলো ভাগি, জরুরী কণ্ঠে বলল জিনা। আবার ধরা পড়তে চাই না।

সোনার টুকরোটা পকেটে রেখে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এল কিশোর, অন্যেরাও বেরোল ফোকর থেকে। মোড় নিয়ে গলি থেকে বেরিয়ে প্রধান সুড়ঙ্গে ঢুকতেই অতি আবছা আলো চোখে পড়ল, খনিমুখ দিয়ে আসছে সঁঝের ফেকাসে সবুজ আলো। টর্চ নিভিয়ে দিল কিশোর। পায়ে পায়ে এগোল মুখের দিকে।

কুকুরটা তেমনি শুয়ে আছে, আবছা অন্ধকারে অস্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। বেড়ার বাইরে টায়ারের শব্দ তুলে থামল একটা গাড়ি। দুজন লোক বেয়োল গাড়ি থেকে।

হ্যারি, বলল একজন, পাথর দিয়ে বাড়ি মারো।

দরকার কি? খসখসে কণ্ঠস্বর দ্বিতীয় জনের। গুলি করলেই তো হয়।

তোমার যা কথা না। গুলির শব্দ শুনে ফেলুক কেউ, আর মোটকা শেরিফটাকে খবর দিয়ে দিক। নাও, পাথর নাও। দূর থেকেও তার নিঃশ্বাসের ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনতে পাচ্ছে ছেলেরা।

কিশোর! ফিসফিসিয়ে বলল মুসা। এই ব্যাটাই! ও-ই ঢুকেছিল সেদিন গোলাঘরে। আমাকে কোপ মারার আগে ওরকম করেই শাস ফেলেছিল।

খনির অন্ধকারে পিছিয়ে এল আবার চারজনে।

কি করি এখন? জিনা বলল। দৌড় দিয়ে পেরোতে পারব না, ধরে ফেলবে। ভাসাব দেখে মোটেই ভাল লোক মনে হচ্ছে না।

পাথর দিয়ে বাড়ি মারার ঠনঠন শব্দ কানে এল। খানিক পরই ভেঙে পড়ল গেটের তালা।

এখনও থাকলে, ওই ঘরেই আছে, হ্যারির খসখসে কণ্ঠ। বিংগো, কি মনে হয় তোমার?

না-ও থাকতে পারে, জবাব দিল ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস। উঠান পেরোচ্ছে ওরা। যথেষ্ট সময় পেয়েছে, সহজেই অন্য কোথাও লুকিয়ে ফেলতে পারে।

ঘরে না পেলে খনিতে খুঁজব।

সেখানে না পাওয়া গেলে চুপ করে গিয়ে লুকিয়ে বসে থাকব। সাহেব এলেই ধরব গলা টিপে।

রসিকতায় হাসন দুজনেই। দরজা খোলার শব্দ হলো। কেবিনে ঢুকছে।

আমাদের দেখে ফেলবে এখানে এনে, চি চি করে উঠল জিনার কণ্ঠ। কোনমতে পালানো দরকার। র‍্যাঞ্চে গিয়ে শেরিফকে ফোন করব।

পাগল নাকি? আঁতকে উঠল মুসা। ওদের সামনে দিয়ে? বন্দুক আছে।

হামাগুরি দিয়ে খনিমুখের কাছে গিয়ে সাবধানে বাইরে উঁকি দিল কিশোর। ছাউনিটার কাছে এক বালতি তরল পদার্থ পড়ে আছে। আরেকটু এগিয়ে তরলের গন্ধ শুকল সে, ছুঁয়ে দেখল ছাউনির খটখটে শুকনো কাঠের পাল্লা।

খনিতে ফিরে এল কিশোর। রঙ গোলানোর তেল, মেকসিকানরা ফেলে গেছে, বলল সে। ছাউনিতে আগুন ধরিয়ে দিলে শহরের কারও না কারও চোখে পড়বে। ফায়ার ব্রিগেডকে খবর দেবে। মুসা, দেশলাই আছে না তোমার কাছে? হ্যামবোনে খাবার গরম করেছিলে যে?

দেশলাই বের করে দিল মুসা।

ছাউনিতে গিয়ে পালা আর বেড়ার কাঠ তেল দিয়ে ভেজাল যতখানি পারল। কাঠি জ্বেলে তাতে দিল লাগিয়ে। দপ করে জ্বলে উঠল আগুন, চোখের পলকে ছড়িয়ে গেল। সময় মত সরে এল সে।

চমৎকার! হাসিমুখে কাল মুসা। কাজ না হয়েই যায় না।

কি মনে পড়তে আচমকা চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। জলদি জলদি ঢোকো! ধাক্কা দিয়ে জিনাকে সরিয়ে দিল সে আরও ভেতরে, মুসা আর রবিনের হাত ধরে টান দিয়ে নিজে ডাইভ দিয়ে পড়ল মেঝেতে। বিচিত্র ভঙ্গিতে অনেকটা ব্যাঙের মত লাফিয়ে সরে গেল যতটা পারল।

কি ব্যাপার বলতে গিয়ে বাধা পেল মুসা।

ডিনামাইট, বলেই আরও ভেতরে সরে গেল কিশোর। নিশ্চয় ছাউনিতে রেখেছে ম্যাকআরথার।

তার কথার প্রমাণ দিতেই যেন প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ধরণী।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *