১৪. খাবার গুছিয়ে দিতে কার্পণ্য করল না

খাবার গুছিয়ে দিতে কার্পণ্য করল না ভিকি। স্যাডল ব্যাগে সেগুলো ঠেসে ভরে নিতে হলো অভিযাত্রীদের।

খাবার গরম করার সময় খুব সাবধান, হুঁশিয়ার করে দিল ভিকি। পুরো পূর্বতটা জ্বালিয়ে এসো না আবার, বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাল সে।

জিনা চড়েছে তার প্রিয় অ্যাপলুসায়। কিশোরেরটা মোটাসোটা মাদী ঘোড়া। মুসারটা হাড় জিরজিরে। হেসেই বাঁচে না জিনা, ঠাট্টা করে বলেছে, দেখো, তোমার যা ওজন, বেচারার মেরুদণ্ড না বাঁকিয়ে দাও। রবিনেরটা আংকেল উইলসনের তৃতীয় এবং সর্বশেষ, বেশ তেজী একটা ঘোড়া, ধূসর রঙের চামড়ায় সাদা ফুটকি।

মাঝারি কদমে ম্যাকআরথারের গেট পেরোল ওরা। ওদের দেখে যেন পাগল হয়ে গেল কুকুরটা, তার চিৎকারে ফিরে না চেয়ে পারল না দুই মেকসিকান শ্রমিক। ওরা এখন কেবিন রঙ করায় ব্যস্ত।

পাহাড়ী পথ ধরে আগে আগে চলেছে জিনা। তার কাছাকাছি রয়েছে কিশোর, কমেটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছে হোঁতকা মাদীটা। তাছাড়া তাল রাখার দিকে থােরাই নজর ঘোড়াটার, তার খেয়াল পথের দুপাশে কোথায় তাজা। ঘাস আছে। দেখলেই সেদিকে এগোনোর চেষ্টা। সামলাতে সামলাতে ইতিমধ্যেই ঘেমে উঠেছে কিশোর। এক সময় হাল ছেড়ে দিল। মনের ভাব : যা খুশি করগে মুটকির বেটি মুটকি।

বাধ্য হয়ে সাহায্যের হাত বাড়াতে হলো জিনাকে। কমেটকে ঘুরিয়ে এনে মাদীটার পাশাপাশি হলো, কিশোরের হাত থেকে রাশ নিয়ে জোরে টান দিয়ে দেখিয়ে দিল অবাধ্য ঘোড়াকে কি করে বাগ মানাতে হয়।

জোরে রাশ টেনে ধরে ঘোড়ার মাথা ওপরের দিকে তুলে রাখল কিশোর। কিন্তু কতক্ষণ আর এভাবে জোর জবরদস্তি করা যায়, কয়েক মিনিট পরই ঢিল দিয়ে দিল। আবার সেই একই কাণ্ড, হাঁটার চেয়ে ঘাস খাওয়ার দিকে মনযোগ বাড়াল ঘোড়া।

এভাবে গেলে তো সারা দিন লাগবে, বিরক্ত হয়ে বলল জিনা।

ঘোড়র পেটে জোরে লাথি লাগাল কিশোর, এই মুটকি, হাট।

বড় জোর দশ কদম ঠিকমত এগোল ঘোড়া, তারপর আবার এক পা বাড়ে তো দুপা পাশে সরে। একটা বাংলা কবিতা মনে পড়ে গেল কিশোরের, বিড়বিড় করল?

এক যে ছিল সাহেব তাহার
গুণের মধ্যে নাকের বাহার
তার যে গাধা বাহন সেটা
যেমন পেটুক তেমনি চেঁটা
ডাইনে বললে যায় সে বামে
তিন পা যেতে দুবার থামে…
ব্যাপার দেখে এমনি তরো
সাহেব বললেন সবুর করো
মূলোর কুঁটো ঝুলিয়ে নাকে…

এ পর্যন্ত বলেই আপনমনে হাসল কিশোর, বলল, দাঁড়াও, তোমার ব্যবস্থাও করছি, বলেই নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। রাশটা জিনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে রাস্তার পাশ থেকে একটা লাঠি কুড়িয়ে নিল। খুব তাজা আর সবুজ দেখে এক আঁটি ঘাস তুলে নিয়ে বাঁধল লাঠির মাথায়। তারপর আবার ঘোড়ায় চেপে লাঠিটা ধরল ওটার নাকের সামনে, এমনভাবে, যাতে কোনমতেই নাগাল না পায় ঘোড়া।

ব্যস, কাজ হয়ে গেল। ঘাস ধরার জন্যে মাথা উঁচু করে ছুটল ঘোড়া, যতই ছোটে ততই আগে বাড়ে ঘাস, নাগাল আর মেলে না। হাসতে হাসতে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো মুসার। জিনা আর রবিনও হাসছে। হাসতে হাসতে রবিন বলল, জিনা, তোমার রাশ টানার চেয়ে কিশোরের ঘাস টানার বুদ্ধি

অনেক মোক্ষম হা-হা-হা!

টায়ারের দাগ ধরে এগিয়ে চলেছে ওরা। দু-ধারে পাইনবন, তার ওপাশে পর্বতের ঢালে কি আছে দেখা যায় না। বেলা একটার দিকে নয় চূড়ায় পৌঁছলো ওরা, দ্রুত নেমে চলল হ্যামবোনের ধুলোয় ঢাকা প্রধান সড়ক ধরে। চারপাশে খটখটে শুকনো কাঠের বাড়িঘর, ভাঙাচোরা জানালা, রঙচটা সানশেড়। সাইনবোর্ডগুলো পড়া যায় না। পথের ওপর পড়ে আছে বিছানা আর সোফায় মরচে ধরা স্প্রিং, ভাঙা আসবাবপত্র, কাচের টুকরো, ছড়িয়ে আছে বাড়ির সামনে, আনাচে-কানাচে।

একটা বাড়ির সামনে এসে ঘোড়া থেকে নামল জিনা। এককালে ওটা হ্যামবোনের জেনারেল স্টোর ছিল। বারান্দার রেলিঙের সঙ্গে ঘোড়াটাকে বাঁধল সে।

ছেলেরাও নামল। অনেকক্ষণ ঘোড়ার পিঠে বসে থেকে শক্ত হয়ে গেছে যেন শরীর। যার যার ঘোড়া বেঁধে, হাত-পা ঝাড়া দিল।

বাবারে, কি নির্জন, চার দিকে তাকাতে তাকাতে বলল মুসা, আশঙ্কা করছে যেন এখুনি একটা ভূত বেরিয়ে আসবে।

লোক থাকে না বলেই তো ভূতুড়ে শহর বলে, জিনা বলল। রাস্তার মাথায় বড় একটা ছাউনির দিকে হাত তুলল। বেড়া আর ছাত করোগেটেড টিনের, জায়গায় জায়গায় মস্ত কালো ফোকর। শ্রমিকরা নিশ্চয় কাজ করত ওখানে।

মস্ত ছাউনিটার দিকে এগোল ওরা।

দেখেশুনে চলবে, হুঁশিয়ার করল জিনা। ওই যে, টিনের টুকরো কাঠের টুকরো পড়ে আছে, ওগুলোর কাছে যাবে না, কোন জিনিস তোলার চেষ্টা করবে না। রোদ থেকে বাচার জন্যে র্যাটল স্নেক লুকিয়ে থাকে ওসবের নিচে। ভয় পেলে

জানি কি করে, বলল মুসা। ভেব না। জঞ্জালের ভেতর কিছু খুঁজতে যাচ্ছি না আমরা।

ছাউনির কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। অনেক আগেই খসে পড়ে গেছে দরজার পান্না। উঁকি দিয়ে ভেতরের বিষণ্ণতা দেখল সবাই।

হুঁ, কাঠের মেঝে, রবিন বলল। আমাদের ভার সইতে পারবে?

সওয়াতে যাচ্ছে কে, কিশোর বলল। ভেতরে ঢুকছি না আমরা। ট্রাক নেই ওখানে। শুধু ভূতুড়ে শহর দেখতে আসিনি আমরা। রাস্তায় সরে এসে টায়ারের দাগ পরীক্ষা করল। দাগ ধরে ধরে গিয়ে থামল ছাউনির এক কোণে। উঁকি দিয়ে একবার তাকিয়েই বলে উঠল, ওই তো।

কি? ছুটে এল জিনা।

মুসা আর রবিনও এল।

পিকআপটা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

মিসেস ফিলটার! চেঁচিয়ে ডাকল জিনা। ছুটে গেল গাড়ির দিকে, মিসেস ফিলটার! আপনি কোথায়?

গাড়ির কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে জিনা, এই সময় শোনা গেল একটা বিচ্ছিরি টি-রু-র শব্দ।

জিনা! খবরদার! চেঁচিয়ে উঠল কিশোর।

লাফিয়ে পেছনে সরার চেষ্টা করল জিনা, কিন্তু তাড়াহুড়োয় পিছলে গেল পা। ধড়াস করে চিত হয়ে পড়ল বালিতে। ট্রাকের নিচ থেকে উড়ে এল যেন একটা মোটা দড়ি, ছোবল হানল এক মুহূর্ত আগে জিনার পা যেখানে ছিল ঠিক সেখানে। কুৎসিত একটা চ্যাপটা মাথা, হাঁ করা চওড়া চোয়ালে ভয়ঙ্কর দুটো বিষদাত।

পাথর হয়ে গেছে যেন জিনা।

পুরো এক সেকেণ্ড লম্বা হয়ে পড়ে রইল সাপটা, তারপর লেজের টি শব্দ তুলে গুটিয়ে নিতে লাগলু শরীর।

নড়ে না, জিনা, ফিসফিস করল মুসা। একটা পাথর তুলে নিয়ে নিশানা করে ছুঁড়ে মারল জোরে।

বাহ, এক্কেবারে বুলস-আই, হাততালি দিল রবিন। মাথা খতম। বড় বাঁচা বাচা গেছে জিনা।

কোনমতে উঠে দাঁড়াল জিনা, দুর্বল রোগীর মত রক্তশূন্য চেহারা। কাঁপা গলায় মুসার দিকে চেয়ে শুধু বলল, থ্যাংক।

মরে গেছে সাপটা, কিন্তু এখনও শরীর মোচড়াচ্ছে, পাক খাচ্ছে। ধীরে ধীরে থেমে এল নড়াচড়া।

ট্রাকের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে নিচু হয়ে তলায় উঁকি দিল মুসা। আর না থাকলেই বাঁচি।

সাপটার পাশ ঘুরে ট্রাকের একেবারে কাছে চলে এল ওরা। কেবিনের ভেতরে উঁকি দিল। মিসেস ফিলটার নেই। খালি। সামনে-পেছনে কোথাও মালপত্র নেই। ইগনিশনের চাবিটাও নেই।

এখানে এভাবে গাড়িটা ফেলে গেল, কানের পেছনে চুলকাল রবিন। কিছু বুঝতে পারছি না।

আমিও না, জিনা বলল, কোথায় যেতে পারে? মালপত্রই বা কোথায়?

কোথাও লুকিয়ে নেই তো? এদিক ওদিক তাকাল মুসা। শহরটা খুজে দেখল ওরা। জানালা-দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখল ঘরের ভেতরে। কিন্তু ভাঙা আসবাব আর ময়লা জঞ্জাল ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। এখানে ওখানে বালিতে পায়ের ছাপ আছে।

মিসেস ফিলটার নেই।

লোক যাতায়াত আছে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। আবার পিকআপের কাছে এল ওরা। ওদের পায়ের ছাপ ছাড়াও ছাপ আছে। ওগুলো অনুসরণ করে এগোল কিশোর। বিশ গজ দূরে আরেক সেট টায়ারের দাগ দেখা গেল।

জীপ কিংবা ট্রাক নিয়ে আরও কেউ এসেছিল, মুসা বলল।

দাগ ধরে এগোল ওরা। শহরের এক কিনারে চলে এল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে আরেকটা সরু পথ, ওরা যেটা দিয়ে এসেছিল তার উল্টোদিকে, এই পথটা মোটামুটি ভাল অবস্থায়ই রয়েছে।

চুপ করে কিছু দেখছে কিশোর। বলল, কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন কিনা কে জানে। টুইন লেকস থেকে এসেছেন নিজের গাড়ি নিয়ে। আগেই ঠিক করা ছিল অন্য কেউ এখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে। নিজের গাড়িটা এখানে ফেলে মালপত্র নিয়ে অন্য গাড়িতে করে চলে গেছেন মিসেস ফিলটার। জিনা, এ-পথটা কোথায় গেছে?

শিওর না, মাথা নাড়ল জিনা। শুনেছি, ওদিকে মরুভূমি।

নিচে গাছের মাথায় ধুলোর ঝড় দেখা গেল, ঢালের দিক থেকে ভেসে এল এঞ্জিনের শব্দ, লো-গীয়ারে চলছে গাড়ি, ফলে গোঁ গোঁ বেশি করছে।

ফিরে আসছে বোধহয়, ভুরু কুঁচকে পথের মোড়ের দিকে চেয়ে আছে মুসা।

কিন্তু মিসেস ফিলটার ফেরেনি। একটা জীপ। আলগা নুড়িতে ঠিকমত কামড় বসাতে পারছে না চাকা, এবড়োখেবড়ো পথের ঝুঁকুনি আর খাড়াই গাড়ির গতি একেবারে কমিয়ে দিয়েছে। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে একজন বয়স্ক লোক, মাথায় ছড়ানোকানাওয়ালা খড়ের তৈরি হ্যাট। পাশে বসা এক মহিলা, পরনে ছাপার সুতি পোশাক।

হাই! পাশে এসে গাড়ি থামাল লোকটা। হাসল।

হাই, হাত তুলে জবাব দিল মুসা।

তোমরাই শুধু?

মাথা নোয়াল মুসা।

বোতল শিকারে এসেছ নিশ্চয়?

বোতল শিকার? জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল রবিন।

আমরা সেজন্যেই এসেছি, মহিলা বলল। সেই ক্যাসা ভারডে থেকে। এসব পুরানো জায়গায় মাঝেসাঝেই পুরানো আমলের চমৎকার সব বোতল পাওয়া যায়। তবে খোঁজার সময় সতর্ক থাকতে হয়। হাত দেয়া উচিত না। লাঠি দিয়ে সরিয়ে নেয়াটাই ভাল। নইলে সাপের যা আজ্ঞা এসব পোছড়া জায়গায়।

জানি, বলল কিশোর। আচ্ছা, আরও নোক আসে নাকি এখানে?

হয়তো আসে, জবাব দিল লোকটা। রাস্তা খুব খারাপ নয় সেটা একটা কারণ। আর বোতল না পাওয়া গেলেও, অন্যান্য জিনিস পাওয়া যায়। গত হপ্তায় অন্য একটা গোস্ট টাউনে গিয়েছিলাম। পুরানো আমলের একটা কেরোসিনের ল্যাম্প পেয়েছি, প্রায় নতুন।

জীপটা চালিয়ে নিয়ে জেনারেল স্টোরের সামনে রাখল সে।

টায়ারের দাগের ব্যাপারে আর শিওর হওয়া যাচ্ছে না, হাত নাড়ল রবিন। যে দাগ ধরে এলাম এখানে, সেটা কোন অ্যানটিক শিকারিরও হতে পারে।

হুঁ, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। মিসেস ফিলটারকে খুঁজে বের করার আর কোন উপায় দেখছি না।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *