০৩. শান্তির রাজ্যে স্বাগতম

শান্তির রাজ্যে স্বাগতম। বেদম হাসিতে দুলছে জিনা।

বিকেলের শান্ত নীরবতা ধীরে ধীরে নেমে এল আবার র‍্যাঞ্চ হাউসে।

উঠে দাঁড়িয়ে চোখ মিটমিট করল মুসা। খাইছিল! কি ওটা?

কিছু না, টিটকারির ভঙ্গিতে বলল জিনা, বিশিষ্ট ভদ্রলোক জনাব হ্যারি ম্যাকআরবারের শিকারী কুকুর, মুরগী চুরির তালে ছিল।

কিশোর উঠে দাঁড়াচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে বলল, বেড়ার নিচ দিয়ে সিধ কেটে ঢোকার চেষ্টা করে। কয়েকবারই করেছে এ-রকম। মুরগীগুলো চেচামেচি শুরু করে দেয়, শটগান নিয়ে ছুটে বেরোয় ভিকিখালা। আজও ফাকা গুলিই ছুঁড়েছে, কিন্তু এই অত্যাচার চলতে থাকলে কপালে দুঃখ আছে কুত্তাটার। ছররা দিয়ে পাছার চামড়া ঝাঝরা করে দেবে।

ভিকিখালা? জিজ্ঞেস করল রবিন।

আমাদের কাজের লোক, জানালেন উইলসন।

গোলাবাড়ির ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল মোটাসোটা এবং মেকসিকান মহিলা, কালো চুল। সুতার পোশাক পরনে, গলা আর হাতার কাছটায় এমব্রয়ডারি করা উজ্জ্বল রঙের বড় বড় ফুল। হাতে একটা শটগান।

এই যে, সিনর উইলসন, চেঁচিয়ে বলল ভিকি। জিনাও এসেছ। খুব ভাল হয়েছে। তোমরা না থাকলে কেমন খালি খালি লাগে।

উইলসন হাসলেন। সেজন্যেই পূর্ণ করে রেখেছ নাকি?

ওই কুত্তাটার কথা আর বলবেন না, ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল ভিকি। আস্ত চোর!

স্বভাব বদলে যাবে, ভেব না, হাসি মুখে বললেন উইলসন। আকাশে গোলাগুলি চালিয়ে যাও, চুরি না ছেড়ে যাবে কোথায় ব্যাটা। হ্যাঁ, ভিকি, এরা। জিনার বন্ধু। কিশোর পাশারবিন মিলফোর্ড মুসা আমান। হপ্তা দুই বেড়াবে আমাদের এখানে।

ওমা, তাই নাকি? উজ্জ্বল হয়ে উঠল ভিকির কালো চোখ। খুব ভাল, খুব ভাল। বাড়িতে এক দল বাচ্চা-কাচ্চা না থাকলে ভাল লাগে? এসো, আমি খাবার ব্যবস্থা করছি। এতদূর এসেছ, নিশ্চয় খিদে পেয়েছে।

র‍্যাঞ্চ হাউসের ভেতরে ঢুকে গেল ভিকি।

সত্যিই খিদে পেয়েছে তো তোমাদের? বললেন উইলসন। ভিকির সামনে কম খেলে চলবে না, রেগে যাবে।

কিছু ভাববেন না,অভয় দিল মুসা। আন্তরিক হাসিতে দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। কখনও যাতে না রাগে সেই ব্যবস্থাই করব।

গাড়ি থেকে স্যুটকেসগুলো নামিয়ে বারান্দায় রাখতে শুরু করলেন উইলসন। তাড়াতাড়ি তাঁকে সাহায্য করতে এগোল তিন গোয়েন্দা। কয়েক মিনিট পর খোলামেলা বিশাল লিভিং রুমের ওপরে দোতলার বড় একটা বাংকমে জিনিস-পত্র নিয়ে এল ওরা। জিনার ঘর নিচে, চাচার ঘরের পাশে। ভিকির ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্টই আছে, রান্নার্থরের পেছনে।

গোসল করবে তোমরা? জিজ্ঞেস করলেন উইলসন। বেশি দেরি কোরো। ডিনারের আগেই আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখাতে চাই তোমাদের।

আলমারিতে কাপড় গোছাচ্ছিল মুসা, উইলসনের কথা শুনে গোছানোর আগ্রহ নষ্ট হয়ে গেল। টান দিয়ে বড় একটা তোয়ালে নিয়ে বলল, পরেও গোছানো যাবে। আগে আপনার সঙ্গেই যাই। বাথরুমের দিকে রওনা হলো সে।

খানিক বাদে জিনা আর তার চাচার সঙ্গে বেরোল তিন গোয়েন্দা। ওপরে নিউ মেকসিকোর পরিষ্কার নীল খোলা আকাশ। জিনার হাতে ইয়া বড় বড় দুই টুকরো চিনি, গাড়িপথ ধরে প্রায় দৌড়ে চলল ছোড়র খোয়াড়ের দিকে। ডাকহে, কমেট। কমেট?

ডাক শুনে ফিরে তাকাল ঘোড়াটা, দৌড়ে এল বেড়ার কাছে। গলা বাড়িয়ে দিল বেড়ার বাইরে। আনন্দে নাক দিয়ে বিচিত্র শব্দ করছে। গলা জড়িয়ে ধরে আদর করল জিনা।

দেখো না কাণ্ড, হাসলেন উইলসন, দুদিন মাত্র হয়েছে, অথচ মনে হচ্ছে কত যুগ একে দেখেনি। ওরা থাকুক। তোমরা এসো, গাছ ছাঁটার ছুরি দেখবে।

পিকআপের পাশ কাটিয়ে গোলাবাড়ির কাছে চলে এল ওরা। দরজা খুললেন উইলসন। শুকনো খড়ের গন্ধ লাগল নাকে। উঁকি দিয়ে দেখল ছেলেরা, ঘরের কোণে গাদা করে রাখা আছে খড়ের বোঝ। দোলের হুক থেকে ঝুলছে হোস পাইপের কয়েল। খন্তা, কোদাল, বেলচা, বড় কাঁচি আর নানা রকম দরকারী যন্ত্রপাতি সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে একটা ওয়ার্কবেঞ্চের পাশে। কাছেই। একটা র‍্যাঞ্চে রাখা আছে পাঁচটা বড় বড় ভোজালীর মত ছুরি।

বাড়িতে বাগানের গাছ তো কাঁচি দিয়েই হুঁটি, মুসা বলল।

সে অল্প কয়েকটা গাছের বেলায় সম্ভব, বুঝিয়ে বললেন উইলসন। কিন্তু হাজার হাজার ক্রিস্টমাস গাছ কাঁচি দিয়ে হাঁটতে অনেক সময় লাগবে, ছুরি দিয়ে কোপানো ছাড়া উপায় নেই। তাছাড়া ছুরি দিয়ে এক কোপে ওপর-নিচের অনেকগুলো ভাল তুমি ছেটে ফেলতে পারছ, তাতে সমান হয় বেশি, কাঁচি দিয়ে সেটা হয় না। র‍্যাঞ্চ থেকে একটা ছুরি নিয়ে এলেন তিনি। আপনা-আপনি সুন্দর হয় না ক্রিস্টমাস ট্ৰী, নিয়মিত যত্ন লাগে। বছর তিনেক আগে জায়গাটা যখন কিনলাম, তখন ভাবতাম, এ আর কি? কয়েকটা চারা মাটিতে পুঁতে দিলেই হলো, নিজে নিজেই বড় হয়ে সাইজমত হয়ে যাবে। এখন বুঝি কত কঠিন। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হয়, ডাল পাতা ছাঁটতে হয়, আর বোজ পানি দেয়া তো আছেই। ছুরি চালানো কিন্তু সহজ ভেব না, কিভাবে চালাতে হয় দেখালেন তিনি। এই যে, এভাবে ধরে, ওপর থেকে নিচে এভাবে কোপ মারতে হয়, সাই করে বাতাস কাটল তীক্ষ্ণ ধার ফলা। খুব সাবধানে কোপাতে হয়। বেশি নিচে যদি নামিয়ে ফেলো, পায়ে এসে লাগবে। ফেড়ে যাবে। পারবে তো?

পারব, বলল মুসা।

সাবধানে আবার জায়গামত ছুরিটা রেখে দিলেন উইলসন।

গোলাবাড়ির একধারে ফেলে রাখা অনেক পুরানো একটা গাড়ি দেখালেন, নিরেট রবারে তৈরি চাকা, ফাঁপা টায়ার নয়। নতুন আরেকটা গোলাঘর বানাব। ওই গাড়িটারও একটা ব্যবস্থা করব তখন।

কাছে গিয়ে গাড়ির আধখোলা একটা জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিল কিশোর। কুচঁকে গেছে সীটের কালো চামড়ার কভার, নগ্ন হয়ে বেরিয়ে আছে কাঠের মেঝে। টি মডেলের ফোর্ড, না? ফিরে জিজ্ঞেস করল সে।

হ্যাঁ, বললেন উইলসন। বাড়িটা যখন কিনি তার আগে থেকেই ছিল, ফাউ পেয়েছি। ওখানেই ছিল ওটা, খড়ের তলায় চাপা পড়ে ছিল। খড় সরিয়েছি, কিন্তু গাড়িটার কিছু করতে পারিনি। সময়ই পাই না। তবে ঠিকঠাক করব, মডেল টি এখন প্রাগৈতিহাসিক জিনিস, সংরক্ষণের বস্তু।

দরজায় দেখা দিল জিনা, ঘোষণা করল, মহামান্য হ্যারি ম্যাকআরথার তশরিফ রাখছেন।

আহ, জিনা, একটু ভদ্রভাবে কথা বল, বিরক্ত হলেন উইলসন। দেখিস, তার সামনে আবার কিছু বলে বসিস না।

চুপ করে রইল জিনা।

বাইরে পায়ের আওয়াজ হলো। ডাক শোনা গেল, মিস্টার উইলসন?

এই যে, এখানে সাড়া দিলেন তিনি।

হালকা-পাতলা একজন লোক উঁকি দিল দরজায়। মাথায় সোনালি চুল, বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি। পরনের জিনস এতই নতুন, কাপড়ের খসখসে ভাবও কাটেনি। চকচকে পালিশ করা বুটে মুখ দেখা যাবে যেন। গায়ের ওয়েস্টার্ন শার্টটা যেন এইমাত্র প্যাকেট ছিড়ে খুলে পরে এসেছে।

এগিয়ে গেলেন উইলসন। হাত মেলালেন দুজনে।

কুকুরের অসদাচরণের জন্যে ক্ষমা চাইল ম্যাকআরবার।

লোকটার পরিচ্ছদ আর কথাবার্তায় একটা ব্যাপারে শিওর হলো কিশোর, মেকি একটা ভাব রয়েছে তার মধ্যে। একেবারে বানিয়ে বলেনি জিনা। কিন্তু আরেকটা প্রশ্নও জাগছে কিশোরের মনে, টুইন লেকসের মত জায়গায়, এই সুন্দর বিকেলে এছাড়া আর কি পোশাক পরতে পারত ম্যাকআরখার? এমনও তো হতে পারে, এখানে আসার আগে ওরকম কাপড় আর কোনদিন পরেনি সে, আসার সময় নতুন কিনে নিয়ে এসেছে। ওগুলো পুরানো হতে তো সময় লাগবে।

শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি শয়তানটাকে, বলল ম্যাকমারধার। আর জালাবে না আপনাকে।

আরে না না, এটা কিছু না, তাড়াতাড়ি বললেন উইলসন। পোষা জন্তুজানোয়ার থাকলে ওরকম একআধটু অত্যাচার করেই। সেটা নিয়ে মাইণ্ড করে বসে থাকলে চলে নাকি।

ছেলেদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন উইলসন।

ম্যাকআরবারের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে রইল জিনা।

ব্যাপারটা লক্ষ করল ম্যাকআরথার, হাসি হাসি পরিষ্কার নীল চোখের তারা কঠিন হয়ে গেল চকিতের জন্যে। তারপর জিনার শরীর ভেদ করে যেন তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল মডেল টি-এর দিকে। আরে, দারুণ একটা গাড়ি! দুর্লভ জিনিস।

একটু আগে এটার কথাই বলছিলাম ছেলেদেরকে। সময় বের করে শিগগিরই ঠিকঠাক করে নেব।

এগিয়ে গিয়ে গাড়িটার গায়ে হাত রাখল ম্যাকআরবার।

হ্যারি ম্যাকআরথার! হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। নামটা আগেও শুনেছি মনে হচ্ছে।

তাই নাকি? ফিরে তাকাল লোকটা।

সিনেমায় কাজ করে আমার বাবা। কিছু দিন আগে খাওয়ার টেবিলে বসে আপনার কথা বলছিল। একটা ছবি বানাচ্ছে এখন, তাতে নাকি একটা পুরানো রিও গাড়ি দরকার। কোথাও পায় না পায় না, শেষে নাকি আপনার কাছ থেকে চেয়ে এনেছে। পুরানো গাড়ি কালেকশনের বাতিক আছে আপনার।

তাই নাকি? ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই, অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল যেন ম্যাকআরথার।

আপনার সংগ্রহের কথা বলছিল বাবা। বিরাট এক প্রাইভেট গ্যারেজ নাকি আছে আপনার, একজন ফুলটাইম মেকানিক রেখে দিয়েছেন বেতন করে। ওর কাজ শুধু গাড়িগুলোকে সব সময় সচল রাখা। সাধারণ কাজ, কিন্তু গাড়ি এত বেশি তাতেই নাকি হিমশিম খেয়ে যায় বেচারা।

হ্যাঁ। সাধারণ বলছ কেন? কাজটা কঠিনই। পুরানো এঞ্জিন, আধুনিক

মেশিনের মত ভাল না, সচল রাখা যথেষ্ট কঠিন।

রানিং বাগ ছবিতে আপনার সিলভার ক্লাউডটাই তো ব্যবহার হয়েছিল?

সিলভার ক্লাউড? ও, হ্যাঁ। হ্যাঁ হ্যাঁ, একটা স্টুডিওকে ধার দিয়েছিলাম…বেশি দিন আগের কথা নয়।

সিলভার ক্লাউড? বলে উঠলেন উইলসন। আমার মডেল টি-ওতো ওটার কাছে নাতি।

শুরুতে অত কোনো গাড়ি আমারও ছিল না, বিনীত কণ্ঠে বলল ম্যাকারবার। তবে একবার নেশায় পেয়ে বসলে কোখেকে কোথেকে জানি জোগাড় হয়ে যায়। কেনা শুরু করলেই টের পাবেন, এই গোলাঘরে কুলাবে না তখন আর। হয় নতুন বানাতে হবে, কিংবা বাড়াতে হবে।

নতুন আরেকটা গোলাঘর বানানোর কথা এমনিতেও ভাবছি, বললেন উইলসন।

কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন দুজনে। হাত নেড়ে নেড়ে বোঝাচ্ছেন উইলসন, কোন জায়গায় কতবড় করে বানাবেন ঘরটা, পুরানোটার কি করবেন।

কি মনে হলো? দুজনে দূরে চলে গেলে বলল জিনা। এরকম ভণ্ড আর দেখেছ?

কাপড়-চোপড় নতুন, বলল মুসা, তাতে কি? নামটা চেনা চেনা লাগছিল, মডেল টি-র প্রতি আগ্রহ দেখে মনে পড়ে গেল। বাবা বলেছে, লোকটার অনেক টাকা, এমনিতেও পাগল, গাড়িরও পাগল। ম্যানডেভিল ক্যানিয়নে নাকি মস্ত বাড়ি আছে তার, দশ ফুট উঁচু দেয়ালে ঘেরা।

মৃদু কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিল কিশোর। কিন্তু রানিং বাগ এর জন্যে তার সিলভার ক্লাউড ধার দেয়নি, বলল সে। ফিল্ম ফান পত্রিকায় গাড়িটার ওপর একটা আরটিকেল বেরিয়েছিল। ম্যাকআরধারের গাড়ি নয়, ওটা ছিল জোনাথন হ্যামিলটনের। ছবির খরচও তিনিই দিয়েছেন। আর ছবিটা আজকের নয়, বহু আগের।

কেউ তর্ক করল না। ওরা জানে, না জেনে কোন কথা বলে না কিশোর, ও যখন বলছে, ঠিকই বলছে।

লাফিয়ে উঠল জিনা। কি বলেছিলাম? ব্যাটা একটা ভণ্ড। মিখক।

হাসল কিশোর। তা বলা যায় না, জিনা। হ্যারি ম্যাকআরবারের অনেকগুলো গাড়ি আছে। তার মধ্যে একটা গাড়ি কখন কাকে ধার দিল না দিল, মনে না থাকলে মোষ দেয়া যায় না। তাছাড়া তার কাছেই গাড়ি চেয়েছে স্টুডিও এমন না-ও হতে পারে। হয়তো তার কোন কর্মচারীই গাড়ির ব্যাপারগুলো দেখাশোনা করে, হয়তো তার মেকানিকের ওপরই রয়েছে দায়িত্ব।

আমার বিশ্বাস হয় না, গোয়ারের মত হাত নাড়ল জিনা।

অকস্মাৎ পরিবেশটাই কেমন জানি বদলে গেল। অস্বস্তিকর নীরবতা। সহজ করে দিল ভিকি, ডিনারের জন্যে ডাক দিয়ে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *