১১. বিকেল নাগাদ র‍্যাঞ্চে ফিরে

বিকেল নাগাদ র‍্যাঞ্চে ফিরে এল ওরা। গাড়ি থেকে মালপত্র নামাতে উইলসনকে সাহায্য করল ছেলেরা। চারাগুলোকে গোলাঘরের কাছে রেখে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখল। বাড়ির ভেতরে চলে গেছেন উইলসন।

মিসেস ফিলটারের বাড়ির দিকে তাকাল কিশোর। ডেথ ট্র্যাপ মাইনের কথা আর সবার চেয়ে ওই মহিলাই বেশি বলতে পারবেন।

মিসেস ফিলটার? জিনা বলল, হ্যাঁ, তা পারবেন।

চলো যাই তাহলে, তার সঙ্গে দেখা করে আসি।

অন্য দুজনও এক কথায় রাজি। রাস্তা পেরিয়ে মিসেস ফিলটারের বাড়িতে এসে দাঁড়াল চারজনে, দরজায় ধাক্কা দিল কিশোর।

সাড়া দিলেন মিসেস ফিলটার, ভেতরে যেতে বললেন ছেলেদেরকে।

ভেজানো দরজা, ঠেলা দিতেই খুলে গেল। পথ দেখিয়ে ছেলেদেরকে রান্নাঘরে নিয়ে এল জিনা। মিসেস ফিলটারকে জিজ্ঞেস করল, ব্যস্ত?

হাসলেন মহিলা, চোখের কোণের ভাঁজগুলো গভীরতর হলো। আজকাল আর ব্যস্ততা কোথায়? তবে আমাকে যদি একটু সাহায্য করতে, প্লীজ…আমার ট্রাকে কিছু মালপত্র আছে, যদি নামিয়ে দিতে। মুদীর কাছে গিয়েছিলাম।

ঠিক আছে, ঠিক আছে, এক্ষুণি দিচ্ছি নামিয়ে, বলল মুসা।

কাঁচা মাটির গাড়িবারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মিসেস ফিলটারের ট্রাক। বড় একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স বোঝাই বাদামী রঙের কাগজে মোড়া প্যাকেট। রান্নাঘরে বয়ে নিয়ে এল ওটা মুসা, নামিয়ে রাখল।

থ্যাংক ইউ, বললেন মিসেস ফিলটার। বয়েস হয়েছে তো, আগের মত কাজ আর করতে পারি না। প্যাকেট খুলে শাকসজি, রুটি ও টিনের খাবার বের করে তাকে সাজিয়ে রাখতে লাগলেন।

হঠাৎ চাপা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন মিসেস ফিলটার। খনি-খনি খেলা শুরু করেছে আবার ম্যাকআরথার। এটাই আশা করছিলাম। আধ ঘন্টা আগে তার শহুরে বন্ধুকে নিয়ে ঢুকতে দেখেছি তো।

খনি খুঁড়ছে নাকি আবার? বলল কিশোর।

দেখেশুনে তা-ই মনে হয় বটে, সায় দিয়ে বললেন মিসেস ফিলটার। বিস্ফারণ ঘটাচ্ছে খনির ভেতরে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখানেই জন্মেছি তো, ওই শব্দ আমি চিনি, কোনদিন ভুলব না। এই বাড়িতেই বাস করেছি, যখন আমার স্বামী সুপারিনটেনডেন্ট ছিল। খনির সুড়ঙ্গে ডিনামাইট ফাটার শব্দ কয়েকদিন শুনলেই তোমরাও আর ভুলবে না। কিন্তু সব সময় খনিতে বোমা ফাটায়

ম্যাকআরথার, শুধু সঙ্গী থাকলেই ফাটায়। তার লস অ্যাঞ্জেলেসের বন্ধুকে দেখায় বোধহয়।

অদ্ভুত শখ, রনি মন্তব্য করল।

অনেকেরই থাকে এ-রকম, হাসলেন মিসেস ফিলটার। একটা লোককে চিনতাম, তার বাড়ির পেছনে মাঠে তিনশো গজ লম্বা এক লাইন বসিয়েছিল, পুরানো একটা রেলইঞ্জিন কিনে তাতে চালাত। বার বার সামনে-পেছনে করত, চালানোর সময় ড্রাইভারের পোশাক পরে নিত। বেশি টাকা থাকলেই এসব ভূত চাপে লোকের মাথায়। ম্যাকআরথারেরও হয়তো ওরকম কিছু হয়েছে। সারাজীবন বাপের মুখে খনির গল্প শুনে শুনে খনি-খোড়ার ভূত চেপেছে আর কি। সেই পুরানো দিনের স্বাদ পেতে চাইছে। এতে দোষের কিছু দেখি না।

এত নির্দোষ ভাবছেন ওকে? জিনার পছন্দ হলো না মিসেস ফিলটারের কথা।

দেখো, কিছু মনে করো না, একটা কথা বলি। কোন সময় সহজ ব্যাপারকে ঘোরাল করবে না। তুমি তার সব কাজেই দোষ দেখতে পাও, তাকে পছন্দ করো না বলে। তবে তোমাকেও দোষ দিই না। নোকটা তেমন মিশুক নয়। সীমানায় বেড়া লাগিয়ে ভালই করেছে। যা একটা কুত্তা পোষে, কখন কাকে কামড়ে দিয়ে বিপদ বাধাবে।

আবার শোনা গেল বিস্ফোরণের শব্দ।

মিসেস ফিলটার, কিশোর বলল, সত্যিই কিছু নেই তো খনিতে? মানে কাজের কাজ কিছু করছে না তো?

জোরে মাথা নাড়লেন মিসেস ফিলটার। ডেথ ট্র্যাপ মাইন শেষ, মরা। চল্লিশ বছর আগেই ফুরিয়ে গেছে রুপা। তোমরাও হয়তো জানো। খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেক দিন খুব দুঃসময় গিয়েছিল আমাদের। এখান থেকে চলেই যেতে হলো শেষে বাধ্য হয়ে। এখানে সামান্যতম সম্ভাবনা থাকলে যেতাম ভাবছ? তারপর রিচার্ড মারা গেল, সে-ও বাইশ বছর আগের ঘটনা। তার বীমার টাকা সব তুলে ফিনিক্সে একটা দোকান দিলাম। ইনডিয়ানদের কাছে মোকাসিন আর গহনা বিক্রি করতাম, কিন্তু ব্যবসার কিছুই বুঝি না, খোয়ালাম সব। দোকান-টোকান বেচে দিয়ে আবার ফিরে আসতে হলো যেখান থেকে গিয়েছিলাম সেখানে। টেনেটুনে চলছি কোনমতে এখন। ঘৃণা ফুটল চোখে, বোধহয় নিজের ওপরই। হঠাৎ করেই কোমল হলো তাঁর দৃষ্টি। তবে, এখানে আসার জন্যে ছটফট করছিলাম আমি। যেখানে জন্মেছি, অনেকগুলো সুখের বছর কাটিয়েছি, সেখানে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটানোর ইচ্ছে কার না হয়? ম্যাকআররও বোধহয় তাই চায়। তার ছোটবেলা দেখেছি, নোঙরা, ললিপপ চুষত, রঙিন লালা লেগে থাকত সারা মুখে। তখনও অদ্ভুত কিছু ছিল ছেলেটার মধ্যে। কী, ঠিক মনে করতে পারছি না।

কিন্তু সত্যি যদি কিছু পাওয়ার আশা করে থাকে ম্যাকআরথার, কোন লাভ হবে না, এটা তো ঠিক? বলল কিশোর।

তা ঠিক। কিচ্ছু নেই আর ওই খনিতে।

রূপা নেই, কিন্তু যদি স্বর্ণ থাকে? দুটো ধাতু অনেক সময় পাশাপাশি থাকে তো।

থাকে। কিন্তু ডেথ ট্র্যাপ মাইনে নেই।

তামা?

না। শুধু রূপা ছিল, শেষ হয়ে গেছে, পুরানো দিনের স্মৃতি মনে করেই বোধহয় বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন মিসেস ফিলটার! সব শেষ। এক কালে কি শহরই না ছিল টুইন লেকস, কি আরামেই না ছিলাম আমরা। আবার যদি অলৌকিক কিছু ঘটত, সত্যি সত্যি কিছু পাওয়া যেত খনিটাতে, বুড়ো বয়েসে আবার হয়তো সুখের মুখ দেখতে পারতাম। কিন্তু তা-তো হবার নয়। যাকগে, এসো আমার ছোটখাট জমিদারী দেখাই তোমাদের, কথাগুলো তিক্ত শোনাল।

ছেলেদেরকে নিয়ে বাইরে বেরোলেন মিসেস ফিলটার। এখানে আসার পর ভেবেছিলাম, দরজায় তালা লাগানোর ব্যবস্থা করব, বললেন তিনি। কিন্তু পরে দেখলাম কোন দরকার নেই। জিনা লাশটা দেখার পর অবশ্য অবস্থা অন্য রকম হয়েছে। এখন অচেনা লোক আসছে। হ্যাঁ, জিনা, ভাল কথা, তোমার চাচার ছুরি পাওয়া গেছে?

নাহ্। নিয়ে গেলে আর কি পায়?

পাবে হয়তো কেউ একদিন পাহাড়ের ওদিকে, মরচে-টরচে পড়া অবস্থায়। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির উত্তর ধারে পুরানো একটা ঘরের কাছে চলে এলেন মিসেস ফিলটার। বললেন, মিলানোর ঘর ছিল এটা। খনির পে-মাস্টার ছিল সে।

দরজায় ঠেলা দিলেন মিসেস ফিলটার। মৃদু ক্যাচকোচ প্রতিবাদ জানিয়ে খুলে গেল দরজা। সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। দীর্ঘ দিনের অব্যবহৃত আসবাবপত্র, দেয়ালের প্লাসটার খসা, আলমারির দরজা ভেঙে খুলে ঝুলে রয়েছে। ভেতরে নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র, কিছু ভাঙাচোরা, কিছু মোটামুটি ভাল।

অনেকেই অনেক কিছু ফেলে গেছে, বললেন মিসেস ফিলটার। নেয়ার দরকারই মনে করেনি, বোঝা মনে করে ফেলে গেছে।

বাড়িগুলো খালি ফেলে রেখেছেন কেন? জিনা জিজ্ঞেস করল।

তো কি করব?

ভাড়া দিয়ে দিলেই পারেন। অনেক ঝামেলা আছে অবশ্য, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা।

তা নাহয় করলাম। কিন্তু ভাড়া নেবে কে? তোক কোথায়?

ঘুরে ফিরে দেখছে ছেলেরা। বালি উড়ছে, বদ্ধ ঘরের পুরানো ভ্যাপসা গন্ধে বাতাস ভারি। জায়গায় জায়গায় ছাতের প্লাসটার খসে পড়েছে, বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ে আরও বেশি করে নষ্ট হয়েছে ওসব জায়গা। মুসার ভয় হলো, গায়ের ওপরই ধসে পড়ে।

মরচে ধরা একটা স্টোভের কাছে একগাদা খবরের কাগজ স্কুপ হয়ে আছে, হলদে হয়ে গেছে পুরানো হতে হতে।

কাগজের স্তুপের পাশে গিয়ে বসে পড়ল রবিন। উল্টে দেখল দু-একটা। মিসেস ফিলটারকে জিজ্ঞেস করল, আপনি যখন জায়গাটা কেনেন, তার আগে থেকেই ছিল? মানে, পাঁচ বছর আগে যখন এলেন?

বোধহয় ছিল, মনে করার চেষ্টা করছেন মিসেস ফিলটার। হ্যাঁ, ছিলই। নইলে পরে আসবে কোত্থেকে? আমি তো রাখিনি।

ইনটারেসটিং, গালে আঙুল রাখল রবিন। আমি নিতে পারি এগুলো?

এই বস্তাপচা পুরানো খবরের কাগজ দিয়ে কি করবে? ভুরু কোঁচকালেন মিসেস ফিলটার।

ও খবরের কাগজের পোকা, হেসে বলল জিনা। পুরানো কাগজ জোগাড় করা হবি। কত রকম পাগলই তো আছে দুনিয়ায়। লাশটা পাওয়ার পর দি টুইন লেকসের অফিসে গিয়েছিলাম আমরা। জানার চেষ্টা করেছি কেন এসেছিল বাড হিলারি, কি করছিল। অনেক কিছুই জেনেছি, কিন্তু…

বার বার জিনার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপছে কিশোর, কিছু না বলার ইঙ্গিত করছে, কিন্তু দেখছেই না জিনা।

রবিন বুঝল ব্যাপারটা, তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বলল, আমার বাবা খবরের কাগজের লোক। পুরানো কাগজের প্রতি ভীষণ আগ্রহ। সে জন্যেই নিতে চাইছি। নেব?

কিছুটা বিস্মিত মনে হলো মিসেস ফিলটারকে। নাও। নিয়ে যাও।

সাবধানে, যেন না ছেড়ে এমনিভাবে সাজিয়ে কাগজের গাদা তুলে নিল রবিন। ঘর থেকে বেরিয়ে এল সবাই। বাইরে পড়ন্ত বিকেলের সোনালি রোদ।

কিছু খাবে তোমরা? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস ফিলটার। ঠাণ্ডা কিছু?

মুসার আপত্তি নেই, হেসে বলল জিনা।

চলো। কমলার শরবত আছে।

মিসেস ফিলটারের ছোট রান্নাঘরে আবার ফিরে এল ওরা। ফ্রিজ খুললেন মহিলা। কিন্তু কমলার রসের বোতল নেই। তাক খোঁজা হলো, আলমারি খোঁজা হলো, কিন্তু কোথাও নেই। আরে, গেল কই? মহিলা তো অবাক। দু বোতল ছিল। আমি তো আজ খাইনি। তাহলে?

সব কিছুই খুঁটিয়ে দেখা কিশোরের স্বভাব। মুদী দোকান থেকে সদ্য আনা জিনিসগুলো যেখানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, সে-তাকের দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। বলল, রুটিও একটা কম। আর এক টিন মাছ। আপনি তখন, রেখেছিলেন, দেখেছি।

কিশোরের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন মহিলা, যেন কথা বুঝতে পারছেন। তাকের দিকে এক নজর চেয়েই দৌড়ে গেলেন দরজার দিকে, বাইরে তাকালেন। যেন দেখতে পাবেন, তার খাবারগুলো হাতে নিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছে কোন লোক।

খবরের কাগজের গাদা নামিয়ে রাখল রবিন। রান্নাঘরের সিংক থেকে তুলে আনল একটা পোড়া সিগারেটের টুকরো। মিসেস ফিলটার, আপনি নিশ্চয় সিগারেট খান না?

রবিনের হাতের দিকে চেয়ে রইলেন মিসেস ফিলটার। চেঁচিয়ে উঠলেন হঠাৎ, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। এ-কার কাজ? কার এত খিদে পেয়েছে? আমার কাছে চাইলেই পারত, চুরি করল কেন?

শুধু খাবারই, মুসা বলল, হয়তো আরও এমন কিছু দরকার হয়েছে তার, যেটা চাইলে দিতেন না আপনি। আসুন না খুঁজে দেখি। এমনও হতে পারে, চোর এখনও বাড়িতেই লুকিয়ে আছে।

রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এল সবাই। প্রতিটি ঘর, আলমারি, বিছানার তলা খুঁজে দেখল। চোর নেই।

তেমন মূল্যবান কিছু নেই আমার, চোরে নেয়ার মত, বললেন মিসেস ফিলটার। আর কিছু খোয়াও যায়নি।

শেষ পর্যন্ত তালা আপনাকে লাগাতেই হচ্ছে, মিসেস ফিলটার, বলল কিশোর। এখন থেকে বাইরে বেরোলে তালা লাগিয়ে বেরোরেন।

কিন্তু টুইন লেকসে কেউ তালা লাগায় না, করুণ কণ্ঠে বললেন মহিলা।

আগে অচেনা কেউ ছিল না, এখন অনেকেই আসা-যাওয়া করছে। কে ভাল কে খারাপ, কি করে বুঝবেন? এই তো, খাবার চুরি করে নিয়ে গেল। একবার যখন করেছে, খিদে পেলে আবারও আসতে পারে। হুশিয়ার থাকা ভাল না?

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *