৩৪. দ্য ডিপার্টমেন্ট অব মিসটেরিস

৩৪. দ্য ডিপার্টমেন্ট অব মিসটেরিস

হ্যারি হাতের কাছে যে থেস্ট্রালটাকে দেখতে পেলো তার ওপর চেপে বসলো। থেস্ট্রাল ওর চকচকে পিঠে হ্যারিকে চাপাতে কোনও আপত্তি করলো না। থেস্ট্রালের দুডানার খাঁজে হাঁটু ঢুকিয়ে বসে মোটামুটি আরামদায়ক মনে হলো। রন, নেভিল, জিনি তখনও থেস্ট্রালের পিঠে উঠতে পারেনি। ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হ্যারি বললো, কী ব্যাপার?

রন বললো, তুমি তো দিব্যি উঠলে, আমরা তো উঠতে পারছি না। অন্ধকারে কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না।

শেষ পর্যন্ত সকলে কোনো রকমে উঠে বসলো।

হ্যারি থেস্ট্রালকে বললো, মিনিস্ট্রি অফ ম্যাজিক, দর্শনকারীদের এনট্রেন্স, লন্ডন। ঠিকানা ঠিক বললো কিনা তা ও জানে না, তুমি তো জায়গাটা চেনো? থেস্ট্রাল ওর কথাটা শুনে শরীরে ঝাঁকানি দিয়ে তীব্র বেগে ডানা মেলে আকাশে উড়লো। এমন প্রচণ্ড তার গতি, হ্যারির মনে হলো ছিটকে পড়বে। ও তাই গলাটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরলো। বাকি সঙ্গীরাও ওর মতো থেস্ট্রালের গলা আঁকড়ে, উড়ন্ত থেস্ট্রালের পিঠে বসে গন্তব্য স্থানে হু হু করে ভেসে যেতে লাগলো। সামনে হ্যারি, ওরা তার পেছনে।

থেস্ট্রাল বড় বড় গাছ, ক্যাসেলের ওপর দিয়ে উড়তে লাগলো। হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, ঠাণ্ডাতে হাত পা জমে যেতে লাগলো। যে কোনও মুহূর্তে পড়ে যেতে পারে-এমন অবস্থা। এক এক করে হোগার্টসের মাঠ, হগসমিড ছাড়িয়ে পাহাড়ের কোল দিয়ে ভেসে চললো। সূর্যাস্তের লাল আলো ওদের গায়ে এসে পড়েছে। ওপার থেকে দেখলো হোগার্টসের আশপাশের গ্রামের কুটিরে আলো জ্বলে উঠেছে। পাহাড়ের কোলে আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নিচু রাস্তায় দেখলো একটা গাড়ি ধীরে ধীরে চলেছে।

হ্যারির কানে এলো রনের গলা, সত্যি উদ্ভট ব্যাপার।

হ্যারি বুঝতে পারলো ওদের এমন অবস্থা! হাত সামান্য একটু আলগা হলেই ধরনীতলে পড়বে! তারপর দেখলো আকাশে তারা ফুটে উঠছে। মাগলদের বসতি দেখে বুঝতে পারলো কতোটা ওপরে উঠেছে। অন্যরা ভয় পেলেও, হ্যারি চাইলো ওর থেস্ট্রাল আরও জোরে, আরও জোরে উড়ে চলুক। বার বার ওর সিরিয়সের কথা মনে হতে লাগলো। স্বপ্নে দেখেছিলো সিরিয়র ডিপার্টমেন্টের ফ্লোরে পড়ে রয়েছেন, আর ভোল্ডেমর্ট তাকে হত্যার ভয় দেখাচ্ছে। তারপর তো অনেক সময় কেটে গেছে। কে জানে এখন কি অবস্থাতে আছেন! তবে একটা ব্যাপারে ও নিশ্চিত ওর ধর্মপিতা ভোল্টেমর্টের ইচ্ছে অনুযায়ী কিছু করছেন না, এখন মৃতও নয়। সেরকম কিছু হলে তো ওর কপালের কাটা দাগে অসম্ভব জ্বলন-চুলকুনি হতো! যে রাতে মি. উইসলিকে আহত হতে দেখেছিলো, সেরাতে ওর কাটা দাগে জ্বলন, চুলকুনি হয়েছিলো, মাথায় অসহ্য ব্যথা হয়েছিলো।

ঠাণ্ডাতে হ্যারির সমস্ত শরীর অসার হয়ে যাচ্ছে। হাত পা দুটো বরফ হয়ে গেছে, একটু আলগা হলে ছিটকে পড়ে যাবে। কানের পাস দিয়ে তীব্র বেগে হাওয়া বইছে। মনে হয় কানের পর্দা ফেটে যাবে। শীতল রাতে ওর গলা শুকিয়ে গেছে। কোথায় এসে পৌচেছে তাও জানে না। ভরসা শুধু ওর থেস্ট্রাল।

যদি ওরা দেরি করে পৌঁছায়।

ও না সিরিয়স বেঁচে রয়েছেন, এখনও ভোল্টেমর্টের সঙ্গে লড়াই করছেন। আমি অনুভব করতে পারছি।

ভোল্টেমর্টের ভয় দেখানো, অত্যাচারে সিরিয়স একটুও কাবু হচ্ছেন না। সবই বুঝি আমি।

হ্যারির পেটে চাপ পড়লো, থেস্ট্রাল হঠাৎ সোঁ সোঁ করে নিচে নামতে লাগলো। নামার সময় হ্যারির মনে হলো ও ছিটকে পড়বে। ও প্রবল শক্তিতে থেস্ট্রালের গলা জড়িয়ে ধরলো। ওর পেছনে যারা আসছিলো তাদের একজনের ভয় বিজড়িত গলার শব্দ শুনতে পেলো। হু হু করে নিচে নামতে নামতে কাউকে পড়ে যেতে দেখলো না। খুব সম্ভব হঠাৎ গতি পরিবর্তনের জন্য ওরা ভয় পেয়েছে। নিজেও তো পেয়েছিলো!

নামতে নামতে দেখলো কমলা রঙের আলো চতুর্দিকে। নানা ধরনের ছোটো বড় বাড়ি, সেখানেও আলো জ্বলছে। রাস্তা-পার্ক, একটা বিরাট জীবন্ত নগর। ওরা একটা ফুটপাতে নামছে বুঝতে পারলো। হ্যারি আরও শক্ত করে চেপে ধরলো খ্রেস্ট্রালের গলা। কিন্তু ঘোড়া তার গতি কমিয়ে দিয়ে অতি সাবধানে, ধীরে ধীরে ফুটপাতে নামলো। বাকি ঘোড়াগুলো একইভাবে নামলো। ওরা একটা রাস্তার ধারে নেমেছে। রাস্তার দুধারে ল্যাম্পপোস্ট, টেলিফোনের ধ্বংসপ্রাপ্ত তার, বাক্স। হ্যারি খুব সাবধানে থেস্ট্রালের পিঠ থেকে ফুটপাতে পা দিলো। ঝলমলে রাস্তা আশপাশের বাড়ির জানালা দিয়ে আলো ঠিকরে রাস্তায় পড়ছে।

রনও নেমেছে। ও বললো, বাবাঃ আর জীবনে থেস্ট্রালের পিঠে চাপছি না। জীবন হাতের মুঠোতে চেপে এসেছি। গ্রামের একটা বাড়িতে ধাক্কা খেয়ে প্রায় পড়ে গিয়েছিলাম। জিনি, নেভিল, হারমিওন আর লুনা নেমে পড়ে কোনওরকম বিরক্তি প্রকাশ করলো না।

–তাহলে এবার আমরা কোথায় যাবো? লুনা খুব দ্রভাবে বললো যেন দিনের বেলায় বেড়াতে বেরিয়েছে ওরা।

–এইদিকে এসো, হ্যারি একটা পরিত্যক্ত টেলিফোন বাক্সের কাছে গিয়ে তার দরজাটা খুললো। চলে এসো।

সকলেই ভেতরে যাবে কি যাবেনা ভাবতে লাগলো।

রন আর জিনিকে ঢুকতে দেখে হারমিওন, নেভিল আর লুনা ওদের পিছু পিছু ঢুকেছে। হ্যারি পেছন ফিরে দেখলো থেস্ট্রালরা পরমানন্দে রাস্তায় পড়ে থাকা খাবার দাবার খেয়ে চলেছে। হ্যারি, সকলে ঢোকার শেষে নিজে ঢুকলো।

–তোমাদের মধ্যে রিসিভারের কাছে যে রয়েছে সে ৫৪৪২ ডায়াল করো, হ্যারি বললো।

রন ডায়াল করলো। ডায়াল শেষ হলে বক্সের ভেতর থেকে একটি মেয়ের সুরেলা কণ্ঠ শুনতে পেলা : মিনিস্ট্রি অফ ম্যাজিকে স্বাগত। অনুগ্রহ করে আপনাদের নাম ও কি কাজে এসেছেন জানান।

হ্যারি খুব তাড়াতাড়ি বললো, হ্যারিপটার, রন উইসলি, হারমিওন গ্রেঞ্জার, জিনি উইসলি, নেভিল লংবটম, লুনা লাভগুড, আমরা এসেছি কোনও একজনকে প্রাণে বাঁচাতে, যদি না তোমার মিনিস্ট্রি এখনও পর্যন্ত সেই কাজ করে না থাকে।

সেই ঠাণ্ডা সুরেলা কণ্ঠের মেয়েটি বললো, ধন্যবাদ। আপনারা প্রত্যেকে একটি ব্যাজ নিয়ে আপনাদের রোবসের বুকে আটকান।

যেখান থেকে ফেরত পাঠানো কয়েন বেরিয়ে আসে, সেই কোটর থেকে ছটা মেটাল ব্যাজ বেরিয়ে এলো। হারমিওন ব্যাজগুলো নিয়ে সকলের বুকে আটকে দিলো। ব্যাজের ওপোর দেখলো লেখা রয়েছে, হ্যারি পটার রেসকিউ মিশন (হ্যারিপটারের উদ্ধারকারী দল)।

–ভিজিটরদের অনুরোধ করা হচ্ছে, তাদের সার্চ করা হবে ও তাদের জাদুদণ্ড সিকিউরিটির ডেস্কে রেজিস্ট্রেশনের জন্য জমা দিতে হবে। অ্যাট্রিয়মের শেষে রেজিস্ট্রেশনের অফিস।

–সুন্দর, হ্যারি বললো বেশ জোরে জোরে। তখনই ওর কাটা দাগটা দপদপ করে উঠলো। হ্যাঁ, চলো যেমন বলেছে আমরা তেমনভাবে চলি।

টেলিফোন বাক্সের ফ্লোরটা কেঁপে উঠলো। ওরা তীব্র বেগে নিচে নামতে লাগলো। দেখতে দেখতে ফুটপাত, থেস্ট্রালদের আর দেখা গেলো না। লিফট জাতীয় ক্যারেজটা অন্ধকার হয়ে গেলে ওরা আন্ডার গ্রাউন্ড মিনিস্ট্রি অফ ম্যাজিকে চললো। চলতে চলতে ক্লিংক শব্দ হতেই দরজাটা খুলে গেলো। পায়ের তলায় ফ্লোরে সোনালী আলো জ্বলছে। হ্যারি ওর জাদুদণ্ডটা শক্ত করে ধরে বাইরে এসে দেখলো অ্যাট্রিয়ম শূন্য, একটি প্রাণীও নেই, আলোগুলো টিম টিম করে জ্বলছে, ফায়ার প্লেসে তখনও আগুন জ্বলছে না।

মিনিস্ট্র অফ ম্যাজিক আপনাদের জন্য সুন্দর একটি সন্ধ্যা কামনা করছে একটি মেয়ের গলা শুনতে পেলো।

হ্যারি এগোতে থাকলে পিছু পিছু চললো নেভিল আর লুনা। অ্যাট্রিয়মে শুধু একটি শব্দ শুনতে পেলো, সোনার ফাউন্টেন থেকে অবিরল জল পড়ার শব্দ। জল বেরিয়ে আসছে জাদুকর-জাদুকরির দরে মুখ থেকে শুধু নয়, সেনট্যারদের তির, সোনার টুপির উপরিভাগ, এলফদের কান থেকে। সব জলই জমা হচ্ছে একটা ঘেরা জলের ডোবাতে।

সেটা ছেড়ে ওরা হ্যারির সঙ্গে সামনে এগোতে লাগলো। ওরা ডেস্কের কাছে পৌঁছলে সিকিউরিটির লোকটি ওর দণ্ড দিয়ে ওদের দণ্ড ওজন করে ডেস্ক থেকে উধাও হয়ে গেলো। হ্যারি আশা করেছিলো আরও অনেক সুরক্ষা কর্মী থাকবে, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলো না। তাদের না থাকাটা মনে হলো অশুভ লক্ষণ। সোনার গেট দিয়ে লিফটের দিকে যেতে যেতে মনে হলো চতুর্দিকে শুধু অমঙ্গলের অদৃশ্য চিহ্ন। সেই ভাবনা যেন বেড়েই চললো। লিফটের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়ালের সুইচে ডাউন টিপলো। বলতে গেলে মুহূর্তের মধ্যে লিফট ওদের সামনে থামলো। সোনার গ্রিলের স্বয়ংক্রিয় দরজা খুলে যেতেই ওরা লিফটের ভেতরে ঢুকলো। হ্যারি ৯ নম্বরের বোতাম টিপতেই লিফট নিচে নামতে শুরু করলো। লিফট নামার সময় ঝর ঝর ঘর্ঘর শব্দ হতে লাগলো। হ্যারির ঠিক মনে নেই, মি. উইসলির সঙ্গে আগে যখন এসেছিলো শব্দ শুনে বিল্ডিং-এর সুরক্ষা বাহি নীর অবশ্যই দ্রিা ভেঙেছিলো। লিফট থামলে আবার সেই সুরেলা কণ্ঠের গলা ডিপার্টমেন্ট অফ মিস্ট্রিজ। লিফটের গ্রিল দেওয়া দরজা খুলে যেতেই ওরা করিডোরে পা রাখলো, করিডোর ঔষশূন্য, শুধু টর্চের আলো জ্বলছে। সেই আলো লিফটের হাওয়াতে দপদপ করছে।

মাসের পর মাস করিডোরের শেষ প্রান্তে যে বন্ধ কালো দরজাটা স্বপ্নে দেখেছে ওরা তার সামনে দাঁড়ালো। শেষ পর্যন্ত সেই দুঃস্বপ্ন দেখা জায়গায় ও জাগ্রত অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।

হ্যারি ওদের সঙ্গে করে সেই কালো দরজার প্রায় ছ ফিট দূরে দাঁড়িয়ে বললো, হতে পারে, দুএকজন কর্মী নিশ্চয়ই ঘরের মধ্যে দেখাশুনা করার জন্য রয়েছে।

হ্যারি চায় না কেউ ওর সঙ্গে ভেতরে থাক। কিন্তু এখন তো ওর কথা চলবে। রন ভেতরে যেতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। ঠিক স্বপ্নে দেখার মতো দরজার সামনে দাঁড়াতেই বন্ধ দরজা খুলে গেলো। ওরা সকলেই প্রথম ঘরের ভেতর ঢুকলো। তারপর ওরা গোলাকৃতি বড় একটা ঘরের ভেতর ঢুকলো। ঘরের যাবতীয় জিনিস কালো রং-এর সিলিং, ফ্লোর, হাতছাড়া দরজা ও কালো দেওয়ালের মাঝে মাঝে রয়েছে। ঘরে সবুজ কয়েকটা মোমবাতি জ্বলছে। সবুজ ঠাণ্ডা আলোর ছায়া ঘরের মাৰ্বল ফ্লোরে এসে পড়ছে, মনে হয় যেন পায়ের তলায় কালো জল জমে আছে।

হ্যারি খুব আস্তে বললো–তোমাদের মধ্যে একজন ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দাও।

ও বলার আগেই নেভিল দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। করিডোরের আলো ঘরে ছিলো কিন্তু দরজা বন্ধ করার পর বড় একটা নীল আলোর মোমবাতি টিপ টিপ করে জ্বলে আরও যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিলো ঘরটা। সমস্ত ঘরটায় যেনো এক ভৌতিক পরিবেশ। স্বপ্নে ও যে দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেছিলো ঠিক তার বিপরীতে আর একটি দরজা। সেই দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো আরও বারো তেরোটি দরজা রয়েছে। কোন দরজা দিয়ে পাশের ঘরে ঢুকবে ভাবছে, তখন ভীষণ জোরে গুরু গুরু শব্দ শুনতে পেলো। সেই শব্দে ঘরের জ্বলন্ত মোমবাতিগুলো কাৎ হয়ে পড়ে গেলো। গোল ঘরটা বন বন করে ঘুরতে লাগলো। হারমিওন হ্যারির হাতটা চেপে ধরলো। ওর ভয় হলো ঘরের ফ্লোরটাও চলতে শুরু করবে। কিন্তু তা হলো না, নীল আলোগুলো ধীরে ধীরে নিভে গেলে নিওন লাইটের মতো ঘরে আলো জ্বলে উঠে ঘরের দেওয়াল আলোকিত করে দিলো। গুরু গুরু শব্দ থেমে গিয়ে আবার সব নীরব থমথমে হয়ে গেলো। নীল হালকা মোমবাতির আলোয় দেখার খুব অসুবিধে, তবু ওরা কিছু দেখার আগ্রহে তাকিয়ে রইলো।

রন বললো, এমন হচ্ছে কেন?

জিনি বললো, কোন দরজা দিয়ে এ ঘরে আমরা ঢুকেছি সেটা বোধহয় ম্যাজিক অফিস জানতে দিতে চায় না।

হ্যারি বুঝতে পারলো জিনির কথা ঠিক। বাইরে বেরুবার অনেক দরজা। কালো কুচকুচে পাথরের ফ্লোরে কালো পিঁপড়ে খোজার মতো ওর অবস্থা অনেকটা। কিন্তু সিরিয়স, সিরিয়স কোথায়?

নেভিলের মুখ শুকিয়ে গেছে, কোন দরজা দিয়ে আমরা বেরুবো? হ্যারির চোখের সামনে যে নীল নীল আলোর রেখা পড়েছিলো চোখ পিট পিট করে সেগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করলো। হাতের দণ্ডটা শক্ত করে চেপে ধরলো। বললো, সিরিয়সকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এখান থেকে আমরা একচুলও নড়ছি না।

–ওর নাম নিওনা, হারমিওন বললো।

হ্যারি কারও পরামর্শ চায় না। ও যা করতে এসছে তা শেষ না করে যাবে না। তাই চুপ করে রইলো হারমিওনের কথা শুনে।

রন বললো, তা হলে আমরা কোনদিকে যাবো হ্যারি?

–আমি জা…, হ্যারি বলতে গিয়ে থেমে গেলো। তারপর টোক গিলে বললো, স্বপ্নে আমি করিডোর দিয়ে কালো দরজা খুলে গেলে একটা ঘরে ঢুকেছিলাম, ঘরটা অন্ধকার ছিলো, এই সেই ঘর। তারপর আর একটা খুব চকচকে দরজা দিয়ে অন্য একটা ঘরে গিয়েছিলাম। এসো আমরা কয়েকটা দরজা খুলি। দরজা খুলে দেখলে বুঝতে পারবো কোন ঘরে ঢুকে ছিলাম, এসো।

যে দরজাটা ওর সামনে ছিলো সেদিকে এগুলো। ওর সঙ্গে সঙ্গে বন, হারমিওন, জিনি, নেভিল আর লুনা চললো। তারপর ও সেই ঠাণ্ডা চকচকে দরজায় হাত দিলো, ডান হাতে ম্যাজিক ওয়ান্ডটা তুলে দরজায় ঠেলতেই বন্ধ দরজা হুট করে খুলে গেলো।

দেখলো সেই ক্ষেত্রাকার (রেক্ট অ্যাংগুলার) ঘরটা মোটামুটি আলোকিত। ঘরের সিলিং থেকে সোনার চেন দিয়ে আলো জ্বলছে। স্বপ্নে কিন্তু ঘরটা অতি উজ্জ্বল দেখেছিলো। ঘরের বাতিগুলো নিভু নিভু হয়ে আবার জ্বলে উঠছিলো অনেকটা ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েসনের মতো। ঘরটায় কয়েকটা ডেস্ক রয়েছে। ঘরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটা বেশ বড়ো মাপের গোল কাঁচের ট্যাংক, তার মধ্যে রয়েছে সবুজ জলের মতো কিছু। এত বড়ো জলাধার যে তার মধ্যে নেমে ওরা সাঁতরাতে পারে–জলের ওপোর মুক্তোর মত কিছু সাদা সাদা জিনিস ভাসছে।

রন বললো, জলের ওপোর ওগুলো কি ভাসছে? হ্যারি বললো, বলতে পারছিনে। জিনি বললো, ওগুলো মাছ?

লুনা বললো, একোয়াভিরিটাস ম্যাগটস! বাবা বলেছেন মিনিস্ট্রি ওগুলো ব্রিড করায়।

হারমিওন বললো, না ওগুলো তা নয়। কথাটা বলে জলের ধারে গিয়ে একটা পাপড়ি তুলে বললো–না, এগুলো মানুষের টুকরো টুকরো ব্রেইন!

–ব্রেইন! ওরা এগুলো এখানে রেখে কি করে? আশ্চর্য!

হ্যারি ট্যাংকের খুব কাছে গিয়ে একটা টুকরো তুলে বললো–না, হারমিওন কোনও ভুল করেনি।

সেই সাদা টুকরোগুলো মাঝে মাঝে সবুজ জলের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে, আবার ভেসে উঠছে। তখন ওগুলোকে অনেকটা ভেজা ভেজা ফুলকপির টুকরো মনে হয়।

হ্যারি বললো, মনে হয় এই ঘরটা নয়, চলো আমরা অন্য একটা ঘরে যাই। ওরা অন্য একটা ঘরে ঢুকলো।

আবার ওরা সেই অন্ধকার গোলাকার ঘরেই ফিরে এলো। হ্যারির চোখে তখন মোমবাতির নীল আলো, আর কাঁচের বড় টবের ওপোর ব্রেনের টুকরোগুলো ভেসে বেড়াতে লাগলো।

লুনা ভাসমান ব্রেনের টুকরোর ঘরের দরজাটা বন্ধ করতে যাবে সেই সময় হারমিওন বললো, বন্ধ করো না, ফ্লেগরেট!

হারমিওন ওর ম্যাজিক ওয়ান্ড শূন্যে তুলে ধরতেই জ্বলন্ত এক্স দরজার গায়ে ফুটে উঠলো। দরজাটা বন্ধ করতেই আবার কানে এলো গুরু গুরু শব্দ। সবকিছু কাঁপতে লাগলো, ঘুরতে লাগলো। এখন সেই হালকা নীল আলোর সঙ্গে টকটকে লাল-সোনালী আলো ফুটে উঠলো, তারপর সব শান্ত হয়ে গেলে। সেই আগুনের মতো ক্রসটা জুলতে লাগলো দরজার গায়ে। ওরা বুঝলো সেই ঘরে ঢোকার আর প্রয়োজন নেই।

–খুব ভালো, এসো আমরা অন্য একটা ঘরে যাই।

ঠিক আগের মতোই জাদুদণ্ড স্পর্শ করাতে ঘরের দরজা খুলে গেলো। সকলেই জাদুদণ্ড তুলে সেই ঘরে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো।

সেই ঘরটা আগের ঘরের চাইতে বড়ো। নিষ্প্রভ আলো, ঘরটা রেক্টএ্যাংগুলার। ঘরের মাঝখানটা ভেঙে বসে গেছে। কম করে কুড়ি ফিট গর্তের সৃষ্টি করেছে। তার চারধারে পাথরের বেঞ্চ সাজানো, অনেকটা অ্যাম্পিথিয়েটারে যেমন সাজানো থাকে। পেনসিভের মধ্যে এইরকম কোর্ট রুমের ঘর, হ্যারি দেখেছিলো। সেই গর্তের মাঝখানে লোহার চেনে বাধা চেয়ারের বদলে রয়েছে পাথরের ডায়াস। সেই ডায়াসের চারধারে পাথরের ধুনকাকৃতি ছাদ। দেখে মনে হলো হাজার হাজার বছরের পুরনো, অতীতের, এমনি অবস্থা যেকোনও সময়ে ভেঙে পড়তে পারে। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই আর্চওয়ের কোনও সাপোর্ট নেই, মনে হয় শূন্য থেকে ঝুলছে। তার চারধারটা কালো পরাতে ঢাকা। ঘর নীরব-নিস্তব্ধ, কোথাও হাওয়ার রেশমাত্র নেই। তবু সেই কালো পর্দাঢাকা ঘরটার পর্দা মৃদু মন্দ কাপছে। মনে হয় কেউ যেনো সবে মাত্র সেটা ঠেলে ভেতরে ঢুকেছে।

হারমিওন বললো–সাবধানে হাঁটাচলা করবে!

হ্যারি সেই গর্তের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গর্তের শেষ প্রান্তে পৌঁছলো। ওর ডায়াসের দিকে যাবার সময় পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। গর্তের তলদেশ থেকে সেই ডায়াস আর তার আর্চওয়ের দিকে মুখ তুলে তাকাতেই মনে হলো অনেক উঁচুতে সেটা রয়েছে। দেখলো তখনও সেই কালো পর্দা থর থর করে কাঁপছে।

ও মুখ তুলে খুব আস্তে আস্তে ডাকলো, সিরিয়স? ওর মনে হলো কেউ যেনো ডানধারে সেই ডায়াসের পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও হাতের ম্যাজিক ওয়ান্ডটা শক্ত করে চেপে ধরে ডায়াসের চারধারটা খুঁজেও কাউকে দেখতে পেলো না। দেখলো শুধু ঘরের মধ্যে কে আছে জানে না। জীর্ণ কালো পর্দাটা মৃদু মৃদু কাপছে।

হারমিওন সেই সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেকটা নেমে হ্যারিকে বললো–হ্যারি চলে এসো, এখান থেকে আমরা অন্য কোথাও যাই।

হারমিওন ভয় পেয়েছে, জলের উপর ব্রেনের টুকরো ভাসতে দেখে ভয়ের চেয়েও বেশি ভয়। হ্যারি অতি পুরনো হলেও, অতি পুরাতন সেই ডায়াস আর আর্চওয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।

হ্যারিকে, হারমিওন আরও একটু জোর দিয়ে আবার ডাকলো–সব ঠিক আছে, চলো আমরা এখান থেকে অন্য কোথাও যাই।

হ্যারি বললো, ওকে, কিন্তু যেখানে ও দাঁড়িয়েছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। ওর কানে আসছে পর্দার অন্তরাল থেকে অস্পষ্ট ফিসফিসানি বিড়বিড়ানির শব্দ।

তোমরা কি বলছো? হ্যারি খুব জোরে বললো, এতো জোরে যে ওর কথা সমস্ত পাথরের বেঞ্চ, ডায়াস, আর্চওয়েতে আঘাত লেগে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো।

হারমিওন বললো–কেউ তো কিছু বলছে না হ্যারি! কথাটা বলে হারমিওন সিঁড়ি দিয়ে হ্যারির কাছে যাবার জন্য নিচে নামতে লাগলো।

–পর্দার পেছন থেকে কেউ কিছু বলে চলেছে হারমিওন। হ্যারি সরে গিয়ে পর্দার দিকে ভুরু কুঁচকে বললো। রন তুমি কি করছো, কিছু কথা শুনতে পাচ্ছো?

 আর্চওয়ের এক ধারে গিয়ে রন বললো, বন্ধু আমি তো এই দিকে রয়েছি, কিছুতো শুনতে পাচ্ছি না।

সেই বিড়বিড়ানি, ফিসফিস শব্দ চতুগুন হয়ে ওর কানে আসতে লাগলো। হ্যারি বললো, আশ্চর্য! তোমরা কেউ কেন শুনতে পাচ্ছো না, আমি তো পাচ্ছি।

তারপরই ও দেখলো আর্চওয়ের সংলগ্ন ডায়াসে ও দাঁড়িয়ে রয়েছে। কখন সেখানে গেছে জানে না।

লুনা আর্চওয়ের পর্দার দিকে তাকিয়ে বললো, হুঁ হ্যারি, আমি তো শুনতে পাচ্ছি।

ওরা সকলে সেই কম্পিত পর্দার সামনে দাঁড়ালো। লুনা বড় দেখে একটা শ্বাস ফেলে বললো–আমি তো শুনতে পাচ্ছি, ওর ভেতরে কেউ আছে! হ্যারি, আমি ছাড়া তোমরা কেন শুনতে পাচ্ছো না?

প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাগত স্বরে হারমিওন সিঁড়ির শেষধাপে দাঁড়িয়ে বললো, কেউ ওর ভেতরে নেই। ওটা একটা আর্চওয়ে। ওখানে কোনও ঘর নেই যে কেউ থাকতে পারে। হ্যারি, আর সময় নষ্ট না করে উপরে উঠে এসো।

হারমিওন হ্যারির একটা হাত ধরে সজোরে টান দিতেই। হ্যারি ওর হাতটা টেনে নিলো।

–হ্যারি আমরা এখানে সিরিয়সকে খুঁজতে এসেছি, হারমিওন আরও জোরে টান দিয়ে খানিকটা বিকৃতভাবে বললো।

–সিরিয়স; হ্যারি আবার বললো, তখনও হ্যারি পর্দার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সেই কাঁপা কাঁপা জীর্ণ কালো পরদা ওকে যেন সম্মোহিত করেছে।

ও বুঝতে পেরেছে সিরিয়সকে ভেতরে কেউ ধরে রয়েছে, বেঁধে রেখে নির্যাতন–অত্যাচার করে চলেছে ঠিক স্বপ্নের মতো। ও আর্চওয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।

ও ডায়াস থেকে কয়েক পা পিছিয়ে এসে পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে বললো, চলো, আমরা যাই।

হারমিওন বললো, এই একটা কথা তো তোমাকে বার বার বলছি হ্যারি, নাও, আর দেরি নয়, চলো।

ওরা সকলে হাত ধরাধরি করে গর্তের সিঁড়ি দিয়ে এসে বেঞ্চের কাছে জড়ো হলো।

তারপর সেই অন্ধকার গোলাকার ঘরে ঢুকে হ্যারি, হারমিওনকে বললো, ওই আর্চটা সম্বন্ধে তুমি কী বুঝলে হারমিওন?

–জানি না, তবে যাই হোক না কেন, আমার মনে হয় ওটা খুবই ভয়ের, ভয়ঙ্কর।

ঘরের দরজাটা বন্ধ করতেই দরজার গায়ে ক্রসটা জ্বল জ্বল করে উঠলো, ঘরটা সামান্য কেঁপে উঠলো। তারপর স্তব্ধ হয়ে গেলো কাঁপুনি। হ্যারি কোনও বাছ-বিচার না করে ঘরের অন্য একটি দরজা ঠেললো। দরজাটা খোলা গেলো না।

হারমিওন বললো, কী ব্যাপার খোলে না কেন?

হ্যারির গায়ে যত শক্তি আছে তা দিয়ে দরজাটায় চাপ দিল কিন্তু বন্ধ দরজাটা খোলা গেলো না। হ্যারি বললো–মনে হয় ভেতর থেকে বন্ধ আছে।

রন হ্যারির সঙ্গে একযোগে ধাক্কা দিলো তবু সেই বন্ধ দরজা খুলতে পারলো।

–দারুণ তো! হারমিওন বললো–তোমরা সরো। কথাটা বলে তালার ছিদ্রতে ওর জাদুদণ্ড ঠেকালো। বললো–অ্যালোহোমারা!

কিন্তু সেই বন্ধ দরজা খুললো না।

–সিরিয়সের ছুরি! হ্যারি রোবের পকেট থেকে সিরিয়সের উপহার দেওয়া ছুরিটা বার করে দেয়াল আর দরজার জোড়ে ঢোকালো। সকলে দেখতে লাগলো হ্যারি প্রবল বিক্রমে দরজা আর দেওয়ালের সামান্য ফাঁকে ছুরিটা ঘোরাচ্ছে। কিন্তু শত চেষ্টাতেও একটুও নড়াতে পারলো না। তারপর আবার কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিলো। আগের মতো পাকাপোক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো বন্ধ দরজা। আরও অদ্ভুত ব্যাপার, হ্যারি ছুরিটা আলখেল্লার পকেটে রাখতে গিয়ে দেখলো ছুরির মুখটা গলে গেছে।

–ঠিক আছে, এই ঘরটা ছাড়ো, অন্য ঘরে যাই, হারমিওন পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়ে বললো।

রন বন্ধ ঘরটার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখতে পাবার আশায় বললো, কিন্তু এটা যদি সেই ঘর হয়?

হারমিওন বললো–হতে পারে না। স্বপ্নেতে হ্যারি সব ঘর দেখেছে। হারমিওন দেখলো দরজায় ক্রস জ্বল জ্বল করছে।

লুনা বললো–তোমরা কি বলতে পারো ওই ঘরে কী আছে? ঘরটা আবার দুলে দুলে উঠলো।

হারমিওন দম বন্ধ করে বললো, কোনো সন্দেহ নেই, ঘরের ভিতর কিছু একটা ঘটঘট শব্দ হচ্ছে। নেভিল কথাটা শুনে ভয়ে ভয়ে হাসলো।

দেয়ালের ও ঘরের কম্পন বন্ধ হয়ে গেলে হ্যারি হতাশ না হয়ে অন্য একটি দরজায় ঘা দিল। দরজাটা খুলে গেলো।

–হ্যাঁ এতো সেই ঘর!

স্বপ্নে যা দেখেছিলো সেই রকম ঘর। আলোতে উদভাসিত, হিরের মতো আলো জ্বল জ্বল করছে, আলোর রশ্মি নাচছে। চোখ ঝলসে যাওয়া ঘর। একটু একটু করে ওর কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেলা। চারধারে অনেক ছোটো–বড়ো ঘড়ি। পুরনো দিনের নানা রকম শৌখিন জিনিস রয়েছে কাঁচের আলমারিতে। বইয়ের তাক আরও অনেক কিছু। বিরাট একটা ক্রিস্টাল বেলজার রয়েছে ঘরের এক কোণে। সেইখানে আলো পড়ে, চতুৰ্গন হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সেই আলো।

–এই দিকে!

হ্যারির উত্তেজনায় বড়ো বড়ো শ্বাস পড়তে লাগলো। ও জানে ঠিক জায়গায় এসে গেছে।

জিনি অবাক হয়ে দেখলো সেই কাঁচের জারে মজার মজার সব কাণ্ডকারখানা হচ্ছে। জারের মধ্যে রয়েছে ছোট একটা পাখির ডিম। ডিমটা যখনই জারের ওপোর দিকে উঠছে তখন ধাক্কা লেগে ফেটে যাচ্ছে। তখন তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে পড়ছে একটা ছোট পাখি। পাখিটা শিস দিচ্ছে। তারপর জারের তলায় পড়ে গেলে ওর পালকগুলো সিক্ত হয়ে যাচ্ছে, ভারি হয়ে যাচ্ছে। আবার সেটা ডিম হয়ে পুরনো অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।

জিনিকে সেই আলো বিচ্ছুরিত জারের সামনে দাঁড়াতে দেখে হ্যারি সকলকে এগিয়ে যাবার জন্য তাড়া দিল, চলো চলো, এখানে দাঁড়াবে না।

জিনি মুখ ভার করে বললো–তুমি তো ডায়াস আর আর্চওয়েতে কতো সময় নষ্ট করলে। ও বেলজারের পেছনের দরজার কাছে দাঁড়ালো।

–হ্যাঁ এই সেই জায়গা! হ্যারির বুকের ভেতরটা উত্তেজনায় এতো বেশি ওঠানামা করতে লাগলো যে সে কথা বলতে পারছে না।

হ্যারি সকলের মুখের দিকে তাকালো। সকলেই হাতে নিয়েছে জাদুদণ্ড। সবারই মুখ গম্ভীর ও দারুণ উত্তেজনা।

হ্যারি একবার পেছনে তাকিয়ে দরজাটা ঠেললো। জায়গাটা খুঁজে বার করেছে। চার্চের সমান দীর্ঘ ঘরে কিছুই নেই, রয়েছে উঁচু উঁচু তাক। তাকে রয়েছে ধূলি ধূসরিত ছোটো ছোটো কাঁচের গোলক। সেই কাঁচের গোলকগুলোতে মোমবাতির আলো পড়ে মাঝে মাঝে চকচক করে উঠছে। মোমবাতিগুলো পিছনের গোলাকার ঘরের মতো জ্বলছে, তার থেকে নীল রশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। ঘরটা অসম্ভব ঠাণ্ডা।

হ্যারি দুসারি তাকের মাঝের সরু জায়গা দিয়ে এগিয়ে গেলো। ওর কানে কিছুই আসছে না, কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, সব কিছু অনড়-অচল।

হারমিওন খুব আস্তে বললো–তুমি বলেছিলে সারি নং সাতানব্বই। –হ্যাঁ, শেষ সারির দিকে তাকিয়ে হ্যারি বললো। নীল রশ্মি বিচ্ছুরিত মোমবাতির তলায় রূপালী সংখ্যায় লেখা চুয়ান্ন। হারমিওন বললো–আমাদের যেতে হবে হ্যাঁ, চুয়ান্নতে, এটাই চুয়ান্ন। হ্যারি সংযত স্বরে বললো, তোমার দণ্ড প্রস্তুত করে রাখো।

ওরা তাকের ফাঁকের রাস্তা দিয়ে মাথা নিচু করে চলতে চলতে শেষ সীমায় পৌঁছলে অন্ধকার দেখলো। বলতে গেলে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। ওরা চুড়াশি, পঁচাশি সারি ছেড়ে গেলো। হ্যারির কানে সামান্য চলা-ফেরার শব্দ হলো, সিরিয়স? তাহলে কী সিরিয়সকে গলাটিপে মেরে ফেলেছে? অথবা অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছেন?

–সাতানব্বই, হারমিওন বললো। সেখানে কেউ নেই, ফাঁকা।

সত্তেজয় হ্যারির গলা শুকিয়ে গেছে। বললো শেষের দিকে আছেন, তোমরা এখান থেকে ভালো করে দেখতে পাবে না।

হ্যারি ওদের নামিয়ে রাখা কাঁচের বলের পাশ দিয়ে আরও এগিয়ে গেলো। কাঁচের বলগুলোর কোনো কোনোটা আলো লেগে চমকাচ্ছে। কিছু ম্লান হয়ে রয়েছে। শেষ যেনো হয় না। ওরা একটা জায়গায় পৌঁছলো, কিছু কিছু মোমবাতি জ্বলছে, কিন্তু সেখানটাও ফাঁকা। শুধু তাদের চলার শব্দের প্রতিধ্বনি, আর কোন শব্দ নেই।

অন্য একটা গলির মুখে গিয়ে হ্যারি বললো, এখানে থাকতে পারেন। অন্য গলির দিকেও তাকালো, ওদিকেও থাকতে পারেন।

–হ্যারি! হারমিওন খুব আস্তে আবার বললো। –বলো। –আমার মনে হয় সিরিয়স এখানে নেই।

কারও মুখে কথা নেই। হ্যারি কারও দিকে তাকাতে চায় না। ওর দারুণ দুর্বলতা লাগছে, মনে হয় খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিছুতেই বুঝতে পারছে না সিরিয়স এই জায়গা থেকে কোথায় গেলেন। এখানেই তো তার থাকার কথা। এখানেই তো ছিলেন, হ্যারি স্বপ্নে দেখেছে তাকে।

হ্যারি আরও একটু বলতে গেলে দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে দেখলো কোথাও সিরিয়সের চিহ্ন নেই।

–হ্যারি? রন ডাকলো। –বলো।

হ্যারি কারও কথা শুনতে চায় না। কারও কথাতে সিরিয়সকে আবিষ্কার না করে হোগার্টসে কিছুতেই ফিরে যাবে না। এই গাঢ় অন্ধকারে চুপ করে বসে অপেক্ষা করবে, বন্ধুদের ক্ষেপ ও বরদাস্ত করবে না। রন ওধার থেকে বললো, হ্যারি এটা দেখেছো?

–কী?

–এটাতে দেখছি তোমার নাম লেখা রয়েছে।

হ্যারি রনের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো। রন হ্যারিকে ছোট্ট একটা কাঁচের গোলক দেখালো, তার ভেতরটায় আবছা আবছা আলো। তাহলেও বহু বছর সেটাকে কেউ ছোঁয়নি, ধূলো-ময়লা পরিষ্কার করাতো দূরের কথা।

–কী বললে আমার নাম? হ্যারি ভাসাভাসাভাবে বললো।

হ্যারি এগিয়ে এসে দেখলো গোলকের মধ্যে হলুদ হয়ে যাওয়া ওর নাম। আঁকা বাঁকা কিছু লেখা রয়েছে। প্রায় ষোল বছর আগের তারিখও রয়েছে।

এস.পি.টি টু এ.পি.ডব্লিউ.বি.ডি

ডার্ক লর্ড এবং (?) হ্যারি পটার

হ্যারি স্থির চোখে কাঁচের ভেতরে সেই লেখাটা ভালো করে দেখতে লাগলো।

–ওটা কী? ওর মধ্যে তোমার নাম লেখা রয়েছে কেন? রন কাঁপা কাঁপা গলায় ব্যাপারটা বুঝতে চাইলো।

–বলতে পারছি না। আমরা তো এখানে আসিনি। হ্যারি উৎকণ্ঠিত গলায় বললো।

হ্যারি সেটা ধরবার জন্য হাত বাড়াতে যাবে, হারমিওন বাধা দিলো, হ্যারি আমার মনে হয় ওটা তুমি ছোবে না।

–বাঃ ছোঁবো না কেন? আমার ব্যাপারে কিছু লেখা আছে।

–না, হ্যারি তুমি ওটাতে হাত দিও না, নেভিল সহসা বললো। হ্যারি ওর মুখের দিকে তাকালো। নেভিলের গোল মুখটা চকচক করছে, সামান্য ঘামছে। দেখে মনে হয় ও অনিশ্চয়তা বরদাস্ত করতে পারছে না।

হ্যারি বললো, কেন? ওতে তো আমার নাম লেখা আছে।

হ্যারি অস্থির চিত্তে সেই ধূলি-ধূসরিত কাঁচের বলে আঙ্গুল ছোঁয়ালো। ছোঁবার আগে ভেবেছিল বহুবছর পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে থাকার জন্য ওটা ঠাণ্ডা বরফের মত। হবে। কিন্তু তা নয় বেশ গরম। মনে হয় প্রখর সূর্যের তাপে এটা রাখা ছিল। ওরা এখানে আসবার আগে তুলে এনে কেউ রেখেছে।

আবার ভাবলো, হতে পারে ভেতরে আলো জ্বলছে তাই গরম হয়ে রয়েছে।

হ্যারি ঠিক করলো, আর অপেক্ষা নয়। সময় এসেছে, নাটকীয় কারও কোনো সাবধান বাণী শুনতে ও রাজি নয়।

হ্যারি তাক থেকে বলটা তুলে নিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু বোঝবার চেষ্টা করলো।

কিন্তু কিছুই হলো না। বন্ধুরা কাঁচের বলটা দেখার জন্য ওকে ঘিরে ধরলো।

কে যেনো পেছন থেকে টান টান গলায় বললো–ভালো, খুব ভালো, পটার। এখন পেছনে তাকাও, এবার ওটা আমার হাতে দাও।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *