৩. রাতের অতিথি

রাতের অতিথি

এবারের অভিজ্ঞতাটি লিমেরিকের আর্চডিকন রেভারেণ্ড জে. এ. হেইডেনের। ১৮৭৯ সালের দিকে অ্যালারির একটা চমৎকার গ্রামে বাস করতেন এক ডিস্ট্রিক্ট ইন্সপেক্টর। আমার বাসার থেকে তাঁরা যেখানে থাকতেন তার দূরত্ব আট-ন মাইল। ভদ্রলোকের সঙ্গে দারুণ একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমার। যখনকার কথা বলছি তখন তার স্ত্রী তৃতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষা করছেন। ছোটখাট, হ্যাংলা-পাতলা একজন ভদ্রমহিলা তিনি। আসন্ন ঘটনাটা নিয়ে মানসিকভাবেও খুব দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই আমার বাড়িতে প্রচুর সময় কাটিয়েছেন। এমনকী এর প্রতিটি কামরা, অন্ধিসন্ধিও তাঁদের খুব ভাল চেনা।

১৮৭৯ সালের ১৭ অক্টোবর, বুধবার। বন্ধুর কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। চিঠিটা পড়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই গতকাল আবার বাবা হয়েছেন তিনি। আর সব কিছু ঠিকঠাকভাবেই এগুচ্ছে। কয়েকটা দিন কেটে গেল। পরের বুধবার রাত দশটার দিকে বিছানায়, গেলাম। আমার স্ত্রী, বাচ্চা আর ভৃত্য দুজন ওপরতলায় ঘুমিয়ে পড়েছে। এক তলায় স্টাডিতে ছোট্ট একটা বিছানা আছে। কখনও কখনও এখানেই ঘুমাই। অন্ধকারের চাদরে মুড়ি দিয়েছে গোটা বাড়িটা। রাতের নীরবতায় ছেদ টানছে কেবল হলরুমের ঘড়িটার টিক টিক শব্দ।

ঘুম আসবে আসবে করছে এমন সময় হালকা,দ্রুত একটা পায়ের আওয়াজ পেলাম। মনে হলো পলকা দেহের কোনো নারী হল ঘরের দরজা পেরিয়ে ঘরের ভিতর দিয়ে আসছে। তারপর মনে হলো যেন একটু দ্বিধা করল। এবার স্টাডির দিকে আসা বারান্দা ধরে হেঁটে দরজার সামনে এসে থামল। পাতলা, চঞ্চল একটা হাত দরজার হাতল হাতড়াবার আওয়াজ পেলাম। ইতিমধ্যে আমি প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছি, আমার স্ত্রী নীচে নেমে এসেছে। সম্ভবত হঠাৎ কোনো দরকার পড়েছে। বিছানায় উঠে বসে নাম ধরে ডেকে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে। কিন্তু অপর তরফ থেকে কোনো সাড়া পেলাম না। বরং মৃদু শব্দটা থেমে গেল। কৌতূহলী হয়ে ম্যাচ ধরিয়ে একটি মোম জ্বাললাম। কিন্তু মোম হাতে দরজা খুলে কাউকে পেলাম না। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসে দেখলাম সবগুলো দরজা লাগানো, অথৈ ঘুমে তলিয়ে আছে সবাই। বিস্মিত হয়ে স্টাডিতে ফিরে এলাম। দোর টেনে মোমটা জ্বেলে রেখেই আবার বিছানায় গেলাম। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টের পেলাম তার উপস্থিতি। আগের ঘটনাটারই পুনরাবৃত্তি ঘটল যেন। তবে এবার দরজার হাতল চেপে ধরেছে অদৃশ্য হাতটা। অর্ধেক ঘুরালও, তারপর থেমে গেল। বিছানা থেকে নেমে আগের মতই খোঁজাখুঁজি করলাম। কিন্তু একটা জনপ্রাণীর দেখাও পেলাম না। ঘড়িতে এগারোটা বাজল। তারপর সব কিছু থেমে গেল।

শুক্রবার একটা চিঠি পেলাম। এটা পড়েই জানতে পারলাম আমার বন্ধু পত্নীটি বুধবার রাতে মারা গিয়েছেন। দেরি না করে অ্যাডারিতে হাজির হলাম। প্রিয় বন্ধুকে সান্ত্বনা দিলাম, তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললাম। তবে আলাপচারিতার একটা অংশ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব। তিনি জানালেন বুধবার সকাল থেকে তাঁর স্ত্রীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। রাতে রীতিমত প্রলাপ বকতে শুরু করেন। অসংলগ্নভাবে এমন ভাবে কথা বলতে থাকে যেন একসময়ে খুব পরিচিত আর চেনা জায়গাগুলোতে আবার হাজির হয়েছে। ভাবছিল ও তোমার বাসায়। বললেন বন্ধুটি, মনে হলো যেন তোমার সঙ্গে কথাও হয়েছে তার। কারণ কখনও কখনও কথায় বিরতি টানছিল, যেন তোমার কথা বা জবাব শুনছে। আমার মাথায় তখন অন্য একটা চিন্তা ঢুকে পড়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক কোন সময় আমার সঙ্গে তার এই কাল্পনিক আলাপচারিতার ঘটনা ঘটেছে বলতে পারবেন কিনা? বন্ধুটি জানালেন সময়টা নির্ভুলভাবেই বলতে পারবেন। কারণ ওসময় তাঁর ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়েছিলেন। ওটা সাড়ে দশটা থেকে এগারোটার মাঝখানে। তাহলে আমার অনুমানই ঠিক, ভাবলাম। ওই সময়ই আমার বাসায় পাতলা শরীরের একজন নারীর উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *