১৩. পরদিন সকালে রান্নাঘরে নাস্তা

পরদিন সকালে রান্নাঘরে নাস্তা সারল ছেলেরা। তাদের সঙ্গে রয়েছে কেবল জিনা। গভীরভাবে কি যেন ভাবছে কিশোর, তার আনমনা ভাব দেখেই বোঝা যায়। নিজের প্লেটের দিকে চেয়ে জিনাকে বলল, ফিনিক্সে মিসেস ফিলটার যে দোকানে কাজ করতেন, দোকানটার নাম জানো?

সেটা জেনে তোমার কোন লাভ নেই, কড়া গলায় জবাব দিল জিনা। দোকানটার নাম ছিল টিড-বিট। প্রথমে মিসেস ফিলটারই দোকানটা দিয়েছিলেন, ব্যবসায় লালবাতি জ্বালিয়ে পরে বিক্রি করে দেন মিসেস ম্যালকম নামে আরেক মহিলার কাছে। সেই মহিলা মিসেস ফিলটারকে ওই দোকানের সেলসউম্যান হিসেবে রেখে দেয়। মিসেস ম্যালকমেরও টাকাপয়সা বিশেষ ছিল না, দোকানও যা চলত, তাতে বেতন খুব একটা দিতে পারত না।

তাই নাকি? মিসেস ফিলটার জমি কেনার টাকা পেলেন কোথায় তাহলে? খোঁজখবর করতে হয়।

কিশোর! খবরদার! গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল জিনা। মিসেস ফিলটারের ব্যাপারে নাক গলাবে না। খুব ভাল মহিলা। আমি পছন্দ করি।

এবং ম্যাকআরথারকে অপছন্দ করো, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর, জানি। তাতে প্রমাণিত হয় না, হ্যারি ম্যাকআরথার চোর-ডাকাত, আর মিসেস ফিলটার সাধু-সন্ন্যাসী। সত্যি কথা কি জানো, মহিলাকে আমিও পছন্দ করি। কিন্তু একজন রহস্যভেদী হিসেবে আবেগকে প্রশ্রয় দিতে পারি না, দেয়া উচিতও নয়।

তাই নাকি। তীব্র ব্যঙ্গ ঝরল জিনার কণ্ঠে। খুব নীতিবান। নির্দোষ একজন ভদ্রমহিলাকে চোর ভাবতে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত।

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল কিশোর, শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলল, বলল, দেখো, জিনা, মিসেস ফিলটার কি করেছেন না করেছেন, আমি জানি না। কিন্তু এটা তো জানি ডাকাতিটার সময় তিনি ফিনিক্সে বাস করতেন, এবং ঠিক তার মতই একজন মহিলা অংশ নিয়েছিল ডাকাতিতে। তারপর একটা লোক পড়ে মরল এমন একটা খনিতে, যেটা মিসেস ফিলটারের অতি-পরিচিত। যোগাযোগগুলো খুব বেশি মাত্রায় হয়ে যাচ্ছে না? সেজন্যেই খোঁজ নিতে চাইছি। শুরুতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতে চাই সেই দোকানটায়, টিড-বিটে। শুরুতেই জানা দরকার, টিড-বিটে সত্যি কাজ করতেন কিনা মহিলা।

ফোন করো না, দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল জিনা। তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। তোমারও মুখ বন্ধ হবে।

তাই করব, উঠে লিভিং রুমে রওনা হলো কিশোর, টেলিফোন করবে।

ডিরেকটরিতে নাম্বার পাওয়া গেল। ডায়াল করল কিশোর। ওপাশ থেকে সাড়া মিলতে নিজের কণ্ঠস্বর ভারি করে, বয়স্ক লোকের গলা নকল করে বলল, টিড-বিট? মিসেস ম্যালকমের সঙ্গে কথা বলতে পারি, প্লীজ?

দীর্ঘ নীরবতা।

মিসেস ম্যালকম? অবশেষে বলল কিশোর। লর্ডবুর্গের বিউটি পারলার থেকে বলছি, আমি হ্যারি কোলম্যান। একজন সেলস-উওম্যান চেয়েছিলাম, দরখাস্ত পেয়েছি, নাম মিসেস রোজ ফিলটার। অভিজ্ঞতার জায়গায় আপনার দোকানের রেফারেন্স দিয়েছে। পাঁচ বছর আগে টিড-বিট ছেড়েছিল, হ্যাঁ হ্যাঁ রিজাইন দিয়েছিল

চুপ হয়ে গেল কিশোর। মনযোগ দিয়ে শুনছে ওপাশের কথা।

পনেরো বছর পর? এক সময় বলল সে।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে অন্যেরা।

বলেছিলাম না? ফিসফিস করে বলল জিনা। মহিলা বাজে কথা বলেন না। জিনার দিকে ফিরেও তাকাল না কিশোর, শুনছে। তাই?…হ্যাঁ, বিশ্বাস করা শক্তহ্যাঁ হ্যাঁ। থ্যাংক ইউ মিসেস ম্যালকম, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।

রিসিভার নামিয়ে রাখল কিশোর।

কি বলল? মুসা আর ধৈর্য রাখতে পারছে না।

পনেরো বছর কাজ করেছেন ওখানে, মিসেস ফিলটার, জানাল কিশোর। পাঁচ বছর আগে বসন্ত কালে চলে এসেছেন। মিসেস ম্যালকম বললেন, এপ্রিল কি মে মাসে হবে। পরিষ্কার মনে করতে পারলেন না। তবে, রিজাইন দিয়ে আসেনি মিসেস ফিলটার।

তাড়িয়ে দিয়েছে, যেন কিছুই না ব্যাপারটা, এমনি ভাবে বলল জিনা। তাতে কি?

তাড়ায়ওনি। ওয়ান ফাইন মরনিং জাস্ট কাজে যাননি। এমন কি টেলিফোনও করেননি। দোকানের এক লোক খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে, বাসা ছেড়ে চলে গেছেন মিসেস ফিলটার। কোথায় গেছেন, কেউ বলতে পারল না। কাউকে জানিয়ে যাননি।

শূন্য চোখে তাকাল জিনা।

সোফায় হেলান দিয়ে ছিল রবিন, সামনে ঝুঁকল। পাঁচ বছর আগের বসন্তেই ডাকাতিটা হয়েছিল। কিশোর, বোধহয় তোমার কথাই ঠিক। হয়তো মিসেস ফিলটারই সাদা গাড়ি ড্রাইভ করেছিলেন। কিন্তু টিড-বিট ছাড়া ও টুইন লেকসে আসার মাঝের সময়টা কাটিয়েছেন কোথায়?

সেটা তাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখি না কেন? প্রস্তাব দিল কিশোর।

গল্পের ছলে কথা আদায়? মুসা হাসল। তা মন্দ হয় না। টেকনিকটা ভালই তোমার। চলো।

তোমাদের মন এত ছোট! কেঁদে ফেলবে যেন জিনা।

কিছু মনে করো না, জিনা, নরম গলায় বলল মুসা। তুমি থাকো।

না, জ্বলে উঠল জিনা, আমিও যাব। তোমাদের মুখ থুবড়ে পড়া না দেখে ছাড়ব ডেবেছ?

কিন্তু মিসেস ফিলটারের পিকআপটা গাড়িবারান্দায় নেই। ডেকে, দরজায় ধাক্কা দিয়েও সাড়া মিলল না।

মনে হয় শহরে গেছেন, জিনা অনুমান করল। এসো, ঢুকি। একটা নোট রেখে যাব, যেন আমাদের বাড়িতে দুপুরের খাওয়া খান।

দরজা ভেজানো রয়েছে। সোজা রান্নাঘরে চলে এল জিনা। পেছনে এল ছেলেরা।

মিসেস ফিলটার? ডাকল জিনা।

সাড়া নেই।

কাগজ-কলমের জন্যে লিভিং রুমে চলে গেল সে। গোয়েন্দারা রান্নাঘরেই রইল। রান্নাঘরটা আগের দিনের মত এত গোছানো নয়, অপরিষ্কার। স্টোডের ওপর হাঁড়ি চড়ানো, খাবারের টুকরো লেগে আছে। সিংকে ময়লা বাসন-কোসন, কোন কারণে ধোয়া হয়ে ওঠেনিবোঝা যায়।

কিশোর, লিভিং রুম থেকে জিনার ডাক শোনা গেল, মিসেস ফিলটার কোথাও বেড়াতে যাবেন মনে হচ্ছে।

দরজায় উঁকি দিয়ে কিশোর জিজ্ঞেস করল, কি করে বুঝলে?

বেডরুমের খোলা দরজা দেখাল জিনা। ছোট একটা স্যুটকেস উপড় হয়ে পড়ে আছে বিছানায়, পাশে এলোমেলো কিছু কাপড় চোপড়।

খোলা দরজার কাছে চলে এল কিশোর। এক নজর দেখেই বলল, তিনি অলরেডি চলে গেছেন।

চলে গেছেন? কিশোরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মুসা।

হাত তুলে খোলা আলমারি দেখাল কিশোর। কাপড় কই? সব নিয়ে গেছেন। ড্রয়ারগুলো কিভাবে খুলে আছে, দেখেছ? খালি। তিনি গিয়েছেন, এবং খুব তড়িৎ-অন্তর্ধান।

মানে? জিনা ঠিক মেনে নিতে পারছে না কিশোরের টিটকারি।

দেখে কিছু বুঝতে পারছ না? গতকালও এ-ঘর দেখেছ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে তকতকে। এই ঘর তো ভালই, রান্নাঘরে গিয়ে ভালমত দেখো। নোংরা। এটো বাসনগুলো পর্যন্ত সিংকে ভেজানো রয়ে গেছে। কোন কারণে এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিতে তিনি জেগেছেন।

কিডন্যাপ! হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল জিনা। তাকে ধরে নিয়ে গেছে! খাবার চুরি করেছিল যে, নিশ্চয় ওই ব্যাটা…

ঠিক তাই, মাথা দোলাল কিশোর। তা এজন্যেই বুঝি সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি করে লোকটার সঙ্গে কিডন্যাপ হয়েছেন? কেউ কিডন্যাপ করলে এভাবে স্যুটকেস গোছানোর সুযোগ দেয়?

বোধহয় বেড়াতেই গেছেন, মুসা বলল।

সন্দেহ আছে। বেড়াতে গেলে এভাবে নোংরা রেখে যেতেন না বাড়িঘর, এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। তাছাড়া গতকাল ঘুণাক্ষরেও জানাননি বেড়াতে যাবেন।

জরুরী কোন কারণে কোথাও যেতে পারেন, রবিন বলল। আমরা যাওয়ার পর হয়তো ফোন পেয়েছিলেন।

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর, কুটি করল, হ্যাঁ, এটা হতে পারে। তবে আরও একটা কারণ হতে পারে। ফিনিক্স থেকে বেরোনো খবরের কাগজটা তুমি দেখে ফেলেছ।

কিন্তু কাগজে কি আছে তিনি জানেন না, প্রতিবাদ করল জিনা। তিনি বাড়ি কেনার আগে থেকেই ওগুলো ছিল ওখানে।

হয়তো ছিল, মেনে নেয়ার ভঙ্গি করল কিশোর। কিন্তু তিনি ডাকাতিতে জড়িত থাকলে আর রবিন হাতে নেয়ার পর কাগজটার হেডলাইন নজরে পড়ে থাকলে, জেনে গেছেন কি লেখা রয়েছে। বুঝে গেছেন, গোলমালে পড়তে যাচ্ছেন। কারণ, তুমি, জরজিনা পারকার, কথা বেশি বলতে গিয়ে বলে ফেলেছ মৃত লোকটার ব্যাপারে তদন্ত করছি আমরা। দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে বেশি সময় যে লাগবে না আমাদের, এটা না বোঝার মত বোকা তিনি নন। এবং বোঝার পর তার কি করা উচিত?

পালানো, ফস করে বলে ফেলল মুসা।

মুখে কিছু আটকায় না তোমাদের। জিনার চোখে তিরষ্কার। এতই যদি আত্মবিশ্বাস, শেরিফকে ডাকছ না কেন?

ডেকে কি বলব? ভুরু নাচাল কিশোর। বলব, মিসেস ফিলটা চলে গেছেন? যে কোন স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার অধিকার আছে যে কোন স্বাধীন নাগরিকের। ডাকাতির সঙ্গে তিনি জড়িত, এর কোন প্রমাণ নেই আমাদের কাছে সবই অনুমান।

ধুলোয় ঢাকা গাড়িবারান্দায় বেরিয়ে এল কিশোর। মাটির দিকে চোখ রেখে এগোল। এক জায়গায় থেমে বালিতে চাকার দাগ পরীক্ষা করল। পিকআপের চাকার দাগের ওপর অন্য চাকার দাগও পড়েছে। পিছিয়ে গিয়ে রাস্তায় উঠে ম্যাকআরবারের বাড়িমুখো এগিয়েছে।

অদ্ভুত, আঙুল দিয়ে ঠোঁটে টোকা দিল কিশোর। শহরের দিকে যাননি। অন্য দিকে গেছেন।

যদি দাগগুলো তার গাড়ির চাকার হয়ে থাকে, জিনা বলল।

তার গাড়িবারান্দায় যে দাগ দেখেছি, তার সঙ্গে মিল তো রয়েছে।

ধুলোয় ঢাকা পথে চাকার দাগ ধরে ধরে এগোল ওরা। ম্যাকআরবারের গৌ ছাড়িয়ে এল। তাদেরকে দেখেই লাফ দিয়ে বেড়ার কাছে চলে এসেছে বিশাল কুকুরটা, বড় বড় লাফ মারছে পেরোনোর জন্যে, চেচাচ্ছে গলা ফাটিয়ে। বেগ থাকায় কুকুরটাকে আর বাধেনি ম্যাকআরথার। কিন্তু তাকে আর তার মেকসিকান শ্রমিকদেরকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

ম্যাকআরবারের সীমানার পর শ-খানেক গজ দূরে মোড় নিয়েছে গাড়ি, অনেক আগে রাস্তা ছিল এখানে, ভাল করে না তাকালে বোঝাই যায় না এখন। একেবেঁকে তী কয়েকটা মোড় নিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে গেছে পথটা।

কিন্তু কেন কেন তিনি পুরানো হ্যামবোনের পথে গেছেন? বলল জিনা।

হ্যামবোন? ফিরে তাকাল কিশোর।

ওই যে ওখানে, চূড়ার ওদিকে একটা সত্যি সত্যি ভূতুড়ে শহর আছে। ওটার নাম হ্যামবোন। আরেকটা খনি আছে ওখানে, ভেথ ট্র্যাপের মতই মৃত। ওখানে টুইন লেকসের মত স-মিলও নেই, তাই শহরটা পুরোপুরি মরে গেছে। কখনও যাইনি, রাস্তা নাকি খুব খারাপ। তবে ফোর-হুইল-ড্রাইভ জীপ বা ট্রাক হলে যাওয়া যায়।

মিসেস ফিলটারের গাড়িটা ফোর-হুইল-ড্রাইভ, কিশোর বলল। তিনি ওদিকেই গেছেন।

উত্তেজিত হয়ে পড়েছে মুসা। তাহলে আমরা যাচ্ছি না কেন? চিহ্ন ধরে ধরে তাকে অনুসরণ করতে পারি। জিনা তোমার চাচার একটা ফোর-হুইল-ড্রাইভ ট্রাক আছে, আর…

আর আমি সেটা চালাতেও পারি, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল জিনা। তবে সেটা ব্যাঙ্ক এলাকার মধ্যে, সমতল জায়গায়। এখানে আমি তো দূরের কথা, আমার ওস্তাদ… হঠাৎ উজ্জল হলো তার চেহারা। ঘোড় নিতে পারি আমরা। মিসেস ফিলটারের কি অবস্থা কে জানে। গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়ে থাকলে ভীষণ বিপদে পড়বেন। আমরা তাকে সাহায্য করতে পারব। ডিকিখালা এখন দয়া করে যদি কিছু খাবার গুছিয়ে দেয়, আর চাচাকেবোঝায়

…তাহলে সত্যিকারের একটা ভূতুড়ে শহরে দেখতে পাব আমরা, রবিনও উত্তেজিত।

ডিকিখালাকেবোঝানোর দায়িত্ব তোমার, জিনা, হেসে বলল মুসা। তুমি এক মিনিটে যতগুলো মিছে কথা বলতে পারবে, আমরা তিনজনে মিলে এক বছরেও তা পারব না।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *