২১-২৫. হাকিমের সম্মুখে হাজির

একবিংশ পরিচ্ছেদ

যথা সময়ে আমাদেরকে হাকিমের সম্মুখে হাজির হতে হল। ষোলজন ধীবর ধরা পড়েছিল। আমি আর আলতার মা খুনের আসামি, আর ধীবরেরা দাঙ্গা-হাঙ্গামার আসামি। যারা ধরা পড়েছিল তাদের অনেককে দু’তিন মাস ধরে সরকারি হাসপাতালে থাকতে হয়েছিলো। গুলিতে কারো মুখ ছিঁড়ে গিয়েছিলো। তলোয়ারের আঘাতে কাহারো হাত ছিল না। মুর্খের দল ডাক্তারকে এক হাজার টাকা করে ঘুষ দিয়েছিলো। ডাক্তার মুখে বলেছিলো তার রিপোর্টের উপরেই মোকদ্দমা চলবে। মূর্খ ধীবরেরা তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে এক নয়, দুই নয়–হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছিলো।

সেদিন জজের কাছারীতে শত শত মানুষ জমেছিলো। আমি আর আলতার মা একটা উকিলও নিযুক্ত করেছিলাম না। কত উকিল এসে বললে, মোকদ্দমা আমার হাতে দাও, খালাস পাবে।

উকিলকে বিশ্বাস করবার কোনো দরকার ছিল না। ভাবলাম খাঁটি সত্য কথা জজের কাছে বলবো–তাতে যা হয় তাই হবে। আলতার মা আর সেই ৬ জন আসামি জোড়হাত হয়ে হাকিমের দিকে চেয়ে কেবলই কাঁদছিলো। ধীবর আসামিদের জন্য কলকাতা থেকে দুইজন উকিল গিয়েছিলো। তাদের ফি দৈনিক ৫০০ টাকা করে। দারোগা, উকিল, সিপাই, চৌকিদার এসে উপস্থিত হলো।

তারপর বিচার হল। দারোগা বাবু বললেন, ‘আলতার মার বাড়িতে উপস্থিত হতেই ধীবরেরা এসে আমাকে আক্রমণ করলে। আমরা আসামিদিগকে নিরস্ত করতে যেয়ে অনুনয় করে বললাম–আমরা কারও ক্ষতি করতে আসি নি। তারা কিন্তু বিশ্বাস করলে না। বললে, যে গ্রামে দারোগা আসে সে গ্রামের সবার ভাগ্যেই জেল থাকে, বিশেষ করে এটা যখন খুনি ব্যাপারে তখন সবাইকে কালাপানিতে যেতে হবে। আমরা অনুচরেরা। আমার সঙ্গে সঙ্গে প্রহৃত হল। গভর্ণমেন্টের কাজে বাধা পেয়ে আমরা পুলিশ সাহেবকে সব কথা জানালাম, ফলে বহুসংখ্যক অস্ত্রধারী সিপাই নিয়ে পরের দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত। হই। ভীষণ দাঙ্গা হল। সরকারকে গ্রাহ্য করা দূরে থাক, তারা সরকারকে মানি না বলে নিশান উড়িয়ে দিলো। পুলিশ সাহেব তাদেরকে ধরতে গিয়েছিলেন! তিনি সাংঘাতিকরূপে। আহত হয়ে ফিরে আসেন, একথা কোর্ট জানেন। বহু কষ্টে এই ষোল জনকে ধরা হয়েছে। মাদারিপুরের ঘাটে, সুন্দরবনে, কাশীর মালোপাড়ায়, কলিকাতায় ক্ষুদিরামের হোটেলে যে কয়েকজন ধরা গিয়াছে তারাই আসল আসামি। চারিজনের আইনমতে ফাঁসি হওয়া উচিত, বাকি ১২ জনের নির্বাসনদণ্ড দেওয়া হউক। পরিশেষে ইহাও আমার বক্তব্য যে, এই আসামি স্ত্রীলোক দুটি রাজকর্মচারীকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে। আসামি হলেও তারা সরকারের নিকটে যথেষ্ট পুরস্কার দাবি করতে পারে।

দারোগার উক্তি শুনিয়া আলতার মা এতক্ষণে চোখ মুছিয়া ফেলিল। আমার মনে কোনো প্রকার ভাব উপস্থিত হয়েছিল না, শুধু বিচিত্র ব্যাপার দেখছিলাম সরকারি উকিল দাঁড়িয়ে একই কথা বললেন। দারোগার কথা সমর্থন করতে গিয়ে তিনি বললেন, এই স্ত্রীলোক দুটির শুধু মুক্তি দেওয়া উচিত নহে, ইহারা যেমন বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে, তাতে এদের সরকার হতে যথেষ্ট পুরস্কার দেওয়া আবশ্যক। সতী রমণীর মর্যাদা আইনেরও উপরে। তাহাদের সম্মান রাজদরবারে অধিক রক্ষিত হওয়া আবশ্যক। আমাদের কোনো উকিল ছিল না। যা বলতে হবে তা নিজেই আমি বলবো স্থির করেছিলাম। অন্য আসামিদের বড় বড় উকিল উঠে বললেন;

দারোগা যা বললেন তা সবই মিথ্যা। সাক্ষাতে সে সব প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। দারোগা প্রথমেই হারাণ মাঝির বাড়িতে যেয়ে তার সধবা মেয়েকে বিনা কারণে ললেন, ‘তুমি এই মোকদ্দমা কিছু জান?’ নিমু নারায়ণ ও রামচরণ তার প্রমাণ দিয়েছে। হারাণের মেয়ে যখন কেঁদে বললে যে, সে কিছু জানে না, দারোগা বাবু তখন ক্রোধান্ধ হয়ে তার সিপাইদের হুকুম দিলেন এই মাগীকে ধর। সিপাইরা মুক্তস্থানে তাকে অর্ধ-উলঙ্গ করে অপদস্থ করে। বৃদ্ধ বাপ এই শোচনীয় দৃশ্য দেখে দারোগার কাছে করুণা ভিক্ষা করে। দারোগা তাকে এমন প্রচণ্ড আঘাত করেছিলো যে, সেই আক্রমণ করতে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয়; অথচ দারোগা বাবু সাক্ষী বলে গেল–এই বৃদ্ধই পুলিশ সাহেবকে আক্রমণ করতে গিয়েছিল। পুলিশ সাহেবকে রক্ষা করতে যেয়ে এক সিপাই এর মাথায় আঘাত করে এবং তার ফলেই সে মারা গেছে। ধীবরদের রক্ত-মাংসের শরীর। তাদের উপর এত অত্যাচার করলে এমন অঘটন যে সংঘটিত হবে তা দারোগা বাবুর মতো বিচক্ষণ রাজকর্মচারীর জানা উচিত ছিলো। আসীম আলতার মা আর তার বোনের বাড়িতে না এসো, দারোগাবাবু প্রথমেই হারাণ,মাঝির বাড়িতে গিয়েছিলেন, এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। এই দারোগাবাবু কার্য হতে জানা যায়, তিনি সরকারি কার্য করতে একেবারে অপারগ। তিনি প্রজার মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু কার্যত এই অনাসৃষ্টির কারণ একমাত্র তিনি। গভর্ণমেন্টের কর্তব্য এখন এই ব্যক্তিকে কার্য হতে অবসর দেওয়া।

দাঙ্গা-হাঙ্গামায় অভিযুক্ত হওয়া স্ত্রীলোক দুইটির এবং দারোগার। শাস্তি হওয়া আবশ্যক। স্ত্রী আসামিদ্বয়ের যে চরিত্র ভালো একথা আমরা বিশ্বাস করিতে পারি না। সাক্ষীরা বলেছে দারোগার সহিত আলতার মার অবৈধ প্রণয় ছিল। সকল দাঙ্গার কারণ রমেন্দ্রের হত্যা। রমেন্দ্রের সহিত আলতার মায়ের বোনের প্রণয় ছিল। আলতার মা বোনের উপর ঈর্ষাপরবশ হইয়া জমিদার-পুত্র রমেন্দ্রকে হত্যা করেছে।

হাকিম অতঃপর আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন–“তুমি কী জান?’

আমি কহিলাম–দারোগা বাবুর সহিত আমাদের কোনো কালে পরিচয় নাই। তদারকের পূর্বে তিনি অন্য কোনো বাড়িতে গিয়েছিলেন কি না আমি জানি না। রামেরে হত্যা আমার দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য বাধা দিতে গিয়েই এই হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়! আমার প্রতি দুর্ব্যবহার করায়, আমার বাড়িতেই ধীবরেরা দারোগা বাবুকে আক্রমণ করে।

আর কোনো জেরা মন্তব্যের প্রয়োজন হল না। জজ সাহেব রায় দিলেন। দাঙ্গা অভিযুক্ত ৪ জন মূল আসামির শুক্র বার বেলা ১২-৪ মিনিটের সময় ফাঁসি হইবে। বাকি ১২ জন আসমির ৫০০ টাকা জরিমানা। পরিশেষে জজ সাহেব আমাদের কথা উল্লেখ করে বললেন–এই স্ত্রীলোক দুটির বীরত্বে, সতীত্বে কোট খুব আনন্দ প্রকাশ করিতেছে। তাহারা সত্য কথা বলিয়াছে, উহাদিগকে মুক্তি দেওয়া হউক।

পরে বিচারে দারোগার দুই মাসের কারাদণ্ড হয়েছিল। রায় প্রকাশ হইবার পরকোর্টের ভিতরে ভিতরে ও বাহিরে হই হই শব্দ আরম্ভ হল। আমরা কাঠগড়া থেকে মুক্ত হয়ে বাহির হয়ে এসে দাঁড়াতেই হাজার হাজার লোক আমাদের চুতুর্দিকে এসে দাঁড়াল।

আমরা ক্রমে ক্রমে জনতা ঠেলে সরে এলাম। জনতা পার হয়ে একটু দূরে এলে আলতার মা আমার হাত ধরে বললে—’দিদি, তুই সব বিপদের মূল। তুই যদি আমাদের গ্রামে না আসতিস, তোকে যদি বড়িতে স্থান না দিতাম তাহলে আজ আমাদের গ্রাম উজার হতো না।’

কি জানি কেন–মন দুঃখে ভরে গেল। মাথাটা যেন কেমন হয়ে উঠলো।

.

দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ

”বাড়িতে ক্রমেই ভয়ানক জ্বর আরম্ভ হল। আলতার মা ক্রমশ আমার উপর কী কারণে জানি না বিরক্ত হয়ে উঠলো! আমাকে দেখলেই সে যেন শিউরে উঠতো! আলতা যদি মা মা বলে আমার কাছে আসতো তার আপন মা জোর করে আমার কাছ থেকে টেনে নিয়ে যেত।

সংসারের বিচিত্রতা দেখে মন ও মাথা দুই-ই আবার খারপ হয়ে উঠলো। ভাবলাম, জ্বরটা একটু কম পড়লেই এস্থান থেকে পালাবো। কিন্তু আলতার কথা ভেবে মনটা যেন কেমন হয়ে গেল। কতকালের সেই হারান স্মৃতি আগুনের মতো মনের মধ্যে জ্বলে উঠলো। ভাবলাম কোথায়, আমার মেয়ে কোথা? সে কার ঘরে এখন? সে কি জানে তার মা কে? হায়রে কপাল? আমার বুকের ধন যে চুরি রে নিলে? কে আমাকে এমন করে ভিখারিনী করলে? ভগবান, তুমি কি আছ। তোমার কাজ নাকি মঙ্গলময়। আমার বুকের আগুন জ্বেলে তুমি তোমার কি মহান উদ্দেশ্য করছ। সে কার মাকে মা বলে মনকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছে।

এর পর দুদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। তৃতীয় দিনে জ্বরটা ছেড়ে গেল। রাত্রি যখন দ্বিপ্রহর তখন আকাশে মেঘ উঠেছিলা। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল একটু একটু বৃষ্টি আরম্ভ হল! সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বাতাস দেখা দিল। আমি ভগবানকে স্মরণ করে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়লাম। সেই বৃষ্টি ঝড়ের ভিতর অতি-ভীত মনে আমি অগ্রসর হচ্ছিলাম। সমস্ত রাত্রি হেঁটে হেঁটে কাটিয়ে দিলাম। সকাল বেলা এক রেলস্টেশনে এসে উপস্থিত হলাম। ১০ টা টাকা সঙ্গে ছিল, কলকাতার টিকিট করলাম। রাত্রি বারটার সময় কলকাতয় এলাম। পর দিন সকাল বেলা হাওড়ার রেল পথ ধরে অগ্রসর হতে আরম্ভ করলাম। প্রায় তিন মাস হেঁটে আমি নাগপুরে যাই। শুনেছিলাম বিন্ধ্যপর্বতে অনেক সিদ্ধ সাধু-সন্নাসী থাকেন। এবারে আমি তাদের সন্ধানে বেরিয়েছিলাম। শুনেছিলাম, সিদ্ধ পুরুষেরা সব বলতে পারেন। নাগপুর হতে আর তিন মাস হেঁটে আমি বিন্ধ্যপর্বতে উপস্থিত হই। আর্যাবর্তের দক্ষিণ সীমায় বিন্ধ্যাচল। কী বিরাট পাহাড় বিন্ধ্যাচল! সমস্ত বিশ্ব ছেড়ে জনমানবশূন্য হিংস্র জন্তু সমাকীর্ণ পাহাড়ের মধ্যে একেবারে চলোম। যখন দূর হতে বিন্ধ্যপাদদেশ অবলোকন করলাম তখন সন্ধ্যা প্রায় সমাগত। প্রাণ এক অনির্বচনীয়ভাবে ভরে উঠলো। প্রাণে ভয় ছিল না, সুতরাং একটা বিরাট শান্তি যে আমার মধ্যে দেখা দিবে তদ্বিষয়ে সন্দেহ কি! পশ্চিম গগনের হৈমকর এসে পাহাড়ের মাথায় প্রভাত হচ্ছিল। যখন পাহাড়ের পাদদেশে এসে উপস্থিত হলাম, তখন দেখতে পেলাম একটা স্রোতম্বিনী পাহাড়ের বুক ভেঙ্গে বের হচ্ছে। দুই পার্শ্বে কী ভীষণ জঙ্গল? বড় বড় গাছ আকাশকে চুম্বন করবার জন্য মুখ বাড়িয়ে আছে। দেখতে পেলাম হাজার হাজর বানর। হঠাৎ পিছন থেকে কি যেন একটা অদ্ভুত জীব ভীষণ চীৎকার করে উঠলো একটা বিকট ভয়ানক আনন্দে আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। নিস্তব্ধ বনভূমি কাপিয়ে আমার হাসি হো হো করে হেসে উঠলো। ইচ্ছা হল সমস্ত পাহাড়ের উপর উড়ে উড়ে বেড়াই! বিরাট গভীর নিস্তব্ধ দেশের মহারানী হই। শৈলের উপর শৈল সমুদ্রের তীরের মতো তরঙ্গায়িত হয়ে উঠেছিল। ইচ্ছা হচ্ছিল এই বিশাল মাটির তরঙ্গের শীর্ষ হতে এক লম্ফে শূন্যকে উপহাস করে গভীর নিম্নভূমিতে লাফিয়ে পড়ি। কী বিরাট দৃশ্য! কী ভয়ানক!

সন্ধ্যার অন্ধকারের সঙ্গে পাহাড় আরও গম্ভীর ভাবময় হয়ে উঠলো। মনে হল সংসারে আমি একা। এ সংসারে আর কেউ নাই। ভগবানের বিশাল ভীমরূপ আমার সম্মুখ। আমার অস্তিত্ব বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। মনে হল বুকখানি কেটে ফেলি। আত্মা আমার মুক্ত হোক। আকাশে-বাতাসে ব্যোম-সমুদ্রে, উর্ধ্ব হইতে নিম্নে, নিম্ন হইতে উর্ধ্বে জোছনার অর্ধ আলোতে খেলে বেড়াই। ভেঙ্গে ফেলি দেহের কারাগার। মনে হল মৃগের সঙ্গে খেলে বেড়াই। নীল লতা-পাতা দিয়ে শয্যা রচনা করি। হিংস্র শার্দূল ভল্লুকের মুখে ননী তুলে দি।তারা আমার পায়ের কাছে শুয়ে পড়ুক। মনে হল জরা মৃত্যু দূর হোক। মানুষ কামনা বাসনা হতে মুক্ত হোক। সমস্ত বিশ্বসংসারটা পাহাড় হয়ে উঠুক। মানুষ স্বভাবের শিশু হয়ে লতাপাতার সঙ্গে মিশে থাকে। বিশ্বের সমস্ত গ্রন্থ সাগরে ডুবে যাক; শুধু তিনটি কথা বেঁচে থাক–ঈশ্বর; ন্যায় ও সত্য। সকল উপাসনা, সকল ধর্ম উঠে যাক, শুধু থাকুক ঈশ্বর ন্যায় ও সত্য।

সেই স্রোতস্বিনী-উপকূলে সমস্ত রাত্রি পঁড়িয়ে কেটে গেলো। তার পর অনবরত সাতদিন আমি পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরি। বনের ফল খেতাম ও ঝরনার জল পান করতাম। সাতদিন পর আমার মনস্কামনা সিদ্ধ হল। একস্থানে দেখলাম একজন ফকির চোখ বুজে পশ্চিম দিকে মাথা নিচু করে পড়ে আছেন। হরি হরি! সে কী অপূর্ব মূর্তি! সমস্ত বনভূমি যেন আলোকিত হয়ে উঠেছিলো।

তিনদিন আমার এই ফকিরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে কেটে গেল। চতুর্থ দিনে ফকির আমার দিকে ফিরে চাইলেন। আমি দুই হাত দিয়ে তাকে নমস্কার করলাম। ফকির কোনো কথা জিজ্ঞাসা না করেই বললেন–“কি বেটী! মেয়ে খুঁজতে এসেছি। ওখানে শুয়ে থাক মেয়ের সন্ধান পাবি।”

জানি না, কি কারণে ঘুমে চোখ ভেঙ্গে এল। আমি সেই স্থানে অবিলম্বে ঘুমিয়ে পড়লাম। তার পর প্রগাঢ় গভীর নিদ্রা। দেখতে পেলাম একটা বিরাট মাঠ, সেই মাঠের মাঝে তুমি দাঁড়ায়ে আছ। আমার মেয়ে তোমার বুকের উপর মাথা রেখে হাসছে।

আবু চমকিত হইয়া লাফাইয়া উঠিল বিস্মিত বিমূঢ় হয়ে জিজ্ঞেস করল, আমি!

রমণী কহিলো–হ্যাঁ তুমি! যখন ঘুম ভেঙ্গে গেল তখন স্বর্ণকিরণ পাহাড়ের উপর একটা অপূর্ব মহিমা ছড়িয়ে দিয়েছিলো।

প্রভাতে ফকির হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মেয়ের সন্ধান পেয়েছে?”

আমি কহিলাম, হ্যাঁ, পেয়েছি ঠাকুর। ফকির বললেন, “তবে আর দেরি করো না। যাও, ঐ যুবকই তোমার মেয়ের জীবন-স্বামী।”

আমি আর দেরি করলাম না। ফকিরকে নমস্কার করে যাত্রা করলাম।

আজ পাঁচ বছর ভারতের সব নগর ঘুরেছি–কোথাও তোমার সন্ধান পাই নাই। আজ বৈকাল বেলা হাওড়ার স্টেশনে আমি ঘুরছিলাম। তোমাকে দেখতে পেয়ে আমার সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে উঠেছিল। সমস্ত পৃথিবীটা আমার চোখের সামনে ঘুরে উঠলো।চলন্ত গাড়িতে আমি অনায়াসে লাফিয়ে উঠতে পেরেছি। এখন বল, আমার মেয়ে কোথায়?

আবু অত্যন্ত বিনীত হয়ে বললেন, “আমি যে সে যুবক তা কী করে জানলেন”

রমণী কহিলেন, “আমি নিজের চোখে তোমাকে দেখেছি। বল আমার মেয়ে কোথায়? একটি বার তাকে দেখতে চাই। সেই সোনার প্রতিমাকে একবার শুধু দেখতে চাই।”

আবু কহিলেন–“আপনার স্বপ্নের সহিত সত্যের কোনো সম্বন্ধ নাই। যদি আপনার মেয়ের কোনো সন্ধান জানতাম ত্ম হলে আমি স্বেচ্ছায় আপনার খোঁজ নিয়ে নিজকে কৃতার্থ করতাম আপনার দুঃখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে”।

রমণী উত্তেজিত হইয়া করিলেন, “তুমি আমার কন্যার জীবন-স্বামী। তুমি স্বামী হয়ে স্ত্রীর খবর জান না! বল–আমার মেয়ে কোথায়?

আবু আবার বলিলেন–“আমার এখনও বিবাহ হয় নাই। তা ছাড়া আপনি হিন্দু। আপনার কন্যার সহিত আমার বিবাহ অসম্ভব কথা!”

রমণী বলিলেন–“তুমি বলতে চাও–তুমি মুসলমান, হিন্দুর মেয়েকে বিবাহ করলে তোমার জাতি যায়?”

আবু বলিলেন, “তাহা বলিতেছি না। শুধু প্রথা নাই।”

“কীসের প্রথা? যেখানে মনুষ্যত্ব আছে সেখানেই আত্মাকে বিক্রয় করা যায়। হিন্দু এক ছাড়া দুই ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে না। বাঙালি হিন্দু গ্রিকের মতো অন্ধ পৌত্তলিক নহে, ইহারা খাঁটি মুসলমান। ইহারা মোহাম্মদের মহা-মনুষ্যত্বকে অস্বীকার করে না। বল আমার মেয়ে কোথায়?”

আবু আবার বিনীতভাবে কহিলেন, “সত্য করিয়া বলিতেছি, আপনার মেয়ের সংবাদ আমি। বিন্দুবিসর্গ জানি না। আমি এমন নরপিশাচ নহি। আপনার মাতৃহৃদয়ের দুঃখ আমি পুরাপুরি অনুভব করছি, সত্যি করে বলছি আমি কিছু জানি না।”

রমণী হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিয়া কহিল–“মিথ্যা! সংসারকে বিশ্বাস নাই–এখানে কেবল অধর্ম ও পাপ।”

মুহূর্তের মধ্যে বাধা দিবার অনেক পূর্বে রমণী চলন্ত ট্রেন হইতে অন্ধাকরে মাঠের মধ্যে লাফাইয়া পড়িল।

.

এয়োবিংশ পরিচ্ছেদ

কানাই নগরের নিমু শেখ কতকাল হতে যে জিরা, গোলমরিচ, কেরোসিন তেল, লাল সুতা পুতুল, মেয়েদের মাথার কাঁটা বেচে বেড়ায় তার ঠিকানা নাই। সরলা, আমলা, যুঁই নিহার, লতা, নাসিফা, জামিলা খাতুন বাল্যকালে আধা-বয়সী-নিমু অর্থাৎ নৈমুদ্দীনকে গ্রামকে গ্রামে মাথায় পসরা নিয়ে ঘুরতে দেখেছে। তাদের প্রত্যেকের কত দূরে দূরে বিয়ে হয়েছে, কারো। বা দুই চারিটি ছেলে আজুও তারা দেখে সেই আধা-বয়সী নিমু তাদের শ্বশুরবাড়ির কাছ দিয়েও চিৎকার করে বলে–“চাই জিরে, গোলমরিচ? চাই মাথার কাঁটা?”

কেউ তাকে দেখে লজ্জা করে না। যারা তার সামনে নেংটা শিশু হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে তারা আজ পাঁচ ছেলের মা হলেও নৈমুদ্দীনকে দেখে লজ্জা করে না। মেয়েদের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি-সবখানেই নিমুর জন্য অন্দরমহল অবারিত দ্বার। শিবু দাসের বউ তার বিধবা কন্যা রমার খবর দুই ক্রোশ দূর হতে নিমুর দ্বারা সংগ্রহ করে। সেদিন রমার ভাসুর তাকে লাঠি দিয়ে মেরেছিল। রমা নিমুর কাছে গোপনে সব কথা বলেছে। নৈমুদ্দীন যথা সময়ে সে কথা শিবুর বৌকে বলে তার আঁখিজল ফেলবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

নিহার রামরতন দত্তের মেয়ে ছোট কালে না নিমু শেখকে ঠাকুর দাদা বলে ডাকতে। আজও তেমনি করে নিমুকে সে দেখা পেলেই দাদা বলে আলাপ করে। পাঁচ বছর আগে যখন ঢাকঢোল পিটে ফজরপুরে বাবুদের বড় ছেলে নিহারকে বিয়ে করতে আসে, সেদিন নৈমুদ্দীন নিহারকে নাতনীর প্রাপ্য কত ঠাট্টাই না করেছিল। নিহার তার কথা শুনে হেসে খুন হয়েছিল।

আর আজকাল যখন আগুনের ডালি বিধবা নিহার নিমু শেখের সম্মুখে এসে দাঁড়ায়, তখন নিমু শেখের মুখে কথা সরে না। রহস্য সে ভুলে যায়। অতি কষ্টে সে আঁখিজল সংবরণ করে। বিবাহের এক মাস পরেই নিহার বিধবা হয়ে ভায়েদের ও ভ্রাতৃবধূরে কৃপার পাত্র হয়ে বাড়ি ফিরে ছিলো।

রমার মা বার্তাবাহক নিমুকে দিয়ে শুক্রবার মেয়ের কাছে খবর পাঠিয়েছিলো, শ্বশুরবাড়িতে আর তাকে অত লাথি খেয়ে থাকতে হবে না। শনিবারেই তার মা তাকে নিয়ে আসবে।

নৈমুদ্দীন যেখানেই যাক, যেখানেই থাক, সে এই দুটি মেয়ের কথা ভুলতে পারত না যত রাতেই সে শুতে যাক, শোবার আগে সে একবার ভাবতো–আহা, এই দুটি মেয়ের কেউ নেই! নৈমুদ্দীনের চোখ জলে ভরে উঠতো। সে ভেবে উঠতে পারতো না কেমন করে সে এদের দুঃখ কষ্ট দূর করতে পারে? সে যে বড় দরিদ্র, তা ছাড়া উপার তো কিছু ছিল

হিন্দুদের এ জঘন্য বাধ্যতামূলবক বৈধব্য ব্রত সে সামান্য অজ্ঞান লোক হইয়াও ঘৃণা না করিয়া থাকিতে পারিত না।

.

চতুর্বিংশ পরিচ্ছেদ

কাটিহারের মুনসেফ শ্যামাচরণ মিত্রের নাম সকলেই জানেন। তখন পূজার সময় তিনি বাড়ি আসিয়াছিলেন। বিজয়ার পরদিন তার বড় ছেলে হরিচরণ বসন্ত রোগে প্রাণ ত্যাগ করিল। হরিচরণ ওকালতী পাস করিয়া বাড়িতে ছিলেন। দুই এক মাসের মধ্যেই তিনি বহরমপুরে কাজে যোগ দিবেন, এইরূপ বন্দোবস্ত হইয়াছিল। কিন্তু হায়, বিধাতার ইচ্ছা অন্যরূপ! কে বুঝিয়াছিল বিজয়ার দিন যেদিন বঙ্গের সর্বত্র হিন্দুর ঘরে আনন্দ-কোলাহল শ্যামাচরণের ঘরে এমন বজ্রাঘাত হইবে।

মুনসেফ বাবুর স্ত্রী সৌদামিনী শ্রেষ্ঠা সুন্দরী, বয়স পঁয়ত্রিশ হইলেও অতীব সৌন্দর্য তাঁহার মধ্যে যথেষ্ট ছিল।

বিবাহের অনেক দিন পরে হরিচরণের জন্ম হয়। সৌদামিনী প্রাণ অপেক্ষা তাঁহার একমাত্র পুত্রকে স্নেহ করিতেন।

গ্রামের মধ্যে সাধ্বী ধার্মিকা রমণী বলিয়া তাহার নাম ছিল। নিম্ন শ্রেণীর হিন্দু মুসলমান তাঁহাকে মা বলিয়া ডাকিত। সৌদামিনীর নিন্দা কোনো মুসলমান কৃষক শুনিতে পারিত না। গ্রামে যদি কাহারো কোনো অসুখ হইত সৌদামিনী তাহার ঔষধ-পত্রের ব্যবস্থা নিজেই করিতেন। নিজ ব্যয় তিনি পাল্কিতে চড়িয়া রোগীকে দেখিয়া আসিতেন!

হারান শেখের ছেলে পড়িতে পারে না। হারনি শেখ আলির বাবুদের বাড়িতে সৌদামিনীকে ধরিল, অমনি তাহার পুত্রের পড়ার ব্যবস্থা হইয়া গেল।

নিতাই ঠাকুর তাঁর মেয়েকে নিয়ে ভারি বিপদে পড়িয়াছেন। বিবাহের ভার নিলেন সৌদামিনী যত খরচ সব তার!

এ হেন ধার্মিক রমণী সৌদামিনীর মাথায় এই সময় এমন বজ্রাঘাত হইল! মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক।

কেঁদে কেঁদে তিনি কয়দিন একেবারে অনাহারে ছিলেন। তার পর বহু চেষ্টার পর বহু অনুরোধের পর জল স্পর্শ করেন। এই সাংঘাতিক বিপদ শুধু তাহাকেই কাঁদায় নাই, যে শুনিয়াছিল সেই কাঁদিয়াছিল। আহা, সতীর কপালে এই ছিল।

মুনসেফ হরিচরণ ছিলেন অত্যন্ত গোঁড়া হিন্দু। পাশ্চাত্য শিক্ষাকে তিনি নিতান্ত ঘৃণার চোখে দেখতেন। মুসলমানদের প্রতি স্ত্রীর অন্যায় টান দেখিয়া তিনি হাড়ে হাড়ে চটিতেন। কতবার তিনি স্ত্রীকে নিষেধ করিয়াছিলেন, কিন্তু কোনো ফল হয় নাই। ভিতরে তার কি ছিল তা কেউ জানে না। বাহিরে তিনি মুসলমানের ছায়া মাড়িয়ে স্নান করিতে দ্বিধা বোধ করিতেন না। একটা গ্রামের ছেলে একদিন তাহাকে মুরগির মাংস খাইতে দেখিয়াছিল–এই কথা সে বন্ধু মহলে একদিন প্রচার করে। তাঁর পিতা এই কথা শুনিয়া একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলিয়া উঠেন। এত বড় একটা ধার্মিক লোকের বিরুদ্ধে এই পৈশাচিক অপবাদ শুনিয়া, পিতা পুত্রের মাথায় পায়ের খরম দিয়া এরূপ ভীষণ আঘাত করেন যে তার মাথা কাটিয়া যায়। ফলে বেচারাকে ছয় মাস হাসপাতালে থাকিতে হইয়াছিল।

মুনসেফ বসিয়া তামাক খাইতেছেন, এমন সময় গ্রামেরএকজন মুসলমান ভদ্রলোক তাহার সঙ্গে দেখা করিতে আসিয়া ফরাসে বসিয়া পড়িলেন। অমনি সুসেফ বাবু ‘রাম রামবলিয়া হুঁকো ফেলিয়া দিলেন। ভদ্রলোক লজ্জিত ও মর্মাহত হইয়া বলিলেন, বাবু তা হলে আসি,আপনার খাবার বেলা হয়েছে, দেরি করলে অসুখ হতে পারে।

মুনসেফ বাবু বুড়ো ভদ্রলোকের অসঙ্কোচে নাম ধরিয়া বলিলেন–“আচ্ছা, তা হলে এসো।”

রাতদিন তিনি সৌদিমিনীর কাছে হিন্দুধর্মের ব্যাখ্যা করিতেন। ইদানীং তিনি স্ত্রীর হাতে খাওয়া পর্যন্ত ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। অফিস হতে আসিয়াই একবার তিনি স্নান করিয়া শুচি হইতেন।

স্ত্রীর হাতে না খেলেও তিনি সৌদামিনীর জন্য পাগল ছিলেন। সৌদামিনীর নিজের পক্ষে নানা বিরক্তির কারণ থাকিলেও স্বামীর ভালবাসায় তিনি সব কথা ভুলে যেতেন। প্রতিদিন মুনসেফ বাবু পূজার পর টিকিতে ফুল বাঁধিয়া তাড়াতাড়ি স্ত্রীর ঘরে আসিয়া কৃষ্ণ ঠাকুরের মতো সৌদামিনীর পায়ের কাছে গড়াইয়া পড়িতেন! সৌদিমিনী লাফাইয়া উঠিয়া বলিতেন, একি?–এ কি? আমার যে নরকেও স্থান হবে না।

ধার্মিক শ্যামাচরণ বলিতেন–তুমি দুর্গা! আমি তোমার মধ্যে জগদ্ধাত্রীর রূপ দেখতে পাচ্ছি। তোমাকে আমি মা বলে পূজা করবো!

এমনভাবে তাঁহাদের জীবন কাটিতেছিল, হঠাৎ একদিন তাঁহাদের একমাত্র পুত্র। হরিচরণ মৃত্যুমুখে পতিত হইল।

শোকে শ্যামাচরণ ও সৌদামিনী একেবারে মুহ্যমান হইয়া পড়িলেন। শ্যামাচরণ ছয় মাসের ছুটি লইলেন।

শোক প্রশমিত করিবার জন্য শ্যামাচরণের স্ত্রী তীর্থভ্রমণে গমন করিলেন। উভয়েরই ইচ্ছা কিছুকাল কাশীতে বাস করিয়া শ্রীক্ষেত্র হইয়ো বাড়ি ফিরেন।

ছয়মাস অতীত হইয়া গিয়াছে। পুত্রশোক অনেকটা প্রশমিত হইয়াছে। বিশেষ করিয়া ভগবান আবার তাদের প্রতি কৃপা প্রকাশ করিয়াছেন। সৌদামিনী বহু বৎসর পরে আবার অন্তঃসত্ত্বা হইয়াছেন।

সংসার আবার শত সুষমা লইয়া তাঁহাদের সম্মুখে প্রতিভাত হইতেছিল। ফুলের গন্ধ আবার ফরিয়া আসিয়াছিল জোছনার আলো আবার তাঁহাদের কাছে মধুর হইয়া উঠিয়াছিল।

একদিন জোছনার আলোয় জগৎ অভিনব সাজে সজ্জিত হইয়াছে। বাড়ির সম্মুখে নানাবিধ কুসুম ফুটিয়াছিল। নীল লতা আর ছোট ছোট ফুলের গাছ সেদিন শ্যামাচরণের বহিবাটীখানিকে একখানি নন্দপুরী করিয়া তুলিয়াছিল। এমন সময় শ্যামাচরণ তাহার স্ত্রীকে লইয়া সেখানে উপনীত হইলেন।

শ্যামল দুর্বার উপর দাঁড়াইয়া আলো ও গানে ভরা প্রকৃতির মধ্যে সৌদামিনী শ্যামাচরণের বুকের উপর মাথা রাখিয়া বলিলেন–এ সংসারে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধুর মিলন

থাকিত, তবে মানুষ বাচিত না। তুমি আমাকে কত ভালবাস, আমি তোমাকে কত ভালবাসি। সকল দুঃখ, সকল বেদনা তোমার মুখের দিকে তাকাইলে ভুলিয়া যাই। .

শ্যামাচরণ স্ত্রীর মুখে চুম্বন করিয়া তাহাকে বুকে আরও একটু চাপিয়া ধরিয়া কহিলেন–প্রিয়ে, স্ত্রী-পুরুষের মিলন না থাকিলে এই দুঃখ কষ্টভরা সংসারে কেহ বাঁচিতে পারিত না, ইহা সত্য। যেদিন প্রথম তোমকে বিবাহ কর সেই দিন হইতেই কী মধুর স্বপ্ন রচনা করিয়াছি। তোমার সৌন্দর্য, তোমার মাধুরী তোমার রক্ত ওষ্ঠের মৃদু কম্পন, প্রতি প্রভাতে নূতন মোহ সৃষ্টি করে! সকল বেদনা, সকল দুঃখ ভূলিয়া ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়া বলি ‘প্রভু! মানুষকে তুমি কী মহাদান দিয়াছ। সমস্ত সংসার ভুলিতে পারি, কিন্তু সৌদামিনীকে ভুলিতে পারি না। তুমি আমার জীবনের শক্তি, ধর্মে তুমি আমার ভক্তি, বিচারকার্যে তুমি আমার বৃদ্ধি, আমি তোমার কাছে শত রকমে ঋণী, তুমি আমার মহারানী।

সোদামিনী কহিলেন–প্রিয়তম, আমি তোমার দাসী। আমাকে অত প্রশংসা করিয়া লজ্জিত করছ কেন?

নিকটস্থ পাথরের বেদীর উপর বসিয়া শ্যামাচরণ সৌদামিনীর হাত ধরিয়া কহিলেন–বেশ, তুমি দাসী, আর আমি দাসীর দাস।

সৌদামিনী কহিলেন–তোমার সহিত কথায় পিরবার যো নাই। এই বলিয়া তিনি শ্যামাচাণের মুখে এক চুম্বন দান করিলেন।

স্বামী-স্ত্রী অতঃপর অনেক কথা হইল।

অবশেষে শ্যামাচরণ কহিলেন–ছুটি ফুরাইয়া গিয়াছে। সোমবারেই রওনা হওয়া আবশ্যক। আমি ময়মনসিংহে বদলি হইয়াছি। সুতরাং গোয়ালন্দ দিয়া যাইতে হইবে।

.

পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ

পাঠককে এইবার জাপানে যাইতে হইবে।

বেনা তাহার স্বামীর জীর্ণ দেহখানির উপর হাত রাখিয়া কহিল–প্রিয় লেমান, তোমার চিকিৎসায় তো সর্বস্বান্ত হইয়া গিয়াছি, হাতে তো আর কিছুই নাই। ছেলেগুলি তো রাত্রিতে কিছু খায় নাই। যদি প্রাণ দিয়ে তোমাকে রক্ষা করিতে পারিতাম তাহাতেও আমার আপত্তি ছিল না। তোমার রক্তশূন্য মুখ আর আমি দেখিতে পারি না। ছেলেগুলিকে কেমন করিয়া বাচাই। এ মাসের বেতন দশ ফ্রাঙ্ক আগেই নেওয়া হয়ে গিয়েছে। মিস্ ফিনিকে আবার কী বলা যায়।

লেমান কী হল সাবিত্রী প্রতিম বধূর স্বাস্থ্যের রক্ত-ভরা চিবুকে হাত দিয়ে কহিল প্রিয়তমে, ভগবান যদি আমার মরণ দিতেন তাহা হইলে অধিক সুখী হইতাম। আর তোমাকে কষ্ট দিতে পারি না। তোমার এই বয়স এই সৌন্দর্য আমার স্পর্শে থাকিয়া অকালে শুকাইয়া যাইবে। আমি নরাধাম, তোমার জীবনকে বিষময় করিয়া তুলিয়াছি। ভগবান। আমাকে ক্ষমা কর।

বেনা স্বামীর পা ধরিয়া কহিল–আমার প্রাণাধিক! অমন কথা মুখে আনিও না। আমি কি কুলটা রমনী! জাপানী রমণী অনায়াসে স্বামীর জন্য প্রাণ দিতে পারে, তথাচ সে প্রলোভনে মুগ্ধ হইবার পাত্রী নহে। প্রিয়-লেমান, তুমি সারা জীব এই অবস্থায় বাঁচিয়া থাকে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমার সেবা করিব।

লেমান কহিল–দেবতার কাছে প্রার্থনা করি, পরজন্মে তুমি মহারানী হয়ে জন্ম গ্রহণ করো।

বেনা কহিল-প্রিয় লেমান, পরজন্মে আমি যদি মহারানী হই, তবে দেবতা যেন তোমাকে রাজা করেন। পরজন্মে ইহা অপেক্ষাও যদি কষ্টের জীবন হয়, তবে যেন তোমাকেই স্বামীরূপে পাই। আমি অর্থ চাহি না; সম্পদ চাহি না, সম্মান চাহি না, চাই তোমাকে।

মিস্ ফিনির পিতা টকিও শহরের একজন সম্রান্ত ব্যক্তি। তাহারই বাড়ির অদূরে এক দরিদ্র দম্পতির মধ্যে উল্লিখিত রকমের কথা হইতেছিল।

লেমান অতি দরিদ্রের সন্তান। যুবক বয়সে কুমারী বেনার ভালবাসা লাভ করিয়াছিল। শহরের এক গলিতে এই দরিদ্র দম্পতি বিবাহের পর মর্তেস্বর্গ রচনা করিয়াছিল। সে আজ দশ বছরের কথা।

আজ দুই বৎসর হইল লেমান কাল যক্ষ্মা-ব্যাধির কবলে পড়িয়া তলে তিলে ধ্বংসের পথে চলিয়াছে।

লেমান সমস্ত দিন পরিশ্রম করিয়া যাহা পাইত তাহাতে তাহাদের বেশ চলিত মাসে। শেষে হাতে দুই দশ ফ্রাঙ্ক জমিতেও ছিল। তাদের কোনো কষ্ট ছিল না।

কয়েক বছরের মধ্যে তিনটি ছেলে-মেয়ে হয়েছিল, তথাচ অনটন হয় নাই। বড় ছেলেটি তার বাপের ইট টানায় সাহায্য করিয়া সামান্য দুই এক পয়সা উপায় করিতে পারিত। দুই বছর হইতে লেমান ব্যাধির যন্ত্রণায় কোনো কাজ করিতে পারে না। ঘরে যা কিছু ছিল সব শেষ হইয়া গিয়াছে।

দারুণ সাংসারিক কষ্টে বেনা মিস্ ফিনির সহচরী হইয়াছিল। কাজ,–স্নানের সময় ফিনির গা পরিস্কার করিয়া দেওয়া, চুল বাঁধিয়া দেওয়া, কাপড় পরায় সাহায্য করা, মুখে পমেটাম লাগান, জুতা পরিস্কার করা, স্নানের সময় কাপড় ধরিয়া রাখা ইত্যাদি। বেনার মাসিক বেতন ১০ ফ্রাঙ্ক।

জুলাই মাসেরবেতন ১০ ফ্রাঙ্ক জুন মাসেই সে লইয়া ডাক্তারকে দিয়াছে। কিন্তু ব্যাধির উপশম হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। ছেলেরা কি খাইবে, কিছু নাই।

লেমান বেনার হাত ধরিয়া কহিল–প্রিয়তমে, তুমি আর কি করিবে? ছেলেপিলের ক্ষুধার যন্ত্রণা তো আর দেখা যায় না। বড় ছেলে একখানা রিক গাড়ি টানিবার উপযোগী হয় নাই, তা হলে সে তো কিছু কিছু উপায় করিতে পারিত!

বেনা কহিল–আমার প্রিয় লেমান, আচ্ছা আমি আর একবার মিস্ ফিনির কাছে যাই। যদি অগ্রিম আরও কিছু পাওয়া যায়।

লেমান তাহার কম্পিত রক্তহীন হাতখানি বেনার চিবুকে রাখিয়া কহিল–না না, আমার প্রিয় বেনা! দরিদ্র বলিয়া কি ক্রমে ক্রমে নীচাশয় হইতে হইবে? মিস্ ফিনিরে তোমার উপর বিরক্ত হইবেন। আমাদিগকে কত ঘৃণার চক্ষে দেখিবেন।

বেণা কহিল–প্রিয় লেমান, আমি তোমার জন্য হাজার অপমান হাজার লজ্জা মাথায় তুলিয়া লইতে পারি; কুমারী ফিনির হৃদয় উন্নত। তিনি আমাদের দুঃখ কাহিনী শুনিলে নিশ্চয় ব্যথিত হইবেন। ধনীর একটু কৃপায় বহু দারিদ্রের প্রাণ রক্ষা হয়।

লেমান বলিল–এখন থাক প্রিয়তমে, এই দারুণ লজ্জা ও অপমান আমি সহিতে। পারিতেছি না। . বেনা–প্রিয় লেমান তোমার রোগজীর্ণ শরীরে মানসিক কষ্ট খারাপ ফল প্রসব করিতে পারে। আচ্ছা, আমি বাহির হইতে আসি। অনেক কথা বলিয়াছি। একটু বিশ্রাম কর।

লেমান শত তালি দেওয়া অথচ পরিষ্কার উপাধানের উপর মাথা রাখিয়া চক্ষু মুদ্রিত করিল।

বিবাহের দিন বেনা তাহার বাল্যবন্ধুর নিকট একখানি ফুল উপহার পাইয়াছিল সেইখানি বাঁধা দেবার জন্য সে গোপনে রাস্তায় বাহির হইয়া পড়িল।

ঘর হইতে বাহির হইবার সময় সে নীরবে চোখের জল মুছিয়া কহিল–দেবতা আমার প্রিয় লেমানকে ভালো করো।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *