১১. অ্যাডভেঞ্চার

১১. অ্যাডভেঞ্চার

প্রথমে বুবুন এবং তার কয়েক সেকেন্ড পরে সুমি ভিতরে লাফিয়ে পড়ল। দুজনেই খানিকক্ষণ গুটিসুটি মেরে বসে থেকে যখন নিশ্চিত হল কেউ তাদের দেখতে পায়নি তখন তারা গুঁড়ি মেরে ভিতরে বাসাটার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

বাসাটার কাছাকাছি গিয়ে তারা দেয়ালে কান লাগিয়ে ভিতরের কথাবার্তা শুনতে চেষ্টা করল, যদি কোনোভাবে আব্বার গলার আওয়াজ শুনতে পারে তা হলে সাথে সাথে ট্রান্সমিটারের সুইচটা অন করে দিয়ে ঠিক যেভাবে গোপনে এসে ঢুকেছে সেভাবে গোপনে বের হয়ে যাবে।

বুবুন ফিসফিস করে বলল, “সুমি!”

“কী হল?”

“দুজন এক জায়গায় থাক ঠিক না। হঠাৎ করে যদি ধরা পড়ে যাই তা হলে দু’জনেই একসাথে ধরা পড়ে যাব।”

“ঠিকই বলেছিস।”

“তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি পুরো বাসাটা একবার চক্কর দিয়ে আসি।”

“ঠিক আছে।”

বুবুন পুরো বাসাটা একবার চক্কর দিয়ে এল, জানালার নিচে দাঁড়িয়ে ভিতরের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করল, ফাঁকফোকর দিয়ে সাবধানে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু কোনো লাভ হল না। আগের জায়গায় ফিরে এসে দেখল সুমি সেখানে নেই, বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে বুবুনের। ধরা পড়ে গেল নাকি? তা হলে অবিশ্যি হৈচৈ দৌড়াদৌড়ি হত, কিন্তু সেরকম কিছুই তো শোনেনি। নিশ্চয়ই কোথাও গিয়েছে, এক্ষুনি ফিরে আসবে।

সত্যি সত্যি কিছুক্ষণের মাঝে সুমি ফিরে এল, কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “ভিতরে ঢোকার একটা উপায় পেয়েছি।”

“ভিতরে ঢোকার?”

“হ্যাঁ।”

“কীভাবে ঢুকবে?”

“বৃষ্টির পানির যে পাইপ রয়েছে সেটা বেয়ে ছাদে যাব, তারপর ছাদ থেকে ভিতরের বারান্দায়।”

বুবুনের পেটের ভিতরে কেমন জানি পাক খেয়ে ওঠে। ঢোক গিলে বলল, “কোনো বিপদ হবে না তো?”

“হলে হবে। আয়, আর দেরি করিস না।”

কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা গেল প্রথমে সুমি এবং তার পিছুপিছু বুবুন পানির পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে যাচ্ছে। এধরনের একটি কাজ যে বুবুন করতে পারবে তার বিশ্বাস ছিল না, কিন্তু সুমি দেখে তার নিজের উপর খানিকটা বিশ্বাস ফিরে আসে। পাইপটা শক্ত করে ধরে রেখে নিচের দিকে না তাকিয়ে হাঁচড়-পাঁচড় করে দুজন উপরে উঠে এল। ছাদে পানির একটা ট্যাংক রয়েছে, দুজনে সেটার আড়ালে দাঁড়িয়ে বাসার ভিতরে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করল। আবছা অন্ধকার, ভিতরে নির্জন সুমসাম, কোনো মানুষ আছে বলেই মনে হল না। দুই পাশে দুটি ঘরে আলো জ্বলছে, সেখানে হয়তো কেউ থাকতে পারে। সুমি ফিসফিস করে বলল, “ছাদে থেকে ভালো করে নিচে তাকিয়ে দেখ।”

“কী দেখব?”

“কিছু দেখা যায় কি না। কতজন মানুষ আছে কী সমাচার।”

দুজনে ছাদ থেকে নিচে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে। বাসাটা কত বড়, কয়টা রুম, কোথায় বারান্দা, কোথায় লুকানোর জায়গা আছে, কোথায় আলো, কোথায় অন্ধকার, হঠাৎ করে কেউ তাড়া করলে কোনদিকে পালিয়ে যাবে এই ধরনের ব্যাপারগুলো ছাদে বসেই আন্দাজ করার চেষ্টা করে। যখন বাসাটা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা হল তখন সুমি বলল, “চল, নিচে যাই।”

“কীভাবে যাবে?”

“কার্নিস ধরে ঝুলে নিচে রেলিঙের উপর নেমে পড়ব।”

“যদি পড়ে যাই?”

“পড়ব কেন! যদি ভয় পাস তা হলে উপর থেকে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দিই, সেই দড়ি বেয়ে নেমে যাব।”

“সেইটাই ভালো, তা হলে আবার দরকার পড়লে দড়ি বেয়ে উঠে যাব।”

দুজনে মিলে লম্বা খানিকটা দড়ি নিয়ে ছাদে পানির ট্যাংকের পাইপের সাথে বেঁধে নিচে ঝুলিয়ে দিল। দুই প্রস্থ দড়ির মাঝে মাঝে গিঁট বেঁধে দেওয়া আছে, তার মাঝে পা দিয়ে বুবুন আর সুমি বেশ সহজেই নিচে নেমে এল। বারান্দা দিয়ে হেঁটে দুজন বাসার এক অন্ধকার কোণায় লুকিয়ে পড়ল। বুবুনের বুক ধ্বক ধ্বক করে শব্দ করছে, সে ফিসফিস করে বলল, “এখন আব্বাকে খুঁজে বের করতে হবে।”

“হ্যাঁ।”

“দুজনই একসাথে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি এখানে পাহারা দাও, আমি যাই।”

“ঠিক আছে। চাচাকে কীভাবে খুঁজে বের করবি?”

“আব্বা যদি থাকেন তা হলে নিশ্চয়ই কোনো ঘরে দরজা বন্ধ করে না হয় তালা মেরে রেখেছে।”

“তাই যেসব ঘর বাইরে থেকে বন্ধ থাকবে না হয় তালা মারা থাকবে সেখানে টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করব কেউ আছে কি না।”

“ঠিক আছে। খুব সাবধান কিন্তু!”

“আমার ব্যাগটা রেখে গেলাম। এর মাঝে সব দরকারি জিনিসপত্র।”

“ঠিক আছে।”

বুবুন একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে অন্ধকার কোণা থেকে খুব সাবধানে বের হল। পা টিপে টিপে নিঃশব্দে সে হাঁটতে থাকে। কোনো ঘর বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগানো থাকলে সে আস্তে আস্তে দরজায় টোকা দিয়ে চাপা গলায় আব্বাকে ডেকে দেখল। দরজা খোলা থাকলে বাইরে দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল ভিতরে কারও নড়াচড়ার বা নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শোনা যায় কি না। কোনো ঘরে তালা দেওয়া থাকলে সাবধানে দরজা ফাঁক করে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। বাসার একেবারে শেষ মাথায় একটা ঘরে বাতি জ্বলছে, ঘরের দরজায় তালা লাগানো, বুবুন দরজা ফাঁক করে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতেই ভিতর থেকে আব্বার গলার আওয়াজ শুনতে পেল, “কে?”

বুবুন উত্তেজনায় প্রায় চিৎকার করে উঠছিল, অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত করে দরজায় মুখ লাগিয়ে চাপা গলায় বলল, “আব্বা আমি বুবুন।”

আব্বা ভিতর থেকে বললেন, “বুবুন, তুই এসেছিস? দরজাটা খোল, বাইরে থেকে কেন জানি বন্ধ করে রেখেছে।”

বুবুন আবার দরজায় মুখ লাগিয়ে চাপা গলায় বলল, “আব্বা, তুমি কোনো কথা বলো না, শুনতে পেলে বিপদ হয়ে যাবে।”

“ঠিক আছে বলব না।” আব্বা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, “তোর কোনো বিপদ হয়নি তো?”

“না আব্বা হয়নি।” উত্তেজনায় বুবুনের সবকিছু গোলমাল হয়ে যেতে থাকে। শব্দ শুনে যদি কেউ চলে আসে? কিন্তু অন্যকিছু করার আগে তাকে তার ট্রান্সমিটারটা অন করতে হবে। সবচেয়ে প্রথমে গাঙ্কু আর পিয়ালকে খবর পাঠাতে হবে যে আব্বা এখানে আছে। তারপর শুধু অপেক্ষা করা।

বুবুন পকেট থেকে ট্রান্সমিটারটা বের করে সুইচটা অন করতে যাচ্ছিল হঠাৎ তার ঘাড়ের মাঝে বাঘের মতো থাবা দিয়ে কে যেন জাপটে পড়ল, হুংকার দিয়ে বলল, “তুই কে? ভিতরে কীভাবে ঢুকেছিস?”

বুবুন ভয়ানক চমকে উঠল, মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে রোমশ ভুরু কুচকুচে কালো দাড়ি আর লালচোখের একজন মানুষ। বুবুনের হাত থেকে ট্রান্সমিটারটা ছিনিয়ে নিয়ে চিৎকার করে বলল, “এটা কী?”

বুবুন কোনো কথা না বলে প্রাণপণে চেষ্টা করল মানুষটার হাত থেকে ট্রান্সমিটারটা নিয়ে নিতে কিন্তু পারল না। মানুষটা বুবুনের চুল ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে সরিয়ে নিয়ে বলল, “তুই ভিতরে ঢুকেছিস কেমন করে?”

বুবুন কোনো কথা বলল না, যদি কোনোভাবে সুইচটা শুধু অন করে দিতে পারত তা হলেই গাব্বু আর পিয়ালের খবর চলে যেত। কিন্তু সেটা করতে পারল না। দুঃখে হতাশায় তার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল, মানুষটা হয়তো তাকে সত্যি সত্যি মেরেই ফেলবে–বুবুন আর কোনো কিছু চিন্তা করতে পারছিল না। রোমশ ভুরু আর কুচকুচে কালো দাড়ির মানুষটা বুবুনের হাত ধরে কীভাবে জানি মোচড় দিতেই সেটা বাঁকা হয়ে পিছনের দিকে চলে গেল প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল বুবুন। আব্বা দরজা ধাক্কা দিয়ে বললেন, “কী হয়েছে বুবুন?”

বুবুন কোনো কথা বলতে পারল না, মানুষটা দাঁতে দাঁত ঘষে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “বল, ভিতরে ঢুকেছিস কেমন করে?”

কিছু-একটা বলতে হবে এখন, সত্যি কথা বললে সুমিও ধরা পড়ে যাবে, সত্যি কথা বলা যাবে না কিছুতেই। বুবুন কোনোমতে বলল, “একটা জানালা খোলা ছিল।”

“কোন জানালা?”

বুবুন অনিশ্চিতের মতো বলল, “ঐ তো ঐদিকে।”

মানুষটা কী যেন ভাবল এক সেকেন্ড তারপর পকেট থেকে চাবির গোছা বের করে তালা খুলে বুবুনকে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। বুবুন তাল হারিয়ে নিচে পড়ে গিয়েছিল, কোনোমতে উঠে বসে আব্বাকে দেখতে পেল। আব্বা খুব অবাক হয়ে বুবুনের দিকে তাকিয়ে আছেন, কাছে এসে তাকে ধরে তুলে তার শরীরের ধুলো ঝাড়তে লাগলেন, আব্বাকে দেখে মনে হতে লাগল এখন শরীর থেকে ধুলো ঝাড়াই সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার। আব্বা ধুলো ঝেড়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ব্যথা পেয়েছিস বুবুন?”

বুবুন হাতে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছে, এখনও কাঁধে এবং কনুইয়ে টনটন করছে। কিন্তু আব্বাকে সেটা বলে কী লাভ? মাথা নেড়ে বলল, “না আব্বা।”

আব্বা খুব চিন্তিত মুখে বললেন, “এরা কারা বুবুন? আমাকে বলল তোর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আমাকে তাই নিতে এসেছে। আমি তাদের সাথে গেলাম আর তখন এই ঘরে এনে আটকে ফেলেছে। কিছু খেতেও দিচ্ছে না।”

বুবুন কিছু বলল না, আব্বা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তোর কি অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল?”

“না আব্বা। তোমাকে ধরার জন্য মিথ্যা কথা বলেছে।”

আব্বা মাথা নেড়ে বললেন, “এরা মনে হয় খুব খারাপ মানুষ।”

এত দুঃখেও বুবুনের হাসি পেয়ে গেল, আব্বা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন যে এরা খুব খারাপ মানুষ! এরা সেই মানুষ যারা একাত্তর সালে রাজাকার আলবদর হয়ে পাকিস্তানিদের সাথে মানুষ খুন করেছে, যখন বুঝতে পেরেছে দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে তখন দেশের সব ভালো ভালো প্রফেসর, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তারকে খুন করেছে। এতদিন পরে আবার সেই একই জিনিস করতে চাইছে?

আব্বা ঘরের মাঝে খানিকক্ষণ পায়চারি করে ঘরের এক কোণায় চেয়ারে চুপ করে বসে রইলেন, তাকে কেমন জানি দুঃখী দেখাতে লাগল, মনে হতে লাগল কিছু-একটা বুঝতে পারছেন না।

বুবুন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল বাইরে কী হচ্ছে। সুমি এখনও বাইরে আছে সেটাই একমাত্র ভরসা। রোমশ ভুরুর মানুষটা দূরে কোথাও গিয়ে চিৎকার করে কারও সাথে কথা বলছে, মনে হয় টেলিফোনে কাউকে বুবুনের খবর দিচ্ছে। আরও কিছু মানুষ বাইরে হাঁটাহাঁটি করছে বলে মনে হল। বুবুন খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভিতরের দিকে হেঁটে আসছিল হঠাৎ সুমির চাপা গলায় ডাক শুনতে পারল, “বুবুন! শুনে যা!”

বুবুন ছুটে গেল, “সুমি! এখানে এসেছিস তুই–ধরা পড়ে যাবি তো!”

সুমি কোনো কথা না বলে দ্রুত তার ব্যাগের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে হ্যাঁকস’টা বের করে বুবুনের হাতে দিল। ফিসফিস করে বলল, “নে, এইটা রাখ।”

“কী করব?”

“জানালার শিক নাহয় দরজার কড়া কিছু-একটা কেটে ফেল বের হওয়ার জন্যে।” সুমি হঠাৎ দূরে কোথাও তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কেউ আসছে, আমি গেলাম।”

সুমি গুঁড়ি মেরে সরে গেল, বুবুন হাতের হ্যাঁকস’টা ঘরের কোণায় একটা টেবিলের নিচে লুকিয়ে ফেলল। একটা মানুষ হেঁটে হেঁটে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে উঁকি দিল। বুবুন মানুষটাকে চিনতে পারল, ইঁদুরের মতো দেখতে সেই মানুষটা। দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে মানুষটা তার ময়লা হলুদ দাঁত বের করে হেসে বলল, “পিপীলিকার পাখা উঠে মরিবার তরে। ভেবেছিলাম খালি বড়টারে ধরব এখন দেখি ছোটটাও চলে এসেছে।”

বুবুন বিষদৃষ্টিতে মানুষটার দিতে তাকাল, কিছু বলল না। ইঁদুরের মতো মানুষটা আরও কিছুক্ষণ দরজার ফাঁক দিয়ে তাদের লক্ষ্য করে চলে গেল। মানুষটা সরে যেতেই বুবুন দরজার কাছে এসে কড়া দুটি লক্ষ করল। দুটি কড়া একত্র করে বাইরে বড় একটা তালা ঝুলছে। হ্যাঁকস দিয়ে বাইরের সেই তারটি কাটা খুব সহজ হবে না। কিন্তু কড়ার যে-অংশটা দরজা দিয়ে ভিতরে এসে একটা বল্টু দিয়ে দিয়ে লাগানো রয়েছে সেটা মনে হয় খুব সহজেই কেটে ফেলা যাবে। তখন কড়াটা ঠেলে বের করলেই ঘর থেকে বের হয়ে আসা যাবে। যদি আশেপাশে কেউ না থাকে তা হলে দরজা খুলে বের হয়ে যাওয়াও কোনো কঠিন ব্যাপার নয়।

বুবুন কাজে লেগে গেল, হ্যাঁক’সটা দিয়ে কাটতে একধরনের শব্দ হয়। শব্দটা ঝিঁঝিপোকার কর্কশ ডাকের মতে, বাইরের ঝিঁঝিপোকার শব্দের সাথে সেটা বেশ মিলে গিয়েছে। বুবুন কী করছে আব্বা তীক্ষ্ণচোখে সেটা দেখতে লাগলেন কিন্তু সেটা নিয়ে ভালোমন্দ কিছুই বললেন না।

পাঁচ মিনিটের মাঝেই কড়াটার একটা অংশ খুলে এল, ইচ্ছে করলেই এখন বুবুন তার আব্বাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসতে পারে কিন্তু সে বের হল না। বুবুন কড়াটা ঠিক জায়গায় লাগিয়ে রাখল, বাইরে থেকে কেউ যেন বুঝতে না পারে যে এটা আসলে খুলে নেওয়া হয়েছে।

কিছুক্ষণের মাঝেই সুমিকে আবার দেখা গেল। সে গুঁড়ি মেরে দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। বুবুন সাথে সাথে কড়াটা ঠেলে বের করে দিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল। সুমি চারিদিকে তীক্ষ্ণচোখে তাকাতে তাকাতে ফিসফিস করে বলল, “দরজা খুলে ফেলেছিস?”

“হ্যাঁ।”

“চল বের হয়ে আয় এখন। চাচাকে নিয়ে আয়।”

আব্বা কেমন জানি বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে আছেন। কী হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছেন না। বুবুন ফিসফিস করে বলল, “আব্বা, কোনো শব্দ করো না। আস্তে আস্তে বের হয়ে আসো।

আব্বা বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লেন। সুমি তার ব্যাগ থেকে একটা বোতল বের করে ভিতর থেকে কী যেন মেঝেতে ঢেলে দিল। বুবুন জিজ্ঞেস করল, “এটা কী?”

“সাবান পানি। পিছলে করার জন্যে।”

“পিছলে করে কী লাভ?”

“দেখবি একটু পরেই।”

সুমি দরজাটা বন্ধ করে আবার কাটা কড়াটা ফুটো দিয়ে ঢুকিয়ে দিল, বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে দরজায় তালা লাগানো রয়েছে।

কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি তারা বাসার কোণায় সেই অন্ধকার অংশে গিয়ে লুকিয়ে গেল। আব্বা কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছেন, মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা নিয়ে চিন্তা করে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না। দুজনে মিলে প্রায় হাত ধরে টেনে তাঁকে সরিয়ে নিতে হল। অন্ধকারে লুকিয়ে গিয়ে বুবুন ফিসফিস করে বলল, “এখন কী করবে?”

“মানুষগুলিকে এই ঘরে আটকে ফেলতে হবে। তারপর পালাব।”

“কেমন করে আটকাবে?”

“যখন এই ঘরে ঢুকবে তখন বাইরে থেকে ছিটকানি লাগিয়ে দেব।”যদি না ঢোকে?”

“একশোবার ঢুকবে। এই দ্যাখ!” সুমি তার ব্যাগ থেকে একটা বড় ঢেলা বের করে হঠাৎ একটা জানালার দিকে ছুঁড়ে দিল, ঝনঝন করে কাঁচ ভেঙে পড়ল প্রচণ্ড শব্দে সাথে সাথে ঘর থেকে কয়েকজন মানুষ বের হয়ে এল। রোমশ ভুরুর মানুষটি, অন্যটি ইঁদুরের মতো চেহারার মানুষ, বাকি দুজনকে তারা আগে দেখেনি।

ইঁদুরের মতো দেখতে মানুষটি বলল, “কে? কে কাঁচ ভেঙেছে?”

“বেকুব ছেলেটা হবে নিশ্চয়ই।”

“দেখে আয় তো!”

“যাই।” বলে একজন মানুষ তাদেরকে যে-ঘরে আটকে রেখেছিল সেদিকে এগিয়ে গেল। দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়েই সে চেঁচিয়ে উঠে বলল, “ঘরে কেউ নেই।”

ইঁদুরের মতো মানুষটা খেঁকিয়ে উঠে বলল, “কেউ নেই মানে? দরজায় তালা মারা আছে না?”

মানুষটা দরজার দিকে ভালো করে তাকাল, তালাটা ধরে একটা ঝাঁকুনি দিল, বুবুন আর সুমি ভয় পাচ্ছিল যে দরজার কড়াটা বুঝি খুলে আসবে, কিন্তু কপাল ভাল, সেটা খুলল না। মানুষটা এবারে হতভম্বের মতো বলল, “দরজায় তালা মারা আছে, কিন্তু ভিতরে মানুষ নাই।”

“কী বলছিস ছাগলের মতো?” এবারে অন্য তিনজনও দরজার সামনে দাঁড়াল, ভিতরে উঁকি দিল এবং কাউকে না দেখে খুব অবাক হয়ে গেল।

ইঁদুরের মতো মানুষটা বলল, “তালাটা খুল দেখি!”

রোমশ ভুরুর মানুষটা পকেট থেকে চাবি বের করে তালাটা খুলে ভিতরে ঢুকল, তার পিছনে অন্যরাও।

সুমি বুবুনকে খোঁচা দিয়ে বলল, “এখন চল। তুই দরজাটা চেপে রাখবি আর আমি ছিটকানি লাগাব।”

বুবুন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বলল, “ঠিক আছে।” যদি ওরা ঠিকমতো ছিটকানি লাগাতে না পারে তা হলে কী হবে বুবুন এই মুহূর্তে সেটা নিয়ে আর ভাবতে চায় না।

বুবুন আর সুমি শুনতে পেল ঘরের ভিতর থেকে একজন বলছে, “এখানে পানি ফেলেছে কে?”

“জানি না। কিন্তু বের হল কোনদিক দিয়ে?”

“তাজ্জবের ব্যাপার! কুফুরী কালাম জানে নাকি?”

মানুষগুলো হেঁটে জানালার কাছে গিয়েছে, এই ফাঁকে বুবুন আর সুমি পা টিপে টিপে দরজা দড়াম করে বন্ধ করে দিল, বন্ধ করার আগের মুহূর্তে ইঁদুরের মতো চেহারার মানুষটা বুবুনকে দেখে ফেলে ছুটে আসতে গিয়ে মেঝেতে ঢেলে রাখা-সাবান পানিতে ভয়ংকর শব্দ করে পিছলে পড়ে। বুবুন প্রাণপণে দরজা চেপে রাখল এবং সুমি দ্রুত ছিটকানিটা তুলে দিল। ভিতরে আবার প্রচণ্ড একটা শব্দ হল, আরও কেউ নিশ্চয়ই আছাড় খেয়ে পড়েছে। সুমি আর বুবুন হাত তুলে একজন আরেকজনকে থাবা দিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। বুবুন বলল, “দেরি করে কাজ নেই, পালাও।”

“হ্যাঁ চল।”

আব্বাকে নিয়ে তারা যখন বারান্দা ধরে ছুটতে শুরু করেছে তখন শুনল দরজার দমাদম লাথি পড়ছে। শক্ত দরজায় শক্ত ছিটকানি কিন্তু চারজন মানুষের লাথি কতক্ষণ আটকাতে পারবে কে জানে!”

বাসার বাইরে বের হয়ে সুমি তার ব্যাগ থেকে তালা বের করে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। এখন দরজা ভেঙে বের হয়ে এলেও ক্ষতি নেই। এখান থেকে বের হবার জন্যে এবারে বাকি রয়েছে গেট। সাথে যদি আব্বা না থাকতেন তা হলে বুবুন আর সুমি দেয়াল টপকে পার হয়ে যেত, কিন্তু আব্বাকে নিয়ে তো আর সেটা করা যাবে না, গেট দিয়েই বের হতে হবে। গেটে যে-মানুষটা রয়েছে সে বাসার ভিতরে কী হয়েছে না হচ্ছে সেসব কিছু জানে বলে মনে হয় না।

সুমি আব্বাকে বলল, “চাচা, আপনি গেটের দিকে যান। গেট খোলা না থাকলে দারোয়ানকে বলবেন গেট খুলে দিতে।”

আব্বা কথাটা শুনলেন কি না কিংবা শুনলেও ঠিক বুঝতে পেরেছেন কি না বোঝা গেল না, কিন্তু মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেলেন। সুমি বুবুনকে নিয়ে অন্ধকারে লুকিয়ে গেল। বুবুন জিজ্ঞেন করল, “কী করবি এখন?”

সুমি ব্যাগ খুলে একটা চাকু বের করে বলল, “দারোয়ান যখন চাচার সাথে কথা বলবে তখন পিছন থেকে দারোয়ানের উপর লাফিয়ে পড়তে হবে, ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে গলায় চাকুটা ধরতে হবে। হিন্দি সিনেমাতে যেরকম করে”

“যদি ফেলতে না পারি?”

“ফেলতে হবে। আমরা পিছনে থাকব, দারোয়ান বুঝতেও পারবে না আমরা ছোট না বড়, ভয় পেয়ে শুয়ে থাকবে।”

বুবুন ঢোক গিলে বলল, “ঠিক আছে।”

“এত ভয় পাওয়ার কী আছে? গাব্বু আর পিয়াল গেটের ওইপাশে আছে না? ডাক দিলেই গেট টপকে চলে আসবে।

“তা ঠিক।”

আব্বা ততক্ষণে গেটের পাশে চলে এসেছেন। আব্বাকে দেখে শুকনোমতন একজন লোক বের হয়ে এল, সে বেশ অবাক হয়ে আব্বাকে দেখছে ঠিক তখন বুবুন আর সুমি পিছন থেকে মানুষটার উপরে লাফিয়ে পড়ল। এ-ধরনের একটা ব্যাপারের জন্যে মানুষটা একটুও প্রস্তুত ছিল না, ভয় পেয়ে ডাক ছেড়ে একটা চিৎকার দিয়ে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল। বুবুন চাকুটা গলার কাছে ধরে রেখে গলার স্বর যথা সম্ভব মোটা করে বলল, “খবরদার, নড়াচাড়া করলে কিন্তু জবাই করে ফেলব।”

সুমি হুংকার দিয়ে বলল, “গেটের চাবি কই?” মানুষটা চিচি করে বলল, “গেটে তালা দেওয়া নাই।”

বুবুন ব্যাগ থেকে দড়ি বের করে মানুষটার হাত বাঁধতে বাঁধতে বলল, “আব্বা গেট খুলে বাইরে চলে যাও।”

“বাইরে?”

“হ্যাঁ। দেখো সেখানে গাব্বু আর পিয়াল আছে।”

“ও।” আব্বা বেশ কষ্ট করে গেট খুললেন। দারোয়ানকে ততক্ষণে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। সুমি বুবুনের দিকে দাঁত বের করে হেসে বলল, “অপারেশান সাকসেসফুল।”

“চলো পালাই।”

আব্বা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। গেটের কাছে গাব্বু আর পিয়ালের দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল, তাদেরকে দেখা গেল না। বুবুন আব্বার হাত ধরে বলল, “আব্বা চলো যাই।”

আব্বা আস্তে আস্তে বললেন, “একটা গাড়ি আসছে।”

বুবুন চমকে উঠে সামনে তাকাল, সত্যি সত্যি একটা গাড়ি ছুটে আসছে এদিকে। সুমি আর বুবুন কী করবে বুঝতে পারছিল না, আব্বাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ার আগেই এদিকে তীব্র হেডলাইট পড়ল তাদের উপর। গাড়ি প্রচণ্ড বেগে কাছে ছুটে এসে হঠাৎ টায়ার পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে ব্রেক করল। কিছু বোঝার আগেই গাড়ির চারটা দরজা খুলে চারজন মানুষ লাফিয়ে নামল। হেডলাইটের তীব্র আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে আছে বলে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু মানুষগুলোর হাতে বন্দুক। মানুষগুলো বন্দুক তাক করে আছে তাদের দিকে। গাড়ির পিছনের সিট থেকে আরও একজন মানুষ নামছে, ভালো করে দেখা যাচ্ছে না মানুষটাকে।

হেঁটে হেঁটে কাছে এল মানুষটা। মুখে দাড়ি মাথায় টুপি। গায়ে লম্বা আচকান, হাতে একটা লাঠি। লাঠিতে ভর দিয়ে মানুষটা কাছে এসে দাঁড়াল। কেউ বলে দেয়নি কিন্তু বুবুন জানে এই মানুষটা খবিরউদ্দিন। মানুষটা খসখসে গলায় বলল, “ধর এইগুলোরে। ভিতরে নে।”

দুজন মানুষ এসে খপ করে বুবুন আর সুমিকে ধরল, সুমি এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করতেই তার মাথায় টুপি খুলে লম্বা চুল বের হয়ে আসে।

সুমিকে ধরে-রাখা মানুষটা চোখ বড় বড় করে বলল, “নাউজুবিল্লাহ্! এইটা দেখি মাইয়া!”

খবিরউদ্দিন দাঁতে দাঁত ঘঁষে বলল, “মাইয়া আর পোলা আমি বুঝি না, ভিতরে নে আগে।”

প্রথমে আব্বা তার পিছনে সুমি এবং সবার পিছনে বুবুনকে ধরে লোকগুলো ভিতরে রওনা দেয়।

বুবুন মাথা ঘুরিয়ে লোকগুলোকে দেখল। এটা কি সত্যিই ঘটছে নাকি এটা একটা দুঃস্বপ্ন?

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *