০০৫.ভূগুবংশ-চ্যবনোৎপত্তি

পঞ্চম অধ্যায়
ভূগুবংশ-চ্যবনোৎপত্তি

শৌনক কহিলেন, বৎস সূতনন্দন! তোমার পিতা মহর্ষি বেদব্যাসের নিকট সমস্ত পুরাণ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, তুমিও সেই সমুদয় অধ্যয়ন করিয়াছ। তোমার পিতার মুখে শ্রবণ করিয়াছি, পুরাণে অলৌকিক কথা-সকল ও আদিবংশ-বৃত্তান্ত-সকল বর্ণিত আছে, তন্মধ্যে প্রথমতঃ ভূগুবংশের বৃত্তান্তশ্রবণ করিতে ইচ্ছা করি, বর্ণনা কর।
মহর্ষি শৌনকের আজ্ঞালাভানন্তর সূতনন্দন উগ্রশ্রবাঃ কহিলেন, দ্বিজাগ্রণী মহাত্মা বৈশম্পায়ন প্রভৃতি যাহা সম্যক্‌রূপে অধ্যয়ন ও কীর্ত্তন করিয়াছেন, আমার পিতা যাহা অধ্যয়ন করিয়াছিলেন এবং তাঁহার নিকট আমি যাহা অধ্যয়ন করিয়াছি, সেই সমস্ত বর্ণনা করিতেছি, শ্রবণ করুন।
সুবিখ্যাত ভূগুবংশ ইন্দ্রাদি দেবগণ ও অশেষ ঋষিগণের পূজনীয়। এই বংশ পুরাণে যেরূপ বর্ণিত আছে, তাহা আমি যথাবৎ বর্ণন করিতেছি। স্বয়ম্ভু ব্রহ্মা বরুণের যজ্ঞ করিতেছিলেন, আমরা শুনিয়াছি, সেই যজ্ঞাগ্নি হইতে মহর্ষি ভৃগু সমুত্থিত হয়েন। ভৃগুর পুৎত্র চ্যবন পিতার প্রিয়পাত্র ছিলেন; চ্যবনের পুৎত্র প্রমতি অতিশয় ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন; ঘৃতাচীর গর্ভে প্রমতির রুরু-নামক এক পুৎত্র উৎপন্ন হয়; রুরুর ঔরসে প্রমদ্বরার গর্ভে আপনার প্রপিতামহ শুনক জন্মগ্রহণ করেন। মহর্ষি শুনক বেদাধ্যয়ন-সম্পন্ন, তপোনিরত, যশস্বী, অশেষ-শাস্ত্রজ্ঞ, ব্রহ্মজ্ঞানী, সত্যবাদী ও জিতেন্দ্রিয় ছিলেন।
শৌনক কহিলেন, হে সূতনন্দন! যেরূপে সেই মহাত্মা ভৃগুনন্দন চ্যবন নামে বিখ্যাত হইলেন, তাহা আমার নিকট সবিশেষ বর্ণন কর।
উদ্রশ্রবাঃ কহিলেন, মহাত্মা ভৃগুর পুলোমানম্নী প্রিয়তমা ধর্ম্মপত্নী ছিলেন, তিনি ঐ মহর্ষির সহযোগে গর্ভিণী হয়েন। একদা ধার্ম্মিকাগ্রগণ্য মহর্ষি ভৃগু স্নানার্থ গমন করিলে পুলোমা নামে এক রাক্ষস তাঁহার আশ্রমে উপস্থিত হইল। ঐ পাপাত্মা আশ্রমে প্রবেশপূর্ব্বক ভৃগু-গৃহিণীর মনোহারিণী মূর্ত্তি দর্শনে কন্দর্পশরে জর্জ্জরিত ও মূর্চ্ছিতপ্রায় হইল। সুচারুদর্শনা পুলোমা অনায়াসলভ্য বন্যফলমূলাদি দ্বারা সেই অভ্যাগত রাক্ষসের অতিথিসৎকার করিলেন। দুর্ব্বৃত্ত রাক্ষস কুসুমশরের বিষম শরে নিতান্ত উদ্‌ভ্রান্তচিত্ত হইয়া “এই বরবর্ণিনীকে হরণ করিব” এইরূপ সঙ্কল্প করিবামাত্র সাতিশয় হৃষ্টমনা হইল। পুলোমা রাক্ষস পূর্ব্বে ঐ সুচারুহাসিনী কন্যাকে’ ভার্ষ্যারূপে বরণ করিয়াছিল, কিন্তু কন্যার পিতা তাহাকে না দিয়া মহাত্মা ভৃগুকে বিধিপূর্ব্বক কন্যা সম্প্রদান করেন। সে অন্যায় কার্য্যের অনুষ্ঠান তাহার মনে সর্ব্বদা জাগরূক ছিল, এক্ষণে সে অবসর পাইয়া হরণ করিতে অভিলাষ করিল।
রাক্ষস পুলোমাহরণে কৃতনিশ্চয় হইয়া অগ্নিশরণস্থ প্রজ্বলিত হুতাশন-সমীপে গমনপূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিল, “হে হুতাশন! তুমি সর্ব্বদেবগণের মুখ্য। তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি, সত্য করিয়া বল, এই সুন্দরী কাহার ভার্গ্যা‍! আমি পূর্ব্বে এই কামিনীকে স্বীয় সহচারিণী করিব বলিয়া বরণ করিয়াছিলাম, কিন্তু ইহার পিতা আমাকে কন্যা দান না করিয়া ভৃগুকে সম্প্রদান করেন। অতএব যদি এই নির্জ্জন-নিবাসিনী বরবর্ণিনী ভৃগুর ভার্য্যা হয়, তবে বল, আমি আশ্রম হইতে ইহাকে অপহরণ করিব। ভৃগু যে আমার পূর্ব্বপ্রার্থিত সুরূপা রমণীর প্রাণীগ্রহণ করিয়াছে, সেই ক্রোধাগ্নিতে আমার হৃদয় অদ্যাপি দগ্ধ হইতেছে।” দুরাত্মা রাক্ষস ভৃগু-পত্নী-বিষয়ে এই রূপ সন্দিগ্ধচিত্ত হইয়া প্রজ্বলিত অগ্নিকে আমন্ত্রণ করিয়া পুনঃপুনঃ জিজ্ঞাসিতে লাগিল। পরে সম্বোধন করিয়া কহিল, “হে হুতবহ! তুমি সর্ব্বদা সর্ব্বজীবের অন্তরে পাপ-পুণ্যের সাক্ষিস্বরূপ অবস্থিতি কর, অতএব তোমাকে জিজ্ঞাসিতেছি, সত্য করিয়া বল, পাপিষ্ঠ ভৃগু আমার পূর্ব্বপ্রার্থিত ভার্য্যাকে গ্রহণ করিয়াছে, সেই কামিনী আমার হইতে পারে কি না? তোমার নিকট ইহার যথার্থ শ্রবণ করিয়া তোমার সাক্ষাতেই এই ভৃগুপত্নীকে হরণ করিব।” অগ্নি রাক্ষসের জিজ্ঞাসানন্তর একপক্ষে মিথ্যাকথন ও পক্ষান্তরে ভৃগুশাপ এই উভয় সঙ্কটে পতিত হইয়া অতিশয় ভীত হইলেন এবং মৃদুস্বরে কহিতে লাগিলেন, –হে দানব-তনয়! পূর্ব্বে তুমি ইঁহাকে বরণ করিয়াছিলে যথার্থ বটে; কিন্তু তোমার যথাবিধি বিবাহ করা হয় নাই। এই নিমিত্ত যশস্বিনী পুলোমার পিতা সৎপাত্রলাভে ইঁহাকে ভৃগুর হস্তে সমর্পণ করেন। মহাতপা ভৃগু বেদবিধিপূর্ব্বক আমার সমক্ষে ইঁহার পাণিগ্রহণ করিয়াছেন। তথাপি তুমি ইঁহাকে পূর্ব্বে বরণ করিয়াছিলে বলিয়া ইনি বিচারমতে তোমারই পত্নী হইতে পারেন। আমি মিথ্যা কহিতে পারি না, যেহেতু মিথ্যাবাদী সর্ব্বত্র অনাদরণীয় হয়।