০৪. ঘূর্ণিপাকে

যেদিন পৌঁছুবার কথা, তার দু-দিন আগেই মংগোলিয়া বম্বাইয়ের জাহাজ-ঘাটায় এসে ভিড়লো। সন্ধে আটটার সময় কলকাতার ট্রেন ছাড়বে। ফগ হুইস্ট খেলা শেষ করে তীরে নামলেন। পাসপার্তুকে কতগুলো দরকারি জিনিশপত্র কিনতে দিয়ে সময়মতো রেলস্টেশনে হাজির হতে বললেন, তারপর সোজা গেলেন কন্সাল আপিশে। বম্বাইয়ের দ্রষ্টব্য স্থানগুলোর প্রতি ফগের কিছুমাত্র আকর্ষণ ছিলো না। তাই কন্সাল আপিশ থেকে বেরিয়ে সোজা স্টেশনেই চলে এলেন তিনি, আর সেখানেই রেলের হোটেলে আহার সমাধা করলেন।

ফিক্স একটু বাদেই জাহাজ থেকে নেমে পুলিশ-আপিশে গেলেন। সেখানে নিজের পরিচয় দিয়ে দস্যুর পশ্চাদ্ধাবনের কাহিনী বর্ণনা করে শুধোলেন : লণ্ডন থেকে কোনো ওয়ারেন্ট এসেছে কি? উত্তরে শুনলেন, না, আসেনি। ওয়ারেন্টটির লণ্ডন থেকে বম্বাইয়ে পৌঁছুবার উপর্যুক্ত সময় তখনও হয়নি। ফিক্স বড় হতাশ হয়ে পড়লেন। তবু পুলিশ কমিশনারের কাছে একটা ওয়ারেন্ট প্রার্থনা করলেন। পুলিশ কমিশনার জানালেন: আমার দেয়ার কোনো এক্তিয়ার নেই।

নিরুপায় হয়ে বিলেতের ওয়ারেন্টের অপেক্ষাতেই রইলেন ফিক্স। দস্যু যাতে পালিয়ে যেতে না-পারে, সেজন্যে রাখলেন কড়া নজর। তার দৃঢ়বিশ্বাস ছিলো, ফগ অন্তত দু-চারদিন বম্বাই থাকবেনই। তদ্দিনে নিশ্চয়ই ওয়ারেন্ট এসে উপস্থিত হবে।

পাসপার্তুরও ধারণা ছিলো যে তারা কিছুকাল বম্বাই থাকবে। কিন্তু তার দিবাস্বপ্ন ভেঙে যেতে দেরি হয়নি। সে দেখলো, অন্তত কলকাতা পর্যন্ত যেতেই হচ্ছে-কে বলতে পারে আরো দূর পথ যেতে হবে কি-না। তার ধীরে-ধীরে বিশ্বাস হতে লাগলো, তবে বুঝি বাজির কথা মিথ্যে নয়। সে তার কপাল চাপড়ে পোড়া অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতে লাগলো।

ফগের কথামতো জিনিশপত্র কিনে পাসপার্তু রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে লাগলো। যত ঘোরাঘুরি করতে লাগলো, ততই তার কৌতূহল বেড়ে চললো। বম্বাইয়ের জাঁকজমক তার চোখ একেবারে ধাঁধিয়ে দিয়েছে।

রেল-স্টেশনের পথে আসতে-আসতে সে দেখতে পেলে অনতিদূরে মালাবার গিরিশূঙ্গে একটা মন্দির দেখা যাচ্ছে। এমন চকমেলানো সুন্দর মন্দিরটা একবার দেখে যাওয়া দরকার ভেবে সে মন্দিরের দিকে এগুলো।

ফরাশি পাসপার্তু জানতো না যে হিন্দুর মন্দিরে, এমনকী মন্দির-প্রাঙ্গণে পর্যন্ত খ্রিষ্টানরা ঢুকতে পারে না। যারা প্রবেশ করতে পারে, তাদেরও মন্দিরের বাইরে জুতো রেখে প্রবেশ করতে হয়। এই নিয়ম অবহেলা করলে ইংরেজ-আদালতে নিয়মভঙ্গকারীর কঠোর শাস্তি অনিবার্য।

অনভিজ্ঞ পাসপার্তু যখন নিঃসন্দিগ্ধচিতে জুতো পরে মন্দিরপ্রাঙ্গণে ঢুকে সোল্লাসে মনে-মনে মন্দিরের কারুকার্যের প্রশংসা করছিলো, তখন কে যেন এসে চক্ষের পলকে একধাক্কায় তাকে মাটিতে পেড়ে ফেললে। সে তাকিয়ে দেখলে, তিনজন ক্রুদ্ধ হিন্দু তার কাছে দাঁড়িয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় তীব্রকণ্ঠে তিরস্কার করছে। না, তিরস্কার বা ভৎসনা নয়–বিশুদ্ধ গালাগালিই সে-সব। আর গালাগাল বুঝতে বোধহয় ভাষাও জানতেও হয় না। একজন জোর করে তার জুতো খুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো; আর অন্য-দুজন তাকে আক্রমণ করে সাংঘাতিকভাবে প্রহার করতে লাগলো।

পাসপার্তু নিজেকে সামলে নিয়ে চক্ষের পলকে উঠে দাঁড়ালে। তারপর দু-চারটে ঘুসি মেরে বিপক্ষদলকে একটু হতচকিত করে দিয়ে তীরবেগে পলায়ন করলে। অমনি চারদিকে ধর-ধর রব উঠলো! কিন্তু পাসপার্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজপথের জনারণ্যে মিশে গেলো, আর কেউ তার সন্ধান পেলো না।

ট্রেন ছাড়বার পাঁচ মিনিট আগে পাসপার্তু হাঁপাতে হাঁপাতে স্টেশনে এসে হাজির হলো। জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফালা-ফালা, মাথায় নেই টুপি, পায়ে নেই জুতো, খালি-পা ক্ষতবিক্ষত। ফগের জন্য যে-সব জিনিশ কেনাকাটা করেছিলো গোলমালের সময় সেগুলো যে কোথায় পড়েছে কে জানে। ফিক্স তখন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ফিলিয়াস ফগের কাছেই অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পাসপার্তুর দুরবস্থা দেখে তার তো চোখ কপালে উঠলো। পাসপার্ত তার দুর্দশার কাহিনী সংক্ষেপে ফগকে খুলে বললে। ফগ শান্তভাবে গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন : আশা করি এমন কাজ আর-কখনও করবে না। খালিমাথা খালি-পা হতবুদ্ধি পাসপার্তু কী বলবে বুঝতে না-পেরে ফ্যালফ্যাল করে প্রভুর দিকে তাকিয়ে কোনো দ্বিরুক্তি না-করে গাড়িতে উঠে বসলো।

ফিক্সওদস্যুর পশ্চাদ্ধাবন করবার জন্যে সেই ট্রেনেই যাবেন বলে ঠিক করেছিলেন, কিন্তু পাসপার্তুর কাহিনী শুনে মনে-মনে ভাবলেন, দেখা যাক, কী হয়। ঠিক সেইমুহুর্তে

হুইসল দিয়ে বম্বাই মেল কলকাতা যাত্রা করলো।

যে-গাড়িতে ফিলিয়াস ফগ পাসপার্তুকে নিয়ে উঠেছিলেন, সেই গাড়িতেই জেনারেল সার ফ্রান্সিস কোমার্ট ছিলেন। মংগোলিয়া জাহাজে এরই সঙ্গে হুইস্ট খেলতেন ফগ। সার ফ্রান্সিসের জীবনের বেশির ভাগই কেটেছিলো ভারতবর্ষে। ইতিপূর্বেই ফগের বাতিকগুলো লক্ষ করেছিলেন ভদ্রলোক। তার রকম-সকম দেখে অনেক সময় সার ফ্রান্সিসের সন্দেহ হতো, বুঝি এই রক্তমাংসের শরীরের মধ্যে কোনো প্রাণ নেই—যে-মন প্রকৃতির অফুরন্ত লীলা-সুন্দর রূপ দেখবার জন্যে ব্যাকুল থাকে, সেইরকম কোনো মন বোধহয় নেই ফিলিয়াসের শরীরে। জীবনে অনেক লোক দেখেছেন সার ফ্রান্সিস, কিন্তু ফগের মতো লোক আর-কখনও দ্যাখেননি।

ট্রেন যেমন চলছিলো, তেমনি চললো। দেখতে-দেখতে পেরিয়ে গেলো পশ্চিমঘাট গিরিমালার সুড়ঙ্গ-পথ।

কথা-প্রসঙ্গে সার ফ্রান্সিস বললেন : আর-কিছুদিন আগে হলে আপনাকে কিন্তু বিফল-মনোরথ হতে হতে মিস্টার ফগ, আশিদিনে সারা দুনিয়া ঘুরে আসা সম্ভব হতো না। কারণ, তখন পশ্চিমঘাট পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্তই চলতো রেল—তারপর আর লাইন ছিলো না। তখন সেখান থেকে পাল্কিতে কিংবা ঘোড়ায় করে যেতে হতো।

ও-সব সামান্য বাধায় আমার অসুবিধে হতো না। পথ চলতে গেলে মাঝে-মধ্যে বাধাবিঘ্ন এসে হাজির হবে, সেটা তো জেনেশুনেই বেরিয়েছি।

আজকেই তো আপনার সব মাটি হতে বসেছিলো। কম্বল মুড়ি দিয়ে পাসপার্তু কুঁকড়েমুকড়ে ঘুম যাচ্ছিলো, তাকে দেখিয়ে সার ফ্রান্সিস বললেন, আপনার ঐ ভৃত্য পাসপার্তু আজ যে-কাণ্ড বাঁধিয়ে বসেছিলো, ব্রিটিশ ভারতে সেই অপরাধ কিন্তু খুবই গুরুতর বলে গণ্য হয়। এ-দেশের লোকের ধর্মবিশ্বাসে যাতে কোনো আঘাত না লাগে, ইংরেজ সরকার সে-বিষয়ে খুব হুঁশিয়ার ও তৎপর। আজ যদি ও ধরা পড়তে

তাহলে কী আর হতো? এ-দেশের আইন অনুসারে তার শাস্তি হতো। দু-দিন পরেই সে আবার ইওরোপে ফিরে যেতো। ওর জন্য কি আর আমি এখানে বসে থাকতুম? ককখনো না। ওকে ফেলে রেখে একাই চলে যেতুম আমি।

রাত বেড়ে চললো ক্রমশ। সকলে ঘুমিয়ে পড়লেন। ট্রেন যেমন তীরবেগে ছুটছিলো, তেমনি চললো।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙলো পাসপার্তুর। ট্রেন আগের মতোই দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। পাসপার্তু গভীর মনোযোগ দিয়ে চারদিকে দেখতে লাগলো। মল্লিনাথ, ইলোরা, ঔরঙ্গবাদ ছাড়িয়ে বেলা প্রায় সাড়ে-বারোটার সময় বেহরামপুর স্টেশনে এসে ট্রেন থামলো। ঝুটোমোতি-বসানো একজোড়া চপ্পল কিনে পাসপার্তু সগর্বে তার খালি-পা আবৃত করলো।

মালাবারের দুর্ঘটনার পর থেকেই পাসপার্তুর মতি ফিরেছিলো। বম্বাইয়ে আসবার আগে পর্যন্ত তার বিশ্বাস ছিলো, এই আজব ভ্রমণ বুঝি ভারতবর্ষে এসেই শেষ হবে। কিন্তু ভারতবর্ষের সুন্দর দৃশ্যাবলি তার মনের ঘুমিয়ে-থাকা ছটফটে চঞ্চল ধাতটাকে জাগিয়ে তুললো, যৌবনের উদ্দাম উম্মাদনা আবার তার মনে ফিরে এলো। এবার তার বিশ্বাস হলো যে কিলিয়াস ফগের বাজি রাখার কাহিনী পুরোপুরি সত্যি। যে-করেই হোক, আশিদিনের মধ্যে পৃথিবী ঘুরে আসতেই হবে। এবার ফিলিয়াস ফগের চেয়ে তার অস্থিরতা আর চিন্তাই যেন বেশি হয়ে উঠলো। ঠিক সময়মতো যাওয়া যাবে তো? পথে কোনো বিপদ-আপদ ঘটবে না তো? কোনো কারণে দেরি হয়ে যাবে না তো? বাজি জিততে পারলে কত গৌরব! বম্বাইয়ে তার বোকামির জন্যেই যে সব নষ্ট হতে বসেছিলো, সে-কথা মনে করে এখন তার বিষম লজ্জা হলো, বুক দুরুদুরু করতে লাগলো। কোনো স্টেশনে একটু বেশিক্ষণ ট্রেন দাঁড়ালেই বিরক্ত হয়ে উঠতে লাগলো সে। অবশেষে ট্রেনের ড্রাইভারের উদ্দেশে গালি পাড়তে শুরু করলো, আর মনে-মনে বলতে লাগলো : আমার মনিবও যেমন-ড্রাইভারকে কিছু বখশিশ দিলেই তো সে আরো-জোরে গাড়ি ছোটাতো। পুরস্কার পেয়েই তো মংগোলিয়ার ক্যাপ্টেন প্রবলবেগে জাহাজ চালিয়েছিলো!

বাইশে অক্টোবর সকাল আটটার সময় রোহটাস থেকে পনেরো মাইল দূরে গাড়ি থেমে গেলো। গার্ডসাহেব চেঁচিয়ে বললে : নামো, নামা— গাড়ি থেকে নামো! এখানে গাড়ি বদল হবে।

ফিলিয়াস ফগ এ-কথার মানে বুঝতে না-পেরে সবিস্ময়ে সার ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকালেন। পাসপার্তু মুহূর্তমধ্যে নেমে গিয়ে পড়িমরি করে খবর নিয়ে ফিরে এলো, ট্রেন আর চলবে না, পথ নেই।

সার ফ্রান্সিস বললেন : বলছো কী তুমি? ট্রেন আর চলবে না? এর মানে? আমি বলছি যে, ট্রেন আর একইঞ্চিও এগুবে না।

তার কথা শুনে ফিলিয়াস ফগ আর সার ফ্রান্সিস হন্তদন্ত হয়ে ট্রেন থেকে নামলেন। সামনে গার্ডকে দেখে সার ফ্রান্সিস শুধোলেন : আমরা কোথায় এসেছি?

খোলবি গাঁয়ে।

এখানে এতক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে-থাকার কারণ কী?

ওদিকে এখনও রেল-লাইন পাতা হয়নি।

পাতা হয়নি? তার মানে?

এখান থেকে এলাহাবাদ পঞ্চাশ মাইল। এ-পঞ্চাশ মাইল পথে এখনও লাইন বসানো হয়নি। এলাহাবাদ থেকে আবার ট্রেন পাওয়া যাবে।

সার ফ্রান্সিস রেগে উঠেছিলেন। ব্রিটিশ রাজত্বে সাহেবসবো কর্তাব্যক্তিদের রাগ একটু বেশিই হয়।লাইন হয়নি তো বরাবর কলকাতার টিকিট দেয়া হলো কেন? খবরের কাগজে যে লিখেছে লাইন বসানো হয়ে গেছে?

সে আমি কী করবো বলুন? সে হলো খবরের কাগজের দোষ। টিকিট তো সরাসরি কলকাতারই দেয়া হচ্ছে। এ তো সব্বাই জানে যে, যাত্রীরা নিজেদের ব্যবস্থামতো খোলবি থেকে এলাহাবাদ যায়।

গার্ডের কথা শুনে সার ফ্রান্সিসের রক্তচাপ মাথায় উঠলো, রাগ সব সীমা ছাড়ালো। যদি পারত, তাহলে পাসপার্তু তক্ষুনি গার্ডকেই উত্তম-মধ্যম শিক্ষা দিয়ে বসতো।

ফিলিয়াস ফগ বললেন : চলুন, সার ফ্রান্সিস। যে-করেই হোক এলাহাবাদ তো যেতেই হবে। দেখা যাক, কোনো উপায় হয় কি না।

এখন আর কী ব্যবস্থাই-বা করা যাবে? যা দেখছি, তাতে মনে হয় এখানেই আপনার বাজির দফা রফা।

ও কিছু না। ও-জন্যে ভাববেন না। পথেঘাটে দেরি যে কিছু হবে, সে আমি আগেই ভেবে দেখেছি।

সে-কী? সবিস্ময়ে সার ফ্রান্সিস বললেন : লাইন যে তৈরি হয়নি, সেটা কি তবে আগেই জানা ছিলো আপনার?

না, তা ছিলো না। তবে আমার যাত্রাপথে যে অনেক অভাবিত বাধাবিপত্তি এসে দাঁড়াতে পারে, সে-সম্বন্ধে আমার মনে কখনও কোনো সন্দেহ ছিলো না।

কলকাতার ট্রেন ধরতে না-পারলে যে আপনার সর্বস্ব যাবে!

ট্রেন ধরতে পারবোই। ছাব্বিশে দুপুরের আগে কলকাতা থেকে হংকং-এর জাহাজ ছাড়বে না। আজ তো কেবল বাইশে। এখনও ঢের সময় আছে।

এমন চাঞ্চল্যবিহীন নিশ্চিন্ত উত্তরের আর-কোনো জবাব দেয়া যায় না। অন্যান্য যাত্রীদের অনেকেই এ-কথা জানতো যে, খোলবিতেই গাড়ি-বদল করতে হয়। প্রত্যেকেই নিজের নিজের বন্দোবস্ত করে রেখেছিলো। কারু জন্যে ঘোড়া, কারু জন্যে বা গোরুর গাড়ি অপেক্ষা করছিলো। যাত্রীরা নিজের নিজের যানবাহন নিয়ে প্রস্থান করলো। ফিলিয়াস ফগ আর সার ফ্রান্সিস কোনোরকম যানবাহনই পেলেন না।

ফগ তখন বললেন : যখন কোনো যানের সুবিধে নেই, তখন আর উপায় কী? আমি হেঁটেই যাবো! পায়দলে।

এই কথা শুনে পাসপার্তু তার মোতিবসানো চপ্পলজোড়ার দিকে তাকালে একবার।

অল্পক্ষণ পরে পাসপার্তু এসে খবর দিলে আমাদের যাবার একটা হিললে হয়েছে। একটা হাতি আছে এখানে।

চলো, দেখে আসা যাক।

স্টেশনের কাছেই সেই হাতির মালিক থাকতো। পাসপার্তু ফিলিয়াস ফগ আর সার ফ্রান্সিসকে নিয়ে সেখানে গেলো। নধরকান্তি মাতঙ্গপ্রবরের দিকে তাকিয়ে ফগ বুঝলেন, হাতিটি তাদের এলাহাবাদ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে। মালিককে জিগেস করলেন : তোমার হাতির নাম কী?

কিউনি।

তোমার ঐ কিউনি চলে কেমন?

বেশ দ্রুতই চলে।

ভাড়া যাবে?

আমার হাতি গরম হয়েছে। এ-হাতি এখন আমি কাউকেই ভাড়া দেবো না।

ফিলিয়াস ফগ নাছোড়বান্দা। বললেন : আমি ঘণ্টায় দেড়শো টাকা ভাড়া দেবো।

না, আমি ভাড়া চাই না।

মূহুর্তমধ্যে ঘণ্টায় চারশো টাকা ভাড়া উঠলো, কিন্তু মালিক নির্বিকার, বললে : না, সাহেব। আপনারা অন্যত্র চেষ্টা করুন।

পাসপার্তুর মুখ থেকে সব রক্ত যেন মুহুর্তে মিলিয়ে গেলো। সার ফ্রান্সিস বুঝলেন, ফিলিয়াস ফগের বিশ্বভ্রমণ এইখানেই খতম হলো!

ফিলিয়াস ফগ কিন্তু তখনও অবিচলিত। বললেন : ভাড়া না-দাও, বিক্রি করো। আমি পনেরো হাজার টাকা দেবো।

মালিক মাথা নাড়তে-নাড়তে ভাবলে, এ সাহেবটা পাগল নাকি?

ব্যাপার দেখে সার ফ্রান্সিস ফগকে আড়াল ডেকে নিয়ে দাম বাড়াতে নিষেধ করলেন। অনেক দাম হয়েছে। এর চেয়ে ঢের-কম দামে এ-দেশে হাতি পাওয়া যায়।

ধীরকণ্ঠে ফগ জবাব দিলেন : উত্তেজিত হয়ে ঝোকের মাথায় আমি কখনও কিছু করি না। ঠিক সময়ে এলাহাবাদ তো যেতেই হবে, তার উপরেই তিন লাখ টাকার বাজি নির্ভর করছে। যে করেই হোক, হাতিটা চাই-ই চাই। পরক্ষণেই মালিকের কাছে এসে বললেন : পনেরো হাজারে হবে না? আচ্ছা, আঠারো হাজার? বিশ হাজার? পঁচিশ হাজার? তাও না! আচ্ছা, তিরিশ হাজারই সই। তিরিশ হাজার দেবো।

তিরিশ হাজার! পাসপার্তুর পাংশু মুখ আরো-পাণ্ডুর হয়ে গেলো। সার ফ্রান্সিস হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। হাতির মালিক দেখলো, আর বেশি আশা করা ভালো নয় কী জানি, যদি এই পাগলা সাহেবের মন ঘুরে যায়! সে হাতিটা ঐ তিরিশ হাজারে বিক্রি করতেই রাজি হলো।

তক্ষুনি একজন মাহুত জোগাড় করে ফিলিয়াস ফগ পাসপার্তু আর সার ফ্রান্সিসকে সঙ্গে নিয়ে এলাহাবাদের দিকে যাত্রা করলেন।

পাৰ্শি মাহুতটির অবশ্য পথ-ঘাট ভালোই জানা ছিলো। বিশ মাইল পথ সংক্ষেপ করবার জন্যে সে বনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হলো।

ফিলিয়াস ফগ আর সার ফ্রান্সিস দুজনে দুটি ছোটো হাওদায় বসলেন। পাসপার্তু দুই হাওদার মাঝখানে আশ্রয় নিলে। ঘণ্টা-দুই চলবার পর যখন সকলে জিরিয়ে নেবার জন্যে হাতির পিঠ থেকে নামলেন, তখন সকলেই খুব শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন-হাওদায় বসে গজেন্দ্রগমনের দুলকিচালে দুলতে-দুলতে সকলেরই সারা শরীর ব্যথায় জর্জর হয়ে উঠেছে। কিন্তু ফগের সেদিকে খেয়ালও ছিলো না। সার ফ্রান্সিস অবাক হয়ে বললেন : মিস্টার ফগ যেন লোহায় গড়া! সেইসঙ্গে পাসপার্তু অমনি এ-কথাও যোগ করে দিলে : কাঁচা লোহায় নয়, পাকা লোহায়।

সামান্য কিছু আহার করে মাহুতের নির্দেশমতো সকলেই আবার হাতির পিঠে উঠলেন। মাহুতের ইঙ্গিতে বিশালদেহী কিউনি হেলে-দুলে বনভূমি পেরিয়ে তালখেজুরের বনের পাশ দিয়ে চলতে লাগলো। জায়গাটার নাম বুন্দেলখণ্ড। দেশীয় রাজাই ছিলেন বুন্দেলখণ্ডের সর্বময় কর্তা। একদল গোঁড়া ধর্মান্ধ উন্মত্ত হিন্দু বাস করতো সেখানে। আরোহীসমেত দ্রুতগামী হাতি দেখে কোথাও-কোথাও কতগুলো লোক কুটিল ক্রোধে এমন হাবভাব দেখালে যে বোঝা গেলো সুযোগ পেলেই তারা কোনো বিপদ ঘটাতে দ্বিধা করবে না। বলা বাহুল্য, এরাই বুন্দেলখণ্ডের সুবিখ্যাত দস্যুদল।

পাসপার্তু তখন ভাবছিলো : এলাহাবাদে পৌঁছে মিস্টার ফগ হাতিটার কী ব্যবস্থা করবেন? কিউনি কি তার সঙ্গেই যাবে? উঁহু, সে-তো সম্ভব নয়। ঢের খরচ পড়বে তবে। বোধহয় বিক্রি করে দেবেন হাতিটা। কিন্তু কিনবে কে হঠাৎ? কিউনির যে-রকম পরিশ্রম হচ্ছে, তাতে মনে হয় ছেড়েই দেবেন একে। আর যদি আমাকেই বখশিশ করে বসেন তাহলেই হবে সবচেয়ে মুশকিলের ব্যাপার!

তখন প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছে। বিন্ধ্যপর্বতের কতগুলো দরারোহ উৎরাই পেরিয়ে হাতি একটা ভাঙাচোরা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। ফিলিয়াস ফগ হিশেব করে দেখলেন, এতক্ষণে মাত্র অর্ধেক পথ এসেছেন। রাত তখন অন্ধকার-ছাওয়া। একটু ঠাণ্ডাও পড়েছিলো। পার্শি মাহুত যে-আগুনের কুণ্ড জ্বাললো, তারই চারদিকে বসে সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করলেন।

পাসপার্তু ছাড়া সকলেরই বেশ ভালো ঘুম হয়েছিলো। সারাদিন হাতির পিঠে দুলেদুলে পথ চলতে হয়েছিলো বলে সে রাত্রেও ঘুমের ঘোরে তা-ই করতে লাগলো ভালো করে ঘুমই এলো না তার। সার ফ্রান্সিসের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা ছিলো। তাই স্থানে-অস্থানে ঘুমুনোর অভ্যেসও ছিলো। আর নির্বিকার-চিত্ত ফিলিয়াস ফগ নিশ্চিন্ত মনে ঘুমুলেন—যেন তার সেভিল রো-র বাসার দুগ্ধফেননিভ কোমল শয্যায় শুয়েছেন।

সকাল ছ-টার সময় তারা আবার হাতির পিঠে উঠে বসলেন। মাহুত জানালে যে, সন্ধের আগেই এলাহাবাদ পৌঁছুনো যাবে। সে লোকালয় ছেড়ে ছায়াঘেরা বনপথেরই আশ্রয় নিয়েছিলো। অনেকক্ষণ চলবার পর হঠাৎ হাতিটি থমকে দাঁড়ালো।

এ-কী! এখন মাত্র বিকেল চারটে–এখনই কিউনি থামলো কেন? সার ফ্রান্সিস মাহুতকে শুধোলেন : থামলে যে? কী হলো হঠাৎ?

পার্শি মাহুতটি বললে : কী জানি, ঠিক বুঝতে পারছি না। কী যেন একটা এদিকপানেই আসছে।

সবাই কান পেতে শুনলেন, দূর থেকে একটা বাজনার শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ধীরে-ধীরে সে-শব্দ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠলো। মাহুত কিউনিকে একটা গাছে বেঁধে রেখে কী ব্যাপার দেখবার জন্যে একটু এগিয়ে গেলো।

একটু বাদেই ফিরে এলো সে। দ্রুতকণ্ঠে বললে : বুন্দেলখণ্ডের ব্রাহ্মণদের একটা শোভাযাত্রা আসছে। চলুন, আমরা পালিয়ে যাই।

হাতি নিয়ে বনের গভীরে ঢুকলো মাহুত।

ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আর চাচামেচি-ভরা একটা তুমুল কোলাহল ক্রমেই এগিয়ে। আসতে লাগলো। দেখতে-দেখতে শোভাযাত্রা দৃষ্টিপথে এসে হাজির হলো। উষ্ণীষ আর আলখাল্লা-পরা পুরোহিতরা চলেছে শোভাযাত্রার আগে-আগে। নানা-বয়সি লোকজন সমবেতস্বরে এক করুণ শ্মশান-সংগীত গাইতে-গাইতে পুরোহিতদের ঘিরে চলেছে। ঢাক-ঢোলের আওয়াজের নিচে মাঝে-মাঝে সেই গানের শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছিলো।

এদের পিছনেই একটা রথ টেনে নিয়ে চলেছে কয়েকটা ঘোড়া। রথের উপর এক দেবীমূর্তি। ভয়ংকর তাঁর রূপ। মূর্তিটি দেখেই সার ফ্রান্সিস চিনতে পারলেন। বললেন, এই-ই হিন্দুদের করালবদনা ভয়ালভীষণা কালী-মূর্তি। তাদের প্রেম আর মুক্তির প্রতিভূ।

পাসপার্তু বলে উঠলো : উঃ, কী ভীষণ রূপ এঁর! এ-যে দেখছি মৃত্যুর প্রলয়ংকরী মূর্তি, প্রেমের স্নিগ্ধ আভার প্রতিমা মোটেই নয়! আরো কী যেন বলতে যাচ্ছিলো সে, কিন্তু মাহুতের ইঙ্গিতে তাকে চুপ করে যেতে হলো।

কালী-মূর্তিটিকে ঘিরে জন-কতক পুরোহিত উম্মাদের মতো দাপাদাপি করে নাচছিলো। এদের পরই দেখা গেলো দামি-পোশাক-পরা একদল ব্রাহ্মণকে। এরা এক ভদ্রমহিলাকে সবলে টেনে আনছিলো। ভদ্রমহিলা প্রতি-পদক্ষেপের সঙ্গে-সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন।

ভদ্রমহিলা অপূর্ব সুন্দরী। গায়ের রঙ উজ্জ্বল গৌর। সারা গায়ে বহুমূল্য অলংকার। পরনে স্বর্ণখচিত মখমলের পোশাক, তার উপর মশলিনের একটা ওড়না। তার ভিতর দিয়ে তার সুকুমার দেহ-লাবণ্য ও অতুলনীয় দেহগঠন ফুটে বেরুচ্ছিলো।

মহিলাটির চারধারে খোলা তলোয়ার হাতে বন্দুক কাঁধে একদল প্রহরী। এদের পিছনে একদল লোক একটি শবাধার বয়ে আনছিলো। শবটি একজন বৃদ্ধের। বহুমূল্য রাজপোশাকে ঢাকা। মুক্তো-খচিত উষ্ণীষ, সোনা আর রেশমের তৈরি দেহাবরণ, কটিবন্ধে কিংখাবের উপর হীরক বসানো। মৃতদেহের পাশে বহুমূল্য অস্ত্র-শস্ত্র পড়ে। সব পেছনে কতগুলো লোক উম্মাদের মতো বিকট চীৎকার করতে-করতে এগুচ্ছিলো। তাদের চীৎকারের নিচে গান-বাজনার আওয়াজ চাপা পড়ে গিয়েছিলো।

সার ফ্রান্সিস মাহুতের দিকে তাকিয়ে শুধোলেন : এই বুঝি সতী?

মাহুত ঠোটে আঙুল দিয়ে সকলকে নীরব থাকতে ইঙ্গিত করলো। শোভাযাত্রা কিছুক্ষণ বাদে অরণ্যের গভীরে অদৃশ্য হয়ে গেলে পর ফিলিয়াস ফগ শুধোলেন : সতী কী?

সার ফ্রান্সিস জবার দিলেন : এ একধরনের নরবলি! তবে তফাৎ এই যে, যে নিহত হয়, সে স্বেচ্ছায় প্রাণ দেয়। এখুনি যে ভদ্রমহিলাকে দেখলেন, কাল ভোরে তার দেহ আগুনে পুড়বে।

পাসপার্তু উত্তেজিত হয়ে উঠলো। কী সর্বনাশ! এরা কি রাক্ষস নাকি?

ফিলিয়াস ফগ প্রশ্ন করলেন : ঐ মৃতদেহটি কার?

মাহুত বললে : ঐ ভদ্রমহিলার বৃদ্ধ স্বামীর। তিনি এ-অঞ্চলের একজন স্বাধীন রাজা ছিলেন।

এখনও এই সর্বনেশে প্রথা চালু আছে?

ভারতের বেশির ভাগ জায়গাতেই এ-প্রথা এখন আর চলতি নেই। সার ফ্রান্সিস বললেন : তবে বুন্দেলখণ্ডে এখনও এই প্রথা প্রচলিত-স্বাধীন রাজ্য কি-না, তাই ইংরেজের আইন চালু হয়নি। এভাবে জীবন্ত পুড়ে মরতে রাজি না-হলে তার কপালে আজীবন যে কত দুঃখ আছে, তার ইয়ত্তা নেই। সমাজ তার মাথা মুড়িয়ে দেবে, একঘরে করবে, তার ছায়া পর্যন্ত মাড়াবে না। কিছুদিন আগে আমি যখন বম্বাই ছিলুম, তখন একবার একটি বিধবা তার স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়ার জন্যে গবর্নরের অনুমতি চেয়েছিলো। গবর্নর সে-অনুমতি না-দেয়ায় বিধবাটি খুব ক্ষুব্ধ হয়ে বম্বাই ছেড়ে চলে গেলো অন্যখানে। সেখানে একজন রাজার সাহায্যে শেষে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরলো।

মাহুত ঘাড় নেড়ে এ-কথা স্বীকার করে বললে : কাল যে সতীদাহ হবে, তা কিন্তু স্বেচ্ছায় হবে না!

তুমি কী করে জানলে? ফিলিয়াস ফগ শুধোলেন।

বুন্দেলখণ্ডে এ-কথা কে না জানে?

কিন্তু কই, ভদ্রমহিলাকে তো কোনো বাধা দিতে দেখলুম না?

কী করে বাধা দেবেন? আফিং আর ধোঁয়ায় তার কি আর এখন জ্ঞান আছে?

তাঁকে ওরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

পিল্লাজির মন্দিরে। এখান থেকে সে-মন্দির দু-মাইল দূরে। আজ রাত্রে সবাই সেখানে থাকবে। কাল খুব ভোরে সতী হবে। এই বলে মাহুত যেই হাতিটা চালাতে যাবে, অমনি ফিলিয়াস ফগ বাধা দিলেন। রাখো, রাখো। সার ফ্রান্সিস, আমরা যদি ভদ্রমহিলাকে রক্ষা করি?

রক্ষা করবেন? সার ফ্রান্সিস অবাক হলেন।

এখনও আমার হাতে বারো ঘণ্টা সময় আছে। ফিলিয়াস ফগ বললেন। ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি।

আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন সার ফ্রান্সিস। এতক্ষণে বুঝলুম, আপনার হৃদয় আছে! আর সে-হৃদয় সাড়া দেয় ঠিক মোক্ষম জায়গায়, একেবারে আসল ব্যাপারে!

ফগ বললেন: হ্যাঁ, তা কখনো-কখনো সাড়া দেয় বৈকি।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *