০৪. যে বিরক্তি ক্লান্তি দুশ্চিন্তা আর নৈরাশ্য আনে তাকে নির্বাসন দেয়া দরকার

০৪. যে বিরক্তি ক্লান্তি দুশ্চিন্তা আর নৈরাশ্য আনে তাকে নির্বাসন দেয়া দরকার

অবসাদের অন্যতম প্রধান কারণ একঘেঁয়েমি। উদাহরণ হিসেবে একজনের নাম বলতেই হয়। ধরুন, এলিসের কথাটাই। আপনারই বাড়ির কাছে সে থাকে। পেশায় সে স্টেনোগ্রাফার। একরাতে সে বাড়ি ফিরল অবসাদে প্রায় ভেঙে পড়ে মাথায় যন্ত্রণা নিয়ে। মায়ের অনুরোধে সে খেতে বসল কিন্তু খেতে পারলে না। তখনই টেলিফোন বেজে উঠল। ওর এক বয় ফ্রেন্ড ফোন করছিল! সে নাচের আসরে যেতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। আনন্দে চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এলিসের। ওর মন চনমনে হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি উপরে গিয়ে পোশাক পালটে ও ছুটল। এরপর রাত তিনটে পর্যন্ত নাচ গান করে বাড়ি ফিরল এলিস-ক্লান্তির কোনো চিহ্নই ছিল না। ওর এমন আনন্দ হচ্ছিল যে ঘুম আসছিল না।

তাহলে কি আট ঘণ্টা আগে এলিস ক্লান্ত ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল। সে অবসাদে ভেঙে পড়ছিল কারণ নিজের কাজে ওর একঘেয়েমি এসেছিল। এরকম আরো হাজারও এলিসকে খুঁজে পাওয়া যাবে। আপনিও এদের মধ্যে একজন হতে পারেন।

এটা সত্য যে, আপনার আবেগজনিত মনোভাবই শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে অবসাদ সৃষ্টির জন্য বেশি দায়ী। কয়েক বছর আগে জোসেফ ই. বারম্যাক আর্কাইভস অব সাইকোলজি’-তে এক প্রবন্ধে বুঝিয়েছিলেন একঘেঁয়েমি কেমন করে অবসাদ সৃষ্টি করে। একটা পরীক্ষার মধ্য দিয়েই তিনি এটা জানান। ড. বারম্যাক কিছু ছাত্রকে কোনো এক পরীক্ষার কাজে লাগিয়েছিলেন সেটায় তিনি জানতেন তাদের কণামাত্রও আগ্রহ ছিল না। ফলাফল কি হল? ছাত্ররা অভিযোগ করল তারা অবসাগ্রস্ত, মাথার যন্ত্রণায় আক্রান্ত, চোখ টাটানিতে বিরক্ত আর তাদের ঘুম পাচ্ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের পেটেরও গণ্ডগোল হয়। সবটাই কি কম্পিত? না। বিপাকীয় পরীক্ষায় দেখা যায় যে, শরীরে রক্তের চাপ আর অক্সিজেন গ্রহণ কোনো মানুষ একঘেঁয়ে বোধ করলেই কমতে থাকে। অথচ সে কাজে আগ্রহ আর আনন্দ বোধ করার সঙ্গে সঙ্গেই বিপাকীয় ক্রিয়া বেড়ে যায়।

আমরা যখন পছন্দসই আর উত্তেজনাময় কাজ করি, তখন কদাচিত আমরা অবসাদ গ্রস্ত হই। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, আমি কিছুদিন আগে কানাডিয়ান রকি পর্বত এলাকার লুইজি হ্রদ অঞ্চলে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলাম। সেখানে বেশ কিছুদিন আমি প্রবাল খাড়ি বরাবর মাছ ধরেছিলাম। এই আনন্দ করতে গিয়ে আমার মাথার চেয়েও উঁচু সব ঝোঁপের মধ্যে দিয়ে পথ করে চলেছি, গাছের গুঁড়িতে হোঁচট খেয়ে পড়েছি–অথচ আট ঘণ্টার টানা পরিশ্রম করার পরেও এতটুকুও ক্লান্ত হই নি। এমন হওয়ার কারণ কি? কারণ হল উত্তেজনা আর দারুণ আনন্দে ছিলাম। দারুণ কাজ করেছি বলে আমি ভাবছিলাম। মস্ত আকারের ছ’টা ট্রাউট মাছ ধরেছিলাম। ধরুন, যদি মাছ ধরতে ধরতে আমার একঘেয়েমি আসত, তাহলে আমার মনোভাব কেমন হত? তাহলে এমন পরিশ্রমের পর সাত হাজার ফিটের উপর আমাকে অবশ্যই অবসাদে ভেঙে পড়তে হত।

পাহাড়ে চড়ার মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজে একঘেঁয়েমিই পরিশ্রমের চেয়ে ঢের বেশি অবসাদগ্রস্ত করে দেয়। একটা উদাহরণ দিচ্ছি : মিনিয়াপোলিশের মি. এস. এইচ. কিংম্যান ব্যাপারটা আমাকে জানান। ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে কানাডা আলপাইন ক্লাবকে প্রিন্স অব ওয়েলস রেঞ্জার্সের কিছু সৈন্যকে পর্বতারোহণ শেখানোর জন্য কিছু পথপ্রদর্শক দিতে অনুরোধ জানায়। মি. কিংম্যান ছিলেন ওই সৈন্যদের পর্বতারোহণ শেখানোর একজন শিক্ষক আর গাইড। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ওইসব গাইডদের বয়স ছিল বিয়াল্লিশ থেকে ঊনষাট বছর-তারা ওইসব তরুণ সৈন্যদের হিমবাহ আর তুষার ভ্রুপের উপর দিয়ে প্রায় চল্লিশ ফুট খাড়া চূড়োতেও নিয়ে যান। সেখানে তাদের ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক পথে যেতে হয়, কোনো রকমে পা রাখা যায় এমন পথেও উঠতে হয়। তারা কানাডিয়ান রকি পর্বতের উচ্চ শিখরে তার নাম করণ হয় নি এমন সব শিখরেও ওঠেন। কিন্তু পনের ঘণ্টা ধরে এই পর্বতারোহণের পর স্বাস্থ্যবান তরুণ সৈন্যরা (যারা প্রায় ছ’মাস কঠিন শিক্ষাক্রম অনুসরণ করেছিল। প্রায় অবসাদে ভেঙে পড়ে।

ওদের ওই অবসাদ কি আগেকার কঠিন শিক্ষায় মজবুত না হয়ে ওঠা পেশীর জন্য? যারা কমান্ডো ট্রেনিং গ্রহণ করেছেন তারা কথাটা শুনে হেসে উঠবেন! না, তাঁরা অবসাদ গ্রস্ত হয়েছিল পাহাড়ে চড়ার একঘেঁয়েমির জন্য। তাদের কেউ কেউ এমনই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে খাবার জন্য অপেক্ষা না করেই তারা ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের পথপ্রদর্শকরা যারা সৈন্যদের চেয়ে বয়সে দুই বা তিনগুণ বড়–তারাও কি ক্লান্ত হয়? হ্যাঁ, তারা ক্লান্ত হলেও ভেঙে পড়ে নি। তারা নৈশভোজ সেরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প-গুজব করে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা করে চলেছিল। তারা ভেঙে পড়ে নি কারণ তাদের আগ্রহ ছিল।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ব্রডওয়ার্ড থর্নডাইক অবসাদ নিয়ে পরীক্ষা করার সময় কিছু তরুণকে প্রায় এক সপ্তাহ ঘুমোতে দেন নি, নানা উৎসাহজনক কাজে ব্যস্ত রেখে। নানা রকম পরীক্ষার পর তিনি ঘোষণ করেন : একঘেঁয়েমিই হল কাজে উৎসাহ কমে আসার কারণ।

আপনি মানসিক পরিশ্রম করে থাকেন, তাহলে আপনার কাজে পরিমাণ আপনাকে অবসাদ গ্রস্ত করে তোলে না। যে কাজ আপনি করেন না তাই আপনাকে ক্লান্ত অবসাদময় করে তুলতে পারে। যেমন ধরুন, গত সপ্তাহের কথাটাই, সে সময় আপনি হয়তো বারবার বাধা প্রাপ্ত হন। কোনো কাজ শেষ হয় নি, চিঠির জবাব দেয়া হয় নি, সাক্ষাত করা যায় নি। সবই কেমন গোলমেলে হয়ে যায়। কিন্তু আপনি সেদিন কিছু না করেও বাড়ি ফিরলেন ক্লান্ত হয়ে মাথায় যথেষ্ট যন্ত্রণা নিয়ে।

অথচ পরের দিন অফিসে সবই চমৎকার কাজকর্ম হয়। আগের চল্লিশ গুণ বেশি কাজ করেন আপনি। তা সত্ত্বেও ঝকঝকে সাদা টাটকা গার্ডেনিয়া ফুলের মতো হয়েই বাড়ি ফিরলেন। আপনার এ রকম অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই হয়েছে। হয়েছে আমারও।

এ থেকে কি শিক্ষা পাচ্ছি আমরা? এই শিক্ষা যে, আমাদের অবসাদ আসে কাজের জন্য নয় বরং ভাবনা, চিন্তা, হতাশা আর বিরক্তি থেকে।

এই পরিচ্ছেদ লেখার সময় আমি জেরোম কার্ণের সংগীত বহুল ‘শো বোট’ নাটকটি দেখতে গিয়েছিলাম। নাটকের নায়কের মুখে শোনা যায় : ‘একমাত্র ভাগ্যবান তারাই যারা কাজ করে আনন্দ পায়। এরকম মানুষেরা ভাগ্যবান এই জন্যই যে তাদের রয়েছে অনেক বেশি ক্ষমতা, কম উদ্বেগ আর কম অবসাদ।

কিন্তু এসব কথা জেনে লাভ কি? আপনার এতে করার আছেই বা কি? একজন স্টেনোগ্রাফারের কথা বলছি–ওকলাহোমার টুলসার এই স্টেনোগ্রাফার কি করেছিল শুনুন। তাকে সারা মাস ধরেই একঘেঁয়েমি ভরা কাজ করতে চলতে হত। তার কাজ ছিল কাগজপত্র গোছানো, চিঠিপত্র তৈরি রাখা, এই সব। অত্যন্ত একঘেঁয়ে কাজ বলে সে একদিন নিজে বাঁচার জন্যেই কাজটা একটা আনন্দময় করবে বলে ভেবে নিল। নিজে নিজেই সে একটা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করে ফেলল। প্রতিদিন সকালে কতগুলো ফর্ম সে তৈরি করত সেগুলো গুণে রাখতে শুরু করল। তারপর সেই সংখ্যা বিকেলের দিকে যাতে অতিক্রম করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হল। সে প্রতিদিনের কাজের হিসেব রেখে পরদিন যাতে অতিক্রম করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হল। সে প্রতিদিনের কাজের হিসেব রেখে পরদিন সেটা পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করল। এর ফল কেমন হয়েছিল? সে অল্প কয়দিনের মধ্যেই ওর দপ্তরের বাকি স্টেনোগ্রাফারের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করে ফেলতে লাগল। কিন্তু তাতে তার কি হল? সে প্রশংসা লাভ করল, না…ধন্যবাদ পেল? না,…পদোন্নতি ঘটল? না।…মাইনে গেল? তাও, না?…তবে এর ফলে তার অবসাদের ভাব কেটে গেল। সে পেল সেই একঘেঁয়েমি ভরা কাজ থেকে মানসিক আনন্দ এবং আরো শক্তি, আনন্দ আর অবসর যাপনের সুখ।

গল্পটা যে সত্যি সেটা আমার জানা, কারণ ওই মেয়েটিকেই আমি বিয়ে করেছি।

আরো একজন স্টেনোগ্রাফারের গল্প শোনাচ্ছি। তিনিও একঘেঁয়েমি ভরা কাজকে আনন্দময় করতে চেষ্টা চালিয়ে সফল হন। তিনি আমাকে নিজের কাহিনী লিখে জানিয়ে ছিলেন। সেটা তার নিজের ভাষাতেই বলছি :

‘আমাদের অফিসে স্টেনোগ্রাফারের সংখ্যা হল চারজন। চারজন নানাজনের চিঠিপত্র দেখাশোনা করে। আমাদের কাজের চাপে মাঝে মাঝে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়। একবার একজন সহকারী অধিকর্তা আমাকে একটা বড় চিঠি টাইপ করার কথা বলেন। আমি আপত্তি জানিয়ে বলি কয়েকটা কথা শুধরে নিলেই কাজ চলতে পারে। নতুন করে টাইপ করতে হবে না। ভদ্রলোক আমাকে দুকথা শুনিয়ে জানালেন আমার ইচ্ছে না থাকলে অন্য কাউকে দিয়েই তিনি টাইপ করিয়ে নেবেন। প্রচণ্ড রাগ করেই আমি চিঠিটা নিলাম। হঠাৎ আমার মনে হল আমার জায়গায় থেকে কাজ করতে পারলে অনেকেই ধন্য। হতে। তাছাড়া ঠিক এই রকম কাজ করার জন্যেই আমাকে মাইনে দিয়ে রাখা হয়েছে। এরপরেই ভালো বোধ করতে লাগলাম। আচমকা মন ঠিক করে ফেললাম, যেন ভালো লাগে এমন মনোভাব নিয়ে এবার থেকে কাজ করব-যদিও মনে মনে আমার ঘৃণাই হত। তারপরেই আমি এই দারুণ দরকারী জিনিস আবিষ্কার করে বসলাম। আমি যদি কাজটা ভালোবাসি মনে করে কাজ করে যাই, তাহলে কিছুটা ভালো করে কাজ করতে পারবো। অতএব, আমাকে কদাচিৎ বাড়তি কাজ করার দরকার হত। আমার এই নতুন পদ্ধতির ফলে বালো কর্মচারি হি সবে আমার সুনাম হল। এরপর যখন একজন বিভাগীয় সুপারিন্টেডেন্টের একজন প্রাইভেট সেক্রেটারির দরকার হল তিনি আমাকেই চাইলেন, কারণ তাঁর মতে, আমি অসন্তুষ্ট না হয়ে বাড়তি কাজ করতে চাই এবং ঠিক এমনটাই তার দরকার। এই ভাবে শুধু মানসিক চিন্তাধারা বদলের ফলেই দারুণ কিছু ঘটে গেল। এ এক দারুণ আবিষ্কার। অদ্ভুত কিছুই এতে ঘটেছে।

কয়েক বছর আগে হারল্যান এ. হাওয়ার্ড এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাতে আর জীবনের ধারাই সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। তিনি নীরস একটা কাজকে সরস করতে চেষ্টা করেন। সত্যিই তার কাজটা একঘেঁয়েমিতে ভরা ছিল–প্লেট সাফ করা, কাউন্টার ধোলাই করা, উঁচু ক্লাসের খাওয়ার ঘরে আইসক্রিম সররাহ করা ইত্যাদি যখন করত, তখন অন্য ছেলেরা খেলাধুলোয় বা মেয়েদের সঙ্গে খুনসুটি করতে ব্যস্ত। হারল্যান হাওয়ার্ড মনে প্রাণেই তার কাজকে ঘৃণা করত। কিন্তু কাজটা যখন তাকে করে যেতেই হবে, তখন সে আইসক্রিম কি দিয়ে তৈরি সেটা জানবে বলে ঠিক করে ফেলল। তাছাড়া একটা আইসক্রিম আর একটা চেয়ে কেনই বা ভালো। সে আইসক্রিমের রসায়ন পড়তে শুরু করল আর পরে দক্ষতাও অর্জন করল। খাদ্য রসায়ন সম্পর্কে তার আগ্রহ এতই বেড়ে উঠল যে, শেষপর্যন্ত সে ম্যাসাচুসেটস্ স্টেট কলেজে ভর্তি হল। এরপর যখন নিউইয়র্ক কোকো এক্সচেঞ্চ, কোকো আর চকোলেট সম্বন্ধে একশ ডলার পুরস্কার প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করল কলেজ ছাত্রদের জন্য-কে জয়ী হল জানেন? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। হারল্যান হাওয়ার্ড।

কাজকর্ম জোগাড় করতে না পেরে সে তার বাড়ি ম্যাসাচুসেটসের আমহাস্টের ৭৫০ নর্থ প্লেজান্ট স্ট্রিটে একটা ছোট্ট গবেষণাগার খুলল। কিছুদিনের মধ্যে দেশে একটা নতুন আইন চালু হল যে দুধের মধ্যেকার জীবাণু গুনতে হবে। হারল্যান হাওয়ার্ডকে কিছুদিনের মধ্যেই আমহার্স্টের অন্তত কুড়িটা প্রতিষ্ঠানের দুধের জীবাণু গোনার কাজে দেখা গেল। তাকে দুজন সহকারীও রাখতে হল।

পঁচিশ বছর পরে এই ছেলেটির কি হবে জানেন? এখন যারা ব্যবসা পরিচালনা করে চলেছেন সেই সব মানুষ ততদিনে অবসর নেবেন বা হয়তো পরলোকে যাবেন, আর তাদের স্থান নেবেন আজকের হাস্যোজ্জ্বল কর্মচঞ্চল তরুণ ছেলেরাই। পঁচিশ বছর পরে আজকের হারল্যান হাওয়ার্ড হয়ে উঠবে তার পেশায় একজন অতি বিখ্যাত মানুষ, অন্যদিকে তার সহপাঠিরা, যাদের সে আইসক্রিম বিক্রি করত তারা হয়তো বেকার থেকে সরকারকে অভিসম্পাত দিয়ে চলবে। হারল্যান এ, হাওয়ার্ডও হয়তো কোনো সুযোগ পেত না যদি-না সে একটা একঘেঁয়েমি ভরা কাজকে আনন্দময় করে তুলতে চাইত।

বেশ কয়বছর আগে আর একজন তরুণও তার কাজ নিয়ে একঘেঁয়েমিতে আক্রান্ত হয়েছিল। তার কাজ ছিল কারখানার লেদ মেশিনে বল্ট তৈরি করা। ছেলেটির নাম ছিল শ্যাম। কাজ ভালো লাগত না বলেই শ্যাম কাজ ছেড়ে পালাতে চাইত, কিন্তু তার ভয় ছিল অন্য কাজ যদি না পায়। কাজটা তাই করে যেতে হবে বলেই শ্যাম ঠিক করল কাজকে আনন্দময় করে তুলতে হবে এই ভেবেই সে তার পাশের মেশিন চালকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ল। দুজনে পাল্লা দিয়ে বল্ট বানাতে শুরু করল। দুজনে দেখত কে বেশি বানিয়েছে। শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা ফোরম্যানের নজরে পড়ল। তিনি শ্যামের কাজের গতিতে দারুণ খুশি হয়ে তাকে আরো ভালো কাজে লাগালেন। এই হল পরপর কতকগুলো পদোন্নতির শুরু। ত্রিশ বছর পরে, শ্যাম-স্যামুয়েল ভকলেন–হলেন বন্ডুইন লোকোমোটিভ ওয়াকসের প্রেসিডেন্ট। তিনি সারাজীবন ধরেই ওই মেকানিক থেকে যেতেন, যদি না নিজের কাজকে আনন্দময় করে তুলতে চাইতেন।

বিখ্যাত বেতার সংবাদ ঘোষক এইচ. ভি. ক্যাপ্টেনবর্ন একবার আমাকে বলেন, কীভাবে তিনি নীরস একটা কাজকে আনন্দময় করে তোলেন। তার বাইশ বছর বয়সের সময় তিনি জাহাজে আটলান্টিক পাড়ি দেন। কিছু গবাদি পশুর তদারকির কাজ করেন। বাইসাইকেলে ইংল্যান্ডে পরিক্রমার পর প্যারি শহরে পৌঁছান ক্যাল্টেনবর্ন। নিজের ক্যামেরা মাত্র পাঁচ ডলারে বাঁধা রেখে তিনি প্যারির সংস্করণ নিউইয়র্ক হেরাল্ডে একটা কাজের আবেদন করে বিজ্ঞাপন দেন। কাজও একটা জুটে যায়–ছবির দেখার স্টিরিওস্কোপ মেশিন বিক্রির। মেশিনের কথাটা বয়স্ক লোকেরা সবাই জানেন দুটো ছবি ঘোরাতে থাকলে একটা হয়ে ত্রিস্তর ছবি হয়ে উঠে।

ক্যাল্টেনবর্ন শেষপর্যন্ত ওই মেশিন প্যারির দরজা দরজায় ঘুরে বিক্রি করতে শুরু কররেন-অসুবিধাও ছিল কারণ ফরাসিতে তিনি কথা বলতে পারতেন না। তা সত্ত্বেও কিন্তু তিনি প্রথম বছরেই পাঁচ হাজার ডলার কমিশন পেয়ে সে বছরে ফ্রান্সের সবচেয়ে বেশি আয়ের বিক্রেতা হয়ে উঠলেন। ক্যাপ্টেনবর্ন আমাকে জানিয়ে ছিলেন, এমন কাজ তার পক্ষে করা সম্ভব হয়েছিল একটা মাত্র কারণেই–আর সেটা হল আত্মবিশ্বাস। হার্ভার্ডে এক বছর পড়াশুনা করার ফলেই এই আত্মবিশ্বাস তাঁর মধ্যে জন্ম নেয়।

তাহলে ফরাসি ভাষা না জানা সত্ত্বেও এ আত্মবিশ্বাস তার এলো কি করে? আসলে কীভাবে বিক্রির সময় কথাগুলো বলতে হবে সেটা তার নিয়োগকর্তা ফরাসিতে তাঁকে লিখে দেয়ার পর তিনি সেটা মুখস্ত করে রাখেন। কোনো বাড়ির দরজায় ঘন্টা বাজিয়ে দিতে গৃহকর্ত্রী দরজা খুললে, ক্যাপ্টেনবর্ন সুন্দর উচ্চারণে সেই মুখস্থ করা ফরাসিতে কথা বলে মেশিনটা ইঙ্গিত করতেন আর ছবিও দেখাতেন। গৃহকর্ত্রী বাড়তি প্রশ্ন করলে তিনি শুধু টুপি তুলে বলতেন আমেরিকান…আমেরিকান আর সঙ্গে লেখা সেই ফরাসি লেখাও দেখিয়ে দিতেন। গৃহকর্ত্রীরা আমোদ পেয়ে হাসতেন আর তার কাজও সমাধা হয়ে যেত। ক্যাল্টেনবর্ন নিজেই স্বীকার করছেন কাজটা আদৌ সহজ ছিল না। তাহলে তার সাফল্যের কারণ কি? একটাই–নিজের কাজ সমাধা করার অদম্য উৎসাহ আর আনন্দময় করে তোলো। প্রতিদিন সকালে বাইরে বেরোনোর আগে তিনি একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতেন : ক্যাপ্টেনবর্ন, যদি খেতে চাও তাহলে এ কাজ তোমাকে করতেই হবে। আর করতে যখন হবেই তখন আনন্দেই সে কাজ করো না কেন? নিজেকে কোনো অভিনেতা ভেবে নাও আর মনে করো কোনো মজাদার চরিত্রেই অভিনয় করছ।’

মি. ক্যাপ্টেনবর্ন নিজে আমাকে বলেছেন, প্রতিদিনের ওই স্বগতোক্তি তাঁকে যে কাজ একদিন ঘৃণা করত তাতেই সফল হতে সাহায্য করেছে। আমেরিকান তরুণদের কাছে তার পরামর্শ হল, প্রতিদিন কাজে নামা চাই। শারীরিক ব্যায়ামের মতো আমাদের দরকার মানসিক কিছু ব্যায়ামও। তাই প্রতিদিন কিছু স্বগতোক্তি করা ভালো।’

এটা কি কোনো হাস্যকর ব্যাপার? মোটেই না। এটা সম্পূর্ণ মনোবিদ্যার ব্যাপার। আমাদের জীবন হল আমাদের মন যা তৈরি করে, আমরা ঠিক তাই। ঠিক মতো চিন্তার মধ্যে দিয়েই যে-কোনো কাজ আপনি কম নীরস করে তুলতে পারেন। শুধু ভাবতে চেষ্টা করুন, কাজকে আনন্দময় করে তুলতে পারলে তার বদলে কি পাবেন আপনি। একবার ভাবুন, এতে আপনার জীবনের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে উঠতে পারে, কারণ আপনি আপনার জাগ্রত থাকার সময়ের শুধু অর্ধেকটাই কাজে ব্যয় করেন। মনে রাখার চেষ্টা করুন, আপনার কাজকে আনন্দময় করে তুললে তাতে পদোন্নতি বা আয়বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। আর তা না। হলেও অন্তত আপনার দৈনন্দিন অবসাদ দূর হয়ে আনন্দের পরশ পেতে পারেন।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *