২৫. শেল কটেজ

২৫. শেল কটেজ

বিল এবং ফ্লয়ারের বড় বড় ঝিনুকের তৈরি কটেজটি সমুদ্র পাড়ের পাহাড় সংলগ্ন। এর দেয়ালের পাশে বিছিয়ে আছে নানা রকমের ঝিনুক এবং একেবারে সমুদ্রের পানিতে ধোয়া ঝকঝকে। ছোট কটেজটির যেখানেই হ্যারি যায় সেখানেই শুনতে পায় সমুদ্রের গর্জন ও ঢেউয়ের শব্দ। মনে হচ্ছে যেন কোনো বিশালাকার প্রাণী সারাক্ষণ বিকট শব্দে নিঃশ্বাস ফেলছে। পরের কয়েকটি দিন সে যতটা সম্ভব অন্য সবার কাছ থেকে দূরে থাকতে চেষ্টা করল। চেষ্টা করল পাথরের উপর দিয়ে আকাশ এবং বিস্তৃত সমুদ্র দেখতে। ঠাণ্ডা লবনাক্ত বাতাস চোখে মুখে উপলব্ধি করল।

ভল্টেমর্টের সঙ্গে যাদুদণ্ডের অসম প্রতিযোগিতায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ওকে ভিতু করে তুলছে। সে আগে কখনো এমন পিছু হটেছে কিনা মনে করতে পারছে না। তার মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে যে এ বিষয়ে রন তাকে কোনো মত দেবে কি।

ডাম্বলডোর যদি চেয়ে থাকেন যে যাদুদণ্ডটি পেতে, যাতে সঙ্কেতগুলো আমরা খুঁজে বার করি তাহলে? চিহ্নগুলো বোঝার পর হয়তো হ্যালোস খুঁজে পাওয়ার জন্য তুমি উপযুক্ত হয়ে উঠবে, বিষয়টি যদি এমন হয়? হ্যারি, যাদুদণ্ডটি যদি সত্যি এলডার ওয়্যাভ হয় তাহলে ইউ-নো-হুকে শেষ করতে আমাদের আর কি প্রয়োজন?

হ্যারির কাছে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। হ্যারি এক সময় ভেবেছে ভন্ডেমর্টের সৌধ ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করাটা প্রতিরোধ না করা একেবারেই পাগলের কাজ। সে এমনকি ব্যাখ্যাও করতে পারবে না, কেন সে এই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। যতবার তারা নিজেদের সঙ্গে নিজেরা বিতর্ক করেছে ততবার তার সিদ্ধান্ত টিই সামনে এসেছে। ওদের বিতর্ককে তার কাছে দুর্বল মনে হয়েছে।

অস্বাভাবিক বিষয়টি হল, হারমিয়নের সমর্থন তাকে রনের সন্দেহ করার ব্যাপারটির মতই অস্বস্তিতে ফেলেছে। চাপের মুখে যাদুদণ্ডটির অস্তিত্বের কথা স্বীকার করলেও সে ধারণা করে এটি একটি অশুভ জিনিস। এবং ভন্ডের্টের এটির আয়ত্ব করার বিষয়টি আরো বিরক্ত করেছে।

তুমি এটা কখনোই করতে পারবে না হ্যারি, হারমিয়ন বারবার বলেছে। তুমি কখনোই ডাম্বলডোরের কবর ভেঙে ঢুকতে পারবে না।

কিন্তু ডাম্বলডোরের মৃতদেহের ধারণাটি তাকে কম শঙ্কিত করেছে। বরং জীবিত ডাম্বলডোরের ইচ্ছার ব্যাপারে ভুল বোঝাটা আরো ভয়ানক। হ্যারির মনে হল সে যেন এখনো অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। সে তার পথ বেছে নিয়েছে, কিন্তু তারপরও যেন পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। ভাবছে সে চিহ্নটি ভুল করল কি না। অন্য পথ নেয়াটা তার ঠিক হল কি না। খানিক সময় পরপর ডাম্বলডোরের প্রতি প্রচণ্ড ক্রোধ ফেটে পড়ছে। এতটাই বেগে যেন ঘরের দেয়ালে যেমন সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তেমনি। ক্রোধের কারণ হল ডাম্বলডোর মৃত্যুর আগে কিছু ব্যাখ্যা করে যাননি।

কিন্তু সত্যিই কি তিনি মৃত? কটেজে আসবার তিনদিন পর রন বলল। হ্যারি দেয়ালের বাইরের দিকে তাকিয়েছিল। হারমিয়ন এবং রন তাকে দেখতে পেল। হ্যারির ওদের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দিতে ইচ্ছে হল না।

হা রন, আবার এ নিয়ে তর্ক শুরু করো না!

আসল ঘটনাটা দেখ হারমিয়ন, রন বলল। হ্যারির মাঝখানে দাঁড়ানো। তখনো হ্যারি বিস্তৃত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখ সেই মাদী হরিণটি, তলোয়ার। তারপর হ্যারির ভাঙা আয়নায় দেখা চোখ….

হ্যারি নিজেই বলেছে যে সে ওই চোখ দুটোকে চিনতে পারে, তাই না হ্যারি?

হুম, পারতাম, হারমিয়নের দিকে না তাকিয়েই হ্যারি বলল।

কিন্তু তুমি চিন্তা করছ না যে তুমি দেখেছ, তাই না? রন বলল।

না, আমি ভাবছি না, হ্যারি বলল।

হারমিয়ন কিছু বলার আগেই রন বলল, যদি এটা ডাম্বলডোরই না হবে, তাহলে বলো কী করে ডোবি জানল যে আমরা শেলারের ভেতর আটকে আছি, হারমিয়ন?

আমি জানি না। কিন্তু তুমি বলতে পারবে যে কী করে ডাম্বলডোর তাকে পাঠাবেন যদি তিনি হোগার্টসের কবরে শুয়ে থাকেন?

আমি জানি না, হতে পারে এটা তার ভূতের কারবার!

ডাম্বলডোর ভূত হয়ে আমাদের দেখা দিতে পারেন না, হ্যারি বলল। ডাম্বলডোর সম্পর্কে সে এখন কোনো কিছুতেই নিশ্চিত না। তিনি চলে যাচ্ছেন।

তুমি কী বলতে চাচ্ছ, চলে যাচ্ছে?রন বলল। কিন্তু হ্যারি কিছু বলার আগেই একটি কণ্ঠ পেছন থেকে বলল, হ্যারি?

ফ্লয়ার কটেজ থেকে বেরিয়ে এসেছে। তার ধুসর রুপালি চুলগুলো উড়ছে।

হ্যারি, গ্রিপহুক তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। সে সবচেয়ে ছোট ওই রুমটিতে আছে। সে বলছে সে কথা ছাড়া থাকতে পারছে না।

 সে যে গবলিনকে অপছন্দ করে তা তার খবর দেয়া থেকে বোঝা গেল। ঘরের দিকে ফিরে যাওয়ার সময় তাকে বিরক্ত দেখা গেল।

গ্রিপহুক ওদের জন্য ফ্লয়ারের বলা রুমটিতে অপেক্ষা করছে। তিন বেডরুমের মধ্যে এটাই সবচেয়ে ছোট। রুমটিতে রাতে হারমিয়ন এবং লুনা ঘুমিয়েছে। সে উজ্জ্বল মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকটাতে লাল পর্দা টেনে দিয়েছে। যার ফলে ঘরের ভেতর ভিন্ন রকমের একটি আলো তৈরি হয়েছে।

আমি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে এসেছি হ্যারি পটার, গবলিন বলল। সে একটি নিচু চেয়ারে পায়ের উপর পা দিয়ে বসে আছে। সে চেয়ারটির হাতলে লম্বা সরু নখ দিয়ে টোকা দিচ্ছে। যদিও গ্রিনগোটের গবলিনরা এটিকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করবে, কিন্তু আমি তোমাকে সাহায্য করব

সেটা খুবই ভাল কথা, হ্যারি বলল। তার ভেতর একটি স্বস্তি বয়ে গেল। গ্রিপহুক, ধন্যবাদ আমরা সত্যিই

–বিনীময়ে, গবলিন বলল। আমাকে পেমেন্ট করতে হবে।

হ্যারি একটু ধাক্কা খেয়ে দ্বিধা করল।

তুমি কত চাও? আমার কাছে সোনা আছে।

সোনা নয়, গ্রিপহুক বলল। সোনা আমার কাছে আছে।

তার কালো চোখগুলো চকচক করছে। তার চোখে কিছু সাদা নেই।

আমি ওই তলোয়ারটি চাই, গোড্রিচ গ্রিফিনডোরের তলোয়ার।

 হ্যারি যেন ধাক্কা খেল।

তুমি সেটা পাবে না, হ্যারি বলল। আমি দুঃখিত।

তাহলে, গবলিন বলল। আমাদের একটি সমস্যা আছে।

রন আগ্রহ নিয়ে বলল, আমরা তোমাকে অন্য কিছু দিতে পারি। আমি নিশ্চিত যে রেষ্ট্যাঞ্জেসে প্রচুর জিনিস রক্ষিত আছে। তুমি ভল্টের ভেতর থেকে যা ইচ্ছা নিতে পারো।

সে ভুল কথাটি বলে ফেলেছে। গ্রিপহুক ক্ষেপে গেল।

আমি কোনো চোর না, ছেলে! আমি এমন কোনো সম্পদ গ্রহণের চেষ্টা করছি যার উপর আমার কোনো অধিকার নেই।

তলোয়ারটি আমাদের

না, তা নয়, গবলিন বলল।

আমরা নিজেরা গ্রিফিনডোর, এবং এই তলোয়ারটি গোড্রিচ গ্রিফিনডোরের।

 গ্রিফিনডোরের আগে এটি কার ছিল? উঠে বসে জানতে চাইল গবলিন।

কারো না, রন বলল। এটা তার জন্যই বানানো হয়েছিল, তাই নয় কি?

না!, চিৎকার করে উঠল গবলিন। প্রচণ্ড রাগে সে লম্বা আঙুল রনের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি আবার উইজার্ডদের উদ্যোত আচরণ! এই তলোয়ারটি প্রথম ছিল রাগনুকের, এটি চুরি করে নিয়েছিল গোড্রিচ গ্রিফিনডোর। এটি একটি হারানো সম্পত্তি, গবলিনদের কাজের একটি মাস্টারপিস। এটি গবলিনদের জিনিস। আমাকে হায়ার করার মুল্য ওই তলোয়ারটি, হয় রাজি না হয় বাদ!

গ্রিপহুক ওদের দিকে তাকালো। হ্যারিও বাকী দুজনের দিকে তাকালো। তারপর হ্যারি বলল, এ ব্যাপারটি নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে গ্রিপন্থক, তুমি কী আমাদের কয়েক মিনিট সময় দেবে?

গবলিন হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ল। তাকে রাগান্বিত দেখা গেল।

নিচের তলার বসার রুমটি খালি। হ্যারি হেঁটে সেখানে ফায়ার প্লেসের কাছে গেল। কপাল ভাজ করলো। কী করা যায় তা চিন্তা করতে চেষ্টা করল। তার পেছন থেকে রন বলল, সে একটি হাস্যকর কথা বলছে। আমরা তাকে এ তলোয়ারটি দিতে পারিনা

এটা কি ঠিক, হ্যারি হারমিয়নকে জিজ্ঞেস করল। তলোয়ারটি কি গ্রিফিনডোর চুরি করেছিল?

হারমিয়ন হতাশ কণ্ঠে বলল, আমি জানি না, উইজার্ডিং ইতিহাস অনেক সময় এদিক ওদিক করা আছে অন্যান্য জাতির প্রতি উইজার্ডদের কাজকর্ম নিয়ে। কিন্তু আমি জানি গ্রিফিনডোর তলোয়ারটি চুরি করেছিল কিনা তা নিয়ে কিছু বলা নেই।

রন বলল, এটাও গবলিনদের একটি কাহিনী হতে পারে যে কীভাবে গবলিনদের উপর উইজার্ডরা অন্যায় করেছে। আমি মনে করি আমাদের নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করা উচিত যে সে আমাদের যাদুদণ্ডগুলো চেয়ে বসেনি।

গবলিনরা উইজার্ডদের অপছন্দ করার অনেক কারণ আছে, রন, হারমিয়ন বলল। অতীতে তাদের সঙ্গে অনেক নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে।

গবলিনরাও একেবারে নরম কেউ না মেয়ে! রন বলল। ওরা আমাদের অনেককেই হত্যা করেছে। ওরা কম হাঙ্গামা করেনি।

কিন্তু তার সঙ্গে কারা বেশি সহিংস এবং খারাপ এ বিতর্কে গেলে সে আমাদের সাহায্য করবে না, ঠিক না?

এ সমস্যা নিয়ে আলোচনার সময় ওরা একটু থামল। হ্যারি বাইরে ডোবির কবরের দিকে তাকালো। লুনা সেখানে কিছু সমুদ্রপারের ফুল একটি জারে ঠেসে রেখে দিচ্ছে।

ওকে, রন বলল। হ্যারি তার দিকে ঘুরে তাকালো।

সেটা কীভাবে? আমরা গ্রিপহুককে বলব যে তলোয়ারটি আমাদের লাগবে ভন্টে প্রবেশ করা পর্যন্ত। তারপর সে ওটি নিয়ে নেবে। সেখানে একটি নকল তলোয়ার আছে, তাই না? আমরা সেটি আয়ত্ব করে তাকে নকলটি দিয়ে দেব।

রন, সে আমাদের চেয়ে তারতম্যটা ভালো জানে, হারমিয়ন বলল। সে হল একজন যে জানে যে তলোয়ারটি ওলোটপালট করা হয়েছে।

সে বুঝে ওঠার আগেই আমরা দ্রুত সরে আসব। সে হারমিয়নের চাহনি দেখে ঘাবড়ে গেল।

হারমিয়ন শান্তভাবে বলল, এটা হল ঘৃণার কাজ। প্রথমে তার সাহয্য নেব এবং তারপর তার সঙ্গে বেঈমানি করব? আর তুমি ভাবছ কেন গবলিন উইজার্ডদের অপছন্দ করে রন?

রনের কান লাল হয়ে গেল।

ঠিকাছে ঠিকাছে, এটা হল একটি বিষয় আমি চিন্তা করেছি মাত্র। তাহলে তোমার সমাধান কি?

আমাদের প্রয়োজন তাকে অন্য কোনো প্রস্তাব দেয়া, অন্য মূল্যবান কিছু।

চমৎকার, আমি গিয়ে একটি গবলিনদের তৈরি পুরাতন তলোয়ার নিয়ে আসব এবং সেটা তুমি ওকে উপহার দিতে পারো।

আবার ওদের ভেতর নিরবতা নেমে এল। হ্যারি জানে এবং নিশ্চিত যে গবলিন ওই তলোয়ার ছাড়া আর কিছুই গ্রহণ করবে না। এমনকি এর মত দামি অন্য কিছু হলেও না। তারপরও এই তলোয়ারটিই হল হরক্রুকসের জন্য একমাত্র অন্ত্র।

সে কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল এবং সমুদ্রের শব্দ শুনল। গ্রিফিনডোর তলোয়ারটি চুরি করেছিল এ ধারণা তার কাছে খুবই অস্বস্তিকর। হ্যারি

সব সময় একজন গ্রিফিনডোর হিসাবে গর্ব বোধ করতো। গ্রিফিনডোর সবসময় মাগলবর্নদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন। এই উইজার্ডরাই তো পিওর ব্লাড প্রীতির স্নিথারিনদের সঙ্গে বিরোধীতা করেছে।

হয়তো সে মিথ্যা বলছে, হ্যারি চোখ খুলে বলল। গ্রিপহুক। হয়তো বা গ্রিফিনডোর আসলে তলোয়ারটি নেয়নি। আমরা কী করে জানব যে গবলিনদের তৈরি ইতিহাসই ঠিক?

এর ভেতরে কি কোনো পার্থক্য আছে? হারমিয়ন জানতে চাইল।

হ্যারি বলল, এ বিষয়ে আমার ধারণা পাল্টাচ্ছে।

সে গভীরভাবে দম নিল।

আমরা তাকে বলব যে, সে তলোয়ারটি পাবে আমরা ভল্টে ঢোকার পর, কিন্তু আমরা সতর্ক থাকব যে কখন সে তলোয়ারটি পাবে তা ঠিক করে বলব না।

রনের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। হারমিয়নকে বরং সতর্ক দেখা গেল।

হ্যারি, আমরা পারি না।

সে এটা পাবে, হ্যারি বলল। আমরা সবগুলো হরক্রুক্স খোঁজার কাজে ব্যবহারের পর তাকে এটি দিয়ে দেব। আমি আমার কথা রাখব।

কিন্তু তাতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে! হারমিয়ন বলল।

আমি সেটা জানি, কিন্তু সে জানে না। আমি তার কাছে মিথ্যা বললাম …আসলেই।

হ্যারি হারমিয়নের দিকে তাকালো একটি লজ্জা নিয়ে। তার মনে পড়ল নারমেনগার্ডের গেটের কাছে লেখা আছে : ফর দি গ্রেটার গুড। সে এই চিন্তাটি দূরে সরিয়ে দিল। এ ছাড়া ওদের আর কিইবা করার আছে?

আমি এটা পছন্দ করছি না, হারমিয়ন বলল।

আমিও খুব একটা পছন্দ করছি না। হ্যারি বলল।

ওয়েল, আমি চিন্তা করছি এটাই সবচেয়ে উত্তম, রন বলল। সে উঠে দাঁড়ালো। চলো যাই এবং তাকে এ কথাই বলি।

ওরা ছোট বেডরুমটায় ফিরে এল। হ্যারি তাকে প্রস্তাবটা জানালো। সতর্ক থাকল তাকে তলোয়ারটি ফেরত দেয়ার নির্দিষ্ট সময় না বলার ব্যাপারে! সে কথা বলার সময় হারমিয়ন একেবারে চুপ হয়ে থাকল। হ্যারি ওর উপর একটু বিরক্ত বোধ করল। ভয় পেল যে হারমিয়ন এই কৌশলটি নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু গ্রিপহুকের দৃষ্টি শুধুমাত্র হ্যারির দিকে।

আমি তোমার কথাটি নিলাম হ্যারি পটার, তোমাকে সাহায্য করার পর তুমি আমাকে তলোয়ারটি ফেরত দেবে।

হ্যাঁ, হ্যারি বলল।  

তাহলে হাত মেলাও, গ্রিপহুক তার হাতটি বাড়িয়ে দিল।

হ্যারি তার হাতটি ধরল এবং ঝাঁকি দিল। সে ভাবল তার ওই কালো চোখ দুটি হ্যারির চোখে কোনো ছলনা দেখতে পায় কি না। এরপর গ্রিপহুক তার হাতটি ছেড়ে দিয়ে দু হাতে তালি দিল। বলল, তাহলে শুরু করা যাক।

এটা অনেকটা গোটা মিনিস্ট্রি ভেদ করে যাওয়ার পরিকল্পনা। ওরা ছোট বেডরুমটিতে বসে পরিকল্পনা আটল। গ্রিপন্থকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রুমটিকে প্রায় অন্ধকার করে রাখা হল।

আমি লেস্ট্যাঞ্জেসের ভল্টটিতে মাত্র একবার প্রবেশ করেছি, গ্রিপহুক বলল। এর ভেতরে নকল তলোয়ারটি রাখার সময়। এটি একটি অন্যতম পুরাতন চেম্বার। সেকালের উইজার্ডিং পরিবারগুলো তাদের মূল্যবান সম্পদ সবচেয়ে গভীর স্তরে রাখতে। জায়গাটি অনেক বড় এবং সবচেয়ে নিরাপদ….

ওরা প্রতিদিন আলমিরার মত ছোট রুমটিতে কয়েক ঘণ্টা করে দরোজা বন্ধ করে কাজ করল। দিন পার হয়ে সপ্তাহ চলে গেল। সমাধান করতে একটার পর একটা সমস্যা এসে সামনে দাঁড়ালো। অবশেষে দেখা গেল ওদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমান পলিজিউস পোশন নেই।

শুধুমাত্র একজনের পরিমান পলিজিউস পোশন আমাদের কাছে অবশিষ্ট আছে, হারমিয়ন আলোর কাছে পলিজিউস পোশনের বোতল ধরে নাড়িয়ে বলল।

ওটুকুই যথেষ্ট, হ্যারি বলল। সে গ্রিপহকের হাতে আঁকা ম্যাপটিতে ভেতরের প্যাসেজগুলো পরীক্ষা করছে।

শেল কটেজের অন্য বাসিন্দারাও অনুমান করছে যে কিছু একটা ঘটনা আছে। কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু ওরা খাবার সময় নিচে নেমে এসে খেতে বসলে বিলের চোখ তিনজনের উপর সন্দেহের দৃষ্টিতে ঘুরতে থাকে। তার চোখে-মুখে চিন্তা এবং উদ্বেগের ছাপ।

যতই গবলিনের সঙ্গে সময় কাটালো ততই হ্যারি অনুভব করতে থাকল যে সে গবলিনকে পছন্দ করছে না। গ্রিপহুক অপ্রত্যাশিতভাবে রক্তপিপাসু। অন্যান্য নিচু শ্রেণীর প্রাণের ব্যাথার কথায় সে আনন্দ পায়। ভল্টে প্রবেশের সময় অন্য উইজার্ডদেরকে আঘাত করার সম্ভাবনার কথা শুনলে স্বস্তি বোধ করে। হ্যারি বুঝতে পারে যে তার সঙ্গে অন্য দুজনও পছন্দ করছে না। কিন্তু এ নিয়ে ওরা কেউ তার সঙ্গে আলোচনা করেনি। গ্রিপহুককে ওদের প্রয়োজন।

গবলিন অসন্তোষ্টির সঙ্গে খায়। তার পা ভাল হয়ে গেলেও সে অলিভ্যান্ডারের মত তার রুমটিতে বসে ট্রেতে করে খাবার খেতে চায়। কিন্তু বিল (ফ্লয়ারের এ ব্যাপার নিয়ে চিৎকার করার পর) উপরে গিয়ে জানায় যে এভাবে তাকে আর খাবার পরিবেশন করা সম্ভব নয়। এরপর গ্রিপহুক সবার সঙ্গে নিচের টেবিলে খেতে আসে। কিন্তু অন্য সবাই যা খায় তা সে খেতে চায় না। তার জন্য আলাদা শুকনো মাংস, গাজর এবং শাক দাবী করে।

হ্যারি দায়িত্ব অনুভব করে। সে সবাইকে বোঝায় যে আর যাই হোক গবলিন শেল কটেজে আছে হ্যারিকে নানা বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য। তার কারণে উইসলি পরিবারকে লুকিয়ে পড়তে হয়েছে। এখন বিল, ফ্রেড, জর্জ এবং মি. উইসলি কেউ কাজ করতে পারছে না।

আমি দুঃখিত, এপ্রিলের এক সন্ধ্যায় ডিনার তৈরিতে সাহায্য করার সময় সে ফ্লয়ারকে বলল। আমি কখনো চাইনি যে তোমরা এই সমস্যার ভেতর জড়িয়ে না পড়।

ফ্লয়ার গ্রিপহুক এবং বিলের জন্য চাকু দিয়ে মাংস পিস করছে। চাকু দিয়ে মাংস কাটতে কাটতে তার বিরক্ত হওয়াটা মুছে গেল।

হ্যারি, তুমি আমার বোনের জীবন রক্ষা করেছ। আমি কখনো ভুলবো না।

কথাটি পুরোপুরি সত্য না। কিন্তু হ্যারি তাকে মনে করিয়ে দিল না যে গ্যাব্রিয়েল কখনোই ভয়ানক বিপদে ছিল না।

যাই হোক, ফ্লয়ার বলতে থাকল। সে তার যাদুদণ্ডটি চুলোর উপরে রাখা সসের পাতিলের দিকে ধরল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পাতিল থেকে বুদ্বুদ উঠতে লাগল। আজ সন্ধ্যায় মি. অলিভ্যান্ডার মুরিয়েলের ওখানে যাবেন। তাতে অনেক কিছু সহজ হবে। সে একটু তীব্র সুরে বলল, গবলিন নিচে এসে থাকতে পারে। তুমি, রন এবং ডিন উপরের ওই রুমটিতে চলে যাও।

লিভিংরুমে থাকতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, হ্যারি বলল। সে জানে যে নিচে সোয়ায় ঘুমানোটাকে গ্রিপহুক ভালোভাবে নেবে না। তাদের পরিকল্পনা মত গ্রিপহুককে সন্তুষ্ট রাখাটা জরুরি। আমাদের নিয়ে চিন্তা করো না। এবং যখন সে প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করলো তখন হ্যারি বলল, আমরাও শীঘ্রই তোমাকে ছেড়ে যাবো। রন, হারমিয়ন এবং আমি। এখানে আমাদের বেশি সময় থাকতে হবে না।

কিন্তু তুমি কী বলতে চাচ্ছ? ফ্লয়ার জানতে চাইল। সে হাতের যাদুদণ্ডটি দিয়ে রান্নার পাতিলটি শুন্যে তুলে ফেলল। অবশ্যই তোমরা এখান থেকে যাবে না। এখানে তোমরা নিরাপদে আছো!

কথা বলার সময় তাকে অনেকটাই মিসেস উইসলির মত শোনালো। পেছনের দরোজা খুলে যেতেই হ্যারিকে আনন্দিত মনে হল। লুনা এবং ডিন প্রবেশ করেছে। বাইরের বৃষ্টিতে ওদের চুল ভিজে গেছে। ওদের বাহুতে গাছের শুকনো ডালপালা লেগে আছে।

..ছোটছোট কানগুলো, লুনা বলছে। অনেকটা জলহস্তীর কানের মতো।

ড্যাডি বলেন অনেকটা রঙীন এবং পশমঅলা। এবং যদি তুমি ওদেরকে ডাকো তাহলে হাম্ শব্দ করতে হবে। ওরা নাচ পছন্দ করে। তবে খুব দ্রুত গতিতে না…

রন এবং হারমিয়ন ডিনার টেবিল সাজাচ্ছে। লুনার পেছনে পেছনে সেদিকে যেতে যেতে ডিন হ্যারির দিকে তাকিয়ে কাঁধটা উঁচু করল। তাকে অস্বস্তিতে আছে বলে মনে হল। ফ্লয়ারের প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচার সুযোগ পেয়ে হ্যারি দু হাতে দুটি পামকিন জুসের জগ নিয়ে ওদের পেছনে পেছনে গেল।

….যদি তুমি আমাদের বাড়িতে আসো আমি তোমাকে ওই শিংগুলো দেখাবো। ড্যাডি আমাকে চিঠিতে লিখেছেন। কিন্তু আমি নিজের চোখে এখনো ওগুলো দেখিনি। কারণ ডেথ-ইটাররা আমাকে হোগার্টসের ট্রেন থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে আমি আর ক্রিসমাসে বাড়ি যেতে পারিনি লুনা বলল।

ওরা দুজনই ফায়ারপ্লেসের কাছে গেল।

লুনা, আমরা তোমাকে জানিয়েছি যে ওগুলো ফেটে গেছে, হারমিয়ন লুনার উদ্দেশে বলল। সেটি ছিল এরুমপেন্ট, ক্রাম্পল হর্ন স্লেরক্যাক না

না, সেটা অবশ্যই একটি রেক্যাক হর্ন ছিল, লুনা শান্ত কণ্ঠে বলল। ড্যাডি আমাকে বলেছে, এটা সম্ভবত আবার পুনর্গঠন হয়ে গেছে। ওরা নিজেরা আবার প্রস্তুত হয়ে যায়, তুমি জানো।

হারমিয়ন চামচগুলো টেবিলে নামিয়ে রাখতে রাখতে মাথা দোলালো। বিল মি, অলিভ্যান্ডারকে সঙ্গে নিয়ে নিচে নেমে এসেছে। অলিভ্যান্ডারকে এখনো অসম্ভব রকমের দুর্বল দেখা যাচ্ছে। তিনি বিলের হাত ধরে আছেন। বিল তাকে সাপোর্ট দিচ্ছে। তার হাতে একটি বড় স্যুটকেস।

লুনা সামনে এগিয়ে গেল। বলল, আমি আপনাকে মিস করবো মি. অলিভ্যান্ডার।

আমিও তোমাকে মিস করবো মাই ডিয়ার,

মি. অলিভ্যান্ডার বললেন। লুনার কাঁধ চাপড়ে দিলেন। ওই ভয়ানক জায়গাটিতে তুমি আমার কাছে এমন এক শান্ত্বনা ছিলে যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

সো–আ ভো, মি. অলিভ্যান্ডার, ফ্লয়ার ফরাসি ভাষায় বলল শুভ বিদায়। সে অলিভ্যান্ডারের দুগালে চুমু খেল। আমি ভাবছিলাম আপনি কি বিলের আন্টি মুরিয়েলের কাছে একটি প্যাকেট পৌঁছে দিয়ে আমাকে বাধিত করবেন? তার টায়রাটা এখনো ফিরিয়ে দেয়া হয়নি।

এটা তো আমার জন্য সম্মানের বিষয়, সামান্য একটু মাথা বো করে অলিভ্যান্ডার বললেন। তামার এই অসম্ভব আতিথেয়তার কাছে সেটা খুবই সামান্য কাজ।

ফ্লয়ার ভেলভেটের কাপড়ে মোড়ানো একটি ছোট বাক্স বের করল। সেটি খুলল অলিভ্যান্ডারকে দেখাবার জন্য। টায়রাটি আলোতে চিকচিক করছে।

মুনস্টোন এবং ডায়মন্ড, গ্রিপহুক বলল। সে এক কোণ দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে যা হ্যারি লক্ষ করেনি। এটি গবলিনদের তৈরি আমার ধারণা, তাই না?

এবং উইজার্ডরা এর জন্য পারিশ্রমিক দিয়েছে, বিল শান্ত কণ্ঠে বলল। গবলিন তার দিকে শীতল এবং অবিশ্বাস মেশানো চাহনি দিল।

বিল এবং অলিভ্যান্ডার যখন রওয়ানা হয় তখন জোরে জোরে বাতাস এসে কটেজের গায়ে আছড়ে পড়ছে। বাকী সবাই গাদাগাদি করে টেবিল ঘিরে বসে আছে। ওরা খেতে শুরু করল। এক জনের কনুইয়ের সঙ্গে আরেকজনের কনুই লেগে আছে। নড়তে পর্যন্ত অসুবিধা হচ্ছে। পাশে ফায়ার প্লেসে পটপট করে শব্দ করে আগুন জ্বলছে। হ্যারি লক্ষ করল ফ্লয়ার ওর পা নাড়াচ্ছে। সে বারবার জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দেখছে। কিন্তু বিল ওদের খাবার শেষ হওয়ার আগেই ফিরে এল। তার চুল বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেছে।

সবকিছু ঠিকঠাক আছে, সে ফ্লয়ারকে বলল। অলিভ্যাভার পৌঁছে গেছে। মাম এবং ড্যাড সকলকে হ্যালো বলেছে। জিনি তোমাদের সবাইকে শুভেচ্ছা দিয়েছে। ফ্রেড এবং জর্জ এখনো মুরিয়েলকে সহায়তা করছে। সে তার টায়রাটি ফেরত পেয়ে মহা আনন্দিত হয়েছে। বলল, সে নাকি ভেবেছিল আমরা ওটা মেরে দিয়েছি।

আহ্, একটা আজব মানুষ তোমার ওই আন্টি, ফ্লয়ার বলল। সে যাদুদণ্ড দিয়ে ব্যবহার করা প্লেটগুলো এক জায়গা করল। সেগুলো ধরে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল।

ড্যাডিও একটি টায়রা তৈরি করেছিল, লুনা বলে উঠল। ওয়েল সেটি একটি মুকুটের চেয়েও সুন্দর।

রন হ্যারির চোখের দিকে তাকালো এবং হাসল। হ্যারি জানে রনের অদ্ভুত দর্শন হেডড্রেসটির কথা মনে পড়েছে। জেনোফিলিয়াসের ওখানে গিয়ে যেটি দেখেছিল।

হ্যাঁ, তিনি র‍্যাভেনক্লোর মুকুটটি পুনরায় তৈরি করতে চাচ্ছিলেন। তিনি ভাবছেন তিনি ওটার সবগুলো আসল উপকরণ চিনে ফেলেছেন। বিলিউইগ পাখা যোগ করার বিষয়টি আসলেই আলাদা।

সামনের দরোজায় বিকট একটি শব্দ হল। সবাই ঘুরে সেদিকে তাকালো। ফ্লয়ার দৌড়ে কিচেন থেকে চলে এল। সে ভয় পেয়েছে। বিল লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে যাদুদণ্ডটি বের করে দরোজার দিকে ধরেছে। হ্যারি, রন এবং হারমিয়নও একই কাজ করল। নিরবে গ্রিপহুক টেবিলের নিচে সবার চোখের আড়ালে চলে গেল।

কে ওখানে! বিল বলল।

আমি, রেমুস জন লুপিন, হুনহুন করা বাতাসের শব্দের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ বলল। হ্যারি বেশ ভয় পেয়ে গেল। ঘটনাটা কি? আমি একজন ওয়্যারও, নিমফোডোরা টঙ্কসকে বিয়ে করেছি। তোমরা শেল কটেজের সিক্রেট কিপাররা আমাকে ঠিকানাটা বলেছিলে। জরুরি প্রয়োজনের সময় চলে আসতে বলেছিল।

লুপিন, বিড়বিড় করে বিল বলল এবং দৌড়ে দরোজার কাছে চলে গেল এবং টেনে দরোজা খুলে ফেলল।

লুপিন দরোজার কাঠের উপরই পড়েছে। তার মুখটি সাদা হয়ে আছে। একটি আলখাল্লা দিয়ে সে মোড়ানো। তার ধুসর চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেছে। লুপিন সোজা হয়ে দাঁড়ালো। সবার দিকে ঘুরে তাকালো। নিশ্চিত হল এখানে কে কে আছে। তারপর চিৎকার করে বলল, একটি ছেলে হয়েছে। আমরা ওর নাম রেখেছি টেড ডোরার বাবার নামানুসারে।

হারমিয়নও আনন্দে লাফিয়ে উঠল। ওয়া-! টঙস! টসের এখন একটি বাচ্চা আছে?

হা! হা! তার এখন বাচ্চা আছে! লুপিন বলল। টেবিলের চারপাশের সবাই আনন্দে চিৎকার করতে থাকল। স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। হারমিয়ন এবং ফ্লয়ার একই সঙ্গে বলে উঠল, অভিনন্দন! রন বলল হায় হায়! একটা বেবি! যেন এমন কথা সে কখনো শুনে নাই।

হ্যাঁ, হ্যা! একটি ছেলে। আবার লুপিন বলল। সে নিজেই যেন নিজের আনন্দে বিমোহিত হয়ে পড়েছে। সে টেবিলটা ঘুরে অন্যপাশে গেল এবং হ্যারিকে জড়িয়ে ধরল। নিচতলার এ আনন্দের দৃশ্য গ্রিমোন্ড প্লেসে কখনো পাওয়া যেত না।

তুমি হবে গডফাদার! সে হ্যারিকে ছেড়ে দিয়ে বলল।

আ-আমি? হ্যারির কথা বেধে গেল।

তুমি, হ্যাঁ, অবশ্যই! ভোরাও এ ব্যাপারে রাজি। তার কথা হল তোমার চেয়ে ভাল আর কেউ হবে না।

আ-হা-হায় হায়-

হ্যারি অভিভূত হয়ে গেল। হতবাক এবং আনন্দিত। বিল দৌড়ে গেল ওয়াইন আনতে এবং ফ্লয়ার চেষ্টা করল লুপিনকে ড্রিংকস করতে রাজি করাতে।

 আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না, আমাকে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে, লুপিন বলল। সে সবার সঙ্গে কোলাকুলি করল। হ্যারি দেখল তাকে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে সতেজ দেখাচ্ছে। থ্যাঙ্ক ইয়ু, থ্যাঙ্ক ইয়ু বিল।

বিল সবার মগ এরমধ্যে ভরে ফেলল। ওরা সবাই উঠে দাঁড়ালো এবং মগ উঁচু করে টেস্ট করল।

টু টেডি রামুস লুপিন, লুপিন বলল। এ গ্রেট উইজার্ড ইন দ্য মেকিং!

ও দেখতে কেমন হয়েছে? ফ্লয়ার জানতে চাইল।

আমার ধারণা সে দেখতে, ডোরার মত হয়েছে, লুপিন বলল। কিন্তু ডোরার ধারণা সে আমার মত হয়েছে। মাথায় খুব বেশি চুল নেই। জন্মের পর মনে হয়েছিল চুলগুলো কালো। কিন্তু বিশ্বাস কর সেই থেকে চুলগুলো ঘণ্টায় ঘণ্টায় পাল্টে গিয়ে ধুসর হয়ে উঠছে। হয়তো আমি ফিরে দেখব তার চুলগুলো ব্লন্ড হয়ে গেছে। আনড্রোমেডা বলেন টঙ্কসের জন্মের দিন চুলের রঙ পরিবর্তন হতে শুরু করেছিল। সে তার মগটি শেষ করল। ওহ ঠিকাছে, আরেকবার মাত্র নেব। বিল তার মগটি ভরে দিল।

বাতাস ছোট কটেজটির উপর আছড়ে পড়ছে। ফায়ার প্লেসের আগুন লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে, পটপট শব্দ হচ্ছে। বিল আরেক বোতল ওয়াইন খুলেছে। বিলের সুসংবাদ ওদেরকে নিয়ন্ত্রণহীন করে ফেলেছে। নতুন উল্লসিত জীবনের ভেতর ঢুকে পড়েছে। এমন উৎসবমুখর পরিবেশ শুধুমাত্র গবলিনকে স্পর্শ করেছে বলে মনে হল না। কিছুক্ষণ পর সে দখল করে রাখা বেডরুমটিতে চলে গেল। হ্যারি মনে করেছিল সে একাই বিষয়টি লক্ষ করেছে। কিন্তু না, গবলিন সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাওয়ার সময় হ্যারি দেখল বিলও তাকে লক্ষ করছে।

না, না…আমার অবশ্যই ফিরে যেতে হবে, আরেক মগ ওয়াইনের প্রস্তাব বাতিল করে লুপিন বলল। সে উঠে দাঁড়ালো এবং তার আলখাল্লাটি গায়ের উপর টেনে নিল। গুডবাই, গুডবাই, আমি চেষ্টা করবো কয়েকদিনের ভেতর ছবি নিয়ে ফিরে আসতে। ওরা সবাই খুব খুশি হবে জেনে যে, আমার সঙ্গে তোমাদের দেখা হয়েছে

সে আলখাল্লা পরে সবার সঙ্গে কুলাকুলি করে অন্ধকার রাতের ভেতর ফিরে গেল।

গডফাদার হ্যারি! বিল বলল। ওরা একসঙ্গে হেঁটে কিচেনের ভেতর দিয়ে গেল টেবিলটা পরিস্কার করতে। একটা সত্যিকারের সম্মান! অভিনন্দন!

হ্যারি হাতের খালি মগগুলো নামিয়ে রাখল। বিল তার পেছনে দরোজাটি টেনে বন্ধ করে দিল। অন্যদের এখনো আনন্দ করার শব্দটা থেমে গেল।

আমি কিছু ব্যাক্তিগত কথা বলতে চাই হ্যারি। কটেজে এতজনের মধ্যে সুযোগ পাওয়া যায় না।

বিল একটু দ্বিধা করল।

হ্যারি, তুমি গবলিনকে সঙ্গে নিয়ে কিছু একটা পরিকল্পনা করছ।

 প্রশ্ন নয়, এটি বিলের মন্তব্য। হ্যারি অস্বীকার করার চেষ্টা করল না। সে বিলের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল।

আমি গবলিনকে চিনি, বিল বলল। হোগার্টস ছেড়ে আসার পর আমি গ্রিনগোটে কাজ করেছি। গবলিন এবং উইজার্ডদের মধ্যে যতটা বন্ধুত্ব হওয়া সম্ভব, আমি ততটাই গবলিনের বন্ধু। আমার বেশ কিছু গবলিন বন্ধু আছে, অথবা–বলতে পারো আমি গবলিনদের চিনি এবং পছন্দ করি। তারপর থেমে একটু দ্বিধা করে বিল আবার বলল, হ্যারি, তুমি গ্রিপহুকের কাছে কী আশা করছ? এবং বিনীময়ে তুমি তাকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছ?

আমি তোমাকে সেটা বলতে পারছি না, হ্যারি বলল। আমি দুঃখিত বিল। ওদের পেছনে দরোজাটি খুলে গেল। ফ্লয়ার আরো মগ নিয়ে ঢুকেছে। একটু, বিল বলল। একটু পরে আসো। ফ্লয়ার বের হয়ে গেল। এবং দরোজাটি পেছন থেকে বন্ধ করে দিল।

বিল বলল, তাহলে শুধু আমি একটা কথাই বলব, যদি তুমি ওর সঙ্গে কোনো দর কষাকষি করে থাকো, আর তা যদি হয় সম্পদ বিষয়ক তাহলে তোমাকে অসম্ভব রকমের সতর্ক থাকতে হবে। পেমেন্ট, রিপেমেন্ট বা মালিকানা নিয়ে গবলিনদের আচরণ মানুষের মত না।

হ্যারির ভেতরে একটি অস্বস্তি কাজ করতে থাকল। যেন তার ভেতর দিয়ে একটি সাপ চলাফেরা করছে।

তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ?

আমরা ভিন্ন এক জাতের আলোচনা করছি। বিল বলল। গবলিন এবং মানুষের মধ্যে লেনদেন শত শত বছর ধরে তিক্ত। তুমি সেটা জানতে পারবে ম্যাজিকের ইতিহাস থেকে। দু পক্ষেরই কিছু ত্রুটি আছে, আমি একথা কখনোই বলব না যে উইজার্ডরা নির্দোষ। কিন্তু গবলিনদের মাঝে বিশ্বাস আছে যে সোনা বা সম্পদের ব্যাপারে উইজার্ডদের কখনো বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ তারা কখনোই গবলিনদের মালিকানা মেনে নেয় না। এ বিশ্বাস গ্রিনগোটের গবলিনদের মধ্যে আরও তীব্র।

আমি বিশ্বাস করি- হ্যারি বলতে শুরু করল। কিন্তু বিল মাথা নাড়ল।

তুমি বুঝতে পারছ না হ্যারি, গবলিনদের সঙ্গে বাস না করলে কেউ বুঝতে পারবে না। গবলিনদের মতে যে কোনো জিনিসের অধিকার এবং মালিকানা হল যে প্রস্তুত করে তার, যে ক্রয় করে তার নয়। সব গবলিন বিশ্বাস করে যে, যে সব জিনিস গবলিনদের প্রস্তুত করা তার মালিক গবলিনরাই।

কিন্তু যদি সেটা ক্রয় করা তাহলে তারা ধরে নেবে যে এটা তাদের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয়েছে যে টাকা দিয়েছে সেটা তার না। গবলিনদের তৈরি যেসব জিনিস উইজার্ডের থেকে উইজার্ডের কাছে যাচ্ছে সেগুলো নিয়ে ওদের বিরাট সমস্যা আছে। তুমি কী গ্রিপহুকের মুখটি দেখেছ যখন টায়রাটা তার চোখের সামনে দিয়ে দেয়া হচ্ছিল তখন? সে মোটেই সন্তুষ্ট ছিল না। আমি বিশ্বাস করি যে সে চিন্তা করেছে, যে জিনিসটি কিনেছে সে মারা যাবার পর এটি গবলিনদের ফিরে পাওয়াটাই উচিত হবে। ওরা মনে করে গবলিনদের বানানো জিনিস ব্যবহার করাই আমাদের অভ্যাস। মনে করে, গবলিনদের কোনো টাকা পয়সা না দিয়ে যে কোনো জিনিস উইজার্ড থেকে উইজার্ডের কাছে হস্তান্তর করা তাদের কাছ থেকে চুরি করারই নামান্তর।

হ্যারির ভেতর এখন একটি অশুভ অনুভূতি হচ্ছে। সে ভাবল বিল তার ভাড়া করার চেয়ে বেশি কিছু ভাবছে কি না।

মদ্দা কথা আমি যা বলতে চাচ্ছি, বিল বলল। সে হাতটি দরোজার উপরে রাখল খুলে সিটিংরুমে যাবার জন্য। তুমি যে প্রতিশ্রুতিই দাও না কেন সে ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকবে হ্যারি। কোনো গবলিনের সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গ করা গ্রিনগোটে ভেঙ্গে প্রবেশ করার চেয়েও বিপদজনক।

বিল দরোজাটি টেনে খুলল। হ্যারি বলল, ঠিক, ধন্যবাদ বিল, আমি তোমার কথা স্মরণ রাখবো। বিলের পেছন পেছন অন্যদের কাছে আসতে আসতে হ্যারির মাথায় একটি কঠিন বুদ্ধি এলো। এ চিন্তাটি ওয়াইন পান করার জন্য এসেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কোনো চিন্তা করা ছাড়াই সে এখন টেডি টক্কসের গডফাদারে পরিণত হতে যাচ্ছে, ঠিক সিরিয়স যেমন তার গডফাদার ছিল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *