১০. লর্ডসবুর্গে পোস্ট অফিসের সামনে

লর্ডসবুর্গে পোস্ট অফিসের সামনে গাড়ি পার্ক করলেন উইলসন। স্যান জোসেতে চারার অর্ডার দিয়েছিলাম, বললেন তিনি। ওগুলো ডেলিভারি নিয়ে বিল্ডারস সাপ্লাই কোম্পানিতে যাব, কাজ আছে। ঠিক একটায় এখানে থাকব, তোমরাও

থেকো। লাঞ্চ সেরে তারপর বাড়ি রওনা হব।

চাচা, ওদের সঙ্গে আমি যাই? জিনা অনুরোধ করল।

যাবে? ঠিক আছে, যাও। কোন রকম গোলমাল পাকিও না আবার। এখানে অবশ্য খনি-টনি কিছু নেই, কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস কি। কখন যে কোথায়… বাক্যটা শেষ করলেন না তিনি।

আর কিছু না বলে পোস্ট অফিসে ঢোকার দরজার দিকে এগোলেন উইলসন।

আগে নুড়িটা দেখাচ্ছ তো? কিশোরকে জিজ্ঞেস করল মুসা। তাতে সময় লাগবে। কোথায় পাওয়া গেছে, বলবে নাকি জুয়েলারকে?

পাগল। টুইন লেকসে সোনা আছে শুনলে মৌমাছির মত গিয়ে ভিড় করবে লোকে। রিপোর্টারদের জ্বালায় পালানো ছাড়া পথ থাকবে না। দেখি, কিছু একটা বানিয়ে বলে দেব জুয়েলারকে।

পোস্ট অফিসের দুটো ব্লক পরেই পাওয়া গেল জুয়েলারের দোকান। জানালায়। সাইনবোর্ড লেখা :

ঘড়ি মেরামত করা হয়।
পুরানো স্বর্ণ আর রৌপ্য
কেনা-বেচা করা হয়।

ঠিক এরকম কাউকেই খুঁজছিলাম, বলে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল কিশোর।

মোটা, প্রায় গোলাপী রঙের একটা লোক বসে আছে কাচের পার্টিশনের ওপাশে। চোখে একটা ঘড়ির মেকানিকের লেন্স, ঘড়ি মেরামত করছে লোকটা। তার পাশে একটা শো-কেসে সাজানো রয়েছে রূপার পুরানো জিনিসপত্র, কয়েকটা সোনার টাই-পিন আর আঙটি।

আপনিই মালিক? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

হাতের ছোট ভ্রু-ড্রাইভারটা রেখে চোখ থেকে লেন্স খুলে রাখল লোকটা। হাসল।

পকেট থেকে নুড়িটা বের করল কিশোর। সিলভার সিটিতে বন্ধুর ওখানে বেড়াতে এসেছি আমরা। গতকাল পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম, এক বুড়োর সঙ্গে দেখা, খনিজ পদার্থের সন্ধানে পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় সে।

মাথা ঝাঁকাল মালিক। আজকাল অনেকেই ঘোরে।

লোকটা বলল, তার টাকা দরকার। এটা বের করে দিল, নুড়িটা বাড়িয়ে দিল কিশোর। বলল, অনেক দিন ধরে আছে তার কাছে। টাকা লাগবে, তাই বিক্রি করে দিতে চায়।

চোখ তেরছা করে নুড়িটা দেখল মালিক, জোরে জোরে ডলল আঙুল দিয়ে। হাসিটা তেমনি রয়েছে। কত দিয়েছ?

পাঁচ ডলার, বলল কিশোর।

এটা আসল? জিজ্ঞেস করল জিনা।

মনে তো হচ্ছে, ঘুরিয়ে বলল লোকটা। স্বর্ণ আছে কিনা বোঝা যাবে এখুনি। ডুয়ার খুলে ছোট একটা শিশি আর একটা উখা বের করল সে। উখা দিয়ে ঘষে সরু একটা দাগ কাটল নুড়ির গায়ে, শিশি থেকে এক ফোঁটা তরল পদার্থ ফেলল খাজে। নাইট্রিক অ্যাসিড, জানাল সে। বেশির ভাগ ধাতুরই বিক্রিয়া ঘটায়, তবে সোনার কিছু হয় না। কয়েক সেকেণ্ড পর মাথা ঝাঁকাল। হ্যাঁ, সোনা আছে।

রেডিমেড সোনা মেলে প্রকৃতিতে? জিজ্ঞেস করল কিশোর। আমি বলতে চাইছি, প্রসেসিং ছাড়াই খাঁটি সোনা বের করা যায়?

সাধারণত অন্য ধাতুর সঙ্গে মেশানো থাকে স্বর্ণ। তবে এটা খুব ভাল পেয়েছ। কোথায় পেল লোকটা, কে জানে।

বলেনি, তাড়াতাড়ি জবাব দিল কিশোর।

হুঁ, নুড়িটা আবার ফিরিয়ে দিল জুয়েলার। কোন বাতিল খনিতে পেয়েছে বোধহয়, ক্যালিফোর্নিয়ার কোন জায়গায় হবে। খনি বন্ধ করে দেয়ার পরেও এসব খনিজ-সন্ধানীরা বহুদিন তার আশেপাশে ঘুরঘুর করে, ছিটেফোটা পায়ও মাঝে মাঝেই।

নুড়িটা পকেটে রাখতে রাখতে বলল কিশোর, অন্য ধাতুর সঙ্গে মেশানো থাকে বললেন। এটার সঙ্গে কি মেশানো আছে? রূপা-টুপা কিছু?

না। লালচে। তার মানে তামা। রূপা থাকলে সবজে দেখাত। বাক্স খুলে পুরানো একটা টাই-পিন বের করল জুয়েলার। ওক পাতার মত ডিজাইন, খুব হালকা সবুজ একটা ভাব রয়েছে। এই যে, এটাতে আছে। অনেকে সবুজ সোনা বলে একে। পঁচিশ পারসেন্ট রূপা, তারমানে এটা আঠারো-ক্যারাট স্বর্ণ। আর এই যে আঙটিগুলো, পঁচিশ-ক্যারাট। বাচ্চাদের জন্যে বানানো হয়েছে বড়দিনের উপহারের জন্যে কেনে লোকে। তবে খুব নরম, সেটা বলে দিই আমি বিক্রির। সময়। তোমার নুড়িটাতে এই জাতের স্বর্ণই আছে।

পাঁচ ডলার দাম ঠিক আছে?

তা আছে। আজকাল তো একটা প্ল্যাসটিকের টুকরোর দামও এর চেয়ে বেশি। যত্ন করে রেখে দাও। কখনও টাই-পিন বা আঙটি বানাতে ইচ্ছে হলে সোজা চলে এসো আমার কাছে।

জুয়েলারকে ধন্যবাদ জানিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল ওরা।

খাইছে! উত্তেজনা আর চেপে রাখতে পারল না মুসা। খনিটাতে সত্যি সত্যি সোনা রয়েছে!

তামাও, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। কিন্তু অবাক লাগছে, এটাতে রূপার বদলে তামা কেন? রূপা থাকাটাই তো স্বাভাবিক ছিল, কারণ পাওয়া গেছে রূপার খনিতে। সোনা আর রূপা এক খনিতে পাওয়া যায়, এটা জানি আমি, কিন্তু সোনা, রূপা, তামা…নাহ, মিলছে না।

মজার ব্যাপার,? জিনা বলল। শয়তানের চেলা তো ব্যাটা, ওর ওস্তাদই বোধহয় গোপনে ওকে জানিয়েছে, খনিটার ভেতরে সোনার স্তর লুকানো আছে। ওর বাপ ছিল ফোরম্যান, দক্ষ খনিকার। হয়তো সে-ই খোঁজ পেয়েছিল সোনার, চুপ থেকেছে, ছেলে বড় হওয়ার পর তাকে বলেছে। ব্যস, জনাব ম্যাকআরথার এসে কিনে নিয়েছেন খনিটা। গল্প ফেঁদেছেন, জন্মভূমির জন্যে কেঁদে কেঁদে তার অন্তত চুরচুর হয়ে গেছে, আহারে। মিথুকের বাচ্চা মিথ্যুক!

তাই যদি হয়, কিশোর বলল, তাহলে আরও আগেই এল না কেন? তার। বয়েস এখন চল্লিশ, আরও বিশ বছর আগেই আসতে পারত। কয়েক বছর আগে সোনার দাম চড়েছিল, তখনও তো আসতে পারত, আর আসার মোক্ষম সময় ছিল সেটাই। কেন এল না?

আসেনি যে সেটা জানছি কি করে? পাল্টা প্রশ্ন করল জিনা। পাঁচ বছর আগে যখন ডাকাত বাড হিলারি খনিতে পড়ে মরল, তখন ম্যাকআরথারও যে আসেনি সঙ্গে, শিওর হচ্ছি কিভাবে? দুজনে পার্টনার হিসেবেই হয়তো এসেছিল। কোন কারণে মতের মিল হয়নি, ঝগড়া লেগেছিল, তাই হয়তো লোকটাকে গর্তে ঠেলে ফেলে দিয়েছে ম্যাকআরথার।

খুব বেশি কল্পনা করছ, জিনা, প্রতিবাদ করল রবিন। একজন কোটিপতি পুরানো এক খনিতে এক ডাকাতের সঙ্গে ঝগড়া করতে আসবে কেন? কোন কারণ নেই। আর যদি ম্যাকআরথার জানেই খনিটাতে স্বর্ণ আছে, তাহলে পার্টনার নেয়ার কোন দরকার নেই। ওই স্বর্ণ তোলার সামর্থ্য তার একারই আছে। আর তার খনি থেকে সে যদি সোনা তোলেই, সেটা বেআইনী কিছু নয়, কাজেই গোপনে তোলার চেষ্টা করার তো কোন কারণ দেখছি না। ওসব বাদ দিয়ে এসো এখন কাজের কথা বলি, বা হিলারির খোঁজ লাগাই।

পকেট থেকে নোটবুক বের করে জোরে জোরে পড়ল রবিন বাড হিলারি, দাগী আসামী, নিয়মিত দুবার দেখা করেই গায়েব হয়েছে। অনেকগুলো ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে সে, বেরি হারবার্ট, বন হিরাম, বার হুম্যান। স্যান কোয়েনটিন থেকে ছাড়া পেয়ে পাঁচ বছর আগে স্যান ফ্রানসিসকো থেকে নিখোঁজ হয়েছে। সেটা সম্ভবত জানুয়ারির শেষ কিংবা ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে। টুইন লেকসে পৌচেছে হয়তো মে মাসের কোন এক সময়, লর্ডসবুর্গ থেকে গাড়ি চুরি করে নিয়ে।

খুব ভাল রের্কড লিখেছ, নথি, প্রশংসা করল কিশোর।

একটা ব্যাপার লক্ষ করার মত, বলে গেল রবিন, তার আসল নাম আর ছদ্মনাম, সবগুলোরই আদ্যাক্ষর বি এইচ। লর্ডসবুর্গেও যদি কোন ছদ্মনাম নিয়ে থাকে, এই দুটো অক্ষর দিয়েই হয়তো নাম বানিয়েছে। সেভাবেই খোঁজা দরকার আমাদের। কিশোর, পাবলিক লাইব্রেরি থেকে শুরু করব? ফোন বুক, সিটি ডিরেকটরি, পুরানো খবরের কাগজ, সবই পাওয়া যাবে ওখানে।

সায় দিল কিশোর।

জিনা চেনে লাইব্রেরিটা। পথ দেখিয়ে তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে এল সেখানে। খুব ভদ্রভাবে লাইব্রেরিয়ানকে জানাল কিশোর, এই অঞ্চলে বেড়াতে এসেছে ওরা। তার এক মামা নাকি থাকে এখানে, অনেক দিন কোন খোঁজখবর নেই, তাই আসার সময় কিশোরের মা বলে দিয়েছে, পারলে মামার খোঁজ নিয়ে আসতে। লাইব্রেরিয়ান মানুষটা ভাল, তাছাড়া এমনভাবে অভিনয় করে বলেছে কিশোর, গলে গেলেন। নিজেই উঠে গিয়ে ফোন বুক, সিটি ডিরেকটরি বের করে দিলেন। পাঁচ বছরের পুরানো বই-পুত্র নিয়ে লম্বা একটা টেবিলে বসে গেল ওরা। নামের আদ্যাক্ষর বি এইচগুলো খুঁজছে।

বেশিক্ষণ লাগল না। দশ মিনিটেই যোলোটা নাম পেয়ে গেল। কিন্তু পনেরোজনই লর্ডসবুর্গের স্থায়ী বাসিন্দা। বাকি থাকল একজন, তার নাম বেকার। হেইম্যান। পাঁচ বছর আগেরর ডিরেকটরিতে আছে, মাঝখানে কয়েকটা বছর নেই, তারপর একেবারে চলতি বছরের বইতে আবার নাম উঠেছে।

মাঝখানে কোথাও চলে গিয়েছিল হয়তো, কিশোর বলল আবার ফিরেছে। আগে যে বাড়ির ঠিকানা ছিল, এখনও তাই আছে।

না, ও আমাদের চোর না, মাথা নাড়ল মুসা। বোঝা যাচ্ছে, কোথাও নামধাম না লিখিয়েই কেটে পড়েছে লর্ডসবুর্গ থেকে আমাদের বি এইচ।

থাকার তো কথা মাত্র কয়েক মাস, রবিন বলল।

পেয়েছ? নিজের ডেস্ক থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন লাইব্রেরিয়ান।

না, স্যার, হতাশ ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। মা বোধহয় ভুল অনুমান করেছে। এখানে আসেইনি মামা। আর এসে থাকলেও হয়তো ডিরেকটরিতে নাম তোলেনি, ফোন নেয়নি। একটা ব্যাপার অবশ্য…মামা যেখানে যায়, শুনেছি কিছু একটা করে মাত করে দেয়, খবরের কাগজে নাম উঠে যায়। পুরানো কাগজগুলো, স্যার…

দেখতে চাও? ওই যে, ওখানে, দেখিয়ে দিলেন লাইব্রেরিয়ান।

একের পর এক পাতা উল্টে চলল ওরা। কিছুই পাওয়া গেল না। অবশেষে, ১০ই মে-তে এসে থমকে গেল। ডেথ ট্র্যাপ মাইনের মুখ বন্ধ করার খবর ছেপেছে। পড়ে বলল রবিন, হুঁ, লর্ডসবুর্গের কাগজেও লিখেছে দেখা যাচ্ছে। হিলারির মৃত্যুর সঙ্গে এর কোন যোগাযোগ থাকতে পারে?

কি জানি, কাঁধ ঝাঁকাল কিশোর। হয়তো খবরটা পড়ে কোন কারণে টুইন লেকসে ছুটে গিয়েছিল হিলারি, খনির ভেতরটা দেখতে। গাড়িটা কবে চুরি হয়েছে, লিখে রেখেছ না?

নোটবুক দেখে জানাল রবিন, মে-র এগারো। লর্ডসবুর্গের কাগজে খবর বেরোনোর পরদিন। আর খনির মুখ বন্ধ করার তিন দিন আগে। যোগাযোগ আছে। মনে হচ্ছে।

কিন্তু কি যোগাযোগ? প্রায় চেঁচিয়ে উঠল জিনা। খনির মুখ বন্ধ করা হবে জানল চোরটা, তারপর এতই উত্তেজিত হয়ে পড়ল, গাড়ি চুরি করে নিয়ে ছুটে গেল ওখানে গর্তে পড়ে মরার জন্যে? যাতে পাঁচ বছর আর কোন খবর না থাকে তার? আমার মনে হয়, ম্যাকআরথারই তাকে ওখানে দেখা করতে…

দূর! বিরক্ত হয়ে বলল মুসা। মুহূর্তের জন্যেও ম্যাকআরথারকে তুলতে পারো না নাকি তুমি?

যে অন্ধকারে ছিলাম, সেখানেই রয়ে গেছি আমরা, রবিন বলল। আমরা জানি, বাড হিলারি লর্ডসবুর্গে এসেছিল, গাড়ি চুরি করেছিল, টুইন লেকমে সে-ই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু প্রমাণ করতে পারব না। সকালটাই মাটি।

পুরোপুরি মাটি না, সান্ত্বনা দিল কিশোর। নুড়িটা আবার বের করে দেখাল। যেদিন এই নুড়িটা পেলাম, সেদিনই বাড হিলারির লাশও আবিষ্কার করলাম। কি যোগাযোগ আছে জানি না, তবে এটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি, যোগাযোগ কিছু একটা আছেই।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *