১৫. নিষিদ্ধ বাগান

নিষিদ্ধ বাগান

পরিস্থিতি এর চেয়ে আর খারাপ হতে পারে না।

ফিলচ তাদেরকে নিয়ে দোতলায় অধ্যাপক মাকগোনাগলের কক্ষে গেলেন। ওরা চুপচাপ বসে আছে। হারমিওন ভয়ে কাঁপছে। হ্যারি নানা রকম অজুহাত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

এই বিপদ থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসবে তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। তারা এত নির্বোধের মত কাজ করল কীভাবে। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগলের কাছে কোন অজুহাতই টিকবে না। তারা রাতে চুপিচুপি বেডরুম ছেড়ে বাইরে চলে গেছে। আর টাওয়ারে ওঠার অপরাধ, এটা তো মাফ করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। টাওয়ার নিষিদ্ধ এলাকা। শুধু ক্লাসের জন্য টাওয়ারে যাওয়া যায়। এর সাথে যোগ হয়েছে নর্বার্টকে পার্সেল করা। সবচে বড় বোকামি তারা করেছে অদৃশ্য হওয়ার পোশাক ছেড়ে এসে।

একটু পরই ম্যাকগোনাগল এলেন। পেছনে নেভিল। নেভিল চিৎকার করে বলল–হ্যারি, আমি তোমাকে সাবধান করার জন্য খুঁজতে গিয়েছিলাম। ম্যালফয় বলেছিল ও তোমাকে ধরতে যাচ্ছে। তোমার কাছে নাকি একটা ড্রাগ…

হ্যারি জোরে মাথা নেড়ে ইশারা দিয়ে নেভিলকে থামাতে চাইল। ম্যাকগোনাগল সেটা দেখে ফেলেছেন। তার প্রশ্বাসে যেন নবার্টের চেয়েও বেশি আগুনের হলকা বেরুচ্ছে। তিনি বললেন–আমি বিশ্বাসই করতে পারি না যে তোমরা এ রকম একটা কাজ করবে। মি. ফিল বলেছেন, তোমরা নাকি এস্ট্রোনমি টাওয়ারে উঠেছিলে রাত একটার সময়। জবাব দাও।

এই প্রথমবারের মতো হারমিওন তার শিক্ষকের কোন প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না। সে মাথা নিচু করে নীরব মূর্তির মতো তার চটি জুতোর দিকে তাকিয়ে রইল।

ম্যাকগোনাগল বলে চললেন-এই ব্যাপারটি বুঝতে খুব বেশি জ্ঞানী হওয়ার দরকার হয় না। আমি বুঝতে পেরেছি। তোমরা একটা গাঁজাখুরি গল্প তৈরি করেছো। তোমরা ম্যালফয়কে এই মিথ্যা গল্প শুনিয়েছ যাতে সে বিছানা ছেড়ে ওখানে যায় ও বিপদে পড়ে।

হ্যারি নেভিলের চোখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বলতে চাইল যা বলা হয়েছে তা সত্য নয়। এসব শুনে নেভিলকে হতভম্ব ও ব্যথিত মনে হচ্ছিল। অন্ধকারে তাদেরকে সাবধান করতে গিয়ে নেভিলকে কী খেসারত দিতে হবে তা হ্যারি বুঝতে পারছিল।

ম্যাকগোনাগল বললেন–জঘন্য ব্যাপার। চার চার জন মাঝরাতে বিছানা ছেড়ে বাইরে চলে গেছে। এ রকম কখনো আগে ঘটেনি। মিস গ্রেঞ্জার, আমি ভেবেছিলাম তোমার বেশ বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। ঠি, পটার, আমি ভেবেছিলাম এসবের তুলনায় তোমার কাছে গ্রিফিল্ডর অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তোমরা তিনজনেই এখন ডিটেনশনে যাবে–মি. লংবটম, তোমাকেও যেতে হবে। তোমারও মুক্তি নেই। মাঝরাতে স্কুলের আশপাশে ঘুরে বেড়াবার অধিকার তোমাকে কেউ দেয়নি। বিশেষ করে এই সময়ে যখন পরিস্থিতি খুব ভালো নয়। গ্রিফিল্ডর হাউজ থেকে পঞ্চাশ পয়েন্ট কাটা হল।

পঞ্চাশ। হ্যারি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তাহলে তো গ্রিফিল্ডর আর এগিয়ে থাকতে পারবে না। গত কিডিচ প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে তারা এক ঈর্ষান্বিত অবস্থানে এসেছিল।

তোমাদের প্রত্যেকের পঞ্চাশ পয়েন্ট কাটা গেল। দীর্ঘ খাড়া নাকের মাধ্যমে নিঃশ্বাস নিতে নিতে ম্যাকগোনাগল বললেন।

প্রফেসর প্লিজ….

আমার কিছু করার নেই। ম্যাকগোনাগল জবাব দিলেন।

অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল বলে চল্লেন–আমি কি করবো, কি করবো না, এটা তোমার বলার দরকার নেই মি. পটার। এবার তোমরা সবাই ঘুমোতে যাও। গ্রিফিল্ডর হাউজের ছাত্র–ছাত্রীদের জন্য আমাকে আর কখনও এত লজ্জা পেতে হয়নি।

এক রাতেই ১৫০ পয়েন্ট কাটা যাওয়াতে গ্রিফিল্ডর হাউজ অনেক পেছনে পড়ে গেল। মনে হলো তুলাটা পড়ে গেছে, পাত্রে আর কিছু নেই। কীভাবে তারা এই ক্ষতি পূরণ করবে?

হ্যারি সারারাত ঘুমোতে পারেনি। সে সারারাত নেভিলের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। সে বুঝতে পারে নেভিলও তার মত শোকাভিভূত। ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা বা বলার কিছু হ্যারির নেই। গ্রিফিল্ডর হাউজ এত পেছনে পড়ে গেছে এ ক্ষতিটা কীভাবে তারা পূরণ করবে-এ নিয়ে নেভিল হ্যারির মতই খুব উদ্বিগ্ন। কি হবে, যখন গ্রিফিল্ডরের সবাই জানবে তারা কি করেছে?

হ্যারি পটার থাকতেও দলের এই দশা। সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় হ্যারি পটারকে সবাই হঠাৎ ঘৃণা করতে শুরু করল। এমনকি বাভেনক্ল এবং হাফলপাফস-এর সবাই তার ওপর ক্ষুদ্ধ। কারণ তারাও চায় স্লিদারিরা যেন হাউজ কাপ না পায়। স্লিদারিন হাউজ খুবই উৎফুল্ল। তারা এখন হ্যারিকে দেখলেই মস্করা করে–থ্যাংক ইউ হ্যারি পটার। তোমার কাছে আমরা ঋণী।

একমাত্র রনই হ্যারির পাশে এসে দাঁড়াল।

কয়েক সপ্তাহের ভেতর তারা এটা ভুলে যাবে। এখানে আসার পর ফ্রেড ও জর্জ আনেক পয়েন্ট হারিয়েছে। তবুও তাদের সবাই পছন্দ করে।

তারা একবারে দেড়শ পয়েন্ট হারায়নি, হারিয়েছে কি? রন বলল, না, কখনোই না।

যা ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে অনেক সময় লাগবে। হ্যারি ভাবল এখন থেকে তার দায়িত্ব বা এখতিয়ারের বাইরে কোন জিনিস নিয়ে সে মাথা ঘামাবে না। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো, অন্যের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করা-এ ধরনের কাজে সে আর লিপ্ত হবে না। সে ভীষণ লজ্জিত হয়ে উডের কাছে গিয়ে বলল–আমি পদত্যাগ করতে চাই। পদত্যাগ। উড় হতভম্ব হয়ে বলে। কেন? পদত্যাগ করে কী লাভ হবে? উড পাল্টা প্রশ্ন করে-এতে কি তোমাদের দল জিতবে? যে পয়েন্ট খোয়া গেছে কিডিচ খেলায় না জয়লাভ করে তা কি করে ফেরত পাওয়া যাবে?

কিন্ডিচ খেলায় আগের মত মজা নেই। অনুশীলনের সময় দলের কোন খেলোয়াড় হ্যারির সাথে কথা বলে না। হ্যারির সাথে কথা বলার প্রয়োজন হলে তারা তাকে তার নাম না বলে সিকার বলে ডাকে।

হারমিওন আর নেভিলও কষ্ট পাচ্ছিল। তবে তাদের কষ্ট হ্যারির মত এত বেশি নয়। কারণ, তারা হ্যারির মত এত পরিচিত নয়। তাদের সাথেও কেউ কথা বলছে না। ক্লাসে হারমিওনও আগের মতো শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না। সে মাথা নিচু করে নীরকে তার কাজ করে।

সামনে পরীক্ষা চলে আসায় হ্যারির খুব ভালো লাগল। কারণ পরীক্ষার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে সহজেই তার কষ্টের কথা ভুলতে পারবে।

হ্যারি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে অন্যের বিষয় নিয়ে সে আর মাথা ঘামাবে না। তার এই প্রতিজ্ঞা হঠাৎ এক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলো।

স্কুলের পরীক্ষা শুরু হবার সপ্তাহখানেক আগে লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে সে অধ্যাপক কুইরেলের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।

কুইরেল বলছেন–না, না, আর নয় প্লীজ মনে হল কেউ তাকে ভয় দেখাচ্ছে। হ্যারি এগিয়ে গেল।

আবার কুইরেলের গলা–ঠিক আছে,.. ঠিক আছে।

একটু পরেই অধ্যাপক কুইরেল ফিরে এলেন। তিনি তার পাগড়ি ঠিক করলেন। তাকে বেশ মনমরা দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখনই বুঝি তিনি চিৎকার করে উঠবেন।

হ্যারির মনে হল অধ্যাপক কুইরেল তাকে দেখতে পাননি। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত হ্যারি অপেক্ষা করল। তারপর ক্লাসরুমে ঢুকল। সেখানে কেউই ছিল না। অবশ্য অপর প্রান্তের দরোজা খোলা ছিল। হ্যারি এগোচ্ছিল। হঠাৎ তার নিজের প্রতিজ্ঞার কথা মনে হলো। এসব নিয়ে ভাবা তো তার কাজ নয়।

লাইব্রেরিতে ঢুকে হ্যারি হারমিওন ও রনকে সব খুলে বললো। অভিযানের আগ্রহ রমের ভেতর আবার জাগতে শুরু করেছে, তার আগেই হারমিওন বললো–ডাম্বলডোরের কাছে যাও। অনেক আগেই তার কাছে আমাদের খাওয়া উচিত ছিল। এবার যদি আমরা কোন কিছু নিজেরাই করি তাহলে স্কুল থেকে নির্ঘাৎ আমাদের বের করে দেয়া হবে।

কিন্তু আমাদের হাতে তো কোন প্রমাণ নেই। হ্যারি বলল

আমাদেরকে সমর্থন করতে অধ্যাপক কুইরেলও ভয় পাবেন। অধ্যাপক স্নেইল্প বলবেন–হ্যালোইন দৈত্যটি কীভাবে এল তা তার জানা নেই। চতুর্থ তলায় যখন ঘটনা ঘটে তখন তিনি ধারে কাছে কোথাও ছিলেন। না। তাহলে কাকে বিশ্বাস করবেন–তাকে মা আমাদেরকে। ডাম্বলডোর ভাববেন তাকে পদচ্যুত করার জন্য আমরা গল্পটা বানিয়েছি। ঝুঁকি থাকলে ফিলও আমাদের সাহায্য করবেন না। আর এটাও মনে রেখো পরশমণি সম্পর্কে আমাদের কিছু জানার কথা নয়। এটা জানাজানি হলে অনেক ব্যাখ্যা ও কৈফিয়ত দিতে হবে।

হারমিওন তার কথায় সন্তুষ্ট হলেও রন হলো না।

আমরা যদি এই নিয়ে একটু মাথা ঘামাই।

কোন প্রয়োজন নেই। হ্যারির সরাসরি উত্তর। আমরা বহু মাথা ঘামিয়েছি। এবার হ্যারি একটা মানচিত্র বের করল। জুপিটারের মানচিত্র। হ্যারি এর মধ্যেই জুপিটার গ্রহের চাঁদগুলোর নাম জেনে গেছে। পরদিন সকালে তারা যখন নাশতা করছিল তখন তাদের তিনজনের কাছেই একই বার্তা এল–

আজ রাত ১১টা থেকে তোমাদের ডিটেনশন শুরু হবে।
প্রবেশ কক্ষে গিয়ে ফিলচের সাথে দেখা করো।
–অধ্যাপক এস. ম্যাকগোনাগল।

হ্যারি ভুলেই গিয়েছিল যে পয়েন্ট খোয়ানোর জন্য তাদেরকে ডিটেনশনের মুখোমুখি হতে হবে। ওই রাতে তারা রনের কাছ থেকে বিদায় নিল। রাত ১১টায় তারা প্রবেশ কক্ষে গেল। ফিলচ সেখানেই ছিলেন। সেখানে ম্যালফয়কেও দেখা গেল। হ্যারি ভুলে গিয়েছিল যে ম্যালফয়েরও ডিটেনশন হয়েছে।

ফিলচ বললেন–আমার পেছন পেছন এসো। তারা তার পেছনে পেছনে গেল। ফিলচ বললেন–স্কুলের আইন–কানুন ভাঙার আগে তোমাদেরকে দুবার করে ভাবতে হবে। আমি ইচ্ছে করলে তোমাদেরকে আরও কঠিন শাস্তি দিতে পারতাম। কয়েকদিন তোমাদেরকে এ ঘরে বন্দি করে রাখতে পারতাম। শিকল দিয়ে বেঁধেও রাখতে পারতাম। আমার অফিসেই শিকল আছে। কিন্তু এবারের মতো ওদিকে যাচ্ছি না। ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কোন কাজ করবে না। পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো না। করলে তোমাদেরই বেশি ক্ষতি হবে।

তারা অন্ধকার মাঠ দিয়ে এগিয়ে গেল। হ্যারি ভাবছিল তাদের কী শাস্তি হবে। নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর কিছু।

চাঁদ ছিল উজ্জ্বল। তবে মেঘ চাঁদকে খানিকটা ঢেকে রেখেছিল। একটু এগিয়ে যেতেই হ্যারি গ্রিডের কুটিরের জানালায় আলো দেখতে পেল। তারা দূর থেকে কিছু কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেল। এটা কে? তুমি ফিলচ? তাড়াতাড়ি এসো। আমি কাজ শুরু করতে চাই।

হ্যারি ভাবছিল তারা যদি হ্যাগ্রিডের সাথে কাজ করে, তাহলে খুব খারাপ হবে না। হ্যারি বেশ আশস্ত বোধ করল। কারণ ফিল তাকে বলল নিশ্চয়ই ভাবছ বন্ধুটার সাথে তুমি তোমার সময় আনন্দেই কাটাতে পারবে। ভালো করে ভাব, তোমরা ঠিকমতো ফিরে আসতে পারবে কিনা আমার সন্দেহ আছে।

এই কথা শুনে নেভিল কাদো কাঁদো হল আর ম্যালফয় পথে পাথরের মত দাঁড়িয়ে গেল।

এই বনে। সে বার বার বলল–রাতের বেলায় যাওয়া নিষেধ। এছাড়া ওখানে অনেক কিছু আছে। আমি শুনেছি সেখানে নেকড়ে বাঘ আছে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর।

নেভিল হাৱির জামার আস্তিন ধরে ফুঁপিয়ে উঠল।

সেটা তোমাদের দেখার ব্যাপার। ফিলচ বললেন–

যদি নেকড়ে থেকে থাকে তাহলে তোমাদের আগেই ভেবে দেখা উচিত ছিল। তাই নয় কি?

অন্ধকার ভেদ করে হ্যাগ্রিড তাদের দিকে এগিয়ে এলেন। সাথে তার কুকুর ফাং। আর কাঁধে ছিল বড় ধনুক ও তীর।

হ্যাগ্রিড বললেন–হ্যারি আর হারমিওন, আমি তো আধঘণ্টা ধরেই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি।

ফিলচ শীতল কণ্ঠে বললেন–তাদের সাথে তোমার বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা ঠিক হবে না, হ্যাগ্রিড। তাদেরকে এখানে আনাই হয়েছে শাস্তি দেবার জন্য।

এ জন্যই বুঝি তোমার দেরি হয়েছে? হ্যাগ্রিড প্রশ্ন করলেন। ফিলচের প্রতি কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে হ্যাগ্রিড বললেন–তুমি নিশ্চয়ই এতক্ষণ বক্তৃতা দিচ্ছিলে। তুমি তোমার কাজ করেছ। এবার আমি আমার কাজ শুরু করব।

ফিলচ বললেন–কাল সকালে আমি খবর নেব। এদের কী অবস্থা দাঁড়িয়েছে আমি দেখব।

হাগ্রিডের দিকে তাকিয়ে ম্যালফয় বলল–আমি এই বনে যাব না। ম্যালফয়ের স্বরে ভয় পাওয়ার ভাব দেখে হ্যারি বেশ খুশি হলো।

হ্যাগ্রিড বললেন–হোগার্টসে থাকতে হলে তোমাকে ওখানে যেতেই হবে। তুমি অন্যায় করেছ। এখন তার শাস্তি ভোগ করতে হবে।

এগুলো তো চাকরবাকরের কাজ। ছাত্রদের নয়। আমরা ভেবেছিলাম আমাদেরকে কিছু লেখালেখি বা এ ধরনের কিছু করতে হবে।

হ্যাগ্রিড তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন–হোগার্টসে তাই করতে হয়। যদি না করতে ইচ্ছে হয় তাহলে দুর্গে ফিরে যাও এবং বহিস্কৃত হয়ে বাড়িতে ফিরে যাও।

ম্যালফয় একটুও নড়ল না। কঠোর ভঙ্গিতে হ্যাগ্রিডের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নিল।

এবার হ্যাগ্রিড তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন–মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনা, আমি আজ রাতে ফে কাজটা করতে যাচ্ছি–তা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আমি চাই না তোমরা কেউ বিপদে পড়। এসো, আমার পেছনে পেছনে এসো।

হ্যাগ্রিড তাদেরকে বনের এক প্রান্তে নিয়ে এলেন। হাতে একটা লণ্ঠন ধরে একটা আঁকাবাকা পথ তাদের দেখালেন। পথটা বনে মিলিয়ে গেছে। মৃদুমন্দ বাতাসে তাদের চুল উড়ছিল।

এদিকে তাকাও। হ্যাগ্রিড বললেন–মাটির ওপর ঝলমলে জিনিসটা দেখ। রূপালী রঙ। এটা ইউনিকর্নের রক্ত। এখানে একটা ইউনিকর্ন আছে যে আঘাত পেয়েছে। এ সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো এ ধরনের ঘটনা ঘটল। গত বুধবারে আমি একটা ইউনিকর্নকে মৃত অবস্থায় দেখেছি। আমাদের চেষ্টা হবে আহত প্রাণীটাকে খুঁজে বের করে তাকে কষ্ট থেকে বাঁচানো।

নিজের ভয় গোপন না করে ম্যালফয় প্রশ্ন করল–ইউনিকর্ন যদি প্রথমেই আমাদেরকে আক্রমণ করে বসে।

যতক্ষণ তোমরা আমার সাথে অথবা আমার কুকুর ফ্যাঙের সাথে থাকবে ততক্ষণ তোমাদের ভয়ের কোন কারণ নেই।

ফ্যাঙের দীর্ঘ দাঁত দেখে ম্যালফয় বলে উঠল–আমি ফ্যাঙকে চাই।

হ্যাগ্রিড বলল–ফ্যাঙকে নিতে চাও নাও। আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি ফ্যাঙ নিজেই খুব ভীরু। আমার দিকে তাকাও। হ্যারি আর হারমিওন বাম দিকে যাবে। ম্যালফয়, নেভিল আর ফ্যাঙ ডানদিকে যাবে। যদি আমাদের কেউ ইউনিকর্ন দেখতে পায় সে বা তার দল সবুজ আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাবে। ঠিক আছে তোমরা তোমাদের জাদুদণ্ড বের কর। এখনই এটা নিয়ে অনুশীলন কর। যদি আমাদের কেউ বিপদে পড়ে সে লাল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাবে। আমরা সবাই তার খোঁজে চলে আসব। সাবধানে থেকো। চলে, যাওয়া যাক।

বনটা অন্ধকার ও নীরব। কিছুদূর যাবার পর পথ দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। স্যরি, হারমিওন আর হ্যাগ্রিড বাঁদিকের রাস্তা ধরল। ম্যালফয়, নেভিল আর ফ্যাঙ ডানদিকের রাস্তায় আগে বাড়ল।

মাটির ওপর দৃষ্টি রেখে তারা নীরবে কিছুদূর অগ্রসর হল। একটু পরই তারা চাঁদের আলোতে ঝড়ে পড়া পাতার ওপর রূপালী নীল রক্ত দেখতে পেল। হ্যারি দেখল, হ্যাগ্রিড খুবই উদ্বিগ্ন।

নেকড়েবাঘ কি কোন ইউনিকর্নকে হত্যা করেছে? হ্যারি জানতে চাইল।

হ্যাগ্রিড বললেন–ইউনিকর্ন ধরা খুব সহজ নয়। তারা শক্তিশালী ঐন্দ্রজালিক প্রাণী। ইউনিকর্ন আহত হয়েছে-এর আগে আমি কখনো শুনিনি।

তারা একটি পিচ্ছিল শেওলাপড়া গাছ পার হলো। হ্যারি জল গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল। বুঝতে পারল কাছাকাছি কোথাও জলাশয় আছে। আঁকাবাঁকা পথের এখানে সেখানে তারা ইউনিকর্নের রক্ত দেখতে পেল?

হারমিওন তুমি ঠিক আছো তো, কোন অসুবিধা হচ্ছে? হাড়ি বললেন।

যদি এটা আহত ইউনিকর্ন হয় তাহলে এটা খুব বেশি দূর যেতে পারেনি।

তারপর হ্যাগ্রিড হঠাৎ বলে উঠলেন, তোমরা এই গাছটার পেছনে চলে যাও।

হ্যাগ্রিড, হ্যারি ও হারমিওনকে হাতে ধরে তাদেরকে পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে একটা বিশাল ওক গাছের পেছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তিনি একটা তীর বের করে ধনুতে লাগালেন। তীর ছোঁড়ার জন্য তিনি প্রস্তুত। কাছাকাছি শুকনো পাতার মর্মরধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল একটা পোশাক যেন শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পর শব্দটি কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।

আমি জানি। তিনি বিড়বিড় করে বললেন-এখানে এমন কেউ আছে যার এখানে থাকার কথা নয়।

নেকড়ে? হ্যারি প্রশ্ন করে।

এখানে কোন নেকড়ে বাঘ নেই, নেই কোন ইউনিকর্ন। হ্যাগ্রিড বললেন–ঠিক আছে। এবার তোমরা আমার পেছনে পেছনে এসো। তবে সাবধান থেকো।

কিছুক্ষণ পর তারা একটা অদ্ভুত জীব দেখল। কোমর পর্যন্ত মানুষ। লালচুল–দাঁড়ি। কিন্তু কোমরের নিচ থেকে ঘোড়া। এমন কী একটা লাল লেজও রয়েছে!

হ্যাগ্রিড জানালেন যে এর নাম রোনান।

আর রোনান হচ্ছে একজন সেন্টর। গ্রীক পুরানে–তোমরা নিশ্চয়ই এর কথা শুনেছ। অর্ধমানব আর অর্ধ অশ্বদেহধারী।

ও তুমি রোনান। হ্যাগ্রিড নিরুদ্বেগে জানতে চাইলেন–তুমি কেমন আছ?

রোনান সামনে এগিয়ে গিয়ে হাত নাড়ল।

গুড আফটারনুন হ্যাগ্রিড। রোনান বলল। তার কণ্ঠে একটা করুণ আর্তি ছিল।

রোনান হ্যাগ্রিডকে প্রশ্ন করল–তুমি কি আমাকে মারতে চেয়েছিলে?

তীরের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে হ্যাগ্রিড বললেন–নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারি না। বনে এমন কেউ ছিল যার থাকার কথা ছিল না। থাক সে কথা। এরা ইল হ্যারি পটার আর হারমিওন গ্রেঞ্জার। তারা দুজনেই ছাত্র। আর ও হল রোনান। একজন সেন্টর।

আমরা দেখেছি। হারমিওন স্তিমিত কণ্ঠে বলল।

গুড আফটারনুন। রোনান বলল–তোমরা কি ছাত্র? তোমরা কি স্কুলে অনেক কিছু শিখেছো?

অল্প-সল্প। বিনীত কণ্ঠে হারমিওন জবাব দিল।

অল্প-সল্প। তবুও কিছু শিখছ রোনান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল। মাথা পেছনে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ও মন্তব্য করল–আজ মঙ্গলগ্রহ বেশ উজ্জ্বল।

তুমি ঠিকই বলেছ। আকাশের দিকে তাকিয়ে হ্যাগ্রিড সায় দিলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে হ্যাগ্রিড বললেন–আমি আনন্দিত যে আমরা একত্রিত হয়েছি। একটা ইউনিকর্ন আহত হয়েছে। তুমি কি তাকে কোথাও দেখেছ?

রোনান কোন জবাব দিল না। সে আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল–সর্বত্রই দেখা যায় যে নিরীহ ব্যক্তিরাই সবার আগে শাস্তি পায়। এখানেও তাই দেখছি।

হ্যাগ্রিড বললেন–রোনান, তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু তুমি কি কোন অস্বাভাবিক কিছু দেখেছ?

মঙ্গলগ্রহ আজ উজ্জ্বল। রোনান বলল। হ্যাগ্রিড অধীরভাবে রোনানকে লক্ষ্য করছিলেন।

রোনান আবার বলল–আজ রাতে মঙ্গলগ্রহটা অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল।

হ্যাগ্রিড বললেন–তাহলে তুমি অদ্ভুত কিছু দেখনি?

এবারও জবাব দিতে রোনান অনেক সময় নিল।

তারপর বললেন–বনে অনেক জিনিস লুকিয়ে থাকতে পারে।

রোনানের পেছনে গাছে মৃদু আন্দোলন দেখা গেল। হ্যাগ্রিড তার তীর ধনুক প্রস্তুত করতে উদ্যত হলেন। এবার দ্বিতীয় সেন্টর সামনে এল। তার চুল কালো। সে রোনান থেকেও বেশি হৃষ্ট–পুষ্ট।

হ্যালো বেইন। হ্যাগ্রিড বললেন–তুমি কি ভালো আছো?

গুড আফটারনুন হ্যাগ্রিড, আশা করি ভালো আছো।

ভালো। হ্যাগ্রিড জবাব দিলেন। দেখো, আমি রোনানকে জিজ্ঞেস করছিলাম তুমি কি সম্প্রতি এখানে অদ্ভুত কিছু দেখেছ? এখানে একটি ইউনিকর্ন আহত হয়েছে। তুমি কি এ ব্যাপারে কিছু জানো?

বেইন উঠে রোনানের পাশে বসল। আকাশের দিকে তাকাল। তারপর শুধু বলল–আজ রাতে মঙ্গলগ্রহ উজ্জ্বল।

একথা তো আমরা আগেও শুনেছি। হ্যাগ্রিড একটু বিরক্তির সাথে বললেন–ঠিক আছে, তোমাদের দুজনের কেউ যদি কোন অদ্ভুত জিনিস দেখ তাহলে আমাকে জানিও। এবার আমি উঠি।

হ্যারি আর হারমিওনও উঠল। কয়েকটা বৃক্ষ তাদের পথরোধ না করা পর্যন্ত তারা হাঁটতে লাগল।

সেনটরের কাছ থেকে কখনো সরাসরি উত্তর আশা করো না। হ্যাগ্রিড হ্যারি আর হারমিওনের উদ্দেশ্যে বললেন।

এখানে কি অনেক সেন্টর আছে? হারমিওন জানতে চায়।

না, খুবই কম। তারা নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখতে চায়। তবে তারা মাঝে মাঝে বেশ উপকারী হয়ে ওঠে। তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু জানা যায়। তারা অনেক কিছুই জানে কিন্তু বলতে চায় না।

গভীর বনের ভেতর দিয়ে তারা হাঁটতে লাগল। হ্যারি ভাবছিল সেনটরদের কথা। রাস্তার বাঁকে আসার পর হারমিওন হ্যাগ্রিডের হাত আঁকড়ে ধরে বলল–দেখুন, দেখুন ওখানে লাল শিখা দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই তারা বিপদে পড়েছে।

তোমরা দুজন এখানে দাঁড়াও। হ্যাগ্রিড বললেন–তোমরা এখান থেকে কোথাও যাবে না। আমি এখানেই ফিরে আসব।

বনের ভেতর দিয়ে হ্যাগ্রিডের যাবার শব্দ তারা শুনতে পেল। তারা দুজনেই খুব ভয় পেয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর পাতার মর্মরধ্বনি ছাড়া আর কোন শব্দ তাদের কানে এলো না।

হারমিওন ফিসফিস করে বলল–তোমার কি মনে হয় না তারা আঘাত পেয়েছে।

আমি ম্যালফয়ের জন্য ভাবি না। তবে নেভিলের জন্য আমার ভাবনা হচ্ছে, কারণ সে প্রথমবারের মতো এখানে এসেছে।

সময় বয়ে যাচ্ছিল। তারা সবাই সজাগ হয়ে রইল। প্রতিটি শব্দ হ্যারিকে সচকিত করে তুলছে। হ্যারি ভাবছিল–কী ঘটতে যাচ্ছে। তারা এখন কোথায়। অবশেষে একটা জোরালো শব্দ গ্রিডের ফিরে আসার কথা জানাল। হ্যাগ্রিড রাগে ফুঁসছিলেন।

হ্যাগ্রিডের সাথে ছিল ম্যালফয়, নেভিল আর ফ্যাঙ। নেভিলকে কৌতুক করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরায় সে ভয় পেয়ে লাল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায়।

হ্যাগ্রিড বললেন-এবার আমি দল পরিবর্তন করে দিচ্ছি। নেভিল তুমিও হারমিওনের সাথে থাকো। হ্যারি, তুমি এই বুদ্ধ ও ফ্যাঙের সঙ্গে যাও। আমি দুঃখিত। হ্যাগ্রিড ফিসফিস করে হ্যারিকে বললেন–তোমাকে ভয় দেখানো তার জন্য কঠিন। আমাদের কাজটা এভাবেই সারতে হবে।

ম্যালফয় আর ফ্যাঙকে নিয়ে হ্যারি বনের আরো গভীরে যাত্রা শুরু করল। আধঘণ্টা হাটার পর তারা গভীর বনের আরো ভেতরে প্রবেশ করল। আরো কিছুদূর যাবার পর তারা খুবই ঘন গাছের মধ্যে এল যেখানে হাঁটা আর সম্ভবপর ছিল না। সামনে গাছপালা খুব চওড়া এবং ঘন ঘন।

হ্যারির কাছে মনে হল রক্ত ক্রমশঃ পুরু হচ্ছে। একটা গাছের শেকড়ে বেশ রক্ত দেখে হ্যারির কাছে মনে হলো আহত প্রাণীটি আশপাশে কোথাও যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। একটা পুরনো ওক গাছের ডালপালার ভেতর দিয়ে হ্যারি একটা প্রাণী দেখতে পেল।

ওই দিকে দেখ। ম্যালফয়কে থামাবার জন্য তার বাহুতে হাত রেখে সে নিচু কণ্ঠে বলল।

মাটিতে সাদা উজ্জ্বল কী যেন চিকচিক করছিল। তারা তার কাছাকাছি গেল।

এটা একটা ইউনিকর্ন। মৃত। হ্যারি জীবনে এত সুন্দর প্রাণী দেখেনি। পাগুলো ছিল চিকন। পাগুলোর ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়েছে। মাটিতে পড়ে আছে। ইউনিকর্নের কেশর কালো পাতার ওপর ছড়িয়ে আছে।

হঠাৎ ঝোঁপ থেকে একটা কাপড়–ঢাকা ছায়ামূর্তি ইউনিকর্নের কাছে। এসে রক্তপান করতে শুরু করল।

আর্তনাদ করে ম্যালফয় আরও পিছিয়ে এল। ফ্যাঙও পিছু হটল। কাপড়ে ঢাকা ছায়ামূর্তিটি মাথা তুলে সরাসরি হ্যারির দিকে তাকাল। ইউনিকর্নের রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। তারপর দ্রুতগতিতে হ্যারির দিকে ছুটে এল। ভয়ে হ্যারি নড়তে পারছিল না।

হ্যারির তীব্র মাথাব্যথা শুরু হল। এত ব্যথা এর আগে তার কখনও হয়নি। প্রচণ্ড ব্যথায় সে তার হাটুর ওপর হাত রাখল। হ্যারি মাথা উঠিয়ে দেখল ছায়ামূর্তি অপসৃত হয়েছে, একটা সেন্টর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

হ্যারিকে কাছে নিয়ে সেন্টর প্রশ্ন করল–তুমি ঠিক আছে তো?

হ্যাঁ, হ্যারি জবাব দিয়ে প্রশ্ন করল–প্রাণীটা কী ছিল?

সেন্টর হ্যারির প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার চোখ ছিল বিবর্ণ নীলকান্ত মণির মত আশ্চর্যজনকভাবে নীল। সে খুব সতর্কভাবে হ্যারির দিকে তাকাল এবং অনেকক্ষণ ধরে হ্যারির কপালের দাগের দিকে তাকিয়ে রইল।

এরপর বলল–তাহলে তুমিই হ্যারি পটার। তোমার এখন হ্যাগ্রিডের কাছে চলে যাওয়া উচিত। এই বন নিরাপদ নয়। বিশেষ করে তোমার জন্য। তুমি কি আমার পিঠে চড়তে পারো? তাহলে এই পথে তাড়াতাড়ি যেতে পারবে।

সেন্টর বলল–আমার নাম ফিরেঞ্জ। সে সামনের হাঁটু ভাঁজ করে পিঠ কাত করে হ্যারিকে তার পিঠে উঠতে বলল। ওইদিকে ঘন বনের গাছের ডাল–পালা কেটে কারো আসার শব্দ শোনা গেল।

দ্রুতগতিতে রোনান ও বেইন এসে উপস্থিত হলো।

ফিরেঞ্জ, বেইন ধমকের স্বরে প্রশ্ন করল-এটা কী করছ তুমি? তোমার পিঠে একজন মানুষ। তোমার কি লজ্জা করে না? তুমি কী একটি মামুলী খচ্চর?

ফিরেঞ্জ বলল–তুমি কি জানো ছেলেটি কে? এ হল হ্যারি পটার। সে যত তাড়াতাড়ি বনের বাইরে যেতে পারবে ততই তার জন্য ভালো।

তুমি তাকে কী কথা বলছিলে বেইন বিরক্তির সাথে জিজ্ঞেস করল ফিরেঞ্জ তোমার কি মনে নেই যে, আমরা শপথ নিয়েছি আমরা স্বর্গের বিরুদ্ধে কিছু করব না। আমরা কি গ্রহ–নক্ষত্রের গতিবিধি পড়িনি?

রোনান নার্ভাস হয়ে মাটি খুঁটতে লাগল।

আমি নিশ্চিত, ফিরেঞ্জ মনে করছে সে ভালো কাজ করছে। খুব বিমর্ষভাবে রোনান এই মন্তব্য করল।

রেগে গিয়ে বেইন তার পেছনের পা দিয়ে মাটিতে লাথি মারল।

অন্যের মঙ্গল–তাতে আমাদের কী এসে যায়? যা ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে কেবল তার ওপরই নির্ভর করা সেনটরদের দায়িত্ব। আমাদের বনে বিপন্ন মানুষের সেবা করা আমাদের কাজ নয়।

ফিরেঞ্জ রেগে হঠাৎ তার পেছনের পায়ে ঝাঁকি দিল। তার পিঠে সওয়ার থাকার জন্য হ্যারিকে ফিরেঞ্জের কাঁধ জড়িয়ে ধরতে হয়।

তুমি কি ইউনিকর্নটা দেখতে পাচ্ছ না? ফিরেঞ্জ চিৎকার করে বলল তুমি কি বুঝতে পারছ না–কেন এটা মারা গেছে? গ্রহগুলি কি তোমাকে এই গোপন খবরটি জানায়নি? বনের অপশক্তিগুলো দূর করার জন্য আমি নিজেকে নিয়োজিত করেছি। হ্যাঁ বেইন, প্রয়োজন হলে আমি মানুষের সাথে কাজ করে যাব।

রোনান ও বেইনকে পেছনে রেখে হ্যারিকে নিয়ে ফিরে দ্রুত অরণ্য ছেড়ে গেল।

হ্যারি ঠিক বুঝতে পারছিল না সে কোথায় যাচ্ছে।

তোমার ওপর বেইনের এত রাগ কেন? হ্যারি জানতে চাইল–কী কারণে তুমি আমাকে উদ্ধার করতে চাইছ?

ফিরেঞ্জ তার গতি কমিয়ে হ্যারিকে বলল মাথা নিচু রাখতে যেন ছোট গাছের ডাল–পালার সাথে তার ধাক্কা না লাগে, কিন্তু সে তারির প্রশ্নের কোন জবাব দিল না, দীর্ঘক্ষণ ধরে তারা নীরবে বনের গাছপালা পার হলো। হ্যারির মনে হল–ফিরেঞ্জ বোধহয় তার সাথে কথা বলতে চায় না। তারা যখন বনের গভীরে ঢুকছিল তখন ফিরে হঠাৎ করে থেমে হ্যারিকে প্রশ্ন করল–হ্যারি পটার, তুমি কী জানো ইউনিকর্নের রক্ত কি কাজে লাগে?

এই অদ্ভুত প্রশ্নে হ্যারি হতভম্ব হয়ে গেল। একটু থেমে হ্যারি জবাব দিল–আমি ঠিক জানি না। আমি শুধু এইটুকু জানি যে শিং, লেজ আর পশম ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহার হয়।

ফিরেঞ্জ ব্যাখ্যা করল–ইউনিকর্ন হত্যা করা ভয়াবহ অপরাধ। যার হারাবার কিছু নেই এবং সবকিছু পাবার সম্ভাবনা আছে কেবল সেই লোকই এ ধরনের অপরাধ করতে পারে। তুমি যদি মৃত্যু থেকে এক ইঞ্চি দূরেও থাক, ইউনিকর্নের রক্ত লোমাকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করবে। তবে এর জন্য তোমাকে ভয়ঙ্কর মাশুল দিতে হবে। তুমি নিজে বাঁচার জন্য এক পবিত্র অক্ষম প্রাণীকে হত্যা করেছ। তোমার জীবন হবে অর্ধেক জীবন, অভিশপ্ত জীবন। ইউনিকর্নের রক্ত তোমার ঠোঁটে স্পর্শ করার সাথে সাথেই এই জীবন শুরু হবে।

হ্যারি পেছন ফিরে ফিরেঞ্জের মাথার দিকে তাকাল। ওর মাথা চাঁদের আলোতে রূপালী দেখাচ্ছে।

এমন বেপরোয়া কেউ কি আছে? হ্যারি জোরে বলে উঠল–সারা জীবনের জন্য অভিশপ্ত হওয়ার চেয়ে মৃত্যু কি ভাল নয়?

তুমি ঠিক বলেছ। ফিরেঞ্জ বলল–জীবিত থাকার জন্য অন্য কিছু খাওয়া যেতে পারে–যা তোমার শক্তি ফিরিয়ে দিতে পারে। এমন কিছু যা তোমাকে অমর করে রাখবে। হ্যারি পটার তুমি কি জানো, এই মুহূর্তে স্কুলে কি লুকোনো আছে?

নিশ্চয়ই পরশমণি। জীবনের সুধা। কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কে–

তুমি কি এমন কারোরই কথা ভাবতে পারো না যে বহু বছর ধরে ক্ষমতায় আসার অপেক্ষা করছে, জীবনের সাথে কোনভাবে ঝুলে থাকতে চাচ্ছে, সুযোগের অপেক্ষায় আছে?–ফিরেঞ্জের স্বগতোক্তি।

মনে হল লোহার মুষ্টি হ্যারির হৃদয়কে দুদিক থেকে চেপে ধরেছে। গাছের পাতার মর্মরশব্দের ভেতর দিয়ে হ্যারির মনে হল সে সেই কথা শুনতে পেয়েছে যা হ্যাগ্রিড তাকে প্রথম সাক্ষাতেই বলেছিলেন।

কেউ বলেন উনি মারা গেছেন, আমি ঠিক জানি না উনি জীবিত না মৃত

তুমি কি বলতে চাচ্ছো তিনি ভল… হ্যারি উৎকণ্ঠিত।

হ্যারি, হ্যারি তুমি ঠিক আছে তো? হারমিওন দৌড়ে তাদের দিকে আসছিল। হ্যাগ্রিড তার পেছন পেছন।

ঠিক কী বলছে তা না বুঝেই হ্যারি বলল—

আমি ভালো। হ্যাগ্রিভ, ইউনিকর্নটা মারা গেছে।

আমি তোমাকে এখানে ছেড়ে যাচ্ছি। ফিরেঞ্জ বিড়বিড় করে বলল।

ইউনিকটা পরীক্ষা করার জন্য হ্যাগ্রিড ছুটে গেল।

তুমি এখন নিরাপদ। তোমার সৌভাগ্য কামনা করি, হ্যারি, ফিরেঞ্জ বলল-এর আগেও সেনটরগণ গ্রহ–নক্ষত্রের ভুল পাঠ করেছেন। আমার মনে হয় এবারও তাই হয়েছে।

হ্যারিকে পেছনে রেখে ফিরেঞ্জ আবার গভীর বনে ফিরে গেল।

***

তাদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থেকে রন অন্ধকার কমনরুমে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমের ঘোরে কিডিচ খেলার ফাউলকে কেন্দ্র করে সে যখন চিৎকার করে উঠল, তখনই হ্যারি জোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে ঘুম থেকে জাগাল। হ্যারি কি কি ঘটেছে বলা শুরু করতেই রনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।

হ্যারি বসতে পারছিল না। সে আগুনের সামনে পায়চারি করছিল। তখনও সে কাঁপছিল।

স্নেইপ ভলডেমর্টের জন্য পাথরটা চাচ্ছেন,.. আর ভলডেমর্ট বনে অপেক্ষা করছে। অথচ আমরা ধারণা করে আসছি স্নেইপ পাথরটা চাচ্ছেন নিজে ধনী হওয়ার জন্য।

এসব কথা এখন রাখো তো। রন ফিসফিস করে বলল। রন এমনভাবে কথা বলল যে মনে হচ্ছে ভলভেমৰ্ট কাছাকাছি কোন স্থান থেকে। তার কথা শুনছে। হ্যারি রনের কথা শুনছে না।

ফিরেঞ্জ আমাকে রক্ষা করেছে যদিও এটা তার করার কথা নয়। বেইন খুব ক্ষিপ্ত ছিল। সে বলছিল ফিরে যা করছে তা গ্রহ নক্ষত্রের নির্দেশের হস্তক্ষেপ। তাদেরকে দেখাতে হবে যে ভলডেমর্ট ফিরে আসছে। বেইন মনে করে ফিরেঞ্জের উচিত আমাকে হত্যা করার জন্য ভলডেমর্টকে সুযোগ দেয়া। আমার মনে হয় এ ব্যাপারে গ্রহ–নক্ষত্রের ভবিষ্যদ্বাণী আছে।

ওই নামটা কি তোমরা বলা বন্ধ করবে? রন ফিসফিস করে বলল।

এখন আমার অপেক্ষা করে দেখতে হবে স্নেইপ কখন পাথরটা চুরি করেন। হ্যারি আস্তে আস্তে বলে চলল–ভলডেমর্ট এসে আমাকে শেষ করে দেবে। আমার মনে হয় বেইন এতে খুশি হবে।

হারমিওন খুব ভয় পেয়েছে মনে হলো। তবে সে হ্যারিকে সান্ত্বনা দিল হ্যারি, সবাই জানে ডাম্বলডোরই একমাত্র ব্যক্তি যাকে ইউ-নো-হু ভয় পায়। যতক্ষণ ডাম্বলডোর আছেন–ততক্ষণ ইউ-নো-হু তোমার গা স্পর্শ করতে পারবে না। কে বলল সেনটররা সব সময় সঠিক কথা বলে? আমার কাছে এটা ভাগ্য–গণনার মত মনে হয়। অধ্যাপক ম্যাকগোনাগল বলেন এটা জাদুর একটি অপরিপূর্ণ শাখা।

তাদের কথাবার্তা শেষ হবার আগেই আকাশ ফর্সা হয়ে গেল। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে তারা শুয়ে পড়ল। তবে রাতের বিস্ময় কিন্তু তখনও শেষ হয়নি। হ্যারি বিছানার চাদর নিচে টেনে ঠিক করার সময় সুন্দরভাবে ভাঁজ করা অবস্থায় তার অদৃশ্য হওয়ার পোশাকটা পেল। পোশাকে একটা চিরকুট পিন দিয়ে আটকানো।

চিরকুটে লেখা—

যদি দরকার হয়।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *