০৪. চাবির রক্ষক

চাবির রক্ষক

বুম। বুম। দরোজায় আবার ধাক্কার শব্দ। ডাডলি লাফ দিয়ে জেগে উঠল।

কামানের শব্দ? সে বোকার মত প্রশ্ন করল।

তাদের পেছনে একটি বিকট শব্দ শোনা গেল। আঙ্কল ভার্নন ভয়ে বিবর্ণ হয়ে ঘরে ঢুকলেন। তার হাতে একটি রাইফেল। এখন তারা বুঝতে পারল তিনি সরু লম্বা প্যাকেটে কি এনেছিলেন।

কে ওখানে? আঙ্কল ভার্নন চিৎকার করে উঠলেন–সাবধান, আমার হাতে অস্ত্র আছে

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর আবার…   

ধ পা স

দরোজায় এমন জোরে ধাক্কা লাগল যে কান–ফাটানো আওয়াজে দরোজার সব পাল্লা মাটিতে পড়ে গেল। দরোজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে এক অতিকায় মানুষ–দৈত্য বললেও ভুল হবে না। চুল–দাঁড়িতে মুখ প্রায় ঢাকা। জ্বলজ্বলে চোখ। তার মাথা গিয়ে ঠেকেছে ঘরের ছাদ পর্যন্ত। মাথা নত করে পিঠ বাঁকিয়ে কুঁজো হয়ে দৈত্যটা ঘরে ঢুকে গেলেন। সে মাথা নিচু করে দরোজাটি হাতে তুলে নিলেন এবং জায়গামতো বসিয়ে দিল। বাইরে ঝড়ের গর্জন কিছুটা কমল। দৈত্যটা সবার দিকে তাকাল।

আমাকে কি এক কাপ চা বানিয়ে দেয়া যায়? পথে যা ধকল সহ্য করেছি।

তারপর সে সোফার দিকে এগিয়ে গেল যেখানে ডাডলি ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে।

দৈত্য বলল-এই মটু উঠে দাঁড়া।

ডাডলি ভয়ে জড়সড় হয়ে মাকে আড়াল করে লুকোবার জন্য ছুটল। আঙ্কল ভার্ননের পেছনে তিনিও ভয়ে কাঁপছিলেন।

আরে এইতো হ্যারি। দৈত্য হ্যারিকে দেখে বলল। হ্যারি দৈত্যাকার লোকটার দিকে তাকাল। লোকটার মুখে স্মিত হাসি।

দৈত্যাকার লোকটা হ্যারিকে বলল–আমি তোমাকে প্রথম যখন দেখি তখন তুমি মাত্র একটি ছোট্ট শিশু। তোমাকে ঠিক তোমার বাবার মত দেখাচ্ছে। অবশ্য তোমার চোখ দুটো তোমার মায়ের মতো।

আঙ্কল ভার্ননের গলায় ঘাড় ঘ্যাঙ শব্দ।

তিনি বললেন–তুমি এক্ষুণি এখান থেকে চলে যাও। এটা আমার হুকুম। তুমি দরোজা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছো।

চুপ করো, নির্বোধ–দৈত্য দাপটের সাথে ধমক দিল। সে সোফার পেছনে গিয়ে আঙ্কল ভার্ননের হাত থেকে রাইফেলটি নিয়ে নিল। রাইফেলটাকে বাঁকিয়ে ঘরের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলল। এত সহজে যেন রাবারের তৈরি কোন জিনিস দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দিল। আঙ্কল ভার্নন মৃদুকণ্ঠে কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু অদ্ভুত কিছু শব্দ করা ছাড়া তার গলা দিয়ে কথা বেরুল না।

দৈত্য হ্যারিকে উদ্দেশ্য করে বলল–হ্যারি, যাহোক, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।

 এর পর দৈত্যটা তার জামার পকেট থেকে একটা বাক্স বের করে হ্যারিকে দিল। হ্যারি কাঁপা কাঁপা হাতে বাক্সটা খুলল। একটা বড়ো চকোলেট কেক। কেকের ওপর সবুজ রঙের আইসক্রিম দিয়ে লেখা হ্যাপি বার্থ–ডে হ্যারি।

হ্যারি দৈত্যের দিকে তাকিয়ে বলতে চাইছিল–তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো–কে তুমি?

দৈত্যটা প্রথম একটু আমতা আমতা করল। তারপর বলল–আমারই ভুল হয়ে গেছে। প্রথমেই আমার পরিচয় দেয়া উচিত ছিল। আমার নাম রুবিয়াস হ্যাগ্রিড। আমি হোগার্টসে থাকি। সেখানকার দরোজার চাবি আমার হেফাজতে আর মাঠের দেখাশোনা করি।

হ্যারির সাথে করমর্দন করার জন্য দৈত্যটি বিশাল হাত বাড়িয়ে দিল। করমর্দনের সময় হ্যারির মনে হলো তার হাতটা বুঝি খসে পড়ছে।

চা পাওয়া যাবে? হ্যাগ্রিড মনে করিয়ে দিলেন। চা যদি একটু কড়াও হয় তাতেও আমার আপত্তি নেই।

এবার হ্যাগ্রিডের দৃষ্টি গেল ঘর গরম করার ফায়ার প্লেস-এর দিকে। তিনি ঘরের ফায়ার প্লেস-এর কাছে একটু কুঁজো হলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে গনগনে আগুন জ্বলে উঠল। ঘর এত গরম হলো যে হ্যারির মনে হল, সে যেন একটা হট বাথ নিচ্ছে। আগুনে গোসল করে নিচ্ছে।

হ্যাগ্রিড এবার সোফায় বসে পড়লেন। মনে হল গদিটি বুঝি ডুবে যাবে। এবার হ্যাগ্রিডের জামার পকেট থেকে হরেক রকমের জিনিস বেরুল–তামার কেতলি, এক প্যাকেট শূকরের মাংসের সসেজ, লম্বা মগ, বোতল, চা ইত্যাদি। হ্যাগ্রি তার কাজ শুরু করে দিলেন। সসেজের আগুনে ঝলসানোর শব্দ ও পোড়া মাংসের গন্ধে ঘর ভরে গেল। তিনি যখন ছয়টি মোটা, রসে ভরা এবং কিছুটা পুড়ে যাওয়া সসেজ লোহার শিকের কড়াই থেকে বের করল ডাডলি লোভাতুর দৃষ্টিতে সেইদিকে তাকাল। আঙ্কল ভার্নন কড়াভাবে বললেন–ডাডলি, ওর দেয়া কোন জিনিস স্পর্শ করবে না।

হ্যাগ্রিড মুচকি হেসে রসিকতা করে বললেন–তোমার ছেলে ডাডলি তো একটি আস্ত থলথলে পুডিং, ওর জন্য চর্বির প্রয়োজন হবে না। তোমার কোন চিন্তার কারণ নেই।

হ্যাগ্রিড হ্যারির দিকে সসেজ বাড়িয়ে দিলেন। হ্যারি এত ক্ষুধার্ত ছিল যে খেয়ে মনে হলো এর আগে কখনো সে এত সুস্বাদু খাবার খায়নি। যদিও সে ভয়ের চোখে হ্যাগ্রিডের দিকে তাকিয়ে ছিল।

হ্যারি হ্যাগ্রিডের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইল। তারপর নিজ থেকেই বলল–আমি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি আপনি কে?

হ্যাগ্রিড এক ঢোক চা গিললেন। হাতের তালু দিয়ে মুখ মুছলেন।

বললেন–সবাই যেমন ডাকে–তুমিও আমাকে হ্যাগ্রিড বলে ডাকবে। তোমাকে একটু আগেই বলেছি, আমি হোগার্টসের চাবির রক্ষক। ধীরে ধীরে তুমি হোগার্টস সম্পর্কে সব জানতে পারবে।

না। হ্যারি বলল।

হ্যাগ্রিড একটু ধাক্কা খেলেন মনে হলো; তিনি হ্যারির এই উত্তর আশা করেনি।

আমি দুঃখিত। হ্যারি দুঃখ প্রকাশ করল।

এবার হ্যাগ্রিড ডার্সলি পরিবারের অন্য সবার দিকে তাকাল। হ্যারি, তোমার দুঃখিত হবার কোন কারণ নেই। দুঃখিত হবার কারণ তো ওদেরই। আমি জানি–তোমাকে লেখা একটি চিঠিও ওরা তোমাকে দেয়নি। হোগার্টসের ব্যাপারেও তারা তোমাকে কিছু জানায়নি। তোমার বাবা–মার ব্যাপারেও ওরা তোমাকে কিছু বলেনি।

আমার বাবা–মার সম্পর্কে কী? হ্যারি আগ্রহ ভরে জানতে চাইল।

তুমি কিছুই জানো না! হ্যাগ্রিড বিস্ময় প্রকাশ করল। বলল–ঠিক আছে, এক সেকেন্ড অপেক্ষা করো।

হ্যাগ্রিড এত ক্ষেপে গেলেন যে মনে হল মুহূর্তেই বাড়িটা লন্ডভণ্ড করে ফেলবেন। ডার্সলি ভয়ে পেছনে হটে দেয়ালে পিঠ ঠেকালেন।

হ্যাগ্রিড হুংকার দিয়ে বললেন–তোমরা আমাকে বল, ছেলে-এই ছেলেটা–মানে হ্যারি কি কিছুই জানে না?

হ্যারির মনে হলো–হ্যাগ্রিড একটু বাড়াবাড়ি করছেন। সে তো স্কুলে পড়ছে। লেখাপড়ায় সে খুব একটা খারাপ নয়।

হ্যারি বলল–আমি পড়াশোনা করি। আমি অঙ্কে ভালো।

হ্যাগ্রিড হ্যারির কথায় কান না দিয়েই ডার্সলি পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রশ্ন করলেন আপনারা কি ওকে ওর পরিবার, ওর বাবা–মার ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানাননি?

হ্যাগ্রিড যেন উত্তেজনায় ফেটে পড়ছিলেন।

আঙ্কল ভার্নন ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে পড়লেন। হ্যাগ্রিড হ্যারির দিকে তাকিয়ে বললেন–তোমার বাবা–মা সম্পর্কে তোমার জানা উচিত। তারা খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন। তুমিও সেই হিসেবে খ্যাতিমান।

কী বললেন? আমার বাবা–মা খ্যাতিমান ছিলেন? হ্যারি বিস্ময়ে হ্যাগ্রিডকে জিজ্ঞেস করল।

তুমি একেবারে কিছুই জানো না? হ্যাগ্রিড বিস্ময়ে হ্যারির দিকে তাকালেন।

অনেকক্ষণ পর আঙ্কল ভার্নন কিছু বলার সাহস পেলেন। তিনি বললেন–হ্যারির বাবা–মা সম্পর্কে কিছু না বলার জন্য তোমাকে অনুরোধ করছি।

এতে হ্যাগ্রিডের রাগ কমল না। হ্যাগ্রিড রাগের সাথেই বললেন আপনি তো কখনো তাকে বলেননি চিঠিগুলোতে কী লেখা ছিল? ডাম্বলডোর হ্যারিকে এই চিঠিগুলো পাঠিয়েছিলেন আমার সামনেই। আপনি এতগুলো বছর হ্যারির কাছ থেকে সবকিছু গোপন রেখেছেন। তাই না?

কী লুকিয়ে রেখেছেন? হ্যারি কৌতূহলী হয়ে উঠলো।

চুপ কর, এসব কথা বলতে আমি কি তোমাকে নিষেধ করিনি? আঙ্কল ভার্নন বিরক্তি প্রকাশ করলেন।

আন্ট পেতুনিয়ার চেহারায়ও আতঙ্কের ছাপ দেখা গেল।

আপনারা দুজন মাথা গরম করলেও কিছু হবে না। হ্যারি তুমি একজন জাদুকর। হ্যাগ্রিড বলল।

ঘরের মধ্যে পিনপতন নীরবতা। শুধু কেবল সাগরের গর্জন আর বাতাসের শির শির আওয়াজ ভেসে আসছে।

আমি একজন কী? হ্যারি আরো কৌতূহলী হলো।

তুমি একজন জাদুকর। হ্যাগ্রিড বললেন–তোমার কাছে পাঠানো চিঠিগুলো তোমার পড়া উচিত ছিল। এই বলে হ্যাগ্রিড একটি হলুদাভ খাম হ্যারির হাতে দিলেন।

হ্যারি খামটি হাতে নিল। খামের ওপর হালকা সবুজ কালিতে লেখা ছিল

মি, এইচ পটার
দি ফ্লোর, হার্ট অন দি রক
সমুদ্র

হ্যারি চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলো–

হোগার্টসের জাদু বিদ্যালয়
প্রধান শিক্ষক : আলবুস ডাম্বলডোর

প্রিয় মি. পটার,
আমরা আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, আমাদের জাদু বিদ্যালয়ে তোমার জন্য একটি আসন রাখা আছে। চিঠির সাথে প্রয়োজনীয় বইপত্র ও সরঞ্জামাদির তালিকা দেয়া হলো।
আগামী ১লা সেপ্টেম্বর থেকে কোর্স শুরু হবে। ৩১শে জুলাইয়ের ভেতর তোমার কাছে পেঁচা প্রত্যাশা করছি।

ইতি
মিনার্ভা ম্যাকগোনাগল
উপ–প্রধান শিক্ষক

হ্যারির মাথায় একগাদা প্রশ্ন কিলবিল করছিল। সে ভেবে পাচ্ছিল না, কোন প্রশ্নটা আগে করবে। কয়েক মিনিট পর অস্ফুটস্বরে বলল, তারা আমার পেঁচার জন্য অপেক্ষা করবে, এর অর্থ কী? একহাতে নিজের কপাল চেপে হ্যাগ্রিড বলল, এতক্ষণে মনে পড়েছে তার অপর হাতটি ওভারকোটের পকেটে ঢুকিয়ে একটি জীবন্ত পেঁচা, একটি লম্বা পালকের কলম ও মোটা কাগজের রোল বের করলেন। হ্যাগ্রিড তার দাঁতে পাখির পালক চেপে কাগজে কিছু লিখলেন যা বুঝতে হ্যারির একটুও অসুবিধে হলো না।

হ্যাগ্রিড লিখলেন :

প্রিয় মি, ডাম্বলডোর,
হ্যারিকে তার চিঠি দেয়া হয়েছে। তার জিনিসপত্র কেনার জনা আমি আগামীকাল বেরুব। আবহাওয়া দুর্যোগময়। আশা করি আপনি ভালো আছেন।
ইতি
হ্যাগ্রিড

লেখাটা ভাঁজ করে হ্যাগ্রিড পেঁচাকে দিলেন। পেঁচা এটা ঠোঁটে চেপে ধরল। এবার পেঁচাটিকে জানালা দিয়ে হ্যাগ্রিড আকাশে উড়িয়ে দিলেন। এমন স্বাভাবিকভাবে হ্যাগ্রিড ফিরে এসে বসলেন, যেন এইমাত্র ফোনে কথা বলে এলেন। এরপর আঙ্কল ভার্নন হুংকার দিয়ে উঠলেন–হ্যারি তুমি কোথাও যাবে না। হ্যাগ্রিড রেগেমেগে আগুনের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। এবং বললেন–আমি দেখতে চাই তোমার মতো একটা মাগল তাকে কীভাবে আটকায়।

মাগল। মাগল কী? হ্যারি জানতে চাইল।

হ্যাগ্রিড জবাব দিলেন–মাগল হলো যে সব লোক জাদুর মর্ম বোঝে না। তোমার দুর্ভাগ্য এরকম একটি মাগল পরিবারে তুমি বড় হয়েছে।

এবার আঙ্কল ভার্নন এগিয়ে এসে বললেন–আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আমরা তাকে এ ধরনের ভোজবাজি থেকে দূরে রাখব। তার ওই ধরনের জাদু–টাদু শেখার ইচ্ছা চিরকালের জন্য আমরা শেষ করে দেব।

হ্যারি বলল–তোমরাও কি জানো যে আমি একজন–জাদুকর।

অবশ্যই জানি। পেতুনিয়া জবাব দিলেন-এটা কী করে হয় যে আমি আমার বোন সম্পর্কে কিছু জানবো না। সেও সেই স্কুল থেকে এরকম চিঠি পেয়েছিল এবং একদিন উধাও হয়ে গিয়েছিল। ছুটির সময় সে বাড়িতে আসতো–তার পকেটে থাকতে ব্যাঙের পা, চায়ের কাপকে সে ইঁদুর বানাতো। একমাত্র আমিই জানতাম, সে একটি ভণ্ড! কিন্তু আমার মা–বাবার কাছে সে ছিল প্রিয়–সবকিছুতেই তারা লিলিকে নিয়ে গর্ব করতো। সবসময় বলতে লিলি এটা… লিলি ওটা…। তারপর তোমার বাবার সাথে স্কুলে তার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে ঘনিষ্টতা এবং বিয়ে। ওরা দুজনেই পাগল, অদ্ভুত, অস্বাভাবিক। তারপর তোমার জন্ম হয়। আমি জানতাম তুমি তাদের মত হবে। তারা একদিন বিস্ফোরণে শেষ হয়ে গেল। তারপর থেকে তুমি আমাদের কাছে।

কথাগুলো শুনে হ্যারির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একটু পর হ্যারি মুখ খুলল–বিস্ফোরণ! তোমরা না বলেছিলে, আমার বাবা–মা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে?

গাড়ি দুর্ঘটনায়! হ্যাগ্রিড গর্জন করে উঠলেন। ডার্সলি পরিবারের সদস্যদের প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হ্যাগ্রিড প্রশ্ন করলেন-এটা কি বিশ্বাস করা যায় যে লিলি আর জেম্স্ গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এটা অসম্ভব। এটা নিছক গুজব। বানোয়াট গল্প। এটা বদনাম। আমাদের জগতের প্রতিটা শিশুই হ্যারি পটারের নাম জানে। এটা কি করে হয় যে সে নিজেই তার সম্পর্কে জানে না। কিন্তু কেন এই দুর্ঘটনা ঘটলো। হ্যাগ্রিড কঠিন ভাষায় প্রশ্ন করলেন।

হ্যাগ্রিডের ক্রোধ খুব দ্রুতই উদ্বেগে পরিণত হলো। উদ্বিগ্ন স্বরে হ্যাগ্রিড বললেন–আমি এটা কখনোই আশা করিনি। আমি তখন বুঝতে পারিনি ডাম্বলভোর কেন আমাকে বলেছিলেন তোমাকে নিতে অনেক বাধা–বিপত্তি পেরুতে হবে। তুমি যে অনেক কিছু জানো না-এটাও আমার জন্য কম বিস্ময়ের ব্যাপার নয়। তোমাকে আমার অনেক কিছুই বলার আছে। তবে সবটুকু এখন বলা যাবে না। আমি ততটুকুই বলব যতটুকু আমার পক্ষে বলা সম্ভব।

ডার্সলি পরিবারের সদস্যদের প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হ্যাগ্রিড হ্যারিকে বলতে লাগলেন–বিষয়টি এই, আমার মনে হয় একটা লোক, নাম–কিন্তু আশ্চর্য তুমি তার নাম জানো না! পৃথিবীর সকলে তার নাম জানে।

লোকটা কে? হ্যারি প্রশ্ন করে বসে।

তার নাম …বলতে গিয়ে হ্যাগ্রিড থেমে গেলেন। হ্যাগ্রিডের মুখ থেকে নামটি বেরুল না।

আমি তার নাম বলতে পারব না। কেউই তার নাম উচ্চারণ করে না হ্যাগ্রিড বললেন।

কিন্তু কেন? হ্যারি জানতে চাইল।

হ্যাগ্রিড বললেন–ঘটনার সাথে আরেকজন জড়িত। তার নাম গালপিন গারগোয়েলেস। সে একজন ভেলকিবাজ ও বদমায়েশ। খুবই জঘন্য, জঘন্যের চেয়েও জঘন্য। তার নাম বলা… আচ্ছা ঠিক আছে, তার নাম ভোলডেমর্ট। দ্বিতীয়বার তার নাম নিতে বলবে না। তার জগতটাই ছিল জাদুলীলা, ডাইনি আর ভেলকিবাজদের নিয়ে। প্রায় বিশ বছর আগে সে তার অনুসারী বানাবার জন্যে লোকজন খুঁজতো। সে বিভিন্ন ধরনের ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটাতে। সে কয়েকজনকে খুন করেছে। বিশেষ করে তার বিরোধী মতের লোকদেরকে। একমাত্র ডাম্বলডোরকেই সে ভয় পেতো। তার স্কুলটাকে সে নিতে সাহস পায়নি।

হ্যাগ্রিড বলে চললেন–তোমার বাবা মা খুব ভাল জাদুকর ছিলেন। তাদের তুলনা হয় না। ছাত্রাবস্থায় হোগার্টস স্কুলে তারা হেড বয় ও হেড গার্ল ছিলেন। তবে এটা অজানাই থেকে গেল যে কেন ভোলডেমর্ট তাদেরকে পক্ষে নেয়ার চেষ্টা কখনো করেনি। এর কারণ হতে পারে যে তোমার বাবা–মা ডাম্বলডোরের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তখন তোমার বয়স মাত্র এক বছর। ভোলডেমর্ট তোমাদের বাড়ি যায়। তোমার বাবা–মাকে হত্যা করে। এ সময় ইউ–নো–হু তোমাকেও হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। তাই তোমার কপালের এই দাগ দেখে আমি বিস্মিত হইনি। এটাও তো কম কষ্ট নয়। এটা একটি শক্তিশালী অভিশাপের পরিণাম। শাপটা তোমার ওপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। এজন্যই তুমি খ্যাতিমান হ্যারি। কারণ সে যাকে মারতে চাইতো তার বাঁচার কোন উপায় থাকত না। একমাত্র তুমিই তার ব্যতিক্রম।

গ্রিডের কথা শুনে হ্যারির মন বিষাদে ভরে গেল।

করুণ দৃষ্টিতে হ্যাগ্রিড হ্যারির দিকে তাকালেন।

হ্যাগ্রিড বলনেল–ডাম্বলডোরের নির্দেশেই আমি তোমাকে সেই ভাঙা বাড়ি থেকে উদ্ধার করি। তবে শেষ পর্যন্ত তুমি যেখানে আছ–অর্থাৎ ডার্সলিদের পরিবারে–সেটাও তো তোমার জন্য ভালো হয়নি। এটা তো তোমার জন্য একটি নরক।

ইতোমধ্যে আঙ্কল ভার্নন তার সাহস কিছুটা ফিরে পেয়েছেন। তিনি বললেন–আমি স্বীকার করি হ্যারির ভেতর অদ্ভুত কিছু জিনিস আছে। সে ডাইনি জগতের লোক। হয়ত শাসন করে তাকে বশে আনা যাবে অথবা যাবে না। তবে আমি চাই না সে ওই জগতের সাথে কোন সম্পর্ক রাখুক।

আঙ্কল ভার্ননের কথা শুনে হ্যাগ্রিড সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠলেন। তার প্যান্ট থেকে একটা ভাঙা ছাতা বের করে সেটাকে তরবারির মতো করে আঙ্কল ভের্ননের সামনে উঁচিয়ে ধরলেন। তারপর বললেন–ডার্সলি, আমি তোমাকে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি, তুমি আর একটি কথাও বলবে না।

ছাতার খোঁচা খাবার ভয়ে আঙ্কল ভার্নন একেবারে চুপসে গেলেন।

হ্যাগ্রিড পুনরায় সোফায় বসলেন।

ভোলডেমর্টের কী হলো? হ্যারি জানতে চাইল।

হ্যাগ্রিড বললেন–সে সেদিন পালিয়ে গেল। পরের রাতে সে তোমাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। তবে ওর ব্যাপারটাও রহস্য রয়ে গেছে। কেউ বলে ও মারা গেছে। কেউ বলে ও এখনও জীবিত।

আন্তরিকতা ও উষ্ণতার সাথে হ্যাগ্রিড হ্যারির দিকে তাকালেন। ওঁর কথায় হ্যারি খুশি ও গর্বিত হওয়ার পরিবর্তে বরং মনে করলো কোথাও বড় ধরনের ভুল হচ্ছে। সে জাদুকর! সে কীভাবে জাদুকর হয়? সে তো ডার্সলি পরিবারে আঙ্কল ভার্নন এবং আন্ট পেতুনিয়ার কাছেই প্রতিপালিত হয়েছে। সে যদি জাদুকরই হবে তাহলে তাকে কেন যাযাবরের জীবন কাটাতে হচ্ছে? কেন কাবার্ডের ওপর ঘুমোতে হয়। সে যদি খ্যাতিমানই হবে তাহলে ডাডলি কেন সব সময় তাকে ফুটবলের মতো লাথি মারে।

হ্যারি হ্যাগ্রিডকে বলল–আপনি বোধহয় ভুল করছেন। আমার মনে হয় না, আমি একজন জাদুকর।

হ্যারির কথায় হ্যাগ্রিড মৃদু হাসলেন।

তুমি জাদুকর হবে না কেন? জাদুবিদ্যাকে কি তুমি ভয় পাও?

হ্যারি আগুনের দিকে তাকাল। এখন সে ভাবতে লাগল ভার আঙ্কল আন্ট তার সাথে কেন দীর্ঘদিন এমন ওলট–পালট ও অস্বাভাবিক ব্যবহার করেছেন।

হ্যারি হাসিমুখে হ্যাগ্রিডের দিকে তাকিয়ে দেখল, হ্যাগ্রিডের মুখে তখনও স্মিত হাসি। আঙ্কল ভার্ননের উদ্দেশ্যে হ্যাগ্রিড বললেন–তুমি কি দেখতে চাও হ্যারি জাদু জানে কিনা।

আঙ্কল ভার্নন বলল–আমি তোমাকে বলেছি হ্যারি কোথাও যাবে না। ও স্টোনওয়াল হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে। তোমাদের ফালতু চিঠি আমি পড়েছি।

হ্যারি হোগার্টসে যদি যেতে চায়। তোমার মত একজন বড় মাগলও কিছুতেই তাকে রুখতে পারবে না–হ্যাগ্রিড বললেন। তুমি কি পাগল, ভাবছো, লিলি ও জেমস-এর ছেলের হোগার্টস যাওয়া বন্ধ করতে পারবে। জন্মের পরেই ওর নাম এ স্কুলে লেখা হয়ে গেছে। সে সেখানে হোগার্টসের ইতিহাসে যার মত বড় শিক্ষক হননি সেই আলবাস ডাম্বলডোরের অধীনে পড়াশোনা করবে।

তাকে ম্যাজিকের কারসাজি শেখানোর জন্য কোন মাথা খারাপ বৃদ্ধকে আমি এক কানা কড়িও দিচ্ছি না। আঙ্কল ভার্ননের কণ্ঠে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

শেষ পর্যন্ত তিনি খানিকটা বেশিই বলে ফেললেন। হ্যাগ্রিড আবার ছাতাটি তরবারির মতো করে আঙ্কল ভার্ননের সামনে তার মাথার ওপর শূন্যে ঘুরালেন। আর বলল–হুঁশিয়ার আলবাস ডাম্বলডোরের বিরুদ্ধে তুমি একটা কথা বলবে না।

হিশ… শব্দ করে ছাতাটি যখন ডাডলির সামনে চলে এল, বেগুনি রঙের আলোর ঝলকানি, আতশবাজির মত একটা শব্দ, এক তীব্র চিৎকার এবং পরমুহূর্তেই ডাডলি তার নিতম্বে দু হাত চেপে তীব্র ব্যথায় বিকট শব্দ করে উঠল। হ্যারি দেখলো একটি শূকরের লেজ ডাডলির ট্রাউজার খুঁড়ে বের হচ্ছে। আঙ্কল ভার্নন আর্তনাদ করে উঠলেন। তিনি এত ভয় পেলেন যে তৎক্ষণাৎ আন্ট পেতুনিয়া আর ডাডলিকে দ্রুত টেনে অন্য ঘরে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় যখন দরোজা বন্ধ করছিলেন তখন তার চেহারায় ভীষণ আতঙ্কের ছাপ। হ্যাগ্রিড তার দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে ছাতার দিকে তাকিয়ে বললেন, মাথা গরম করা ঠিক নয়, কিন্তু অনেক সময় এটা কাজ করে। মানে… ওকে শূকর বানানো, তবে সে এমনিতেই দেখতে শূকরের মতো।

হ্যারি হ্যাগ্রিডকে জিজ্ঞেস করল–আপনি জাদু দেখান না কেন?

একথার কোন জবাব না দিয়ে হ্যাগ্রিড তাঁর কোটটা হ্যারির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, তুমি আমার কোটটি পরে নাও। খেয়াল রেখো। এর ভেতরে আরো কিছু জিনিস আছে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *