১২. র‍্যাঞ্চ হাউসে ফিরে এল ওরা

র‍্যাঞ্চ হাউসে ফিরে এল ওরা। দু-হাতে পাজাকোলা করে খবরের কাগজের গাদা নিয়ে এসেছে রবিন।

কেন এনেছ এগুলো? মুসা জিজ্ঞেস করল। ইতিহাসে ডক্টরেট নেবে নাকি? থিসিস লিখবে?

আর আমাকেই বা চুপ করিয়ে দিয়েছিলে কেন তখন? জিনা অনুযোগ করল।

কারও কথারই জবাব না দিয়ে রবিন বলল, বেশির ভাগ কাগজই দা টুইন লেকস। চল্লিশ বছরের আগেও কপিও আছে। তবে এই যে, এটা, ফিনিক্স থেকে বেরোয়, পাঁচ বছর আগের, মে-র নয় তারিখের কপি। দেখো দেখো, হেডলাইনটা দেখো।

দেখে গভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। হুম! নিরাপদ কোথাও বসে ভালমত পড়া দরকার।

গোপন আর নিরাপদ জায়গা এখানে একটাই গোলাঘরটা। ভেতরে ঢুকে মডেল টি-র ধারে এসে বসল ওরা। কাগজের গাদা নামিয়ে রেখে ফিনিক্স থেকে বেরোনো পেপারটা মেলল রবিন। চারপাশ থেকে ঝুকে এল সবাই ওটার ওপর।

জোরে জোরে পড়ল রবিন :

আর্মার্ড ট্রাক লুট
দশ লক্ষ ডলার নিয়ে পালিয়েছে
মুখোশধারী ডাকাতেরা।

আজ বিকেল তিনটায় নর্থ ইনডিয়ান হেড রোডে এক দুঃসাহসিক ডাকাতি হয়েছে। ট্রাকটা সিকিউরিটিস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির! মুখখাশপরা তিনজন সশস্ত্র ডাকাত অতর্কিতে আক্রমণ করে ড্রাইভার হিনো মারকিং আর গার্ড ডিয়েগো পিটারকিনকে বেঁধে ফেলে, হাত-মুখ বেঁধে রাখে ট্রাকের পেছনে। তারপর দশ লক্ষ ডলার লুট করে নিয়ে পালিয়ে যায়। এখানে উল্লেখযোগ্য, ডাকাতদের হাতে ছিল কাটা-শটগান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য : সাদা একটা ক্রাইসলার সিডানে করে এসেছিল ডাকাতেরা। ফিনিশিয়ান লোন কর্পোরেশনের সামনে এসে আর্মার্ড ট্রাকটা থামার আগে থেকেই পথের ধারে দাঁড়িয়েছিল সাদা গাড়িটা। ডাকাতেরা মেঝেতে লুকিয়েছিল। টাকা লুট করে ওরা সাদা গাড়িতে তোলার পর পরই পাশের একটা কার্ড শপ থেকে এক মহিলা বেরিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল, দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চলে গেল ইনডিয়ান হেড রোডের উত্তর দিকে। মুখোশধারীদের চেহারার বর্ণনা পাওয়া যায়নি, তবে মহিলাকে ভালমতই দেখেছে প্রত্যক্ষদর্শী। মহিলার বয়েস পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে, হালকা-পাতলা গড়ন, চুল হালকা ধূসর, গায়ের রঙ তামাটে। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চিমত লম্বা, ওজন, আন্দাজ একশো তিরিশ পাউণ্ড। গাঢ় রঙের প্যান্ট ছিল পরনে, গায়ে টারটল-নেক সাদা শার্ট। গলায় অস্বাভাবিক বড় একটা ইনিডিয়ান হার ছিল, রূপার তৈরি, নীলকান্তমনি খচিত।

খাইছে! বলে উঠল মুসা। এক মিলিয়ন নিয়ে পালাল?

মে-র নয় তারিখ, বিড় বিড় করল কুিশোর। পাঁচ বছর আগে। রবিন, তার পরদিনই তো ডেথ ট্র্যাপ মাইনের মুখ সীল করার কথা বেরিয়েছিল লর্ডবুর্গের কাগজে?

হ্যাঁ, বলল রবিন। এবং এগারো তারিখ গাড়িটা চুরি গিয়েছিল।

সেই সময়, আপন মনেই বলে গেল কিশোর, মিসেস ফিলটারের বাড়ি ছিল খালি। আসেননি তখনও টুইন লেকসে। এলেন অক্টোবরে, জায়গা আর বাড়ি কিনলেন। কিন্তু কেউ একজন ছিল তখন ও-বাড়িতে, যে মে-র নয় তারিখে ফিনিক্সে ছিল, যে কাগজটা ফেলে গেছে।

বাড হিলারি! চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

অসম্ভব নয়, সায় দিয়ে বলল কিশোর। লর্ডসবুর্গ থেকে বেশি দূরে না ফিনিক্স। ডেথ ট্র্যাপ মাইন সীল করার মাত্র কয়েক দিন আগে দশ লক্ষ ডলার ডাকাতি হলো, তারপর লর্ডর্সবুর্গে একটা গাড়ি চুরি হলো, পাঁচ বছর পর খনিতে পাওয়া গেল এক জেলখাটা দাগী আসামীর লাশ। হ্যাঁ, কল্পনা করতে দোষ নেই, হিলারি ওই ট্রাক ডাকাতদের একজন, নয় তারিখে ফিনিক্স ছিল, তারপর লর্ডসবুর্গ থেকে গাড়ি চুরি করে পালিয়ে এসে লুকিয়েছিল টুইন লেকসে। মনে হচ্ছে, বুঝতে পারছি, কেন সে এসেছিল এখানে।

লুকাতে, বলল মুসা।

না। টুইন লেকসে লুকানোর জায়গা নেই। এখানে নতুন কেউ এলেই সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে যাবে। ধরা যাক, হিলারি ডাকাতদের একজন, তার ভাগের টাকা লুকানোর জন্যে নিরাপদ একটা জায়গার খোঁজ করছিল। মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে শিগগিরই, এমন একটা খনির চেয়ে টাকা লুকানোর ভাল জায়গা আর কোথায় হতে পারে?

চোখ বড় বড় করে ফেলেছে জিনা। কিন্তু রাখলে আবার বের করবে কি করে?

বাড হিলারির মত একটা ডাকাতের জন্যে সামান্য কয়েকটা লোহার শিক এমন কি বড় বাধা, রবিন জবাব দিল।

টাকাগুলো তাহলে ম্যাকআরথারই পেয়েছে। চেঁচিয়ে উঠল জিনা। খনিতে লুকানো থেকে থাকলে সে ছাড়া আর কেউ পায়নি। এজন্যেই কাউকে খনির ধারেকাছে ঘেঁষতে দেয়নি ব্যাটা। লাশটা আছে জেনেও বলেনি। সুযোগ মত লুকিয়ে ফেলত লাশটা, তাহলে টাকার কথা আর অনুমান করতে পারত না কেউ। কিন্তু তার কপাল খারাপ, আমরা তার আগেই গিয়ে দেখে ফেলেছি।

সেটা সম্ভব, বলল কিশোর। কিন্তু আপাতত ম্যাকআরবারের কথা ভাবছি। না আমরা। হিলারির টুইন লেকসে আসার আরও একটা কারণ থাকতে পারে।

কি? জিজ্ঞেস করল রবিন।

হতে পারে, লর্ডসবুর্গের খবরের কাগজে খনিটা সম্পর্কে যা যা বেরিয়েছে, তার চেয়ে বেশি জানত হিলারি। হতে পারে, কেউ তাকে বাতিল খনিটার কথা সব বলেছিল, বলেছিল খনির পরিত্যক্ত জায়গাগুলোর কথা। হতে পারে, সেই লোক হিলারির কুকাজের এক সহকারী।

কি বলতে চাইছ? বুঝতে পারছে না জিনা।

ফিনিক্সের ছোট একটা দোকানে কয়েক বছর চাকরি করে টুইন লেকসে ফিরে এলেন মিসেস ফিলটার, ডাকাতিটার কয়েক মাস পরে। বেশ বড় সাইজের একটা সম্পত্তি কেনার মত টাকা নিয়ে এলেন সঙ্গে করে। হিলারির সহকারী হতে পারেন না?

তু-ত্তুমি পাগল হয়ে গেছ! উত্তেজনায় কথা স্পষ্ট করে বলতে পারল না জিনা।

তু-তুমি পাগল হয়ে গেছ! উত্তেজনায় কথা স্পষ্ট করে বলতে পারল না

না, তা হইনি, হালকা গলায় বলুল কিশোর। যে গাড়িতে করে পালিয়েছিল ডাকাতেরা, সেটার ড্রাইভার ছিলেন মহিলা।

ঠিক! দু-আঙুলে চুটকি বাজাল রবিন। ঠিক বলেছ। মহিলার বয়েস ছিল পঞ্চান্ন থেকে ষাটের মধ্যে, হালকা ধূসর চুল, গায়ের রঙ তামাটে। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা, একশো তিরিশ পাউন্ড ওজন। গলায় রূপার হার, তাতে বসানো নীলকান্তমনি।

কি জিনা, ভুরু নাচাল কিশোর, এ-রকম কাউকে চিনি আমরা?

কিন্তু কিন্তু ওরকম আরও অনেক মহিলা থাকতে পারে, আর ওই হার একা মিসেস ফিলটার পরেন না, বাজারে আরও কিনতে পাওয়া যায়। মিসেস ফিলটার একজন অত্যন্ত ভাল মহিলা।

ব্যবহার ভাল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ডাকাতিটা যখন হয়, তখন মহিলা ফিনিক্সে ছিলেন, এটা তো ঠিক। ব্যবসায় নেমে জমানো টাকা সব খুইয়েছিলেন, তারপর চাকরি নিয়েছিলেন ছোট একটা দোকানে, সেখানে কত আর বেতন পেতেন?

খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার পর কত আর জমানো যায় ওই টাকা থেকে? কিন্তু দেখা গেল বেশ মোটা টাকা নিয়ে ফিরেছেন, ডাকাতির কয়েক মাস পর। কোন কাজ করেন না, অথচ বেশ আছেন এখানে। শান্ত, ভদ্র, আত্মবিশ্বাসী, এতবড় একটা ডাকাতির জন্যে পারফেক্ট চরিত্র। সব চেয়ে বড় কথা, প্রত্যক্ষ দর্শীর বিবরণের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে সব কিছু।

তাতে কি! রেগে উঠল জিনা। দেখো কিশোর, কোন প্রমাণ নেই তোমার হাতে। কিছু প্রমাণ করতে পারবে না।

না তা পারব না, স্বীকার করল কিশোর, তবে কতগুলো অদ্ভুত যোগাযোগ দেখতে পাচ্ছি। প্রমাণ খোঁজা শুরু করতে পারি আমরা, নরম চোখে তাকাল জিনার দিকে। আরেকটা সম্ভাবনার কথা ভেবে দেখতে পারি। যদি মিসেস ফিলটার ডাকাতিটার সঙ্গে যুক্ত থাকেন… নাটকীয় ভঙ্গিতে চুপ করে গেল সে।

বলো। থামলে কেন? চেঁচাল জিনা।

তাহলে এমনও হতে পারে, বাড হিলারি একা আসেনি টুইন লেকসে। হয়তো…হয়তো টাকা লুকানোর সুযোগই পায়নি।

মিসেস ফিলটার ধাক্কা দিয়ে তাকে খাদে ফেলে দিয়েছেন, জিনার কণ্ঠ কাপছে, মুখচোখ লাল, এই তো বোঝাতে চাইছ? তুমি…তুমি বদ্ধ পাগল হয়ে গেছ, কিশোর পাশা। তোমার আর কোন কথা শুনতে চাই না, ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।

কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। সত্যি তুমি ভাবছ, মিসেস ফিলটার হিলারিকে খুন করে তার ভাগের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন?

না, মাথা নাড়ল কিশোর। এমনি কথার কথা বলছিলাম জিনার সঙ্গে। তবে, ডাকাতিটায় ওই মহিলাও জড়িত থাকলে অবাক হব না।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *