০১. মূল দক্ষতা অর্জনের পথ

বিক্রয় ও জনসংযোগ প্রতিনিধি হবেন কীভাবে

 “সঠিক জনসংযোগের কাজে আমাদের সামাজিক মেলামেশায় কিছু উদ্দেশ্যের স্পর্শ থাকা নেহাতই জরুরি। মানুষকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করতেই হবে।”–হাবার্ট ক্যাসন

“যে বিশেষ ক্ষমতায় কোনো বিশেষ একজন অন্যকে প্রভাবিত করতে পারেন, ঠিক সেই ক্ষমতাকেই আমরা সংক্ষেপে ব্যক্তিত্ব বলে থাকি।”-রয় শেরউড

.

ভূমিকা

আমাদের জাতীয় জীবনে বয়স্ক শিক্ষা আন্দোলন বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, আর এই কাজে সবচেয়ে সক্রিয় ব্যক্তি নিঃসন্দেহে ডেল কার্নেগি। কার্নেগিই বোধহয় আজকের দুনিয়ায় একমাত্র মানুষ যিনি সবচেয়ে বেশি বয়স্কদের লেখার আর বক্তৃতার সমালোচনা করেছেন। রিপ্লের ‘অবিশ্বাস্য’ নামের কার্টুনে প্রকাশ পেয়েছে কার্নেগী প্রায় দেড়লক্ষ বক্তৃতা সমালোচনা করেছেন। সংখ্যাটা শুনে যদি তেমন ধারণা না জন্মায় তাহলে বলি, এর অর্থ হলো কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করার পর যতদিন কেটেছে তারপর জন্মায় তাহলে একটি করে বক্তৃতা।

ডেল কার্নেগির জীবন সত্যিই বিচিত্র মানুষ কোনো মৌলিক ধারণা পোষণ করলে আর তার আগ্রহ থাকলে কি করা সম্ভব এ জীবন তারই জ্বলন্ত উদাহরণ।

মিসৌরীর এক খামারে, রেললাইন থেকে দশ মাইল দূরে জন্মানোর পর তিনি বারো বছর বয়সের আগে কোন গাড়ি দেখেন নি। অথচ প্রৌঢ়ত্বের সীমায় পৌঁছনোর পর পৃথিবীর সর্বত্রই তাঁর পরিচিতি।

এই মানুষটি প্রথম জীবনে প্রায় আধ ডজন বার জনগণের সামনে কথা বলতে গিয়ে ব্যর্থ হন, অথচ তিনিই হন আমার ব্যক্তিগত ম্যানেজার। আমার সাফল্যের অনেকখানিই ডেল কার্নেগির শিক্ষার ফলেই হয়েছে।

তরুণ কার্নেগি শিক্ষার জন্য প্রচণ্ড সংগ্রাম করেছিলেন। গোড়ার তাকে পড়ে থাকতে হয় উত্তর পশ্চিম মিসৌরীর ভাঙাচোরা সেই খামারে। হতাশায় মরীয়া হয়ে কার্নেগিপরিবার মিসৌরীর কাছে। ওয়ারেনসবুর্গের স্টেট টিচার্স কলেজের কাছে আর একটা খামার কেনেন।

ওই কলেজে প্রায় ছ’শ ছাত্র ছিলো। কার্নেগির এমন টাকা ছিলো না যাতে শহরে থাকা সম্ভব। তিনি দেখলেন কলেজে সেই ছাত্রদেরই রমরমা, যারা ফুটবল আর বেসবল খেলে বা যারা বিতর্ক আর লোকজনের সামনে বক্তৃতা দিয়ে বিজয়ী হয়।

খেলাধুলোয় কোন দক্ষতা নেই বুঝেই কার্নেগি বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় জয়ী হবেন ভাবলেন। মাসের পর মাস তিনি বক্তৃতা তৈরি করে চললেন।

কিন্তু এতো প্রাণপণ চেষ্টা, হারের পর হারের ফলে বৃথাই গেল। তারপর আচমকা তিনি জয়ী হতে আরম্ভ করলেন। কলেজের সব প্রতিযোগিতাতেই তার জয় হল। অন্য সব ছাত্ররাও এরপর তাকে শিক্ষা দিতে অনুরোধ জানাতে আরম্ভ করল আর তারাও জয়ী হল।

গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর পশ্চিম নেব্রাসকা আর পূর্ব উইণ্ডমিঙে তিনি ডাকযোগে শিক্ষার পাঠক্রম বিক্রি শুরু করেন। প্রচুর পরিশ্রম করেও তেমন সাফল্য এলোনা। জীবন ধারণের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নানা জীবিকা গ্রহণ করতে হল কার্নেগীকে। বিক্রয় প্রতিনিধি হয়ে প্যাকার্ড কোম্পানির ট্রাক বিক্রি তার মধ্যে অন্যতম।

সেই সময় কার্নেগির মতো অসুখী মানুষ বোধহয় আর ছিল না। প্রতিদিনের জীবন তার কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠল। তাঁর জীবনের আকাঙক্ষা ছিল বই লিখবেন, যে বই লেখার স্বপ্ন তিনি কলেজে পড়ার দিনগুলোয় দেখতেন। শেষপর্যন্ত তাই তিনি কাজে ইস্তফা দিয়ে দিলেন। মনে মনে কার্নেগি ঠিক করলেন গল্প, উপন্যাস লিখতে সুরু করবেন আর রাতের স্কুলে শিক্ষাদান করে জীবিকা নির্বাহ করবেন।

কিন্তু কী শিক্ষা দেবেন? কলেজ জীবনের দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করে কার্নেগীর মনের পটে জেগে উঠলো বক্তৃতা দেবার শিক্ষাই তাঁকে একমাত্র আত্মবিশ্বাস দিতে পেরেছিলো। এরই মধ্যে তিনি লাভ করেছিলেন সাহস, গতিশীলতা আর ব্যবসা জগতের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষমতা। এই কথা স্মরণ করেই কার্নেগি নিউ ইয়র্কের সমস্ত ওয়াই.এম.সি. এ. স্কুলে বাণিজ্য জগতে মানুষের বক্তৃতাদান শেখানোর ক্লাসে শিক্ষকের কাজের জন্য আবেদন জানালেন।

ব্যাপার কী? ব্যবসায়ীদের বক্তা হিসেবে গড়ে তোলা? অসম্ভব! এটা তারা ভালোই জানেন যে এরকম হতে পারে না। আগে এ চেষ্টা চালিয়ে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন।

স্কুল কর্তৃপক্ষ যখন তাকে প্রতিরাতে মাত্র দু ডলার মাইনেও দিতে রাজি হলেন না, কার্নেগি তখন মোট লাভের উপর কমিশনে কাজ নিতে রাজি হলেন–অবশ্য লাভ আদৌ হলে। আশ্চর্য ঘটনা হল, মাত্র তিনবছরে কর্তৃপক্ষ তাকে প্রতিরাতে দু ডলারের বদলে তিন ডরার দিতে থাকেন।

পাঠক্রম বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। ক্রমে অন্য শহরের স্কুলও এ কাহিনী শুনল। ডেল কার্নেগি নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোর, লন্ডন, প্যারী–সর্বত্রই খ্যাতিমান হয়ে উঠলেন। যারা তাঁর পাঠক্রমের প্রতি আগ্রহী ছিলেন তাঁদের জন্য ভালো কোন পাঠ্য পুস্তক ছিল না। কিন্তু তাতে উদ্যম হারান নি কার্নেগী–তিনি নিজেই একখানা বই লিখে ফেললেন ‘জনগণের সামনে বক্তৃতা ও বাণিজ্য জগতে প্রভাব বিস্তার।‘ আজ সেই বই সমস্ত ওয়াই এম. সি. এ., আমেরিকান ব্যাঙ্কার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ন্যাশনাল ক্রেডিট মেনস্ অ্যাসোসিয়েশনের সরকারী পাঠ্যপুস্তক।

আজ ডেল কার্নেগীর পাঠক্রমের ছাত্র সংখ্যা অন্য যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা পাঠক্রমের ছাত্র সংখ্যার চেয়ে বেশি।

ডেল কার্নেগির দাবি যে কোন মানুষই ক্ষেপে গেলে কথা বলতে পারে। তার মত হল আপনি যদি শহরের সবচেয়ে অজ্ঞ লোককেও মুখে ঘুসি মারেন, সে উঠে দাঁড়িয়ে উন্মত্তের মতই চিৎকার করে মনোভাব প্রকাশ করবে। তিনি আরো বলেন, যে-কোনো মানুষই আত্মবিশ্বাস থাকলে জনগণের সামনে সংলাপে সক্ষম। শুধু তার মনের অভ্যন্তরে আকাঙক্ষা যদি টগবগ থাকে।

আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পথ তার মতে হল, যে কাজে আপনার ভীতি আছে সেই কাজই করা। এই জন্যই তিনি তাঁর পাঠক্রমের ক্লাসে প্রত্যেককে অল্পবিস্তর বক্তৃতা দিতে বলে থাকেন। শ্রোতারাও সহানুভূতিশীল-কারণ তাঁরা সবাই একই নৌকার যাত্রী। একমাত্র ধারাবাহিক অনুশীলনই সাহস, আত্মবিশ্বাস আর আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পারে।

ডেল কার্নেগী আপনাদের বলবেন যে তিনি আজ পর্যন্ত এই বক্তৃতা দান শিক্ষা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কিন্তু তিনি অন্য একটা দাবীও করবেন, আর তাহল তার প্রধানতম কাজ মানুষের ভয় দূর করে সাহস জাগিয়ে তোলা।

কার্নেগীর সব ছাত্রই হলেন ব্যবসা জগতের মানুষ। এই জন্যই তারা চাইতেন দ্রুত কোন ফলাফল। যাতে তাদের শিক্ষাকে তারা কাজে লাগতে পারেন। কার্নেগি সে কাজে যে সম্পূর্ণ সফল আজ তাঁর পাঠক্রমের অভাবিত জনপ্রিয়তাই সেকথা প্রমাণ করে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম জেম্স বলেছিলেন, সাধারণ মানুষের সুপ্ত মানসিক ক্ষমতার মাত্র শতকরা দশভাগই জাগিয়ে তোলা সম্ভব। ডেল কার্নেগি বয়স্কদের সুপ্ত ক্ষমতা জাগিয়ে তুলে অলৌকিক কাণ্ড ঘটিয়েছেন।

লাওয়েল টমাস

.

০১. মূল দক্ষতা অর্জনের পথ

যে বছর টাইটানিক জাহাজটি উত্তর আতলান্তিকের শীতল সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয় সেই ১৯১২ সালে আমি জনগণের সামনে কথা বলার ক্লাসে শিক্ষাদান শুরু করি। তারপর থেকে হাজার হাজার মানুষ এই ক্লাসে শিক্ষালাভ করেছেন।

প্রথম ধাপ শুরু করার আগে আগ্রহীদের প্রথমেই সুযোগ দেওয়া হয়–এই শিক্ষাপদ্ধতি থেকে তারা কি লাভ করার আশা করেন সেটা জানাতে। স্বাভাবিক ভাবেই এর উত্তর পাওয়া গেল বিভিন্ন রকম। তবে আশ্চর্যের কথা মূল চাহিদা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিন্তু এক! আমাকে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে বলা হলেই আমি অত্যন্ত আত্ম-সচেতন আর ভীত হয়ে পড়ি যে ভালো করে ভাবতে পারি না, কি বলবো তা ভুলে যাই। আমি তাই আত্মবিশ্বাস, স্থৈর্য আর চিন্তা-শক্তি চাই। আমি ব্যবসাজগত বা সামাজিক জগতের সামনে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার আর বিশ্বাযযাগ্যভাবে কথা বলতে চাই।’

কথাটা পরিচিত লাগছে নাকি? এর অভাববোধ আপনাকেও বিব্রত করেনি কি? বাইরের জগতের সামনে আপনিও কি চান না বিশ্বাসযোগ্য আর প্রত্যয় উৎপাদনকারী বক্তৃতা দেবার ক্ষমতা অর্জন করতে? আমার ধারণা, অবশ্যই তা চান। এ বইটা যে পড়তে আগ্রহ বোধ করছেন তাতেই বোঝা যায় আপনি ভালোভাবে কথা বলার শক্তি অর্জনে আগ্রহী।

আমি জানি এর উত্তরে আপনি কি বলবেন : ‘কিন্তু মিঃ কার্নেগী, আপনি কি সত্যিই ভাবেন একদল লোকের সামনে আমি বেশ ঝরঝর করে কথা বলে যাওয়ার ক্ষমতা অর্জন করব?’

সারা জীবন ধরেই আমি মানুষকে তাদের ভয় দূর করে সাহস আর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে সাহায্য করেছি। আমার ক্লাসে যেসব অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেছে সে কথা লিখলে কয়েকখানা বইই হয়ে যাবে। তাই এটা কোন ভাবার ব্যাপার নয়। আমি জানি একাজ আপনি পারবেন শুধু এই বইয়ে যে নিয়মের কথা বলা হয়েছে সেগুলো যদি ঠিকমত অভ্যাস করেন।

আপনি যেমন ভাবে বসে থাকতে পারেন তেমন ভাবেই শ্রোতাদের সামনে সোজা দাঁড়িয়ে কেন চিন্তা করতে পারবেন না? শ্রোতাদের সামনে কথা বলতে গেলে ভয় আপনাকে ঘিরে ধরার কোন কারণ থাকতেই পারে না। মনে রাখবেন, এ অবস্থাকে অনায়াসেই বদল করা সম্ভব, শুধু চাই অভ্যাস আর শিক্ষা পদ্ধতি, এর সাহায্যেই এই ভয় দূর করে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা সম্ভব।

এই বইটি আপনাকে সেই উদ্দেশ্য সফল করতেই সাহায্য করবে। এটা সাধারণ পাঠ্য বই নয়। এতে বক্তৃতা দেওয়ার খুঁটিনাটি বিষয় নেই। এতে নেই কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল এতে রয়েছে সারা জীবন ধরে বয়স্কদের বক্তৃতা দেওয়া শিক্ষার অভিজ্ঞতার নির্যাস। যেমন আপনি যেখানে প্রতিষ্ঠিত, সেখান থেকেই আপনি যা হতে চান সেখানেই আপনাকে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি এ বই। আপনাকে করতে হবে শুধু সহযোগিতা-এ বইয়ের প্রতিটি নির্দেশ মেনে আপনার কথা বলার সুযোগ এলেই তা কাজে লাগাতে হবে।

এ বই কাজে লাগাতে আপনাকে পরবর্তী চারটি নির্দেশ প্রচুর সাহায্য করবে। ১। অপরের অভিজ্ঞতা স্মরণ করুন।

জন্মগত ক্ষমতালব্ধ বক্তার মতো প্রাণী আর নেই। সেকালে বক্তৃতা দেওয়ার ব্যাপারকে যখন উন্নত শিল্প বলে ভাবা হত তখন এমন বক্তা হওয়া নেহাতই কঠিন ছিল। আজকের দিনে বক্তৃতাকে কথপোকথনের বাড়তি সংযোজন বলেই ভাবা হয়। অতীতের সেই মনোহারিণী ভঙ্গি আর কণ্ঠস্বর আজ হারিয়ে গেছে। আজকের যুগে আমরা নৈশভোজে, সভায়, গির্জায়, টি ভি বা রেডিওতে শুনতে চাই শুধু সোজাসুজি বক্তৃতা। এখন আমরা চাই বক্তারা আমাদের একাত্ম হবেন, আমাদের দিকে কথা ছুঁড়ে দেবেন না।

অনেক স্কুলে পাঠ্য বইয়ে বলা হয় জনগণের সামনে বক্তৃতার ব্যাপারটা একটা বন্ধ শিল্প, যা শুধু বহুঁকাল চেষ্টায় কণ্ঠস্বর ঠিক করে ভাষায় অলঙ্কার জুড়েই করা যায়। আমি দীর্ঘকাল, প্রায় সারা জীবনই মানুষকে বুঝিয়েছি জনগণের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার কাজ খুবই সহজ। শুধু কতকগুলো সহজ নিয়ম মেনে চললেই হল। ১৯১২ সালে যখন প্রথম এই শিক্ষাদান শুরু করি তখন প্রাথমিক ছাত্রের মত আমিও এর অর্থ জানতাম না। আমি প্রথমে যে শিক্ষাদান শুরু করি তা আমার কলেজী শিক্ষার উপর নির্ভর করে।

 পরে দেখলাম ভুল পথে চলেছি। বয়স্কদের যে ভাবে শিক্ষা দিচ্ছিলাম তারা যেন নতুন কলেজ ছাত্র। আমি দেখলাম, আমি যে ওয়েবন্টার, বার্ড, পিট আর ওডোনেলকে নকল করতে বলেছি সেটা একেবারেই ভুল। আমার ক্লাসের ছাত্ররা যা চাইছিল তা হল, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সাহসের সঙ্গে পরিষ্কার গলায় ব্যবসা জগতের সভায় বক্তব্য রাখা। এরপর সব বই জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে কতকগুলো সহজ বিষয় নিয়ে ছাত্রদের মুখোমুখি হতে আমার দেরী হয় নি। এতেই কাজ হল আর ছাত্ররাও বেশি সংখ্যায় আসতে লাগল।

আমার অফিসের তাকে আর দুনিয়াময় শাখা অফিসে যে সব প্রশংসাপত্র জমিয়ে রাখা আছে সেগুলো যদি দেখতেন, আপনারা অবাক হয়ে যেতেন। এসব চিঠি এসেছে নামী সব শিল্প অধিকর্তার কাছ থেকে যাঁদের নাম সংবাদপত্রের শিরোণাম। এ ছাড়া এসেছে রাজ্যের গভর্ণর, পার্লামেন্টের সদস্য, কলেজের প্রেসিডেন্ট আর শিল্পী জগতের মানুষের কাছ থেকেও। শুধু এই নয়, আরও চিঠি পেয়েছি গৃহকর্ত্রী, মন্ত্রী, শিক্ষক, কোম্পানী অধিকর্তা। শ্রমিক-দক্ষ ও অদক্ষ, ইউনিয়ন সদস্য। কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, ব্যবসায়ী মহিলা। এঁরা সকলেই চেয়েছেন জনগণের সামনে আত্মবিশ্বাস নিয়ে গ্রহণীয় হতে। তারা সফলতা লাভ করায় কৃতজ্ঞতায় আমাকে সপ্রশংসা চিঠি না লিখে পারেন নি।

যে-সব হাজার হাজার মানুষকে আমি শিক্ষা দিয়েছি তার মধ্যে একজনের কথাই আমার মনে আসছে যেহেতু ব্যাপারটা সে সময় আমার উপর দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। কয়েক বছর আগে ফিলাডেলফিয়ার একজন সফল ব্যবসায়ী ডি. ডব্লিউ. ঘেন্ট আমার পাঠক্রমে যোগ দেওয়ার পর আমাকে লাঞ্চে নিমন্ত্রণ করেন। তিনি আমায় বলেন : বহু সভায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ আমি এড়িয়ে গিয়েছি মিঃ কার্নেগী। বর্তমানে আমি এক কলেজে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। সভায় তাই সভাপতিত্ব করতেই হবে। আপনি কি মনে করেন এই বয়সে বক্তৃতা শেখা সম্ভব?

আমি ওই বয়সের মানুষকে শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা থেকে জানালাম এটা নিশ্চয়ই সম্ভব আর তিনি সফল হবেনই।

তিন বছর পর তাঁর সঙ্গে আবার মঞ্চে যাই। প্রথম সাক্ষাতের সময় যে টেবিলে বসেছিলাম সেটাতেই আমরা বসি। আমি তার কাছে জানতে চাই আমার ভবিষ্যত বাণী ঠিক হয়েছে কি না। তিনি হেসে একটা নোট বই বের করে দেখালেন কতগুলো জায়গায় তিনি বক্তৃতার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। তিনি আরও বললেন, এই বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা, বক্তৃতা দান করে যে আনন্দ আমি পাই তার তুলনা নেই।

শুধু এই নয়–তিনি তুরুপের যে তাসটি এবার দেখালেন তা হল ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সভায় প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব তাঁকেই দেওয়া হয়েছে।

আর একটা উদাহরণ দিই। বি এফ, গুডরিচ কোম্পানী বোর্ডের চেয়ারম্যান এম গুডরিচ একদিন আমার অফিসে এসে বলেন, আমি সারা জীবনে যতবার বক্তৃতা দিতে চেয়েছি ততবারই ভয়ে কেঁপেছি। বরাবর বোর্ডের সভায় সভাপতিত্ব করেছি আর বসে বসে কথা বলেছি। কিন্তু যখনই দাঁড়িয়ে বলতে হয়েছে ভয়ে কেঁপে উঠেছি। মুখ দিয়ে যেন কথাই বেরোতে চায়নি। আমার বিশ্বাস হয় না কিছু করতে পারবেন এ ব্যাপারে। আমার সমস্যা বড়ই জটিল।

‘কিন্তু’, আমি বললাম, ‘আমি কিছু করতে পারবো না বুঝলেও এসেছেন কেন?’

‘শুধু একটা কারণে’, তিনি জবাব দিলেন। আমার একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট আছে। লোকটা অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির। আমার চেম্বার পার হয়ে যাওয়ার সময় সে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকত, কদাচিৎ মুখ তুলতো। আচমকা দেখলাম সে আমার ঘরে সোজা চিবুক উঁচু করে ঢুকছে আর আমাকে উজ্জল মুখে বলল, ‘সুপ্রভাত, মিঃ গুডরিচ!’ ওর পরিবর্তনে দারুণ অবাক হয়ে যাই। তাই একদিন বললাম ‘কে তোমাকে বদলালে?’ সে তখন আপনার সব কথা জানাল। ওর ওই পরিবর্তন দেখেই আপনার কাছে এসেছি।

আমি মিঃ গুডরিচকে বললাম যে তিনি যদি আমার ক্লাসে যোগ দিয়ে যা করতে বলা হবে তাই করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শ্রোতাদের সামনে বক্তৃতা দিয়ে আনন্দ পাবেন। তা যদি পারেন তিনি জবাব দেন, তাহলে পৃথিবীতে আমিই হব সবচেয়ে সুখী মানুষ। তিনি আমার ক্লাসে যোগ দিলেন আর অদ্ভুত রকম উন্নতি করলেন। তিন মাস পরে আমি তাকে এক হলঘরে তিনি হাজার মানুষের সামনে মিনিট দুই বক্তৃতা করতে আহ্বান করি। তিনি কথা বলেন প্রায় এগারো মিনিট।

আমার ক্লাসে যারা শিখতে এসেছেন তাঁদের অনেকেরই এ রকম অলৌকিক ব্যাপার ঘটেছে। তাঁদের অনেকেরই এই শিক্ষার ফলে পদোন্নতি ঘটেছে। ব্যবসায় তাদের স্বপ্ন সার্থক হয়েছে, তাঁরা সমাজে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছেন। এ রকম বহু ক্ষেত্রেই হয় যে ঠিক একটা বক্তৃতাতেই এই অলৌকিক কাণ্ড ঘটেছে। এরপর আপনাদের মারিও লাজোর কাহিনী শোনাচ্ছি।

বেশ ক’বছর আগে কিউবা থেকে একটা তার পেয়ে বেশ অবাক হয়ে যাই। সেটা এই রকম : আপনার জবাব না পেলে আমি নিউইয়র্কে এসে একটা বক্তৃতার জন্য শিক্ষা নেব।’ সই ছিল : মারিও লাজো’। লোকটির নামও আমার শোনা ছিল না।

মিঃ লাজো নিউইয়র্কে এসে বললেন : ‘হাভানা ক্লাব একটা অনুষ্ঠানে তাদের পঞ্চাশ বর্ষ পূর্তি পালন করবে আর আমাকেই প্রধান বক্তা করা হয়েছে। আমি একজন অ্যাটনী, জীবনে জনগণের সামনে বক্তৃতা করিনি। যদি তাই ব্যর্থ হই তাহলে স্ত্রী দুঃখ পাবে আর সমাজেও ছোট হয়ে যাব। তাই কিউবা থেকে ছুটে এলাম, যদি কোন কিছু করতে পারেন। মাত্র তিন সপ্তাহ সময় আছে।

ওই তিন সপ্তাহে মারিও লাজোকে নানা ক্লাসে প্রতি রাতে তিন চারবার বক্তৃতা দেওয়ালাম। তিন সপ্তাহ পরে তিনি সেই বক্তৃতাও দিলেন। তাঁর বক্তৃতা এতই ভাল হল যে টাইম পত্রিকায় তাঁকে বিরাট প্রশংসা করা হয়।

ঘটনাটাকে অলৌকিক মনে হচ্ছে? ঠিকই তাই, বিংশ শতাব্দীতে ভয় জয় করার এক অলৌকিক ঘটনা।

২। নিজের উদ্দেশ্য সামনে রাখুন।

মিঃ ঘেন্ট যখন নতুন দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মনের সুখে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তখন যা করেছিলেন সেটাই মনে হয় তার সাফল্যের কারণ। তবে এটা ঠিক, তিনি আমার নির্দেশ মেনে চলেছিলেন। আমার ধারণা তিনি তা করেন একজন বক্তা হবেন বলেই। তিনি ভবিষ্যতকে সামনে রেখে কাজ করে গেছেন। আপনাকেও সেইভাবে ভবিষ্যকে সামনে রেখে বাস্তবায়িত করতে হবে।

আপনার আত্মবিশ্বাস এবং সন্দুরভাবে কথা বলবার ক্ষমতা যা সহজবোধ্য হয়ে উঠবে তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে হবে। এটা হলে সমাজে, বন্ধু মহলে আপনার প্রতিপত্তি কতটা বাড়বে, ব্যবসায়ে এটা কতখানি কাজে লাগাতে পারবেন সেকথাই আপনাকে ভাবতে হবে। সংক্ষেপে এটাই আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে।

বক্তৃতা ও ব্যবসায়ে প্রতিপত্তি’ নামে এক প্রবন্ধে ন্যাশনাল ক্যাস বেজিন্টার কোম্পানীর চেয়ারম্যান আর ইউনেস্কোর চেয়ারম্যান এস. সি. অ্যালিন লিখেছেন, ‘আমাদের ব্যবসার ইতিহাসে অনেকেই মঞ্চে উঠে চমৎকার কাজ করেছেন। বেশ কয়েক বছর আগে কানসাসের এক তরুণ আমাদের শাখা অফিসে বিচিত্রি এক ভাষণ দেয়। আজ সেই আমাদের বিক্রয়ের ভাইস-প্রেসিডেন্ট। আমি জানি আজ তিনি কোম্পানীর প্রেসিডেন্ট।’

আপনার ভাষণের ক্ষমতা আপনাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে আপনার ধারণা করার শক্তি নেই। আমাদের একজন স্নাতক, মাৰ্জো কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট হেনরী ব্ল্যাকস্টোন বলেন কার্যকর ভাবে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ আর তাদের সহযোগিতা লাভকেই শিখরে ওঠার সিঁড়ি বলেই আমরা মনে করি।

একবার ভাবুন আপনার শ্রোতাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আনন্দ কতখানি। আমি সারা বিশ্বে ভ্রমণ করে দেখেছি শ্রোতাদের বক্তৃতা দান করে মুগ্ধ করে রাখার চেয়ে বড় সুখ আর কিছুতেই নেই। এর মধ্য দিয়ে আপনি লাভ করেন একটা ক্ষমতার অনুভূতি।

এবার কোন সভায় বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন ভেবে নিন। আত্মবিশ্বাস নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছেন মঞ্চের দিকে, চারদিকে নিস্তব্ধ। শ্রোতাদের আপনার কথায় মুগ্ধ করে তুলেছেন, তারপর বক্তৃতা শেষ হতেই শুধু করতালি আর প্রশংসা বাণীর শব্দ। মনে রাখবেন এর একটা অদ্ভুত মাদকতা আছে।

হার্ভার্ডের বিখ্যাত মনস্তত্বের অধ্যাপক উইলিয়াম জেম্স যে ক’টি কথা লিখে গেছেন তা আপনার জীবনে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। কথাগুলো আপনার মনে আলিবাবার মত সাহসের দরজাই খুলে ধরতে পারে। কথা কটি এই : ‘যে-কোনো বিষয়ই হোক তার প্রতি আপনার আকাঙক্ষা আপনাকে রক্ষা করতে পারে। যদি কোন ফল লাভ আশা করেন নিশ্চিত তা পাবেন। যদি ভাল হতে চান-তাই হবেন। যদি শিক্ষিত হতে চান শিক্ষিতই হবেন। একাগ্র হয়ে এগুলো চাইলেই তা লাভ করতে পারেন। সঙ্গে শুধু একশরকম অনাকাঙিক্ষত জিনিস চাইবেন না।‘

ছোট ছোট দলের সামনে ভাষণ দেওয়া শেখা জনগণের সামনে সাধারণ বক্তৃতার চেয়ে অন্যান্য সুযোগ এনে দেয়। আসলে সারা জীবনে আপনি চিরাচরিত কোন জনগণের সামনে বক্তৃতা না করে থাকলেও এই শিক্ষা থেকে যা পাবেন তার মূল্য অনেক। একটি হলো, এই ভাষণ শিক্ষা আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। আপনি যেই বুঝতে পারবেন যে আপনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে একদল মানুষের সামনে বক্তৃতা দিতে পারেন, এটা অনায়াসেই মেনে নেওয়া যায় ঢের বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একজনের সঙ্গে কথা বলবেন। আমার ছাত্ররা যখন দেখেন তাঁরা ক্লাসের সহপাঠিদের সামনে বক্তৃতা দিতে সক্ষম আর তাতে ছাদ ভেঙে পড়ে না। এর ফলে তারা তাদের বন্ধু বান্ধব, পরিবার, ব্যবসায়িক সহযোগী, ক্রেতা সকলকেই উজ্জীবিত করতে পারেন।

এই ধরনের শিক্ষায় ব্যক্তিত্বের যে পরিবর্তন হয় সেটা সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ে না। অল্প কিছুদিন আগে আমি আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সার্জন ড. ডেভিড অলম্যানকে প্রশ্ন করি, মানসিক আর শারীরিক দিক থেকে জনসংযোগের শিক্ষার উপকারিতা কী? তিনি হেসে জবাবে বলেন যে তিনি এজন্য একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দেবেন। এটা কোন ওষুধের দোকান তৈরি করতে পারবে না, এটা তৈরি করতে হবে সেই ব্যক্তিকেই, তিনি যদি পারবেন না ভাবেন তাহলে ভুল করবেন।

প্রেসক্রিপশানটা আমার ডেস্কেই আছে। যতবারই তা পড়ি ততবারই মুগ্ধ হই। সেটা এই রকম :

আপ্রাণ চেষ্টায় এমন শক্তি গড়ে তুলুন যাতে অন্যে আপনার মন আর হৃদয় অনুকরণ করতে পারে। আপনার চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য সহজে ব্যক্তিকে, দলকে এবং জনগণের সামনে প্রকাশ করতে শিখুন। দেখবেন যে আপনার চেষ্টা যতই এগোতে থাকবে ততই আপনার সত্তা আগের চেয়ে ঢের বেশি করে অপরের উপর প্রভাব ফেলতে পারছে।

এই ব্যবস্থাপত্র থেকে আপনি দ্বিগুণ লাভ করতে পারবেন। যতই অন্যের সামনে বক্তব্য রাখতে পারবেন ততই আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়ে উঠে ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটবে। এর অর্থ আপনি আবেগ মণ্ডিত করেছেন, আর তাতেই শারীরিকভাবেও আপনার উন্নতি হবে। বর্তমান জগতে এই জনসংযোগ আর বক্তৃতা তরুণ বা বয়স্ক সকলেরই দরকার। ব্যবসার দুনিয়ায় এর কার্যকারিতার কথা আমি জানি না। তবে স্বাস্থ্যের দিকে অফুরন্ত। একজনই হোক বা অনেকেই হোক পারলেই তাদের সামনে বক্তব্য রাখুন দেখবেন আপনার মধ্যে পরিবর্তন আনবেই।

এধরনের ধারণা থাকা চমৎকার। কোন ওষুধের বড়িতে তা পাবেন না।

৩। সাফল্যের জন্য মনকে তৈরী করুন।

একবার এক বেতার অনুষ্ঠানে আমাকে তিনটে কথায় বলতে বলা হয় জীবনে কোন্ শ্রেষ্ঠ শিক্ষা লাভ করেছি। আমি বলেছিলাম : সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা আমি পেয়েছি তা হল আমরা যা ভাবি তার অসামান্য গুরুত্ব। আপনি কি ভাবেন যদি জানতে পারতাম তাহলে বুঝতে পারতাম আপনি কি, কারণ আপনার চিন্তাই জানিয়ে দেয় আপনি কি। আপনার চিন্তাধারা বদল করে আমরা আপনার জীবনই বদলে দিতে পারি।’

এখন আপনি চাইছেন আরও আত্মবিশ্বাস নিয়ে কার্যকর জনসংযোগ গড়ে তোলা। অতএব এখন থেকে আপনার কাজ হল নঙর্থক ভাবনা ছেড়ে চেষ্টায় সফল হওয়ার কার্যকর চিন্তা করা। আপনাকে অবশ্যই লোকের সামনে কথা বলার একটা আশাবাদী মন গড়ে তুলতে হবে।

একটা কাহিনী শোনাব এবার। দেখতে পাবেন একাগ্রতা থাকলে যে কেউ কিভাবে বক্তৃতা করার চ্যালেঞ্জ নিতে পারে। যার কথা বলছি তিনি অনেক নিচু থেকে উঠে পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রায় ব্যবসা জগতের প্রবাদে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু প্রথম জীবনে কলেজে যখন তিনি বক্তৃতা দিতে উঠতেন তাঁর মুখ দিয়ে কথা বেরোত না। মুখ সাদা হয়ে যেত তাঁর, পাঁচ মিনিটের বেশি কথা বলতে না পেরে তাঁকে মঞ্চ থেকে সজল চোখে পালাতে হত।

অল্প বয়সে যার এ অবস্থা ছিল, ব্যর্থতা তাঁকে স্তব্ধ করতে পারেনি। তিনি শপথ নেন একজন ভালো বক্তা হবেন। আর তাতেই না থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্ব-প্রসিদ্ধ সরকারী অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তার নাম ক্লারেন্স বি. র‍্যাণ্ডেল। তাঁর একটা বই ‘ফ্রিডম’স ফেথ’-এ তিনি জনসংযোগ সম্পর্কে বলেছেন সব রকম কাজেই আমার অভিজ্ঞতা জমেছে। আমি হাজির হয়েছি ব্যবসায়িক সভায়, চেম্বার অব কমার্সেও, রোটারী ক্লাবে এই রকম বহু জায়গায়। মিশিগানে যুদ্ধের সময়েও বক্তৃতা দিয়েছি। আমি হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্ট জেম্স ব্রায়ান্ট কনাল্টের সঙ্গে বক্তৃতা দিয়েছি। এমন কি মূল ফরাসি ভাষাতেও তা করেছি।

‘আমার ধারণা শ্রোতারা কি শুনতে চায়, আর তা কিভাবে বলা হবে, তা আমি জানি। আমার মনে হয় একজন দক্ষ ব্যবসায়ী যদি ব্যবসায় দায়িত্ব নিতে পারেন তাঁর পক্ষে অন্য কিছু শেখা কঠিন নয়।’

মি. র‍্যান্ডালের সঙ্গে আমি একমত। একজন ভালো বক্তা হওয়ার কাজে সাফল্যের ইচ্ছা অনেকটাই এগিয়ে দেয়। আমি যদি আপনাদের মনের ইচ্ছা সম্পর্কে একটা অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতাম তাহলে বলে দিতে পারতাম নিশ্চিত ভাবেই, সাফল্য লাভ করতে আপনার কত সময় প্রয়োজন।

তাই একাজে সফল হতে আপনার চাই উপযুক্ত কিছু গুণাবলী। এটা যে কোন দরকারী কাজেই প্রয়োজন হয়। পর্বত ডিঙিয়ে যেতেও চাই উদগ্র একটা ইচ্ছার মত কিছু।

জুলিয়াস সীজার যখন গলা থেকে চ্যানেল পার হয়ে ইংল্যান্ডে হাজির হন তখন তাঁর সেনাদলের বিজয়ের জন্য কি ব্যবস্থা নেন জানেন? খুব একটা চালাকির কাজই তিনি করেন। তিনি ডোভারের মুখে এক উঁচু জায়গায় থামেননিচে তাকাতে তাঁদের চোখে পড়ে, যে জাহাজে চড়ে তারা এসেছিলেন তার সবই লেলিহান আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শত্রু দেশে সব সংযোগ নিশ্চিহ্ন, পালাবার পথও নেই–অতএব একটা কাজই করার ছিল : এগিয়ে চলা-জয় করার জন্য। আর ঠিক তাই তিনি করেন।

অমর সীজারের এমনই ছিল মনের জোর। আপনিও তাই করুন না কেন, শ্রোতাদের ভয় জয় করার মধ্য দিয়ে।

৪। যতটা সম্ভব অভ্যাস করুন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আমার যে পাঠ্যক্রম চালু করেছিলাম আজ তা পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রতি বছরই নতুন ধ্যান ধারণা পুরনোগুলো বদলে গেছে। তবে পাঠক্রমের একটা বিষয় অপরিবর্তিত থেকে গেছে। ক্লাসের প্রত্যেককেই অন্ততঃ একবার উঠে দাঁড়িয়ে, বেশির ভাগই দুবার, ক্লাসের সকলের সামনে বক্তৃতা দিতে হয়। কেন? এটা সেই জলে না নেমে যেমন সাঁতার শেখা যায় না তেমনই–অর্থাৎ মানুষের সামনে বক্তৃতা না দিলে কেউ বক্তা হতে পারে না। আপনি বক্তৃতা করা সম্পর্কে মোটা মোটা বই পড়তে পারেন–এ বইয়ের সঙ্গেও –অথচ বক্তৃতা দান না করতেও পারেন। এ বইটা একটা গাইড বই মাত্র। আপনাকে এর নির্দেশ অভ্যাস করতে হবে।

জর্জ বার্নার্ডশ’কে যখন প্রশ্ন করা হয় এমন চমৎকারভাবে জনগণের সামনে তিনি কিভাবে বক্তৃতা করেন, তিনি জবাব দেন : ‘স্কেট করা যেভাবে শিখেছি সেই ভাবেই একগুয়ের মত নেহাত বোকার মতই অভ্যাস করে শিখেছি বক্তৃতা করা। যৌবনে শ ছিলেন অত্যন্ত ভীরু। কারও বাড়িতে ঢোকার আগে রাস্তায় অন্ততঃ বিশ মিনিট ঘোরাঘুরি করতেন। খুব কম লোকই আমার মত কাপুরুষ ছিল আর এমন লজ্জা পেত’, শ স্বীকার করেছেন। শেষ পর্যন্ত শ ভীরুতা, আর কাপুরুষতা জয় করার সেরা পথই বেছে নিয়েছিরেন। তিনি তাঁর দুর্বলতাকে জয় করতে চাইলেন। একটা বিতর্ক সভায় তিনি যোগ দিলেন। লণ্ডনের প্রায় সব সভায়, যেখানে আলোচনার সুযোগ থাকত সেখানেই যোগ দিতে লাগলেন। সমাজতন্ত্রের পক্ষে প্রচার চালাতে মনপ্রাণ ঢেলে জর্জ বার্নার্ড শ বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের একজন চমৎকার সুদক্ষ বক্তা হয়ে উঠেছিলেন।

কথা বলার সুযোগ চারপাশেই ছড়ানো। যে সব প্রতিষ্ঠানে কথা বলার সুযোগ আছে তাতে যোগদান করুন। সুযোগ পাওয়া মাত্রই যে কোন জনসভায় যোগ দিন। দপ্তরের কোন সভায় পিছনের আসনে থাকবেন না। বেশ জোরালো স্বরেই আপনার বক্তব্য রাখুন। কথা বলুন! রবিবারের শিক্ষাদানের ক্লাসে শিক্ষাদানও করুন। ভালো করে নজর রাখলে দেখবেন আপনার চারপাশে ব্যবসা, সামাজিক, রাজনৈতিক পেশাদারী বা এমন কি আপনার এলাকাতেও কথা বলার দারুণ সুযোগ রয়েছে। কথা না বললে আপনার জানা অসম্ভব কতটা উন্নতি লাভ করতে পারলেন। তাই শুধু কথা বলে যান বারবার।

একজন তরুন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্তা আমায় বলেছিলেন, এ ব্যাপার আমার জানা, কিন্তু শেখার অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করে না।

‘অগ্নিপরীক্ষা!’ আমি জবাব দিই। কথাটা মন থেকে হটিয়ে দিন। আপনি ঠিকভাবে চিন্তা করতে পারেন নি।”

‘ঠিক চিন্তাটা কেমন?’ তাঁর প্রশ্ন ছিল।

‘একটা অ্যাডভেঞ্চারের চিন্তা’ জবাব দিই।

আপনিও তা করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *