০৮. রাজা হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান

হারীতের পুত হরিবীজ নাম ধরে।
হরিবীজ রাজা হইল অযোধ্যা নগরে।।
হরি রাজা বহু কাল সুখে রাজ্য করে।
তাঁর পুত্র হরিশ্চন্দ্র খ্যাত চরাচরে।।
হরিশ্চন্দ্রে সমর্পণ করি সর্ব দেশ।
স্বরূপে গঙ্গাতে রাজা করিল প্রবেশ।।
পিতৃমৃত্যু পরে হরিশ্চন্দ্র হৈল রাজা।
পুত্রের সমান পালে পৃথিবীর প্রজা।।
সোমদত্ত রাজকন্যা নাম তার শৈব্যা।
বিবাহ করিল হরিশ্চন্দ্র অতি ভব্যা।।
পাইয়া সুন্দরী জায়া অন্তরে উল্লাস।
হইল তাঁহার পুত্র নামে রুহিদাস।।
সুখে রাজ্য করে হরিশ্চন্দ্র মহীপতি।
ইন্দ্রেরে লইয়া কিছু শুনহ সম্প্রতি।।
একদিন সভাতে বসিল সুরপতি।
পঞ্চকন্যা নৃত্য করে প্রথম যুবতী।।
নাচিতে নাচিতে অতি বাড়িল তরঙ্গ।
একবার করিলেক তারা তালভঙ্গ।।
দেখিয়া করিল কোপ দেব পুরন্দর।
অভিশাপ দিল পঞ্চকন্যার উপর।।
যৌবন গর্বিতা তোরা হয়েছিস মনে।
বদ্ধ হয়ে থাক বিশ্বামিত্র তপোবনে।।
চরণে ধরিয়া কন্যা করেন ক্রন্দন।
কতকালে হবে বল শাপ বিমোচন।।
ইন্দ্র বলে বন্দীরূপে থাক তপোবনে।
মুক্ত হবে রাজা হরিশ্চন্দ্র পরশনে।।
নিত্য সে রূপসী পুষ্প করে আহরণ।
ডাল ভাঙ্গে ফুল তোলে কে করে বারণ।।
শিষ্যসহ বিশ্বামিত্র গেল তপোবনে।
ডালভাঙ্গা গাছ সব দেখিল নয়নে।।
এমন করিয়া ডাল ভাঙ্গে যেই জন।
আইলে লাগিবে কালি লতার বন্ধন।।
এত বলি শাপ তারে দিল মুনিবরে।
প্রভাতে আইল কন্যা পুষ্প তুলিবারে।।
যেইকালে কন্যা আসি ডালে ভর দিল।
লতার বন্ধন হাতে অমনি লাগিল।।
প্রভাতে আসিয়া বিশ্বামিত্র তপোবনে।
কন্যা দেখি ভাবিতে লাগিল রুষ্ট মনে।।
অনেক প্রকারে তারে দিল ভর্ৎসন।
যথাস্থানে মুনিবর করিল গমন।।
হেনকালে তথা হরিশ্চন্দ্র যশোধন।
মৃগয়া করিতে করিলেন আগমন।।
মৃগ না পাইয়া অতি ব্যাকুলিত মন।
ক্লান্ত হন নানা স্থান করিয়া ভ্রমণ।।
মনস্তপ পাইয়া বসিল তরুতলে।
কন্যা ডাকে উচ্চৈঃস্বরে হরিশ্চন্দ্র বলে।।
ক্রন্দন শুনিয়া রাজা গেল তপোবনে।
স্পর্শমাত্র মুক্ত হয়ে গেল পঞ্চজনে।।
আশ্চর্য দেখিয়া হরিশ্চন্দ্র যশোধন।
সৈন্য সহ নিজ রাজ্যে করিল গমন।।
প্রাতঃকালে আইলেন গাধির নন্দন।
কন্যাগণে না দেখি দুঃখিত হৈল মনে।।
আমি যে বান্ধিনু ছাড়াইল কোন্ জনে।
সর্বনাশ হইল তার সংশয় জীবন।।
ধ্যান করি জানিলেন গাধির নন্দন।
হরিশ্চন্দ্র ছাড়াইয়া দিল কন্যাগণ।।
মুনি ক্রোধ করিয়া যে চলিল সত্বর।
উত্তরিলা গিয়া মুনি রাজার গোচর।।
মুনিরে দেখিয়া রাজা কৈল অভ্যর্থন।
এস এস বলি দিল বসিতে আসন।।
সফল ভবন মোর সফল জীবন।
মোর গৃহে আইলা যে গাধির নন্দন।।
জ্বলন্ত অনল যেন বলে তপোধন।
যে কন্যা বান্ধিনু তাঁরে ছাড় কি কারণ।।
রাজা কহে কন্যা মোরে কৈল আমন্ত্রণ।
মিথ্যা না বলিব প্রভু করেছি মোচন।।
দান পুণ্য করি প্রভু তুষি যে ব্রাহ্মণ।
আমা প্রতি ক্রোধ কেন কর অকারণ।।
এ কথা শুনিয়া কহে গাধির কুমার।
দান পুণ্য কর বলে এত অহঙ্কার।।
কি দান করিবা তুমি দেখি তব মন।
আমারে কিঞ্চিৎ দান দেহ ত রাজন্।।
রাজা বলে গৃহধর্ম সফল জীবন।
মোর দান লবে প্রভু গাধির নন্দন।।
যাহা চাহ তাহা দিব না করিব আন।
নানা দানে গোসাঞি রাখিব তব মান।।
মুনি বলে দান দেহ যদ্যপি রাজন্।
আগেতে করহ তুমি সত্য নিবন্ধন।।
রাজা বলে সত্য সত্য না করিব আন।
এ সত্য লঙ্ঘিলে নাহি পাব পরিত্রাণ।।
ভূপতি করিল সত্য না বুঝিয়া ছন্দ।
মৃগ বন্দী হৈল যেন না বুঝিয়া ফান্দ।।
মুনি বলে দেখহ সকল দেবগণ।
রাজা করিবেন নিজ সত্যেরে পালন।।
মুনি বলে দিবে যদি ভেবেছ অন্তরে।
রাজন্ পৃথিবী দান করহ আমারে।।
দানের করিল রাজা অতি পরিপাটী।
হাতে করি আনিলেন তিন তোলা মাটী।।
ভূদান করিল হরিশ্চন্দ্র শ্রদ্ধাযুত।
স্বস্তি স্বস্তি বলিয়া লইল গাধিসূত।।
মুনি বলে দিলা দান পাইনু এখন।
দানের দক্ষিণা রাজা আনহ কাঞ্চন।।
রাজা বলে দক্ষিণাতে না করিহ ঘৃণা।
দানের দক্ষিণা দিব সাত কোটি সোণা।।
মুনি বলে বিলম্বে নাহিক প্রয়োজন।
সাত কোটি কাঞ্চন করহ সমর্পণ।।
ভূপতি করেন আজ্ঞা ভাণ্ডারীর প্রতি।
আমারে আনিয়া দেহ স্বর্ণ শীঘ্রগতি।।
দৃঢ় করি বলে মুনি গাধির কুমার।
ভাণ্ডার উপর তব কিবা অধিকার।।
সকল পৃথিবী দান করিলা আমারে।
ভাণ্ডারী কাহার ধন দিবেক তোমারে।।
শুনিয়া ভাবিত রাজা ছাড়িল নিঃশ্বাস।
আপনি করিলাম আপনা সর্বনাশ।।
মুনি বলে ভূপতি মজিলা অহঙ্কারে।
পৃথিবী ছাড়িয়া বেটা যাহ স্থানান্তরে।।
পাত্র মিত্র সবে বলে করি যোড়পাণি।
হরিশ্চন্দ্র ভূপে দিতে পটি একখানি।।
সূচ্যগ্র খননে যত উঠে বসুমতী।
উহাকে না দেয় বিশ্বামিত্র মহামতি।।
পাত্র মিত্র বলে শুন গাধির তনয়।
কোথায় বসিবে হরিশ্চন্দ্র নিরাশ্রয়।।
এত শুনি ক্রোধ করি বলে মহাঋষি।
পৃথিবীর বহির্ভাগে আছে বারাণসী।।
শৈব্যা নারী আর নিজে পুত্র রুহিদাস।
তিনজন যাউক করিতে কাশীবাস।।
বিশ্বামিত্র বাক্য শুনি সূর্যবংশধন।
দারা পুত্র সহ কাশী করিল গমন।।
মুনি বলে শুন রাজা আমার বচন।
দিয়া যাহ সাতকোটি আমাকে কাঞ্চন।।
রাজা বলিছে গোসাঞি না করিহ ঘৃণা।
সাত দিন পরে দেব সাতকোটি সোণা।।
সাত দিন পথে রাজা বহিয়া চলিল।
পথ আগুলিয়া মুনি কহিতে লাগিল।।
মম কথা শুন হরিশ্চন্দ্র তপোধন।
আগে দেহ সাতকোটি আমারে কাঞ্চন।।
শৈব্যার সহিত রাজা করিল মন্ত্রণা।
কি দিয়া শোধিবে ভাবে ব্রাহ্মণের সোণা।।
শৈব্যা বলে শুন প্রভু নিবেদি তোমারে।
আমাকে বিক্রয় কর হাটের মাঝারে।।
স্ত্রী লইয়া চলে রাজা হাটের ভিতরে।
দাসী কিন বলিয়া ডাকিল উচ্চৈঃস্বর।।
এক বিপ্র ছিল সে পণ্ডিত সাধুজন।
ছিল তার একটি দাসীর প্রয়োজন।।
ব্রাহ্মণ বলেন ওহে পুরুষরতন।
লইবা দাসীর মূল্য কতেক কাঞ্চন।।
রাজা বলে নাহি জানি মিথ্যা প্রবঞ্চনা।
এ দাসীর মূল্য চাই চারি কোটি সোণা।।
এ কথা শুনিয়া বিপ্র স্বীকার করিল।
চারি কোটি সোণা দিয়া শৈব্যারে কিনিল।।
দাসী নিয়া দ্বিজ যায় আপনার বাস।
মায়ের কাপড় ধরি কান্দে রুহিদাস।।
অঞ্চল ধরিয়া পুত্র যায় গড়াগড়ি।
ছাড় ছাড় বলি বিপ্র দেখাইল বাড়ি।।
শৈব্যা বলে গোসাঞি করি গো নিবেদন।
বিনা পণে কিনহ আমার এ নন্দন।।
শুনিয়া কহিল বিপ্র হইয়া বাতুল।
দুজনের তরে কোথা পাইব তণ্ডুল।।
শৈব্যা বলে তুমি অন্ন দিবা যে আমাকে।
তাহাই ভক্ষণ আমি করাব বালকে।।
ব্রাহ্মণ বলেন ক্রোধে হইয়া বাতুল।
দিনপ্রতি একসের পাইবা তণ্ডুল।।
দাসী কিনি বিপ্র যায় আপনার স্থানে।
স্বর্ণ লয়ে গেল রাজা মুনি বিদ্যমানে।।
অত্যল্প দেখিয়া স্বর্ণ কহে তপোধন।
অল্প জ্ঞান কর হরিশ্চন্দ্র হে রাজন্।।
সাত কোটি লব ঘাটী নহে সাত রতি।
বিশ্বামিত্রে অবজ্ঞা না কর মহামতি।।
এ কথা শুনিয়া মহা প্রমাদ ভাবিল।
শিরা হাত দিয়া রাজা হাটে চলি গেল।।
হাটখানি বৈসে বারাণসীর গোচরে।
তৃণ বান্ধি সান্ধাইল হাটের ভিতরে।।
নফর কিনিবা বলি ডাকে উচ্চৈঃস্বরে।
কালু নামে হাড়ি এক ছিল সে নগরে।।
সে বলে আমার কর্ম আছে তো নফরে।
চাহি এক নফর সে রাখিবে শূকরে।।
এ কথা শুনিয়া রাজা কহিছে বচন।
তুমি যাহা কহ তাহা করিব পালন।।
কালু বলে শুন ওহে পুরুষরতন।
আপনার মূল্য লবা কতেক কাঞ্চন।।
রাজা বলে নাহি জানি মিথ্যা ব্যবহার।
স্বর্ণ লব তিন কোটি মূল্য আপনার।।
এ কথা শুনিয়া কালু বিলম্ব না কৈল।
তিন কোটি স্বর্ণ দিয়া নফর কিনিল।।
সাত কোটি সোণা নিয়া দিল মুনিবরে।
ধন পাইয়া গেল মুনি অযোধ্যা নগরে।।
কালু বলে শুন ওহে পুরুষরতন।
কি নাম তোমার কহ কাহার নন্দন।।
প্রবন্ধ করিয়া রাজা কহিতে লাগিল।
হরিশ্চন্দ্র নাম বাপমায়েতে রাখিল।।
কত বা ডাকিবে হরিশ্চন্দ্র নাম ধরে।
কখন বলিও হরি কখন বা হরে।।
নফর লইয়া কালু যায় নিজ বাস।
হরিশ্চন্দ্র ঘুচাইয়া কৈল হরিদাস।।
হরিদাস বলে প্রভু করি নিবেদন।
খাইতে উচ্ছিষ্ট মোরে না দিবে কখন।।
কালু বলে হরিদাস শুনহ বচন।
বারাণসীপুরে রাখ শূকরের গণ।।
বারাণসীতীরে যত মড়া দাহ হয়।
পঞ্চাশ কাহন লহ প্রত্যেক মড়ায়।।
সঁপিয়া কর্তব্য কর্ম হাড়ি গেল ঘরে।
ডাকিয়া আনিল রাজা সকল শূকরে।।
বলিতে লাগিল হরিশ্চন্দ্র মহীপাল।
মম এক কথা শুন শূকরের পাল।।
দান পুণ্য করিলাম এ দক্ষিণ করে।
তোমাদের মলমুত্র মুছিব কি করে।।
এক সত্য পালিবা হে সকল শূকরে।
মলমূত্র পরিত্যাগ করিহ অন্তরে।।
পালিল রাজার বাক্য সকল শূকরে।
মলমূত্র পরিত্যাগ করিল অন্তরে।।
উভঝুঁটি চুল বাঁধে রাজা উচ্চ করে।
বারাণসীতীরে নিত্য দৌড়াদৌড়ি করে।।
রাজচিহ্ন রাজার সকল পলাইল।
পাটনীর বেশ রাজা তখন ধরিল।।
শৈব্যা রহিলেন হেথা ব্রাহ্মণ আগারে।
এক সের তণ্ডুল ব্রাহ্মণ দেয় তাঁরে।।
তিন পোয়া রুহিদাস খান তিন বারে।
এক পোয়া খান শৈব্যা দ্বিজের আগারে।।
বিপ্র বলে শুন শৈব্যা আমার বচন।
খাইল তোমার ভাগ তোমার নন্দন।।
কালি হৈতে আমি যে করিব দেবার্চন।
তব পুত্রে পুষ্প হেতু পাঠাইব বন।।
পুষ্প আহরণে যাউক বালক তোমার।
বাড়াইয়া দিব ত তণ্ডুল কিছু আর।।
শৈব্যা বলে যেই আজ্ঞা করিবা যখন।
সেই আজ্ঞা পালিবেক আমার নন্দন।।
স্বর্ণসাজি লইল সে স্বর্ণের আঁকড়ি।
বিশ্বামিত্র তপোবনে যায় রড়ারড়ি।।
ডাল ভাঙ্গে ফুল তোলে আপনার মনে।
এক দিন এল মুনি সে বন ভ্রমণে।।
ডাল ভাঙ্গা দেখিয়া কুপিল মুনি মনে।
এমন কুকর্ম আসি করে কোন্ জনে।।
ধ্যান করি বিশ্বামিত্র জানিল কারণ।
পুত্রার্থে আইসে হরিশ্চন্দ্রের নন্দন।।
বিপ্রঘরে জননী হাড়ির ঘরে বাপ।
কল্য যদি আসে তার বুকে খাবে সাপ।।
এত বলি শাপ দিল ক্রোধে তপোধন।
রাত্রিকালে হেথা শৈব্যা দেখিল স্বপন।।
প্রাতঃকালে প্রকাশিত সূর্যের কিরণ।
তুলিতে কুসুম যায় রাজার নন্দন।।
তপোবনে রাজার কুমার যবে চলে।
হেনকালে শৈব্যা তারে হাত ধরি বলে।।
না যাইও তুলিতে কুসুম তপোবন।
নিতান্ত করিবে তোরে ভুজঙ্গে দংশন।।
রুহিদাস বলে নাহি যাইলে তথায়।
দুর্মুখ ব্রাহ্মণ অন্ন না দিবে তোমায়।।
কৃতী পুত্র করে পিতামাতার পালন।
খাইয়া তোমার অন্ন থাকি সর্বক্ষণ।।
না রাখিল শিশুপুত্র মায়ের বচন।
কুসুম তুলিতে যায় রাজার নন্দন।।
রুহিদাস প্রবেশিল সেই তপোবনে।
নানা জাতি পুষ্প তুলে যাহা লয় মনে।।
জাতী যুথী মল্লিকা যে তুলিল রঙ্গন।
পারিজাত শেফালিকা চম্পক কাঞ্চন।।
অশোক কিংশুক জবা অতসী কেশর।
গোলাপ আকন্দ তোলে বকুল টগর।।
অবশেষে শ্রীফলে আঁকড়ি ভেজাইল।।
ডালেতে আছিল সাপ বুকেতে দংশিল।।
সর্বাঙ্গেতে শিশুর বেড়িল বিষজাল।
ভূমিতে পড়িল শিশু মুখে ভাঙ্গে লাল।।
আকাশে হইল বেলা দ্বিতীয় প্রহর।
তবু সে রাজার পুত্র না আইল ঘর।।
বিলম্ব দেখিয়া তবে কহিছে ব্রাহ্মণ।
এখন না আইল কবে হবে দেবার্চন।।
শৈব্যা বলে প্রভু এই করি নিবেদন।
আপনি দেখিয়া আসি কোথা সে নন্দন।।
তনয়ে দেখিতে শৈব্যা করিল গমন।
তপোবনে মুনির দিলেক দরশন।।
বালকেরে চাহিয়া বেড়ায় তপোবনে।
দেখে বৃক্ষ আড়ে পড়ে আপন নন্দনে।।
পুত্রকে দেখিয়া শৈব্যা পড়িল ভূতলে।
যেমন কলার গাছ ভাঙ্গে ডালে মূলে।।
পুত্র কোলে করি শৈব্যা করিছে ক্রন্দন।
কোথা গেল মম পুত্র রুহিত নন্দন।।
কোথা গেলে ওহে হরিশ্চন্দ্র যশোধন।
আসিয়া দেখহ তব মরিল নন্দন।।
ধর্ম করিবার ফল দিল নারায়ণ।
অগ্নিতে পুড়িয়া আমি ত্যজিব জীবন।।
পুত্র কোলে করি শৈব্যা করিছে গমন।
পলাইয়া গেল বলি ভাবিছে ব্রাহ্মণ।।
পুত্র কোলে করি শৈব্যা ছাড়িল নিঃশ্বাস।
কান্দিতে কান্দিতে কহে ব্রাহ্মণের পাশ।।
নিবেদন করি শুন সকল ব্রাহ্মণে।
কেমনে বাঁচিবে পুত্র বাঁচিবে কেমনে।।
শুনিয়া প্রবোধ বাক্য কহে বিপ্রগণ।
সর্পের দংশনে প্রাণ ছাড়িল নন্দন।।
মড়া কোলে করি কেন করিছ ক্রন্দন।
মরিলে অবশ্য জন্ম জন্মিলে মরণ।।
বারাণসীপুরে তুমি মড়া লয়ে যাহ।
কাষ্ঠচিতা করি এই মৃতদেহ দাহ।।
মড়া লৈয়া গেল শৈব্যা কাতর অন্তরে।
ততক্ষণে ব্রাহ্মণ চলিল নিজ ঘরে।।
মড়া লৈয়া গেল শৈব্যা বারাণসী বাস।
হাতেতে মুদ্গর করি আসে হরিদাস।।
হরিদাস বলে মড়া করিব দাহন।
মড়া প্রতি লই পঞ্চাশৎ কার্ষাপণ।।
হরিদাস বলে তোমায় কহিনু নিশ্চয়।
তোমারে বলি যে সত্য আন নাহি হয়।।
অন্যের ঘাটেতে লৈয়া পোড়াহ কুমার।
বিধাতা করিল মোরে হাড়ির আচার।।
শৈব্যা বলে গোসাঞি বলিতে ভয় বাসি।
বিধাতা করিল মোরে ব্রাহ্মণের দাসী।।
শৈব্যা বলে আজ্ঞা কর ঘাটের পাটনী।
দিব আমি চিরিয়া এ বস্ত্র আধখানি।।
এতেক শুনিয়া তবে শৈব্যার বচন।
হাতেতে মুদ্গর নৈয়া আইসে রাজন্।।
পড়িলেন পুত্র লয়ে শৈব্যা আথান্তরে।
হরিশ্চন্দ্র বলিয়া সে কান্দে উচ্চৈঃস্বরে।।
প্রভু হরিশ্চন্দ্র রাজা গেলে কোথাকারে।
আসিয়া দেখহ মৃত আপন কুমারে।।
হরিশ্চন্দ্র বলি শৈব্যা কান্দে বিদ্যমান।
তখন হইল সে রাজার পূর্ব জ্ঞান।।
হরিশ্চন্দ্র বলে রাণি না কর ক্রন্দন।
আমি সেই হরিশ্চন্দ্র দেখহ লক্ষণ।।
শৈব্যা বলে হরি হরি এ ছিল কপালে।
সামান্য পাটনী আজ কটু কথা বলে।।
অযোধ্যায় ছিলাম যে রাজার রমণী।
এবে পরিহাস করে ঘাটের পাটনী।।
হরিদাস বলে প্রিয়ে বলি তব ঠাঁই।
পাসরিলে সকলি কিছুই মনে নাই।।
সোমদত্ত রাজকন্যা শৈব্যা তব নাম।
তোমাকে বিবাহ প্রিয়ে আমি করিলাম।।
রুহিদাস নামে তব হইল নন্দন।
মম রাজ্য নিল বিশ্বামিত্র তপোধন।।
এ কথা শুনিয়া রাণী চাহিতে লাগিল।
কপালে নিশানা ছিল তখনি চিনিল।।
পুত্র কোলে করি রাজা করিছে ক্রন্দন।
কোথা এড়ি গেলে বাপু রুহিত নন্দন।।
এ ধর্ম করিতে দুঃখ দিল নারায়ণ।
অগ্নিতে পুড়িয়া আজি ছাড়িব জীবন।।
তখন চন্দন কাষ্ঠে জ্বালাইল চিতা।
মধ্যেতে রাখিল পুত্র পাশে পিতামাতা।।
যে কালে জ্বলন্ত অগ্নি দিবেন চিতাতে।
হেনকালে ধর্মরাজ কহেন সাক্ষাতে।।
অগ্নিতে পুড়িয়া কেন ত্যজিবা জীবন।
আমি জিয়াইয়া দিব তোমার নন্দন।।
পদ্মহস্ত বুলাইল বালকের গায়।
বিষজ্বালা দূরে গেল চক্ষু মেলি চায়।।
হেনকালে কালু আসি রাজারে সম্ভাষে।
তোমায় আমার স্বর্ণ দায় না আইসে।।
ব্রাহ্মণ আসিয়া বলে রাজার সদনে।
তোমাতে আমাতে দায় ঘুচিল কাঞ্চনে।।
রাজা বলে গোসাঞি করি গো নিবেদন।
ব্রহ্মস্ব লইব বল কিসের কারণ।।
রাণীর হাতেতে স্বর্ণকঙ্কণ যে ছিল।
তাহা দিয়া রাজা তার দায় ঘুচাইল।।
মুনি বলে জপ তপ সব নষ্ট কৈনু।
মিথ্যা রাজ্য করিয়া যে জন্ম গোঙাইনু।।
যেখানে আছেন হরিশ্চন্দ্র যশোধন।
সেইখানে মুনি আসি দিল দরশন।।
মুনি বলে শুন হরিশ্চন্দ্র মহীপতি।
আপনার রাজ্যে তুমি যাহ শীঘ্রগতি।।
রাজা বলে গোসাঞি শুনহ নিবেদন।
কেমন করিলা রাজ্য কহ তপোধন।।
মুনি বলে সে কথায় নাহি প্রয়োজন।
এক্ষণে গমন রাজ্যে করহ রাজন্।।
স্ত্রী পুত্র লইয়া রাজা করিল গমন।
প্রসন্নমানস মুনি প্রফুল্লবদন।।
অযোধ্যায় রাজা আসি দিল দরশন।
রাজসূয় যজ্ঞ রাজা করিল তখন।।
রাজ্যভার পুত্রেরে করিয়া সমর্পণ।
হরিশ্চন্দ্র পরলোকে করিলা গমন।।
কুক্কুর বিড়াল আদি যত পশুগণ।
স্বশরীরে সবে চলে বৈকুণ্ঠ ভুবন।।
দেব গদাধর তাহে কুপিত অন্তরে।
কহিলেন ডাকিয়া নারদ মুনিবরে।।
স্বর্গ নষ্ট করে হরিশ্চন্দ্র নৃপবর।
এ কথা শুনিয়া মুনি চলিল সত্বর।।
বীনা বাজাইয়া যায় মহা তপোধন।
দেখে রথে স্বর্গে রাজা করিছে গমন।।
প্রণমিয়া রাজা তবে স্বর্গে যাই বলে।
মুনি বলে যাহ রাজা কোন্ পুণ্যফলে।।
সুবুদ্ধি রাজার তবে কুবুদ্ধি ঘটিল।
আপনার পুণ্য যত কহিতে লাগিল।।
বাপী কূপ তড়াগাদি নানা স্থানে করি।
দিয়াছি জাঙ্গাল আর বৃক্ষ সারি সারি।।
মম রাজ্য নিল বিশ্বামিত্র তপোধন।
আপনাকে বেচি শুধিলাম সে কাঞ্চন।।
পুণ্যকথা যেই রাজা কহিতে লাগিল।
কহিতে কহিতে রথ নামিয়া পড়িল।।
নামিল রাজার রথ দুঃখিত অন্তর।
ভাল মন্দ নাহি বলে হইল কাতর।।
স্বর্গে থাকি যুক্তি করে যত দেবগণ।
রাজার কটক কিবা করিবে ভক্ষণ।
যে শস্য সঞ্চয় করে না করিয়া ব্যয়।
হরিশ্চন্দ্র রাজার কটকে তাহা লয়।
ক্ষেত্র হৈতে যেই শস্য আনিয়া ফেলায়।
হরিশ্চন্দ্র রাজার কটকে তাহা খায়।।
নূতন বসন রাখে করিয়া যতন।
রাজার কটক পরে সেই সে বসন।।
এ নিয়ম করিল সকল দেবগণ।
অর্ধপথে হরিশ্চন্দ্র রহিল তখন।।
স্বর্গে নাহি গেল রাজা মর্ত্য না পাইল।
হরিশ্চন্দ্র রাজা মধ্য পথেতে রহিল।।
কৃত্তিবাস পণ্ডিতের কবিত্ব বিচক্ষণ।
আদিকাণ্ডে গান হরিশ্চন্দ্র বিবরণ।।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

3 thoughts on “০৮. রাজা হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান

  1. লেখক এক নাম্বার নিয়মটা না জারি করলেও পারতেন । শুধু শুধু কচিকাঁচা হিমু প্রেমিদের কষ্ট দেওয়ার কি প্রয়োজন ছিল ?

  2. এই লাইব্রেরিকে ধন্যবাদ । হিমু রিমান্ডে আর তিতাস একটি নদীর নাম পুরো বইটি দেওয়া যাবে ?

  3. ফারিহা, দুঃখ করো না । আমরা নিশ্চয়ই একদিন হিমু হবই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *