৩৮. দ্য সেকেন্ড ওয়ার বিগিন্স

৩৮. দ্য সেকেন্ড ওয়ার বিগিন্স

হি-হু মাস্ট নট বী নেমড ফিরে এসেছেন

ম্যাজিক মন্ত্রী কর্ণেলিয়স ফাজ গত শুক্রবার রাতে ছোট একটি বিবৃতি দিয়ে স্বীকার করেছেন হি-হুঁ মাস্ট নট বী নেমড (যার নাম আমরা কখনোই মুখে আনি না) আবার আমাদের দেশে ফিরে এসেছেন, শুধু তাই নয় বরং আগের মতোই তৎপরতা চালাচ্ছেন।
অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে আমি অবশ্যই স্বীকার করছি যে, জাদুকর নিজের নামকরণ নিজে করেছেন লর্ড। হ্যাঁ, আপনারা জানেন কাকে আমি ইঙ্গিত করছি–তিনি বেঁচে আছেন শুধু নয় আবার আমাদের মধ্যে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ফাজ খুবই ক্লান্তিতে দমকে দমকে বললেন–সাংবাদিক সম্মেলনে রিপোর্টারদের। একই সঙ্গে আরও দুঃখের সঙ্গে আপনাদের জানাচ্ছি, আজকাবান কারাগারে ডিমেন্টরসরা একযোগে বিদ্রোহ করেছে। ওরা আর মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক নয়। আমাদের বিশ্বাস ডিমেন্টসরা এখন লর্ডের কাছ থেকে আদেশ নিতে শুরু করেছে। লর্ড যার নাম আমরা ভুলে গেছি, নাম মুখেও আনতে চাই না।
আমরা আমাদের জাদুকর-জাদুকরীদের তৎপর ও সজাগ থাকার অনুরোধ করছি। মন্ত্রণালয় শিঘ্রই আপনাদের ঘর বাড়ি রক্ষা ও আক্রমণের প্রাথমিক প্রতিরোধ সম্বন্ধে একটি গাইড পুস্তিকা প্রকাশিত করবে। পুস্তিকাটি বিনামূল্যে সব জাদুকর পরিবারে দেয়া হবে আগামী মাসে।
মন্ত্রীর বিবৃতিতে জাদুকররা খুবই আতঙ্কিত হয়েছে ও বিপদ সংকেত মনে করছে। কারণ গত বুধবারে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল ও দৃঢ়তার সাথে আশ্বাস দিয়েছিল, চলে আসা ওই গুজবের কোন সততা নেই যে ইউ–নো-হু আবার আমাদের মধ্যে রয়েছে।
যে ঘটনার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে তা খুবই অস্পষ্ট। যদিও বিশ্বাস করা যায় হি-হুঁ যার নাম মুখে আনা যায় না তিনি এবং তার কয়েকজন মার্কামারা অনুচরেরা (যারা ডেথ ইটারস নামে পরিচিত), বৃহস্পতিবার সন্ধ্যেবেলায় ম্যাজিক মন্ত্রণালয়ে ঢুকতে পেরেছিলেন।
এলবাস ডাম্বলডোর, হোগওয়ার্টসের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হেডমাস্টার এবং ইন্টারন্যাশনাল কনফেডারেশন অভ উইজার্ডসর পুনঃ প্রতিষ্ঠিত সদস্য এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ওয়ারলক অফ দ্য উইজেন গেমটের প্রধান, তাকে এখনও এই ব্যাপারে কিছু বলার জন্য পাওয়া যায়নি। তিনি গত এক বছর ধরে অবশ্য বলে আসছেন ইউ–নো–হুঁ মৃত নয় বেঁচে রয়েছেন এবং অনেকই বিশ্বাস করেন যে তিনি নতুনভাবে ক্ষমতা অধিগ্রহণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। ইতিমধ্যে দ্য বয়-হুঁ লিভড়

বলেছিলাম না হ্যারি? আমি জানি যেমন করেই হোক ওরা তোমাকে টেনে আনবে। হারমিওন ওর সামনের খবরের কাগজটা দেখতে দেখতে বললো।

ওরা হাসপাতালে বসেছিল। হ্যারি রনের বেডের শেষ প্রান্তে বসে রনের সঙ্গে হারমিওনের খবর পড়া শুনছিল। হারমিওনের হাতে রোববারের প্রফেটা জিনির একটা পায়ের গোড়ালি দড়ি দিয়ে বেঁধে মাদাম পমফ্রে সামান্য উঁচু করে দিয়েছেন। পাটা হারমিওনের বিছানার দিকে। নেভিলের ভাঙ্গা নাকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে। ও দুটি খাটের মাঝে একটা চেয়ারে বসে রয়েছে। লুনা যথারীতি নিজস্ব ভঙ্গিতে দ্য কুইবলার উল্টো করে পড়ে চলেছে। ওর মুখ দেখে মনে হয় হারমিওনের একটি কথাও ওর কানে যায়নি।

–ও হ্যাঁ যে ছেলেটি বেঁচে রয়েছে ওইতো বসে রয়েছে, তাই না? রন মুখ গোমড়া করে বললো–ভ্রান্ত পথে চলা আর নয়, কি বল?

ও ওর বেডের পাশে রাখা ক্যাবিনেট থেকে একগাদা ফ্রগ চকোলেট বার করে কয়েকটা হ্যারি, জিনি আর নেভিলের দিকে ছুঁড়ে দিল। জিনি আর নেভিল চকোলেট দাঁত দিয়ে কাটতে লাগল। হ্যারির যে হাতটায় ক্ষতের জন্য সেলাই করা হয়েছে সেই জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে রয়েছে। ফোলার ওপর মাদাম পমফ্রে পাতলা একটা জঙর ছাল লাগিয়ে রেখেছেন। পমফ্রে বলেছেন বেশি চিন্তা করলে ক্ষত সারতে সময় লাগবে। ডা. উব্বিলিসের বিস্মরণ শীল মলম মাখিয়ে দিয়েছেন ব্যথা কমার জন্য। ওর মনে হচ্ছে ব্যথার সামান্য উপশম হয়েছে।

-হ্যাঁ, ওরা তোমার খুব কুখ্যাতি করেছে হ্যারি, হারমিওন হাতের কাগজে চোখ রেখে বললো–একাকীত্বে মেশান একটি সত্যের শব্দ… ভারসাম্যহীনভাবে উপলব্ধি করা যায়, তার গল্পে অটল বিশ্বাস নেই… জোর করে উপহাস আর অপবাদ শোনানো হচ্ছে…। হু, হারমিওন বলে গেল ভুরু কুঁচকে আমার মনে হয় ওরা আসল ঘটনা বলছে না, ওরাই প্রফেট সম্বন্ধে উপহাস করছে, অসত্য বলছে।

কথাটা বলে ও সংকুচিত হয়ে বুকের ওপর একটা হাত রাখল। ডলোহভ ওর ওপর যে চার্ম প্রয়োগ করেছিল, খুবই কম ক্ষমতাশীল ছিল। যদি ও জাদুমন্ত্রটা জোরে জোরে বলত, তাহলে মাদাম পমফ্রের কথা বলা যায়, অনেক ক্ষতি করতে পারত। হারমিওনকে অসুখ সারাবার জন্য দশ রকমের পোশান গিলতে হয়েছে প্রত্যেক দিন। মোটামুটি এখন ও সেরে উঠছে, হাসপাতালে থাকতে ওর আর ভাল লাগছে না।

ইউ-নো-হুর করায়ত্ব করার শেষ চেষ্টা, পাতা দুই থেকে চার, কোন ভাম্বলডোরে কথা কেউ কানে দিচ্ছে না, পাতা ছয় থেকে আট, হ্যারি পটারের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকার, পাতা নয়… ঠিক আছে, খবরের কাগজটা গুটিয়ে একপাশে ছুঁড়ে দিয়ে হারমিওন বললো–অনেক কিছু লেখার সুযোগ পেয়ে গেছে। তাছাড়া হ্যারির সঙ্গে সাক্ষাৎকার মোটেই একান্ত নয়। ওটাতো একমাস আগে দ্য কুইলারে ছেপেছিল।

বাবা ওই কপিটা তো ওদের বিক্রি করেছিলেন। লুনা ভাসা ভাসাভাবে বললো–কুইবলারের কপিটা তেমনভাবে ধরে। ওরা বেশ ভাল দাম দিয়েছিল। আমরা গরমকালে এবার সুইডেনে বেড়াতে যাব, এক্সপিডিসন টু সুইডেন–যদি আমরা ক্রমপল-হর্নড় সুরক্যাক ধরতে পারি।

হারমিওন কথা বলবে না এমন মুখ করে বসেছিল। লুনার কথা শেষ হলেই বললো–সত্যি খুব ভাল তো…।

জিনি, হ্যারির মুখের দিকে তাকিয়েই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে হাসতে লাগল।

–থাক সেসব কথা, হারমিন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো। আবার ব্যথার জন্য শরীরটা কোঁচকালো। তারপর স্কুলের ব্যাপার স্যাপার কিছু শুনলে?

–ও হ্যাঁ, ফ্লিট উইক জর্জ আর ফ্রেডের জালে ডোবার হাত থেকে বেঁচেছে। জিনি বললো–ও তিন সেকেন্ডের জন্য হাবুডুবু খেয়েছিল। জানালার তলায় জলের সামান্য দাগ পড়েছিল, চটপট জায়গাটা দড়ি দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল।

–কেন হারমিন হকচকিয়ে বললো। –বললো, দারুণ ম্যাজিক, জিনি স্লগ করে বললো।

–মনে হয় ফ্রেড আর জর্জকে মনে রাখার জন্যে, রন বললো–একগাদা চকোলেট চিবুতে চিবুতে। ওরা আমাকে এইগুলো পাঠিয়েছে। রন হ্যারিকে একগাদা ছোট ছোট চকোলেট দেখিয়ে বললো–মনে হয় ওদের জোক শপ ভালই চলছে।

হারমিওন মুখে বিরক্তির ছাপ। ডাম্বলডোর আবার স্কুলে জয়েন করেছেন খবর পেয়েছো তো?

–হ্যাঁ, নেভিল বললো। এবার সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে মনে হয়।

–মনে হয় ফিলচ খুব খুশি হবে, হয়েছে? রন জিজ্ঞেস করলো। ফ্রগ কার্ডগুলো জলের জগে ডুবিয়ে দিল। কার্ডে ডাম্বলডোরের ছবি।

–একটুও না, জিনি বললো। বেচারি খুবই বিব্রত, জিনি গলার স্বর নামালো। ফিস ফিস করে বললো–ও এখন বলে বেড়াচ্ছে হোগওয়ার্টসে ডাম্বলডোর ব্যর্থ হয়েছেন। সে আরো বলে বেড়াচ্ছে হোগওয়ার্ট তার প্রাপ্তির মধ্যে প্রফেসর আমব্রিজকে পাওয়া হলে শ্রেষ্ঠতম।

ওরা হাসপাতলের এক কোণে শুয়ে থাকা ম্যাদাম আমব্রিজের দিকে তাকাল। তাকিয়ে রয়েছেন ছাদের দিকে উদাস নয়নে। অনেকেই জানে না ডাম্বলডোর কেমন করে তাকে গভীর জঙ্গলে সেন্টারদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। জম্ভগুলো হয়ত ওকে মেরে ফেলত। গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে গায়ে তার একটা আঁচড় কাটতে না দিয়ে, ডাম্বলডোর ওকে ধরে ধরে জঙ্গলের বাইরে নিয়ে এসেছিলেন। আমব্রিজ অকৃতজ্ঞ তাই হয়ত কাউকে সেই ঘটনা বলবে না। কেউ জানবে না আসলে তার কি হয়েছিল। ওরা দেখল মিস আমব্রিজের মাথার চুলগুলো ডেলা পাকিয়ে গেছে। চুলের ভেতরে তখন লতা পাতার টুকরো রয়েছে। তাহলেও গায়ে তার একটা আঁচড়ের দাগ নেই।

হারমিওন ফিস ফিস করে বললো–মাদাম পমফ্রে বলছিলেন উনি দারুণ মানষিক আঘাত পেয়েছেন।

–গোমড়া মুখ দেখে তাই মনে হয়, জিনি বললো।

–বেঁচে আছেন কি মরে গেছেন দেখবে? রন জিব দিয়ে একটা আওয়াজ করতেই আমব্রিজ এধার ওধার তাকালেন। দৃষ্টিতে তখনও তার ঘোর।

–কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো প্রফেসর? মাদাম পমফ্রে তার অফিস ঘরের দরজা খুলে হলে ঢুকে আমব্রিজের দিকে তাকিয়ে বললেন।

–না না না একটুও না। আমব্রিজ বালিশে মাথা গুঁজে বললেন–মনে হয় আমি একটা স্বপ্ন দেখছিলাম।

হারমিওন আর জিনি ওদের গায়ের চাঁদরে আপাদমস্তক মুডি দিয়ে হাসি চেপে রইল।

–ও তুমি সেন্টারসদের কথা বলছিলে না? হারমিওন হাসি থামিয়ে বললো এখন তাহলে কে ডিভিনেসন পড়াচ্ছেন? ফিরেও আছেন?

–না থেকে উপায় নেই, ওকে তো আর সেন্টাররা ফিরে আসতে দেবে না, হ্যারি বললো। দেবে বলে মনে হয়?

–মনে হয় উনি আর ট্রলনী দুজনেই ক্লাস নেবেন, জিনি বললো। –কিন্তু ডাম্বলডোর বলছিলেন শুনেছি ট্রিলনীকে ছুটি দিয়ে দেবেন, রন বললো। মানে রিটায়ার করিয়ে দেবেন।

–বললেই হল? হারমিওন পাল্টা বললো। আমরা জানি ওনার ভবিষ্যদ্বাণী কারেক্ট।

কথাটা শুনে হ্যারির বুকের ভেতর কে যেন হাতুড়ি পিটাতে লাগলো। ও কাউকে বলেনি প্রফিসির ভেতরে কি আছে। নেভিল বলেছে ডেথ রুমে হ্যারি ওকে টেনে ওঠানোর সময় ওটা ভেঙে গেছে। হ্যারি ওর ভুল বক্তব্য শুধরে দেয়নি। যাদের নেভিল কথাটা বলছে তাদের মুখভঙ্গিও সে দেখেনি।

–সত্যি ভেঙে গেলো, দুঃখের কথা, হারমিওন শান্তভাবে মাথা দোলাতে দোলাতে বললো।

–ঠিক বলেছ, রন বললো। ইউ-নো-হু জানতে পারলো না ওর ভেতরে কি। ছিল। হ্যারিকে বেড থেকে উঠে দাঁড়াতে দেখে বললো–চললে কোথায়?

–হাগ্রিডের কাছে, হ্যারি বললো। ওর কাছে গিয়ে সকলের খবর দিতে হবে। শুনেছি ফিরে এসেছেন।

–বলবে, আমরা সবাই ভাল আছি। রন ডরমেটরির খোলা জানালা দিয়ে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললো–আমরা যদি তোমার সঙ্গে হ্যাগ্রিডের কাছে যেতে পারতাম…।

হ্যারিকে দরজার গোড়া পর্যন্ত যেতে দেখে হারমিওন বললো–হ্যারি হ্যাগ্রিডকে বলো আমরা ভাল আছি। হয়তো আমাদের অবস্থার কথা উনি শোনেনি।

হ্যারি হাত তুললো। একরকম জানিয়ে গেল ও ওদের সব কথা শুনেছে আর ঠিক যা হয়েছিল তাই বলবে হ্যাগ্রিডকে।

সেদিন ছিল রোববার। ক্যাসেলে কেউ নেই এমনই নিস্তব্ধ। স্কুলের ছেলে মেয়েদের টার্ম শেষ হতে চলেছে। বাকি রয়েছে কিছু হোমওয়ার্ক, লেশন। ও সবাই লনে ছুটোছুটি করছে, রোদ পোয়াচ্ছে। সকলেই খুশি আর কদিন পরেই বাড়ি ফিরবে। হ্যারি জনশূন্য করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। অদূরে কিডিচ খেলার মাঠ, সেখানে ছেলে–মেয়েরা গেছে। দুএকটি ছেলেমেয়ে লেকে সাঁতার কাটছে, ওদের আশেপাশে রয়েছে স্কুইডস (সামুদ্রিক মাছ)।

ও ঠিক করে উঠতে পারছে না একলা থাকবে না ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিলে মিশে হৈ হৈ করবে। যখনই কেউ ওকে দেখতে পেলে ওর কাছে আসে তখনই ও চলে যায়। আবার একলা থাকলে মনে হয়, বন্ধুরা আসুক, ওর সঙ্গে গল্প করুক। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলো, হ্যাগ্রিডের কটেজে যাবে। বলতে গেলে সেই ঘটনার পর ও হ্যাগ্রিডের সঙ্গে ভাল করে কোনও কথা বলেনি।

হ্যারি মাৰ্বল পাথরের সিঁড়ির শেষধাপে পা দিতেই দেখল ডানধারের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে ম্যালফয়, ক্র্যাবে আর গোয়েলে। হ্যারি জানে তিন মূর্তি স্নিদারিন কমনরুমে যাচ্ছে। হ্যারি আর এক পা না বাড়িয়ে দাঁড়ালো। ওরা ওকে দেখতে পেয়েছে, হ্যারিকে দাঁড়াতে দেখে ওরাও দাঁড়ালো। ওরা সকলেই চুপ করে দাঁড়িয়ে। ওরা যেখানে দাঁড়াল সেখানে কোন শব্দ নেই, নিস্তব্ধ। শুধু বাইরে থেকে স্কুলের ছেলেমেয়েদের কলরব ভেসে আসছে।

ম্যালয়ের মুখে শয়তানি হাসি। ও এধার ওধার তাকালে। মনে হয় দেখলো কোন টিচার সেই দিকে আসছেন কি না। তারপর ও পিছন ফিরে হ্যারির দিকে তাকালো। খুব চাপা গলায় বললো–পটার, তুমি বেঁচে আছ, মরে যাওনি।

হ্যারি ওর ভুরু দুটো তুলে ম্যালয়ের দিকে তাকালো।

–হ্যারি বললো–তুমি ভাবছ আমি হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি কেমন করে।

কথাটা শূনে ম্যালয়ের মুখটা রাগে যেন ফেটে পড়তে চাইলো। হ্যারি আগে কখনও ম্যালফয়কে এত বেশি রাগতে দেখেনি।

–তোমাকে মূল্য দিতে হবে, ম্যালফয় দাঁত কিড়মিড় করে মাঝারি গলায় বললো–আমার বাবাকে তুমি যা করেছে তার জন্য তোমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে, এখনই আমার হাতে।

–ওরে বাপরে, তোমাদের ভয়ে আমি থর থর করে কাঁপছি। আমার মনে হয়, লর্ড ভোল্ডেমর্ট তোমাদেরই মত রাগে কাঁপছেন। যা বল কি বলবে? ম্যালফয় ক্র্যাবে আর গোয়েলে লর্ড ভোল্ডেমর্টের নাম শুনে দারুণ ভয় পেয়ে গেলো। লর্ডের নাম শুনে ভয়ে মুখ নীল হয়ে গেল কেন? লর্ড তত তোমার বাবার বিশেষ বন্ধু, তাই না? তোমার কিসের ভয়?

–পটার, তুমি নিজেকে তারই মত বিরাট মানুষ মনে করছ। হ্যারির দিকে ম্যালফয় এগিয়ে আসতে আসতে বললো।

ক্র্যাবে আর গোয়েলেও হ্যারির দিকে এগিয়ে এলো। তুমি কি মনে করেছ আমি তোমাকে হাতে পেয়েও ছেড়ে দেবো? তুমি আমার বাবাকে আজকাবানের জেলে পাঠাবে?

–আমি ভাবছিলাম তাইতো উচিত কাজ হবে; হ্যারি বললো।

–শোনো, ডিমেন্টরসরা আজকাবানের জেলে নেই। ম্যালফয় খুব ধীরে ধীরে বললো–ড্যাড আর বাকি সবাই শিগগিরি সেখানে থেকে চলে আসবেন।

–হ্যাঁ, হ্যাঁ আসবেন তো, হ্যারি বললো–এখনতো সবাই জেনে গেছে তিনি গেজলে ওঠা ফেনা ছাড়া আর কিছু নয়।

ম্যালফয় ওর একটা হাত আলখেল্লার পকেটে ঢোকানোর আগেই হ্যারি ওর জাদুদণ্ডটা পকেট থেকে টেনে বার করলো।

–পটার! এনট্রেন্স হলে কে যেন জোরে খুব জোরে বললো।

হ্যারি দেখলো, স্নেইপ অফিস ঘরে যাবার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। হ্যারির সর্বশরীর রাগে ঘৃণায় জ্বলে উঠলো। স্নেইপ সম্বন্ধে ডাম্বলডোর ওকে যা যা বলেছেন, ওর কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। জীবনে সে কথাগুলো ও ভুলবে না। স্নেইপকে ক্ষমা করবে না। না না কখনোই না।

–কী ব্যাপার পটার? এখানে তোমরা কি করছ? কথাটা বলে ওদের চারজনের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

–আমি ভাবছি ম্যালফয়ের ওপর কোন কার্সটা প্রয়োগ করবো, হ্যারি তীব্র স্বরে বললো।

স্নেইপ হ্যারির মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

–দণ্ডটা এখনই পকেটে রেখে দাও। স্নেইপ কাটাকাটা স্বরে বললেন গ্রিফিন্ডারের দশ পয়েন্ট কাটা গেল।

কথাটা বলে স্নেইপ বিরাট আকারের আওয়ার গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বিশ্রিভাবে হাসলেন–আহাই, তাহলে তো গ্রিফিরদের আর কোনও পয়েন্ট হাতে রইলো না ঘড়িটা নেবার। তাহলে তো আমাদের তোমাকে কিছু…।

–আরও কিছু যোগ করুন।

হ্যারি দেখলো প্রফেসর ম্যাকগোনাগল ক্যাসেলে যাবার জন্য সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। তার একহাতে টাইট কার্পেটের তৈরি ব্যাগ, অন্য হাতে ওয়াকিং স্টিক। ব্যাগের ভারে একটু ঝুঁকে পড়েছেন। তাহলেও মুখ দেখে মনে হয় সুস্থ।

~ প্রফেসর ম্যাকগোনাগল! স্নেইপ তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন তাহলে সেন্ট মাংগো হাসপাতাল থেকে আপনাকে রিলিজ করে দিয়েছে, তাইতো দেখছি।

–হ্যাঁ প্রফেসর স্নেইপ, ম্যাকগোনাগল তার ট্রাভলিং ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন আমি একেবারে নবজীবন লাভ করেছি, তোমরা দুজন? ক্র্যাবে গোয়েলে।

ম্যাকগোনাগল ওদের মুখের দিকে উদ্ধত ভঙ্গিতে তাকালেন। ওরা ম্যাকগোনাগলের দিকে এগিয়ে এল। ওদের মুখ ঝুলে পড়েছে।

–এদিকে আমার কাছে এস। আমার ব্যাগ আর আলখেল্লাটা আমার অফিসে নিয়ে যাও। প্রফেসর ম্যাকগোনাগল কঠিন সুরে বললেন–ম্যালয়ের দুই সাগরেদকে।

–ঠিক আছে, ম্যাকগোনাগল বালির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন–আমার মনে হয়, হ্যারি আর ওর দুই বন্ধুদের পঞ্চাশ পয়েন্ট করে পাওয়া উচিত। ইউ নো–হু ফিরে এসেছে সেই খবর পৃথিবীর সকলকে জানিয়ে দেবার পুরস্কার হিসেবে। আপনি কি বলেন, প্রফেসর স্নেইপ?

–কী বলছেন? স্নেইপ এক সেকেন্ড দেরি না করে বললেন। হ্যারি জানে স্নেইপ ম্যাকগোনাগলের কথা খুব ভাল করেই শুনতে পেয়েছেন। মানে ঠিক বুঝলাম না।

–পটার পঞ্চাশ, দু উইসলির পঞ্চাশ করে, আর লংবটম আর মিস গ্রেঞ্জারও পঞ্চাশ। প্রফেসর ম্যাকগোনাগল বললেন। ঠিক সেই সময় গ্রিফিরদের আওয়ার গ্লাসের বালি ঝর ঝর করে নিচের গ্লাসে পড়ল। ও হ্যাঁ, মিস লাভগুডও পাবে পঞ্চাশ–ম্যাকগোনাগল বললেন। আপনি পটারের কাছ থেকে দশ পয়েন্ট কেটেছিলেন, তাই না প্রফেসর স্নেইপ? তো এখন হিসেব ঠিক। পটার? ম্যালফয় এত সুন্দর একটা রৌদ্রউজ্জ্বল দিনে করিডোরে কি করছ? যাও বাইরে গিয়ে সকলের সঙ্গে মিলে মিশে হৈ হৈ করো, হাসো খেলো, ম্যাকগোনাগল বললেন।

হ্যারিকে দুবার কোনও কথা বলতে হয় না। ম্যাকগোনাগলের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে জাদুদণ্ডটা পকেটে রেখে সদর দরজা দিয়ে বাইরে চলে গেল।

হ্যাগ্রিডের কেবিনের দিকে হ্যারি চললো। সূর্য তখন ওর মাথার ওপর গনগন করছে। দেখল ছেলে–মেয়েরা রোববারের প্রফেটে পড়ছে, রোদ্দুর পোয়াচ্ছে। কেউ কেউ মিষ্টি খাচ্ছে। ওর দিকে ওরা তাকালো। ওদের মধ্যে দুএকজন ওকে ডাকলো। দুএকজন সানডে প্রফেটে ওর সমন্ধে লেখা ছেপেছে সেটা দেখালো। ওদের কাছে হ্যারি হিরো বনে গেছে। হ্যারি ওদের দিকে তাকালো না। ওরা তো জানে না তিনদিন আগে কি কাণ্ড ঘটেছিল। হ্যারি কারও দিকে না তাকিয়ে হন হন করে হ্যাগ্রিডের কেবিনের দিকে চললো।

ও হ্যারির ক্যাবিনের বন্ধ সদর দরজার দিকে তাকয়ে ভাবলো খুব সম্ভব হ্যাগ্রিড কেবিনে নেই। তারপরই দেখলো ফ্যাংগ ওর দিকে লাফাতে লাফাতে আসছে। আনন্দে আত্মহারাও। তারপর দেখলো হ্যাগ্রিড পিঠে একটা বস্তা ভর্তি বিনস চাপিয়ে ওর দিকে আসছেন। হ্যাগ্রিডের বাগান লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। যাগ্রিড বাগানের ভেতর থেকেই হ্যারিকে দেখে বললেন–সব ভালো তো হ্যারি!

হ্যারি হ্যাগ্রিডের হাসি হাসি মুখের দিকে তাকালো।

–এস ভেতরে এস, চা খেতে খেতে গল্প করা যাবে, হ্যাগ্রিড বললেন।

হ্যারি হ্যাগ্রিডের সঙ্গে কেবিনের ভেতরে গেল। হ্যাগ্রিড তার প্রকাণ্ড কাঠের টেবিলের সামনে বসতে বসতে বললেন–চা? না জুস খাবে। হ্যাঁ সব খবর টবর বল। তোমার এখন শরীর ভাল আছে তো?

–খুব ভাল আছি। আপনি এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিলেন?

হ্যাগ্রিড ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো–সিরিয়সের মতো লুকিয়েছিলাম। বড় একটা পাহাড়ের গুহাতে ছিলাম।

হ্যাগ্রিঙ কান্না চেপে গেলাস ভর্তি জুস খানিকটা চুমুক দিয়ে খেয়ে বললেন যাণ ফিরে এসেছি।

–আপনাকে দেখে তো ভালই মনে হচ্ছে। হ্যারি বললো ও সিরিয়স প্রসঙ্গ আনতে চায় না। সিরিয়সের কেউ নাম করলে ও অন্য প্রসঙ্গে আসে।

–সত্যি? কথাটা বলে হ্যাগ্রিড ওর মোটা মোটা দুহাতের চেটো দিয়ে মুখ ঢেকে বললেন–আমার ভাই এপি ও এখন ভাল আছে, খুশ মেজাজে আছে। ওর এখন একটা বান্ধবী দরকার।

হ্যারি হ্যাগ্রিডের মাথা থেকে গ্রুপির বান্ধবীর প্রসঙ্গ বাদ দিতে চায়। আর একটা জায়েন্ট অরন্যে না আসাই ভাল মনে হয়।

হ্যাগ্রিড থেমে থেমে বললেন–সকলেই এখন বুঝতে পারছে তুমি একচুলও মিথ্যে বলোনি হ্যারি। তারপর হ্যারি পটারকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন হ্যাগ্রিড।

–দেখ হ্যারি, হ্যাগ্রিড টেবিলে ঝুঁকে পড়ে বললেন। আমি তোমার চেয়ে অনেক আগে থেকে সিরিয়সকে জানি। সিরিয়স যুদ্ধ করতে করতে মারা গেছে, অন্যায়-এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে। তার মৃত্যুতে শোক করো না হ্যারি। ওইরকম বীরের মত ও মরতে চেয়েছিল।

–না, সিরিয়স মরতে চাননি, হ্যারি রেগে গিয়ে বললো।

–না, আমি তা বলিনি। ওতো ঘরের কোণে লুকিয়ে বসে থাকতে চায়নি। অন্যরা যুদ্ধ করুক আর ও ঘরে থাকুক তা চায়নি সিরিয়স।

হ্যারি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, বললো–এবারে আমাকে যেতে হবে। রন হারমিওন হসপিটাল উইংগ-এ রয়েছে।

–ও হ্যাঁ, যেতে তো হবেই, বেশ তাহলে যাও, খুব সাবধানে যাবে।

হ্যারি একরকম দৌড়াতে দৌড়াতে দরজা খুলেই হাসপাতালের দিকে খুব তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগলো। আগের মতোই হ্যারি কারও দিকে, কারও কথা না শুনে হাঁটতে লাগলো। মাঝে মাঝে চোখ দুটো বন্ধ করে হাঁটতে লাগলো। ভাবতে লাগলো সবকিছু ওর সামনে থেকে বিলীন হয়ে যাক। ও একা, ওর কেউ নেই।

কিছুদিন আগে, ওর পরীক্ষা শেষ হয়নি। ও ভোল্ডেমর্ট ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছে না, ওর মনের মধ্যে ভোল্ডেমর্ট গেঁথে রয়েছে। ও জানে, ভোল্ডেমর্ট সম্বন্ধে যা বলেছে সব সত্যি। ভোল্ডেমর্ট ফিরে এসেছে, কেউ বিশ্বাস করতে না চাইলেও যা সত্যি তাই বলেছে। ও কিছুটা হাঁটার পর লেকের ধারে ঝোঁপ ঝাড়ু সরিয়ে দুহাঁটুতে মুখ রেখে বসে বসে লেকের জলের ঢেউ দেখতে লাগলো। এমন জায়গায় বসেছে যে ওকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ও একা থাকতে চায়। কেউ এসে ওর সামনে দাঁড়াক তা ও চায় না।

কেন ও একা থাকতে চায়? ডাম্বলডোরের কাছ থেকে সব শোনার পর থেকে ও সকলের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। একটা অদৃশ্য বেড়া দিয়ে ওকে যেন ঘিরে রাখা হয়। ও একা, অন্যদিকে পৃথিবীর সব কিছুই। ও ছিল, এখনও আছে–অ্যা মাকড় ম্যান। ওই কথাটার মানে ও জানে না।

হ্যারি লেকের কিনারায় বসে থাকে কি করবে কোথায় যাবে ভেবে পায় না। ওর সমস্ত দেহ-মন ভরাক্রান্ত; ও ভাবতে পারছে না সিরিয়স আর ফিরে আসবেন না। অনেকদিন পর আকাশ নীল, রোদ উঠেছে সকলেই হাসছে, গল্প করছে। ওদের থেকে ও যেন আলাদা। ও ভাবতে পারছে না, বিশ্বাস করতে পারছে না এই পৃথিবীতে আর কতদিন বেঁচে থাকবে, কবে শেষ হবে খুনির হাতে।

ও অনেকটা সময় নীরব হয়ে বসে রইল, ভুলতে চেষ্টা করতে লাগলো ওর ধর্মপিতা সিরিয়সের কথা। মনে পড়ছে লেকের অপর পারে সিরিযস একবার একশ ডিমেন্টরদের সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই করার পর জ্ঞান হারিয়েছিলেন।

সূর্য কখন অস্ত গেছে ও জানে না। হঠাৎ মনে হল ওর খুব শীত করছে। ও ধীরে ধীরে দাঁড়াল তারপর ক্যাসেলের দিকে হাঁটতে লাগল। আলখেল্লার হাতা দিয়ে চোখের জল মুছে নিল।

***

স্কুল টার্ম শেষ হবার তিনদিন আগে রন আর হারমিওন সম্পূর্ণ সুস্থ হবার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল। হারমিওন মাঝে মাঝে হ্যারির কাছে সিরিয়সের কথা তুলতে চাইলে রন ওকে থামিয়ে দিল। হ্যারি জানে না কবে আবার ও সিরিয়স সম্বন্ধে কথা বলতে পারবে। কখনও সিরিয়সের কথা বলতে ইচ্ছে করে কখনও বা করে না। সব কিছুই ওর মন মেজাজের ওপর নির্ভর করে। অসম্ভব মনোবেদনায় সঙ্গে আর এক ব্যথায় মন ভরে ওঠে। হোগওয়ার্টস থেকে চলে যাবার দিন আসন্ন, আবার ওকে প্রাইভেট ড্রাইভে ফিরে যেতে হবে। এখন ও বুঝতেপেরেছে কেন ওকে গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলো প্রাইভেট ড্রাইভে ডার্সলের সঙ্গে থাকতে হয়। কিন্তু মনটা না চাইলেও সেখানে থাকতে হবে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য।

টার্ম শেষ হবার একদিন আগে প্রফেসর আমব্রিজ হোগওয়ার্টস থেকে চলে গেলেন। প্রফেসর ম্যাকগোনাগল, আমব্রিজকে বিদায় জানাতে পারলেন না, সোফাতে বসে রইলেন। উঠবেন কি করে, হাঁটবেন কেমন করে পিভস ওর ওয়াকিং স্টিক নিয়ে পালিয়েছে।

স্কুলের সেই টার্মের শেষ সন্ধ্যাটি এসে গেল। সবাই তাদের বাবা-মা, বাড়ি যাবার আগে জিনিসপত্র বাক্সে ভরে নিয়েছে। একটু পরেই টার্ম শেষের খাওয়া দাওয়া শুরু হবে। হ্যারি শুধু একলাটি চুপ করে বসে রয়েছে। না আছে গোছগাছ করার তাগিদ না আছে ভাল ভাল খাবার তাড়া।

রন ওকে ক্লিষ্ট মুখে বসে থাকতে দেখে বললো–কাল গুছালেই হবে, এখন খেতে চল, আমার কিন্তু ভীষণ ক্ষিধে পেয়েছে। চল যাই। রন ঘর ছেরে যাবার আগে হ্যারি বললো–তুমি যাও আমি আসছি।

কিন্তু রন চলে যাবার পরও হ্যারি চুপ করে বসে রইল। ওর ফিটে যাবার কণা মাত্র ইচ্ছে নেই তবুও যেতে হবে। ও খুব ভাল করেই জানে ডাম্বলডোর ভাষণ দেবার সময় ওর নাম উল্লেখ করে বলবেন–হ্যারি স্বচক্ষে ভোল্ডেমর্টকে দেখেছে, গত বছর ওর সম্বন্ধে বলেছেও।

আর দেরি করা উচিত হবে না। ও ট্রাঙ্কের তলা থেকে কয়েখটা কুঁচকানো আলখেল্লা বার করল। বার করার সময় চোখে পড়ল ট্রাঙ্কের এক কোণে পড়ে থাকা একটা দোমড়ানো মোচড়ানো কাগজের প্যাকেট-এর উপর। হাতে তুলে নিয়ে বুঝতে পারলো না প্যাকেটের মধ্যে কি আছে। ও চটপট প্যাকেটের মুখটা ছিঁড়তেই দেখতে পেলো ওর একটা ট্রেনারস। ও ট্রেনারস হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো। তারপর মনে পড়ে গেল ট্রেনারসটা সিরিয়স ওকে বার নম্বর গ্রিমণ্ড প্লেসে থাকার সময় উপহার দিয়ে বলেছিলেন, এটা যখন পরবে তখন ঠিক আমার কথা মনে পড়ে যাবে।

হ্যারি বিছানায় বসে ট্রেনারসটার পাট খুলতেই টুক করে ছোট একটা চৌকো আয়না বিছানায় পড়ে গেল। আয়নাটা অতি পুরনো আর তার কাঁচে পুরু করে ধূলো জমে গেছে। নিজের মুখটা দেখার জন্য হ্যারি আয়নাটা ওর মুখের সামনে ধরলো। কাঁচের উপর এতো ধূলো জমেছে যে নিজের মুখটাই স্বচ্ছভাবে দেখতে পেলো না। আয়নাটা আবার প্যাকেটের মধ্যে রাখার সময় দেখলো পেছনে ছোট ছোট অক্ষরে কিছু লেখা রয়েছে। হাতের লেখাটা সিরিয়স কি লিখেছেন পড়তে লাগল। সিরিয়স লিখেছেন

এটা একটা দুমুখী আয়না, এরকম দুটো আছে। তার মধ্যে একটা আমার কাছে আছে, এটা তোমাকে দিলাম। তুমি যদি কখনও আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও তাহলে আয়নাটা তোমার সামনে ধরবে। তখন তোমার প্রতিবিম্ব আমার আয়নাতে ফুটে উঠবে। তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবে। জেমস আর আমি এটা ব্যবহার করতাম, যখন আমরা দুজনে দুজাগায় থাকতাম।

লেখাটা পড়ার পর হ্যারির বুকের ভেতর যেন একটা ইঞ্জিন চলতে লাগলো দূর্দান্ত গতিতে। চারবছর আগে ও ইডরেজড মিররে বাবা-মাকে দেখেছিল। ও সিরিয়সের সঙ্গে কথা বলতে চাইল। এখনই, একটুও দেরি করে নয়। কিছু কথা বলার আগে ও দেখে নিল আশেপাশে কেউ আছে কিনা। ডরমেটরি ফাঁকা। ও আবার আয়নার দিকে তাকালো। খুব মুখের কাছে নিয়ে এল সিরিয়সের দেয়া আয়না। খুব কাছে নিয়ে এসে কাঁপা কাঁপা গলায় খুব জোরে বললো–সিরিয়স!

ওর নিঃশ্বাসের বাস্পে আয়নার কাঁচটা আরও ঝাঁপসা হয়ে গেল, ও আয়নাটা প্রায় মুখের সামনে চেপে ধরল। ও দেখল ওর চোখ দুটো কাঁপছে, পিট পিট করে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কিন্তু চোখ দুটো তো সিরিয়সের নয়–ওরই।

তারপর আলখেল্লার অস্তিন দিয়ে আয়নার কাঁচটা ভাল করে মুছে নিয়ে গলায় যত জোর আছে তা দিয়ে আবার বললো, প্রতিটি শব্দ শূন্য ঘর ঝম ঝম করে উঠল।

সিরিয়স ব্ল্যাক!

না, আয়না যেমন তার প্রতিচ্ছবি নিয়ে কাঁপছিল, তেমনইভাবে কাঁপতে লাগল। চোখ দুটো পিট পিট করতে লাগলো।

হঠাৎ কে যেন ওর কানে কানে বললো–আরে বোকা সিরিয়ষ তোমার কথার জবাব দেবে কেমন করে? ওর কাছে কি ডুপ্লিকেট আয়নাটা এখন আছে?

–ও তাই সিরিয়স ওর সঙ্গে কথা বলতে পারছে না।

হতাশা ওকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিল। হাতের কাছে যা কিছু পেল ছুঁড়তে লাগলো যেখানে সেখানে। আয়নাটাও ভেঙে ট্রাঙ্কের ডালার ওপর পড়ে রইলো।

তারপর ওর মাথায় নতুন এক বুদ্ধি এলো। অনেক তীক্ষ্ম, অনেক বড়। আগে তো এই কথা ও ভাবেনি–কেন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করেনি?

ও ঘর ছেড়ে লাট্টুর মত ঘুরতে ঘুরতে স্পাইরেল সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলো। নামার সময় ওর দেওয়ালে মাথা ঠুকে গেল, গায়ে ধাক্কা লাগলো। ও শূন্য কমন রুমের সামনে দাঁড়ালো। ও ফ্যাট লেডিকে কোনও রকম হৃক্ষেপ না করে প্রোট্রেট হোলে চোখ রাখল। ফ্যাট লেডি বললো–ফিস্টতো এখন শুরু হচ্ছে হ্যারি, তুমি তো জান তুমি অনেক দেরিতে এসেছ।

কিন্তু হ্যারিরত ইচ্ছে নেই ফিস্টে যোগ দেবার।

কিন্তু এখানে তো ভূতের রাজত্ব, তুমি না চাইলেও কোনও একটা ভূত তোমাকে ছাড়বে না।

ও তখন করিডোর ধরে দৌড়াল। মৃত অথবা জীবিত কাউকে ও দেখতে পেলো না। হ্যাঁ আছে, ওরা সবাই গ্রেট হলে ভিড় করে আছে। তারপর ও চার্মস রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। ও হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে ভাবতে লাগলো ও কোথায় যাবে

যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে, হলে ফিস্ট খতম না হওয়া পর্যন্ত। কথাগুলো ভাবছে ঠিক সেই সময় ও করিডোরের শেষপ্রান্তে হেডলেস নিককে দেখতে পেল

–এ এই–এই নিক শোনো শোনো!

 ভূত একপাশে ঝুলে থাকা মাথাটা ওর গলার ওপর সেট করে নিল। তখন নিকোলাম ডি মিমসি পরপিংটনকে পরিষ্কার দেখতে পেল।

–শুভসন্ধ্যা, নিকোলাস বললেন। বলার পর প্রস্তর মূর্তি থেকে বেরিয়ে এলেন। হ্যারির দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন। একমাত্র আমি নই যে ফিস্টে জয়েন করতে দেরি করে ফেলেছি–তাহলে? তাহলে কি হবে? নিকোলাস অদ্ভুতভাবে হাসলেন হ্যারির দিকে তাকিয়ে।

–নিক আমি কী আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?

হ্যারির কথাটা শুনে নিকোলাস তার একটা আঙ্গুল দিয়ে বেঁকান মুণ্ডুটা ভাল করে ঘাড়ে সেট করে নিলেন।

–এখনই হ্যারি? ফিস্ট শেষ হবার পর প্রশ্ন করলে চলবে না?

–না, প্লিজ নিক! হ্যারি বললো–আমি এখনই এখানে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। চলুন ওই দিকটায় যাই। যাবেন?

কথাটা বলে করিডোরের সংলগ্ন প্রথম ঘরটার দরজা খুলে দাঁড়াতেই হেডলেস নিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

–বাঃ বাঃ অতি সুন্দর, হেডলেস বললেন। মিথ্যে বলছি না সত্যি সত্যি তোমার কাছে এই রকমটি আশা করছিলাম।

হ্যারি দরজা খোলা রাখলেও নিক দেওয়াল বেয়ে ভেতরে গেলেন। হ্যারি দরজাটা বন্ধ করে বললো–আশা করছিলেন?

–এই যে, তুমি আসবে, আর আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। কথাটা বলে ঘরের জানালা দিয়ে অন্ধকার লনের দিকে তাকালেন। কখনও কখনও এমন হয়।

–যখন কেউ কোনও রকম আঘাত পায়, কিছু জিনিস হারায়।

হ্যারি সেই কথার তোয়াক্কা না করে বললো–ঠিক ধরেছেন, আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

কথাটা শুনে নিক নীরব রইলেন।

–ঠিক কথা বলেছি, হ্যারি বললো। হ্যারি মনে মনে কিছু একটা ঘটতে পারে সেইভাব করে দাঁড়িয়ে রইলো।

নিক আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকার লনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

–ঠিক, সব ঠিক বলছি তাই না? আপনি মৃত অথচ আপনার সঙ্গে আমি কথা বলছি। মৃত হলেও আপনি হোগওয়ার্টসে সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে পারছেন সবকিছু করছেন তাই না?

–হ্যাঁ ঠিক বলেছ, নিক বললেন। হ্যাঁ আমি ঘুরে বেড়াই, সকলের সঙ্গে কথাও বলি।

–তার মানে মৃত্যু হলেও, আপনি আবার পৃথিবীতে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন, ভূত হয়ে এসেছেন।

–সকলে তা পারে না ভূত হয়ে ফিরতে।

–আপনার কথার মানে বুঝলাম না।

–সব জাদুকররা তা পারে না, শুধু একমাত্র তারা পারে।

–তাই, হ্যারি হেসে উঠল। ও হেডলেসের কথার অর্থ বুঝতে পেরেছে।

–আমি যাকে এখানে খুঁজতে এসেছি, তিনিও একজন জাদুকর। তাহলে তার আসতে বাধা কিসের? ঠিক বলেছি?

নিক, জানালা থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে দুঃখ ভরা মুখে হ্যারির দিকে তাকালেন।

–তিনি আর ফিরে আসবেন না।

 –কে? কার কথা বলছেন?

 –সিরিয়স ব্ল্যাকের কথা বলছি। নিক বললেন।

 –কেন পারবেন না? আপনি তো ফিরে এসেছেন, হ্যারির কণ্ঠে উষ্মা।

–আপনি মৃত, তাওতো আপনি মুছে যাননি।

-হ্যাঁ পারে, জাদুকররা পারে; কিন্তু সব মৃত জাদুকররা তা চায়না। তবে তারা ইচ্ছে করলেই এক সময় যে পৃথিবীর বুকে পা রেখেছিল আবার সেই পৃথিবীতে পা রাখতে পারে। নিক অনেক কষ্টে কথাগুলো যেন বললেন।

–কেন নয়? আমি অন্যের প্রসঙ্গে তুলতে চাই না, বলুন সিরিয়স কেন চাইছেন

না। সিরিয়স অস্বাভাবিক কোনও কিছু তোয়াক্কা করে না।

কথাটা বলার পর হ্যারি খোলা দরজার দিকে তাকাতেই ওর মনে হলো সিরিয়স দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর কথা শুনছিলেন। সিরিয়সকে ও ক্ষণিক হলেও দেখতে পাবে, দেহ তার রক্তে মাংসের নয়, শুভ্র, ট্রান্সপারেন্ট, সেই ভাবেই ওর কাছে আসবেন।

–না, উনি কখনোই আসবেন না, নিক কথাটা আবার জোর দিয়ে বললো। উনি চিরকালের জন্য বিলীন হয়ে গেছেন।

–কি বলছেন? বিলীন হয়ে গেছেন মানে? তাহলে আপনি হলেন না কেন? অন্যরা কেন ফিরে আসতে চায় না? তাহলে এই জায়গাটায় এত ভূতের সংখ্যা কেন? কেন তারা মৃত্যুর পর বিলীন হতে চায়নি?

–আমার কাছে তোমার এই প্রশ্নের জবাব নেই হ্যারি, নিক বললেন।

–আপনি তো মৃত, তাই না? হ্যারি হতাশ হয়ে বললো–আপনি কেন জবাব দিতে পারবেন না?

-হ্যাঁ, আমি মৃত। তাও আমি পৃথিবী ছেড়ে যাইনি। আসলে আমি অন্দরে না বাহিরে। নিক সামান্য তোতলালেন। আমি জীবন ও মৃত্যু রহস্য সম্বন্ধে কিছু জানি

হ্যারি। কেন আমি নকল জীবন ধারণ করে রয়েছি তাও জানি না। আমি শুনেছি ডিপার্টমেন্ট অফ মিস্ট্রিস এ সম্বন্ধে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।  

–সেই জায়গাটা কোথায় দয়া করে আমাকে বলবেন নিকোলাস, হ্যারি মরিয়া হয়ে বললো।

নিকোলাস হ্যারির সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে যেমনভাবে ঘরে ঢুকে ছিলেন তেমনই ভাবে চলে গেলেন হ্যারিকে ঘরে নিছক একলাটি রেখে।

নিকোলাস ঘর ছেড়ে চলে যাবার পর হ্যারির মনে হল ক্ষীণকাল আগে যেন ওর গডফাদারকে হারিয়েছি। আবার তিনি ফিরে আসবেন। ওর সঙ্গে কথা বলবেন তার কোনও আশার আলো দেখতে পেলো না। ও প্রায় শূন্য ক্যাসেলের দিকে ধীর পদক্ষেপে চললো। মনে তার দারুণ বেদনা, জীবনে আবার কী ও হাসতে পারবে? সকলের সঙ্গে মন খুলে গল্প করতে পারবে? ফ্যাটলেডি যেখানে থাকেন ও সেই দিকে চললো। তারপর চলতে চলতে হঠাৎ চোখে পড়ে গেল লুনা আসছে। লুনার দৃষ্টির বাইরে যাবে তেমন কোনও লুকোবার জায়গা হ্যারি দেখতে পেলো না। লুকিয়ে বেড়াবার শক্তি ওর মন থেকে অবলুপ্ত হয়ে গেছে।

–হ্যালো, লুনা ভাসাভাসাভাবে ওকে দেখে বললো। হ্যারি যে ওকে দেখে লুকোতে চেয়েছিল সেটা বুঝতে পারেনি।

–তুমি ফিস্টে যাওনি? এখানে কেন ঘুরছ? হ্যারি ওকে জিজ্ঞেস করলো।

লুনা নোটিশ বোর্ডের দিকে আঙ্গুল দেখাল। হ্যারি দেখল লুনা ওর হারিয়ে যাওয়া সব জিনিসের একটা ফর্দ টাঙিয়ে রেখেছে। ওর মনের আশা ওগুলো ও ফেরত পাবে।

–আরে তোমার জিনিসপত্র ছেলে–মেয়েরা লুকিয়ে রাখতে যাবে কেন? হ্যারি সাদাসিধেভাবে বললো–তুমি কী কারও সাহায্য চাও?

–না, মোটেই না। এই রকম অবস্থা প্রতিবছর আমার হয়, আবার আমি সেগুলো পেয়েও যাই। ওগুলো ঘরে নেই তাই, আজ রাতেই তো গোছগাছ করে নিতে হবে। ও তুমি ফিস্টে যাওনি?

হ্যারি নিরাসক্তভাবে বললো–খাবার ইচ্ছে নেই। এর অন্য কোনও কারণ নেই।

–না, তুমি ঠিক বললে না। লুনা জল ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললো। জিনি বলছিলো, তোমার গডফাদার ডেথ ইটারসদের হাতে মারা যাওয়াতে তুমি খুব…।

হ্যারি ঘাড় নাড়লো। অন্য কেউ সিরিয়স প্রসঙ্গ তুললে হয়তো রেগে যেত, কথার জবাব দিতো না। লুনার কথা শুনে কিছু মনে করলো না। হঠাৎ ওর মনে পড়ে গেলো লুনা তো মৃত মানুষকে পৃথিবীতে টেনে আনতে পারে।

–তুমি কী এমন কেউ মৃত… মানে তার মৃত্যুর পর তাকে দেখতে পেয়েছ? পৃথিবীতে এনেছ?

–হ্যাঁ, লুনা সংক্ষেপে বললো। হ্যাঁ, আমি মাকে দেখেছি। মা খুব নামকরা একজন জাদুকরী (উইচ) ছিলেন, তুমি হয়তো জানো। মা সে সম্বন্ধে নানা এক্সপেরিমেন্ট করতেন, যাকে প্ল্যানচেট বলা হয়। সেই রকম করতে গিয়ে যাদুর ভুলে, একদিন তিনি নিজেই চলে গেলেন, আমার বয়স তখন নবছর।

–সত্যি আমি দুঃখিত।

–বিশ্বাস কর, খুবই দুর্ভাগ্যজনক লুনা খুবই স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো–মাঝে মাঝে সেই কথা মনে হলে খুব দুঃখ হয়, খারাপ লাগে। তাহলেও এখনও তো আবার ড্যাড বেঁচে আছেন, এমন নয় যে আমি আর আমার মাকে আর দেখতে পাবো না।

–ধ্যাৎ তাই আবার হয় নাকি, লুনা মাথা নাড়ল।

হ্যারির কথা যেন ওর বিশ্বাস হয় না।

–তুমি তো যারা নেই তাদের কথা শুনতে পাও।

 –মানে?

–ওই আর্চওয়ের ঘরে; ওরা সবাই অদৃশ্য হয়ে কথা বলে। শুনছিলে না ওরা বলছিলো?

ওরা পরস্পরের দিকে তাকালো। লুনার মুখে মৃদু হাসি। হ্যারি বুঝতে পারে না কি বলবে।

–সত্যি, তুমি তোমার প্রিয়জন যারা মৃত তাদের কথা শুনতে চাও না? হ্যারি বললো।

–না, একদম না। তার চেয়ে চল আমরা নিচে গিয়ে কিছু পুডিং খেয়ে আসি। সকলেই তো ওখানে আসবে, তারপর আমরা যে যার বাড়ি চলে যাব, আমাদের ছুটি খুব মজাসে কাটবে, লুনা বললো।

–সত্যি, সত্যি তুমি ঠিক বলেছ।

লুনা নিজস্ব চলার ভঙ্গিতে চলে গেল যেখানে টার্ম শেষের ভোজ হচ্ছে। হ্যারির লুনার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল ওর পেটের মধ্যে যে বিরাট বোঝাটা ওকে যন্ত্রণা দিয়ে চলেছিল, ক্রমাগত সেই ভারটা যেন অনেক কমে গেছে।

***

পরের দিন হোগওয়ার্টস এক্সপ্রেসে চেপে বাড়ি যাওয়া ওদের কাছে স্মরণীয় এক ঘটনা হয়ে রইল সন্দেহ নেই। প্রথমত ম্যালফয়, গ্রোয়েলে আর ক্র্যাবি সুযোগ খুঁজছিল হ্যারিকে ট্রেনের করিডোরে আক্রমণ করার, যখন ধারে কাছে কোনও স্বাক্ষী থাকবে না। ওরা সেই পরম সুযোগ পেয়ে গেল। হ্যারি টয়লেট থেকে একা ওর কেবিনে ফিরছিল। ওরা চেয়েছিল এমন একটা জায়গাতে হ্যারিকে একলা পেতে, যখন সেখানে কোন ডিএর সদস্য মজুদ থাকবে না।

ওরা ওদের কাঁচের পার্টিশন দিয়ে দেখতে পেল হ্যারিকে তিনমূর্তি আক্রমণ করার জন্য এগোচ্ছে। তখন এরনি ম্যাকমিলন, হান্না অ্যাবট, সুথান বেনেস, জাস্টিন ফিঞ্চ, ফ্রেলে, অ্যানথনী গোল্ড স্টেইন আর টেরী বুট (সকলেই ডিএর সদস্য) ওদের কামরা থেকে বেরিয়ে এসে ওদের তিনজনকে এমন অবস্থায় পরিণত করল যেন তিনটে লাগেজ! হ্যারি এরনি, জাস্টিন ওদের ধরে হোগওয়ার্টস এক্সপ্রেসের লগেজ ব্যাকে চালান করে দিল।

এরনি হাসতে হাসতে বললো–ট্রেন থেকে নেমে আমি ম্যালয়ের মায়ের মুখটা দেখতে চাই। ছেলের অবস্থা দেখে মুখটা কেমন হবে বুঝতে পারছ?

ম্যালফয় তখন ওর মাথার ওপর যে লগেজের ব্যাগটা রয়েছে সেখানে জবুথবু হয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছে।

রন বললো–ছাড়ো মায়েদের কথা। ক্ষিধেতে আমার পেটের ভেতরটা চনচন করছে, কথাটা শেষ হতে না হতে লাফিয়ে উঠে বললো–আরে ওইতো খাবার ট্রলি আসছে।

বন্ধুদের ধন্যবাদ জানিয়ে হ্যারি–রন ওদের কামরাতে গিয়ে দেখল হারমিন একগাদা ডেইলি প্রফেট নিয়ে বসে রয়েছে। হারমিওন ওদের কামরায় ঢুকতে দেখে হাতের ডেইলি প্রফেট থেকে জোরে জোরে পড়তে লাগল। টুকরো খবর এই রকম

ডিমেন্টসদের আক্রমণ কেমন করে প্রতিহত করা যাবে, মিনিস্ট্রি ডেথইটারসদের কেমনভাবে ধরবে। আর এক পাগলের চিঠি; সে নাকি সকালে ভোল্ডেমর্টকে ওর বাড়ির সামনে দিয়ে গট গট করে হেঁটে যেতে দেখেছে।

হারমিওন ডেইলি প্রফেটটা মুড়ে পাশে রেখে বললো–যত্তোসব বাজে খবর। এখনও তো ওদের হামলা শুরু হয়নি, তবে শিগগিরি হবে মনে হয়।

রনের পাশে হ্যারি বসেছিল। হঠাৎ রনের কাঁচের পার্টিশনে চোখ পড়তেই হ্যারিকে খোঁচা মেরে বললো–হে হ্যারি দেখ দেখ চো যাচ্ছে।

হ্যারি দেখল চো মেরিয়েটা এজকোষের সঙ্গে করিডোর দিয়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য চোর দৃষ্টি হ্যারির ওপর পড়তেই চোর গালদুটো লাল হয়ে গেল। হ্যারি মুখ নামিয়ে চেসবোর্ড দেখতে লাগল। রন প্রায় কিস্তিমাৎ করেছে।

রন মুখ টিপে বললো–ওর সঙ্গে তোমার ইদানীং কেমন চলছে বন্ধু? –বিশেষ কিছু বলার নেই, হ্যারি বললো।

হারমিওন বললো–কানে খবর এসেছে এখন ও নতুন একটি ছেলের সঙ্গে ঘোরাফেরা করছে।

হ্যারি হাসল। হাসিতে বোঝাতে চাইল অতীত অতীত, বর্তমান নিয়ে মাথা ঘামাও।

রন বললো–এখন আর ও গোমড়া মুখে থাকে না। খুব হাসি খুশিতে থাকে।

হ্যারি বললো–সেটাই তো দরকার।

শুনছি অন্য একজন…। জিনি বললো মাইকেল কর্নার।

রন বললো–মাইকেল? কিন্তু তুমি তো দেখি ওর সঙ্গে ঘোরাফেরা কর।

জিনি বললো–হা করতাম, এখন আর করি না। এখন ডিন থমাস!

হ্যারি বললো–আরে ওটাতো একটা গাড়ল।

–কী বললে? রন চেঁচিয়ে উঠল।

ট্রেন তখন কিংস ক্রসের কাছে এসে গেছে। হ্যারির মন চায় না ট্রেন থেকে নেমে আবার আন্টি পেটুনিয়ার কাছে যেতে। ট্রেনে অনন্তকাল থাকলে কেমন হতো? সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কি থাকতে পারবে না? তখন ট্রেনটা আবার কিংস ক্রস থেকে হোগওয়ার্টস-এ ফিরে যাবে নতুন আর পুরনো ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে।

ট্রেন মন্থর গতিতে প্লটফরমে পৌঁছবার আগেই টিকেট ইন্সপেক্টর এসে হ্যারি, রন আর হারমিওনকে প্ল্যাটফরম ৯ ও ১০-এর মাঝে ম্যাজিকাল বেরিয়ারে নামতে নির্দেশ দিল। হ্যারির হোগওয়ার্টস এক্সপ্রেসে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লুকিয়ে থাকার স্বপ্ন ভেঙে গেল।

ট্রেনে হ্যারি আর রনের সময় কেটেছে দাবা খেলে, আর হারমিওনের প্রফেটের টুকরো খবর পড়ে। ডিমেন্টরস আর ডেথ ইটারসদের নিয়ে একই খবর। আর সকাল বেলা ভোল্টেমর্টের একা একা হেঁটে যেতে দেখার চিঠি।

চো নামছিল সেই সময় হ্যারির সঙ্গে ওর দেখা হয়ে গেল। ওর সঙ্গে মেরিয়েটা, ওর গায়ে কাল রঙের বেলাক্রড়া (টাইট সোয়েটার। সর্বাঙ্গ ঢাকা–শুধু মুখের কাছটা খোলা থাকে)।

স্টেশনে ওদের রিসিভ করতে এসেছেন ম্যাড আই মুডি (একইরকম তার ড্রেস), তার পেছনে দাঁড়িয়ে টোকংস। টোংকসের বাবলগামের মতো চুল রোদ পড়ে ঝক ঝক করছে। গায়ে ওর পার্পল রং-এর টি শার্ট। টোংকসের পাশে লুপিন দাঁড়িয়ে ছিলেন। গায়ে সেই সুতো বেরিয়ে পড়া ওভারকোট। শীর্ণ, চিন্তিত মুখ। মি. ও মিসেস উইসলিও এসেছেন।

ছেলে মেয়ে আর হ্যারিকে দেখে খুশিতে উপছে পড়ে ওদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হারমিওনকেও আদর করলেন।

লুপিন বললেন–তোমার প্রাইভেট ড্রাইভে যাবার আগে আমরা ডার্সলেদের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।

হ্যারি দেখল অদূরে আঙ্কল, আন্টি আর তাদের প্রিয় পুত্র দাঁড়িয়ে রয়েছে। হ্যারি বললো–বলে কোনও লাভ নেই। ও দেখল ম্যাড আই মডি ডার্সলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছেন। সম্ভবত তিনিও কিছু বলতে চান।

হারমিওনের বাবা-মাও এসেছেন। মা বাবার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে হারমিওন, হ্যারি আর রনের সঙ্গে ডার্সলে পরিবারের দিকে চললো। ওদের পেছনে লুপিন আর মুডি।

মি. উইসলিও চলেছেন ওদের সঙ্গে। হ্যারির দুবছর আগেকার আঙ্কল ভার্নন আর আঙ্কল উইসলির ড্রইয়ংরুমের ঘটনা মনে পড়ে গেল। ডার্সলেদের ঘরে একাই মি. উইসলি সকল কিছু ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। হ্যারি ভাবল আঙ্কল ভার্নন নিশ্চই সেই ঘটনার কথা ভুলে যান। ডার্সলে পরিবারের তিনজন আর ওদের সংখ্যা অনেক। এ কারণে যতই রেগে থাকুক ভার্ননের পক্ষে কিছু প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

মি. উইসলি, ভার্নননের দিকে হাত বাড়িয়ে স্মিত মুখে বললেন–কিছু মনে করবেন না, হ্যারি আপনার বাড়িতে যাবার আগে দুএকটা কথা বলতে চাই।

মুডি ঘেঁৎ ঘোৎ করে বললেন–হ্যারি আপনাদের ওখানে থাকছে সেই বিষয়ে।

আঙ্কল ভার্ননদের গোঁফ জোড়া নেমে গেল অমর্যাদার আভাস পেয়ে। বেশ গুরুগম্ভীর স্বরে মুডিকে বললেন–সেটা আমার বিবেচ্য, আপনাদের তো মাথাগলাবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

মুডি বললেন–আমি যা বলতে চাই আপনাকে তা মাথাতে গেলে অনেকগুলো বইয়ের প্রয়োজন হবে, যদি লেখা যায়।

টোংকস বললেন–ওসব কথা থাক মুডি।

টোকংস-এর গোলাপী চুল আন্টি পেটুনিয়ার একটুও যেন চোখে বরদাস্ত হচ্ছিল না। কথাটা হচ্ছে আমাদের দৃষ্টির বাইরে হ্যারি থাকলে তার সঙ্গে আপনারা কেমন ব্যবহার করবেন।

মি. উইসলি বললেন–হ্যারিকে যদি ফেল্লিটোন ব্যবহার করতে না দেন সেই সম্বন্ধে বলতে চাই।

হারমিওন ফিস ফিস করে বললেন–টেলিফোন।

মুডি কটকট করে বললেন–যদি আমরা হ্যারির কাছ থেকে কোনও আভাষ পাই যে আপনারা ওর সঙ্গে সভ্য ব্যবহার করছেন না তাহলে… তাহলে আপনার জবাবদিহী করতে হতে পারে।

কথাটা শুনে ভার্ননের মুখটা আরও ফুলে উঠলো। প্রচণ্ড রাগে ওর সাহসের সীমা ছাড়িয়ে গেল। বললেন–আপনারা কি আমায় ভয় দেখাচ্ছেন? কথাটা এত জোরে জোরে বললেন যে, আশপাশের লোক থমকে দাঁড়াল।

মুডি বললেন–তা একটু পাওয়াচ্ছি বৈকি। মুডি বুঝতে পারলেন ভার্ননের মাথায় কথাটা ঠিকমত প্রবেশ করেছে।

আঙ্কল ভার্নন কাঁপতে কাঁপতে বললেন–আমাকে দেখে কি আপনাদের তাই মনে হয়?

মুডি তার বাউলার হ্যাট সরিয়ে বললেন–শুনুন, মুডির ম্যাজিক্যাল আই ঘুরতে লাগল। ভার্নন ভয় পেয়ে দুপা পিছিয়ে গেলেন। তার পেছনের একটা লগেজ ট্রলিতে ধাক্কা খেলেন। ব্যথাতে মুখটা আরও চুপসে গেল। হ্যাঁ তাই মনে হয়, ভয়ই পাওয়াচ্ছি ডার্সলে?

মুডি ভার্ননের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে হ্যারির দিকে তাকালেন।

–তো পটার, যদি আমাদের কখনও বোধকর তাহলে অবশ্যই জানাবে। যদি তিন চারদিন একনাগাড়ে তোমার কোনও খবর আমরা না পাই, তাহলে আমরা তোমাদের ওখানে আসব।

কথাটা শুনে আন্টি পেটুনিয়া একটু ঘাবড়ে গেলেন। সদলবলে যদি ওরা হ্যারির খোঁজ করতে প্রাইভেট ড্রাইভে আসে তাহলে পাড়ার লোকেরা অন্য কিছু ভাবতে পারে। সেটাও ভয়ের ব্যাপার!

–তাহলে পটার আজ আমরা আসি, মুডি পটারের কাঁধে তার গাছের শেকড়ের মতো হাতে চাপ দিয়ে বললেন।

লুপিন বললেন–সাবধানে চলাফেরা করবে হ্যারি। খবরা খবর দেবে।

মিসেস উইসলি বললেন–মন খারাপ করবে না হ্যারি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমাকে আমরা আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসব।

রন প্রবলভাবে হ্যারির হাত দুটো চেপে ধরে বললো–আবার দেখা হবে বন্ধু।

হারমিওন বললো–সত্যি, সত্যি, সত্যি, সত্যি…।

হ্যারি সকলের দিকে তাকিয়ে রইল কোনও রকমে চোখের জল চেপে। ওর মুখ থেকে কথা বেরোচ্ছে না। ও একটু হাসলো, একটা হাত তুলে বিদায় নিল। ওরা হ্যারির দিকে তাকাতে তাকাতে স্টেশনের বাইরে চলে গেলে ব্যারি আঙ্কল ভার্নন, আন্টি পেটুনিয়া আর ডাডলির সঙ্গে অন্য রাস্তায় দাঁড়াল। প্রাইভেট ড্রাইভ যাবার জন্য পা টেনে টেনে চললো। রাস্তা তখন প্রখর সূর্যালোকে যেন ফেটে যাচ্ছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *