২৫. দ্য বীটল অ্যাট বে

২৫. দ্য বীটল অ্যাট বে

পরের দিন সকালে হ্যারি তার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলো। হারমিওন রোজকার মতো ডেইলি ফেটের প্রথম পাতাটা দেখেই সরবে আঁতকে উঠলো। ওর তীক্ষ্ণকণ্ঠের শব্দে কাছে যারা বসেছিল সচকিত হয়ে গেলো।

–কী ব্যাপার? হ্যারি ও রন সমস্বরে বলে উঠলো।

হারমিওন খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠাটা ওদের দিকে এগিয়ে দিলো। ওরা দেখলো দশটি সাদা-কালো ছবি। প্রতিটি ছবির তলায় তাদের নাম অপরাধ ও শাস্তির কথা সংক্ষেপে লেখা রয়েছে। দশটি ছবির মধ্যে নটি জাদুকরের বাকি একটি জাদুকরির। তাদের সবাইকে আজকাবান কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অ্যান্টোনিও ডলোহভকে দেখে হ্যারির মনে হলো ওর দাঁত-মুখ খিচিয়ে রয়েছে, বিশ্রী মুখ। ছবির নিচে লেখা, গিডিয়ন ও ফেবিয়ন প্লেওয়েটকে নৃশংসভাবে হত্যার অপরাধে দণ্ডিত।

অ্যালজারনন রুকউডের মুখে বসন্তের দাগ, মাথার চুল তৈলাক্ত, মুখে-চোখে বিতৃষ্ণার ছাপ। ছবিটির নিচে লেখা, হি-হুঁ যার নাম অবশ্যই ব্যক্ত করা যায় না, তার কাছে মিনিস্ট্রি অফ ম্যাজিক থেকে গোপন তথ্য পাচার করার অপরাধে দণ্ডিত।

হ্যারির দৃষ্টি পড়লো জাদুকরীর ছবিতে। ছবির দিকে তাকাতেই মনে হলো ও ড্যাব ড্যাবে চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। জাদুকরির মাথায় লম্বালম্বা কালো চুল, পরিচ্ছন্নতার অভাব। চোখে-মুখে বিশ্রী হাসির ছাপ হলেও দেখতে সুশ্রী সন্দেহ নেই। তার মুখের আদল সিরিয়সের সঙ্গে মেলে। আজকাবানে পাঠানোর আগে ছবিটি তোলার জন্য তার সৌন্দর্য বহুলাংশে ম্লান হয়ে গেছে। বেল্লাট্রিক্স লেস্টরেজ্ঞ

ফ্রাঙ্ক এবং অ্যালিস লংবটমের ওপোর অত্যাচার এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম করার জন্য দণ্ডিত।

হারমিওন হ্যারিকে কনুইয়ের খোঁচা মেরে ছবিটির ওপর ভাগে বড় বড় অক্ষরে শিরোনামের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো। হ্যারি, বেল্লাট্রিকসের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য শিরোনাম লক্ষ্য করেনি।

দলে দলে আজকাবান কারাগার থেকে পলায়ন
মন্ত্রণালয় চিন্তিত ও ভাবিত 
তারা মনে করে ব্ল্যাক হইতেছে বৃদ্ধ ডেথ ইটারদের কেন্দ্র বিন্দু

ব্ল্যাক? হ্যারি সরবে বললো, হতেই পারে না।

হারমিওন ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে শু শব্দ করে জোরে জোরে কথা বলতে নিষেধ করলো। আস্তে পড়ো।

ম্যাজিক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে গভীর রাতে আজকাবান কারাগার থেকে দলে দলে কয়েদী পালিয়েছে।

কর্নেলিয়স ফাজ (ম্যাজিক মন্ত্রণালয়) তার ব্যক্তিগত দপ্তর থেকে সংবাদদাতাদের জানিয়েছেন, যে দশজন বিশেষ নিরাপত্তার অধীনে বন্দি ছিল গতকাল সন্ধ্যাবেলায় তারা জেল ভেঙে পালিয়েছে, এবং তিনি মাগল প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিটি বন্দিদের বিপজ্জনক কার্যকলাপ সম্বন্ধে অবগত করেছেন।

আড়াই বছর পূর্বে ঠিক একইভাবে খুনি সিরিয়স পালিয়েছে। গতরাতে ফাজ জানিয়েছেন, আমরা মানতে রাজি নই যে ওই দুইজনের জেল ভেঙে পলায়ন ভিন্ন। প্রকারের। বাইরের মদৎ ছাড়া, ওইরকম বিরাট আকারের পলায়ন সম্ভবপর নয়। এইরকম পলায়ন অবশ্যই আমাদের মনে করিয়ে দেয় আজকাবান জেল ভেঙে পলায়নের প্রথম বন্দি সিরিয়স ব্ল্যাকের কথা। তাকে বলা যায়, এক সুনিপুণ বন্দি, যার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্যেরা পালিয়েছে। ওই দশজনের মধ্যে রয়েছে বেল্লাট্রিক্স লেস্টরেঞ্জ, ব্ল্যাকের খুড়তুতো বোন। তারা ব্ল্যাককে স্বাভাবিক কারণে নেতা মনে করে। যাইহোক আমরা অপরাধীদের ধরার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছি ও আমরা জাদুকর সম্প্রদায়কে সতর্ক ও সাবধানে থাকার অনুরোধ করছি। কোনো কারণেই যেন ওইসব অপরাধীদের সাহায্য না করা হয়।

এইবার বুঝতে পেরেছো হ্যারি, গতকাল তিনি কেন এতো আনন্দে বিভোর ছিলেন? রন জিজ্ঞাসুনেত্রে হ্যারির দিকে তাকিয়ে বললো।

–আমি একটুও বিশ্বাস করি না, হ্যারি মুখ বিকৃত করে বললো। জেল ভাঙ্গার দোষ ফাজ সিরিয়সের ঘাড়ে চাপাচ্ছেন।

হারমিওন তিক্ত স্বরে বললো, এছাড়া ফাজের আর কি যুক্তি থাকতে পারে? বলতে পারে, আমি অতিশয় দুঃখিত। ডাম্বলডোর অবশ্য আমাকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, এমন একটা কিছু ঘটতে পারে, কারণ আজকাবানের গার্ডেরা লর্ড ভোল্টেমর্টের দলে যোগ দিয়েছে।

রন ওদের সতর্ক করে দিয়ে বললো–এখন এসব কথা না বলাই ভাল। চুপ করে থাকো, ভোল্টেমর্টের বদমাস অনুচরেরা জেল ভেঙে কেটে পড়েছে। গত ছ মাস ধরে ফাজ বলে চলেছেন তুমি আর ডাম্বলডোর মিথ্যাবাদী! তাই না?

হ্যারি গ্রেট হলের চতুর্দিক দেখতে লাগল, হারমিওন কাগজটার ভেতরের খবর পড়তে শুরু করলো। ওর মাথায় ঢুকছে না, খবরটা জেনে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা কেন ভয় পাচ্ছে না, অথবা খবরটা সম্বন্ধে কোনও আলোচনা না করে দিব্যি বসে বসে আড্ডা মারছে। কিন্তু ওদের সংখ্যা খুবই কম, যারা হারমিওনের মতো প্রত্যহ খবরের কাগজ কেনে আছে বা পড়ে। ওরা কিডিচ খেলা, হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত। ওরা কী জানে না আরও দশটি ডেথইটার ভোল্টেমর্টের দলে যোগ দিয়েছে?

হ্যারি স্টাফ টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলো ডাম্বলডোর আর প্রফেসর ম্যাকগোনাগল গভীরভাবে কথাবার্তা বলছেন। তাদের কাছে খবরটা অন্যরকম। দুজনেরই মুখ খুব গম্ভীর। প্রফেসর স্প্রাউট খবরের কাগজ এমন মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন যে প্লেট থেকে অর্ধসেদ্ধ ডিমের কুসুম তার গায়ে টপ টপ করে পড়ে চলেছে। প্রফেসর আমব্রিজ একবাটি ভর্তি পরিজ খেতে ব্যস্ত। একবারও তিনি তার ব্যাঙের মত ড্যাবড্যাবে চোখ দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের দুষ্টুমি দেখছেন না। খাচ্ছেন আর মাঝে মাঝে ডাম্বলডোর, ম্যাকগোনাগলের দিকে মুখ তুলে তাকাচ্ছেন।

–ওহো, এটাতো চোখে পড়েনি, হারমিওন খবরের কাগজ থেকে মুখ না সরিয়ে বললো।

–কী চোখে পড়েনি? হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে বললো।

–সত্যি সাংঘাতিক, হারমিওন উৎকণ্ঠিত হয়ে বললো। ও কাগজের দশনম্বর পাতাটা মুড়ে এগিয়ে দিলো হ্যারি আর রনের দিকে।

ম্যাজিক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মির মর্মান্তিক মৃত্যু

ম্যাজিক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মী ব্রডরিক বোডে-৪৯ কে গতরাতে তার বেডের ধারে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে একটি পট প্ল্যান্টের সাহায্যে। সেন্ট মাংগোস হাসপাতাল তার হত্যার ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান করার আশ্বাস দিয়েছেন।
দেখা মাত্র হিলারদের ডাকা হয়েছিলো কিন্তু তারা মি বোডেকে অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেনি। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পূর্বে তাকে তার কর্মস্থান থেকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
হিলার মিরিয়ম স্ট্রাউট, যার দায়িত্বে মি. বোডকে রাখা হয়েছিলো তাকে পূর্ণ বেতনসহ বিলম্বিত করা হয়েছে। তাকে এই রিপোর্ট লেখার সময় হাসপাতাল চত্বরে দেখতে পাওয়া যায়নি, কিন্তু হাসপাতালের পক্ষ থেকে এক মুখপাত্র বলেছেন:
সেন্ট মাংগোস মিঃ বোডের এই দুঃখজনক মৃত্যুর জন্য গভীর শোক জানাচ্ছে। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তার দৈনন্দিন স্বাস্থ্যের একটু একটু উন্নতি হচ্ছিলো। আমাদের প্রতিটি ওয়ার্ডে যে সমস্ত হিলার ডিউটিতে থাকেন, তাদের সব সময় সজাগ থাকার নির্দেশ দেওয়া থাকে। কিন্তু মনে হয়, হিলার স্ট্রাউট, ক্রিসমাসের জন্য সামান্য ব্যস্ত থাকলেও কোন রকম বিপদের সম্ভাবনা দেখে পট প্ল্যান্টটি মি. বোডের বেডের পাশে রেখেছিলেন। মি. বোডের কথাবার্তা ও চলাফেরায় উন্নতি লক্ষ্য করে হিলার স্ট্রাউট তাকে প্ল্যান্টটি দেখাশুনো করতে দিয়েছিলেন ভাবতেই পারেননি সেটি ক্ষতিকারক ফ্রিটারবুম হতে পারে। কিন্তু সেটা ছিলো শয়তানের ফাঁদ। সেটি মি. বোডে স্পর্শ করতেই শয়তান গলাটিপে তাকে হত্যা করে।
সেন্ট মাংগোস এখনও পর্যন্ত জানে না সেই মারাত্মক প্ল্যান্ট কে বা কারা ওয়ার্ডে এনেছিলো। এখন হাসপাতাল সমস্ত জাদুকরদের অনুরোধ করছে, তারা যদি হত্যা সম্বন্ধে কিছু জানেন তাহলে জানাবার জন্য অনুগ্রহ করে এগিয়ে আসেন।

বোডে, নামটা যেনো চেনা চেনা, রন বললো।

–ওকে আমরা সেন্ট মাংগোসে দেখেছিলাম, মনে নেই? হারমিওন ফিস ফিস করে বললো। সেই যে লকহার্টের বেডের উল্টোদিকে বিছানায় শুয়ে ছাদের সিলিং এর দিকে তাকিয়েছিলো। শয়তানকেও আসতে দেখেছি, সেই হিলার বলেছিলো প্ল্যান্টটা নাকি ক্রিসমাসের উপহার।

হ্যারি এক মনে সেন্ট মাংগোসের কথা ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে অজানা এক আতঙ্ক ওকে পেঁচিয়ে ধরে।

–আশ্চর্য! আমরা শয়তানের ফঁদ দেখেও ধরতে পারলাম না।

রন বললো, দোষ আমাদের নয়, যে শয়তানটা বোডের কাছে পাঠিয়েছিলো তার দোষ। কেনার সময় তারা চেকআপ করেনি কেন!

হারমিওন বললো, ওহ রন এ নিয়ে আর আলোচনা নয়, আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে কেউ একজন ওই শয়তানের ফাঁদটা রেখে যাবে। আর প্ল্যান্ট পটটা যে স্পর্শ করবে তার মৃত্যু হবে? এটা নিছক খুন। খুনি খুবই চালাক। তাতে সন্দেহ নেই।

–কেউ যদি রেখে যেতো, তাহলে হসপিটালের স্টাফদের জানার উপায় নেই? হ্যারি তখন বোডের হত্যা সম্বন্ধে কিছু ভাবছিলো না। ও ভাবছিলো মিনিস্ট্রিতে হিয়ারিং-এ যাবার সময় নতলায় ওঠা লিফটের কথা। সেই বিষণ্ণ মুখের লোকটিকে যে সেদিন অ্যাট্রিয়ম লেবেলে উঠেছিলো।

ও বললো, হ্যাঁ আমি বোডেকে আগে দেখেছিলাম। হ্যাঁ দেখেছিলাম–তোমার সঙ্গে মিনিস্ট্রিতে যাবার সময়।

কথাটা শুনে রন হাঁ করে তাকিয়ে রইলো।

–আমিও বাবার মুখে বাড়িতে ওর কথা শুনেছি। ও বোবা ছিলো, মিস্ট্রিজ বিভাগে কাজ করতো।

হারমিওন ওদের মুখের দিকে ক্ষাণিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওদের কাছ থেকে প্রফেটটা টেনে নিয়ে, আবার সেই দশটি জেল পালানো ডেথ ইটারসদের ছবি দেখলো। তারপর যাবার জন্য দাঁড়ালো।

রন বললো, আরে কোথায় চললে?

হারমিওন হাতের ব্যাগটা দোলাতে দোলাতে বললো, চিঠি ফেলতে। আমার মনে হয়, একমাত্র আমিই বোডের হত্যাকারিকে ধরতে পারবো।

রন গোঁজ গোজ করতে করতে বললো, ও যখন এইসব কথা বলে তখন মেজাজ ঠিক থাকে না।

হ্যারি ও রন দুজনেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। রন বললো–দশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে আমাদের কি করতে চায় জানালে পারতো। হ্যাগ্রিড, হ্যাগ্রিড আমরা এখানে।

হ্যাগ্রিড গ্রেট হলের দরজার মুখে দাঁড়িয়েছিলেন। র‍্যাভেন ক্ল ছাত্র-ছাত্রীদের যাবার জায়গা থেকে সরে গেলেন। এখনও তার মুখে ক্ষতের ছাপ। নাকের ডগার পাশে নতুন একটা কাটা দাগ।

–বাঃ তোমরা..?

–হ্যাগ্রিড এখন কেমন আছেন?

–ভাল, খুউব ভাল। ভীতু ভীতু চেহারার প্রফেসর ভিক্টরের দিকে তাকালেন। খুব ব্যস্ত আছি, স্টাফ লেসন নিতে হচ্ছে। হাবিজাবি অপদার্থেরা সবাই প্রমোশন পাচ্ছে আর আমি এখনও শিক্ষানবিশ।

–আপনি এখনও শিক্ষানবিশ?

রন কথাটা বেশ জোর দিয়ে বললো। মতলব আরও অনেক ছাত্র ছাত্রীদের কথাটা শোনানো।

হলের অনেক ছাত্রছাত্রী ওদের দিকে তাকালো।

–হ্যাঁ, হ্যাগ্রিড বললেন। আচ্ছা চলি।

হ্যাগ্রিড সামনের দরজা দিয়ে পাথরের সিঁড়ির দিকে চললেন। তারপরেই ভেজা মাঠ পেরিয়ে নিজের কেবিনে যাবেন। হ্যারি হ্যাগ্রিডের দিকে তাকিয়ে রইলো। জানে না হ্যাগ্রিডকে আর কতো দুঃখের সংবাদ শুনতে হবে।

***

কয়েকদিনের মধ্যে স্কুলের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী জেনে গেলো হ্যাগ্রিড এখনও শিক্ষানবিশি প্রফেসর। হ্যারি দেখলো কোনও ছাত্রছাত্রীদের তার জন্য দুঃখ নেই, যেনো অতি সাধারণ ব্যাপার।

ম্যালফয় অবশ্য হ্যাগ্রিডের কথা শুনে একটুও দুঃখিত নয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীর সেন্ট মাংগাস হাসপাতালে হত্যার খবর রন, হ্যারি আর হারমিওনের মনে গেঁথে গেছে। ওরা খুবই চিন্তিত। তারপর করিডোরে ছাত্রছাত্রীরা একটি মাত্র বস্তু সম্বন্ধে আলোচনা করতে লাগলো। গুজব ছড়ালো কয়েকজন ডেথইটারকে এ্যাকিং শ্যাকে দেখা গেছে। ওরা গ্র্যাকিং শ্যাকে লুকিয়ে রয়েছে, সিরিয়স ব্ল্যাকের মত হোগার্টসে ঢুকে পড়বে। সুসান বোনস, ওর আঙ্কল, আন্ট আর কাজিনরা ওই দশটির মধ্যে কোনও একজনের হাতে খুন হয়েছে। হার্বোলজি ক্লাশে বললো হ্যারির মতো অবস্থা ওর ও।

আবার হ্যারি ছাত্রছাত্রীদের কাছে আলোচনার বিষয় হয়ে গেলো।

শুধু ছাত্র-ছাত্রী নয়, স্কুলের শিক্ষকরাও ডেথইটারদের জেল ভেঙে পলায়নের আলোচনা করতে লাগলেন, দুর্ভেদ্য আজকাবান কারাগার ভেঙে পালানো কি করে সম্ভব হলো?

হারমিওন বললো, আজকাল আর স্টাফ রুমে বসে প্রফেসররা খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন না। আমব্রিজ ওখানে বসে থাকলে সকলেই চুপ করে থাকেন।

নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।

হোগার্টসের উচ্চ পর্যায়ের তদন্তকারীর নির্দেশানুসারে

এতদ্বারা শিক্ষকদের অবহিত করা হইতেছে যে, ছাত্রছাত্রীদের যে বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য তাহাদের নিযুক্ত করা হইয়াছে তাহার বহির্ভূত কোনও বিষয়ে শিক্ষা এবং তথ্য সরবরাহ থেকে অবশ্যই বিরত থাকবে।
এই আদেশ এডুকেশনাল ডিক্রি নম্বর ছাব্বিশ অনুসারে প্রদত্ত হইল।
দস্তখত ডোলোরস জেন আমব্রিজ, উচ্চ তদন্তকারী।

আমব্রিজের উপরোক্ত নতুন আদেশ নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের নানা ঠাট্টা তামাশা, হাসির খোরাক শুরু হয়ে গেলো। ফাজের একনিষ্ঠ বান্ধবীর আদেশ সম্বন্ধে সকলেই বলাবলি করতে লাগলো, ম্যাজিক মন্ত্রণালয়ের খামখেয়ালিপনার সুযোগ নিয়ে আমব্রিজ যা খুশি তাই করছেন। ট্রিলনী ও হ্যাগ্রিডের মতো গুণী শিক্ষকদের নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য চূড়ান্ত অপমান ও হেনস্থা করেছেন। ডাম্বলডোর সব জেনেও নীরব রয়েছেন। আমব্রিজ সুযোগ বুঝে তলোয়ার ঘুরিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষকদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে মাথা গলাচ্ছেন।

হ্যারির ওপোর আমব্রিজের উন্মা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। তা চলুক, কিন্তু হ্যাগ্রিডের বাড়ি যাওয়া, সিরিয়সের চিঠিতে বাধাদান, ফায়ার বোল্ট, সব কিছুতেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি! সত্যি বলতে কি, সবমিলিয়ে হ্যারির হোগার্ট স্কুলের জীবন দুর্বিসহ করে তুললেন আমব্রিজ। আমব্রিজের প্রতি প্রতিশোধের একটি মাত্র পথ, ওর ডিএর কাজকর্ম দ্বিগুণ করা। হ্যারির সঙ্গে সকলেই একমত হলো।

জ্যাকেরিয়া স্মিথ আরও উৎসাহের সঙ্গে ডিএ ক্লাসে আসতে লাগলো। দশজন ডেথইটারদের জেল ভেঙে পলায়ন সকলকে রীতিমত ভয় পাইয়ে দিয়েছে। নেভিল ওর বাবা-মায়ের প্রতি আক্রমণে খুবই ক্ষেপে রয়েছে। হ্যারি-হারমিওন-রনের সঙ্গে সেন্ট মাংগোস হাসপাতালে সাক্ষাতের কথা ও কাউকে বলেনি, হ্যারিও বলেনি। তারপর থেকে নেভিল ওদের আরও কাছে এসে গেছে। বেল্লাট্রিকস বা তার টর্চার করা লোকদের সম্বন্ধেও না। নেভিল কারও সঙ্গে বেশি কথা না বলে হ্যারির ডিএ শিক্ষা ক্লাসে আরও চতুন উৎসাহে কাজকর্ম করতে লাগলো। হ্যারি ওর ফোলা ফোলা মুখ চুপসে দিয়ে অযথা আঘাত, দুর্ঘটনা সম্বন্ধে না ভেবে অন্যদের চাইতে বেশি করে শেখার ব্যাপার উৎসাহ দিতে লাগলো। এত তাড়াতাড়ি ও সবকিছু শিখে নিচ্ছে দেখে সকলেই খুব আশ্চর্য হয়ে গেলো।

হ্যারি স্নেইপের কাছে অকলামেন্সি শিখতে লাগলেও স্নেইপের সঙ্গে ওর। সম্পর্কের কিছু উন্নতি হলো না। বলতে পারা যায় দিন দিন অবনতি হতে লাগলো।

অকলামেন্সি শিক্ষা শুরু করার আগে, ওর কাটা দাগে কালেভদ্রে রাত্রি বেলায় ব্যথা হতো চুলকোতো এখন যেন সেটা বেড়ে গেছে। মনে হয় ওর সবকিছুই ঘটে চলেছে ভোল্টেমর্টের ইচ্ছানুসারে, অনেকটা রেডিও টিউনিং-এর মতো। স্নেইপের কাছ থেকে প্রথম শিক্ষা গ্রহণের পর থেকে ও আশা করেছিলো ওর মানসিক চিন্তা থাকবে না, কাটাদাগে ব্যথা অনুভব করবে না। তা সেসব চুলোয় যাক ইদানিং মিনিস্ট্রি অফ ম্যাজিকের অফিসের শূন্য করিডোর দিয়ে হেঁটে দরজার কাছে যাওয়ার স্বপ্ন রোজই দেখছে।

 হারমিওন বললো, ওটা তোমার অসুস্থতার লক্ষণ। ওর আর রনের সঙ্গে তর্কাতর্কি যেন একটু বেশি করে বাড়িয়ে চলেছে হ্যারি।

–তোমার ওই অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে হবে, না হলে বেড়েই চলবে।

হ্যারি বললো, স্নেইপের অকলামেন্সি শিক্ষা আমার সত্যি ভীষণ বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। কাটা দাগে যন্ত্রণা, প্রতিরাতে স্বপ্নে করিডোর দিয়ে হাঁটা, বিশ্বাস করো তোমরা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার মন চাইছে সেই বন্ধ দরজা খুলে। ঘরের মধ্যে ঢুকতে। শুধু বাইরে থেকে তাকিয়ে থাকা আমাকে বড় বেশি দুর্বল করে দিচ্ছে।

হারমিওন শক্ত কণ্ঠে বললো, সোজাভাবে নিওনা হ্যারি। ডাম্বলডোর কখনোই চান না তুমি স্বপ্নে করিডোর আর কালো বন্ধ দরজা দেখো। স্নেইপকে অযথা কেন তোমাকে অকলামেন্সি শেখাতে বলবেন। আমার মনে হয় তোমাকে আরও বেশি করে খাটতে হবে, ডাম্বলডোর যা চাইছেন তাই করো।

হ্যারি বললো, কে বললো আমি সিরিয়াস নই? তুমি একদিন স্নেইপের ক্লাসে যাবে, দেখবে স্নেইপ তোমার মাথার ভেতর ঢুকতে চাইছেন, বুঝলে ব্যাপারটা হাসির নয়?

রন বললো, হতে পারে।

–মানে কী হতে পারে? হারমিওন তীক্ষ্ণকণ্ঠে বললো।

–আরে ওতে হ্যারির কী দোষ? ওতো ওর মনের জগতে চাপা দিয়ে চলে আসতে পারে না, রন অস্পষ্টভাবে বললো।

–তুমি কি বলতে চাও শুনি? হারমিওন বললো।

–হতে পারে স্নেইপ হ্যারিকে যথাযথভাবে শেখাচ্ছেন না।

হ্যারি, হারমিওন সোজা রনের দিকে তাকালো। রন ওদের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।

–এমনও হতে পারে, রন আরও একটু স্বর নামিয়ে বললো, এও হতে পারে উনি হ্যারির মন আরও বৃহৎ করতে চাইছেন, ইউ-নো-হুর প্রবেশ সুগম করতে।

–চুপ করো রন, হ্যারমিন তীক্ষ্ণভাবে বললো। বলতো কতবার তুমি স্নেইপকে সন্দেহ করলে? যা করছেন ঠিক করছেন, একবারও তা বলেছো? তুমি ভাল করেই জানো স্নেইপকে। ডাম্বলডোর বিশ্বাস করেন, উনি অর্ডারের হয়ে কাজ করেন এটাই যথেষ্ট নয়?

রন একগুয়ের মতো বললো, উনি একসময় ডেথইটার ছিলেন সেটা জানো? এমন কোনও কাজ করেননি যাতে প্রমাণিত হতে পারে তিনি সেই পথ থেকে সরে এসেছেন।

হারমিওন আবার বললো, ডাম্বলডোর ওকে বিশ্বাস করেন। আমরা যদি ডাম্বলডোরকে বিশ্বাস না করি, তাহলে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না।

***

হ্যারির কাছে জানুয়ারি মাসটা দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেলো। একটার পর একটা কাজ, পঞ্চম বার্ষিক পরীক্ষার জন্য গাদাগাদা হোমওয়ার্ক-পড়াশুনো, স্নেইপের শিক্ষা, তার ওপোর ওদের ডিএ সেশন। বলতে গেলে শুতে শুতে মাঝরাত কেটে ভোর হয়ে যায়। হঠাৎ ফেব্রুয়ারি সামনে এসে হাজির। সঙ্গে করে নিয়ে এলো উষ্ণ জলীয় আবহাওয়া। দ্বিতীয়বার (সেই বছরে) হগসমিডে যাওয়া প্রারম্ভ। হ্যারি পরিকল্পনা করেছিলো চোর সঙ্গে একত্রে যাওয়া, সেদিন আবার ভ্যালেন্টাইন ডে তাহলে তো আরও মজা আরও আনন্দের দিন হবে।

সেদিন খুব ভোরবেলা হ্যারি, রন স্মার্টলি ড্রেস করে ব্রেকফাস্ট খেতে এলো। পাচার চিঠি নিয়ে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই। ওরা বসতে বসতে দেখলো হারমিওন একটা অপরিচিত বাদামি রং-এর প্যাচার ঠোঁট থেকে একটা চিঠি নিচ্ছে।

হারমিওন খামের মুখটা খুলতে খুলতে হাসি হাসি মুখে বললো, আঃ হাঃ ঠিক সময়ে চিঠিটা এসেছে। ও খামের মুখটা খুলে ছোট একটা পার্চমেন্ট বার করলো। ও গোগ্রাসে চিঠিটা পড়তে পড়তে মুখের হাসি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

–হ্যারি শোনো, হারমিওন বললো–খুবই ইমপর্টেন্ট ব্যাপার, তুমি কী আজ দুপুরের দিকে থ্রি ব্রুমস্টিকে আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবে?

হ্যারি বললো, ঠিক বলতে পারছি না। চোর সঙ্গে আমার সারাদিন কাটানোর প্ল্যান আছে। কি করবো, কি বলবো, সেসব নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।

–তাহলে, সম্ভব হলে তুমি ওকে সঙ্গে করেই এনো। হারমিওন বললো–কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে। আসবে না?

–ঠিক আছে, কিন্তু কেন বলবে তো?

–তোমাকে সব বলার এখন সময় নেই, আমাকে চিঠির জবাব এখনই দিতে হবে। হারমিওন এক হাতে চিঠি অন্য হাতে পাউরুটি টোস্ট নিয়ে গ্রেট হল থেকে একরকম দৌড়াতে দৌড়াতে বেরিয়ে গেলো।

–তুমি আসছো তো? হ্যারি রনকে জিজ্ঞেস করলো। রন বিষণ্ণ মুখে মাথা নাড়লো।

–আমি আদতেই হগসমিডে যেতে পারবো কিনা বলতে পারছি না। অ্যাঞ্জেলিনা সারাদিনের ট্রেনিং প্রোগ্রাম রেখেছে। আমাকে কেন টিম থেকে বাদ দিয়েছে বুঝতে পারলাম না। শ্লোপার আর কির্কেকে দলে নিয়েছে। সত্যি হরিবুল… তুমি ওদের খেলা দেখেছো!

–কারণ, তুমি ফর্মে থাকলে ভাল খেলো, হ্যারির একটু যেন ত্যাক্ত হয়ে বললো।

চো দরজার সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। মাথার কোঁকড়ানো কোঁকড়ানো চুলে পনিটেল করেছে। ওকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। হ্যারির হাত দুটো যেনো দেহের চেয়ে বড়, দৃঢ় পদক্ষেপে ও চোর দিকে এগিয়ে গেলো।

চো ওকে আসতে দেখে বললো–হাই।

হ্যারিও বললো–হাই।

ওরা দুজনে দুজনের মুখের দিকে তাকালো। হ্যারি বললো–তাহলে চলো আমরা যাই।

–ও হ্যাঁ।

ওরা ফ্লিচের রেজিস্টারে সই করার জন্য লাইন লাগালো। তারপর ওরা মাঠ পেরিয়ে কিডিচ স্টেডিয়াম পার হলো। দেখতে পেলো রন আর জিনি চলে যাচ্ছে। জীবনে এই প্রথম ও উইসলিদের সঙ্গে গেলো না, তার জন্য মর্মবেদনাতো আছেই।

চো যেতে যেতে বললো, মনে আছে থার্ডইয়ারে পড়ার সময় আমরা দুজনে দুটো টিমের হয়ে খেলেছিলাম?

–মনে আছে, তুমি সব সময়ে আমাকে আটকে রেখেছিলে।

–উড আমাকে তোমায় ঝাড়ু থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে বলেছিলো? চো হাসতে হাসতে বললো, ও প্রাইড অফ পোর্টরিতে খেলার চান্স পেয়েছে–সত্যি?

–না, পাডলে মেয়র ইউনাইটেডে পেয়েছে, আমি ওকে গত বছর ওয়ার্ল্ড কাপে খেলতে দেখেছি।

–আমি তোমাকে ওখানে দেখেছিলাম, মনে আছে? আমরা একই ক্যাম্প সাইটে ছিলাম, খুব ভাল লেগেছিলো–তাই না?

ওরা গেট পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড কিডিচ কাপের কথা কইতে কইতে হগমসিডের দিকে এগোতে লাগলো। হ্যারির মনে হলো ওর সঙ্গে আগে কথা কইতে এতো জড়তা কেন লাগতো। এখন তো বেশ স্বাভাবিকভাবেই হাঁটছে, কথা কইছে।

ওদের পাশ দিয়ে বিরাট স্লিদারিনের দল চলে গেলো। তার মধ্যে প্যানসি পারকিনসনকে দেখতে পেলো। প্যানসি ওদের দুজনকে এক সঙ্গে যেতে দেখে চিৎকার করে বললো, পটার–চ্যাং! হায় হায় চ্যাং তোমার রুচির প্রশংসা করতে পারলাম না। ডিগরি কিন্তু পটারের চেয়ে দেখতে ভালো ছিলো!

মেয়েরা ওদের ফ্যাশান দেখাতে, হেলে দুলে চললো। মাঝে মাঝে হ্যারি আর চোর দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো। হ্যারি কিডিচ ছাড়া অন্য কোনও কথা যেন খুঁজে পাচ্ছে না। চোর মুখের দিকে না তাকিয়ে, মুখ নামিয়ে শুধু ওর পা দেখছে।

 হগাসমিডের মুখে দাঁড়িয়ে দেখলো হাইস্ট্রিট দিয়ে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা দলে দলে নাচতে নাচতে চলেছে। যাবার সময় ওরা রাস্তার ধারের দোকানের কাঁচের জানালা দিয়ে জিনিসপত্র দেখছে। রাস্তার পেভমেন্টস দিয়ে চলে কার সাধ্য।

হগসমিডে ঢুকে হ্যারি বললো, কোথায় যাবে?

–যেখানে খুশি, চো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো–উহ, রাস্তার ধারে দোকানগুলো দেখতে দেখতে গেলে কেমন হয়?

ওরা দুজনে ডারভিস আর ব্যাঙ্গেসের দিকে চললো। দেখতে পেলো একটা বিরাট পোস্টার ঝুলছে, কেউ কেউ ওটা দেখছে। হ্যারি পোস্টারে তাকিয়ে দেখলো যে দশজন ডেথইটারস জেল ভেঙে পালিয়েছে তাদের ছবি আর অপরাধের বৃত্তান্ত রয়েছে। পোস্টারের তলায় লেখা রয়েছে ম্যাজিক মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা। যেসব অপরাধীদের ফটো দেওয়া হয়েছে তাদের ধরা সম্বন্ধে যদি কোনও জাদুকর জাদুকরী সংবাদ/ তথ্য দিতে পারে তাহলে তাদের একহাজার গ্যালিয়ন পুরস্কার দেওয়া হবে।

চো একটু অবাক হয়ে বললো, সিরিয়স ব্ল্যাক আজকাবান থেকে পালিয়েছিলেন? হগসমিডে চতুর্দিকে ডিমেন্টররা ছড়িয়ে পড়েছিলো আনাচে কানাচে তাকে ধরার জন্যে। এখন দশ-দশটা ডেথইটারস জেল ভেঙে পালিয়েছে। এখানে তো একটাও ডিমন্টর নেই!

হ্যারি বললো, তাইতো দেখছি, হ্যারির চোখ বেল্লট্রিক্স লেস্টরেঞ্জের ছবির দিকে।

হ্যারি কাছাকাছি কোনও ডিমেন্টর না থাকার জন্য দুঃখিত নয়, কিন্তু না থাকার জন্য মনে হলো ব্যাপারটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মনে হয় জেল থেকে তাদের মদত দেওয়া হয়েছিলো। তাদের ধরার খুব একটা চেষ্টা করছে না। তারা যেন মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোলের বাইরে। চো আর হ্যারির সব দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে হলো দশজন পলাতক ডেথইটার ওদের দিকে বিশ্রীভাবে তাকিয়ে রয়েছে।

একটু পরেই টিপটিপ করে বৃষ্টিপড়া শুরু হলো তারই সঙ্গে ঠাণ্ডা হাওয়া, তারপর বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা ওদের ভিজিয়ে চুপ চুপ করে দিলো।

চো ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে বললো, উস্ এককাপ গরম গরম কফি খেলে কেমন হয়?

বৃষ্টি আরও তেজে পড়তে লাগলো।

হ্যারি এধার ওধার তাকিয়ে বললো–ঠিক আছে, কিন্তু কোথায়?

–কাছেই তো একটা সুন্দর জায়গা আছে, তুমি ম্যাডাম পুড়ি ফুটের দোকানে কখনও যাওনি?

সত্যি হ্যারি অবশ্য আগে কখনও যায়নি, কফিশপের নামও শোনেনি। পুড্ডি ফুটের ছোট চায়ের দোকান, প্রচুর ভিড়। দোকানটার ভেতর বাহির ঝালর, আর নানারকম জিনিস দিয়ে সাজানো। হ্যারির সেই দৃশ্য দেখে আমব্রিজের অফিসের দৃশ্য মনে পড়ে গেলো।

চো খুশি মনে বললো, কফিশপটা দারুণ কিউট না?

হ্যারি মিথ্যে বললো, হ্যাঁ সত্যি বড় সুন্দর।

–ওই দেখো আজ ভ্যালেন্টাইনডে তো তাই এতো সাজিয়েছে, চো অনেকগুলো সোনালী রঙ-এর ছোট ছোট ডানাওয়ালা পুতুল দেখিয়ে বললো। সোনালী পুতুলগুলো ছোট ছোট গোল টেবিলের ওপোর ঝোলানো রয়েছে। মাঝে মাঝে তাদের গায়ে আলো পড়ে রং বদলাচ্ছে, ঝলমল করছে।

–সত্যি কী সুন্দর!

একটি মাত্র ছোট গোল টেবিল খালি ছিলো ওরা সেখানে বসলো। পাশেই জানালার কাঁচ বাষ্পে ভর্তি, বাইরের কিছুই দেখা যায় না। বৃষ্টি পড়েই চলেছে। ঝমঝম করে। ওদের টেবিলের পাশেই আর একটি টেবিলে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে হাত ধরে বসে রয়েছে। চো ওর অন্তরঙ্গতা দেখে হ্যারির দিকে তাকালো। চো কী চাইছে হ্যারি ওদের হাত ধরে বসুক? হ্যারির চারপাশের দৃশ্য দেখে তেমন ভালো লাগলো না। বেশিরভাগই মনে হয় স্বামী-স্ত্রী।

–আপনাদের জন্য কি আনবো? ম্যাডাম পুডিড ফুটের প্রশ্নে হ্যারি মুখ তুললো। বেশ শক্ত সমর্থ মহিলা, মাথায় চকচকে চুলে খোপা বাধা। অনেক কষ্টে রোজার ডেভিয়েস আর ওদের টিটেবিলের সামান্য ফাঁকে দাঁড়ানো।

–দুটো কফি, চো বললো।

ম্যাডাম পুড়ি ফুট কফি আনতে চলে গেলেন। হ্যারি রোজার ডেভিয়েসের টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলো ওরা দুজনে চিনির পটটা সরিয়ে সকলের দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে গভীরভাবে চুম্বন করে চলেছে। হ্যারির দেখে খুব খারাপ লাগলো। মনে হলো ডেভিয়েস কি চাইছে হ্যারি থেকে ওর গার্ল ফ্রেন্ডের মত সকলের সামনে চুম্বন করুক? ওর মুখটা গরম হয়ে গেলো, মুখ ঘুরিয়ে আবার জানালার দিকে তাকালো। জানালার কাঁচ তখনও বাষ্পে ভরা, বাইরের রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। ও চোর দিকে না তাকিয়ে টি-শপের সিলিং-এর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে রইলো।

বেশ খানিকটা সময় দুজনে নীরব থাকার পর চো হঠাৎ আমব্রিজের প্রসঙ্গ তুললো। হ্যারি তখন দারুণ স্বস্তি পেলো, টি শপের পরিবেশ ওর একটুও ভাল লাগছিলো না। কিন্তু আমব্রিজ প্রসঙ্গ, ডিএ মিটিং-এত বেশি আলোচিত হয়েছে যে, দুএকটা কথার পর নতুন কিছু কথা আর ওরা খুঁজে পেলো না।

–এই, আমার সঙ্গে থ্রি ব্রুমস্টিকে লাঞ্চে যাবে? ওখানে হারমিওনের আসার কথা আছে, হ্যারি বললো।

কথাটা শুনে চো ওর সরু সরু ভুরু দুটো তুললো।

 –আজ তুমি তাহলে হারমিওন গ্রেঞ্জারের সঙ্গে…?

–হ্যাঁ। ও সকালে আমাকে বলেছিলো, ভাবছি যাবো। তুমিও চলো না। আমার মনে হয় ওর কোনও আপত্তি নেই।

–ও হ্যাঁ, সত্যি ওর ব্যবহার খুবই সুন্দর।

কিন্তু সুন্দর কথাটি বললেও, ওর মুখ দেখে হ্যারির তা মনে হলো না। ওর গলার স্বর কেমন কেমন… কিছু মনে হয় বলেই চলেছে। তারপরই চোর দৃষ্টি ওর অদ্ভুত মনে হলো।

আবার নীরবতা।

রোজার ডেভিয়েস আর ওর গার্ল ফ্রেন্ডের উন্মত্ততার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ওদের দুজনের ঠোঁট যেনো শক্ত গ্লু (আঠা) দিয়ে চিপকে গেছে।

চো টেবিলের ওপোর একটা হাত ওর কফি কাপের পাশে প্রসারিত করে রেখেছে, হ্যারির ইচ্ছে হলো ওর হাতটা ধরে। কে যেনো ওকে ঝাটকা দিয়ে বললো, চুপ করে কী দেখছো ধরোনা ওর হাতটা। মাত্র একফুটের দূরতু! ও কিডিচ খেলার সময় আকাশে যেমন ভাবে উড়ন্ত ব্লিচকে চেপে ধরে, তেমনভাবে তো ধরতে পারে।

কিন্তু হ্যারি ওর একটা হাত সামান্য বাড়াবার আগেই চো ওর হাতটা টেবিলের ওপোর থেকে সরিয়ে নিলো।

হ্যারি চুপ করে রইলো। সোনালী রঙের ছোট ছোট পুতুলগুলোর কয়েকটা মেঝেতে পড়ে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে হ্যারি কফির শেষটুকু চুমুক দিলো, ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।

চো বললো, গতবছর এখানে আমি সেডরিকের সঙ্গে এসেছিলাম।

হ্যারি একটু অন্যমনস্ক ছিলো, খুব সম্ভব চোর কথাটা ওর কানে গেলো না। তারপরে বুঝতে পারলো চো কি বলতে চেয়েছে।

চো ইতস্ত করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো, আমি অনেকদিন থেকে তোমায় একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চেয়েছি হ্যারি? ও আগে একবারও আমার কথা বলেছিলো… আমার নাম…?

সেডরিকের মৃত্যু হ্যারির জীবনে এক মর্মান্তিক ঘটনা। ও চায় না সেডরিকের মৃত্যু নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করতে, চোর সঙ্গে তো নয়ই। তাই চোর কথা শুনে ও চুপ করে রইলো। ও চোর দিকে ধীরে ধীরে তাকিয়ে দেখলো ওর দুচোখ জলে ভরে গেছে, অনেকটা ডিএ ক্লাশের শেষদিনের মতো।

হ্যারি খুব আস্তে, যতটা পারে নরমভাবে বললো–শোনো, সেডরিক… সেডরিক আর নেই, কি হবে ওর কথা ভেবে। অন্য প্রসঙ্গে আসি অন্য কথা বলি।

হ্যারির কথাটা বলার পর মনে হলো যেনো সেডরিকের প্রসঙ্গে বাধা না দিলেই ভালো ছিলো।

ও বললো–আমি ভেবেছিলাম তুমি ওর বন্ধু, তুমি আমার কথাটা বুঝতে পারবে। অবশ্যই ওর কথা তুলবে, আমাকে বলবে যা যা তুমি দেখেছিলে। কিন্তু তুমি বলোনি।

চোর কান্না শুনে রোজার ডেভিয়েস ওর বান্ধবীর মুখ থেকে মুখ টেনে নিয়ে চোর দিকে তাকালো।

হ্যারি চাইলো রোজার যেনো ওদের দিকে না তাকায়। বান্ধবীকে নিয়ে যেমন চিপকে বসেছিলো তেমনই থাকুক।

চো মুখে রুমাল চেপে বললো, তোমার যখন হারমিওনের সঙ্গে লাঞ্চ খাবার প্ল্যান ছিলো তো আমাকে কেন তোমার সঙ্গে আসতে বলেছিলে! হারমিওন ছাড়া আরও কত মেয়েকে কথা দিয়েছ?

–না না তা নয়, হ্যারি বললো। ও বুঝতে পারলো চো কেন কাঁদছে। সেডরিকের নাম উত্থাপনের পর ও হেসে হেসে ছেকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিলো। বুঝতে পারেনি চো হাসির জন্য আঘাত পাবে।

হ্যারি দেখলো টিশপের সকলেই ওদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অস্বস্তি তো লাগবারই কথা। চো ব্যাগটা টেবিল থেকে হঠাৎ তুলে নিয়ে বললো, চলি হ্যারি, পরে তোমার সঙ্গে কথা হবে।

হ্যারি কিছু বলার আগেই চো শপ করে ওকে ছেড়ে চলে গেছে।

চো একটু আগে রোজারকে দেখিয়ে বলেছে, ও আমাকে ওর সঙ্গে আসতে বলেছিলো, আমি আসিনি।

হ্যারি পকেট থেকে গ্যালিয়ন বার করে টেবিলে রেখে একটা ফিকে লাল রঙের কনফেট্টির চুল নেড়ে দিয়ে শপ থেকে বেরিয়ে গেলো।

বাইরে তখন ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, তারই সঙ্গে বরফের মতো ঠাণ্ডা হাওয়া। সেই বৃষ্টির মধ্যে এধার–ওধার ঘুরে কোথাও চোকে দেখতে পেলো না।

মেয়েরা! ও দাঁত কট কট করে বললো–দুপকেটে ঠাণ্ডা হাতদুঠো পুরে পা দিয়ে রাস্তায় বৃষ্টির জমা জল ছিটোতে ছিটোতে, হাঁটতে লাগলো। সেডরিক সম্বন্ধে চো কী কথা বলতে চায়? সব সময় একই প্রসঙ্গ টেনে এনে ঘ্যান ঘ্যান করে কেন?

ও সেই রকমভাবে হাঁটতে হাঁটতে থ্রি ব্রুমস্টিকের সামনে দাঁড়ালো। ও জানে ব্রুমস্টিকে ও যথাসময়ে আসার অনেক আগেই এসে পড়েছে। হারমিওনের এখনও আসার সময় হয়নি।

হ্যারি জানে, পাবে ঢুকলে অনেক চেনাজানা লোকদের সঙ্গে দেখা হবে, হারমিওন আসা পর্যন্ত সময়টুকু তাদের সঙ্গে কথা বলে কাটাতে পারবে।

হ্যারি মাথা ঝাঁকুনি দিলো মুখের ওপোর থেকে বৃষ্টি ভেজা চুলগুলো সরাবার জন্য। এধার ওধার তাকাতে লাগলো। তাকাতে তাকাতে দেখলো পাবের এক কোণে বিষণ্ণ মুখে হ্যাগ্রিড বসে রয়েছেন।

অনেক টেবিল চেয়ারের ফাঁকা জায়গা দিয়ে হ্যাগ্রিডের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, হাই হ্যাগ্রিড।

হ্যাগ্রিড তন্ময় হয়ে কিছু ভাবছিলেন। হ্যারির কথা কানে যেতেই লাফ দিয়ে উঠলেন। হ্যারি দেখলো হ্যাগ্রিডের মুখে আরও দুটি নতুন কাটা দাগ, আঁচড়ের দাগ।

–ও হো হ্যারি তুমি? ঠিক আছে তোমার শরীর?

–হ্যাঁ ভালই আছি, হ্যাগ্রিড বললেন–আমরা দুজনে তো এক নৌকোতে পা দিয়ে চলেছি, তাই না হ্যারি?

হ্যারি মাথা চুলকালো।

–তোমার বাবা নেই, আমারও। আমরা দুজনেই খুব ভালো বংশের। আজ যদি তোমার বাবা বেঁচে থাকতেন, তাহলে তোমার জীবন অন্যরকম হতো।

–হ্যাঁ হয়তো! হ্যারি সাবধানতার সঙ্গে বললো। কথাটা বলার পর হ্যারি লক্ষ্য করলো হ্যাগ্রিডের মন মেজাজ একটুও ভালো নেই।

–হ্যাগ্রিড বললেন, যাই বলো না কেন মানুষের জীবনে ভালো বংশ থেকে আসা সবচেয়ে বড় কথা।

হ্যারি হ্যাগ্রিডের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো–আবার দেখছি আপনি আঘাত পেয়েছেন, আগেরগুলো দেখি এখনও ভাল করে সারেনি।

হ্যাগ্রিড বললেন, ও কিছু নয়, স্বাভাবিক। হ্যাগ্রিড ফ্ল্যাক্সটা তুলে নিয়ে বললেন, চলি হ্যারি, পরে তোমার সঙ্গে দেখা হবে।

হ্যারি একটু দঃখিত হলো। কে জানে হ্যাগ্রিডের কি হয়েছে। হ্যাগ্রিড এতো অসুখী কেন বুঝতে পারলো না হ্যারি।

–হ্যারি! আরে হ্যারি এদিকে এসো!

ডাক শুনে ও দেখলে হারমিওন ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

ও হারমিওনের টেরিলের সামনে দাঁড়ালো। হারমিওন ওর পাশের শূন্য চেয়ারটায় হাত ঠেকিয়ে বললো, আগেই এসে গেছি, আমি ভাবছিলাম তুমি নিশ্চয়ই চোর সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে মশগুল হয়ে আছে। আমি আশা করছিলাম আরও ঘণ্টাখানেক পরে হয়তো আসবে।

হ্যারি দেখলো হারমিওন একা নয়। ভাবতে পারছে না একই টেবিলে লুনা, লাভগুড আর রিটা স্কীটার, ডেইলি প্রফেটের ভূতপূর্ব সাংবাদিক বসে রয়েছে! রিটা, যাকে হারমিওন সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে।

–চো? রিটা সঙ্গে সঙ্গে বলে চেয়ারটা ঘুরিয়ে হ্যারির দিকে তাকালো। একটি মেয়ে?

রিটা ওর কুমিরের চামড়া ব্যাগটা আঁকড়ে ধরলো।

হারমিওন, রিটা স্কীটারের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললো, হ্যারির যদি একশটা মেয়ে বন্ধু থাকে তাতে আপনার কী? আশাকরি আপনার কথা শেষ হয়েছে, এবারে আপনি যেতে পারেন।

রিটা একটা সবুজ রঙের কুইল ব্যাগ থেকে বার করে হারমিওনের দিকে এমনভাবে তাকালো যেনো এই মাত্র কুইনিন টেবলেট খেয়েছে।

হ্যারি চেয়ারে বসে রিটা, লুনা ও সবশেষে হারমিওনের মুখের দিকে তাকিয়ে রিটাকে বললো, আপনি এখানে?

–পারফেক্ট প্রশ্ন করেছ। আমি তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি। কথাটা বলে রিটা ওর গেলাসে খুব বড় দেখে একটা চুমুক দিলো। তারপর হারমিওনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, কী বলো, আমি কি হ্যারির সঙ্গে দুএকটা কথা বলতে পারি?

হারমিওন নিরস কণ্ঠে বললো, হ্যাঁ, পারেন, অবশ্যই ইচ্ছে করলে পারেন।

চুপ করে বসে থাকা রিটার সহ্য হয় না। ও বোধহয় আসার সময় মাথার চুল পরিপাটি করে বেঁধে এসেছিলো। এখন সেগুলো অবিন্যস্ত, কিছু চুল মুখের ওপোর ঝুলে পড়েছে। শ্যান পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকা লাল রঙ-এ ছাপিত নখগুলো (প্রায় ইঞ্চি দুই থেকে রঙ উঠে গেছ)। চশমার হাতল থেকে নকল জুয়েলও দুএকটা নেই। গেলাসে আরও একবার চুমুক দিয়ে মৃদু হেসে বললো, খুব সুন্দর মেয়ে, তাই না হ্যারি?

কথাটা শুনে হারমিওন ক্ষেপে গিয়ে বললো, হ্যারির ব্যক্তিগত কথা নিয়ে কিছু বলবেন না বলে দিলাম, এই শেষ কথা। আপনি এখনও আপনার ডিলের কথা বলেননি।

–ডিল! সে আবার কী? রিটা তার, মুখটা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে মুছলো। ডিল সম্বন্ধে এখনও তো তুমি কিছু বলোনি, তুমি তো শুধু এখানে আমাকে আসতে বলেছিলে।

রিটা স্কীটার খুব বড় দেখে একটা শ্বাস ফেললো।

–হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমাকে আর হ্যারিকে নিয়ে আজব গল্প বানাতে। আমাদের পেছনে লেগেছেন কেন বলুন তো? এমন একজন কাউকে জোগাড় করুন যে আপনাকে দেখে গদগদ হবে।

রিটা বাঁকাচোখে হ্যারিকে দেখে বললো–কারও সাহায্য নিতে হবে না। এ বছরে তো হ্যারি সম্বন্ধে অনেক ভয়ার্ত সব ঘটনা-টটনা শুনেছি। তা তোমার সেইসব ভয়াবহ ঘটনা সম্বন্ধে তোমার বক্তব্য কি? বিশ্বাসঘাতকতা? উন্মাদের প্রলাপ? ভুল বোঝাবুঝি?

হারমিওন বললো, অতি স্বাভাবিক, আপনার কথা শুনে রাগ করার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ ও ম্যাজিক মন্ত্রণালয়ে যা ঘটেছে তাই বলেছে। মন্ত্রী মশাই বোকা না হলে বিশ্বাস করবেন কেন।

–তাহলে তুমি তোমার কথাতে এঁটে বসে আছো হ্যারি? তুমি বলতে চাও হি হু যার নাম আমরা বলি না তিনি ফিরে এসেছেন? রিটা চোখের চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে হ্যারির মুখের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বললো। (কথা বলার সময় ওর একটা হাত কুমিরের চামড়ার ব্যাগটা চেপে রইলো। তুমি তাহলে বলতে চাইছো, ডাম্বলডোর যে সমস্ত আজেবাজে কথাবার্তা বলছেন, মানে ইউ-নো-হু ফিরে আসছেন, তা মিথ্যে নয় সত্য? তুমি তার একমাত্র প্রধান সাক্ষী?

–আমি তার একমাত্র সাক্ষী হতে যাবো কেন? কমপক্ষে বারজন ডেথ ইটারসদের দেখেছেন। আপনি তাদের নাম জানতে ইচ্ছুক, হ্যারি গম্ভীরভাবে বললো।

–শুনলে অবশ্যই সুখী হবো, রিটা ব্যাগ ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললো। এমনভাবে হ্যারির দিকে তাকিয়ে রইলো যেনো এই প্রথম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর একটি জিনিস ওর সামনে রয়েছে।

 রিটা বললো, বিরাট শিরোনাম বড় বড় অক্ষরে থাকবে পটার দোষারোপ করছে, তারই তলায় সাব হেডিং, হ্যারি পটার বলছে, ডেথইটাররা এখনও আমাদের মধ্যে রয়েছে, তাদের নাম ও জানে। তারপরই তলায় একটি বেশ বড় সুন্দর ফটোগ্রাফ থাকবে তোমার। ইউ-নো-হুর আক্রমণের পর নাবালক হ্যারি পটার ১৫, গতকাল বেশ কিছু বিখ্যাত ও সম্মানিত জাদুকর সম্প্রদায়ের সদস্যদের দোষারোপ করেছে যে তারা ডেথইটারস।

কথাগুলো বলার পর রিটা, হারমিওনের দিকে তাকিয়ে হাতের কুইলটা দাঁতে কামড়ে বললো, মিস পারফেক্ট নিশ্চয়ই মনে করছে না–এই স্টোরিটা ছাপা হোক।

হারমিওন বললো, সত্যি কথা বলতে মিস পারফেক্ট চায়, খবরটা ছাপা হোক।

রিটা, হারমিয়নের মুখের দিকে তাকালো। অন্যদিক থেকে গান ভেসে এলো, উইসলি আমাদের রাজা। রিটা ওর গেলাসের ককটেল অনিয়ন একটা স্টিক দিয়ে নাচাতে লাগলো।

রিটা, হারমিওনকে কর্কশ স্বরে বললো, তাহলে তুমি চাইছো হি-হুঁ, যার নাম করা যাবে না, রিপোর্ট লিখবো যে সে ফিরে এসেছে?

হারমিওন বেশ জোর দিয়ে বললো–অবশ্যই। যেমনটি হ্যারি বলবে তেমনই। ও ডেথ ইটারদের নামধাম সব খবর, আপনাকে যথাযথ জানাবে, আহা, ঘাবড়াবেন না। এই নিন ন্যাপকিন ভাল করে ধরুন।

ভোল্টেমর্টের নাম শুনে রিটা ভয়ে লাফিয়ে আঁতকে উঠতেই হাত থেকে গেলাসের অর্ধেকটা ছলকে মেঝেতে পড়ে গেলো।

রিটা ন্যাপকিন দিয়ে ওর গ্রাবিবর্ষাতির সামনেটা চেপে ধরে খুব নীরস কণ্ঠে বললো, দ্যা প্রফেট ওটা ছাপবে না। কেউ ওর কথা বিশ্বাস করে না সকলেই মনে করে, ডাম্বলডোর ভ্রান্ত ধারণায় ভুগছেন। তুমি কী সেই কথা মাথায় রেখে আমাকে লিখতে বলো?

হারমিওন অসম্ভব রেগে গিয়ে বললো, তাহলে লিখুন হ্যারি পটার ওর খেলার মাৰ্বল কেমন করে হারিয়েছে। ধন্যবাদ! আমি চাই যা ঘটেছে, দেখেছে ও তাই বলুক।

–বাজারে সেসব চলবে না, ফাজ পছন্দ করবেন না। রিটা বললো।

–তাহলে কী বলতে চান ফাজ যা যা পছন্দ করবেন তাই ছাপা হবে? হারমিওন বিরক্ত হয়ে বললো।

রিটা হারমিওনের মুখের দিকে অনেকটা সময় কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর টেবিলে ঝুঁকে পড়ে ব্যবসায়িক সুরে বললো–ঠিক আছে, ফাজের প্রফেটের ওপোর কর্তৃত্ব আছে, ওরা কখনও হ্যারির সম্বন্ধে ভাল করে লিখবে না। কারণ সেইসব পড়ার মেজাজ নেই পাঠকদের, জনসাধারণ পছন্দ করে না। গতবারের আজকাবান সম্বন্ধে যেসব খবর বড় বড় করে বেরিয়েছিলো সেগুলো পাঠকদের যথেষ্ট চিন্তার কারণ হয়েছিলো। কেউ বিশ্বাস করতে চায় না ইউ-নো-ই ফিরে এসেছে।

–তাহলে ডেইলি প্রফেট আসল খবর ছাপার বদলে লোকেরা যা চায় তাই ছাপে? হারমিওন ব্যঙ্গ করে বললো।

রিটা কথাটা শোনার পর সোজা হয়ে বসে গেলাসের ফায়ার অফ হুইস্কি ফেলে দিলো।

–মুখ তুমি, বলতে চাও ডেইলি প্রফেট পাঠকদের মনতুষ্ট করে চলে?

লুনা বললো–আমার বাবা বলেন, ওই কাগজ অতি বাজে, পড়ার অযোগ্য। ওদের কথার মাঝখানে অপ্রত্যাশিতভাবে বলে উঠলো। তারপর ওর বড় বড় চোখে রিটাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো, আমার বাবা প্রয়োজনীয় ঘটনা, গল্প ছাপেন, মনে করেন সেগুলো জনসাধারণের প্রয়োজনীয়। অর্থের প্রতি তার কোন মোহ নেই।

রিটা লুনার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকালো।

–তোমার বাবা সম্ভবত গ্রামের মানুষদের জন্য বোকা বোকা সব জিনিস ছাপেন। মনে হয় মাগলদের সঙ্গে মেলামেশার পঁচিশ রকম পদ্ধতি পরের সংখ্যায় থাকবে ওইরকমই একটা কিছু।

ককটেল অনিয়ন গিল্লিওয়াটারে মিশিয়ে লুনা বললো–না, আমার বাবা দ্য কুইবলার কাগজের এডিটর।

রিটা এমনভাবে ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করে হেসে উঠলো যে আশেপাশের লোকেরা চমকে উঠলো।

–কি বললে, জনসাধারণের জানানোর ও জ্ঞানবৃদ্ধির জন্য লেখা ছাপা হয়? হাসির ব্যাপার! কাগজগুলো পেলে আমি আমার বাগানে সার হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।

–বাঃ উঁচু গলায় কথা বলার দারুণ সুযোগ পেয়ে গেছেন, তাই না?

লুনা আমাকে বলেছে, ওর বাবা হ্যারির সঙ্গে সাক্ষাৎকার ছাপলে খুবই খুশি হবেন।

রিটা ওদের দুজনের দিকে সোজা তাকিয়ে হো : হো : করে হেসে উঠলো।

-কী বললে, দ্যা কুইবলার? তুমি মনে করছে, সেই সাক্ষাৎকার কুইবালারে ছেপে বেরোলে খুব একটা প্রয়োজনীয খবর বলে মনে করবে জনসাধারণ?

–সকলেই না, কিছু সংখ্যক হয়তো মনে করবে, হারমিওন বললো–কিন্তু ডেইলি ফেটের আজকাবানের জেল ভেঙে পলায়নের খবরের মধ্যে কিছু ফাঁক আছে। আমার মনে হয় বেশ কিছু লোক মনে করবে, যা ঘটেছে তার থেকে উন্নত ধরনের বলার অনেক স্কোপ ছিল। গ্রাম্য পত্রিকা যদি সঠিকভাবে প্রতিবেদন জনসাধারণের কাছে পেশ করতে না পারে, কথাটা বলে আড় চোখে লুনার দিকে তাকালো, মানে বলতে চাই ওইরকম এক…।

–ঠিক আছে তোমার বাবার কাগজের হয়ে আমি ইন্টারভিউ নেবো, তা তোমার বাবা আমাকে কেমন সম্মান বা দক্ষিণা মানে লেখার পারিশ্রমিক দেবেন?

–আমার মনে হয় বাবার কাগজের লেখার জন্য লেখকদের বাবা কোনও পেমেন্ট করেন না, লুনা খুব সাধারণভাবে বললো। লেখা পাঠায়, ছাপা হলে সম্মান দেওয়া হয়েছে মনে করে। অবশ্য ছাপার অক্ষরে নাম দেখলে কে না খুশি হয়!

কথাটা শুনে রিটা স্কীটার আবার তেঁতো খাওয়ার মত মুখ বিকৃত করলো।

–তুমি কী মনে করো আমি বিনা পারিশ্রমিকে লেখা লেখি করি?

হারমিওন বললো–না না তা কেন হবে। আমি ইচ্ছে করলে প্রেস কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারি, আপনি একটি ভুইফোড় সাংবাদিক। অবশ্য দ্য প্রফেট হয়তো আপনাকে আজকাবানে বন্দি হয়ে থাকার খরচা পত্র দেবে।

রিটার মুখচোখ দেখে মনে হয় ও হারমিওনের ওপোর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর সবকিছু ভেঙে চুরে, ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ওর নাকের ওপোর ছুঁড়ে মারবে।

রিটা বললো, এখন দেখছি আমার আর কোনও ভিন্ন পথ নেই। আছে কি? ওর গলার স্বর সামান্য কাঁপা কাঁপা। ও আবার ওর কুমিরের চামড়ার ব্যাগের মুখটা খুলে, একটা কুইক কোটস কুইল কলম নিয়ে পার্চমেন্টের ওপর রাখলো।

হারমিওন ওর গ্লাসের তলা থেকে একটা চেরিফল তুলতে তুলতে বললো এবারে তাহলে কেটে পড়ন রিটা।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *