০৮. শেষ বিকেলে বাড়ি ফিরল ওরা

শেষ বিকেলে বাড়ি ফিরল ওরা।

বারান্দায় অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন উইলসন। গাড়ি বারান্দায় তিনটে গাড়ি। জটলা করছে কয়েকজন লোক, কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে।

কারও সঙ্গে কথা বলবে না আমার ভাস্তি, রাগ করে বললেন উইলসন। এমনিতেই ও বদমেজাজী, তার ওপর এই ঘটনায় মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেছে… ছেলেদেরকে দেখে থেমে গেলেন। জিনা, ঢোকো। সোজা ওপরতলায়। লাফ দিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে জিনার বাহু ধরে টেনে নিয়ে ঠেলে দিলেন ঘরের ভেতরে। পিঠে ধাক্কা দিয়ে ছেলেদেরও ঢুকিয়ে দিলেন তাড়াতাড়ি। নিজেও ঢুকে দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন দরজা।

রিপোর্টার না জোক, লাল হয়ে গেছে তার মুখ। একটা কথাও বলবে না ওদের সঙ্গে।

কেন, কি হবে? প্রশ্ন না করে পারল না জিনা। আমি তো এখন মস্ত বড় খবর, তাই না?

কি হবে? তোমার মা শুনলে আমার মুণ্ডু কেটে নেবে, এই হবে।

আগে হুঁশিয়ার করলে না কেন? আমি তো সব বলে এসেছি সম্পাদক পিটারসনকে।

পিটারসনের কথা আলাদা, ছেলেদের অবাক করে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন উইলসন। সে চালায় একটা অখ্যাত পত্রিকা। জাপানে বসে এটা পাবে না তোর মা, জানবেও না কিছু। যা বলছি, শুনবি। বাড়ি থেকে একদম বেরোবি না আজ। কালও যদি জোকগুলো না যায়, কালও বেরোনো চলবে না।

আংকেল, কিশোর বলল, কাল আমরা লর্ডসবুর্গে যেতে চাই।

কেন?

পকেট থেকে নুড়িটা বের করল কিশোর, আগের দিন খনিতে যেটা কুড়িয়ে পেয়েছিল। দেখিয়ে বলল, জুয়েলারকে দেখাব।

হাসলেন উইলসন। সোনার টুকরো মনে করেছ? হতাশ হবে। ডেথ ট্র্যাপে সোনা নেই। যেতে পারো, তবে কাল নয়। এ-হপ্তায়ই আমি যাব, তুমি আর জিনা যেতে পারবে তখন। চাইলে, চারজনেই যাবে। তোমাদেরকে রেখে যাওয়ার চেয়ে নিয়ে যাওয়াই নিরাপদ।

রিপোর্টারদের বিদায় করার জন্যে আবার বেরোলেন উইলসন।

সারাটা বিকেল বই পড়ে আর আলোচনা করে কাটাল ওরা। খানিক পর পরই বাংরুমের লাগোয়া ঝোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকাল ম্যাকআরথারের বাড়ির দিকে। জিনা এসে জানাল একবার, শটগান হাতে গুহা পাহারা দিচ্ছে ম্যাকআরথার। তার হারামী কুত্তাটা দর্শক তাড়াতে তাড়াতে এতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, ঘেউ ঘেউ করারও আর শক্তি নেই। লম্বা হয়ে মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

রাতে সকাল সকাল খেয়ে বাংরুমে এসে ঢুকল ছেলেরা। ম্যাকআরবারের জানালায় আলো দেখতে পেল। কিন্তু ওরা বিছানায় ওঠার আগেই নিভে গেল আলো। একটু পরে মিসেস ফিলটারের বাড়ির আনোও নিভে গেল।

সবাই যেন আজ বেশি ক্লান্ত, বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে বলল মুসা। আমিও। কিন্তু কেন বুঝতে পারছি না।

উত্তেজনা, ব্যাখ্যা করল রবিন। প্রচণ্ড উত্তেজনায় দ্রুত ক্ষয় হয় শরীর, কাহিল হয়ে পড়ে। এখানকার সবার বেলায়ই তো আজ এই ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া কোন কারণে হঠাৎ বেশি চমকে গেলেও পরে অবসাদ আসে শরীরে। কাল খনিতে যা দেখলাম, ভয়ানক দৃশ্য। বড় কষ্ট পেয়ে মরেছে বেচারা।

কিন্তু কি করছিল সে ওখানে? সারা দিন নিজেকে অনেকবার প্রশ্নটা করেছে কিশোর। লর্ডসবুর্গে হয়তো কোন জবাব মিলবে।

জুয়েলারকে পাথর দেখাতে সত্যি যাচ্ছ? রবিন জিজ্ঞেস করল।

ক্ষতি কি? এটা একটা ভাল ছুতো, আংকেলের কাছ থেকে সরে যাওয়ার। যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেয়ে যান, খনি-রহস্যের তদন্ত করছি আমরা, মুহূর্তের জন্যে কাছছাড়া করবেন না আর।

জিনা কিন্তু হিলারিকে নিয়ে মোটেও ভাবছে না। তার একটাই লক্ষ্য, ম্যাকআরথারকে ভণ্ড প্রমাণ করা।

কিন্তু লাশটাকে কেন আগে দেখল না ম্যাকআরথার? প্রশ্নটা খালি খোচাচ্ছে। আমাকে। নিজের খনি একটু ঘুরে দেখার কৌতুহলও হলো না?

নানারকম প্রশ্ন মনে নিয়ে একে একে ঘুমিয়ে পড়ল তিনজনেই।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল মুসার। অন্ধকারেই ভ্রুকুটি করে কান পাতল। কিছু একটা নড়ছে বাইরে, জানালার নিচে কোথাও। আরেকবার শোনা গেল, শব্দটা, মচমচ, ক্যাঁচকোচ। কনুয়ের ওপর ভর রেখে উঠল সে।

কিশোর, এই কিশোর? ফিসফিস করে ডাকল। রবিন? শুনছ?

উঁ…কি? পাশ ফিরল রবিন।

গোলাঘরের দরজা খুলল কে জানি, উঠে পা টিপে টিপে জানালার দিকে এগোল মুসা। চৌকাঠের ওপর দিয়ে ঝুঁকে তাকাল। পাশে এসে দাঁড়াল অন্য দুজন।

কই, দরজা তো বন্ধ, রবিন বলল।

পর মুহূর্তেই আলো দেখা গেল গোলাঘরের জানালার ময়লা কাচে, নাচছে। আলোটা মৃদু। নিভে গেল। জ্বলল আবার।

দেশলাই জ্বালছে, কিশোর বলল! চলো তো, দেখি।

দ্রুত শার্ট-প্যান্ট আর জুতো পরে নিল ওরা। নিঃশব্দে নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে। সাবধানে খুলল সামনের দরজা।

চাঁদ ডুবে গেছে। বেশ অন্ধকার। আগে আগে এগোল গোয়েন্দাপ্রধান, তাকে অনুসরণ করল সহকারীরা। গোলাঘরের দরজার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে, এই সময় আলগা পাথরে পা পড়ে পিছলাল রবিন, গোড়ালি গেল মচকে, জোরে চিৎকার দিয়ে বসে পড়ল সে।

সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল ঘরের আলো। জানালা অন্ধকার।

খাইছে! জোরে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে মুসা।

একটা পাথরে বসে গোড়ালি ডলতে শুরু করল রবিন, চোখ গোলাঘরের দিকে। খানিক পরেই উঠে দাঁড়াল সে। আবার এগোল তিনজনে। আস্তে করে দরজার বাইরে খিলে হাত রাখল কিশোর, মৃদু খড়খড় করে উঠল ওটা।

ঝটকা দিয়ে খুলে গেল দরজা। বুকে জোর ধাক্কা খেয়ে উল্টে মাটিতে পড়ে গেল কিশোর। মোটাসোটা মূর্তিটাকে দেখেই লাফিয়ে একপাশে সরে গেল মুসা। ওদের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলে গেল লোকটা, হারিয়ে গেল গাড়ি পথের ওপাশের ক্রিস্টমাস খেতে।

কে? বাড়ির ভেতর থেকে ডাক শোনা গেল। কে ওখানে?

উঠে দাঁড়াল কিশোর। জবাব দিল, গোলাঘরে চোর ঢুকেছিল।

তাই নাকি? সর্বনাশ! বললেন উইলসন। এখুনি শেরিফকে ফোন করছি।

ম্যাকআরথারের বাড়ির দিকে হাত তুলে বলল মুসা, ব্যাট। ওদিকে গেছে।

কান পেতে রয়েছে ছেলেরা, কিন্তু আর কোন শব্দ শোনা গেল না। অন্ধকার খেত, গাছগুলো নিথর।

বেশি দূর যায়নি, বলল কিশোর।

ঢোক গিলল মুসা, পায়ে পায়ে এগোেল খেতের দিকে। কান খাড়া; কোন গাছ নড়ছে কিনা, অন্ধকারে বোঝার চেষ্টা করছে। তার পেছনেই রয়েছে কিশোর আর রবিন। আরেকটু এগিয়ে আস্তে করে বায়ে সরে গেল কিশোর, রবিন সরলো জানে। খেতে ঢুকে পড়ল মুসা, খুব সাবধানে এগোচ্ছে যাতে নিচের দিকের কোন ডালে পা বেধে হুমড়ি খেয়ে না পড়ে।

হঠাৎ থেমে গেল মুসা! দুরুদুরু করছে বুক, কানের কাছে শুনতে পাচ্ছে যেন রক্তের দ্রুত সঞ্চালন। আরেকটা শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে, জোরে নিঃশ্বাস ফেলার আওয়াজ। জোর করে শব্দটা চেপে রাখতে চাইছে যে লোকটা। দৌড়ে এসে হাঁপিয়ে পড়েছে। রয়েছে কাছেই।

স্থির হয়ে গেছে মুসা, শুনছে ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস। তার কাছ থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে গাছের আড়ালে রয়েছে, হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারে। সঙ্গীদের ডাকার জন্যে মুখ খুলতে গিয়েও থেমে গেল সে। চোরটা ভাগবে তাহলে।

এই সময় গাড়ির আওয়াজ শুনে হাসি ফুটল মুসার মুখে। শেরিফ ছুটে আসছেন। চোরটাকে পাকড়াও করতে পারবে এবার।

গেটের কাছে মোড় নিল গাড়ি, হেডলাইটের আলো ঘুরে এসে পড়ল মুসা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। এক দৌড়ে গিয়ে আরেকটা ঘন ঝাড়ের ভেতরে ঢুকে গেল চোর। লাফিয়ে উঠে তার পিছু নিল মুসা। কিন্তু দুই পা এগিয়েই থেমে গৈল। ওপরের দিকে ভোলা একটা হাত দেখতে পাচ্ছে, নড়তে শুরু করেছে। হাতটা।

ঝট করে নিচু হয়ে গেল মুসা। শাঁ করে তার মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল ধারাল লম্বা ফলা, একটা গাছের মাথা দু-টুকরো হয় গেল, আরেক মুহূর্ত দেরি করলে গাছের পরিণতি হত মুসার।

গাছপালা ভেঙে মাড়িয়ে আবার দৌড় দিল চোর।

সোজা হলো মুসা। হাঁটু কাঁপছে। বড় বাঁচা গেছে, আরেকটু হলেই আজ…আর ভাবতে পারল না সে।

পাশে এসে দাঁড়াল কিশোর।

ভোজালী! কোনমতে বলল মুসা। গাছ কাটার ছুরি! আরেকটু হলেই দিয়েছিল আমার মুণ্ডু আলাদা করে!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *