০৩. দ্য অ্যাডভান্স গার্ড

০৩. দ্য অ্যাডভান্স গার্ড

আমাকে ডিমেন্টররা আক্রমণ করেছিল, আমাকে হয়ত হোগার্টস থেকে বহিষ্কারও করা হবে। আমি জানতে চাই এখানে কি হচ্ছে এবং আমি কবে এসব থেকে মুক্তি পাব।

হ্যারি ওর ঘরে গিয়ে কথাগুলো তিনটে আলাদা চামড়ার কাগজে লিখল। প্রথমটা সিরিয়স, দ্বিতীয়টা রন এবং তৃতীয়টা হারমিওনের জন্য। ওর পেঁচা হেডউইগ খাচাতে নেই, খুব সম্ভব শিকার করতে গেছে। শূন্য খাঁচাটা ডেস্কের ওপর পড়ে রয়েছে। পেঁচার ফিরে আসার অপেক্ষায় হ্যারি ঘরে পায়চারি করতে লাগল। মাথাটার দপদপানি তখনও কমেনি। ওর দুই ক্লান্ত চোখ জ্বালা করছে। ঘুম আসছে; কিন্তু ঘুমুতে পারছে না। ডাডলিকে টেনে-হিঁচড়ে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য ওর পিঠে ব্যথা করছে। ডাডলি ওকে মারার জন্য যে দুটো জায়গায় ফুলে আছে সেগুলোয় ব্যথায় দপদপ করছে।

রাগে ও হতাশায় ও সারা ঘরে দুম দুম করে হাঁটতে লাগল। দাঁত কিড়মিড় করে, মুষ্টিবদ্ধ করে তারকাখচিত খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বারবার ও খোলা জানালার কাছে দাঁড়াল। ডিমেন্টরসদের ওকে ধরার জন্য পাঠিয়েছিল, মিসেস ফিগ আর মুন্ডানগাস গোপনে ওকে চোখে চোখে রাখছেন। জাদু মন্ত্রণালয়ে শুনানি হবে, হোগওয়াটস থেকে সাসপেনসন। আশ্চর্য, কেউ তাকে এসব কেন হচ্ছে তার বিন্দুবিসর্গ জানাচ্ছে না।

এবং সবচেয়ে মারাত্মক প্রশ্ন হাউলারের কি মতলব? কার বীভৎস কণ্ঠস্বর বিশ্রীভাবে অনবরত কিচেনে ঢুকে প্রতিধ্বনিত হয়েছে? সকলেই তাকে দুষ্টু বাচ্চা ছেলের মত ব্যবহার করছে কেন? ভবিষ্যতে আর কোনও খেল দেখিও না, ঘরের মধ্যে থাক। চলতে চলতে পায়ের কাছে পড়ে স্কুলের টাঙ্কটায় ও লাথি মারল। কিন্তু তাতেও রাগ একটু কমলো না, আরও মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সারা শরীরে। অসহ্য ব্যথা ছাড়াও ট্রাঙ্কে প্রচণ্ডভাবে লাথি মারার জন্য পায়ের আঙ্গুলগুলোতে তীব্র ব্যথা করতে লাগল। খোড়াতে খোঁড়াতে জানালার কাছে দাঁড়াতেই, ওর পেঁচা হেডউইগ ডানা ঝাঁপটা দিতে দিতে ছোট একটি ভূতের মতো জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকল।

ঠিক সময়ে! হ্যারি রেগেমেগে বললো, পেঁচা ওর শূন্য খাচার ওপর বসল। ওর মুখে একটা ব্যাঙ, দয়া করে ওটা রাখ; তোমায় কিছু কাজ করতে হবে আমার।

হেডউইগও গোল বড় বড় হলুদ বর্ণের ভৎসর্নার চোখে হ্যারির দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে তখনও মরা ব্যাঙ।

–শোন, এদিকে এস। হ্যারি তিনটে চিঠি গোল করে একটা চামড়ার ফিতেতে ওর আঁশ আঁশ পায়ে বাঁধতে বাঁধতে বললো–দয়া করে সোজা চিঠিগুলো সিরিয়স, রন আর হারমিওনকে দিয়ে জবাব নিয়ে আসবে জবাব না পাওয়া পর্যন্ত ফিরবে না। যতক্ষণ না ওরা ভাল ও বড় করে জবাব না লিখবে তুমি ওদের খুঁচিয়েই যাবে। বুঝলে …?

হেডউইগ হ্যারির কথা শুনে বিদ্রূপ মেশান ডেকে উঠল। ওর ঠোঁটের কোণে তখনও মৃত ব্যাঙটা ঝুলছে।

–যাও যাও দেরি করো না, হ্যারি অধৈর্য হয়ে বললো।

হেডউইগ তিনটে চিঠি নিয়ে সেঁ করে উড়ে গেল। হেডউইগ চলে গেলে হ্যারি জামা-প্যান্ট না বদলে বিছানায় শুয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল হেডউইগকে ও বড় বেশি খাটাচ্ছে। চার নম্বর প্রাইভেট ড্রাইভে পেঁচা হেডউইগ একমাত্র বিশ্বস্ত বন্ধু। সিরিয়স, রন আর হারমিওনের জবাব নিয়ে আসতে পারলে হ্যারি ওকে আদর করবে।

ওরা, অবশ্যই যত তাড়গাড়ি পারে ওর চিঠির জবাব দেবেই। ওরা নিশ্চয়ই ডিমেন্টরের আক্রমণ বিষয়টি তুচ্ছ বলে গণ্য করবে না। আগামীকাল নিশ্চয়ই ও তিনটে মোটা মোটা চিঠি পেয়ে যাবে। সেই চিঠগুলোতে থাকবে ভালবাসা, সহানুভূতি আর ব্যরোতে আসার আমন্ত্রণ! সুন্দর কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ওর দুচোখের পাতা ঘুমে বন্ধ হয়ে গেল।

***

কিন্তু পরদিন সকালে হেডউইগ ফিরলো না।

হ্যারি চুপচাপ শুয়ে রইল সারাটা দিন! ওঠা একমাত্র বাথরুমে যাওয়া। সেইদিন তিনবার ওর ঘরে খাবার দিয়ে গেলেন আন্টি পেটুনিয়া। আন্টি যতবারই আসেন হ্যারি হাউলার সম্বন্ধে জানতে চায়, আন্টি ছাড়া আর কে বলতে পারবে হাউলার সম্বন্ধে? হ্যারির যদিও আগ্রহ নেই আঙ্কল-আন্টি আর ডাডলির সঙ্গে কথা বলতে। যত না বলা যায় ততই ভাল। মনে শান্তি থাকে, রাগ হয় না।

তিন তিনটে দিন চলে গেল হেডউইগের পাত্তা নেই। আকাশের দিকে ও তাকিয়ে থাকে, মন্ত্রণালয়ে যাবার দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে।

যদি ওরা ওকে দোষী সাব্যস্ত করে তাহলে? যদি ওকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়, ওর জাদুদণ্ড ভেঙে দুটুকরো করে দেয় তাহলে কী করবে কোথায় যাবে? ভেবে ভেবে আকুল হয় হ্যারি।

ও অন্য এক জগতের লোক, দুএকমাস ডার্সলে পরিবারে থাকতে পারে; কিন্তু সবসময়ের জন্য নয়। এক বছর আগে মন্ত্রণালয় থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার আগে সিরিয়স তার বাড়িতে থাকতে বলেছিলেন। ও কম বয়স্ক বলে কী কোনো বাড়িতে থাকবার অনুমতি পাবে? এখনতো সে শুযোগও নেই। ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাটুট অফ সিক্রেসীর বিধী ভঙ্গের অপরাধে কী ওকে আজকাবান কারাগারের ছোট সেলে বন্দি করে রাখা হবে? যখনই এইসব বিপদের কথা ভাবে তখনই নানা আশঙ্কায় অনিশ্চয়তায় হ্যারি চুপ করে শুয়ে বা বসে থাকতে পারে না। উত্তেজিত হয়ে ঘরে পায়চারি করে।

চতুর্থ দিনেও হেডউইগ কোনও জবাব নিয়ে ফিরে আসে না। হ্যারি দারুণ দুশ্চিন্তায়, মনের দুঃখে সিলিং-এর দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে নানা কথা ভাবতে থাকে। এমনই এক সময়ে আঙ্কল ভার্নন ওর ঘরে ঢুকলেন। হ্যারি ধীরে ধীরে ভার্ননের দিকে তাকাল। আঙ্কল ভার্নন খুব দামী স্যুট পড়েছেন, খুব খুশি খুশি ভাব চোখে মুখে।

ভার্নন বললেন–আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি।

 –দুঃখিত?

–আমরা মানে তোমার আন্টি, ডাডলি আর আমি কোথাও যাচ্ছি।

 –খুব ভাল। হ্যারি নিস্পৃহ কণ্ঠে বললো।

–আমরা যতক্ষণ না ফিরি তুমি ঘর থেকে বেরোবে না।

–ঠিক আছে।

–টেলিভিশন স্টিরিও বাড়ির কোনও জিনিসে হাত দেবে না।

 –ঠিক আছে।

 –ফ্রিজ থেকে খাবার চুরি করে খাবে না।

–ভালো কথা।

–আমি তোমার ঘর তালাবদ্ধ করে রাখব।

 –তাই রাখবেন।

তর্ক বিতর্ক না করে সবকিছুতেই হ্যারি হ্যাঁ হু করাতে ভার্নন একটু সন্দেহের দৃষ্টিতে হ্যারির দিকে তাকিয়ে বাইরে থেকে ওকে লক করে চলে গেলেন। হ্যারি ঘরে বসে ভার্ননের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার পদশব্দ শুনতে পেল। দুএক মিনিট পর ও শুনতে পেল গাড়ির দরজা বন্ধ করার শব্দ, ইঞ্জিনের ঘর ঘর শব্দ। গাড়ি বারান্দার তলা থেকে ভার্ননের গাড়ি চলে যাওয়ারও শব্দ শুনতে পেল।

ওরা বাড়িতে থাকলে বা না থাকলে হ্যারির কিছু যায় আসে না। ও এত ক্লান্ত যে বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের আলোটা পর্যন্ত অফ করার শক্তি নেই। ঘর একটু একটু করে ঘন অন্ধকার হয়ে যায়, রাত্রির শব্দ শোনা যায় ও জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে হেডউইগের প্রতীক্ষায়

শূন্য বাড়িটা কেমন যেন থমথম করছে। পাইপে জল দেওয়ার শব্দ কানে আসছে। হ্যারি আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে রইল। মনের মধ্যে দারুণ অস্বস্তি, চিন্তা, ভাবনা।

তারপর ও পরিষ্কার শুনতে পেল নিচের রান্না ঘরে কিছু ভেঙে পড়ার শব্দ।

হ্যারি উঠে বসল। তিনজনই তো এইমাত্র বেরিয়ে গেল, তবে কী বাড়িতে চোর ঢুকেছে? তারপর সব চুপচাপ আবার শব্দ! কারা যেন ফিস ফিস করে কথা বলছে। চোর? চোর হলে তো কথা বলবে না। হ্যারি ম্যাজিক ওয়ান্ডটা হাতে নিল। তারপর শোবার খাট থেকে নেমে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে থেকে আসা কথাবার্তা শোনার জন্য কান খাড়া করে রইল। পরক্ষণেই ও লাফিয়ে উঠল ঘরের বন্ধ দরজাটার ক্লিক শব্দে। দরজাটা খুলে গেল।

হ্যারি নিশ্চল হয়ে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে অন্ধকার সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর দিকে তাকাল। কারা কথা বলছে শোনার জন্য ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। দুএক মিনিট এগোবে কি এগোবে না দুনোমনো করে শেষ পর্যন্ত সিঁড়ির মুখের কাছে গেল।

ওর বুকের হৃদপিণ্ড যেন ঠেলে কণ্ঠনালীর কাছে উঠে আসতে চাইছে। দেখল এক তলায় সিঁড়ির মুখে হলে কিছু লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাস্তা থেকে কাঁচের জানালা দিয়ে সামান্য আলো এসে ওদের গায়ে পড়েছে। খুব বেশি তো সংখ্যায় ওরা আট-নজন হবে।

–তোমার ম্যাজিক ওয়ান্ড নামিয়ে ফেল, কেউ দেখে ফেলতে পারে। একজন খুব আস্তে অথচ রাগত স্বরে বললো।

হ্যারির বুকটা টিপ টিপ করছে উত্তেজনায়। কিছুতেই থামাতে পারছে না। সেই গলার স্বরের সঙ্গে ও পরিচিত হলেও হাত থেকে ম্যাজিক ওয়ান্ডটা সরালো না।

প্রফেসর মুডি? ও দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে বললেন।

–আমি প্রফেসর সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানি না। বেশ জোর দিয়ে বললেন নিচে নেমে এস আমরা তোমাকে ভাল করে দেখতে চাই।

হ্যারি জাদুদণ্ডটা নামালেও শক্ত মুঠিতে ধরে রইল। একপাও নড়লো না। ওদের সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে, কারণ এখনও পর্যন্ত তাদের ভাল করে দেখতে পায়নি। খুব বেশিদিন হয়নি প্রায় নমাস আগে ও ম্যাড আই মুডির লোকজনের সঙ্গে থেকে এসেছে। লোকটা সত্য মুডি না অন্য কেউ জানতে হবে। একজন ভণ্ডও তো হতে পারে, একজন ভণ্ড হ্যারিকে হত্যা করতে চেয়েছিল।

কি করবে না করবে সিদ্ধান্ত নেবার আগেই আরেকটি কর্কশ স্বর নিচ থেকে ওপরে ভেসে এল।

–সব ঠিক আছে হ্যারি, আমরা তোমাকে নিতে এসেছি।

প্রায় এক বছরেরও বেশি হয়েছে গলার স্বরটা না শুনলেও ও চিনতে পারল। ওর হৃদপিণ্ডটা ধ্বক ধ্বক করতে লাগল।

–প্রফেসর লুপিন? ও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না লুপিন এসেছেন। -আপনি এসেছেন?

–শোন আমরা সবাই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রয়েছি, অন্য একজন বললো। সম্পূর্ণ অপরিচিত গলা। মহিলার কণ্ঠস্বর লুমোস।

একটা ম্যাজিক ওয়ান্ড দপ করে জ্বলে উঠতেই সমস্ত হলটা ম্যাজিক্যাল লাইটে উদ্ভাসিত হয়ে গেল। হ্যারি চোখ পিট পিট করতে লাগল। যেসব লোক এসেছে। তারা সিঁড়ির মুখে একত্র হয়ে ওপরে তাকাল। কেউ কেউ ওকে ভাল করে দেখার জন্য ঘাড় উঁচু করল।

রেমাস লুপিন হ্যারির খুব কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন। তার বয়স খুব বেশি না হলেও খুব অসুস্থ ও ক্লান্ত দেখাচ্ছে। শেষ যখন হ্যারি লুপিনকে দেখেছিল তখন তার মাথার সব চুল সাদা হয়ে যায়নি। আগের চেয়ে তার বেশভূষা আরও যেন জীর্ণ! যাই হোক না কেন হ্যারিকে দেখে লুপিন হাসতে লাগলেন। হ্যারিও হাসবার চেষ্টা করল। যদিও ওর মনের অবস্থা হাসার মত নয়।

যে ডাইনিটা হাতে জ্বলন্ত ওয়ান্ড ধরেছিল, সে বললো–উঃ যা ভেবেছিলাম ঠিক সেরকমই দেখতে! দলের মধ্যে মনে হল তার বয়স কম। ওর মুখটা লম্বা ক্ষীণ, মলিন। চকচকে কৃষ্ণবর্ণ চোখ। মাথার চুল ছোট ছোট ও খাড়া খাড়া, রং বেগুনি। ওয়াটচের, হ্যারি!

-ইয়া, আমি জানি তুমি কি বলতে চাইছ, রেমাস, একজন টাক মাথার কালো জাদুকর অনেক দূর থেকে বললো। ওর গলার স্বর মৃদু হলেও বেশ গম্ভীর। ওর কানে একটা করে সোনার চাকা। ওকে দেখতে অনেকটা জেমসের মত।

–চোখ দুটো ছাড়া; একজন রূপালী চুলের উইজার্ড ফোঁসফেঁসে গলায় বললো–লিলির চোখের মত।

ম্যাড আই মুডি, মাথায় ওর ধূসর বর্ণের চুল। নাকের অনেকটা অংশ নাক থেকে অপসৃত ও সন্ধিগ্ধভাবে ওর ট্যারা চোখে তাকিয়েছিল। একটা চোখ ছোট, কাল আর উজ্জ্বল, অন্যটা বড় বড় গোলাকৃতি, নীল ইলেকট্রিক বাতির মত। সেই চোখ দিয়ে ও দেওয়াল, দরজা ভেদে করে, এমনকি নিজের মাথার পেছনটাও দেখতে পান।

–লুপিন তোমার কোনও সন্দেহ নেই এই সেই ছেলে? ও ঘোৎ ঘোৎ করে বললো–ওর মত দেখতে একজন ডেথ ইটারকে আনতে পারলে বেশ ভালই হত। আসল পটার এই ছেলেটা কিনা জানতে হলে পটার সম্বন্ধে ওকে প্রশ্ন করার দরকার আছে, যদি না কেউ ভেরিটাসিরাম এনে থাকে?

লুপিন জিজ্ঞেস করল–তোমার পেট্রোনাস কি রকম রূপ নিয়েছিল?

–হরিণের সিং হ্যারি ঘাবড়ে গিয়ে বললো।

সকলেই ওর দিকে তাকিয়ে আছে, হ্যারির খুব অস্বস্তি লাগছে। সেই রকম মন নিয়ে ও ধীরে ধীরে নিচে নামল। জাদুদণ্ডটা জীনসের পেছনের পকেটে নিতে ভুলল না।

মুডি গর্জন করে বললেন–ওহে ওটা তোমার পকেটে রেখো না। ওটা থেকে যদি আগুন বেরোয়? এইরকম ভুল করে তোমার চেয়ে অনেক বড় বড় জাদুকর তাদের পাছা… হাঃ হাঃ, তুমি সেসব জানো না।

বেগনি চুলের মহিলা তৎক্ষণাৎ ম্যাড আইকে বললো–তা তুমি তাদের নাম বলতে পার?

ম্যাড আই মুডি বললেন–ওসব কথায় কান দিও না। আমি যা বললাম তাই কর। ওই দণ্ডটি পকেট থেকে বার করে নাও। প্রাথমিক সুরক্ষা, আজকাল কেউ তার ধার ধারে না। কথাটা বলে কিচেনের দিকে এগিয়ে গেলেন।

লুপিন হাত বাড়িয়ে হ্যারির সঙ্গে করমর্দন করল।

–কেমন আছ তাই বল? হ্যারিকে খুব কাছ থেকে দেখতে দেখতে লুপিন বললেন।

–খুউব ভাল।

হ্যারি ভাবতে লাগল ওদের আসাটা স্বপ্ন না সত্যি! চার চারটে সপ্তাহ ধরে ও নিষ্কর্মা হয়ে বসে আছে প্রাইভেট ড্রাইভে–হঠাৎ একত্রে এতগুলো নামী জাদুকর ওর সামনে দাঁড়িয়ে? মনে হয় ওরা অনেক আগেই এখানে আসার পরিকল্পনা করে এসেছেন। লুপিনকে ঘিরে যারা দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাদের দিকে হ্যারি তাকাল। ওরা তখনও ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। ও খুব লজ্জায় পড়ে গেল। গত চার পাঁচদিন নানা ঝামেলা ও মন খারাপের জন্য জীনস শার্ট ইত্যাদি পরা ও চুলটুল আঁচড়ানোর দিকে লক্ষ্য রাখেনি।

হ্যারি মিন মিন করে বললো–ওরা কেউ বাড়িতে নেই আমার ভাগ্য ভাল।

–ভাগ্যবান–হাঃ হাঃ, বেগুনি চুলওয়ালা মহিলা বললেন; আমিই প্ল্যান করে ওদের বাড়ি থেকে তাড়িয়েছি। মাগলদের দিয়ে একটা ফালতু চিঠি পাঠিয়েছি। চিঠিতে লেখা হয়েছে অল ইংল্যান্ড সুবারবন লন প্রতিযোগিতায় তোমরা শর্ট লিস্টেড হয়েছে, ওরা ছুটেছে প্রাইজ নিতে, ভেবেছে সত্যি।

অল ইংল্যান্ড বেস্টকেষ্ট সুবারবন লন কমপিটিসন। স্রেফ ভাওতা জানতে পেরে আঙ্কল ভার্ননের মুখোভাব কেমন হবে–ভাসা ভাসা হ্যারির চোখের সামনে ফুটে উঠল।

ও জিজ্ঞেস করলো–আমরা তাহলে এখনই রওনা হব? খুব তাড়াতাড়ি?

–বলতে পার এখনই; লুপিন বললেন। আমরা সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করছি।

–আমরা কোথায় যাচ্ছি, বারোতে? হ্যারি মনের মধ্যে বিরাট আশা নিয়ে জানতে চাইল।

–না বারোতে নয়; লুপিন বললেন হ্যারিকে কিচেনের দিকে যেতে, যেসব উইজার্ডরা এসেছিল তারা পিছু পিছু চলল। সকলেরই হ্যারির দিকে কৌতূহল দৃষ্টি। –খুবই ঝুঁকির ব্যাপার। আমরা একটা অতি গোপনীয় জায়গায় সদর দপ্তর খুলেছি। সেখানেই যাবার সম্ভাবনা।

ম্যাড আই কিচেন টেবিল হিপফ্লাক্স থেকে কিছু নিয়ে খাচ্ছিলেন, ওর জাদুর চোখ চতুর্দিকে চরকির মত বন বন করে ঘুরছে। ডার্সলেদের অনেক পরিশ্রম বাঁচানো অ্যাপলায়নসের ওপর ওর দৃষ্টি।

–উনি অ্যালস্টার মুডি, হ্যারি। লুপিন, মুডিকে আঙ্গুলি দিয়ে দেখিয়ে হ্যারিকে বললেন।

–হা হা আমি জানি, হ্যারি অস্থির চিত্তে বললো। এক বছর বা তারও বেশি ওনার সঙ্গে পরিচয়। চেনা জানা মানুষকে তাকে নতুন করে চিনিয়ে দেওয়া কেমন যেন অস্বস্তিকর লাগল।

–আর ইনি নিমফাভোরা।

–আমাকে নিফাড়োবা বলে ডাকবেন না, রেমাস অল্পবয়সী জাদুকরী শরীরে কাঁপুনী দিয়ে বললো–টংকস বলে ডাকবেন।

লুপিন হাসতে হাসতে বললেন–আমাদের প্রিয় জাদুকরী নিমফাডোরা টংকস তার পদবীতে ডাকা পছন্দ করে।

–আর ইনি কিংগয়ে শ্যাকেলটন।

লুপিন দীর্ঘকায় কালো জাদুকরকে দেখিয়ে বললেন। কিংগশ্নে মাথা নোয়াল। আর ও এলফিয়াস ডোগে ফাসাসে গলার জাদুকর ঈষৎ মাথা হেলাল। ডিডেলাস ডিগ্নিল বেগুনি রং-এর টপহ্যাট হাত থেকে পড়ে গেল ডিগগিলের মাথা হেলানোর সময়। বললো–এর আগে দেখেছি মিস্টার হ্যারিকে।

–এমেলাইন ভানস। সবুজ পান্না রঙ-এর শাল গায়ে দেওয়া বেশ মনোগ্রাহী চেহারার মহিলা মাথা নত করে নিজের পরিচয় দিয়ে বললো। স্টার গিস পডমোর, চৌক চোয়ালের জাদুকরী মাথায় খড়ের রঙ-এর চুল তার চোখ মারল।

–আমি হেসটিয়া জোনস, গোলাপী চিবুকের কাল চুলের এক জাদুকরী টোস্টারের ধারে বসেছিল হাত নাড়িয়ে বললো।

হ্যারিকে সকলের সঙ্গে পরিচয় করে দেবার সময় ও জবুথবু হয়ে মাথা নোয়াল। ওর দিকে যেন ওরা না তাকিয়ে থাকে হ্যারি মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগল। ওর মনে হল সবাই যেন ঠেলেটুলে ওকে স্টেজের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আরও আশ্চর্য হল একসঙ্গে এত লোক আসার কারণ কি?

সুপিন বললেন–অনেকেই তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়েছিল। এমনভাবে বললেন যেন লুপিন হ্যারির মনের কথা জানতে পেরেছেন।

মুডি বললো–হা হা যা বলেছে। পটার আমরা হচ্ছি তোমার দেহরক্ষক।

লুপিন বললেন–রাস্তা টাস্তা সব ঠিকঠাক জানার পর সদর দপ্তর সবুজ সংকেত দেবে, তারই অপেক্ষা করছি আমরা। লুপিন জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। হাতে আমাদের আর পনের মিনিট সময় আছে।

পংকস বললো–মাগলসরা খুবই নির্ঝঞ্ঝাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তাই না? কথাটা বলে রান্নাঘর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। আমার বাবা মাগল পরিবারে জন্ম। জাদুকররা যেমন একরকম হয় না, মাগলরাও তাই। যা বলেছ, হ্যারি বললো। তারপর লুপিনের দিকে তাকিয়ে বললো–আমি বুঝতে পারছি না কি সব ঘটছে। কার কাছ থেকে খবরটা পেলে।

কথাটা শুনে কয়েকজন জাদুকর, জাদুকরী হিস হিস শব্দ করল। ডিডেলাস ডিগগিলের হাত থেকে হ্যাট আবার পড়ে গেল। মুডি ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে উঠলেন চুপ চুপ কর।

–কেন? হ্যারি বললো।

মুডি একটা চোখ হ্যারির দিকে আর ম্যাজিক চোখটা সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে বললেন–এখানে বসে এসব আলোচনা করা ঠিক নয়। চুলোয় যাক, জাহান্নামে থাক, রেগেমেগে ম্যাজিক্যাল চোখটা হাতে চাপা দিলেন। নোংরা লোকটা এটা ব্যবহার করার পর ঠিকমত চোখে আটকাচ্ছে না।

টংকস বললো–পুরনো কথা টেনে আনবেন না ম্যাড আই। শুনতে বিশ্রী লাগে।

হ্যারি আমাকে একগেলাস জল এনে দিতে পারো?.মুডি অনুরোধ করলেন। হ্যারি মুডিকে এক গেলাস পরিষ্কার জল এনে দিল। জল দেবার সময় দেখল জাদুকর-জাদুকরীরা ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে।

হ্যারির হাত থেকে গেলাসটা নিয়ে মুডি বললেন–চিয়ার্স। তারপর মুডি গেলাসের জলে জাদুই চোখটা ফেলে দিতেই ওটা সোঁ সোঁ শব্দ করে ঘুরতে লাগল। তাকিয়ে রইল সকলের দিকে পালা করে। তাকিয়ে বললেন–আমি তিনশ ষাট ডিগ্রি ভিজিবিটিটা চাই যখন আমরা সদর দপ্তরে ফিরে যাব।

হ্যারি জিজ্ঞেস করল–আমরা কেমনভাবে যাব, কোথায় যাচ্ছি?

–ঝাড়ু, লুপিন বললো–তুমি ওই ঝাড়ুটা ঠিকমত ব্যবহার করতে পারবে না? ওরা ফ্ল নেটওয়ার্কের ওপর নজর রাখবে।

–রেমাস বলেছে তুমি নাকি খুব দক্ষ উরুকে, কিংগশ্নে ওর গম্ভীর গলায় বললেন।

লুপিন বললেন, অসাধারণ। ঘড়িতে সময় দেখল–যাকগে, হ্যারি তোমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। সংকেত এলেই আমাদের এক মুহূর্ত দেরি না করে উড়তে হবে।

টংকস হাসতে হাসতে বললো–আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি হ্যারি?

সকলে কৌতূহলী আর আগ্রহের চোখে তাকিয়ে রইল হ্যারি আর টংকসের দিকে। ওরা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল।

–বা সুন্দর! টংকস বললো: খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্নও বটে। আমি কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছ? একটু অস্বাভাবিক। বাঃ তোমার ঘরটি আরও ভাল।

হ্যারি ঘরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে দিল।

ওর ঘরটা বাড়ির অন্যসব ঘর ইত্যাদির মত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়। চারদিন ঘরে বন্দি হয়ে থেকে হ্যারি কুঁড়ের মত শুয়েছিল। সাফসুতরো থাকতে ইচ্ছে করেনি। হেডউইগের খাঁচাটা খুবই নোংরা। সেটা পরিষ্কার করা হয়নি। গন্ধ বেরোচ্ছে তাঁচা থেকে; ট্রাঙ্কটা খোলা অবস্থায় রয়েছে, বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে কোনও রকমে গুঁজে সুজে রাখা জিনিসপত্র। তার মধ্যে মাগলদের জামা-প্যান্ট ছাড়াও জাদুকরের বেশভূষাও রয়েছে। মেঝেতেও কিছু জিনিসপত্র পড়ে রয়েছে।

সময় বাঁচানোর জন্য হ্যারি ওর বই, খাতাপত্র ইত্যাদি ছুঁড়ে ছুঁড়ে ট্রাঙ্কের মধ্যে ভরতে লাগল। ওদিকে টংকস ওর আলমারির একটা পাল্লায় ফিট করা আয়নাতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে লাগল।

ও খুব দুঃখ ভরাক্রান্ত সুরে বললো–বেগুনি গায়ের রং আমার নয়। কথা বলতে বলতেও খোচা খোচা বর্শার ফলকের মত চুলগুলো টানে টংকস। আমাকে কি ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে হ্যারি?

টংকসের মাথার ওপর ঝোলানো কিডিচ টিমস ব্রিটেন আর আয়ারল্যান্ডের ফটো দেখতে দেখতে হ্যারি বললো–যা বলেছ।

–নাগো না তাই; টংকস সাফ বললো। তারপর চোখ দুটো এমনভাবে ঘোরালো যেন কিছু মনে করার চেষ্টা করছে। এক সেকেন্ড পর ওর মাথার চুলের রং গোলাপী বাবলগামের মত হয়ে গেল।

–আরে কেমন করে রং বদলালে? হ্যারি টংকসের বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে বললো।

–আমি হচ্ছি বহুরূপী। আয়নাতে দেখে নিল ওর চুলের পরিবর্তন। এর মানে আমি আমার চেহারাও পরিবর্তন করতে পারি? টংকস হ্যারির হতভম্ব হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে বললো। আমার জন্মগত শক্তি বুঝলে। আরর ট্রেনিং-এ আমি ছদ্মবেশ আর লুকোচুরিতে সকলের চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছিলাম। বুঝলে, কোনও পড়াশুনা না করেই। দারুণ না!

–তুমি আরর? হ্যারি বললো।

–হ্যাঁ, টংকস গর্বিতভাবে বললো। কিংগসেও–তবে ও আমার চেয়ে উন্নত মানের। আমি মাত্র গত বছরে যোগ্যতা অর্জন করেছি। গোপনতা আর অনুসরণ

এ গাড়ু মেরেছিলাম। তাছাড়া আমি একটু নড়বড়ে। রান্না ঘরে কাঁচের জিনিস। ভাঙার শব্দ শুনতে পাওনি?

হ্যারির তখন ট্রাঙ্ক গোছানো শেষ হয়েছে।

–আমাকে তুমি কেমন করে বহুরূপী হতে হয় শেখাবে?

টংকস চাপা হাসল। –তুমি কপালের দাগটা লুকোতে চাও? ও হ্যারির কপালের কাটা দাগের দিকে তাকাল।

—কিছু মনে করি না। কেউ ওর কপালের কাটা দাগের দিকে তাকিয়ে থাকে ওর ভাল লাগে না।

–শেখাটা খুব কঠিন কাজ। ওটা জন্মগত। পড়াশুনো করে, ট্রেনিং নিয়ে ওটা হয় না।

হ্যারি বই, জামা-কাপড়, টেলিস্কোপ এবং স্কেল বাক্সবন্দি করল। টংকস ট্রাঙ্কের সব জিনিস দেখতে দেখতে বললো–বাঃ সব নিয়েছ দেখছি।

কড়াই? ঝাড়ু? ওহ! আগুনের বল ছোঁড়ার গুলতি?

হ্যারির ডান হাতে ধরা ঝাড়ু দেখে টংকসের দুচোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! ঝাড়ুটুা হ্যারির বিশেষ গর্বের আনন্দের। সিরিয়স ঝাড়ুটা ওকে উপহার দিয়ে ছিলেন আন্তর্জাতিক মাপের ঝড়।

–আমি এখনও কমেট টু সিক্সটি চালাই, টংকস বললো। আহাহ! তোমার জীনসের পেছনের পকেটে এখনও জাদুদণ্ড রয়েছে। ওকে, চলো আমরা লোকোমোটর ড্রাঙ্কের দিকে যাই। টংকের সুরে একটু ঈর্ষার ভাব।

ট্রাঙ্ক আর হেডউইগের শূন্য পেঁচা আর ঝাড়ু নিয়ে ওরা নিচে নামল মুডি ওদিকে জলের গেলাস থেকে জাদুর চোখ পরে নিয়েছে। পরিষ্কার করার পর ওটা যেন লাফাচ্ছে। হ্যারির ওটা দেখে ভাল লাগে না। টংকস আর হ্যারিকে দেখে লুপিন সহাস্যে বললেন–চমৎকার চলো আমরা বাগানে গিয়ে দাঁড়াই। ওখান থেকেই আমরা নতুন করে দপ্তরে যাবো। আমরা প্রস্তুত। ওহ হ্যারি তোমার আঙ্কলকে কোনও রকম চিন্তা না করার জন্য একটা চিঠি রেখে গেলাম।

–ওরা একটুও চিন্তা করবে না, হ্যারি বললো।

 –তুমি ভাল আছ সেটা জানে বলেই।

–ভাল আছি জানতে পারলে মুষড়ে পড়বেন।

–আবার ওদের সঙ্গে আগামী গ্রীষ্মে দেখা হবে।

–আবার এখানে আসতে হবে?

লুপিন কোনও জবাব দিলেন না।

–এদিকে এসে দাঁড়াও হ্যারি। মুডির হাতে তার ওয়ান্ড। তোমাকে মোহমুক্ত করাতে হবে মুডি বললো।

–কী করবেন …? হ্যারি ভয় ভয়ে বললো।

–জাদুবলে সুরক্ষিত, মুডি বললো ওর হাতের জাদুদণ্ড উঁচু করে। লুপিন বলছিল তোমার অদৃশ্য হয়ে যাবার একটা আলখেল্লা আছে। আমরা যখন উড়ে যাব তখন ওটার দরকার হবে না। উড়ে যাবে হাওয়াতে। এখন ঠিক আছে। চলো।

মুডি হ্যারির মাথাটা শক্ত করে মুড়ে দিলেন। হ্যারির মনে হল মুডি যেন একটা ডিম ওর মাথার ওপর ভাঙলেন। মুডি ওর গায়ে যেখানেই জাদুদণ্ড ছোঁয়ান সেখানটা বরফ শীতল হয়ে যায়।

টংকস বললো–চমৎকার! ম্যাড আই মুডি হ্যারির পেটের দিকে তাকালেন।

হ্যারি নিজের শরীরের দিকে তাকাল, আগের মত আর ও নেই। অদৃশ্য নয়, একটি গিরগিটির মত রঙ আর বয়নবিন্যাস। অনেকটা রান্নাঘরের মত। ও এখন একটা মানুষের দেহ বিশিষ্ট একটা গিরগিটি হয়ে গেছে।

পিছনের দিকের দরজাটা খুলে মুডি বললো–তোমরা সবাই বাইরে চল।

যারা সব এসেছিল একে একে তারা আঙ্কল ভার্ননের সুসজ্জিত বাগানে দাঁড়াল।

মুডি ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বললেন–আকাশ পরিষ্কার রয়েছে।

ওর জাদুই চোখ উপরের আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। আরেকটু বেশি মেঘে ঢেকে দিলে ভাল হত। ঠিক আছে, সকলে হ্যারিকে লক্ষ্য রাখবে। আমরা খুব গা ঘেষাঘেষি করে উড়ব। টংকস থাকবে সামনে। লুপিন তোমাকে নিচে থেকে কভার করবে। আমি ঠিক তোমার পিছনে থাকব। বাকি সকলে গোলাকৃতিভাবে আমাদের ঘিরে থাকবে। যেন অন্যথা না হয়। সবাই আশা করি বুঝতে পেরেছ? যদি আমাদের মধ্যে কেউ মারা যায়?

হ্যারি শুকনো মুখে বললো–তার সম্ভাবনা আছে? মুডি হ্যারির কথায় কান দিলেন না।

–চলো, এবার আমরা সবাই উড়ে যাই, ওড়ার সময় কেউ কিন্তু থামবে না, অবস্থান বদল করবে না। শোন হ্যারি, ওরা যদি আমাদের পরাজিত করে। আর তুমি বেঁচে থাকো তবে আগের স্ট্যান্ডবাই প্রহরীরা তোমাকে পাহাড়া দিয়ে নিয়ে যাবে। তুমি সোজা পূর্বদিকে উড়বে, তখন স্ট্যান্ডবাই প্রহরীরা তোমাকে দেখতে পেয়ে ঠিক জায়গায় নিয়ে যাবে।

টংকস বললো–ম্যাড আই এসব কথা বলবেন না। হ্যারি ভুল বুঝতে পারে, ভাববে ওকে আমরা হেলাফেলা করে নিয়ে যাচ্ছি।

টংকস হ্যারির জিনিসপত্র ওর ঝাড়ুতে ঠিকমত বেঁধে দিল যাতে দূরন্তভাবে মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় কোনও কিছু পড়ে না যায়। লুপিন বললো প্রথম সংকেত তোমরা ঝাড়ু বেঁধে নাও, আকাশের দিকে নিশানা করলেন।

কিংগস্লে বললো–ভয় নেই হ্যারি আমরা কেউ মরছি না।

অনেক অনেক দূরে আকাশে গাদাগাদা উজ্জ্বল লাল আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগল। তারাগুলো চকমক করতে লাগলো। হ্যারি ওর ডান পা ফায়ার বোল্টে রেখে হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরল। ফায়ার বোল্ট থর থর করে কেঁপে উঠল।

–দ্বিতীয় সংকতে, চলো; লুপিন বললেন। আকাশে আরও উজ্জ্বল লাল আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগল।

হ্যারি ভেসে চলল। নিচে দেখতে পেল প্রাইভেট ড্রাইভের চৌকো চৌকো বাড়ি, সবুজ ঘাষের বাগান। ঠাণ্ডা দূরন্ত হাওয়া ওর বড় বড় চুলগুলো যেন উড়িয়ে। নিয়ে যাচ্ছে। একটু একটু করে নিচের সব মাঠ-ঘাট বাড়ি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। ঠাণ্ডা ঝড়ো বাতাস ওর মনের ভেতর থেকে মন্ত্রণালয়ের চিঠি, যেখানের শুনানির জন্য যাওয়ার ভাবনাও উড়িয়ে নিয়ে গেল। মনে হল মুক্তির আনন্দ ওর বুকের ভেতরটা খান খান করে দেবে। বিরাট অনন্ত আকাশ ওর সব ভাবনা চিন্তা, সমস্যা একটু একটু শূন্যে পরিণত হলো। তারা ভরা আকাশে সব কিছুই মূল্যহীন, অর্থহীন, তুচ্ছ মনে হল। প্রাইভেট ড্রাইভ থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান আর রইল না।

–বাঁ ধারে, বা ধারে, এই দেখ একটা মাগল আমাদের দেখছে! মুডি চিৎকার করে বললো। টংকস আদেশ মত বাঁক নিল। হ্যারি ওকে অনুসরণ করল, লক্ষ্য রাখল ওর পিছনে বাঁধা লম্বা শুড় তীব্র হাওয়াতে পৎপৎ করে দুলছে। আমাদের আরও অনেক উপরে উঠতে হবে কম করে কোয়ার্টার মাইল।

শো করে ওপরে ওঠার সময় ঠাণ্ডাতে ওর দুচোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। ওর নিচে সবকিছুই গভীর অন্ধকারাচ্ছন্ন। শুধু অন্ধকারের মধ্যে দেখতে পেল বিন্দু বিন্দু আলো, খুব সম্ভব গাড়ির হেডলাইট। নয়ত রাস্তার আলো।

–দক্ষিণে বাঁক নাও, মুডি জোরে জোরে বললেন–আগে শহর!

নিচের মাকড়সার জালের মত আলো ছাড়িয়ে ওরা দক্ষিণে চলল। সামনে ছোট একখণ্ড মেঘ, ওটাকে এড়িয়ে ওরা চললো।

টংকস রেগে মেগে বললো, ম্যাডআই আমরা মোটেই মেঘের ওপর দিয়ে যাচ্ছি না। সর্বাঙ্গ ভিজে যাচ্ছে।

হ্যারি টংকস-এর কথা শুনে আস্বস্ত হল। ঠাণ্ডায় ওর হাত-পা সমস্ত শরীর যেন বরফ হয়ে গেছে। ফায়ার বোন্টের হাতল ভাল করে চেপে ধরতে পারছে না। একটা গরম কোট পেলে যেন শীত কাটত। ও ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল।

যাত্রাপথ মুডির নির্দেশমত ওরা কখনও কখনও বদলাতে থাকে বরফ শীতল হাওয়াতে হ্যারির চোখ বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। অনেক কষ্টে মাঝে মাঝে তাকায়। কানেও ব্যথা করতে থাকে। হাফলপাফের বিরুদ্ধে কিডিচ খেলাতে এই রকম ঠাণ্ডা লেগেছিল। তখন ও তৃতীয় বছরের ছাত্র। ঠাণ্ডা ঝড়ো হাওয়া ও এখনও ভুলতে পারে না। ওর চারপাশের প্রহরীরা রাজপাখীর মত ওকে ঘিরে উড়তে থাকে। হ্যারি বুঝতে পারে না কতক্ষণ ধরে উড়ে চলেছে। কম করে এক ঘণ্টা তো হবেই।

–দক্ষিণ পশ্চিমে চলো, মুডি নির্দেশ দিলেন–আমাদের গাড়ি চলার রাস্তা এড়িয়ে চলতে হবে।

হ্যারির এত শীত করছিল যে, মুডির গাড়ির কথা শুনে, তলা দিয়ে যে গাড়ি চলছে তার ভেতরে ঢুকতে হ্যারির ইচ্ছে করলো।

ফ্লু পাউডারের কথাও মনে হলো। সেখানে খুব অস্বস্তিকরভাবে লাটুর মতো ঘুরলেও অগ্নিশিখার উষ্ণতা তো আছে।

–আমাদের কেউ ফলো করছে না নিশ্চিত হবার জন্য যে কিছুটা পিছনে হটতে হবে, মুডি বেশ জোরে জোরে বললেন।

আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন ম্যাড আই? টংকস সামনে থেকে চেঁচিয়ে বললো, আমরা সবাই ঝাড়ুর সঙ্গে জমে বরফ হয়ে গেছি! এইরকমভাবে রাস্তা বদলালে মনে হয় ওখানে পৌঁছতে আরও এক সপ্তাহ লাগবে। তাছাড়া আমরা তো প্রায় পৌঁছে গেছি।

লুপিন বললেন–তুমি টংকসকে ফলো করো হ্যারি!

তারপর ওরা ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে।

হ্যারি এখন সব দেখতে পাচ্ছে। বাড়িঘর বাগান ছোট বড় রাস্তা রাস্তা দিয়ে অগণিত মানুষ, গাড়ি চলেছে। রাস্তার তীব্র আলোতে সবকিছু দিনের মতো মনে হয়। রাস্তার আলো, বাড়িঘরের আলো, এত চমক আগে ও দেখেনি। ও যত তাড়াতাড়ি আকাশ থেকে জমিতে নামতে চায়। কিন্তু নামতে পারবে না কেউ ওকে ঝাড়ু থেকে ছিন্ন না করলে।

–এসে গেছি! টংকস সকলকে জানাল। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হ্যারি টংকসের সঙ্গে একটা স্কোয়ারের মধ্যে আগাছাপূর্ণ ঘাসের ওপর নামল।

টংকস নেমেই চটপট হ্যারির সব জিনিসপত্র নামিয়ে দিলেন। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাপতে হ্যারি এধার ওধার তাকাল। বাড়িগুলোর বন্ধ দরজা দেখে মনে হল ওরা কেউ ওকে স্বাগত জানাচ্ছে না। বাড়িগুলো একটাও ঝকমকে নয়। জীর্ণ প্রায় ভগ্ন দৈন্য দশাপ্রাপ্ত। দেওয়ালে পলেস্তরা নেই। কোনও কোনও বাড়ির দেয়াল থেকে গাছ গজিয়েছে। আলো নেই বললেই চলে। থাকলেও টিম টিম করছে। দেখলেই ভৌতিক মনে হয়। অনেক বাড়ির সামনে গাদা গাদা রাবিশ, ভাঙা ইট পাথর, জঞ্জাল জরো হয়ে রয়েছে।

হ্যারি হতভম্ব হয়ে বললো–আমরা কোথায় এসেছি?

লুপিন ওর কথা শুনে শান্ত স্বরে বললেন–মিনিট খানেকের মধ্যে জানতে পারবে।

মুডি ওর আলখেল্লা খুলছিলেন। ওর হাত দেখে মনে হয় বরফে জমে গেছে।

–পেয়েছি; ও বিড়বিড় করে বললো। হাত তুলে একটা রূপোর সিগারেট লাইটার দেখালেন। ওটা ক্লিক করলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাছে সব রাস্তার অনেক আলো নিভে গেল। আবার লাইটার ক্লিক করতেই আরও কিছু আলো নিভে গেল। মুডি এক এক করে রাস্তার সব আলো নিভিয়ে দিলেন। শুধু বাড়ির ভেতরের আলো তাও পরদা ঢাকা। আকাশের চাঁদের আলোও।

মুডি বললেন–ডাম্বলডোরের কাছ থেকে এটা নিয়েছি। কথাটা বলে পুট আউটারটা পকেটে রেখে দিলেন।

মুডি হ্যারির হাত ধরে রাস্তার ধারে একটা পেভমেন্টের ওপর দাঁড়ালেন। লুপিন, টংকস হ্যারির জিনিসপত্র ঘাড়ে নিয়ে পেছনে পেছনে চলল। প্রহরীরা তাদের ম্যাজিক ওয়াল্ড জ্বালিয়ে পাশে পাশে হাঁটতে লাগল।

খুব কাছের একটা দোতলা বাড়ির জানালা থেকে তীব্রভাবে স্টিরিও চলার শব্দ শুনতে পেল হ্যারি। নাকে এল ডাস্টবিনে জমা করে রাখা ময়লা ইত্যাদির পচা গন্ধ।

–এসে গেছি, মুডি খুব চাপাগলায় বললেন। হ্যারির মোহমুক্ত করা হাতে এক টুকরা পার্চমেন্ট দিল। হাতের ম্যাজিক ওয়ান্ড জ্বালিয়ে লেখাগুলো পড়ার মত করলো। ছোট ছোট হাতের লেখাগুলো হ্যারির পরিচিত বলে মনে হচ্ছিল। তাতে লেখা:

অর্ডার অফ ফনিক্সের সদর দপ্তর বার নম্বর গ্রিনল্ড প্লেস, লন্ডনে অবস্থিত।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *