উপন্যাস
গল্প
নাটিকা

ন্যাংচাদার ‘হাহাকার’

ন্যাংচাদার ‘হাহাকার’

ক্যাবলা বললে বড়দার বন্ধু গোবরবাবু ফিলিমে একটা পার্ট পেয়েছে।

টেনিদা চার পয়সার চীনেবাদাম শেষ করে এখন তার খোলাগুলোর ভেতর খোঁজাখুঁজি করছিল। আশা ছিল, দু-একটা শাঁস এখনও লুকিয়ে থাকতে পারে। যখন কিছু পেলে না, তখন খুব বিরক্ত হয়ে একটা খোলাই তুলে নিলে, কড়মড় করে চিবুতে চিবুতে বললে, বারণ কর ক্যাবলা–এক্ষুনি বারণ করে দে।

ক্যাবলা আশ্চর্য হয়ে বললে, কাকে বারণ করব? গোবরবাবুকে?

–আলবাত। নইলে তোর গোবরবাবু স্রেফ ঘুঁটে হয়ে যাবে।

ঘুঁটে হবে কেন? সেই যে কী বলে–মানে স্টার হবে।…আমি বলতে চেষ্টা করলুম।

স্টার হবে? আমার ন্যাংচাদাও স্টার হতে গিয়েছিল, বুঝলি? এখন নেংচে-নেংচে হাঁটে আর সিনেমা হাউসের পাশ দিয়ে যাবার সময় কানে আঙুল দিয়ে, চোখ বুজে খুব মিহি সুরে দীনবন্ধু, কৃপাসিন্ধু কৃপাবিন্দু বিতরো–এই গানটা গাইতে-গাইতে পেরিয়ে যায়।

বুঝতে পারছি। …হাবুল সেন মাথা নাড়ল : তোমার ন্যাংচাদা-রে ফিলিমের লোকেরা মাইরা ল্যাংড়া কইরা দিচ্ছে।

হঃ, মাইর‍্যা ল্যাংড়া করছে!–টেনিদা ভেংচে বললে, খামকা বকবক করিসনি, হাবুল। যেন এক নম্বরের কুরুবক।

ক্যাবলা বললে-কুরুবক তো ভালোই। এক রকমের ফুল।

–থাম, তুই আর সবজান্তাগিরি করিসনি। কুরুবক যদি ফুল হয়, তা হলে কানিবকও একরকমের গোলাপফুল। তা হলে পাতিহাঁসও এক রকমের ফজলি আম! তা হলে কাকগুলোও এক রকমের বনলতা হতে পারে।

ক্যাবলা বললে-বা-রে, তুমি ডিকশনারি খুলে দ্যাখো না।

শাট আপ! ডিকশনারি। আমিই আমার ডিকশনারি। আমি বলছি কুরুবক এক ধরনের বক–খুব খারাপ, খুব বিচ্ছিরি বক। যদি চালিয়াতি করবি তো এক চাঁটিতে তোর দাঁত 

–দাঁতনে পাঠিয়ে দেব।–আমি জুড়ে দিলুম : কিন্তু বকের বকবকানি এখন বন্ধ করো বাপু। কী ন্যাংচাদার গল্প যেন বলছিলে?

–অঃ, ফাঁকি দিয়ে গল্প শোনার ফন্দি? টেনি শর্মাকে অমন আনরাইপ চাইল্ড মানে কাঁচা ছেলে পাওনি বুঝেছ, প্যালারাম চন্দর? ন্যাংচাদার রোমহর্ষক কাহিনী যদি শুনতে চাও তা হলে এক্ষুনি পকেট থেকে ঝাল-নুনের শিশিটা বের করো। একটু আগেই লুকিয়ে লুকিয়ে চাটা হচ্ছিল, আমি বুঝি দেখতে পাইনি?

কী ডেঞ্জারাস চোখ-দেখেছ? কত হুঁশিয়ার হয়ে খাচ্ছি ঠিক দেখে ফেলেছ। সাধে কি ইস্কুলের পণ্ডিতমশাই টেনিদাকে বলতেন, বাবা ভজহরি–তুমি হচ্ছ পয়লা নম্বরের শিরিগাল…মানে ফকস!

দেখেছে যখন, কেড়েই নেবে। কী আর করি–মানে-মানে দিতেই হল শিশিটা।

প্রায় অর্ধেকটা ঝাল-নুন একেবারে চেটে নিয়ে টেনিদা বললে ন্যাংচাদা-মানে আমার বাগবাজারের মাসতুতো ভাই

হাবুল বললে-চোরে-চোরে।

–অ্যাঁ! কী বললি?

–না-না, আমি কিছু কই নাই। কইতাছিলাম, একটু জোরে-জোরে কও!

–জোরে?–টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে নাকটাকে আলুসেদ্ধর মতো করে বললে, আমাকে কি অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো পেলি যে, খামকা হাউমাউ করে চ্যাঁচাব? মিথ্যে বাধা দিবি তো এক গাট্টায় চাঁদি

আমি বললুম-চাঁদপুরে পাঠিয়ে দেব।

–যা বলেছিস!–বলেই টেনিদা আমার মাথায় টকাস করে গাঁট্টা মারতে যাচ্ছিল, আমি চট করে সরে গিয়ে মাথা বাঁচালুম।

আমাকে গাঁট্টা মারতে না পেরে ব্যাজার হয়ে টেনিদা বললে–দরকারের সময় হাতের কাছে কিছু পাওয়া যায় না-বোগাস। মরুক গে–ন্যাংচাদার কথাই বলি। খবরদার কথার মাঝখানে ডিসটার্ব করবি না কেউ।

হ্যাঁ, যা বলছি। আমার বাগবাজারের মাসতুতো ভাই ন্যাংচাদার ছিল ভীষণ ফিলিমে নামবার শখ! বায়োস্কোপ দেখে-দেখে রাতদিন ওর ভাব লেগেই থাকত। বললে বিশ্বাস করবিনে, বাজারে কাঁচকলা কিনতে গেছে-হঠাৎ ওর ভাব এসে গেল। বললে, ওগো তরুণ কদলী! এই নিষ্ঠুর সংসার তোমাকে ঝোলের মধ্যে রান্না করে করে খায়–তোমার অরুণ, হিয়ার করুণ ব্যথা কে বুঝবে! এই বলে, খুব কায়দা করে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ওফ বলতে যাচ্ছে, এমন সময় কাঁচকলাওয়ালা বললে, কোথাকার এঁচোড়ে পাকা ছেলে রে। দিতে হয় কান ধরে এক থাপ্পড়। ন্যাংচাদা আমার কানে কানে বললে—অহো–কী নৃশংস মনুষ্য–দেখেছিস?

এমন ভাবের মাথায় কেউ কি আই-এ পাশ করতে পারে? ন্যাংচাদা সব সাবজেক্টে ফেল করে গেল। আর মেসোমশাই অফিস থেকে ফিরে এসে যা-যা বললেন, সে আর তোদের শুনে কাজ নেই। মোদ্দা, অপমানে ন্যাংচাদার সারারাত কান কটকট করতে লাগল। প্রতিজ্ঞা করল, হয় ফিলিমে নেমে প্রতিভায় চারিদিক অন্ধকার করে দেবে–নইলে এ-পোড়া কান আর রাখবে না।

-খুব ইচ্ছেশক্তি থাকলে, মানে মনে খুব তেজ এসে গেলে বুঝলি, অঘটন একটা ঘটেই যায়। ন্যাংচাদা তো মনের দুঃখে সকালবেলা দি গ্র্যান্ড আবার খাবো রেস্তোরাঁয় ঢুকে এক পেয়ালা চা আর ডবল ডিমের মামলেট নিয়ে বসেছে। এমন সময় খুব সুট-টাই হাঁকড়ে এক ছোকরা এসে বসলো ন্যাংচাদার টেবিলে। ন্যাংচাদা দেখলে, তার কাছে একটা নীল রঙের ফাইল..আর তার ওপরে খুব বড় বড় করে লেখা ইউরেকা ফিলিম কোং। নবতম অবদান-হাহাকার।

ন্যাংচাদার মনের অবস্থা তো বুঝতেই পারছিস। উত্তেজনায় তার কানের ভেতর যেন তিনটে করে উচ্চিংড়ে লাফাতে লাগল, নাকের মধ্যে যেন আরশোলারা সুড়সুড়ি দিতে লাগল। তার সামনেই জলজ্যান্ত ফিলিমের লোক বসে–তাতে আবার নবতম অবদান। একেই বলে মেঘ না চাইতে জল। কে বলে, কলিযুগে ভগবান নেই।

ন্যাংচাদা বাগবাজারের ছেলে–তুখোড় চিজ। তিন মিনিটে আলাপ জমিয়ে নিলে। লোকটার নাম চন্দ্রবদন চম্পটী–সে হল হাহাকার ফিলিমের একজন অ্যাসিসট্যান্ট। মানে, ছবির ডিরেকটারকে সাহায্য করে আর কি।

হাবুল বললে সহকারী পরিচালক।

–চোপরাও।–টেনিদা হাবুলকে এক বাঘা ধমক লাগিয়ে বলে চলল, চন্দ্রবদনকে ন্যাংচাদা ভজিয়ে ফেললে। তার বদনে দুটো ডবল ডিমের মামলেট, চারটে টোস্ট আর তিন কাপ চা ঘুষ দিয়ে–শেষে হাতে চাঁদ পেয়ে গেল ন্যাংচাদা। ওঠবার সময় চন্দ্রবদন বললে–এত করে বলছেন যখন–বেশ, আপনাকে আমি ফিলিমে চান্স দেব। কাল বেলা দশটার সময় যাবেন বরানগরের ইউরেকা ফিলিমে–নামিয়ে দেব জনতার দৃশ্যে।

হাত কচলাতে কচলাতে ন্যাংচাদা বললে, স্টুডিয়োটা কোথায়, স্যর?

 চন্দ্রবদন জায়গাটা বাতলে দিলে। বললে–দেখলেই চিনতে পারবেন। উঁচু পাঁচিল বাইরে লেখা রয়েছে ইউরেকা ফিলিম কোং। আচ্ছা আসি এখন, ভেরি বিজি, টা-টা–

হাত নেড়ে চন্দ্রবদন তড়াক করে একটা চলতি বাসে উঠল।

সেদিন রাত্তিরে তো ন্যাংচাদার আর ঘুম হয় না। বার বার বিছানা থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জনতার দৃশ্যে পাট করছে। মানে, কখনও স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে কখনও জয়ধ্বনি করছে, কখনও অট্টহাসি হাসছে। অবিশ্যি হাসি আর জয়ধ্বনিটা নিঃশব্দেই হচ্ছে–পাশের ঘরেই আবার মেসোমশাই ঘুমোন কিনা।

সারা রাত ধরে জনতার দৃশ্য সড়গড় করে নিয়ে ন্যাংচাদা সকাল নটার আগেই সোজা ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের বাসে চেপে বসল। তারপর জায়গাটা আঁচ করে নেমে পড়ল বাস থেকে।

খানিকটা হাঁটতেই–আরে, ওই তো উঁচু পাঁচিল। ওইটেই নিশ্চয় ইউরেকা ফিলিম।

গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল ন্যাংচাদা। বাইরে একটা মস্ত লোহার গেট–ভেতর থেকে বন্ধ। তার ওপরে বোর্ডে কী একটা নাম লেখা আছে কিন্তু লতার ঝাড়ে নামটা পড়া যাচ্ছে না-দেখা যাচ্ছে কেবল তিনটে হরফ-এল, ইউ, এম।

এল-ইউ-এম! লাম। মানে ফিলাম। তার মানেই ফিলিম।

ক্যাবলা আপত্তি করলে, লাম! লাম কেন হবে? এফ-আই-এল-এম ফিলম।

টেনিদা রেগেমেগে চিৎকার করে উঠল : সায়লেন্স! আবার কুরুবকের মতো বকবক করছিস? এই রইল গল্প–আমি চললুম।

প্রায় চলেই যাচ্ছিল, আমরা টেনেটুনে টেনিদাকে বসালুম। হাবুল বললে, ছাইড়া দ্যাও ক্যাবলার কথা–চ্যাংড়া!

–চ্যাংড়া! ফের ডিসটার্ব করলে ট্যাংড়া মাছ বানিয়ে দেব বলে রাখছি। হুঁ! লোহার গেট বন্ধ দেখে ন্যাংচাদা গোড়াতে তো খুব ঘাবড়ে গেল। ভাবলে, চন্দ্রবদন নির্ঘাত গুলপট্টি দিয়ে দিব্যি পরস্মৈপদী খেয়েদেয়ে সটকান দিয়েছে। তারপর ভাবলে, অন্যদিকেও তো দরজা থাকতে পারে। দেখা যাক।

পাঁচিলের পাশ দিয়ে ঘুরঘুর করছে–গেট-ফেট তো দেখা যাচ্ছে না। খুব দমে গেছে, এমন সময় হঠাৎ ভীষণ মোটা গলায় কে বললে, হু আর ইউ?

ন্যাংচাদা তাকিয়ে দেখল, পাঁচিলের ভেতর একটা ছোট ফুটো। তার মধ্যে কার দুটো জ্বলজ্বলে চোখ আর একজোড়া ধুমসো গোঁফ দেখা যাচ্ছে। সেই গোঁফের তলা থেকে আবার আওয়াজ এল : হু আর ইউ?

ন্যাংচাদা বললে, আমি–মানে আমাকে চন্দ্রবদনবাবু ফিলিমে পার্ট করতে ডেকেছিলেন। এটাতে তো ইউরেকা ফিলিম?

–ইউরেকা ফিলিম?-গোঁফের তলা থেকে বিচ্ছিরি দাঁত বের করে কেমন খ্যাঁক-খেঁকিয়ে হাসল লোকটা। তারপর বললে, আলবাত ইউরেকা ফিলিম। পার্ট করবে? ভেতরে চলে এসো।

-গেট যে বন্ধ। ঢুকব কী করে?

–পাঁচিল টপকে এসো। ফিলিমে নামবে আর পাঁচিল টপকাতে পারবে না, কী বলো?

ন্যাংচাদা ভেবে দেখলে, কথাটা ঠিক। ফিলিমের কারবারই আলাদা। দ্যাখ না–বোঁ করে লোকে নল বেয়ে চারতলায় উঠে পড়ছে, ঝপাং করে পাঁচতলার থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ছে–একটা চলতি ট্রেন থেকে লাফিয়ে আর একটা ট্রেনে চলে যাচ্ছে। এসব না করতে পারলে ফিলিমে নামাবেই বা কেন? ন্যাংচাদা বুঝতে পারলে, এখানে পাঁচিল টপকে ভেতরে যাওয়াই নিয়ম, ওইটেই প্রথম পরীক্ষা।

ন্যাংচাদা কী আর করে? দেওয়ালের খাঁজে-খাঁজে পা দিয়ে উঠতে চেষ্টা করতে লাগল। দুপা ওঠে–আর সড়াৎ করে পিছলে পড়ে যায়। শখের সিলকের পাঞ্জাবি ছিঁড়ল, গায়ের নুনছাল উঠে গেল, ঠিক নাকের ডগায় আবার কুটুস করে একটা কাঠপিঁপড়ে কামড়ে দিলে। ভেতরে বোধহয় আরও কিছু লোক জড়ো হয়েছে তারা সমানে বলছে-হেঁইয়ো জোয়ান–আর একটু–আর একটু

প্রাণ যায় যায় কিন্তু ন্যাংচাদা হার মানবার পাত্তর নয়। একে বাগবাজারের ছেলে, তায় জনতার দৃশ্যে পার্ট করতে এসেছে। আধঘণ্টা ধ্বস্তাধ্বস্তি করে ঠিক উঠে গেল পাঁচিলের ওপর। বসে একটু দম নিতে যাচ্ছে, অমনি তলা থেকে কারা বললে, আয় রে আয়–চলে আয় দাদা–আয় রে, আমার কুমড়োপটাশ

আর বলেই ন্যাংচাদার পা ধরে হ্যাঁচকা টান। ন্যাংচাদা একেবারে ধপাস করে নীচে পড়ল। কুমড়োপটাশের মতোই।

কোমরে বেজায় চোট লেগেছিল, বাপ-রে মা-রে বলতে বলতে ন্যাংচাদা উঠে দাঁড়াল। দেখলে পাঁচিলে-ঘেরা মস্ত জায়গাটা সামনে খানিক মাঠের মতো–একটু দূরে একটা বড় বাড়ি, পাশেই একটা ছোট ডোবা–তাতে জল নেই, খানিক কাদা। আর তার সামনে পাঁচ-সাতজন লোক দাঁড়িয়ে নানারকম মুখভঙ্গি করছে।

একজন একটা হুঁকো টানছে–তাতে কলকে টলকে কিচ্ছুটি নেই। আর একজনের ছেঁড়া সাহেবি পোশাক কিন্তু টুপির বদলে মাথায় একটা ভাঙা বালতি বসানো। একজনের গলায় ছেঁড়া জুতোর মালা। আর একজন মুখে লম্বা-লম্বা গোঁফ-দাড়ি সমানে চেঁচিয়ে বলছে : কুকুর আসিয়া এমন কামড় দিল পথিকের পায়। বলেই সে এমন ভাবে ঘ্যাঁক করে দৌড়ে এল যে, ন্যাংচাদাকে কামড়ে দেয় আর কি।

সেই সাহেবি পোশাক পরা লোকটা ধাঁ করে রদ্দা মেরে কুকুর আসিয়া এমন কামড়কে দূরে সরিয়ে দিলে। তারপর বললে–বন্ধুগণ, আমাদের নতুন অভিনেতা এসে গেছেন। বেশ চেহারাটি।

সকলে চেঁচিয়ে বললে, হিরো আলবাত হিরো।

ন্যাংচাদা প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু হিরো শুনেই চাঙ্গা হয়ে উঠল। বুঝল, সিনেমায় তো নানারকম পার্ট করতে হয়–তাই ওরা সব ওইরকম সেজেছে, যাকে বলে মেক আপ। তারপর তাকেই হিরো করতে চায়! ন্যাংচাদা নাক আর কোমরের ব্যথা ভুলে একেবারে আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি হাসল। বললে, তা আজ্ঞে, হিরোর পার্টও আমি করতে পারব–পাড়ার থিয়েটারে দুবার আমি হনুমান সেজেছিলুম। কিন্তু চন্দ্রবদনবাবু কোথায়?

সেই জুতোর মালা-পরা লোকটা বললে, চন্দ্রবদন শ্বশুরবাড়ি গেছে–জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খেতে। আমি হচ্ছি সুর্যবদন ডিরেকটার।

বালতি মাথায় লোকটা তাকে ধাঁই করে এক চাঁটি দিলে : ইউ ব্লাডি নিগার! তুই ডিরেকটার কীরে? তুই তো একটা হুঁকোবরদার। আমি হচ্ছি ডিরেকটার–আমার নাম হচ্ছে তারাবদন।

সূর্যবদন চাঁটি খেয়ে বিড়বিড় করতে লাগল। আর যে-লোকটা কামড়াতে এসেছিল, সে সমানে বলতে লাগল :

সকালে উঠিয়া আমি মনে-মনে বলি
 আজি কি সুন্দর নিশি পূর্ণিমা উদয়
একা ননী পাড়ে ছানা আমগাছে চড়ে
মহৎ যে হয় তার সাধু ব্যবহার

তারাবদন ধমকে দিয়ে বললে, চুপ! এখন রিহার্সেল হবে। তারপর হিরোবাবু-তোমার নাম কী?

ন্যাংচাদা বললে, আমার ভালো নাম বিষ্ণুচরণ–ডাকনাম ন্যাংচা।

-ন্যাংচা! আহা–খাসা নাম! শুনলেই খিদে পায়। তারপর ফিসফিসিয়ে বললে, জানো-আমার ডাক নাম চমচম!

ন্যাংচাদা বলতে যাচ্ছে, তাই নাকি হঠাৎ চমচম চেঁচিয়ে উঠল : কোয়ায়েট! সব চুপ। রিহার্সেল হবে। মিস্টার ন্যাংচা—

 ন্যাংচাদা বললে, আজ্ঞে?

–এক পা তুলে দাঁড়াও।

ন্যাংচাদা তাই করলে।

এবার দুপা তুলে দাঁড়াও।

ন্যাংচাদা ঘাবড়ে গিয়ে বললে, আজ্ঞে, দুপা তুলে কি

বলতেই তারাবদন চটাস করে একটা চাঁটি বসিয়ে দিলে ন্যাংচাদার গালে। বললে, রে বর্বর, স্তব্ধ করো মুখর ভাষণ! যা বলছি, তাই করো। ফিলিমে পার্ট করতে এসেছ দুপা তুলে দাঁড়াতে পারবে না! এয়ার্কি নাকি?

চাঁটি খেয়ে ন্যাংচাদার তো মাথা ঘুরে গেছে। কাঁউমাউ করে দুপা তুলে দাঁড়াতে গেল। আর যেই দুপা তুলতে গেছে, ধপাস করে পড়ে গেল মাটিতে।

সবাই চেঁচিয়ে উঠল : শেমশেম, পড়ে গেলি! ফাই–ফাই! :

ন্যাংচাদা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ফিলিমে নামতে গেলে নিশ্চয় দুপা তুলে দাঁড়াতে হয় কিন্তু কী করে যে সেটা পারা যায় কিছুতেই ভেবে পেল না।

তারাবদন ন্যাংচাদার জুলপি ধরে এমন হ্যাঁচকা মারল যে, তড়বড়িয়ে লাফিয়ে উঠতে হল বেচারিকে। তারপর তারাবদন বললে, এবার গান করো।

কী গান গাইব?

–যে গান খুশি। বেশ উপদেশপূর্ণ গান।

ন্যাংচাদা এক্কেবারে গাইতে পারে না..বুঝলি? মানে আমাদের প্যালার চাইতেও যাচ্ছেতাই গান গায়–একবার রাস্তায় যেতে-যেতে এমন তান ছেড়েছিল যে, শুনে একটা কাবলীওলা আচমকা আঁতকে উঠে ড্রেনের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু হিরো হওয়ার আনন্দে সেই ন্যাংচাদাই ভীমসেনী গলায় গান ধরল :

ভুবন নামেতে ব্যাদড়া বালক
তার ছিল এক মাসি–
ভূবনের দোষ দেখে দেখিত না
সে মাসি সর্বনাশী

এইটুকু কেবল গেয়েছে…হঠাৎ সবাই চেঁচিয়ে উঠল : স্টপ

তারাবদন বললে, না…আর গান না। এবার নাচো

-নাচব?

নিশ্চয় নাচবে।

–আমি তো নাচতে জানিনে।

নাচতে জানো না…হিরো হতে এসেছ? মামাবাড়ির আবদার পেয়েছো…না? বলেই কড়াৎ করে ন্যাংচাদার জুলপিতে আর-এক টান।

গেলুম গেলুম..বলে ন্যাংচাদা নাচতে লাগল। মানে ঠিক নাচ নয়…লাফাতে লাগল ব্যথার চোটে।

সকলে বললে, এনকোর…এনকোর!

যেই এনকোর বলা…অমনি তারাবদন আর-একটা পেল্লায় টান দিয়েছে ন্যাংচাদার জুলপিতে। পিসিমা গো গেছি..বলে ন্যাংচাদা এবার এমন নাচতে লাগল যে, তার কাছে কোথায় লাগে তোদের উদয়শংকর।

তারাবদন বললে, রাইট। ও-কে! কাট।

কাট! কাকে কাটবে? ন্যাংচাদা ভয় পেয়ে থমকে গেছে। তারাবদন বললে, এবার তা হলে সন্তরণের দৃশ্য। কী বলো বন্ধুগণ?

সঙ্গে সঙ্গে সকলে চেঁচিয়ে বললে, ঠিক…এবারে সন্তরণের দৃশ্য।

ন্যাংচাদা আরে আরে…করছ কী… বলতে বলতে সবাই ওকে চ্যাংদোলা করে তুলে ফেলল। তারপর চক্ষের পলকে নিয়ে ছুঁড়ে ফেললে সেই ডোবাটার ভেতরে।

কাদা মেখে ভূত হয়ে উঠতে যাচ্ছে…সবাই আবার ঠেলে ডোবার মধ্যে ফেলে দিলে। বলতে লাগল : সন্তরণ…সন্তরণ!

 আর সন্তরণ। ন্যাংচাদার তখন প্রাণ যাওয়ার জো। সারা গা…জামাকাপড় কাদায় একাকার…নাকে-মুখে দুর্গন্ধপচা পাঁক ঢুকে গেছে, আর বিছুটির মতো সে কী জ্বলুনি। ন্যাংচাদা যেমনি উঠতে চায় অমনি সবাই তক্ষুনি তাকে ডোবায় ফেলে দেয়। আর চাঁচাতে থাকে : সন্তরণ…সন্তরণ

শেষে ন্যাংচাদা আকাশ ফাটিয়ে হাহাকার করতে লাগল..মানে হাহাকার ফিলিমে পার্ট করতে এসেছিল কিনা : বাঁচাও…বাঁচাও…আমাকে মেরে ফেললে..আমি আর ফিলিমে পার্ট করব না…

প্রাণ যখন যাবার দাখিল তখন কোত্থেকে তিন-চারজন খাকী শার্ট-প্যান্ট পরা লোক লাঠি  হাতে দৌড়ে এল সেদিকে। আর তক্ষুনি তারাবদনের দল এক্কেবারে হাওয়া।

ন্যাংচাদার তখন প্রায় নাভিশ্বাস। খাকীপরা লোকগুলো তাকে পাঁক থেকে টেনে তুলে কিছুক্ষণ হাঁ করে মুখের দিকে চেয়ে রইল। শেষে বললে, ক্যা তাজ্জব! ই নৌতুন পাগলা ফির কাঁহাসে আসলো?

ব্যাপার বুঝলি? আরে…ওটা মোটেই ফিলিম স্টুডিয়ো নয়…লাম..মানে লুনাটিক অ্যাসাইলাম…অর্থাৎ কিনা পাগলা গারদ। উঁচু পাঁচিল আর লাম দেখেই ন্যাংচাদা ঘাবড়ে গিয়েছিল।

সেই থেকে ন্যাংচাদা নেংচে-নেংচে হাঁটে…আর সিনেমা হল দেখলেই চোখ বুজে করুণ গলায় গাইতে থাকে : দীনবন্ধু, কৃপাসিন্ধু..।

টেনিদা থামল। আমার ঝালমুনের শিশি ততক্ষণে সাফ। হাত চাটতে-চাটতে বললে, তাই বলছিলুম, তোর গোবরবাবুকে বারণ করে দে। আরে–আসলে ফিলিম স্টুডিয়োগুলোও এমনি পাগলা গারদ…গোবরবাবুকে স্রেফ ঘুঁটেচন্দর বানিয়ে ছেড়ে দেবে!

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *